ফন্ট সাইজ:
থিম:
প্রেমের আলোড়ন

৫০তম পর্ব

লেখক: এমডি সুহান জয়

গল্প: প্রেমের আলোড়ন

লেখক:এমডি সুহান জয়

পেজ: Midnight Tales by Joy

পর্ব: ৫০ (প্রথম অংশ)

(Note – এটি একটি প্রণয় ও জীবনবোধের মিশ্রণ সম্বলিত গল্প। যেখানে তীব্র রোম্যান্সের পাশাপাশি সামাজিক বাস্তবতা ও ব্যক্তিগত সংগ্রাম তুলে ধরা হয়েছে।)

"তুমি আমাকে না জানিয়ে ছেলের বিয়ে ঠিক করেছিলে?" সাবেরা ক্ষোভে ফেটে পড়লেন। জাহাঙ্গীর সাহেবকে নির্বাক হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে তিনি আরও একধাপ এগিয়ে এলেন। তীক্ষ্ণ স্বরে আবার জিজ্ঞেস করলেন, "চুপ করে আছ কেন? জবাব দাও!"

জাহাঙ্গীর সাহেব কোনো উত্তর দিলেন না। তার নিরবতা দেখে সাবেরা তাকে ছেড়ে দিয়ে কিছুটা দূরে সরে দাঁড়ালেন। বুক ফেটে কান্না আর আক্রোশ বেরিয়ে আসছে তার, "কেন করলে এমনটা? আমার ছেলে যাকে ভালোবেসেছিল, সে কি খুব খারাপ ছিল? কোন সাহসে তুমি সুহানাকে এ বাড়ি থেকে চলে যেতে বললে? নিজের সন্তানের সুখের কথা একবারও ভাবলে না? শুধু নিজের স্ট্যাটাস আর অহংকারটাই বড় হলো তোমার কাছে?"

জাহাঙ্গীর সাহেব আমতা আমতা করে কিছু একটা বলতে চাইলেন, "আমি তো আসলে এতটা জানতাম না, আমাকে..."

"আর একটা কথাও বলবে না তুমি!" সাবেরা তাকে থামিয়ে দিলেন। "নিজের ছেলের অবস্থা একবার দেখেছ? ওদের সবাইকে এখনই এ বাড়ি থেকে বের করে দাও। আমি আর এক মুহূর্তের জন্যও ওদের মুখ সহ্য করতে পারব না।"

পুরো বাড়িতে তখন এক থমথমে পরিবেশ। জাহির নিজের রুমে বন্দি, ফিনাও তার ঘরে একা। আফ্রিদি আর বাকি ভাইবোনরা বড়দের এই রণচণ্ডী রূপ দেখে ভেতরে ঢুকতে ভয় পাচ্ছে। পরিস্থিতি এতটাই বেগতিক যে সবাই চিন্তিত। ঠিক হয়েছে, আজকের মধ্যেই সবাই ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা দেবে; সেখান থেকে যার যার গন্তব্যে ফিরে যাবে। ফুপি কাল রাতেই বিদায় নিয়েছেন, তুহিনার খালামনিরাও চলে গেছেন।

রামিম সবাইকে আশ্বস্ত করে বলল, "আমি আর দাদাভাই দেখছি সবটা, তোরা এখন তোদের রুমে যা।"

আফ্রিদি আর রামিমের কথা শেষ হতেই তুহিনা আকুল হয়ে এগিয়ে এল। ধরা গলায় বলল, "আমিও তোমাদের সাথে যাব, প্লিজ আমাকে সাথে নাও!"

আফ্রিদি শান্ত গলায় তুহিনাকে বোঝানোর চেষ্টা করল, "এখন নয় পাখি, তুমি পরে যেয়ো। তুমি প্লিজ এত টেনশন নিও না , নিজের শরীরের অবস্থাটা বোঝো। ওর মাথার ঠিক নেই এখন।" তারপর পাশে থাকা রিফাকে ইশারা করে বলল, "তোর ভাবিকে নিয়ে যা তো রিফা।"

আফ্রিদি ধীরে ধীরে দরজায় টোকা দিয়ে ঘরের ভেতরে উঁকি দিল। দেখল জাহির স্তব্ধ হয়ে বেডের ওপর বসে আছে। আফ্রিদি নিঃশব্দে রুমে ঢুকল, কিন্তু জাহির একবার ফিরেও তাকাল না। অবিন্যস্ত চুলগুলো অনেকটা বড় হয়ে গেছে, যা তার মুখমণ্ডলকে প্রায় আড়াল করে রেখেছে। আফ্রিদি কাছে এগিয়ে গিয়ে জাহিরের হাত রাখল। নিচু স্বরে বলল, "আমি কল করে দিয়েছি, আজকের মধ্যেই পার্কিং থেকে নিয়ে আসবে তারপর আমরা ব্যাক করব।"

জাহির শুধু আলতো করে মাথা নাড়ল। সে অতিরিক্ত ফর্সা হওয়ায় তার লাল হয়ে যাওয়া চোখ আর নাক যেন বিকেলের রোদের মতো টকটকে দেখাচ্ছিল। আফ্রিদি তার পাশে বসল। রামিম কিছুটা দূরে চেয়ারে বসে রইল; এই কঠিন সময়ে বড়দা কে ঠিক কী বলে সান্ত্বনা দেওয়া উচিত, তা বুঝতে না পেরে সে চুপ থাকাই শ্রেয় মনে করল।

খানিক বাদে আফ্রিদি খুব সাবধানে জিজ্ঞেস করল, "তুই কি সুহানাকে আগে থেকেই চিনতিস?"

জাহির কিছুক্ষণ নীরব হয়ে রইল। তার নীরবতা দেখে আফ্রিদি আবার বলল, "তোর বলতে ইচ্ছে না হলে থাক, আমরা ওকে..."

কথা শেষ করার আগেই জাহির বিছানায় শুয়ে পড়ল। সিলিংয়ের দিকে তাকিয়ে আপন মনেই বিড়বিড় করে উঠল, "তোর মনে আছে আফ্রিদি, হাই স্কুলে সেই ঝামেলার পর আব্বু আমাকে হুট করে ট্রান্সফার করে দিয়েছিল?"

আফ্রিদির চোখের সামনে ভেসে উঠল বার্লিনের সেই দিনগুলো। জাহির তখন দ্বাদশ শ্রেণির ছাত্র, জাহির খুব মিসুখ মানুষ কিন্তু তার রক্তে তেজ বেশি। জাহাঙ্গির তখন বার্লিনে আছেন চাকরি সূত্রে বড়ো পদে কর্মরত। অতিরিক্ত চঞ্চল, দূরান্ত ও মেধাবী হিসেবে জাহিরের সুনাম থাকলেও, পড়াশোনার আর খেলাধুলা সব দিকেই সে এক ভয়ংকর চিতা।

সেই সময় জাহিরের এক সহপাঠী চরম ধৃষ্টতা দেখিয়েছিল। সে আফ্রিদিকে নিয়ে অত্যন্ত কুরুচিপূর্ণ কিছু কৌতুক আর ব্যঙ্গচিত্র বানিয়ে স্কুলের করিডোরে পোস্টার সেঁটে দিয়েছিল। খবরটি জাহিরের কানে পৌঁছানো মাত্রই সে হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে ফেলে। নিজের ভাই সমান বেস্টফ্রেন্ড কে নিয়ে এমন নোংরামি সে সহ্য করতে পারেনি।

স্কুলের প্রকাশ্য প্রাঙ্গণে জাহির স্যার ও ম্যাডামদের সামনেই ছেলেটিকে পশুর মতো অমানবিক মারধর করছিল। সেখানে উপস্থিত কোনো শিক্ষকই তাকে বাঁচাতে এগিয়ে আসেননি; বরং পুরো ঘটনাটি ক্যামেরাবন্দি করা হচ্ছিল।

এমন সময় আফ্রিদ দ্রুত ছুটে এসে জাহিরকে জাপটে ধরে থামাল। তাকে টেনে দূরে সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করতে করতে সে বলতে লাগল, “ছেড়ে দে ভাই, এবার ছেড়ে দে...”

জাহির প্রচণ্ড ক্ষোভে ফেটে পড়ে চিৎকার করে বলল, “ওর মুখ আমি আজ ভেঙে গুঁড়িয়ে দেব! ওই মুখ দিয়েই ও কথাগুলো বলেছে, হারাম**দা!”

জাহির বারবার আফ্রিদের বাঁধন ছিঁড়ে ছেলেটির দিকে তেড়ে যেতে চাইল। কিন্তু আফ্রিদ তাকে শক্ত করে ধরে রাখল এবং বাকি বন্ধুরাও দ্রুত এগিয়ে এসে জাহিরকে সেখান থেকে সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করল।

এদিকে নিচে পড়ে থাকা ছেলেটি ব্যথায় কাতরাতে কাতরাতে চিৎকার করে প্রশ্ন করল, “তোর এত গায়ে লাগছে কেন? ও তোর কে হয় *** নাকি?”

কথাটা জাহিরের কানে পৌঁছাতেই সে তার সামনে থাকা বন্ধুকে সজোরে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিল। ধাক্কা খেয়ে বন্ধুটি নিচে পড়ে গেল। আফ্রিদ আবার জাহিরকে টেনে ধরার চেষ্টা করতেই জাহির আফ্রিদির হাত ধরে টেনে নিয়ে গেলো, আফ্রিদির কাঁধে হাত কাছে নিয়ে আসলো…

“আই এম হিস ব্রাদার ফ্রম অ্যানাদার মাদার!”

আবার মার শুরু করলো, মারের চোটে ছেলেটির কোমরের হাড় ভেঙে গিয়েছিল। সেই ঘটনায় পুরো স্কুলে তোলপাড় শুরু হয়। পরিস্থিতি এতটাই নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গিয়েছিল , তাই জাহাঙ্গীর সাহেব বাধ্য হয়ে জাহিরকে সাথে সাথেই বার্লিন থেকে সরিয়ে দেন। তাকে পাঠিয়ে দেওয়া হয় মিউনিখের সবচেয়ে দামী এবং নামকরা স্কুল ‘MGT’-তে। পরিবারের সবাই বার্লিনে থেকে গেলেও, জাহির একাই মিউনিখে গিয়েছিল। আফ্রিদি জাহির দুইবছর একে অপরের থেকে দূরে ছিল সেই সময় ছিল আফ্রিদির জীবনে সব চেয়ে খারাপ সময়।

আফ্রিদি মাথা নেড়ে সায় দিল, "হ্যাঁ, মনে আছে।"

জাহির ছাদের দিকে তাকিয়ে ধীর গলায় বলতে শুরু করল, "ওর সাথে আমার প্রথম দেখা হয়েছিল এক ইলিগ্যাল স্ট্রিট ফাইটিং বারে। নতুন শহরের নতুন স্কুল, আমি তখন কাউকেই চিনতাম না। আমার রুমমেট ছিল ক্লাসেরই এক ছেলে, নাম শিফন। একদিন হুট করেই সে আমাকে এক অদ্ভুত প্রস্তাব দিল..."

শিফন এসে তাকে ডাকল, "এই যে MJ!"

জাহির নির্লিপ্তভাবে উত্তর দিল, "হুম।"

"আজ রাতে স্ট্রিট ফাইট দেখতে যাবি?" শিফনের চোখেমুখে এক ধরণের উত্তেজনা লক্ষ করা গেলো।

জাহির অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল, "জার্মানিতে তো এসব নিষিদ্ধ, না?"

"আরে না ব্রো, আজ মিস্ক্রোক্স বিল্ডিংয়ে একটা বড় ফাইট আছে। আমি তো যাচ্ছি, তুই আসবি?"

জাহির তখন এসবের গভীরে খুব একটা জানত না। কৌতূহল আর একঘেয়েমি কাটাতে সে রাজি হয়ে গিয়েছিল।

‘MGT’ বয়েস হোস্টেলের বড়ো ঘড়িতে তখন মধ্যরাত পার হয়ে গেছে। চারপাশ নিঝুম, কেবল করিডোরে নৈশপ্রহরীর বুটের শব্দ মাঝে মাঝে প্রতিধ্বনি তুলছে। শিফন অতি সাবধানে জাহিরের বিছানার পাশে এসে দাঁড়াল। নিচু স্বরে ফিসফিস করে ডাকল, “MJ ওঠ সময় হয়ে গেছে!”

জাহির তখনো পুরোপুরি নিশ্চিত ছিল না। জার্মানিতে এই ধরণের ইলিগ্যাল স্ট্রিট ফাইট কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। ধরা পড়লে ক্যারিয়ার শেষ। কিন্তু শিফনের চোখেমুখে এক ধরণের উত্তেজনা। সে জাহিরকে একরকম জোর করেই রাজি করাল।

দুজন অতি সন্তর্পণে হোস্টেলের পেছনের দেওয়াল ঘেঁষে অন্ধকারের আড়ালে বেরিয়ে এল। পাহারাদারদের চোখ ফাঁকি দিয়ে কাঁটাতারের বেড়ার এক কোণ দিয়ে তারা গলিয়ে গেল বাইরের রাস্তায়। শহরের আলো তখনো নিভেনি, কিন্তু সেই আলোর নিচেই লুকিয়ে ছিল এক অন্ধকার জগৎ।

শিফন ইশারায় একটা ট্যাক্সি ডাকল। গন্তব্য— শহরের উপকণ্ঠে থাকা সেই কুখ্যাত ‘মিস্ক্রোক্স বিল্ডিং’। জায়গাটা পরিত্যক্ত, চারপাশ ঝোপঝাড়ে ঘেরা পাশাপাসি অনেক গুলো ফ্ল্যাট আছে ভুতুড়ে টাইপের। কিন্তু বিল্ডিংয়ের সামনে পৌঁছাতেই জাহির অবাক হয়ে দেখল, সেখানে দামি দামি গাড়ির মেলা। সমাজের ওপরতলার মানুষেরা চাদর মুড়ি দিয়ে এখানে আসে কেবল নেশায়।

বিল্ডিংয়ের ভেতরে ঢুকতেই এক ভ্যাপসা গরম আর সিগারেটের ধোঁয়ায় জাহিরের দম আটকে এল। নিচে মাটির তলায় এক বিশাল হলঘর, যার মাঝখানে দড়ি দিয়ে ঘেরা একটি রিং। চারপাশে মানুষের চিৎকারে কান ঝালাপালা হওয়ার অবস্থা। শিফন জাহিরের কাঁধে হাত রেখে উত্তেজিত হয়ে বলল, “দেখ MJ, আজকের ফাইটটা স্পেশাল”।

জাহির ফাইট দেখলো সবার মুখে একটা করে মাস্ক কেউ কাউকে চিনতে পারবে না একটু উপর দিকে ব্যালকনি মতো আছে সেখানে লাল রঙের বড়ো আরামদায়ক সোফাতে বসে আছে কয়েকজন, বড়ো বোর্ড দেখা গেলো লেখা আছে ভিআইপি জোন।

দেখল, রিংয়ের ভেতরে দুজন ফাইটার দাঁড়িয়ে আছে—দুজনেরই মুখমণ্ডল লাল রঙের ফেস কভারে ঢাকা, যাতে কেউ কাউকে চিনতে না পারে। একেকটি ঘুসি আর লাথির শব্দে পুরো হলঘর কেঁপে উঠছে।

রিংয়ের ভেতর তখন ঘাম আর রক্তের ফাইট শুরু হয়ে গেছে। উন্মত্ত দর্শক চিৎকার করছে, কিন্তু জাহিরের তীক্ষ্ণ চোখ জোড়া নিবদ্ধ ছিল কেবল ফাইটার প্রতিটি মুভমেন্টের ওপর। তিন বছর ডিফেন্স একাডেমিতে কঠোর ট্রেনিং নেওয়া জাহিরের কাছে এই কৌশলগুলো ছিল পানির মতো পরিষ্কার। বাবার চাপে পড়ে বাধ্য হয়েই তাকে সেই ট্রেনিং নিতে হয়েছিল, কিন্তু পরে সে মজা পেয়েছিল ফ্রী তে লোককে মারতে পারতো এতে সব থেকে বেশী হেল্প করেছিল তার দীর্ঘ দেহ এতো লম্বা কেউ ছিল না 6’1 ছিল লাস্ট আর সে 6’3।নিজের ব্যক্তিগত ইমেজের কথা ভেবে না চাইতেও রাতের আঁধারে হোস্টেলের রুমেই চলত তার একান্ত প্র্যাকটিস, হাফ জীবন তো নিজের রেপুটেশন ধরে রাখতেই কাটিয়ে দিয়েছে, মনোযোগ দিয়ে তো খালি ফুটবল আর অংকই করেছে, বাকি এমনি এমনি চলেছে তার জীবনে উইথআউট এনি রিজন।

জার্মান স্কুলগুলোতে ছাত্রদের রুচি অনুযায়ী খেলাধুলার সুযোগ দেওয়া হয়। জাহির সেই সুযোগের পূর্ণ ব্যবহার করেছিল। সে একে একে রপ্ত করেছিল সমস্ত কৌশল, নিজের ইচ্ছেতেই। রিংয়ের ফাইটারদের দিকে তাকিয়ে সে মনে মনে প্রতিটি শট মেলাচ্ছিল—জ্যাব থেকে শুরু করে নিখুঁত ক্রস, শক্তিশালী হুক আর চোয়াল ফাটিয়ে দেওয়া আপারকাট।।

হঠাৎ রিংয়ের ভেতরের লড়াইটা নোংরা মোড় নিল। জাহির দেখল একজন লড়াকু অন্যজনকে কাবু করতে লো ব্লো আর আই গৌজ করার চেষ্টা করছে। জাহির দাঁতে দাঁত চিপে ভাবল, “রং টেকনিক!” তার জানা ছিল কীভাবে স্প্রল ব্যবহার করে টেকডাউন আটকাতে হয় কিংবা জয়েন্ট ম্যানিপুলেশন দিয়ে প্রতিপক্ষকে নিমিষেই অচল করে দেওয়া যায়। সে মনে মনেই লড়ছিল—কখন এলবো স্ট্রাইক করতে হয় আর কখন নি স্ট্রাইক দিয়ে প্রতিপক্ষের হাড় গুঁড়িয়ে দিতে হয়, তা তার নখদর্পণে। এমনকি পাম হিল স্ট্রাইক আর হ্যামার ফিস্টের মতো ভয়ংকর কৌশলগুলোতেও সে ছিল অপ্রতিদ্বন্দ্বী।

সবকিছু ঠিকঠাকই চলছিল, লড়াইয়ের নেশায় মত্ত পুরো হলঘর তখন টগবগ করে ফুটছে। কিন্তু হঠাৎ সেই উন্মাদনার বুক চিরে কানে এল বিকট এক শব্দ—ফায়ারিং! মুহূর্তেই পুরো পরিবেশ থমকে গেল। হকচকিয়ে যাওয়া দর্শকদের মাঝখানে বাইরে থেকে দুজন গার্ড হন্তদন্ত হয়ে ভেতরে ঢুকে চিৎকার করে উঠল, “পুলিশ খবর পেয়ে গেছে! যে যেদিকে পারো পালাও!”

এক নিমেষে সেই উত্তেজনার জায়গা নিল চরম আতঙ্ক। সবাই প্রাণভয় দিগ্বিদিক ছুটে বেরোতে লাগল। মানুষের সেই উত্তাল ধাক্কাধাক্কিতে জাহির আর শিফন একে অপরের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল। জাহির ভিড় ঠেলে কোনোমতে সিঁড়ির কাছাকাছি পৌঁছাল। সিঁড়ি দিয়ে উঠতে উঠতেই সে দ্রুত শিফনকে কল করল। ওপাশে শিফনের আতঙ্কিত স্বর পেতেই জাহির ধমকের সুরে বলল, “তুই এক্ষুনি বেরিয়ে যা! আমি আসছি, তুই দূরে গিয়ে কোথাও দাঁড়া। গো, গো, গো...!”

জাহির সামনের দিকে এগোতেই দুজন পুলিশ অফিসার তার পথ আগলে ধরল। কিন্তু জাহির নিখুঁত ক্ষিপ্রতায় তাদের হাত ঝাপটা দিয়ে সরিয়ে দিল এবং চোখের পলকে সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠে গেল। ওপরের তলা থেকেও তখন লোকজন হুরহুর করে নিচে নামছে। সেই জনস্রোতের বিপরীতে গেলো জাহির যারা যারা নিচে নেমে ছিল সবাইকে পাকড়াও করল।

পুরো বিল্ডিংয়ের জানালাগুলো প্লাইউড দিয়ে শক্ত করে আটকানো, বাইরের সামান্য আলোও ভেতরে প্রবেশের সুযোগ পাচ্ছিল না। কোনো ভাবে লুস কানেকশন এর কারণে আলো জ্বলছে না ফলে চারপাশ ঘুটঘুটে অন্ধকারে ডুবে গেল। নিচের তলায় পুলিশ তখন অনেককেই পাকড়াও করেছে। এরই মধ্যে একজন অফিসারের টর্চের আলো সিঁড়ির কোণায় গিয়ে পড়ল, তিনি জাহিরকে ওপরের দিকে নিঃশব্দে মিলিয়ে যেতে দেখলেন।

অফিসার সাথে সাথে তার ওয়াকিটকি তুলে নিলেন, “হ্যালো, চ্যানেল নম্বর টু স্পিকিং...!”

ওপাশ থেকে গম্ভীর স্বর এল, “ইয়েস স্যার!”

“ওপরের তলায় অতিরিক্ত ফোর্স পাঠাও। আমরা নিচে অনেককে আটকে ফেলেছি, কিন্তু ওপরেও কয়েকজন পালিয়ে গেছে। ফাস্ট, ফাস্ট!”

অন্ধকারের মাঝে জাহির অনুভব করল, বিপদ এবার তার ঘাড়ের ওপর নিঃশ্বাস ফেলছে। চারদিকে ভারী বুটের শব্দ আর টর্চের আলোর ঝলকানি—জাহির কি পারবে এই গোলকধাঁধা থেকে অক্ষত অবস্থায় বেরিয়ে আসতে?

পুলিশের অভিযানের খবরে স্ট্রিট ফাইটিং বারের অন্ধকার, ধোঁয়াশাচ্ছন্ন হলঘর এক মুহূর্তে আতঙ্কপুরীতে পরিণত হলো। লাইট বন্ধ, চারদিকে ভারী বুটের শব্দ আর পুলিশ অফিসারের হাঁকডাক। এর মাঝেই জাহির অন্ধকারে গা ঢাকা দিয়ে দ্রুতগতিতে ওপরে উঠে এল। পেছনে পুলিশের তাড়া, সামনে অজানা পথ—তার একমাত্র লক্ষ্য হলো এই গোলকধাঁধা থেকে কোনোমতে বেরিয়ে আসা, একবার ধরা পড়লে সমস্ত খাটনি পানিতে যাবে।

অন্ধকার করিডোরে পথ খুঁজছিল জাহির। টর্চের আলোর ঝলকানি তখন চারদিকে এক বিভীষিকাময় পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছে। জাহির ঝড়ের গতিতে সামনের দিকে ছুটছে, ঠিক তখনই অন্ধকারের বুক চিরে অন্য এক ছায়ামূর্তি হুট করে তার সামনে এসে পড়ল। অন্যজনের গতিও ছিল প্রবল, তাই কেউ কাউকে পাশ কাটানোর সুযোগটুকু পেল না।

দুজনের কাঁধ বাহু সজোরে ধাক্কা লাগল। সেই ধাক্কার প্রচণ্ডতায় তারা উভয়েই ভারসাম্য হারিয়ে ফেলল। ঠিক সেই মুহূর্তেই, মাথার ওপরে থাকা পুরনো একটি ঝোলানো বাতি শর্ট সার্কিটের কারণে বিকট শব্দে জ্বলে উঠল। বাতিটি একবার জ্বলছে আর একবার নিভছে—আর সেই মিটমিটে হলুদ আলোর লুকোচুরিতে জাহিরের দৃষ্টি থমকে গেল। বেহায়া দৃষ্টি নিবদ্ধ হলো তার ঠিক সামনেই থাকা সবুজ কাঠবাদাম আকৃতির একজোড়া আঁখি গোলকে। কোনো এক গভীর অতল তলা থেকে উঠে আসা একজোড়া চোখ, যাতে মিশে আছে বিস্ময়।

পরস্পরের চোখের মায়ায় সেই কয়েক সেকেন্ড তারা স্থির হয়ে রইল। পরক্ষণেই গতির ধাক্কায় দুজনই হুট করে একে অপরের বিপরীতে হেলে পড়ল সাথে সাথে ধপ করে ফ্লোরে আছড়ে পড়ল। বাতিটি তখনো চিরচির শব্দ করে এদিক-ওদিক দুলছে, আর তার কম্পিত আলোতে করিডোরটি অদ্ভুত এক রহস্যময় রূপ নিয়েছে।

জাহির এক হাতে মেঝের ওপর ভর দিয়ে কোনোমতে নিজেকে সামলে নিয়ে পা ছড়িয়ে বসল। হাঁফাতে হাঁফাতে সে দেখল, তার ঠিক উল্টোদিকে অপরজন মেঝেতে পড়ে আছে। জাহিরের মতোই তার পুরো মুখ কালো মাস্ক দিয়ে ঢাকা, কেবল সেই সবুজ চোখ জোড়া দিয়ে সে অস্থিরভাবে চারিদিক দেখছে। দুজনেই তখন বিধ্বস্ত, দুজনেরই হৃদস্পন্দন প্রবল—কিন্তু সেই ক্ষণস্থায়ী হলুদ আলোয় তাদের মাঝে এক অদৃশ্য সুতোয় টান পড়ল।

করিডোরের সেই ঝুলন্ত বাতিটা তখনো এক অদ্ভুত ছন্দে দুলছে। বিদ্যুৎ আসা-যাওয়ার সেই অস্থির আলোয় চারপাশের ছায়াগুলো দেয়ালে নাচানাচি করছে। জাহির মেঝেতে এক হাতে ভর দিয়ে সোজা হয়ে বসল, তার বুকের ভেতরটা তখনো কামারের হাপরের মতো ওঠানামা করছে। ঠিক তার হাত দুয়েক দূরে পড়ে থাকা সেই রহস্যময়ী মূর্তির দিকে সে স্থির দৃষ্টিতে তাকাল, কালো প্যান্ট সাথে কালো ফুলস্লিভ টিশার্ট পড়েছে।

অপরজনও তখন ধপ করে মেঝেতে পড়ে নিজের ব্যথা সামলে নেওয়ার চেষ্টা করছে। মাস্কের ওপরের খোলা অংশ দিয়ে বেরিয়ে থাকা একজোড়া চোখ জাহিরের সমস্ত ইন্দ্রিয়কে মুহূর্তেই অবশ করে দিল।

বিদ্যুতের সেই ক্ষণস্থায়ী হলুদাভ আলো যখন শেষবারের মতো জ্বলে উঠল, জাহির দেখল—মাস্কের ভেতরে থাকা সেই সবুজ কাঠবাদাম আকৃতির চোখ দুটো হিরের মতো জ্বলজ্বল করছে। সেই চোখের মণিতে তখন অদ্ভুত তেজ।

উপরের তলায় ধস্তাধস্তির শব্দ পেয়েই পুলিশ কর্মীরা দ্রুত সিঁড়ি বেয়ে উঠতে শুরু করল। টর্চের তীব্র আলো দেয়ালে প্রতিফলিত হতেই জাহির ঝটপট মেঝের ওপর থেকে উঠে দাঁড়াল। সে সৌজন্যের খাতিরে সামনের রহস্যময়ী মেয়েটির দিকে হাত বাড়িয়ে দিল সাহায্য করতে, কিন্তু মেয়েটি সেই সাহায্য নিল না; বরং অসামান্য ক্ষিপ্রতায় সে নিজেই উঠে দাঁড়াল। জাহিরকে ভুল পথে এগোতে দেখে সে অতি নিচু ও সর্তক স্বরে বলে উঠল— “দিস ওয়ে (এই দিকে)!”

জাহির থমকে দাঁড়াল এবং মুহূর্তেই ঘুরে তার পিছু নিল। কিন্তু তারা খুব বেশিদূর এগোতে পারল না। দেখা গেল, দুজন পুলিশ অফিসার টর্চ জ্বালিয়ে ঠিক এই করিডোর দিয়েই তাদের দিকে এগিয়ে আসছে। বিপদ আসন্ন দেখে জাহির এক মুহূর্তও সময় নষ্ট করল না। সে সামনে থাকা মেয়েটির হাত ধরে হ্যাঁচকা টানে নিজের দিকে টেনে আনল, দ্রুত পিছিয়ে গিয়ে দুটো সিঁড়ি উপরে উঠে গেল।

মেয়েটি প্রথমে এই আকস্মিক আচরণে প্রচণ্ড রেগে গিয়েছিল, কিন্তু পরিস্থিতির গুরুত্ব বুঝতে পেরে সে নিমিষেই শান্ত হয়ে গেল। জাহির দুই হাত দিয়ে তাকে শক্ত করে নিজের শরীরের সাথে চেপে ধরেছে যাতে অন্ধকারে কেউ তাদের অস্তিত্ব টের না পায়। মেয়েটির মাথা তখন জাহিরের বুকের ঠিক নিচে—বুক আর পেটের মাঝামাঝি জায়গায় ঠেকে আছে।, সেই সময় খালি খেলাধুলো আর প্র্যাকটিস, লম্বা মিডিয়াম চেহারা হালকা হালকা গোঁফ এর রেখা দেখা দিয়েছে কিশোর বয়স এর জাহির খুব চার্মিং ছিল স্কুলে টিচার পর্যন্ত তার তারিফ করত।

পুলিশের ভারী বুটের শব্দ ক্রমেই এগিয়ে আসছে, আর টর্চের তীব্র আলো চাবুকের মতো চারিদিকে ঘুরে বেড়াচ্ছে। জাহির নিজের মাথা সামান্য নিচু করে মেয়েটির কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিসিয়ে জিজ্ঞেস করল, “এখান থেকে যাওয়ার কোনো রাস্তা আছে?”

মেয়েটি জাহিরের দিকে না তাকিয়েই অত্যন্ত ক্ষীণ স্বরে উত্তর দিল, “ছাদ...।”

“ওকে।”

বিপদ কিছুটা কাটতেই মেয়েটি নিজেকে জাহিরের বাঁধন থেকে ছাড়িয়ে নিল, জাহিরও তাকে ছেড়ে দিল। পুলিশের টর্চের আলো করিডোর স্পর্শ করার আগেই দুজন উল্কার গতিতে ছুটে ছাদে গিয়ে পৌঁছাল।

ছাদের দরজা ঠেলে বেরোতেই রাতের হাড়কাঁপানো উত্তুরে হাওয়া তপ্ত নিঃশ্বাসের ওপর আছড়ে পড়ল। কিন্তু থমকে দাঁড়ানোর উপায় নেই; নিচ থেকে ভেসে আসা পুলিশের সাইরেন আর সার্চলাইটের তীব্র ঝলকানি জানান দিচ্ছে পালানোর পথ ক্রমশ ছোট হয়ে আসছে। আকাশে মেঘের ঘনঘটা, তার বুক চিরে মাঝে মাঝেই চিলতে বিদ্যুৎ খেলে যাচ্ছে।

জাহির নিজের পরিস্হিতি দেখে আসতে করে দাঁতে পিষল — "আই উইল কিল ইউ শিফন! ওহ আল্লাহ, হেল্প আস!"

জাহির উঁকিঝুঁকি মেরে চারপাশটা মেপে নিল। নিচতলায় নামার সব রাস্তা এখন পুলিশের দখলে। সে দ্রুত ছাদের কিনারে গিয়ে দাঁড়াল। পাশের পরিত্যক্ত ফ্ল্যাটটার দূরত্ব বেশ কয়েক ফুট। মাঝখানের সেই অন্ধকার শূন্যতা মৃত্যুকূপের মতো হাঁ করে আছে; সামান্যতম ভারসাম্য হারালে সরাসরি নিচের কঠিন পিচঢালা রাস্তায় আছড়ে পড়তে হবে।

জাহির পেছনে ফিরতেই মেয়েটি তাকে চমকে দিয়ে সামনে এগিয়ে এল। খুব ধীর কিন্তু স্থির গলায় সে জিজ্ঞেস করল— "We need to go to that building"

জাহির শুধু নিঃশব্দে মাথা নাড়ল। সে ভাবছিল এই ভীত মেয়েটিকে কীভাবে ওপাশে নিয়ে যাবে, কিন্তু মেয়েটির অকুতোভয় প্রশ্ন তার সব দুশ্চিন্তা নিমেষেই উড়িয়ে দিল। দুজনেই কয়েক কদম পিছিয়ে গিয়ে দৌড়ানোর জন্য গতি সঞ্চয় করে নিল। জাহির শেষবার মেয়েটির পজিশন দেখে নিয়ে বুকভরা শ্বাস নিয়ে দৌড় শুরু করল। ঠিক কার্নিশের শেষ প্রান্তে এসে দুজনেই এক লাফ দিল।

বাতাসের গতিবেগ ভেদ করে তারা ওপাশের ছাদে গিয়ে আছড়ে পড়ল। হাতে প্রচণ্ড চোট পেলেও জাহির দাঁতে দাঁত চেপে নিজেকে সামলে নিয়ে তড়িৎঘড়ি উঠে দাঁড়াল। তবে মেয়েটি তখনো ধুলোবালি মাখা মেঝেতে পড়ে আছে।

পাশের ছাদে সার্চলাইটের আলো পড়তেই জাহির সতর্ক হয়ে উঠল। সে দ্রুত মেয়েটির পাশে গিয়ে তাড়া দিল, "হ্যালো মিস! প্লীজ গেট আপি, দে আর কামিং!"

ঠিক তখনই আকাশ ভেঙে ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি শুরু হলো। হাড়কাঁপানো ঠান্ডা পানির স্পর্শে জাহির শিউরে উঠল। কিন্তু মেয়েটি নিশ্চল, কোনো সাড়াশব্দ নেই। জাহিরের মনে খটকা লাগল; সে দ্রুত হাঁটু গেড়ে বসে আঙুল দিয়ে আলতো খোঁচা দিয়ে ডাকল, "হেই গার্ল... হেই..."। কোনো উত্তর না পেয়ে নাকের কাছে হাত নিতেই বুঝল সে জ্ঞান হারিয়েছে। আতঙ্কে জাহিরের মুখ দিয়ে বেরিয়ে এল, "শিট, শিট, শিট!"

পুলিশের উপস্থিতি টের পেয়ে জাহির আর দেরি করল না। মেয়েটিকে পাঁজাকোলা করে তুলে নিয়ে সে দ্রুত সিঁড়ির দিকে ছুটল। একবার পেছনে তাকিয়েই আবার বিড়বিড় করল, "লা ইলাহা ইল্লা আনতা সুবহানাকা ইন্নি কুনতু মিনাজ জ্বালিমিন" নিচে নামতেই এক ভ্যাপসা গন্ধে নাড়িভুঁড়ি উল্টে আসার উপক্রম হলো। জাহির সুহানাকে আরও শক্ত করে আঁকড়ে ধরল।

নিচতলার অবস্থা আরও করুণ। চারপাশের ইটের দেয়ালগুলো প্লাস্টারহীন, রুক্ষ লালচে-ধূসর হয়ে আছে। কোথাও কোথাও সিমেন্টের অমসৃণ প্রলেপ লাগানো, যা দেখতে বেশ কদর্য। মেঝেতে কোনো টাইলস নেই, কেবল এবড়োখেবড়ো কংক্রিটের ঢালাই। বাইরে তখন মেঘের গর্জনের সাথে বৃষ্টির দাপট আরও বেড়েছে।

অন্যদিকে, শিফন অনেকটা দূরে এক বাসস্ট্যান্ডের ছাউনির নিচে আশ্রয় নিয়েছে। প্রবল বৃষ্টি আর একাকীত্বে সে ভীষণ আতঙ্কিত। কাঁপাকাঁপা হাতে ফোনটা ধরে সে অস্ফুট স্বরে বলতে লাগল, "জাহির... প্লিজ চলে আয় ভাই, আমার খুব ভয় করছে ভাই..."

দ্বিতল ভবনের একটা মার্বেল বসানো স্ল্যাবের ওপর জাহির সাবধানে সুহানাকে শুইয়ে দিল; জায়গাটা দেখে মনে হচ্ছে ওটা আসলে রান্নাঘর। জানালার ফ্রেমগুলো বসানো হলেও তাতে কাঁচের বালাই নেই। সেই শূন্য ফ্রেম দিয়ে হু হু করে ঠান্ডা বাতাস আর বাইরের আবছা আলো ভেতরে ঢুকে আসছে। বৃষ্টির ছাঁটে মেঝের জমা ধুলোমাটি ভিজে কাদার মতো লেপটে আছে।

জাহির এক মুহূর্ত কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। পরক্ষণেই পকেট থেকে ফোনটা বের করল। সুইচ অফ করা ছিল, অন করতেই স্ক্রিন জ্বলে উঠল। সে সময় নষ্ট না করে দ্রুত শিফনকে কল দিল। শিফন এই ফোনটার জন্যই চাতক পাখির মতো বসে ছিল, রিং হতেই এক পলকে রিসিভ করল।

— "হ্যালো... এমজে (MJ)! তুই ঠিক আছিস তো?"

— "হ্যাঁ, আই এম ফাইন, আগে আমার কথা শোন..."

— "ভাই, তুই কি এখনো ওখানেই আছিস? আমি আসছি তোর কাছে..."

— "দাঁড়া, একদম না! এখানে আসার চিন্তাও করিস না। পারিস দূরে চলে যা। তুই বরং এখন হোস্টেলে ফিরে যা। পুলিশ ওই রাস্তা দিয়েই টহল দেবে, মাঝরাতে তোকে একা দেখলে সন্দেহ করে তুলে নিয়ে যাবে।"

শিফন রুদ্ধশ্বাসে জিজ্ঞেস করল, "আর তুই?"

— "আমি সুযোগ বুঝেই বেরিয়ে যাব। তুই চলে যা।"

— "আমি তোর জন্য অপেক্ষা করব, প্লিজ যোগাযোগ রাখিস। আমার জন্যই তুই ফেঁসে গেলি ভাই, আই এম রিয়েলি সরি..."

— "এখন ওসব রাখ, আগে পালানোর কথা ভাব। যা এখান থেকে!"

ফোন কেটে জানালার ফাঁক দিয়ে বাইরে উঁকি দিল জাহির, কিন্তু বর্তমান অবস্থান থেকে সবটা স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে না। সে সন্তর্পণে ঘর থেকে বেরিয়ে উল্টো দিকে গিয়ে দাঁড়াল। নিচে দেখা যাচ্ছে বিশাল পুলিশ বাহিনী পুরো বিল্ডিং ঘিরে ফেলেছে, বৃষ্টির মধ্যেই রেইনকোট পরে জোরদার তল্লাশি চালাচ্ছে তারা। ইতিমধ্যে বেশ কিছু মানুষকে পুলিশ ভ্যানে তুলেও নেওয়া হয়েছে। নিজের পরিস্থিতির কথা ভেবে জাহির চরম বিরক্ত হলো— "ধুর! কী এক আপদেই না ফেঁসে গেলাম!"

এমন সময় কয়েকজন পুলিশ সদস্য পাশের জরাজীর্ণ বিল্ডিংটার সামনে এসে দাঁড়াল। তাদের ওপর নির্দেশ ছিল ভেতরে ঢুকে তল্লাশি চালানোর। কিন্তু বাইরে থেকে ওই ভুতুড়ে অট্টালিকার জীর্ণ দশা দেখে তাদের পিলে চমকে যাওয়ার দশা। মনে হচ্ছে ভেতরে পা রাখলেই কোনো অশরীরী ভূতের দলবল তাদের গিলে খাবে!

পুলিশরা একে অপরের মুখ চাওয়া-চাওয়ি করল। শেষে একজন কাঁপাকাঁপা হাতে ওয়াকিটকি অন করে জানাল, "হ্যালো স্যার, এখানে কেউ নেই ওভার।"

পাল্টা জবাব এল, "ওকে, দেন কাম ব্যাক উই হ্যাভ টু গো, ওভার।"

পুলিশের দল চলে যেতেই বৃষ্টির তেজ আরও বেড়ে গেল। জার্মানিতে বর্ষার নামে কোনো ঋতু নেই এখানে সারা বছর বৃষ্টির দেখা মেলে, গ্রীষ্মের শেষে এবং শরৎকালে বেশি বৃষ্টির হয়। এখন গরম শেষের দিকে এমন বৃষ্টি স্বাভাবিক হলেও, বর্তমান পরিস্থিতিতে জাহিরের মেজাজটা আরও তেতো হয়ে উঠল।

দরজার সামনে গিয়ে দাঁড়াল সে। আদতে কোনো দরজা নেই, কেবল দরজার ফ্রেমের ওপর কারুকার্য করা মেহগনি কাঠের খাম অবশিষ্ট আছে। গায়ের কালো জ্যাকেটটা ভিজে সঁতসেঁতে হয়ে যাওয়ায় জাহির সেটা খুলে ফেলেছে। পরনে তার এখন কালো জিন্স আর টি-শার্ট ধবধবে ফর্সা মানুষ সে—আজকের অনুষ্ঠানের থিম অনুযায়ী এই পোশাকই পরে এসেছিল সে।

মেয়েটির দিকে তাকিয়ে জাহিরের হঠাৎ নিজেকে কোনো উপন্যাসের নায়ক বলে ভ্রম হলো। জীবনে অসংখ্য গল্প-উপন্যাস পড়েছে সে। এমন বৃষ্টিভেজা রাতে কোনো এক নির্জন জায়গায় নায়ক-নায়িকার আটকা পড়া, একে অপরের সান্নিধ্যে আসা, নায়কের সেই পাগলামি তারপর আসে তীব্র আসক্তি (obsession), আর নায়িকার নিজেকে বাঁচানোর আকুতি—সবই তার চেনা ছক। "ব্লা ব্লা ব্লা... গল্প! একটু মারপিট হবে তবে না জমবে হুস…"

ব্যক্তিগতভাবে জাহিরের পছন্দ একটু অন্যরকম। তার একখানা বুদ্ধিমতী ও চতুর হরিণী চাই, যার মস্তিষ্ক চলবে তারও আগে। যে তাকে কন্ট্রোল করতে পারবে, তাকে পাওয়ার জন্য জাহির যুদ্ধে নামতেও রাজি —তবেই না তাকে পাওয়া সার্থক। উগ্র আসক্তি বা অবশেশন কেবল বইয়ের পাতাতেই শোভা পায়, বাস্তবে এর অস্তিত্ব নেই বললেই চলে। সে বাস্তবতায় বিশ্বাসী মানুষ; এখনো কোনো সময় আসেনি সে মনে করে যার যখন আসার সে চলে আসবে। তবুও আজকের এই অদ্ভুত পরিবেশে ক্ষণিকের জন্য হলেও তার মনে হলো—একটু না হয় নায়ক সাজাই যাক!

—“ তাহলে নায়ক এবার নায়িকার মুখ দেখবে? ওয়েল ওয়েল, দেন হোয়াই লেট? মোমেন্টাম ধরে রাখতে হবে তো! লেটস গো MJ, ইউ হ্যাভ টু সি..”

জাহির ঠিক কোনো উপন্যাসের নায়কের ভঙ্গিতেই ধীরপায়ে এগিয়ে গেল। কিন্তু সত্যিই কি সে মুখটা দেখবে? মেয়েটির চোখের কথা মনে পড়তেই তার কিউরোসিটি বহুগুণ বেড়ে গেল। মনের ভেতরে এক তীব্র অস্থিরতা কাজ করছে, কিউরোসিটি কমার বদলে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে। পকেট থেকে ফোনটা বের করে ফ্ল্যাশ ওন করলো সে। মেয়েটির মুখ তার দিকেই ঘোরানো আছে।

জাহির নিজেকেই সাহস দিল— "যা হবে দেখা যাবে, গো MJ, ইউ ক্যান ডু দিস!"

অবশেষে জাহির হাত বাড়াল মেয়েটির গলার কাছে। কালো মাস্কটার এক প্রান্ত ধরে খুব ধীরে ধীরে সে উপরের দিকে টেনে তুলল.....

চলবে….

(গল্পের সমস্ত চরিত্র,কাল সবই কাল্পনিক সকলে সেই ভাবেই নেবেন, লেখার মাঝে কোনো বানান ভুল থাকলে মাফ করবেন)

#প্রেমের_আলোড়ন

#midnight_tales_by_joy

#md_suhan_joy

Thank You🍀

(Don’t copy without permission)

Enjoy your reading 🎀

গল্প: প্রেমের আলোড়ন

লেখক:এমডি সুহান জয়

পেজ: Midnight Tales by Joy

পর্ব: ৫০ (শেষ অংশ)

(Note – এটি একটি প্রণয় ও জীবনবোধের মিশ্রণ সম্বলিত গল্প। যেখানে তীব্র রোম্যান্সের পাশাপাশি সামাজিক বাস্তবতা ও ব্যক্তিগত সংগ্রাম তুলে ধরা হয়েছে।)

জাহির তড়িঘড়ি করে উঠে বসে আফ্রিদির দিকে মুখ করে বাবু হয়ে বসল। আফ্রিদি শান্ত চোখে জাহিরের দিকে তাকিয়ে তার হাবভাব বোঝার চেষ্টা করছিল।

ইতিমধ্যে রামিম একটা চেয়ার টেনে নিয়ে সামনে এল। তাসফিন, সামির আর সাদাদ রুমে ঢুকেই দরজাটা আটকে দিল—রামিমের ইশারাতেই তারা এখানে এসেছে। সবাই মিলে এক জায়গায় গোল হয়ে বসার পর জাহির আফ্রিদির দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল, "জানিস ওটা কী ছিল?"

আফ্রিদি নিচু স্বরে জানতে চাইল, "কে ছিল?"

জাহির বলতে লাগল, "কালো মাস্কটা সরতেই দেখা গেল একটা ছোট আর মসৃণ থুতনি, তারপর খুব নরম এক জোড়া ঠোঁট। প্রথম দেখায় মনে হবে কেউ পেনসিল দিয়ে নিখুঁতভাবে এঁকেছে। সরু আর খাড়া নাক, ছোট মুখ আর কপাল—সব মিলিয়ে চোখ বন্ধ থাকা অবস্থায়ও তাকে অসম্ভব সুন্দর লাগছিল। বিশেষ করে ওর চোখের গড়ন ছিল দারুণ। ওর মুখটা সবসময় তৈলাক্ত আর চকচকে থাকে। গায়ের রং একেবারে ফর্সা না হলেও ঠিক শ্যামলাও বলা যায় না। আমি কতক্ষণ যে ওর মুখটার দিকে তাকিয়ে ছিলাম, সময়ের কোনো খেয়াল ছিল না। খুব খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখছিলাম, মুখের একটা অংশও বাদ দিইনি। একবার আঙুল দিয়ে আলতো করে ছুঁয়ে দেখেছিলাম—ভীষণ নরম ছিল।"

আফ্রিদি জাহিরের কাঁধে হাত রেখে তাকে নিজের কাছে টেনে নিল, আর জাহিরও আফ্রিদিকে জড়িয়ে ধরল। আফ্রিদি কেঁদে উঠে বলল, "আই এম সরি ভাই, আই এম সরি! আমার জন্য তোকে সবসময় কষ্ট করতে হয়, অলওয়েজ সারভাইভ করিস তুই..." জাহির কান্নারত স্বরে বলতে লাগল, "আমার খুব কষ্ট হচ্ছে রে আফ্রিদি, আই এম ইন পেইন ব্রো... অসহ্য যন্ত্রণা!"

আফ্রিদির কাঁধে মাথা রেখে জাহির অবিরাম কেঁদে যাচ্ছিল। তাকে দেখে কেউ কোনোদিন কল্পনাও করতে পারেনি যে জাহির এমনভাবে ভেঙে পড়তে পারে। রামিম, তাসফিন, সাদাদ আর সামির সবসময় তাদের বড়দাকে হাসিখুশিই দেখে এসেছে। সে সবার পেছনে লাগে, সারাদিন মজা করে, এমনকি বাড়ির মায়েরা তাকে এক মুহূর্ত না দেখলে চলে না—যেকোনো পরিবেশ জমিয়ে দেওয়াটাই তার স্বভাব। সেই প্রাণবন্ত ছেলেটাই আজ তার প্রেয়সীর জন্য চোখের জল,নাকের জল এক করে ফেলছে।

আফ্রিদি প্রথমে জাহিরকে শক্ত করে ধরে রাখল, কিন্তু কিছুক্ষণ পর তাকে এক ধাক্কায় সরিয়ে দিয়ে খাটে হেলান দিয়ে বসল।

জাহির বলতে লাগল, "ওখানে পানি ছিল না, আমার কোনো খেয়ালও ছিল না। আমি নির্লজ্জের মতো ওর দিকে তাকিয়ে ছিলাম। পরে একটা পোকার কামড়ে আমার হুঁশ ফিরল। হারামিটা আমার পুরো মুডটাই নষ্ট করে দিয়েছিল!

জাহির দ্রুত ফ্লাশ জ্বালিয়ে দেখল পোকাটা তার বুটের ভেতরে ঢুকে গেছে। সে তড়িঘড়ি করে জুতোটা খুলে এক লাথি মেরে দূরে ফেলে দিয়ে মৃদু চিৎকার করে উঠল— "বাস্টা*র্ড!"

বাইরে বৃষ্টির পানি জানালার ভেতরে ছিটকে আসছিল। জাহির আবার জুতো পরে হাত বাড়িয়ে বৃষ্টির ঠান্ডা পানি ধরল এবং সেই পানি সুহানার মুখে ছিটিয়ে দিল। প্রচণ্ড স্নায়বিক চাপে সুহানা জ্ঞান হারিয়েছিল, পানির ঝাপটায় তার চোখের পাতা কেঁপে উঠল। সুহানার জ্ঞান ফেরার আগেই জাহির দ্রুত মাস্কটা টেনে নামিয়ে সেখান থেকে বেরিয়ে গেল। কিছুক্ষণ পর সুহানা চোখ মেলে তাকাল এবং সামনে মাকড়সার বীভৎস সব জাল দেখে ভয়ে আঁতকে উঠে লাফিয়ে নিচে নামল। তার গলায় খুব ব্যথা করছিল; সে কিছুতেই মাথায় মেলাতে পারছিল না যে শেষ পর্যন্ত আসলে কী ঘটেছিল।

“উফফ….”

জাহির বাইরে থেকে আড়ালে দাঁড়িয়ে সুহানার প্রতিটি পদক্ষেপ লক্ষ করছিল। সুহানা সামনের দিকে এগিয়ে গেল এটা বোঝার জন্য যে সে আসলে এখন কোথায় আছে। তার মনে পড়ল শেষবার সেই ছেলেটিকে সে দেখেছিল যে লাফ দিয়েছিল, তারপর আর কিছু মনে নেই।

সুহানাকে বাইরে আসতে দেখে জাহির দ্রুত লাফিয়ে অনেকটা দূরে সরে গেল এবং পেছন ফিরে লম্বা একটা শ্বাস নিয়ে নিজেকে সামলে নিল। তাকে এখন নাটক করতে হবে। কোনো মেয়ের দিকে সে ওভাবে বেহায়া নজরে তাকিয়ে ছিল—এটা তার ইগোতে লেগেছে। তার ধারণা অনুযায়ী, সে কেন কারো দিকে তাকাবে?

সুহানা বাইরে বেরিয়ে এসে আশেপাশে খুঁজতে লাগল। বিদ্যুতের ঝলকানিতে সেই লম্বা মানুষটিকে দেখতে পেল সে। সুহানা আর সামনে বাড়ল না, বরং আড়াল থেকে উঁকি দিয়ে দেখার চেষ্টা করল। সে বুঝতে পারল, এই ছেলেটিই তাকে এখানে নিয়ে এসেছে।

কৃতজ্ঞতাবোধ থেকে সুহানা কিছুটা এগিয়ে এল। জাহির আড়চোখে সব দেখছিল, সুহানাকে এগিয়ে আসতে দেখে সে আড়ষ্ট হয়ে সোজা হয়ে দাঁড়াল। সুহানা খুব নিচু স্বরে বলল, "থ্যাঙ্ক ইউ।"

সরাসরি ধন্যবাদ শুনে জাহির কিছুটা বিভ্রান্ত হয়ে গেল। তার 'ওয়েলকাম' বলা উচিত ছিল, কিন্তু সে কেন যেন বলতে পারছিল না। জাহির ভেবেছিল সুহানা হয়তো এখানে আসার কারণ জানতে চাইবে, অথবা তাকে কেন নিয়ে আসা হয়েছে তা নিয়ে প্রশ্ন করবে। কিন্তু সুহানা সেসব কিছুই করল না—যা ছিল জাহিরের ধারণার বাইরে।

জাহির পেছন ফিরে তাকাল। সুহানা তার তুলনায় বেশ খাটো হওয়ায় তাকে অনেকটা নিচে তাকাতে হলো। সে গম্ভীর গলায় বলল, "ওয়েলকাম।"

জাহিরের কণ্ঠস্বর শুনে সুহানা শুধু একবার মাথা নাড়ল, কিন্তু একবারের জন্যও তার দিকে চোখ তুলে তাকাল না। সুহানা আসলে অন্য কোনো গভীর চিন্তায় মগ্ন ছিল। সে ফিনাকে নিয়ে টেনশন করছিল—যদি ফিনা কাউকে কিছু জানিয়ে দেয়, তবে এক বিরাট বিপর্যয় ঘটে যাবে। মেয়েটা বড্ড বুদ্ধু!

"উই শুড গো নাউ..."

জাহিরের কথা শুনে সুহানা কোনো উত্তর না দিয়ে কেবল মাথা নাড়ল। জাহির আগে আগে হাঁটতে শুরু করল আর সুহানা তাকে অনুসরণ করল।

হাঁটতে হাঁটতে জাহির জিজ্ঞেস করল, "আপনি কি এখানে আগে এসেছেন?"

সুহানা খুব নিচু স্বরে উত্তর দিল, "না।"

"তাহলে তখন অত সিওর হয়ে কীভাবে বললেন যে রাস্তা এই দিকেই?"

সুহানা শান্তভাবে বুঝিয়ে বলল, "চারদিকের সব পথই তো বন্ধ ছিল, কেবল দুটো পথ ছাড়া। একটা নিচের দিকে যাচ্ছিল, তাই অন্যটা নিশ্চয়ই উপরেই হবে, বাকী সব ব্লক করা, আমি নিশ্চিত ছিলাম না, অনুমান করেই বলেছিলাম।"

সুহানার কথা শুনে জাহিরের পা দুটো থমকে গেল। তাকে থামতে দেখে সুহানাও দাঁড়িয়ে পড়ল। জাহির মনে মনে ভাবল, "কী একটা অবস্থা! আজ যদি ছাদের দরজাও বন্ধ থাকত তবে কী হতো? একটা মেয়ে তার আগেই এত কিছু ভেবে ফেলল! ছিঃ ছিঃ জাহির,। জায়গা ডুইবা মইরা যাই।"

সুহানা জাহিরকে পাশ কাটিয়ে সামনে এগিয়ে গেল। জাহির নিজের ভাবনা থেকে বেরিয়ে দ্রুত পা চালিয়ে বাইরে এল। বাইরে এখন কেউ নেই, শুধু অঝোর ধারায় বৃষ্টি পড়ছে।

জাহির ম্যাপ দেখে বুঝতে পারল আশেপাশে কোনো স্টেশন বা বাস স্ট্যান্ড নেই। এই ছোট জঙ্গলটা পার হয়ে উল্টো দিকে গেলে তবেই বাস স্ট্যান্ড পাওয়া যাবে। জায়গাটা আসলে আউট সাইড এলাকা, যা বছরে কেবল একবার গরমের সময় দুই মাসের জন্য খোলা হয়; তাও আবার পারমিশন নিয়ে এখানে ক্যাম্পিং করতে আসতে হয়।

দুইজনেই তাদের যাত্রা শুরু করল এবং ধীরপায়ে নিচের দিকে নেমে এল। হাতে থাকা টর্চের আলো জ্বালিয়ে তারা পথ চলছে। ঝোপঝাড়ের আড়াল থেকে শিয়ালের ডাক শোনা যাচ্ছে, যা শুনে সুহানা কিছুটা ভয় পাচ্ছে—খুব বেশি না হলেও সামান্য তো বটেই। জাহির তার কাছে একদমই অজানা এক যুবক, তারা একে অপরের মুখও ঠিকমতো দেখেনি। এতক্ষণ জাহির ভালো ব্যবহার করলেও, এই নির্জন পথে একটা ছেলেকে পুরোপুরি বিশ্বাস করতে পারছিল না সুহানা। তাই হাঁটতে হাঁটতেই সে তার পায়ের গোড়ালি থেকে ছোট একটা চাকু বের করে হাতের মুঠোর ভেতর শক্ত করে চেপে ধরল।

জাহির বারবার পেছনে ফিরে তাকাচ্ছিল সুহানা ঠিকঠাক সাথে আসছে কি না তা নিশ্চিত হতে। সামনেই একটা বড় নালা পড়ল, যার ওপর পারাপারের জন্য একটা গাছের গুঁড়ি ফেলে রাখা হয়েছে। গুঁড়িটার ওপর সবুজ শ্যাওলা জমে আছে। জাহির সরাসরি গুঁড়িতে না উঠে পা দিয়ে ধাক্কা দিয়ে দেখে নিল সেটা যথেষ্ট মজবুত কি না। সুহানা কোনো কথা বলল না; সব কাজ তার একার পক্ষে সম্ভব নয়। কিছু ক্ষেত্রে মেয়েদের মতো সংযত আচরণ করাই শ্রেয়, আর সে এখন ঠিক সেটাই করছে।

জাহির গুঁড়ির ওপর উঠে দু-পা এগোতেই সুহানা তাকে অনুসরণ করল। জায়গাটা ভীষণ পিচ্ছিল আর গুঁড়িটা বেশ চওড়া হলেও নিচে বৃষ্টির কারণে কাদায় মাখামাখি হয়ে স্যাঁতস্যাঁতে হয়ে আছে। জাহির পার হয়ে ওপাশে লাফিয়ে নামল এবং সুহানার চলার পথ সহজ করতে টর্চের আলো সেদিকে ধরে রাখল।

সুহানা যখন প্রায় শেষ প্রান্তে চলে এসেছে, ঠিক তখনই গাছের এক ফোকরে তার পা আটকে গেল। সামনের দিকে পড়ে যেতে নিলেই জাহির দ্রুত সুহানার কোমর জড়িয়ে ধরে তাকে পাজাঙ্কোলা করে তুলে নিল। সেই মুহূর্তে গুঁড়িটা নড়াচড়া করতে করতে নিচে পড়ে গেল। জাহিরের শক্ত হাতের স্পর্শ সুহানার কোমরের ভাঁজে অনুভব হচ্ছিল। জাহির এক মুহূর্তের জন্য ঘোরের মধ্যে ডুবে গেল এবং তার হাতের বাঁধন আরও কিছুটা শক্ত হলো, জীবনে প্রথম কোনো নারী শরীর তার খুব কাছে হাতের মুঠোয় পেয়েছে। সুহানা তখন মাটি থেকে কয়েক ফুট উঁচুতে জাহিরের শরীরের সাথে মিশে ঝুলছিল। সুহানা যখন নিজেকে ছাড়ানোর জন্য হাত-পা নাড়াতে শুরু করল, তখন জাহিরের ঘোর কাটল। সে নিজের এমন আচরণে মনে মনে কিছুটা বিরক্ত হলো এবং কয়েক পা দূরে গিয়ে সুহানাকে নামিয়ে দিল। সুহানা নামার সাথে সাথেই কিছুটা দূরত্ব বজায় রেখে সরে দাঁড়াল।

জাহির গলা ঝেড়ে অস্বস্তি কাটানোর চেষ্টা করল এবং ম্যাপের দিকে তাকাল। গন্তব্যে পৌঁছাতে আরও কিছুটা পথ বাকি, অথচ সময় দ্রুত বয়ে যাচ্ছে। বৃষ্টির তেজ এখন কমলেও ঠান্ডা হাওয়া বইছে। শীতে কাঁপতে কাঁপতে দুইজনেরই নাক ও মুখ লাল হয়ে গেছে।

ফিনা কম্বল মুড়ি দিয়ে লাইট বন্ধ করে বসে আছে। ঘরে শুধু একটি ল্যাম্প জ্বলছে। তার একদিকে যেমন ভূতের ভয় করছে, অন্যদিকে সুহানার জন্য চিন্তাও হচ্ছে। সে ঘড়ির দিকে তাকিয়ে বিড়বিড় করে বলল, "সু, তাড়াতাড়ি আয়! আমার ওয়াশরুমে যেতে হবে, নয়তো কাল সকালে সব তোকেই শুকাতে দিতে হবে কিন্তু!"

এদিকে সুহানা ও জাহির হাঁটতে হাঁটতে বাসস্ট্যান্ডের কাছে চলে এল। কিন্তু জায়গাটা বেশ নিচুতে হওয়ায় সুহানা প্রথমে লাফ দিয়ে স্ট্যান্ডের ছাদে নামল, তারপর নিচে। জাহির আগেই জেনেছিল যে মেয়েটি জিমন্যাস্টিকস জানে, তাই সেও দ্রুত নিচে নেমে পড়ল। দুজনে কিছুটা দূরত্ব বজায় রেখে বসল এবং আড়চোখে একে অপরকে দেখে নিয়ে উল্টো দিকে মুখ ফিরিয়ে নিল। তারা দুজনেই নিজেদের মুখের কালো মাস্ক খুলে জঙ্গলে ফেলে দিল। এরপর জ্যাকেটের টুপি মাথায় তুলে দিয়ে সাধারণ ওয়ান-টাইম মাস্ক পরে নিল। কারণ, এই বিধ্বস্ত অবস্থায় বাসে উঠলে লোকে তাদের ডাকাত ভেবে পুলিশে দেবে। সুহানা আর জাহিরের দিকে তাকাল না, তবে জাহির ফোন ঘাঁটার ছলে বারবার সুহানাকে দেখছিল। কয়েকবার দেখার পর সে খেয়াল করল যে তাদের দুজনের জ্যাকেট এবং পোশাক প্রায় একই রকমের।

জার্মানির ব্যস্ত শহরগুলোতে সারারাত বাস চলে। সেখানে আগে থেকে কার্ড রিচার্জ করে রাখতে হয় অথবা অনলাইন টিকিট কাটতে হয়, যা বাসে ওঠার সময় মেশিনে দেখাতে হয়। সুহানার কাছে কার্ড ছিল আর জাহিরের টিকিট ছিল অনলাইনে, তবে সেটা তারা কেউ কাউকে জানাল না। কিছুক্ষণ পর আবার বৃষ্টি শুরু হলো এবং বাসের আলো দেখা যেতেই দুজনে উঠে দাঁড়াল। বাস থামলে সুহানা হাতে চেপে রাখা চাকুটা দূরে ছুঁড়ে ফেলে দিল। জাহির সুহানাকে আগে ওঠার সুযোগ করে দিল। সুহানা দ্রুত কার্ড পাঞ্চ করে ভেতরে চলে গেল এবং জাহিরও ফোন শো করে বাসে উঠল। পাশাপাশি হওয়ার সময় সুহানা খুব নিচু স্বরে আবার 'থ্যাঙ্ক ইউ' বলল। বাসে তখন কয়েকজন লোক ছিল, সুহানা একদম পেছনের দিকে গিয়ে মাথা নিচু করে বসল। জাহির খুব বেশি দূরে না গিয়ে সামনের দিকেই আসন নিল।

জাহির তার বন্ধু শিফনকে কল করল— "হ্যালো?"

শিফন ওপাশ থেকে উত্তেজিত হয়ে বলল, "হ্যাঁ, হ্যাঁ! উফ ব্রো, তুই কই?"

"আমি বাসে আছি।"

"ওহ গড! ফাইনালি..."

জাহির শিফনকে তার নামার ঠিকানা বলে দিল। সুহানা তখনও মাথা নিচু করেই বসে ছিল। জাহিরের স্টপেজ আসতেই সে নেমে পড়ল এবং বাইরে দাঁড়িয়ে সুহানার দিকে তাকাল। সুহানা সেটা খেয়াল করে অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে নিল। জাহির তখন দৃষ্টি সরিয়ে নিল। ঠিক সেই সময় শিফন ছুটে এসে তাকে জড়িয়ে ধরল এবং বলল, "ওহ ব্রো! আই প্রমিস ইউ, আর কোনোদিন তোকে একা ফেলে যাব না। সরি ইয়ার!"

জাহির আর কিছু না বলে শিফনকে সাথে নিয়ে হাঁটা দিল। এদিকে সুহানাও নির্দিষ্ট গন্তব্যে নেমে পড়ল। পাঁচিলের কাছে এসে সে একবার দেখে নিল আশেপাশে কোনো কুকুর আছে কি না। চারপাশ জনশূন্য দেখে সে বেশ ক্ষিপ্রতার সাথে বাঁদরের মতো ঝুলে লাফিয়ে পাঁচিল টপকে ভেতরে ঢুকে পড়ল। জানালার কাঁচে হিসাবমতো টোকা দিতেই ফিনা সজাগ হয়ে উঠল এবং দ্রুত জানালা খুলে দিল। সুহানা ভেতরে ঢুকেই সাবধানে জানালা আটকে দিল।

ফিনা সুহানার পিঠে একটা মৃদু কিল বসিয়ে দিয়ে বলল, "তোর কি একটুও ভয় লাগে না রে?"

সুহানা ব্যথায় কুঁকড়ে উঠে বলল, "উফ্, লেগেছে তো আমার!"

ফিনা অভিযোগের সুরে বলল, "জানিস, আমাকে একা একা ওয়াশরুমে যেতে হয়েছে? আমার যে কত ভয় লাগছিল!"

সুহানা হাসতে হাসতে উত্তর দিল, "না গেলে তো আর এই মাসে রাস্তায় বসতে হতো।"

ফিনা শুধু বলল, "হুম।"

আসল কথা হলো, সুহানা সেখানে কোনো মারপিট দেখতে যায়নি, বরং দুজন মহিলা স্টাফের সাথে খাবার ডেলিভারি দিতে গিয়েছিল; আর সেখানেই ঘটেছিল ওই লঙ্কাকাণ্ড। ওদিকে জাহিররাও রুমে ঢুকে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল। দুই প্রান্তের দুই ঘরে সুহানা আর জাহির ফ্রেশ হয়ে লাইট বন্ধ করে বিছানায় শুয়ে পড়ল। সুহানা একবার সেই ছেলেটির কথা ভাবল, কিন্তু পরক্ষণেই নিজেকে সামলে নিয়ে চোখ বন্ধ করল।

অন্যদিকে জাহিরের অবস্থা ভিন্ন। সে চোখ বন্ধ করলেই সুহানার মুখ আর তার সাথে কাটানো মুহূর্তগুলো বারবার মনে পড়ছিল। সে নিজের হাতের দিকে তাকিয়ে থাকল—এই হাত দিয়েই সে তাকে ছুঁয়েছিল। এপাশ-ওপাশ করেও তার চোখে ঘুম এল না। শেষমেশ মন ঘোরাতে সে বিছানা ছেড়ে উঠে পড়ল এবং টেবিল থেকে এল. জে. শেন-এর 'হ্যান্ডসাম ডেভিল' বইটি নিয়ে পড়তে বসল।

সেদিন আর কেউ স্কুলে গেল না; অসময়ে বৃষ্টিতে ভেজার কারণে দুজনেই জ্বরে ভুগল। পরদিন সকালে জাহির স্কুল বাসের জন্য অপেক্ষা করছিল। তার সাথে হোস্টেলের আরও অনেক ছেলেই ছিল—সবার পরনে লাল প্যান্ট, সাদা শার্ট, লাল ব্লেজার আর লাল টাই। কাঁধে লেদারের ব্যাগ ঝুলিয়ে সবাই দাঁড়িয়ে আছে। জাহির আগের দিনের ম্যাচের গল্প শুরু করেছে আর বাকিরা মন দিয়ে তা শুনছে ও হাসাহাসি করছে। অন্যদিকে গার্লস স্কুলের মেয়েরা দাঁড়িয়ে মন্ত্রমুগ্ধের মতো জাহিরকে গিলছে।

বাস থামতেই সবাই একে একে উঠে পড়ল। জাহির সিটে গিয়ে বসার পর বন্ধুদের সাথে আগের অসম্পূর্ণ আড্ডায় মেতে উঠল। ড্রাইভার বাস ছাড়ার ঠিক আগেই দুজন হুড়মুড় করে বাসে উঠে এল। তারা হাঁপাতে হাঁপাতে বলল, "সরি সরি আঙ্কেল!"

ড্রাইভার হেসেই বাস ছেড়ে দিলেন। ফিনা একটা সিটে বসে পড়ল, কিন্তু আর কোনো জায়গা খালি না থাকায় সুহানা দাঁড়িয়ে রইল। সে নিজের ব্যাগটা ফিনার কাছে দিয়ে দিল। স্কুলের কয়েকজন মেয়ে সুহানাকে দেখে হাসাহাসি করল এবং তাদের মেল ফ্রেন্ডদের ইশারা করতেই তারা সুহানার দিকে এগিয়ে এল। তারা সামনে থেকে সরে যেতেই জাহিরের নজর সরাসরি গিয়ে পড়ল সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মেয়েটির দিকে। জাহির সোজা হয়ে বসল এবং চোখ বড় বড় করে তাকাল। সে কি স্বপ্ন দেখছে? নাহ, স্বপ্ন নয়—একদম সত্যি! সেই রাতের মেয়েটিই তো! চোখ, নাক, গাল, ঠোঁট—সব হুবহু এক। জাহির আবার ঘোরের মধ্যে চলে গেল। মেয়েটির চুল খুব বেশি বড় নয়, কাঁধ পর্যন্ত ছোট ছোট চুলগুলো বাতাসের তালে দুলছে। জাহির তাকে পা থেকে মাথা পর্যন্ত খুঁটিয়ে দেখল—নিতান্তই ছোট এক মেয়ে, তাদের স্কুলেরই গার্লস সেকশনে পড়ে।

সুহানা চুপচাপ দাঁড়িয়ে ছিল। তখনই কানে এল বিদ্রূপাত্মক কিছু কথা— "শাউ, শ্লাঙে" ( "দেখ নাগিন")। সুহানা সব শুনল কিন্তু কিছু বলল না। ফিনা প্রতিবাদ করতে চাইলেও সুহানা তাকে থামিয়ে দিয়ে চুপচাপ বসে থাকতে বলল। সুহানার কোনো প্রতিক্রিয়া না পেয়ে ছেলেরা আরও বিরক্ত হলো এবং নানান আজেবাজে কথা বলতে শুরু করল। এদিকে একজনের রাগ তখন ক্রমশ বাড়ছে।

শেষমেশ দুজন ছেলে উঠে এসে সুহানার পেছনে দাঁড়াল এবং তার চুলে আলতো করে হাত দিল। একজন উপহাস করে জিজ্ঞেস করল, "হাস্ট দু গিফট্?" ("বিষ আছে তোমার?")। অন্যজন হাত বাড়াতেই সুহানা বিদ্যুতের গতিতে ঘুরে দাঁড়িয়ে তার হাত জাপটে ধরল। 'রিস্ট লক' টেকনিক ব্যবহার করে সে নিমেষেই ছেলেটির হাত উল্টো দিকে দুমড়ে দিল। ব্যথায় ছেলেটি আর্তনাদ করে ওঠার আগেই সুহানা তার শরীরের পুরো ভর দিয়ে একটি শক্তিশালী 'ফ্রন্ট কিক' সরাসরি তার বুকে বসিয়ে দিল। সেই লাথির চোটে ছেলেটি ছিটকে গিয়ে বাসের মেঝেতে আছাড় খেয়ে পড়ল—একেবারে জাহিরের পায়ের কাছে। জাহির বিস্ময় নিয়ে নিচে কাতরাতে থাকা ছেলেটির দিকে তাকিয়ে রইল।

ঠিক সেই মুহূর্তে দ্বিতীয়জন সুহানার দিকে তেড়ে আসতে চাইল। কিন্তু সুহানা তাকে সেই সুযোগ দিল না। সে তড়িৎ গতিতে নিচু হয়ে ছেলেটির আক্রমণ এড়িয়ে গেল এবং এক ঝটকায় তার চুল মুঠো করে ধরল।‘হেড ম্যানিপুলেশন’ প্রয়োগ করে সে ছেলেটির মাথাটি বাসের লোহার রড সাথে সজোরে ঠুকে দিল। মুহূর্তের জন্য ছেলেটি চিৎকার করলো, ছেলেটি যখন ব্যথায় নুইয়ে পড়ল, তখনই সুহানা তার এক পা দিয়ে ছেলেটির পায়ে ল্যাং মারল এবং শরীরের ওপরের অংশ দিয়ে সজোরে নিচের দিকে চাপ দিল।ছেলেটি যখন ব্যথায় নুইয়ে পড়ল, তখনই সুহানা তার এক পা দিয়ে ছেলেটির পায়ে ল্যাং মারল এবং শরীরের ওপরের অংশ দিয়ে সজোরে নিচের দিকে চাপ দিল।

পুরো বাস এক নিস্তব্ধতায় ডুবে গেল। সুহানার ক্ষিপ্রতার সামনে সেই দুই উদ্ধত যুবক এখন যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছে তাদের উস্কে দেওয়া মেয়েগুলো চুপ করে গেলো। সুহানা শান্ত ভঙ্গিতে নিজের ইউনিফর্ম ঠিক করে আবার আগের জায়গায় ফিরে আসলো, নিচে পরে থাকা ছেলেটির জায়গা ফাঁকা থাকায় সে বসল,তার হাব ভাব যেন কিছুই হয়নি।

সুহানার প্রতি জাহিরের কৌতূহল ক্রমেই বাড়তে লাগল। একসময় সে বুঝতে পারল, সুহানার প্রতি তার এক ধরণের টান তৈরি হয়েছে। প্রথমে সে সুহানাকে মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলতে চাইলেও পারল না; মেয়েটি যেন তার চিন্তায় স্থায়ীভাবে আসন গেড়ে বসল। রাস্তার ধারের লাইব্রেরিতে খোঁজখবর নেওয়া থেকে শুরু করে, বিকেলে হোস্টেলের সামনে প্র্যাকটিস শেষে কিছুটা দূরে দাঁড়িয়ে থাকা—নানাভাবে সে সুহানার ওপর নজর রাখত। এই সময়ে সে সুহানার অনেকগুলো ছবিও সংগ্রহ করেছিল।

নিজের কাজে নিজেই অবাক হতো সে। কিন্তু ধীরে ধীরে এই লুকোচুরি খেলায় সে বেশ আনন্দ পেতে শুরু করল। সুহানাকে নিয়ে যারা আজেবাজে কথা বলেছিল, জাহির তাদের ওপর প্রতিশোধ নিতেও ছাড়েনি। একজনকে ওয়াশরুমের লাইট বন্ধ করে বস্তা চাপা দিয়ে উত্তম-মাধ্যম দিয়েছিল, আর অন্য একজনের দরজায় হাত পিষে চারটে আঙুল ভেঙে দিয়েছিল। তাকে চুপিচুপি দেখা, অনুসরণ করা, এমনকি মাঝে মাঝে ড্রোন দিয়ে তার রুমে উঁকি মারা—জাহির কত কিছুই না করেছে! তখনও সে ভালোবাসার প্রকৃত অর্থ উপলব্ধি করতে পারেনি। সেই উপলব্ধিটা হয়েছিল অন্য একদিন।

এক রবিবারে জাহির দেখল সুহানা একা বের হয়েছে, তার হাতে লাল কাগজে মোড়ানো একটি উপহার। জাহির পকেট হাতে দিয়ে দুলতে দুলতে ফুটপাতে এসে দাঁড়াল। সুহানা বের হতেই সে নিঃশব্দে তাকে অনুসরণ করতে লাগল। কিছুদূর যাওয়ার পর সুহানা একটি ছোট পার্কে ঢুকল এবং জাহিরও আড়ালে থেকে ভেতরে প্রবেশ করল। সুহানা একটি বেঞ্চের ওপর গিফটটা রেখে কারও জন্য অপেক্ষা করতে লাগল। অনেকটা সময় পেরিয়ে গেলেও কেউ এল না। সুহানা ঠায় বসে রইল; জাহিরের মনে সন্দেহ জাগলেও সে ধৈর্য ধরে আড়ালেই রয়ে গেল।

সন্ধ্যা নেমে এল। চারপাশের গাছগাছালি থেকে পাখির ডাক শোনা যাচ্ছে। সুহানা ঘড়ি দেখে নিল—এখন ৬টা ১৯ মিনিট। সে বারবার গেটের দিকে তাকাচ্ছে কিন্তু কেউ নেই, সবাই একে একে বাড়ির দিকে চলে যাচ্ছে। জাহির আড়ালে থাকায় সুহানা তাকে দেখতে পাচ্ছিল না।

অনেকটা সময় পার হয়ে যাওয়ায় জাহিরের সন্দেহ আরও দৃঢ় হলো—এতক্ষণ ধরে মেয়েটা আসলে কার জন্য অপেক্ষা করছে? ঠিক তখনই লম্বা স্কার্ট পড়া এই দেশীয় দেখতে একটি মেয়ে দৌড়ে সুহানার সামনে এল। সুহানা তাকে দেখেই জড়িয়ে ধরল, যদিও মেয়েটি শান্ত ছিল কিন্তু পাল্টা জড়িয়ে ধরল না।

"হ্যাপি বার্থডে টু ইউ!"

"হুম।"

সুহানা সেই লাল কাগজে মোড়ানো উপহারটি মেয়েটির হাতে তুলে দিল এবং সে সেটি গ্রহণ করল।

মেয়েটি কাঁদতে কাঁদতে বলল, "আমায় মাফ করিস সু..."

"আরে ছাড়, ইটস ওকে। বাদ দে ওসব।"

মেয়েটি কান্নাভেজা কণ্ঠে বলতে লাগল, "আমি মম কে অনেক বলেছি, কিন্তু মম তোকে ইনভাইট করতে চাইল না। ওখানে সবাই আছে, শুধু তুই নেই। মম যেন কেমন হয়ে গেছে! তোর মা-বাবার ব্যাপারে হয়তো জেনে গেছে, তাই তোকে এড়িয়ে চলতে বলেছে। ওখানে আমাদের ক্লাসের ম্যাম, স্যার, ক্লাসমেটরা এমনকি ফিনাও আছে—শুধু তুই নেই। প্লিজ আমাকে মাফ করে দিস, আই অ্যাম সরি..."

সুহানা সব শুনে মৃদু হেসে বলল, "আরে ওসব বাদ দে। ওটা কোনো ব্যাপারই না। আচ্ছা, সবাই যখন ওখানে আছে, তবে তুই এখানে কেন এলি?"

"ওহ, এই নে কেক! আমি সবার চোখ ফাঁকি দিয়ে তোর জন্য লুকিয়ে এনেছি। ওখানে সবাই কেক খাচ্ছে, তুই কেন পাবি না? আমি মাকে মিথ্যে বলে বাইরে এসেছি, আমাকে এখনই ফিরতে হবে।"

"যা যা, এনজয় কর। কিপ ইট আপ!"

"সরি ইয়ার।"

"যা এখন।"

মেয়েটি দৌড়ে চলে গেল। সুহানা হাসিমুখে তার চলে যাওয়া দেখল। মেয়েটি পার্ক থেকে বেরিয়ে যেতেই সুহানা একা বেঞ্চে বসে পড়ল। জাহির কিছুটা এগিয়ে এল। সুহানার ঠোঁটের হাসিটা ধীরে ধীরে মিলিয়ে যেতে লাগল। সে প্লাস্টিক থেকে কেকটা বের করল এবং সেটির দিকে তাকিয়ে কেঁদে উঠল। পুরো পার্ক একদম ফাঁকা, কেউ নেই। জাহির সামনে এগিয়ে যেতে চেয়েও থমকে গেল। সে ভাবছিল—মেয়েটি কাঁদছে কেন? ওর মা-বাবার কী হয়েছে? সুহানা কেকটা খেল না, বরং আবার প্লাস্টিকে ঢুকিয়ে রাখল। সে হাত দিয়ে মুখ ঢেকে ফুঁপিয়ে কাঁদতে লাগল।—বেচারা মেয়েটাকে দাওয়াত দিলে এমন কী ক্ষতি হতো? ওর মা-বাবা যা-ই করে থাকুক, তাতে এই মেয়েটার দোষ কোথায়?---

সুহানার অবস্থা দেখে জাহিরের মনে খুব মায়া হলো। সে শুনেছে মেয়েটি অনাথ তার কেউ নেই। তার সাথে থাকা বন্ধুটিও । কিছুক্ষণ পর সুহানা উঠে দাঁড়াল এবং তার লম্বা হাতাওয়ালা পোশাক দিয়ে ঘষে ঘষে চোখ-মুখ মুছে নিল। জাহির দ্রুত গাছের আড়ালে সরে গেল। সুহানা হাতের প্লাস্টিকটি নিয়ে পার্ক থেকে বেরিয়ে গেল; এটি শিশুদের পার্ক হওয়ায় বেশিক্ষণ খোলা থাকে না। জাহিরও দ্রুত বেরিয়ে এসে তার পিছু নিল।

বাইরে রাখা নিজের রেঞ্জার সাইকেলটি নিয়ে সে দূর থেকে সুহানাকে অনুসরণ করতে শুরু করল। কিছুদূর যাওয়ার পর রাস্তার কয়েকটি শিশু সুহানার দিকে এগিয়ে এল। সে হাসি মুখে তাদের সাথে কথা বলল এবং হাতের প্লাস্টিকটি তাদের দিয়ে দিল। বাচ্চারা খুশি হয়ে তাকে 'হাই-ফাইভ' দিয়ে চলে গেল, আর সুহানাও সামনের দিকে পা বাড়াল।

সেদিন থেকেই সুহানার প্রতি জাহিরের মনে সফট কর্নার তৈরি হলো, যা ধীরে ধীরে গভীর অনুরাগে রূপ নিল। কখন যে সে ভালোবেসে ফেলল, তা নিজেও বুঝতে পারেনি। সবাই যেহেতু একে ভালোবাসা বলে, তাই সেও ধরে নিয়েছে এটাই ভালোবাসা। তবে এই অনুভূতির প্রকৃত স্বরূপ তার অজানাই রয়ে গেছে, আর কোনো ভাষা দিয়ে এটি ব্যাখ্যা করার ক্ষমতাও তার নেই। আফ্রিদি দূরে ছিল বলে জাহির তাকে কিছু জানায়নি, কারণ সে জানলে নিশ্চিত মজা করত।

স্কুল জীবনের সেই একটি বছর সুহানাকে নিয়ে ভাবতে ভাবতেই কেটে গেল জাহিরের। দেখতে দেখতে সে আঠারো পেরিয়ে কলেজ জীবনে পা রাখল। সে দূর থেকেই সবসময় সুহানাকে দেখে এসেছে; তবে তাকে আলাদা করে রক্ষা করার প্রয়োজন পড়েনি, কারণ সুহানা যথেষ্ট শক্তিশালী এবং সে নিজেই সব সামলে নিতে পারে।

সুহানার চশমা পরার কারণও ছিল স্বয়ং জাহির। সেদিন স্টেটে তার সিলেকশন ট্রায়াল ছিল, কিন্তু ভালো কোনো শট নিতে পারছিল না সে। হুট করে বল পেতেই জাহির ঝাঁপিয়ে পড়ে এবং একের পর এক গোল করে ২-৩ ব্যবধানে ম্যাচ জিতিয়ে দেয়। জয়ের আনন্দে সে সামনে থাকা একটি বল অকারণে জোরে লাথি মেরেছিল, যা সরাসরি গিয়ে লাগে মাঠের পাশ দিয়ে দৌড়ে যাওয়া মেয়েটির মাথায়। এরপর সুহানাকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয় এবং তার চোখে বড় ধরণের ক্ষতি হয়। জাহির বাইরে থেকে সবটা দেখেছিল; আফসোস আর অনুশোচনায় তার কত রাত যে ঘুম হয়নি, তার হিসেব নেই। পরে সে শুনেছিল যে সুহানা সেই ছেলেটিকে অনেক খুঁজেছিল, কিন্তু কেউ তার হদিস দেয়নি। ছেলেদের স্কুল আলাদা হওয়ায় সুহানা চাইলেও কিছু করতে পারেনি।

জাহির বলতে লাগল, "প্রথমবার পার্টিতে ওকে দেখে আমি অবাক হয়ে গিয়েছিলাম। সেদিনই ও প্রথম আমার মুখ দেখেছিল, তার আগে মনে হয় কোনোদিন দেখেনি—নইলে নির্ঘাত চিনতে পারত। সেদিন ওর চোখে ছিল তীব্র রাগ, আর আমি তো ননসেন্সর মতো কাজ করে বসেছিলাম... ওকে পেতে আমি কী না করেছি! কাল সবাই জোর করেছিল বলেই ও বিয়েটা করেছে, নাহলে ও জীবনেও কাউকে বিয়ে করত না।"

সে আকুল হয়ে বলল, "আফ্রিদি, তুই ওকে আমার কাছে এনে দে... আমি আর থাকতে পারছি না, বড্ড কষ্ট হচ্ছে রে!"

আফ্রিদি কী বলবে ভেবে পেল না, সে নিজেই সক হয়ে গিয়েছিল। জাহির কোনো মেয়ের জন্য এভাবে পাগল হয়ে আছে—এটা তার কাছে অকল্পনীয়। কারণ জাহিরকে অসংখ্য মেয়ে প্রেমের প্রস্তাব দিয়েছে, তাকে কাছে পেতে চেয়েছে, এমনকি তার জন্য অনেকে মারামারি পর্যন্ত করেছে, অথচ সেই জাহির আজ একজনের জন্য এভাবে ভেঙে পড়েছে।

আফ্রিদির মনে পড়ে গেল কলেজের প্রথম দিনের কথা। একটি মেয়ে জাহিরের গায়ের ওপর ধাক্কা খেয়েছিল এবং তার ব্যাগটি নিচে পড়ে গিয়েছিল। জাহির তখন আফ্রিদির সাথে গল্পে মশগুল ছিল, সে মেয়েটিকে কিছুই বলেনি বরং মেয়েটিই এসে তার সাথে ধাক্কা খেয়েছিল। জাহির নিজের জায়গায় স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে থাকলেও মেয়েটি তার দিকে তাকিয়ে হাসল এবং মনে মনে লজ্জা পেল। মেয়েটি ভেবেছিল জাহির হয়তো নিচ থেকে ব্যাগটি তুলে তার হাতে দেবে, কিন্তু জাহির তেমন কিছুই করল না। মেয়েটি কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে শেষমেশ নিজেই ব্যাগটি তুলে নিল।

মেয়েটি জিজ্ঞেস করল, "আপনি একটা 'সরি' তো বলতেই পারেন, তাই না?"

জাহির কথার মাঝখানে তার দিকে তাকাল এবং বিরক্ত হয়ে বলল, "হোয়াট?"

"আমাকে ধাক্কা দিলেন যে..."

জাহির নিজের দিকে আঙুল তুলে বলল -“আমি ?”

মেয়েটি মাথা নাড়িয়ে উত্তর দিলো -“ইয়েস”

জাহির অন্য দিকে তাকিয়ে চুলে হাত বুলিয়ে বলল -“নো ওয়ে,আপনি এসে ধাক্কা মেরেছেন”

মেয়েটি দ্রুত বলল -“ওকে ওকে সরি”

জাহির সেটা শুনে ছন্দ কাটল একটু – “ভাবছি কি যে করি…?

গলায় দেবে দড়ি,

সরে যাও আমি মরি”

মেয়েটি বুঝল না বাংলা ভাষা আফ্রিদি মুখ চেপে হাসছে দেখে মেয়েটি ভুরু কুঁচকে জানতে চাইলো -“এক্সকিউস মি? আমাকে কিছু বললেন”

জাহির উলটো দিকে ঘুরে ঠোঁট চেপে হেসে বলল --“নাথিং”

মেয়েটি দুইপা এগিয়ে এসে নরম করে বলল -“ক্যান আই গেট ইউর নম্বর?”

"চল হাট!"

বলেই জাহির আবার গল্পে মনোযোগ দিল। তখন খেলার আড্ডা জমে উঠেছে, কার কী পারফরম্যান্স সব তথ্য তার নখদর্পণে। মেয়েটি অপমাণিত হয়ে সেখান থেকে চলে গেল। আফ্রিদি হেসে উঠে বলেছিল, "একটা 'সরি' বললে কী হতো রে?"

জাহির উত্তর দিয়েছিল, "তোর খুব দরদ উথলে উঠলে তুই গিয়ে ওর পা ধরে গড়াগড়ি খা, যা!"

ফ্রেন্ড সার্কেলের সবাই তখন হোহো করে হেসে উঠল। এমন অসংখ্য ঘটনা আছে যেখানে জাহির সবাইকে 'চল হাট', 'ফোট', 'সর', 'হুশ হুশ' বলেই কাটিয়ে দিয়েছে। কেউ বেশি বিরক্ত করলে সে সরাসরি তার বাবার কাছে গিয়ে নালিশ ঠুকে দিত।

সেই ছেলেটা মনে মনে এতসব ছক কষে রেখেছিল যে তার সবচেয়ে কাছের বন্ধু হয়েও আফ্রিদি বিন্দুমাত্র টের পায়নি; জাহির যে ভীষণ ধূর্ত আর চতুর একজন মানুষ। আফ্রিদির মনে মনে রাগ হলো— তাকে জানালে এমন কী ক্ষতি হতো? তবে এই হিসাব সে পরে নেবে, আপাতত কিছুই বলল না।

জাহির বিছানা থেকে নেমে পড়ল, কান্নায় তার চোখ-মুখ লাল হয়ে আছে। সে জুতো না পরেই সরাসরি ওয়াশরুমের দিকে এগিয়ে গেল। ঘরের বাকি সবাই স্তব্ধ হয়ে বসে আছে; তারা কখনো কল্পনাও করেনি যে বড়দার মতো মানুষের প্রেম কাহিনী তাদের এভাবে শুনতে হবে, তাও আবার এই পরিস্থিতিতে। জাহির ঠিক করেছে আজ রাতেই সে চলে যাবে।

এদিকে ডেনিয়েল বারে বসে মদ্যপান করছে, ইদানীং তার মাথার ঠিক নেই। সে ফিনাকে ভীষণভাবে মিস করছে এবং তার জন্য দুশ্চিন্তাও হচ্ছে— মেয়েটা হঠাৎ এভাবে কোথায় উধাও হয়ে গেল! ওর কোনো বিপদ হয়নি তো? শুরুতে ফিনার ওপর রেগে থাকলেও এখন ডেনিয়েলের মন মানছে না; সে বারবার ফোন করছে কিন্তু ওপাশ থেকে সুইজড অফ আসছে। সে বিড়বিড় করে বলছে, "বেবি প্লিজ ফিরে এসো, আমি আর তোমাকে কষ্ট দেব না। আই অ্যাম সরি।"

তুহিনা নিজের ঘরে অবিরাম কেঁদে চলেছে এবং সবকিছুর জন্য নিজেকেই দায়ী করছে। ফিনা একদম চুপচাপ হয়ে গেছে; সে কারো সাথে কথাও বলছে না, এমনকি কাঁদছেও না। রুহানী অনেক চেষ্টা করেও তার থেকে কোনো উত্তর বের করতে পারল না।

বাড়ির বাইরের দিকটা একদম থমথমে। তুহিনার মা-বাবা সব জিনিসপত্র গুছিয়ে নিচে নামিয়ে এনেছেন। তানি জ্ঞান হারিয়ে পড়ে আছে তার মা ডুকরে কাঁদছে। বিহান সব জায়গায় খোঁজ নিয়েছে কিন্তু কোনো সন্ধান পেল না।

জাহির ওয়াশরুমে ঢুকে মুখে পানির ঝাপটা দিচ্ছে। রাগে তার শরীর জ্বলছে; সে সজোরে এক লাথি মেরে বেসিনটা ভেঙে চুরমার করে দিল — "প্লিজ জান, ফিরে এসো!"

চলবে….

(গল্পের সমস্ত চরিত্র,কাল সবই কাল্পনিক সকলে সেই ভাবেই নেবেন, লেখার মাঝে কোনো বানান ভুল থাকলে মাফ করবেন)

#প্রেমের_আলোড়ন

#md_suhan_joy

#midnight_tales_by_joy

Thank You🍀

(Don’t copy without permission)

Enjoy your reading 🎀

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৫০তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন