ফন্ট সাইজ:
থিম:
প্রেমের আলোড়ন

৪৯তম পর্ব

লেখক: এমডি সুহান জয়

গল্প: প্রেমের আলোড়ন

লেখক:এমডি সুহান জয়

পেজ: Midnight Tales by Joy

পর্ব: ৪৯ (প্রথম অংশ)

(Note – এটি একটি প্রণয় ও জীবনবোধের মিশ্রণ সম্বলিত গল্প। যেখানে তীব্র রোম্যান্সের পাশাপাশি সামাজিক বাস্তবতা ও ব্যক্তিগত সংগ্রাম তুলে ধরা হয়েছে।)

জাহির দরজায় পিঠ ঠেকিয়ে কিছুক্ষণ স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। পুরো ঘরজুড়ে এক অদ্ভুত নিস্তব্ধতা, শুধু এসি-র মৃদু গুঞ্জন আর সুহানার অনিয়মিত নিশ্বাসের শব্দ পাওয়া যাচ্ছে। ধীরে ধীরে সে বিছানার দিকে এগিয়ে গেল। সাদা চাদরের ওপর শুয়ে থাকা সুহানাকে দেখে তার বুকের ভেতরটা দুমড়েমুচড়ে যাচ্ছে।

বেডের পাশে রাখা চেয়ারটা টেনে সে সুহানার একদম কাছে বসল। সুহানার ফ্যাকাশে মুখটা মায়ায় ভরা, কিন্তু ঠোঁটের কোণে আর কপালে আঘাতের চিহ্নগুলো জাহিরকে অপরাধবোধে বিদ্ধ করছে। সে কাঁপা কাঁপা হাতে সুহানার ব্যান্ডেজ করা জায়গার ওপর নিজের হাত রাখল। হিমশীতল শরীর!

"খুব কষ্ট হচ্ছে, না সুহু?" জাহির ফিসফিস করে বলল। ওর গলার স্বর বুজে এল। "আমি জানি, তুমি আমাকে কোনোদিন ক্ষমা করবি না, তাই তোমাকে জানতেই দেবো না । আজকের এই দিনটা এমন হওয়ার কথা ছিল না। আমার আর তোমাকে বউ সাজে দেখা হলো না পরিস্থিতি আমাকে স্বার্থপর বানিয়ে দিয়েছিল আমি কি করবো বল ?

"ভয় নেই, আমি আছি তো। এখন থেকে তুমি আমার। দুনিয়ার কেউ আর তোকে আমার কাছ থেকে কেড়ে নিতে পারবে না। তুমি সুস্থ হয়ে ওঠো, তারপর যত খুশি চিল্লামিল্লি করো, গালাগালি করো—সব মেনে নেব। শুধু ঠিক হয়েযাও।"

রাত বাড়ছে। জাহির চেয়ার ছেড়ে উঠে সাবধানে সুহানার পাশে বিছানায় আধশোয়া হলো। খুব সাবধানে, যেন ওর শরীরে সামান্যতম স্পর্শ না লাগে। সুহানার একটা হাত নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে সে একদৃষ্টিতে ওর মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। আজ তাদের বাসর রাত, কিন্তু কোনো আনন্দ নেই, নেই কোনো উৎসবের আমেজ। আছে শুধু একরাশ দুশ্চিন্তা আর কষ্ট।

জাহির সুহানার হাত ধরলো আলতো করে হাতের উলটো পিঠে ঠোঁট ছোঁয়ালো নিজের হাতের মাঝে আবদ্ধ করলো সুহানার হাতখানা জাহিরের হাতের তুলনায় সুহানার হাত ছোটো সরু সরু লম্বা লম্বা আঙুল হাতের তালু চেপে ধরায়ে লাল হয়েছে জাহির খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখলো , মুখের দিকে চাইলো চোখ টা ফুলেছে একটু ঠোঁটের পাশে কেটেছে একটু খানি।

তাকাতে তাকাতে কখন যে জাহিরের চোখ লেগে এল, সে নিজেও জানল না। সুহানার হাতটা শক্ত করে ধরে রেখেই সে ঘুমের দেশে তলিয়ে গেল।

সবাই যে যার রুমে চলে গেছে। শত চেষ্টা করেও কেউ জাহিরকে এক দানা খাবার খাওয়াতে পারেনি। এমনকি বাবার কড়া ধমকও আজ কোনো কাজে আসেনি। জাহির ঠায় দাঁড়িয়ে ছিল দরজার বাইরে, কারো কোনো অনুরোধই তার কানে পৌঁছায়নি। শেষ পর্যন্ত সাবেরা বেগম হাল ছেড়ে দিলে আফ্রিদি তাকে জোর করে রুমে নিয়ে যায়।

মোহনার প্রশ্নে তানি এক চিলতে বাঁকা হাসি হাসল। সে খাটের ওপর বাবু হয়ে বসল; রুমে সবাই উপস্থিত থাকলেও সে কাউকে পরোয়া করে না। তার সাজানো স্বপ্নগুলো আজ ধূলিসাৎ হয়ে গেছে—এটা ভাবতেই তার রাগ চড়চড়িয়ে মাথায় চড়ে বসছে।

তানি তাচ্ছিল্যের স্বরে বলল, "এইসব জানা কি খুব বড় ব্যাপার নাকি?"

কথাটা শুনে মোহনা রাগে মারার জন্য তেড়ে আসতেই আয়েশা বেগম সামনে এসে দাঁড়ালেন। তিনি কঠোর গলায় বললেন, "খবরদার! আমার মেয়ের গায়ে যেন একটা টোকাও না পড়ে। তাহলে কিন্তু হিতে বিপরীত হবে। আমার মেয়েকে ওই মেয়ের মতো ভাববেন না যে যখন-তখন গায়ে হাত তুলবেন!"

আতিফ সাহেব মোহনাকে টেনে সরিয়ে নিলেন। তিনি তানির দিকে তাকিয়ে হতাশ গলায় বললেন, "তানি, এটা করে কি খুব ভালো কাজ করলে তুমি?"

তানি সটান জবাব দিল, "হ্যাঁ, করেছি তো! আমার জীবনটা শেষ করে দিয়ে তোমার আদরের মেয়ে সুখে থাকবে, সেটা আমি হতে দেব কেন? ওর তো জানা দরকার ছিল ওর আসল পরিচয়টা কী, তাই না? তাই আমি সব বলে দিয়েছি।"

আতিফ সাহেব তানির মুখে এমন উদ্ধত কথা শুনে স্তব্ধ হয়ে গেলেন। তার বিশ্বাস হচ্ছে না যে তানি এতটা নিচে নামতে পারে। তিনি কাঁপা গলায় বললেন, “ও তো কিছুই জানত না ”।

তানি সগর্বে হাসল। “বোন? তোমার মেয়ে কি আমাকে বোন মানে না কি ? সুহানা কে বোন ভাবে আমাকে নয়”

মোহনা বেগম চিৎকার করে উঠলেন, “তুই শুধু নিজের হিংসা চরিতার্থ করতে চাস!”

আয়েশা বেগম এবার কণ্ঠস্বর আরও উঁচিয়ে মোহনার ওপর চড়াও হলেন। তিনি তীক্ষ্ণ গলায় বললেন, “আমার মেয়ের দোষটা আসলে কোথায়? ও তো কেবল সত্যিটাই সামনে এনেছে। ওই মেয়েটার আসল পরিচয় তো আপনারা গোপন করে রেখেছিলেন; আজ না হোক কাল তো সে জানতই। এখন এই সব কথা বলে আর কী লাভ? লাভের গুড় তো সব পিঁপড়েয় খেয়ে ফেলেছে! বিয়ে হওয়ার কথা ছিল আমার মেয়ের সাথে, অথচ বিয়ে হয়ে গেল অন্য কারোর। আমার মেয়েটার যে কতটা কষ্ট হচ্ছে, তা কি আপনারা একবারও ভেবে দেখেছেন?”

রাদিফ স্তব্ধ হয়ে বসে আছে, তার মুখ দিয়ে কোনো কথা সরছে না। এমনকি এখন বাইরে বেরোতেও তার ভীষণ লজ্জা লাগছে। নিজের অতীতটা এভাবে সবার সামনে চলে আসবে, সেটা সে কল্পনাও করতে পারেনি। টাকা-পয়সা তো মেলাই দূরে থাক, উল্টো মান-সম্মানটুকুও ধুলোয় মিশে গেল। নতুন করে আর কোনো তর্ক বা ঝামেলায় জড়ানোর বিন্দুমাত্র ইচ্ছে তার নেই।

তানি তার বাবার দিকে একবার তাকাল; দেখল তিনি অন্য দিকে মুখ ফিরিয়ে নিঝুম হয়ে বসে আছেন, হয়তো গভীরভাবে কিছু ভাবছেন। তানি আর কিছু না বলে চোখ সরিয়ে নিল এবং চুপচাপ শুয়ে পড়ল। আয়েশা বেগম পরম আদরে মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন। এরপর রাদিফ নিঃশব্দে রুম থেকে বেরিয়ে গেল; বাড়ির কেউ তাকে একবারের জন্য খাওয়ার কথাও বলেনি। নিজের রুমে যাওয়ার পথে জাহিরের বন্ধ দরজার দিকে নজর পড়তেই তার বুকটা কেঁপে উঠল। আজ সে চাইলেও অস্বীকার করতে পারছে না যে, ওই ঘরের ভেতরে থাকা মানুষটা তারই অংশ।

রাত বাড়ার সাথে সাথে বাইরে কুকুরগুলোর গগনবিদারী চিৎকার শুরু হলো। পাহারাদারের হাঁকডাক আর কুকুরের ডাকে জিসানের ঘুম ভেঙে গেল। সে ধড়ফড় করে উঠে বসে ঘড়ির দিকে তাকাল; দেখল রাত তখন ৩টা ২৪ মিনিট। জিসান জানালা খুলে বাইরে উঁকি দিয়ে দেখল কুকুরগুলো মাটি খুঁড়ে কিছু একটা বের করার চেষ্টা করছে আর দারোয়ান তাদের তাড়িয়ে দিচ্ছে। সে জানালাটা টেনে দিয়ে আবার শুয়ে পড়ল। ওদিকে জাহির ক্লান্তিতে গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন হয়ে পড়েছে। ঘুমের ঘোরে কখন যে সুহানার হাতটা তার মুঠো থেকে ফসকে গেছে, সেদিকে তার কোনো খেয়াল নেই। দেখতে দেখতেই ভোরের আলো ফুটে উঠল আর চারপাশ পাখির কলকাকলিতে মুখরিত হয়ে উঠল।

বেলা গড়িয়ে সকালের রোদ বেশ কড়া হয়েছে। আজকে উঠতে সবার দেড়ি হয়েছে বাড়ির গিন্নিরা ডাইনিং টেবিলে নাস্তা সাজাতে ব্যস্ত, আর গৃহকর্মীরা গতকালকের ধকল সামলে থালাবাসন ধোয়ামোছার কাজ সারছে। আফ্রিদি আলতো করে তুহিনাকে ডাকল, "তোতা পাখি, ওঠো! অনেক দেরি হয়ে গেছে কিন্তু।"

তুহিনা ধীরলয়ে চোখ মেলে তাকাতেই আফ্রিদি এক চিলতে হাসি দিয়ে ওর কপাল থেকে এলোমেলো চুলগুলো সরিয়ে দিল। তুহিনা একটা হাই তুললে আফ্রিদি ওকে ধরে বিছানায় বসিয়ে দিল। গতরাতে তুহিনা আর পোশাক বদলানোর সুযোগ পায়নি, আফ্রিদি শুধু ওর ভারী গয়নাগুলো খুলে একপাশে গুছিয়ে রেখে দিয়েছিল।

তুহিনা ঘুম জড়ানো কণ্ঠে আস্তে করে বলল"গুড মর্নিং!"

"গুড মর্নিং ডিয়ার।" আফ্রিদি উত্তর দিল। আফ্রিদি উৎসাহ দিয়ে বলল, "এবার ঝটপট ফ্রেশ হয়ে নাও, বাইরে সবাই হয়তো আমাদের জন্য অপেক্ষা করছে।"

আস্তে আস্তে গতরাতের সব স্মৃতি তুহিনার মনে পড়তে লাগল। মুহূর্তেই ওর মুখটা ছোট হয়ে এল। সে ভাবছে, কীভাবে এখন বাইরে যাবে? কোন মুখে জাহিরের সামনে দাঁড়াবে? সুহানার আজকের এই অবস্থার জন্য তো সে নিজেকেই দায়ী মনে করছে।

আফ্রিদি ওর মনের অবস্থা বুঝতে পেরে চুলগুলো হাত দিয়ে গুছিয়ে দিতে দিতে বলল, "চিন্তা করো না, সব ঠিক হয়ে যাবে। আমাদের বাইরে যেতেই হবে। সুহানার সাথে দেখা করবে না?"

তুহিনা অপরাধবোধে ভরা কণ্ঠে বলল, "ও তো আমাকে দেখতেই চায় না।"

"তোমাকে এই কথা কে বলল?" আফ্রিদির প্রশ্ন।

তুহিনা আর কথা বাড়াল না। বিছানা ছেড়ে উঠে দাঁড়াল এবং ব্যাগ থেকে একটা শাড়ি বের করে নিয়ে সোজা ওয়াশরুমে ঢুকে গেল।

আফ্রিদি বিছানা ছেড়ে উঠে দাঁড়াল এবং দরজা খুলে বাইরে বারান্দায় এল। নিচে তাকিয়ে দেখল বড়রা সবাই যার যার কাজে ব্যস্ত, কিন্তু বাচ্চাকাচ্চারা বোধহয় এখনো ঘুম থেকে ওঠেনি। সে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে একটা আড়মোড়া ভেঙে শরীরের জড়তা কাটাল। একবার ভাবল জাহিরের দরজায় টোকা দিয়ে ওকে ডাকবে, কিন্তু পরক্ষণেই মত বদলে ভাবল—থাক, একটু ঘুমাক।

ঠিক সেই সময় সাবেরা বেগম জাহাঙ্গীর সাহেবের জন্য চা নিয়ে উপরে উঠছিলেন। আফ্রিদিকে দেখে তিনি মাঝপথেই থেমে গেলেন। আফ্রিদি ফুপিকে দেখে এগিয়ে এল এবং আলতো করে তার হাত থেকে চায়ের কাপটা নিয়ে নিল।

"এটারই খুব দরকার ছিল এখন!"

সাবেরা বেগম হেসে বললেন, "আরে এটা তো তোর জন্য নয়, তুই নিচে গিয়ে খা। এটা তোর ফুপার জন্য এনেছি।"

আফ্রিদি আবদারের সুরে বলল, "ফুপা নাহয় একটু পরেই খাবে, আগে আমি খেয়ে নিই।"

সাবেরা বেগম মৃদু হাসলেন। একটু ইতস্তত করে জিজ্ঞেস করলেন, "তুহিনা কি ঘুম থেকে উঠেছে?"

আফ্রিদি আলতো করে মাথা নাড়ল। সাবেরা বেগম তখন মলিন মুখে জাহিরের বন্ধ দরজার দিকে তাকালেন। আফ্রিদি ফুপির মনের অবস্থা বুঝতে পেরে তাকে কাছে টেনে সান্ত্বনা দিল, "কিছু হবে না ফুপি, তুমি একদম চিন্তা করো না। যা হয়েছে তা আমাদের মেনে নিতেই হবে। আসলে আমার জন্যই সবটা এলোমেলো হয়ে গেল, কিন্তু বিশ্বাস করো—আমি কোনোদিন এমনটা চাইনি।"

সাবেরা বেগম ম্লান হেসে বললেন, “তোরে আমি দোষারোপ করিনি রে বাপ।”

কথাটা শুনেই আফ্রিদি তার ফুপিকে জড়িয়ে ধরল।নিচু স্বরে বলল, “থ্যাঙ্ক ইউ।”

সাবেরা পরম মমতায় আফ্রিদির পিঠে হাত বুলিয়ে দিলেন। মা-মরা এই ছেলেটাকে তিনি নিজের সন্তানের মতোই ভালোবাসেন; তাই হাজার কষ্ট হলেও তাকে কিছু বলতে পারেন না। জাহিরকে তিনি শাসন করতে পারলেও আফ্রিদির বেলাতে মনটা নরম হয়ে যায়। তাছাড়া জাহিরের সামনে আফ্রিদিকে বকাঝকা করার জো নেই; বন্ধুর গায়ে আঁচ লাগলে জাহির মুখ কালো করে চলে যাবে। ছোটবেলার পুরনো কথা মনে পড়তেই সাবেরা বেগমের ঠোঁটের কোণে এক চিলতে হাসি ফুটে উঠল।

তিনি আলতো করে আফ্রিদিকে সরিয়ে দিয়ে বললেন, “এবার যা, নিজের বউয়ের খেয়াল রাখ। ছেলেদের দায়িত্ব তো আমি ভাগ করে দিয়েছি, আমার কাজ শেষ। এখন তুই ভেতরে যা।”

সাবেরা বেগমের স্নেহের পরশ পেয়ে আফ্রিদির মনের ভার কিছুটা হালকা হলো। তিনি মৃদু হেসে সিঁড়ি দিয়ে নিচে নেমে গেলেন। আফ্রিদি নিজের রুমের দরজার সামনে গিয়ে দাঁড়াল।

আফ্রিদি দরজায় হালকা টোকা দিয়ে ভেতরে ঢুকল। দেখল তুহিনা শাড়ি পরে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে আছে। তার চোখেমুখে বিষণ্ণতা থাকলেও আজ তাকে এক স্নিগ্ধ মায়াবী লাগছে। আফ্রিদি পেছনে গিয়ে দাঁড়াল।

“খুব সুন্দর লাগছে তোমায়,” আফ্রিদি নিচু স্বরে বলল।

তুহিনা আয়নায় আফ্রিদির প্রতিবিম্বের দিকে তাকিয়ে একটু ম্লান হাসল।

আফ্রিদি তুহিনার হাত ধরে বলল, “চলো এবার নিচে যাই”।

নিচে নামতেই দেখল বাড়ির গিন্নিরা সবাই তটস্থ। তানি আর আয়েশা বেগম এক কোণে চুপচাপ বসে আছেন, তাদের চেহারায় কাল রাতের ঝড়ের রেশ এখনো কাটেনি। তুহিনা আর আফ্রিদিকে দেখে বাড়ির বড়রা একটু সজাগ হলেন, কিন্তু কারো মুখেই কোনো হাসি নেই—এক থমথমে নীরবতা পুরো ঘরজুড়ে রাজত্ব করছে।

ফিনা আজ অনেক ভোরেই ঘুম থেকে উঠেছে, কিন্তু ঘর থেকে বাইরে বেরোতে ওর একদম ইচ্ছে করছে না; সে চুপচাপ এক জায়গায় বসে আছে। হঠাৎ বিছানায় পড়ে থাকা অবহেলিত ফোনটা বেজে উঠল। প্রথমে উঠতে ইচ্ছে না করলেও জানালার ধার থেকে এসে সে ফোনটা হাতে নিল। আঙ্কেল লুগনোসের কল দেখে সে দ্রুত রিসিভ করল।

"হ্যালো," ফিনা বলল।

ওপাশ থেকে শোনা গেল, "হ্যালো ফিনা ডিয়ার।"

"হ্যাঁ আঙ্কেল, বলুন।"

মিস্টার লুগনেস জানতে চাইলো "সু কোথায়?"

ফিনা একটু ঘাবড়ে গিয়ে জিজ্ঞেস করল, "কেন আঙ্কেল? কী হয়েছে?"

"তোমার কাছে কি কোনো মেসেজ যায়নি?"

ফিনা এবার সত্যিই ভয় পেয়ে গেল, "কিসের মেসেজ আঙ্কেল?"

"আমার ফোনে কাল একটা মেসেজ এসেছিল, সু..."

আঙ্কেলের কথা শেষ হওয়ার আগেই ফিনা ফোনটা বিছানায় ফেলে দিয়ে জাহিরের রুমের দিকে ছুটল। সে জাহিরের দরজায় জোরে জোরে ধাক্কা দিতে শুরু করল, "ভাইয়া, দরজা খোলেন! ভাইয়া!"

দরজায় এমন ধপধপ শব্দে জাহির ধড়ফড়িয়ে জেগে উঠল। তার ঘুমের ঘোর মুহূর্তেই কেটে গেল।সে দ্রুত একটা টি-শার্ট গায়ে গলিয়ে নিল। বাইরে থেকে ফিনার চিৎকার শুনে সে উত্তর দিল, "কামিং... !"

জাহির দড়জা খুলতে দেরি ফিনার রুমে ঢুকতে নয়— "সু...!"

চলবে….

(গল্পের সমস্ত চরিত্র,কাল সবই কাল্পনিক সকলে সেই ভাবেই নেবেন, লেখার মাঝে কোনো বানান ভুল থাকলে মাফ করবেন)

#প্রেমের_আলোড়ন

#md_suhan_joy

#midnight_tales_by_joy

Thank You🍀

(Don’t copy without permission)

Enjoy your reading 🎀

গল্প: প্রেমের আলোড়ন

লেখক:এমডি সুহান জয়

পেজ: Midnight Tales by Joy

পর্ব: ৪৯ (শেষ অংশ)

(Note – এটি একটি প্রণয় ও জীবনবোধের মিশ্রণ সম্বলিত গল্প। যেখানে তীব্র রোম্যান্সের পাশাপাশি সামাজিক বাস্তবতা ও ব্যক্তিগত সংগ্রাম তুলে ধরা হয়েছে।)

সুহানা কোথায়?" ফিনার এই প্রশ্নে জাহিরের চৈতন্য ফিরল। সে হচকচিয়ে বিছানার দিকে তাকাল; সুহানা সেখানে নেই।যে স্ট্যান্ডে করে ওকে রক্ত দেওয়া হচ্ছিল, সেটাও উধাও!

জাহির ওয়াশরুমে গিয়ে দেখল, সেখানটাও জনশূন্য। সে উচ্চস্বরে ডাকতে লাগল, "সুহু... বেরিয়া এসো প্লিজ!" কিন্তু সারা ঘরে কোথাও তার চিহ্ন নেই। এই সাতসকালে অসুস্থ্য শরীরটা নিয়ে সুহানা কোথায় উধাও হয়ে গেল?

ফিনা জাহিরের কাছে ছুটে এসে ওর বাহু ধরে ঝাঁকাতে লাগল, "সু কোথায় ভাইয়া? ও কোথায়?"

জাহির ফিনার হাত ছাড়িয়ে ঝড়ের বেগে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। সে চিৎকার করে ডাকতে লাগল, "সুহু! কই তুমি? বেরিয়ে এসো!" সে একছুটে ছাদে চলে গেল, সারা ছাদ খুঁজল কিন্তু সুহানা নেই। হন্যে হয়ে নিচে নামতে নামতে সে সুহানার নাম ধরে ডাকতে লাগল। হাফ প্যান্ট পরা অবস্থাতেই বেচারা বাড়ির বাইরে দৌড় দিল।

নিচে তখন সবাই নাস্তা করছিল। জাহিরকে ওভাবে হিতাহিত জ্ঞানশূন্য হয়ে বাইরে ছুটতে দেখে আফ্রিদি খাওয়া ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। বাড়ির সবাইকে বিচলিত হতে দেখে আফ্রিদি পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার জন্য বলল, "তোমরা খেয়ে নাও, কেউ অস্থির হয়ো না। আমি দেখছি কী হয়েছে।"

রামিম আর তাসফিন উঠে দাঁড়াতে দাঁড়াতে বলল, "আমি আসি।" কিন্তু আফ্রিদি তাদের ধমক দিয়ে থামিয়ে দিল, "না, একদম না! চুপ করে বসে খা।"

জাহির বাড়ির বাইরে এসে ঝিলের পাড়ে গেল, কিন্তু দোলনাটা একদম ফাঁকা। সেখান থেকে সে বাগানে গিয়ে খুঁজতে লাগল। আফ্রিদি পেছন থেকে চিৎকার করে বলল, "জাহির, দাঁড়া!" কিন্তু জাহির কোনো কথা শুনল না, সে অবিরাম ছুটতে লাগল। আফ্রিদি নিজের গতি বাড়িয়ে কোনোমতে জাহিরের হাত ধরে ফেলল।

জাহির রাগে ফেটে পড়ল, "ছাড় আমাকে, হাত ছাড়!" জাহির আবার দৌড়াতে শুরু করল এবং আফ্রিদির হাত ফসকে গেল। পুরো বাগানে জাহিরের হাহাকার শোনা যাচ্ছিল, "সুহু, প্লিজ বেরিয়ে এসো! কই তুমি সুহু?"

আফ্রিদি হাঁপাতে হাঁপাতে জিজ্ঞেস করল, "আরে হয়েছেটা কী, বলবি তো?"

"সুহু রুমে নেই!" জাহিরের এই কথায় আফ্রিদির মাথা ঘুরে উঠল। রুমে নেই মানে? সে-ও এবার চিৎকার করে সুহানার নাম ধরে ডাকতে শুরু করল।

ফিনা তখন জাহিরের রুমে গিয়ে বিছানায় বসে পড়ল। কান্নায় তার ঠোঁট ভেঙে আসছে। হঠাৎ তার চোখ গেল টেবিলের ওপর রাখা সুহানার ফোনের দিকে। ফিনা ফোনটা হাতে নিয়ে ভাবতে লাগল, আঙ্কেল কিসের মেসেজের কথা বলছিলেন? সে দ্রুত হোয়াটসঅ্যাপ খুলল এবং আঙ্কেলের পাঠানো সেই প্রথম মেসেজটি ওপেন করল।

"আমার বর্তমান এবং ভবিষ্যতে যা কিছু থাকবে, তার একমাত্র অংশীদার আমার প্রিয় বন্ধু ফিনা। আমি স্বেচ্ছায় আমার সব সঞ্চয় তাকে দিয়ে যাচ্ছি; এখন থেকে 'ওশিয়ান বাইটস ফ্রম ইদা'-এর মালিকানাও থাকবে তার হাতে। সিনেমার মতো দীর্ঘ চিঠি লেখার ইচ্ছে বা অবস্থা—কোনোটাই এখন আমার নেই। তাই নিজের খেয়াল রাখবেন। নিফেলকে আমার পক্ষ থেকে এডভ্যান্স হ্যাপি বার্থডে জানিয়ে দেবেন। আপনার ঋণ পরিশোধ করার ক্ষমতা আমার নেই; দয়া করে আমাকে ক্ষমা করবেন। ভালো থাকবেন আংকেল, গুড বায়।"

মেসেজটি পড়া শেষ হতেই ফিনা হিতাহিত জ্ঞানশূন্য হয়ে নিজের রুমে ছুটল। সে দ্রুত সুহানার ব্যাগটা খুলে দেখল—ভেতরে পাসপোর্ট নেই! তার মানে সুহানা সত্যিই সব চলে গেছে।

বাড়ির পেছনের দিকে আসতেই আফ্রিদির পায়ে কিছু একটা বাধল। সে দেখল ঘাসের ওপর পড়ে আছে রক্ত দেওয়ার স্ট্যান্ড, খালি ব্লাড বটল আর হাত থেকে খুলে ফেলা পিন ও পাইপ। আফ্রিদি চিৎকার করে ডাকল, "জাহির...!"

আফ্রিদির ডাকে জাহির ছুটে এল, দেখলো সেইগুলো তার মন মানছে না কোনো ভাবেই। সে রুদ্ধশ্বাসে জিজ্ঞেস করল, "ও কোথায় আফ্রিদি?"

আফ্রিদি কোনো উত্তর দেওয়ার আগেই জাহির আলুথালু পায়ে বাড়ির ভেতর ঢুকে পড়ল। সে হন্তদন্ত হয়ে ওপরে ফিনার রুমে গেল। ফিনাকে সেখানে ঠায় দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে তার কাছে গিয়ে ধরা গলায় বলল, "ফিনা, সুহু...?"

ফিনা কোনো কথা না বলে নিজের হাতের মুঠোয় থাকা ছোট্ট একটি জিনিস জাহিরের হাতের তালুতে রাখল। জাহির দেখল, সেটা তার দাদীর দেওয়া সেই চকচকে নাকফুলটা; যা গতকাল সুহানার নাকে শোভা পাচ্ছিল। সে কাল ভালো করে দেখতেও পারেনি এটা পরে এক ঝলক দেখেছিল কোলে নিয়ে আসার সময়।

ফিনা ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠে বলল, "সবকিছুর জন্য দায়ী আমরাই। ওই পরিবারটা যখনই সামনে এসেছে, অপমাণ ছাড়া আর কিছুই মেলেনি। ওদের কাছে সু কখনো হাত পাতিনি, তবুও জুটেছে একরাশ ক্ষোভ আর অভিমান। ওরা আমার কাছ থেকে আমার প্রাণের বন্ধুকেও কেড়ে নিল; এখন আর আমার কিছুই রইল না। সু আমাকে টাকার লোভী মনে করে, তাই যাওয়ার আগে সবকিছু আমার নামে গুছিয়ে দিয়ে গেছে। অথচ সবটা না জেনেই কত চালাকির সাথে সে চলে গেল! সে আসলে ভীষণ বোকাও; একবারের জন্যও কি আমাকে হ কিছু জিজ্ঞেস করতে পারত না? এখন আমার কী হবে? ও কোথায়? ওকে ফিরিয়ে আনুন প্লিজ!"

সুহানা যে সত্যিই চলে গেছে, তার বড় প্রমাণ হলো পাসপোর্টটা সেখানে নেই। বিছানার ওপর থেকে সুহানার ফোনটা নিয়ে জাহির হোয়াটসঅ্যাপ মেসেজটা খুলে ধরল। মাথায় কিছুই খেলছে না তার; চরম এক বিভ্রান্তিতে সে বিছানার ওপর ধপ করে বসে পড়ল। আফ্রিদি পাশে বসে মেসেজটা পড়ে নিল।

আফ্রিদি চুপচাপ বসে একদৃষ্টে দেয়ালের দিকে তাকিয়ে থাকা জাহিরের দিকে তাকাল। জাহিরের পরনে একটি বাদামী রঙের টি-শার্ট এবং সাদা রঙের একটি ছোট হাফ প্যান্ট; যেখান দিয়ে তার মজবুত পায়ের পেশিগুলো স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে। আফ্রিদি ধীরস্বরে ডাকল, “জাহির...!”

জাহির কোনো উত্তর দিল না। সে শান্ত ভঙ্গিতে উঠে দাঁড়াল এবং ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। ফিনা একা সেই ঘরেই বসে রইল। আফ্রিদি একবার ফিনাকে দেখে নিয়ে জাহিরের পিছু পিছু বাইরে বেরিয়ে এল। এই মুহূর্তে কী বলা উচিত বা কী করা দরকার, তা যেন আফ্রিদির মাথাতেই আসছে না।

নিচে তখন বাড়ির সবাই নাস্তা শেষ করে উঠেছেন। প্রত্যেকের মুখে চিন্তার ছাপ স্পষ্ট; নাযেও বিমর্ষ মুখে নিচে বসে আছে। আতিফ সাহেব আর রাদিফ তাদের পরিবার নিয়ে একটু দূরে বসে আছেন—আজই তাদের এখান থেকে চলে যাওয়ার কথা।তুহিনা তাদের থেকে দূরে গিয়ে বসেছে কাল রাতেই আফসার এবং তার পরিবার ফিরে গেছে। তুহিনা সাবেরা এর পাশে বসেছে ভীষণ অস্বস্তি হচ্ছে তার কালকের ঘটনার পরেও এই মানুষ গুলো কতটা ভালো ব্যবহার করছে তার সাথে।

জাহিরকে নিচে নামতে দেখে সবার উৎসুক দৃষ্টি তার ওপর পড়ল। জাহির কারো সাথে কোনো কথা না বলে সোজা তার দাদীর ঘরের দিকে এগিয়ে গেল। তখন আফ্রিদি সামনে এগিয়ে এসে সবাইকে দুঃসংবাদটা দিল, “সুহানা চলে গেছে...।”

গতরাতের সেই বিভীষিকা, সুহানার সেই রক্তশূন্য ফ্যাকাশে মুখ আর নিজের ভেতরকার অপরাধবোধ—সবকিছু যেন এক নিমেষে তাকে শ্বাসরুদ্ধ করে ফেলল। সে ড্যাবড্যাব করে আফ্রিদির দিকে তাকিয়ে রইল, চোখেমুখে এক তীব্র আতঙ্ক। তার মনে হচ্ছিল, সুহানার এই চলে যাওয়ার পেছনে সবচেয়ে বড় দায়টা বুঝি তারই।

তুহিনা কাঁপা গলায় ফিসফিস করে বলল, “ও একা কোথায় যাবে? এখানে কিছু চেনে না কোথায় গেলো?”

তার চোখের কোণ বেয়ে জল গড়িয়ে পড়তে লাগল। সে আয়েশা বেগমের দিকে তাকাল, কিন্তু সেখানে কোনো সহমর্মিতা খুঁজে পেল না।

সাবেরা বেগম যেন নিজের কানকেই বিশ্বাস করতে পারলেন না। চমকে উঠে বললেন, “কী বললি? আবার বল!”

আফ্রিদি বিষণ্ণ গলায় বলল, “সুহানা নেই ফুপি, ও চলে গেছে।”

“কোথায় গেছে?” সাবেরা বেগমের আর্তনাদ

“জানি না, কাউকে কিছু বলে যায়নি...।” আফ্রিদি তখন সবটা খুলে বলল। আতিফ আর রাদিফ একে অপরের দিকে তাকালেন। তাদের মনে সন্দেহ জাগল—সুহানা কি নিজে চলে গেছে, নাকি অন্য কেউ তাকে নিয়ে গেল? তবে এখন আর এসব নিয়ে ভেবে লাভ নেই; যা হওয়ার তা তো হয়েই গেছে।

"ফিনাকে জিজ্ঞেস করো, ও নিশ্চয়ই কিছু জানে!"জাহাঙ্গির সাহেবের এই প্রশ্নের উত্তরে আফ্রিদি হতাশ গলায় বলল, "না ফুপা, ও-ও কিছু জানে না। আসলে কী ঘটেছে বা না ঘটেছে, তার বিন্দুবিসর্গও কারও জানা নেই। ও কোনো ব্যাগপত্র সাথে নেয়নি, শুধু পাসপোর্টটা নিয়ে বেরিয়ে গেছে...।"

বাড়ির সবার মনে এখনো একরাশ অবিশ্বাস; কেউ যেন বিশ্বাসই করতে পারছে না সুহানা এভাবে চলে যেতে পারে। ঠিক সেই মুহূর্তে হঠাৎ কিছু একটা ভেঙে পড়ার বিকট শব্দে সবার টনক নড়ল। সবাই চমকে শব্দ লক্ষ্য করে সেদিকে তাকাল।

দেখা গেল, জাহির দাঁড়িয়ে আছে—তার হাতে একটি ৬৯ ক্যালিব্যারের অরিজিনাল ফ্লিন্টলক মাস্কেট। তার রক্তবর্ণ স্থির দৃষ্টি তখন সরাসরি আতিফের দিকে নিবদ্ধ। পাশে একটা কাঠের বুলেটের বক্স পরে আছে

"জাহির...!" জাহাঙ্গীর সাহেব চিৎকার করে ছেলেকে থামানোর চেষ্টা করলেন। কিন্তু তার কথা শেষ হওয়ার আগেই জাহির ট্রিগার চেপে দিল। মুহূর্তেই কানে তালা লাগানো শব্দে গুলি ছিটকে গেল এবং আতিফের ঠিক পেছনে থাকা পিলারের একপাশ ভেঙে গুঁড়িয়ে গেল।

আতিফ সাহেব ভয়ে কুঁকড়ে গিয়ে সোফার হাতল চেপে ধরেছেন, তার কপাল বেয়ে ঘাম ঝরছে। রাদিফও আতঙ্কে পাথর হয়ে দাঁড়িয়ে আছে;

"সবকিছুর জন্য তুই দায়ী... তোর জন্যই সব হয়েছে!" জাহিরের কণ্ঠস্বর ক্রোধে ফেটে পড়ল আতিফের দিকে আঙুল তুলে নিজের কথা সম্পূর্ণ করলো। আফ্রিদি দ্রুত সামনে গিয়ে রুখে দাঁড়াল এবং দৃঢ় গলায় বলল, "জাহির, বন্দুকটা ফেল! শান্ত হ!"

জাহির হিতাহিত জ্ঞানশূন্য হয়ে গর্জে উঠল, "সর সামনে থেকে! ওরা আমার সুহুকে মেরে ফেলেছে, আজ সবকটার কলিজা মেপে দেখব! আমার জিনিসে হাত বাড়ায় হারাম**"

আফ্রিদি ওকে আটকানোর আপ্রাণ চেষ্টা করে বলল, "দাঁড়া ভাই, শান্ত হ!" কিন্তু জাহির প্রচণ্ড এক ধাক্কায় আফ্রিদিকে সরিয়ে দিল। বাড়ির ভেতরে তখন আর্তনাদ আর চিৎকার-চেঁচামেচি শুরু হয়ে গেছে। সবার চোখের সামনেই জাহির উন্মত্তের মতো গুলি ছুঁড়তে শুরু করল।

জাহিরের মাস্কেট থেকে একের পর এক গুলি গর্জে উঠতে লাগল। ড্রয়িংরুমের শৌখিন আসবাবপত্র আর দেয়ালের ছবিগুলো চুরমার হয়ে যাচ্ছে। আতিফ আর রাদিফ সোফার নিচে কোনোমতে প্রাণ হাতে নিয়ে লুকিয়ে পড়েছে, তাদের চিৎকারে পুরো বাড়ি প্রকম্পিত।

আফ্রিদি মেঝে থেকে উঠে জাহিরকে পেছন থেকে জাপটে ধরার চেষ্টা করল। “জাহির, পাগল হয়েছিস?”

জাহির স্থির পায়ে আতিফের দিকে এগিয়ে এল। তার হাতে ধরা সেই ভারী মাস্কেটটা এখন আতিফের বুকের ঠিক কয়েক ইঞ্চি দূরে। জাহিরের চোয়াল শক্ত, চোখে খুনের নেশা।

আতিফ সাহেব তোতলাতে শুরু করলেন, “জা...জাহির, শান্ত হও। আমরা কিছু জানি না, বিশ্বাস করো...”

"তোদের জন্য ও আমাকে ছেড়ে চলে গেছে!" জাহিরের কণ্ঠস্বর কান্নায় ভেঙে এল।"আমার সুহু তোদের কী ক্ষতি করেছিল রে? কেন ওর পেছনে লেগে আছিস তোরা? কেন ওকে..."

জাহাঙ্গীর সাহেব ছেলেকে শান্ত করার আপ্রাণ চেষ্টা করে ধমক দিলেন, "জাহির! বন্দুক নামা! এটা কী করছিস তুই?"

কিন্তু জাহির তখন হিতাহিত জ্ঞানশূন্য। সে আতিফকে ছেড়ে রাদিফের দিকে ধেয়ে গেল এবং তার কলার ধরে টেনে তুলল। সোফার ওপর এক পা তুলে রাদিফের গালের ভেতরে বন্দুকের নলটা ঢুকিয়ে দিয়ে হিংস্র গলায় গর্জে উঠল, "শু*য়ো*রের বা*চ্চা! নিজের স্বার্থে নিজের সন্তানের জন্ম পর্যন্ত অস্বীকার করিস, তুই তো এক জানো*য়ার! থুঃ! আজ তোদের মতো জানোয়ারদের জন্যই ও চলে গেছে। তোরা ওর গায়ে দাগ লাগাস? তোর সেই যোগ্যতা আছে?"

জাহিরের প্রতিটি শব্দে ঝরে পড়ছিল সুহু কে হারানোর তীব্র যন্ত্রণা আর পরিবারের ওপর জমে থাকা একরাশ ঘৃণা। আতিফ আর রাদিফ তখন ভয়ে কুঁকড়ে আছে, জাহিরের চোখের আগুনের সামনে তাদের আর কোনো আত্মপক্ষ সমর্থনের উপায় নেই।

আফ্রিদি, তাসফিন, রামিম, সামির, বিহান আর জাসমির—সবাই মিলে একজোট হয়ে জাহিরকে টেনে ধরে আটকানোর আপ্রাণ চেষ্টা করল। জাহির উন্মত্তের মতো চিৎকার করে উঠল, "ছাড়ো! বলছি আমায় ছাড়ো!"

ধস্তাধস্তির একপর্যায়ে বিহান কোনোমতে জাহিরের হাত থেকে বন্দুকটা কেড়ে নিল। কিন্তু জাহির তখন হিতাহিত জ্ঞানশূন্য; সে প্রচণ্ড শক্তিতে সবাইকে এক ঝটকায় সরিয়ে দিয়ে আবারও আতিফ আর রাদিফদের দিকে তেড়ে গেল। তার দু’চোখ বেয়ে তখন নোনা জল গড়িয়ে পড়ছে, আর সে বুকফাটা আর্তনাদ করে বলতে লাগল, "তোদের জন্যই আমার সুহু এত কষ্ট পেয়েছে! তোদের জন্যই আজ ও আমাকে ছেড়ে চলে গেছে...!"

জাহাঙ্গীর সাহেব চিৎকার করে ছেলেকে থামানোর চেষ্টা করলেন, “থামো! থামো বলছি জাহির!” ফিনা ওপর থেকে দাঁড়িয়ে নিচে ঘটে যাওয়া এই ভয়াবহ কাণ্ডটা দেখছিল।

জাহির তানির দিকে আঙুল তুলে তীক্ষ্ণ স্বরে প্রশ্ন করল, “কাকে জিজ্ঞেস করে ওই মেয়ের সাথে আমার বিয়ে ঠিক করেছিলে আব্বা?”

ছেলের মুখে গোপন কথা শুনে জাহাঙ্গীর সাহেব রীতিমতো চমকে উঠলেন। জাহির এই খবর জানল কোত্থেকে? তিনি বিড়বিড় করে বললেন, “তুমি...”

জাহির আর কারো কথা শুনল না, সে তানির দিকে ধেয়ে গেল। উপস্থিত সবাই তাকে ধরার চেষ্টা করলেও কেউ তাকে রুখতে পারল না। জাহির তানিকে সজোরে এক চড় মারল, তানি ছিটকে নিচে পড়ে গেল। সে থামল না; তানির চুলের মুঠি ধরে তাকে টেনে তুলল। তানির একপাশের গাল ফেটে রক্ত বেরোচ্ছে। জাহির হিসহিসিয়ে বলল, “আমাকে বিয়ে করার খুব শখ, না? সাইকো সাজা মা*রাস তুই!” বলেই সে অপর পাশের গালে ঠাটিয়ে আরেকটা চড় বসিয়ে দিল।

তানির মা আর্তনাদ করে উঠলেন, “আল্লাহর দোহাই লাগে, আমার মেয়েকে ছেড়ে দাও! দয়া করে ওকে আর মেরো না!” তানি ততক্ষণে জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছে।

জাহাঙ্গীর সাহেব এবার পরিস্থিতি সামাল দিতে এগিয়ে এলেন, জাহিরকে সজোরে একটা থাপ্পড় মারলেন। সাবেরা বেগম এই দৃশ্য দেখে আতঙ্কে সোফায় ধপ করে বসে পড়লেন, “এ কী হচ্ছে আল্লাহ্!”

মুহূর্তেই চারপাশ নিস্তব্ধ হয়ে গেল। আতিফ আর রাদিফ ভয়ে জড়সড় হয়ে আছেন। মোহনা একপাশে তার স্বামীকে আঁকড়ে ধরে রেখেছেন। রাদিফ তখন তানি আর আয়েশা বেগমের কাছে গিয়ে দাঁড়াল। প্রত্যেকের চোখেমুখে এখন চরম আতঙ্ক।

জাহাঙ্গীর সাহেব গর্জে উঠলেন, “একটা মেয়ের জন্য তোমার এত পাগলামি?”

জাহির ক্ষোভে ফেটে পড়ল। সে চিৎকার করে জাহাঙ্গীর সাহেবের মুখের খুব কাছে গিয়ে চোখে চোখ রেখে বলল, “ও স্রেফ একটা মেয়ে নয়! আল্লাহর নামে কলেমা পড়ে সুন্নাত আদায় করে বিয়ে করা আমার বিবাহিত স্ত্রী সে। নেক্সট টাইম একই ভুল নটি এক্সেপ্টেড —সে মুহাম্মদ জাহির উদ্দিনের রেসপেক্টেড ওয়াইফ!”

জাহাঙ্গীর সাহেব স্তব্ধ হয়ে চেয়ে রইলেন; তার আর কিছু বলার শক্তিটুকুও অবশিষ্ট নেই। জাহির আবারও আঙুল তুলে প্রশ্ন করল, “কাকে জিজ্ঞেস করে আমার বিয়ে ওর সাথে ঠিক করেছিলে? তুমি কি ভেবেছিলে আমি জানব না? তুমি সুহুকেও এই বাড়ি ছেড়ে চলে যেতে বলেছিলে! ওকে আমার থেকে দূরে যাওয়ার জন্য চাপ দিয়েছিলে। ওর ঘরে বসে ওর বাবা-মা তুলে অপমান করেছিলে! বলো আব্বা, তুমি এসব বলেননি?”

জাহাঙ্গীর সাহেব কোনো কথার তাল মেলাতে পারলেন না। সব সত্য এভাবে ফাঁস হয়ে যাবে তিনি কল্পনাও করতে পারেননি। আগে বলেছিলেন তখন তিনি জানতেন না সুহানা কে, এখন তার কোনো আত্মপক্ষ সমর্থনের উপায় নেই।

জাহির ভাঙা গলায় আড়াল,“এত কিছুর পরেও ও আমাকে কিচ্ছু জানায়নি। আমি যদি আজ নিজে থেকে না জানতাম, তবে ও কোনোদিনও বলত না!”

নিজের ছেলের চোখে নিজের জন্য এত ঘৃণা তিনি আগে কখনো দেখেননি। যে আভিজাত্য আর বংশের দোহাই দিয়ে তিনি সুহানাকে অপমান করেছিলেন, আজ সেই বংশের উত্তরাধিকারীই তাকে কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। তার আর কোনো যুক্তি বা ধমক দেওয়ার শক্তি নেই; তিনি শুধু ফ্যালফ্যাল করে জাহিরের দিকে তাকিয়ে রইলেন।

আফ্রিদি, বিহান, সামিররা স্তব্ধ হয়ে এক কোণে দাঁড়িয়ে আছে। তারা জানত পরিস্থিতি খারাপ, কিন্তু জাহাঙ্গীর সাহেব যে নিজে সুহানাকে বাড়ি ছাড়ার হুমকি দিয়েছিলেন—এটা তাদের কল্পনার বাইরে ছিল। আফ্রিদি বুঝতে পারছে এই ক্ষতের উপশম সহজে হবে না।

পুরো বাড়িতে এখন শুধু এক ভারী নিস্তব্ধতা। জাহিরের হাহাকার আর ক্রোধের পর যে শূন্যতা তৈরি হয়েছে, তা যেন সবাইকে গ্রাস করে নিচ্ছে।

জাহির সদর দরজার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের বুকে সজোরে হাত চাপড়ে বলতে লাগল, "আমার বুকের বাঁ-পাশের পাঁজরের হাড় দিয়ে সৃষ্টি সে; আমার ব্যক্তিগত রমণী সে! সে শুধুই আমার, আমার আর আমার! ওর গোটা দুনিয়া আমি; আমি ছাড়া ওর আর কেউ নেই, কিচ্ছু নেই নাথিং। আল্লাহ ওকে আমার নামেই লিখে দলিল করে পাঠিয়েছে। তোমরা ওকে আমার থেকে দূরে সরিয়ে দেবে এত সহজ? আরে রুহের জগতেই আমি ওকে নিজের নামে দলিল করার পরই এই দুনিয়াতে এসেছি। ও আমার রাত জাগা ইবাদাতের ফল। আল্লাহর কাছে ওকে চাইতে চাইতে সিজদায় পড়ে আমার কপালে ছাল উঠে গেছে। গতকালই তো শেষ দিন ছিল; আমায় বলা হয়েছিল আমি যা চাইব তাই পাব। আল্লাহ খুশি হয়ে আমাকে দিয়েছিলেন, কিন্তু আমি ওকে নিজের কাছে ধরে রাখতে পারলাম না!"

বাড়ির সবাই স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। জাহিরের ভেতরে যে এমন এক রূপ লুকিয়ে থাকতে পারে, তা কারোরই জানা ছিল না; এমনকি তার প্রিয় বন্ধু আফ্রিদিরও নয়। জাহিরের দু’চোখ ছাপিয়ে নোনা জল গড়িয়ে পড়ছে। লোকে বলে পুরুষ নাকি কাঁদে না! কিন্তু আজ এই ছেলেকে দেখ—খেলতে গিয়ে হাত ভেঙেছে, মাথা ফেটেছে, কত বড় বড় চোট পেয়েছে কিন্তু কোনোদিন এক ফোঁটা চোখের জল ফেলেনি; সেই জাহির আজ শিশুর মতো কাঁদছে। আজ সে হয়ত তার সবচেয়ে প্রিয় ‘খেলনা’টিকে চিরতরে হারিয়ে ফেলেছে।

সে চিৎকার করে বাড়ির বড়দের উদ্দেশে বলল, "তোমাদের জন্যই আজ আমি ওকে হারিয়েছি! আমার সুহুকে আমার অবর্তমানে তোমরা একটু আগলে রাখতে পারলে না? আমার ছয় বছরের জমানো ভালোবাসা আমি হারিয়ে ফেললাম! আমার তো ওকে বলাও হয়নি যে আমি ওকে কতটা..."

বলতে বলতে জাহির সিঁড়ির ওপর ভেঙে পড়ল। তার কণ্ঠস্বর বুজে এল। সে সিলিংয়ের দিকে তাকিয়ে আর্তনাদ করে বলল, "ও কোথায় আছে জানি না, কী অবস্থায় আছে তাও জানি না! আল্লাহ, তুমি রহম করো। আমার জিনিস আমাকে ফিরিয়ে দাও শুধু একবার। কোথায় আছো তুমি সুহু ?”

--------------------------------------------

এয়ারপোর্টের লাউডস্পিকারে ভেসে এল সেই কাঙ্ক্ষিত ঘোষণা— যা কারোর হৃদপিণ্ডের গতি বাড়িয়ে দিল কয়েক গুণ:

“Good morning, passengers. Emirates/flydubai flight number 30056AZV, bound for Novosibirsk, is now boarding at Gate Number 031. Please proceed to the gate immediately with your passport and boarding pass. You have only 4 minutes left.” {"সুপ্রভাত যাত্রীবৃন্দ। এমিরেটস/ফ্লাইদুবাই ফ্লাইট নং 30056AZV, যা নোভোসিবিরস্ক-এর উদ্দেশ্যে যাত্রা করবে, তার বোর্ডিং এখন গেট নম্বর 031-এ শুরু হয়ে গেছে। অনুগ্রহ করে আপনার পাসপোর্ট এবং বোর্ডিং পাস নিয়ে দ্রুত গেটের দিকে অগ্রসর হোন। হাতে সময় আছে আর মাত্র ৪ মিনিট”}

পায়ে স্লিপার নিয়েই সে দ্রুতগতিতে এস্কেলেটরের ওপর উঠে পড়ল। ভিড়ের সবাইকে পাশ কাটিয়ে ওপরে আসতেই তার নজরে এল গেট নম্বর ৩১। সময় হাতে বড্ড কম, তাই লক্ষ্য স্থির হতেই সে সেদিকে ঝড়ের বেগে ছুটতে লাগল। তার মুখে প্যাঁচানো ছিল দুবাইয়ের ঐতিহ্যবাহী ঘিয়ে রঙের একটি নরম স্কার্ফ, যা তার চোখ ছাড়া মুখমণ্ডলের বাকি অংশকে আড়াল করে রেখেছিল।

ছুটতে ছুটতে সে নিজের পায়ের গতি আরও বাড়িয়ে দিল। কিন্তু গেটের ঠিক কাছাকাছি পৌঁছানোর মুহূর্তেই হঠাৎ একজনের সাথে তার সজোরে ধাক্কা লাগল। সেই ধাক্কার চোটে অপর ব্যক্তির হাতের আঘাতেই মুখের স্কার্ফটি আলগা হয়ে সরে গেল এবং তার ঢাকা থাকা মুখমণ্ডল সবার সামনে দৃশ্যমান হয়ে উঠল। ভারসাম্য সামলাতে না পেরে সে সরাসরি স্টিলের রড দিয়ে ঘেরা গেটটির ওপর আছড়ে পড়ল। সেই প্রচণ্ড আঘাতে তার হাতের পুরনো ক্ষতস্থানে নতুন করে চোট লাগল এবং মুহূর্তেই ওয়ান-টাইম ব্যান্ডেজটি রক্তের তোড়ে খুলে গেল।

সুহানা যন্ত্রণায় কুঁকড়ে গিয়ে নিজের রক্তাক্ত ক্ষতস্থানটি অন্য হাত দিয়ে শক্ত করে চেপে ধরল। ঠিক সেই মুহূর্তেই তার চোখাচোখি হলো সেই ব্যক্তির সাথে, যার সাথে তার সজোরে ধাক্কা লেগেছে। সামনে থাকা ব্যক্তিটি নিজের কাঁধে হাত দিয়ে চোখ কুঁচকে আছে, বোঝাই যাচ্ছে সে-ও বেশ ব্যথা পেয়েছে। তার পরনে ধবধবে সাদা রঙের পোশাক, চোখে কালো সানগ্লাস এবং উচ্চতা প্রায় ৫ ফুট ১১ ইঞ্চির মতো। মাথায় আরব শেখদের মতো নিখুঁতভাবে স্কার্ফ পেঁচানো। সুহানা চোখ তুলে তাকাতেই সেই ব্যক্তি সরাসরি সুহানার চশমার আড়ালে থাকা আকর্ষণীয় চোখ দুটোর দিকে সম্মোহিতের মতো তাকিয়ে রইল। মুগ্ধ নয়নে সে নিচু স্বরে বিড়বিড় করে উঠল— “মা-শা-আল্লাহ, নাজরাত উয়ুনাক তিজবাহ” (মা-শা-আল্লাহ, তোমার চোখের চাহনি যে কলিজা বিঁধে ফেলে!)।

কথাগুলো সুহানার কান পর্যন্ত পৌঁছাল না। সে দ্রুত নিজের পাসপোর্ট আর টিকিট মাটি থেকে কুড়িয়ে নিল। লোকটির দিকে আর না তাকিয়েই অতি ক্ষীণ ও নরম কণ্ঠে বিড়বিড় করে বলল— “সামেহনি, আনা আসিফাহ” (আমাকে ক্ষমা করবেন)। লোকটির নজরে এল সুহানার হাত দিয়ে অনবরত রক্ত ঝরছে। সে কিছু একটা বলার জন্য হাত বাড়াল, ঠোঁট নাড়াল, কিন্তু তার আগেই সুহানা বিদ্যুতের গতিতে সেখান থেকে সরে পড়ল। এক লাফে ব্যারিকেড পার হয়ে সে গেটের দিকে ছুটল।

ঠিক যখন গেটটি বন্ধ করে দেওয়া হচ্ছিল, তখনই সে হাঁফাতে হাঁফাতে সেখানে গিয়ে পৌঁছাল। অবিন্যস্ত চুলে দাঁড়িয়ে কোনোমতে শ্বাস নিয়ে বলল, “আই এম এক্সট্রিমলি সরি ফর লেট!”

সেখানে থাকা দায়িত্বে থাকা অফিসারটি বেশ বিরক্ত হলেও সুহানার অবস্থা দেখে আর কিছু বললেন না। সুহানা নিজের কাগজপত্রগুলো তার হাতে তুলে দিয়ে দু-হাঁটুতে হাত রেখে নুয়ে পড়ল। বুক ফেটে দম আসছে তার, চোখেমুখে অন্ধকার দেখছে—উফফ! কী এক নিদারুণ যন্ত্রণা!

অফিসার জিজ্ঞেস করলেন, "আপনার লাগেজ?"

সুহানা কোনোমতে উত্তর দিল, "আই হ্যাভ নাথিং টু ক্যারি।" অফিসার কিছুটা অবাক হলেও আর উচ্চবাচ্য করলেন না। ডকুমেন্ট ক্লিয়ার হতেই গেট খুলে দেওয়া হলো। সুহানা এবার ধীরপায়ে এগোতে লাগল। পায়ে প্রচণ্ড ব্যথা পেয়েছে সে, তাই কিছুটা খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়েই চলতে হচ্ছে তাকে। এখান থেকে বাইরের বিশাল রানওয়েতে দাঁড়িয়ে থাকা প্লেনগুলো স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে।

একেবারে এক কাপড়ে বেরিয়ে এসেছে সে। অবশেষে এক দীর্ঘশ্বাসের সাথে সে প্রাণভরে মুক্ত বাতাস নিতে পারল। আজ আর তাকে কেউ কিছু বলতে পারবে না। সমস্ত পিছুটান সে পেছনে ফেলে এসেছে—আজ আর কোনো ভয় নেই, নেই কোনো উদ্দেশ্য, নেই কোনো গুরুভার দায়িত্ব। কোনো মানসিক চাপ বা পিষ্ট হওয়া মুহূর্তগুলোও আর নেই; আজ কেবল সে এবং তার শান্তি।

প্লেনের বাসে উঠে পড়ল সে। নিজের অনাকাঙ্ক্ষিত দেরির জন্য সবার কাছে বিনীতভাবে ক্ষমা চেয়ে নিল। যাত্রীরা প্রথমে রেগে থাকলেও সুহানার বিধ্বস্ত চেহারা দেখে কিছুটা নরম হলেন। বাস চলতে শুরু করল। আর ঠিক সেই নির্জন মুহূর্তেই, হুট করে জাহিরের সাথে কাটানো দীর্ঘ অজস্র স্মৃতি ও মুহূর্তগুলো তার মনের কোণে ভিড় করতে লাগল।

,

জ্ঞান ফেরার পর চোখ খুলেই সুহানা নিজেকে আবিষ্কার করল জাহিরের খুব কাছাকাছি। এত কাছ থেকে তাকে সে আগে কোনোদিন দেখেনি—গতকালেই প্রথম দেখেছিল, কী ভীষণ সুদর্শন একজন পুরুষ! পরক্ষণেই সংবিৎ ফিরে পেয়ে সে সরে এল। নিজের হাতে টান অনুভব করতেই দেখল তার হাতটি জাহিরের শক্ত মুঠোয় বন্দি; কোনোমতে নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে সে অন্ধকারের মাঝে উঠে বসল। মুহূর্তেই ঘটে যাওয়া সব ঘটনা তার স্মৃতিতে ভিড় করে এল—ফিনা, তুহিনা আর জাহাঙ্গীর সাহেবকে দেওয়া সেই অমোঘ প্রতিশ্রুতি। কথা তাকে রাখতেই হবে।

সে অতি সাবধানে উঠে দাঁড়াল। ড্রিপের স্ট্যান্ডটি ধরে আস্তে করে লক খুলে রুম থেকে বেরিয়ে এল। করিডোর তখন ঘুটঘুটে অন্ধকারে ডুবে আছে। সে পা বাড়াল ফিনার রুমের দিকে। দরজাটি ভাগ্যক্রমে লক করা ছিল না; নব ঘোরাতেই তা খুলে গেল। ভেতরে ফিনা বেডে বসে থাকা অবস্থাতেই ঘুমিয়ে পড়েছে। বন্ধুকে এভাবে দেখে সুহানার বুকটা হলো, সে যন্ত্রণায় নিজের ঠোঁট কামড়ে ধরল।

দেরি না করে সে ব্যাগ থেকে প্রয়োজনীয় পর্যাপ্ত টাকা আর পাসপোর্ট গুছিয়ে নিল। টেবিলের ওপর যেখানে ফোনটি রেখেছিল, ঠিক সেখানেই সেটি অক্ষত আছে। ফোনটি হাতে নিয়ে সে ফিনার দিকে একবার তাকাল। তারপর দ্রুত মেসেজ অপশনে গিয়ে নিজের সবচেয়ে বিশ্বস্ত মানুষটিকে সবটা জানিয়ে দিল।

ফিনার কাছে গিয়ে তাকে আলতো করে ধরে শুইয়ে দিল সে, গায়ের ওপর টেনে দিল নরম কম্বল। আস্তে করে আওড়াল— "গুড বায় ডিয়ার বেস্ট ফ্রেন্ড, হ্যাভ এ গুড লাইফ।" আর এক মুহূর্তও সেখানে সে দাঁড়াল না। যে পথে এসেছিল, ঠিক সেই পথেই ফিরতি পা বাড়াল। যাওয়ার আগে শেষবারের মতো পুরো বাড়িটার দিকে একবার চোখ বুলিয়ে নিল। এই বাড়িটি তার জীবনের এক বিশেষ অধ্যায়ের সাক্ষী হয়ে রইল। কয়েকদিন হলেও তারা তো তাকে মেয়ের মতো না হোক, অন্তত যত্নে আগলে রেখেছিল।

সে নিঃশব্দে জাহিরের রুমে ঢুকল এবং ধীরলয়ে দরজাটি লক করে দিল। ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখল রাত তিনটা পার হয়ে গেছে—সময় বড্ড কম, আর দেরি করা চলবে না। টেবিলের ওপর নিজের ফোনটি সাইলেন্ট করে রেখে দিল; এই যন্ত্রটির প্রয়োজনীয়তা তার কাছে ফুরিয়ে গেছে। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে শেষবারের মতো দেখল সে। হঠাৎ নাকে হাত দিতেই কিছু একটা আলাদা ঠেকল—সেইদিন হুট করেই তো তার নাকটা ফুটিয়ে দিয়েছিল দি...।

সে বিড়বিড় করে উঠল, “এটা আমার হক নয়।” নাক থেকে পাথরে বসানো সোনার সেই প্রিয় নাকফুলটি খুলে ফোনের পাশেই রেখে দিল সে। তারপর গিয়ে বসল জাহিরের একদম গা ঘেঁষে। জাহির সেখানে পা ছড়িয়ে বসে থাকা অবস্থাতেই একপাশে হেলে গভীর ঘুমে মগ্ন।

সুহানা কিছু বলতে চাইল, কিন্তু গলা দিয়ে শব্দ বেরোচ্ছে না কেন? ভীষণ কষ্ট হচ্ছে কি? চোখের কোণ ছাপিয়ে জল গড়িয়ে পড়ল, সে দাঁত দিয়ে সজোরে নিজের ঠোঁট কামড়ে ধরল। পরক্ষণেই ঠোঁটে এক চিলতে ম্লান হাসি ফুটিয়ে তুলল। —অনেক ঝগড়া, অনেক অভিযোগ আর অনেক রাগ; এই তো ছিল আমাদের অদ্ভুত এক সম্পর্ক। হুট করে আজ ভুলবশত আমার সাথে জড়িয়ে গেছেন আপনি। 'ইউ ডিজার্ভ ফার বেটার দ্যান মি, নো নো বেস্ট... আই এম নট সুইটেবল ফর ইউ।' ইউ আর দা‘গ্রেট MJ’, জার্সি নম্বর ১১; এক্সট্রাঅর্ডিনারি ব্রেইন উইথ রয়েল ব্লাড,আর আমি? আমি কেবল সবকিছু নষ্ট করে দেওয়ার কারিগর"

হাত দিয়ে চোখের জল মুছে সে শেষবারের মতো বিদায় জানাল— “আমাকে যেতেই হবে। আই এম সরি, মাই ওয়ান অ্যান্ড অনলি ‘কারিজমাতিক দুশমান’, গুড বাই।” সে আর এক মুহূর্তও সেখানে দাঁড়াল না। জানালার কাছে গিয়ে হাতের ক্যানুলাটা এক টানে খুলে দ্রুত একটি ওয়ান-টাইম ব্যান্ডেজ লাগিয়ে নিল। হাতটা একটু ঝাঁকিয়ে নিল—এসব ব্যথায় তার শরীর এখন অভ্যস্ত। ড্রিপের স্ট্যান্ডটি ধরে জানালার বাইরে নিয়ে গিয়ে দূরে ঘাসের ওপর ছুড়ে ফেলে দিল। শব্দ পেয়ে কয়েকটা কুকুর সেদিকে এগিয়ে এল। সুহানা শেষবারের মতো জাহিরের শান্ত মুখটার দিকে তাকাল

“টিভির পোস্টার ছাড়া আমাদের আর কোনোদিন দেখা হবে না। থ্যাঙ্ক ইউ ফর হুয়াটএভার ইউ ডিড ফর মি। এই জীবনে আপনার আমার আর কখনো দেখা না হয়।”

কারো ধাক্কায় সুহানার ভাবনার জাল ছিঁড়ে গেল। একজন মৃদু স্বরে বললেন, “ম্যাডাম, প্লিজ নামুন, আমরা গন্তব্যে পৌঁছে গেছি। সবাই নেমে গেছে।” সুহানা চারপাশ তাকিয়ে দেখল সত্যিই পুরো বাস এখন ফাঁকা। সে অপ্রস্তুত হয়ে বিড়বিড় করে উঠল, “সরি, সরি!”

সে দ্রুত উঠে দাঁড়াল। চোখের কোণ ভিজে উঠেছে, চশমাটা একপাশে সরিয়ে সে জল মুছে নিল। তারপর বাস থেকে নিচে নেমে পড়ল। বাইরে এখন খাঁ খাঁ রোদ। সুহানা ধীর পায়ে প্লেনের সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠতে লাগল। মনে মনে শেষবারের মতো বলল— “ভালো থাকবেন...।”

এদিকে জাহির নিজের রুমে ফিরে এসেছে। ফোনের সব জরুরি কথা শেষ, সে এখনই সুহানার খোঁজে বেরিয়ে পড়বে আজকেই। তার চোখের সামনে ফোনের স্ক্রিনে ভেসে উঠল সুহানার একটিই ছবি, যা সে প্রথম তুষারপাতের দিন লুকিয়ে তুলেছিল। ছবিতে সুহানা পা নামিয়ে দু-হাত পেতে তুষার নিয়ে হাসছে। ছবিটির দিকে তাকিয়ে আজ অদম্য জাহিরও শিশুর মতো কেঁদে ফেলল। চোখের পানি পড়লো স্ক্রিনের উপরে জাহির হুট করে ভাঙ্গা গলায় গেয়ে উঠলো....

~“হাতে ধইরা ছাইড়ো না হাত সামনে আগাইয়া,

ছাড়িয়া যাইওনা বন্ধু মায়া লাগাইয়া।

জীবন খাতায় প্রেম কলঙ্কের দাগ দাগাইয়া,

ছাড়িয়া যাইওনা বন্ধু মায়া লাগাইয়া।”~

চলবে….

(গল্পের সমস্ত চরিত্র,কাল সবই কাল্পনিক সকলে সেই ভাবেই নেবেন, লেখার মাঝে কোনো বানান ভুল থাকলে মাফ করবেন)

#প্রেমের_আলোড়ন

#md_suhan_joy

#midnight_tales_by_joy

Thank You🍀

(Don’t copy without permission)

Enjoy your reading 🎀

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৪৯তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন