গল্প: প্রেমের আলোড়ন
লেখক:এমডি সুহান জয়
পেজ: Midnight Tales by Joy
পর্ব: ৫৯
[বিশেষ দ্রষ্টব্য-"এই গল্পটি মূলত গভীর প্রণয় ও সূক্ষ্ম জীবনবোধের এক অনন্য সংমিশ্রণ। এখানে যেমন ফুটে উঠেছে হৃদয়ের তীব্র রোমান্টিক অনুভূতি, তেমনি সমান্তরালভাবে উঠে এসেছে কঠোর সামাজিক বাস্তবতা এবং মানুষের ব্যক্তিগত জীবনের টানাপোড়েন ও নিরন্তর সংগ্রামের চিত্র। আশা করি, অনুভূতির এই বিচিত্র রঙ আপনাদের স্পর্শ করে যাবে।"]
সকালের নাস্তার টেবিলে জাহাঙ্গির সাহেবের কথায় আচমকা এক নিস্তব্ধতা নেমে এল। বিহান জানাল — "ঝিলে একটা লাশ পাওয়া গেছে।"
খবরটা শুনে জাহির আর আফ্রিদি দুজনেই চমকে উঠল। জাহির ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করল — "ডেডবডি?"
— "হ্যাঁ "
— "আমাদের দাদুর ঝিলে?" আফ্রিদির কণ্ঠে বিস্ময়।
— "হ্যাঁ।"
সাবেরা বেগম ভয়ে শিউরে উঠলেন। আতঙ্কিত স্বরে জিজ্ঞেস করলেন — "জলে ডুবে মারা গেছে নাকি?"
জাহাঙ্গির মাথা নেড়ে গম্ভীর গলায় বলল — "না, এটা মার্ডার। খুনি ডান হাতটা কেটে দড়ি দিয়ে গলায় বেঁধে দিয়েছিল। দীর্ঘক্ষণ পানিতে থাকায় শরীরের মাংস সাদা হয়ে পচে গেছে। ঝিলের চাষের মাছেরা শরীরের প্রায় ৮৫ শতাংশ মাংস খেয়ে ফেলেছে। পচনের কারণে কোনো পরিচয় উদ্ধার করা যাচ্ছে না, পানিতে সমস্ত প্রমাণও ধুয়ে মুছে গেছে।"
আফ্রিদি কৌতূহল নিয়ে প্রশ্ন করল — "লাশ ভেসে ওঠার কথা, এতদিন পর পাওয়া গেল কেন?"
বিহান শিউরে উঠে দৃশ্যটা কল্পনা করল — "না , তিনটে ভারী পাথর মাথা, বুক আর পায়ে বেঁধে ডুবিয়ে দেওয়া হয়েছিল। মোটা দড়িটা পচে ছিঁড়ে যাওয়ায় আজ লাশটা ভেসে উঠেছে। দৃশ্যটা ভয়াবহ!"
রুবাইদার গা গুলিয়ে এল এসব শুনে। জাহাঙ্গীর সাহেব পরিস্থিতি সামলাতে বললেন — "আচ্ছা আচ্ছা, বাদ দাও এসব। যা হওয়ার হয়ে গেছে। আমাদের তো কোনো সমস্যা হবে না।"
জাহির চুপচাপ বসে ফোনে ক্যালেন্ডারের ডেট নোটিফিকেশন চেক করছিল। জাহাঙ্গির চারিদিকে একবার চোখ বুলিয়ে জিজ্ঞেস করল — "মেয়েগুলো কই? বেলা তো অনেক হলো, এখনো নিচে নামল না কেন?"
বিহান হেসে উত্তর দিল — "কাল রাতে তো সব এক জায়গায় ছিল। মনে হয় সারারাত গল্প করেছে। মেয়েদের ওই তো স্বভাব, লোকের কথা নিয়ে চর্চা করা!"
জাহাঙ্গীর সাহেব চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে হাসলেন — "যাক, ঘুমাতে দাও। একজন উঠলেই তো এদিক-ওদিক ছুটবে।"
স্বামীর কথায় রুবাইদা প্রতিবাদী হয়ে উঠলেন — "লোকের কথা নিয়ে চর্চা করি মানে? কী বলতে চাইছো তুমি?"
— "কেন, তাই তো করো!" বিহন সাহেবের সোজাসাপ্টা উত্তর।
— "আহা! তুমি যেন কত বড় সাধু! অফিসে কোন মেয়ে কাকে পছন্দ করে, সেই সব নিয়ে তো অফিস গ্রুপে বেশ রসিয়ে রসিয়ে কথা বলো। আমাদের নামে অপবাদ দিচ্ছ কেন?"
গরম চা খেতে গিয়ে বিপত্তি বাঁধল বিহানের; রুবাইদার কথা শুনে সে জিভ পুড়িয়ে ফেলল। সাবেরা বেগম আর জাহাঙ্গীর সাহেব মুখ টিপে হাসছেন। জাহাঙ্গির উঠে গেলেন বাইরের হাওয়া খেতে, সাবেরা কে নাযে গেলেন হাত ধরে।
বিহান আতঙ্কিত কণ্ঠে বলল— "কী সব বলছো রুবা..."
এতক্ষণে রুবাইদার খেয়াল হলো যে তিনি ভুল জায়গায় ভুল কথা ফাঁস করে দিয়েছেন, আর সেটা শুনে ফেলেছে জাঁহির আর আফ্রিদি।
জাহির ডাকলো — "চাচু..."
বিহান বিড়বিড় করলেন — "ব্যাস, হয়েছে আমার!"
বিহান ভয়ার্ত দৃষ্টিতে জাহিরের দিকে তাকাল। জাহির ঠোঁট কামড়ে হালকা হেসে ভ্রু নাচিয়ে জিজ্ঞেস করল — "কার সাথে কার চলে সব খবর আছে তোমার? তোমার নিজের কারোর সাথে কিছু নেই তো?"
বিহান কাঁচুমাচু হয়ে বলল — "নাহ্ বাপ, এই বয়সে ওসব নেই।"
জাহিরের দুষ্টুমি কন্ঠে বলল— "ইচ্ছে থাকলে উপায় হয়!"
রুবাইদা এবার জাহিরের দিকে তেড়ে এলেন — "এই বয়সে কি আমার সংসার ভাঙবি? তোর কু-বুদ্ধি দেওয়া বের করছি আমি!"
______________________________
জাহির পরনে একটি হাফপ্যান্ট আর খালি গায়ে তার অতি আদরের ঘোড়া ‘ব্লিটজ’কে গোসল করাচ্ছে। অনেক দিন পর নিজের মালিককে কাছে পেয়ে ব্লিটজও ভীষণ আনন্দিত; তার প্রতিটি আচরণে সেই খুশির বহিঃপ্রকাশ ঘটছে। জাহির অত্যন্ত মনোযোগ দিয়ে ঘোড়ার পায়ের লোহার নালগুলো পাল্টে দিচ্ছে। সকালের রোদের তির্যক আলো এসে জাহিরের সুঠাম ও ফর্সা শরীরে পড়ায় তা চমকাচ্ছে। পেশিবহুল শরীরের ওপর জল আর রোদের খেলা এক অদ্ভুত দৃশ্য তৈরি করেছে।
আফ্রিদি আর জাহির দুজনেই একটু আগে জিম শেষ করে মাঠে নেমেছে। গোসল করার সময়টুকুও হয়নি, শরীরচর্চার সেই উত্তেজনা নিয়েই তারা এখানে চলে এসেছে। আফ্রিদি এই সুযোগে জাহিরের কয়েকটা দারুণ ছবি তুলে সোশ্যাল মিডিয়ায় পোস্ট করে দিল। পোস্ট করা মাত্রই কমেন্টের বন্যা বয়ে গেল; সবাই জাহিরকে একবার সরাসরি লাইভে দেখার জন্য আবদার করতে শুরু করল। কিন্তু জাহির এসবে ভীষণ নারাজ। তার গম্ভীর চাহনি দেখেই আফ্রিদি লাইভে আসার পরিকল্পনা বাতিল করে দিল। পাশের বিশাল সুইমিং পুলের ঢাকনা খুলে পানি পাল্টানোর নির্দেশ আসায় আফ্রিদি সেদিকেই দৌড় দিল।
তৎক্ষণাৎ জাহিরের ফোনটা বেজে উঠল। হাতের পানি ও ময়লা মুছে সে ফোনটা রিসিভ করল। — “হ্যালো?”
ওপাশ থেকে অত্যন্ত মার্জিত এবং ভারী এক কণ্ঠস্বর ভেসে এল — “আসসালামু আলাইকুম।”
জাহির কিছুটা ভ্রু কুঁচকে উত্তর দিল — “ওয়া আলাইকুম আসসালাম।”
— “আমি আপনার পিএ-র সাথে কথা বলেছি। উনিই আমাকে আপনার নম্বরটা দিয়েছেন।”
জাহিরের তখনই রোমানের কথা মনে পড়ল। রোমান জানিয়েছিল যে, দুবাই থেকে একজন প্রভাবশালী শেখ এখানে এসেছেন। তিনি জাহিরের নতুন প্রজেক্ট সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে আগ্রহী। জাহির প্রথমে মানা করে দিলেও শেখ নাছোড়বান্দা ছিলেন; তিনি অন্তত একবার সরাসরি কথা বলতে চেয়েছিলেন। পরে আফ্রিদির জোরাজুরিতেই জাহির কথা বলতে রাজি হয়।
ওপাশ থেকে শেখ পুনরায় নিজের পরিচয় দিলেন — “আমিশেখ হামদান আল-মাখতুম এর তরফ থেকে বলছি। আপনার কাজ সম্পর্কে অনেক শুনে এবং সে ব্যক্তিগতভাবে আপনার প্রজেক্টে আগ্রহী।”
জাহির গম্ভীর কিন্তু পেশাদার স্বরে সংক্ষিপ্ত উত্তর দিল — “ইয়াহ, আই অ্যাম লিসেনিং।”
এবার শেখ হামদান নিজেই ফোনের ওপাশ থেকে বললেন — “জাহির, আপনার পরবর্তী মেগা প্রজেক্ট নিয়ে আমি অনেকদিন ধরেই ভাবছি। আমি চাই এই বিষয়ে আমাদের সরাসরি একটি বৈঠক হোক। আমি কি আজ আপনার আবাসে আসতে পারি?”
শেখ শেখ হামদান আল-মাখতুম কণ্ঠস্বরে এক ধরনের গাম্ভীর্য থাকলেও জাহিরের প্রতি তার অগাধ শ্রদ্ধা স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছিল। জাহির হলো ফুটবল বিশ্বের অন্যতম উজ্জ্বল নক্ষত্র হিসেবে তার নাম এখন সবার মুখে মুখে। সবুজ গালিচায় তার পায়ের জাদুতে যেমন প্রতিপক্ষ কুপোকাত হয়, তেমনি তার ব্যক্তিত্বের আভিজাত্য মানুষকে মুগ্ধ করে।
শেখের বিনয়ী আবদার আর দৃঢ়তা উপেক্ষা করার সাধ্য জাহিরের ছিল না। সে কিছুক্ষণ নীরব থেকে অবশেষে রাজি হলো — “ঠিক আছে । আজ বিকেলের দিকে আমার বাড়িতে আপনার আমন্ত্রণ রইল।”
ফোন রেখে জাহির দীর্ঘশ্বাস ফেলল। আফ্রিদি তখন পুলের ধার থেকে ফিরে এসেছে। জাহির তাকে জানাল — “বিকেলের দিকে শেখ হামদান আল-মাখতুম আসছেন। সব কিছু টিপটপ থাকে তোর দায়িত্ব এটা।”
জাহির নিজের কাজে পুনরায় নিমগ্ন হলো, কিন্তু তার অবচেতনে কোনো এক গভীর চিন্তা বারবার করাঘাত করছিল। একটা খটকা লাগছে, কোনো এক রহস্য তাকে ভাবিয়ে তুলেছে। ঠিক সেই মুহূর্তে ব্লিটজ আচমকা সামনের দুই পা তুলে শূন্যে লাফিয়ে উঠল। জাহির বিদ্যুৎগতিতে ঘোড়াটির গায়ে হাত রেখে তাকে শান্ত করার চেষ্টা করল এবং সামনে তাকাতেই তার বুকটা ধক করে উঠল। সুহানা সামনে ঘাসের ওপর পড়ে আছে।
জাহির এক মুহূর্ত দেরি না করে হন্তদন্ত হয়ে তার কাছে ছুটে গেল। সুঠাম শরীরের সমস্ত পেশি তখন উদ্বেগে টানটান। সে ঘাসের ওপর হাঁটু গেড়ে বসে পড়ে বিচলিত কণ্ঠে ডাকল— “ব্যথা পেয়েছ সুহু? গেট আপ, গেট আপ উজি!”
ব্লিটজ কোনো হিংসুটে স্ত্রীর মতো সুহানাকে দেখে ফোঁস ফোঁস করতে লাগল। সে উগ্র ভঙ্গিতে সুহানার দিকে এগোতে চাইলে জাহির হাত উঁচিয়ে তাকে কড়া ভাষায় থামিয়ে দিল— “ওখানে গিয়ে দাঁড়া! একদম চুপ!”
মালিকের অমোঘ নির্দেশ ব্লিটজ অক্ষরে অক্ষরে পালন করল। রাগে গজগজ করতে করতে সে দূরে গিয়ে দাঁড়াল ঠিকই, কিন্তু তার অগ্নিদৃষ্টি সুহানার ওপর থেকে সরল না। সুহানা বিমূঢ় হয়ে ঘোড়াটির কাণ্ড দেখছিল। জাহির তখন অতি সন্তর্পণে সুহানার হাত-পা পরীক্ষা করছে; কোথাও চোট লাগল কি না তা দেখতে গিয়ে তার নজরে পড়ল সুহানার কনুইটা ছিলে গিয়ে লাল হয়ে আছে।
জাহির ব্যথাতুর স্বরে জিজ্ঞেস করল— “অনেক বেশি লাগছে?”
সুহানা এতক্ষণ ঘোরের মধ্যে ছিল, এবার সে পূর্ণদৃষ্টিতে জাহিরের দিকে তাকাল। আর তাকানো মাত্রই তার গণ্ডদেশ লজ্জায় আরক্তিম হয়ে উঠল। সূর্যের আলোয় ঘামভেজা উন্মুক্ত শরীরে জাহিরের এমন বেহায়া ভঙ্গিতে ঘুরে বেড়ানো দেখে সে দ্রুত চোখ সরিয়ে নিল— ‘অর্ধউলঙ্গো জীব, এমন অর্ধনগ্ন হয়ে কেউ বাইরে ঘোরে!’
সুহানা ধুলোবালি ঝেড়ে উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টা করতেই জাহির তার ছিলে যাওয়া কনুইটা অতি সন্তর্পণে আঁকড়ে ধরল। সুহানা তৎক্ষণাৎ হাতটা সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে ঝামটে উঠল— “ছাড়ুন ! আমার কিছুই হয়নি, লাগেনি আমার।”
জাহির সেই বাধা অগ্রাহ্য করে তাকে আরও নিবিড়ভাবে নিজের কাছে টেনে নিল। তার কণ্ঠস্বরে এখন শাসনের সুর— “মিথ্যে বোলো না। এখানে কেন এসেছো? এই কাঠফাটা রোদে বেরোনোর কী প্রয়োজন ছিল?”
সুহানা মুখ ঘুরিয়ে জবাব দিল— “সবাই এসেছে, তাই আমিও এসেছি।”
জাহিরের ঠোঁটের কোণে সেই পরিচিত বাঁকা হাসিটা ফুটে উঠল। সে সুহানার চোখের দিকে তাকিয়ে ধীরলয়ে বলল— “সবাই তো ওদিকের গার্ডেনে। তুমি বুঝি আমাকে বড্ড মিস করছিলে? তাই আড়াল ভেঙে চুপিচুপি আমার খোঁজেই এখানে এসে আছাড় খেলে?”
সুহানা এবার রাগে ফেটে পড়ল— “আপনি কি এমন কোনো মহৎ মানুষ যে আপনাকে আমি খুঁজতে আসব? আমি অন্তত কোনো অর্ধনগ্ন মানুষকে খুঁজে বেড়াই না!”
জাহির তেরছা হাসল। তার সেই সম্মোহনী হাসিতে সুহানার হৃদস্পন্দন এক মুহূর্তের জন্য থমকে গেল। সে সুহানার আরও কাছে ঘেঁষে দাঁড়িয়ে তপ্ত স্বরে বলল— “নিজের বাড়িতে, নিজের বউয়ের চোখের সামনে ঘুরছি—এতে লজ্জার কী আছে? যদি প্রয়োজন মনে করি, তবে যা অবশিষ্ট আছে তাও খুলে দিতে পারি। তাতে কি তোমার নজর লেগে যাওয়ার ভয় পাচ্ছো, 'উজী'?”
সুহানা বড় বড় চোখ করে তাকাল। জাহিরের এমন নির্লজ্জ উক্তিতে সে রীতিমতো স্তম্ভিত। সে চোখ রাঙিয়ে বলল— “নজর লাগার মতো এমন কী রাজপুত্তুর আপনি শুনি? আর, আমার একটা সুন্দর নাম আছে।”
জাহির এবার সুহানার কানের একদম কাছে মুখ নিয়ে উষ্ণ ফিসফিসানিতে বলল— “নামে ডাকব না? আচ্ছা, তবে কি ‘জান’ বলে ডাকলে তুমি বেশি খুশি হবে?”
সুহানার সারা শরীরে এক লহমায় সহস্র ভোল্টের বিদ্যুৎ খেলে গেল। লজ্জায় আর রাগে তার গাল দুটো লাল হয়ে উঠল। সে সর্বশক্তি দিয়ে জাহিরের পাথরের মতো শক্ত বুকে একটা ধাক্কা দিল। কিন্তু জাহির এক চুলও নড়ল না, বরং সুহানার কোমল হাতটা নিজের তপ্ত হাতের মুঠোয় কয়েদি করে ফেলল।
জাহির রহস্যময় স্বরে বলল— “শোনো নালিশি বেগম, এই যে ব্লিটজ তোমাকে দেখে কেন অমন ফোঁস ফোঁস করছিল জানো? ও অবলা প্রাণী হলেও ঠিক বুঝতে পেরেছে যে ওর মালিকের সবটুকু মনোযোগ এখন অন্য কেউ কেড়ে নিয়েছে। ও তো ঈর্ষায় জ্বলছে, কিন্তু আমার যে 'জানের জান' সামনে দাঁড়িয়ে আছে, সে কেন সারাদিন মুখ ভার করে থাকে?”
সুহানা ঝট করে মুখ ঘুরিয়ে নিল। অভিমানের মেঘ তার চোখেমুখে স্পষ্ট হলেও কণ্ঠে কাঠিন্য ধরে রেখে বলল— “আমি কেন মুখ ভার করতে যাব? আপনি যা খুশি করুন,— আমার, আমার তাতে বয়েই গেছে!”
জাহির এবার দরাজ গলায় শব্দ করে হেসে উঠল। সেই পৌরুষদীপ্ত হাসির শব্দে দুপুরের নিঝুম বাগানের নিস্তব্ধতা কাঁচের মতো টুটে গেল। সে এক পা এগিয়ে সুহানার চিবুকটা আলতো করে ধরে নিজের দিকে ফেরাল। জাহিরের চোখে এখন আর সেই শাসন নেই, সেখানে খেলা করছে এক গভীর মায়া আর তীব্র দুষ্টুমি।
সে চোখ টিপে প্রশ্ন করল— “ওহ! তাহলে আসল ব্যথাটা এখানে? কেউ কি তবে ভীষণ ‘জেলাস’ ফিল করছে?”
সুহানা তড়িৎবেগে চিবুক সরিয়ে নিয়ে বলল— “কিসের জেলাস? আর কাকে নিয়ে জেলাস হতে যাব শুনি?”
— “অবশ্যই আমাকে নিয়ে!” জাহিরের আত্মবিশ্বাসী উত্তর।
— “একদম ফালতু কথা বলবেন না। আমি অন্তত আপনার মতো নই।”
জাহির দমল না, বরং আরও জোর দিয়ে বলল— “না না, তুমি তো আমার ধ্রুবতারা। তুমি আমার মতো হতে যাবে কেন? তুমি তো আমার ‘সুহু’। আচ্ছা, একটা কথা সত্যি করে বলবে?”
সুহানা ভ্রু কুঁচকে তাকাল— “কী কথা?”
— “কাল রাতে যখন রুহানীর ঘরে ছিলে, বালিশটা কি আমার অভাব পূরণ করতে পেরেছিল?”
সুহানা আকাশ থেকে পড়ল— “কোন দুঃখে?”
জাহির হাসতে হাসতে বলল— “আমার দুঃখে!”
সুহানা এবার রীতিমতো বিরক্ত কণ্ঠে বলল— “একদম নয়! আমি কাল রাতে ভীষণ খুশি ছিলাম। এক্সট্রা ঝামেলা বিহীন ঘুম... আহ্, কী শান্তি!”
কথাটা শেষ করেই সুহানা হনহনিয়ে সামনের দিকে পা বাড়াল। জাহির তখনও ঘাসের ওপর দাঁড়িয়ে মিটিমিটি হাসছে। সে চোখের পলকে ব্লিটজের পিঠে চড়ে বসল। মালিকের ইশারা পেয়ে ঘোড়াটি এক দুর্দান্ত ভঙ্গিতে লাফিয়ে উঠল। সুহানা জোর কদমে হেঁটে এগিয়ে যাচ্ছে ঠিকই, কিন্তু জাহির ব্লিটজকে নিয়ে বিদ্যুৎবেগে তার পথ আটকে দাঁড়াল। ঘোড়ার পিঠে বসে থেকেই সে রাজপুত্রের মতো সুহানার দিকে হাত বাড়িয়ে দিল।
সুহানা সেই হাত উপেক্ষা করে পাশ কাটিয়ে বেরিয়ে গেল। জাহিরও নাছোড়বান্দা; সে ব্লিটজকে নিয়ে সুহানার সমান্তরালে চলতে শুরু করল। সুহানা রাগে তেরছা চোখে তাকাতেই জাহির ঠোঁট গোল করে হাওয়ায় একটা চুমু ছুড়ে দিল।
সুহানা মুখ কুঁচকে বলল— “ছি!”
জাহিরও তৎক্ষণাৎ পালটা রসিকতা করল— “ছি-টু!”
সুহানা এবার দৌড় দিল বাড়ির দিকে। জাহিরও ব্লিটজকে নিয়ে তার পিছু পিছু ধাওয়া করল। সামনেই দাঁড়িয়ে আফ্রিদি আর তুহিনা এই অদ্ভুত কাণ্ড দেখছিল। সুহানা পেছনে জাহিরের দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে দৌড়াচ্ছিল, আর ঠিক সেই অসাবধান মুহূর্তেই ঘটল এক চরম অঘটন!
সুহানা খেয়ালই করেনি সে পুলের একেবারে কিনারায় চলে এসেছে। পরক্ষণেই ভারসাম্য হারিয়ে সে সজোরে আছড়ে পড়ল পুলের টলটলে নীল জলে। প্রায় ১০ ফুট গভীর আর বিশাল সেই জলাধারে সুহানা হাবুডুবু খেতে শুরু করল। দুপুরের নিস্তব্ধতা চিরে জলের সেই বিশাল ঝপাৎ শব্দ হলো। সুহানাকে ওভাবে অতর্কিতে পুলের জলে আছড়ে পড়তে দেখে জাহির অট্টহাসিতে ফেটে পড়ল। তার দুর্ধর্ষ হাসির শব্দে চারিদিকের বাতাসও কেঁপে উঠল। সুহানা বোকামি করে না, বাচ্চামি করে না তবে জাহিরের কাছে সবসময়ই এক বিশেষ বিনোদনের খোরাক হচ্ছে তার সুহুর বাঁচামি। কিন্তু সেই হাসির স্থায়িত্ব হলো বড়জোর কয়েক সেকেন্ড।
ঠিক তখনই ফিনা দৌড়ে আসতে আসতে আর্তনাদ করে উঠল— “জাহির ভাইয়া! সুহানা কিন্তু সাঁতার জানে না!”
এই একটি বাক্য জাহিরের কানে তপ্ত সিসার মতো বিঁধল। হাসির রেশটুকু মুহূর্তেই মিলিয়ে গিয়ে সেখানে ঠাঁই নিল এক জমাটবাঁধা আতঙ্ক। জাহির দেখল, নীল জলের গভীরে সুহানা হাত-পা ছুড়ে ওপরে ওঠার আপ্রাণ চেষ্টা করছে তার দু-একটি অস্ফুট আর্তনাদ আর জলের বুদবুদ ছাড়া আর কিছুই অবশিষ্ট নেই।
জাহির এক মুহূর্ত কালক্ষেপণ করল না। কোনো কিছু চিন্তা করার আগেই সে তীরের বেগে দৌড়ে এসে পুলের নীল জলে এক দুঃসাহসী লাফ দিল। বাতাসের গতিতে তার সুঠাম দেহটি জল চিরে গভীরে চলে গেল। পুলের তলায় জলের নিচে সব কিছুই কেমন থমকে গেছে। জাহির দুই হাত দিয়ে জল সরিয়ে সুহানাকে খুঁজতে লাগল।
খানিক দূরেই সে দেখল, সুহানার শরীরটা ধীরে ধীরে অতলে হারিয়ে যাচ্ছে। তার খোলা চুলগুলো জলের নিচে এক জালের মতো ছড়িয়ে আছে। জাহির ক্ষিপ্র গতিতে এগিয়ে গিয়ে সুহানার কোমরে হাত জড়িয়ে তাকে নিজের বুকের সাথে পিষে ধরল। সুহানা তখন জ্ঞান হারিয়েছে কি না বোঝা যাচ্ছে না, তবে তার চোখ দুটো বোজা।
জলের ওপরের শান্ত পরিবেশ ততক্ষণে হুলস্থুলে ভরে উঠেছে। আফ্রিদি আর তুহিনা ফিনা পুলের ধারে এসে ভিড় করেছে। জলের নিস্তব্ধতা চিরে জাহির সুহানাকে কোলে নিয়ে ভেসে উঠল। তার এক হাতে সুহানার অবশ দেহটি আকড়ে ধরা, আর অন্য হাতে সে জল কেটে তীরের দিকে এগিয়ে আসছে। জাহিরের চেহারায় তখন এক ভয় ও আতঙ্ক মিলেমিশে একাকার।
পুলের বাঁধানো ঘাটে সুহানাকে শুইয়ে দিয়ে জাহির নিজেও হাঁপাতে লাগল। তার ফর্সা বুকটা দ্রুত ওঠানামা করছে, ভিজে চুলগুলো মুখের ওপর এসে পড়েছে। সে সুহানার গালে থাপ্পড় মারতে শুরু করল— “সুহু! এই সুহানা, চোখ খোলো! বলছি চোখ খোলো!”
সুহানা নিজের গাল দুটো আলতো করে চেপে ধরে হাপাতে হাপাতে বলল— “উফ! লাগছে...। আমি ঠিক আছি, সামান্য জল খেয়ে ফেলেছি মাত্র, ইটস ওকে!”
ফিনা ওর পাশে ধপ করে বসে পড়ে তপ্ত স্বরে বলল— “এই ‘ইটস ওকে’ শব্দটা তোকে একদিন সত্যি ডোবাবে , দেখে নিস!”
সুহানা ভিজে শরীরে উঠে বসল। তার কণ্ঠস্বরে এক অদ্ভুত উদাসীনতা— “ডোবালে ডুবে যাব, ক্ষতি কী?”
সে এক পা ভাঁজ করে অন্য পা-টি মেলে দিয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে লম্বা এক শ্বাস নিল। পরক্ষণেই খকখক করে কেশে উঠল সে; সামান্য জল বেরিয়ে এল মুখ দিয়ে, চোখ দুটো রক্তবর্ণ হয়ে উঠেছে। হঠাৎ সে জাহিরের দিকে তাকিয়ে হুকুমের সুরে বলল— “আমার চশমাটা এনে দিন, পুলে পড়ে গেছে ওটা।”
জাহির স্তম্ভিত হয়ে সুহানার দিকে তাকিয়ে রইল। এই মেয়েটিই মাত্র কয়েক মিনিট আগে তাকে ট্রমার শেষ সীমায় নিয়ে গিয়েছিল, আর এখন কেমন অবলীলায় তাকে হুকুম করছে! জাহির নিজের ভেতরের সেই ভয়টাকে চাপা দিয়ে বলল— “আমি পারব না। নিজের চশমা নিজে উদ্ধার করো।”
সুহানা অসহায় মুখে বড় বড় চোখ করে তাকাল— “দাদাভাই...”
আফ্রিদি তৎক্ষণাৎ এগিয়ে এসে সুহানার মাথায় হাত রাখল। সুহানা আদুরে গলায় বলল— “তুমি একটু এনে দেবে?”
আফ্রিদি আশ্বস্ত করে বলল— “দেবো তো! ছাড় তো ওর কথা, ও এমনই।”
জাহিরের রাগ এবার সপ্তমে চড়ল। সে কথা না বাড়িয়ে একটা বড় তোয়ালে দিয়ে সুহানাকে আষ্টেপৃষ্টে পেঁচিয়ে নিল। সুহানা কিছু বুঝে ওঠার আগেই জাহির তাকে পাজা করে তুলে নিয়ে কাঁধে ফেলে দিল। সুহানা ছটফট করে নামার চেষ্টা করতেই জাহির তার কানের কাছে নিচু আর বিপজ্জনক স্বরে বলল— “আমার বেডের ওপর আছাড় খেতে না চাইলে চুপচাপ থাকো। বেশি লাফালাফি একদম নয়!”
সুহানা কুঁকড়ে গিয়ে স্থির হয়ে রইল। জাহির আফ্রিদির দিকে তাকিয়ে বলল— “আফ্রিদি, তুই বাকি কাজগুলো সেরে নে, আমি গেলাম।”
আফ্রিদি পেছনে দাঁড়িয়ে গজগজ করতে লাগল— “হ্যাঁ হ্যাঁ, আমারই তো সব দায়! তুই তো পটের বিবি সেজে থাকবি। নাটক শালা! তোর কপালে বাসর জুটবে না রে, তোর বউ তোকে লাথি দিয়ে ঘর থেকে বের করে দেবে। আমি নিজে ওকে ট্রেনিং দেবো। আল্লাহ তোকে বউয়ের ভালোবাসা থেকে বঞ্চিত রাখুক, আমিন!”
তুহিনা আফ্রিদির কপালে মৃদু চাপড় দিয়ে বলল— “আহ্, থামো তো! আর বলো না। অন্য সময় তো জাহির তোমার সব কাজ করে দেয়, আজকে একটু তুমি করলে কী এমন ক্ষতি হবে?”
পাশে ফিনা একমনে বসে ছিল, তার মনটা হঠাৎ কোনো এক অজানা কারণে ভার হয়ে গেছে। তুহিনা চট করে ফিনার চোখের ভাষা বুঝে নিল। সে ফিনাকে ডেকে বলল— “চল ফিনা, তোকে একটা জিনিস দেখাই আমি।”
ফিনা নিঃশব্দে তুহিনার পিছু নিল। রোদে ঘাসের ডগায় জমে থাকা জলের বিন্দুগুলো তখন মুক্তোর মতো জ্বলজ্বল করছে, আর জাহির সুহানাকে কাঁধে নিয়ে গটগট করে বাড়ির ভেতরে ঢুকে পড়ল। এক অদৃশ্য অস্থিরতা টান তখনো পুরো বাগান জুড়ে মিশে রইল।
_________________________________
দুপুর গড়িয়ে বিকেল নেমেছে। মায়াবী রোদের আভা ছড়িয়ে পড়েছে পুরো আঙিনায়। সুহানা গোসল সেরে রুমে থেকে বেরোনোর পর আর যায়নি রুমে। আজ তার রেস্টুরেন্ট বন্ধ, তাই অখণ্ড অবসর। ফিনাও রয়ে গেছে এখানে। গ্রাউন্ড ফ্লোরের শীতল মেঝের ওপর বসে সাবেরা বেগমের কাছে ছোটবেলার গল্প শুনছে সুহানা সাথে বাকি সবাই । সাবেরা সুহানার চোখের চশমাটা খুলে রেখে ওর রেশমি চুলে বিলি কেটে দিচ্ছেন। সুহানার মুখে এক চিলতে প্রশান্তি।
চারতলার লাইব্রেরির বিশাল কাঁচের জানালার ওপাশে দাঁড়িয়ে জাহির একদৃষ্টে নিচে তাকিয়ে আছে। ওপর থেকে সুহানাকে বড্ড ক্ষুদ্র আর কোমল দেখাচ্ছে। জাহির একটি বইয়ের ভাঁজে আঙুল রেখে চিন্তায় ডুবে আছে। তার ফর্সা কপালে দুশ্চিন্তার সূক্ষ্ম ভাঁজ; মাথায় একটি হেয়ারব্যান্ড দিয়ে চুলগুলো আটকানো। টেবিলের ওপর ছড়িয়ে থাকা কয়েকটা রহস্যময় ছবি তাকে অস্থির করে তুলছে। সে চায় না এই জটিলতায় আফ্রিদিকে জড়াতে। — সে নিজে সামলে নেবে ইনশাআল্লাহ।’
সুহানার প্রাণবন্ত মুখটার দিকে তাকিয়ে জাহিরের মনের মেঘ কিছুটা হলেও কাটল। মেয়েটাকে এ বাড়িতে আনার পর থেকে ওর ঠোঁটের হাসিটা যেন স্থবির হয়ে গেছে—একদম যেমনটা জাহির চেয়েছিল। ওর ‘সুহু’ পৃথিবীর সবটুকু সুখ পাক, এটাই এখন তার একমাত্র চাওয়া।
হঠাৎ হাতে থাকা ওয়াকি-টকিতে যান্ত্রিক শব্দ ভেসে এল— ‘স্যার, গেস্ট এসেছে।’ জাহির তৎক্ষণাৎ একটি শার্ট গায়ে জড়িয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে এল। কড়া নির্দেশ পাঠাল নিচে, একজন স্টাফ এসে মহিলামন্ডলী কে সতর্ক করলেন— ‘ম্যাডাম গেস্ট এসেছেন, ডাইনিং থেকে সবাইকে রুমে যাওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন হাইকোর্ট পরে ডেকে নেওয়া হবে দয়া করে ,যে যার রুমে চলে যান”
একজন কে পাঠালেন জাহাঙ্গীর সাহেব আর বিহানকে ডাকতে। আফ্রিদি খবর পেয়েই সব কিছু তদারকি করতে বেরিয়ে এল।
জাহির নিজের ভঙ্গিতে সিঁড়ি দিয়ে নামছিল। সুহানা সবার সাথে উপরে উঠে যাচ্ছিল; এলোমেলো চুল আর ঘরোয়া পোশাকেই সে সিঁড়িতে জাহিরের মুখোমুখি হলো। পাশ কাটিয়ে যাওয়ার মুহূর্তেই সুহানার নরম কবজিটা জাহিরের শক্ত মুঠোয় বন্দি হলো। সুহানা চমকে তাকিয়ে দেখল তার ‘মালিক’কে।
জাহির দুই সিঁড়ি ওপরে উঠে এসে সুহানার কানের কাছে নিচু কিন্তু দৃঢ় স্বরে বলল— “রুম ছেড়ে একদম বেরোবে না। যে দরকারই পড়ুক, বাইরে পা দেবে না।”
সুহানা অবাক হয়ে প্রশ্ন করল— “কেন?”
— “আমি মানা করেছি তাই। সোজা রুমে যাবে এবং আমি না আসা পর্যন্ত ওখানেই থাকবে ।”
সুহানা জাহিরের চোখের সিরিয়াসনেস দেখে দমে গেল। সে বাধ্য মেয়ের মতো মাথা নেড়ে সায় দিল। ঠিক সেই মুহূর্তেই সদর দরজা দিয়ে ভেতরে প্রবেশ করলেন দুবাইয়ের বেশ নামি-ডাকি মানুষ — শেখ হামদান আল-মাখতুম
জাহির মুহূর্তের মধ্যে সুহানাকে নিজের চওড়া পিঠের আড়ালে লুকিয়ে ফেলল। এক হাত দিয়ে সুহানাকে নিজের শরীরের সাথে মিশিয়ে ধরে সে আড়াল তৈরি করল। জাহির একটা সিঁড়ি নিচে দাঁড়িয়ে সুহানা কে সম্পূর্ণ আড়াল করতে সক্ষম হলো বা হাত দিয়ে সুহান পিঠে হাত দিয়ে নিজের পিঠের সাথে ধরে রাখলো যাতে নড়তে না পারে।
সুহানা কৌতূহলী হয়ে জাহিরের কাঁধের পাশ দিয়ে উঁকি দিল। সামনে সাদা শার্ট আর কালো প্যান্ট সজ্জিত এক দীর্ঘদেহী, সুদর্শন যুবক দাঁড়িয়ে। তার দৃষ্টি সরাসরি জাহিরের দিকে, কিন্তু এটা বলা ভুল হবে বরং তার নজর- জাহিরের আড়ালে থাকা মানবীর দিকেই নিবদ্ধ। সুহানা ভেবেছিল কোনো প্রথাগত শেখ আসবে, কিন্তু এই যুবকের আধুনিক স্টাইলিশ অবয়ব তাকে অবাক করল।
হামদানের ঠোঁটে এক চিলতে রহস্যময় হাসি ফুটে উঠল, যা জাহিরের মনে তীব্র অস্বস্তি আর সন্দেহের দানা বাঁধল। আফ্রিদি আর জাহাঙ্গীর সাহেব সৌজন্য বিনিময়ে ব্যস্ত থাকলেও হামদান স্থির দৃষ্টি কেবল জাহিরের ওপর। জাহির এক মুহূর্ত দেরি করল না। সে ঝট করে ঘুরে সুহানার দিকে তাকাল। সুহানা কিছু বুঝে ওঠার আগেই জাহির তাকে পাজা করে কোলে তুলে নিল ওই ভাবেই বস্তার মতো। সামনে যে রুমটি পেল, সেখানেই তাকে ঢুকিয়ে দিয়ে কড়া স্বরে নির্দেশ দিল— “খবরদার, বেরোবে না! ইটস অ্যান অর্ডার”
দরজাটা বন্ধ করে জাহির নিচে নেমে এলো হামদানের মুখোমুখি হলো, তখন তার চোখে আদিম শিকারির হিংস্রতা আর সতর্কতা। বিকেলের শান্ত আলোয় এক অদৃশ্য যুদ্ধের দামামা বেজে উঠল ওই ড্রয়িং রুমে।
জাহির ঠোঁট এলিয়ে এক চিলতে শীতল হাসি হাসল বাঁদিকের গজদার টা বেরিয়ে এলো। সে সিঙ্গেল সোফাটায় বসে অত্যন্ত আয়েশি ভঙ্গিতে পায়ের ওপর পা তুলে রাখল। তার প্রতিটি চলন-বলনে এক রাজকীয় অবজ্ঞা স্পষ্ট। সে বলল— “এবার বলুন, আমার সম্পর্কে আপনার আর কী কী জানার আছে?”
হামদান মৃদু হেসে জবাব দিলেন— “আপনার বিষয় সারা দুনিয়া জানে এমজে।আমি আপনার থেকে বয়সে অন্তত পাঁচ বছরের বড়; অর্থাৎ আমি আপনার সিনিয়র।”
জাহির নির্বিকার গলায় বলল— “হবে হয়তো, তবে সেটা এই মুহূর্তে আমার কাছে কোনো ভাবনার বিষয় নয়।”
হামদান সোফায় হেলান দিয়ে বললেন— “আপনার প্রজেক্ট সম্পর্কে আমি বিস্তারিত জানি। শুনেছি আপনি সব ধরনের ডোনেশন রিজেক্ট করছেন। কারণটা কি জানতে পারি?”
জাহির সরাসরি হামদানের চোখের দিকে তাকিয়ে উত্তর দিল— “এই প্রজেক্টের জন্য আমি একাই যথেষ্ট। কারো টাকা-পয়সা নেওয়ার প্রয়োজন নেই, সেটা আমি শুরুতেই স্পষ্ট করে দিয়েছি। মানুষজন শুধু ক্যামেরার সামনে আসতে আর নিজেদের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করতেই দান করতে চায়,আমার উজ্জ্বল ভবিষ্যতের জন্য নয়।”
হামদান কিছুটা অবাক হয়ে বললেন— “আপনি বড্ড কড়া ভাষায় কথা বলেন। সেটা কি শুধু আমার ক্ষেত্রে, নাকি সবার জন্যই এমন রুক্ষ?”
জাহির আবারও সেই রহস্যময় হাসি হাসল— “না, সবার জন্য নয়। আপনি আমার বন্ধু নন, আর আমরা যে বিষয় নিয়ে কথা বলছি তা অত্যন্ত সেনসিটিভ হেলাফেলা করা যাবে না একদম।”
হামদান হাসলেন, তবে সেই হাসির আড়ালে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে চারপাশটা একবার দেখে নিলেন। টেবিলের ওপর সাজানো রকমারি খাবারের আয়োজন। তিনি পাশে বসা কর্মচারীর দিকে চোখের ইশারা করতেই সে নিঃশব্দে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। জাহিরও সতর্ক ছিল; সে আগে থেকেই নিজের লোক ঠিক করে রেখেছিল, তাই কর্মচারীর পিছু পিছু একজনকে পাঠিয়ে দিল।
আফ্রিদি দূর থেকে জাহিরের দিকে তাকাল। চোখের ইশারায় সে জাহিরকে ফোন দেখতে বলল। জাহির ফোন বের করে দেখল আফ্রিদির মেসেজ— ‘বাইরে আয়।’
জাহির হামদানকে খাওয়ার অনুরোধ জানিয়ে নিজে ড্রয়িং রুম থেকে বেরিয়ে এল। এদিকে সুহানা ওই রুমে একা বসে আছে। জাহিরের কড়া নির্দেশ অমান্য করার বিন্দুমাত্র ইচ্ছে তার নেই। কিন্তু তার মাথায় একটা চিন্তা বারবার ঘুরপাক খাচ্ছে; ওই মানুষটাকে একঝলক দেখে তার চেনা চেনা মনে হয়েছে। কোথায় যেন দেখেছে, কিন্তু ঠিক মনে পড়ছে না। জাহিরের অস্বাভাবিক সিরিয়াস আচরণও তাকে ভাবিয়ে তুলেছে। সুহানা মাথা ঝাঁকিয়ে নিজেকে শান্ত করার চেষ্টা করল। কেন সে জাহিরকে নিয়ে এত ভাববে? ইগনোর! সুহানা গিয়ে জানালার কার্নিশে বসল। বাইরের আকাশটা এখন সিঁদুরে হলুদ হয়ে উঠেছে, ধীরে ধীরে সন্ধ্যা নামছে ধরণীতে।
বাইরে জাহির আর আফ্রিদি পাশাপাশি দাঁড়িয়ে আছে। আফ্রিদি কিছুটা বিরক্ত হয়েই বলল— “কী হয়েছে তোর? এমন করছিস কেন?”
— “আমার কোনো ইনভেস্টর লাগবে না আফ্রিদি।”
— “সেটা মানলাম লাগবে না। কিন্তু এমন অদ্ভুত আচরণ কেন করছিস? লোকটা তো খারাপ কিছু করেনি। তোর ব্যবহারটা বেশি রুড হয়ে যাচ্ছে না?”
জাহির স্থির দৃষ্টিতে আফ্রিদির দিকে তাকাল— “তোর মনে হয় আমি রুড হচ্ছি?”
আফ্রিদি জাহিরের কাঁধে হাত রেখে নরম গলায় বলল— “আচ্ছা সরি। শোন আমার কথা, ওনাকে অন্তত একটু সহজভাবে গ্রহণ কর...”
আফ্রিদি জাহিরের কাঁধে হাত রেখে খানিকটা সময় চুপ করে রইল। সে জানে জাহির ভীষণ জেদি তার ইগো সবার আগে তারও আগে তার সুহু। কিন্তু এই জেদটা কখনো কখনো কাজের পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। মৃদু বাতাসের শব্দে ড্রয়িং রুমের কোলাহল বাইরে এসে স্তিমিত হয়ে যাচ্ছে।ভিতরে জাহাঙ্গীর আর বিহান তদারকি করছে সমস্ত গৃহকর্মচারী এটা ওটা নিয়ে এসে রাখছে হামদান এর সামনে এসে বুঝে উঠতে পারছে না কোনটা ছেড়ে কোনটা খাবে কাবাব থেকে শুরু করে সবটাই আছে বড় টেবিল ভরে গেছে পুরোটা রাখার জায়গা কম পড়ছে। আফ্রিদি ধীরস্বরে কথা শুরু করল।
আফ্রিদি— “জাহির, তুই একা সব করতে পারিস, সেই ক্ষমতা তোর আছে। কিন্তু একটু ঠান্ডা মাথায় ভেবে দেখ।”
জাহির নির্লিপ্ত স্বরে বলল— “আমি জানি আফ্রিদি। আর সেজন্যই আমি কোনো সস্তা প্রচার চাই না।”
আফ্রিদি— “প্রচার তুই না চাইলেও হবে, কারণ তুই জাহির, এমজে তুই একটা জোক ক্র্যাক করলেও মানুষ লাগবে। কিন্তু হামদান আল-মনসুরের মতো মানুষেরা যখন সাথে থাকে, তখন রাস্তার কাঁটাগুলো এমনিতেই সরে যায়। তুই একা কত বাচ্চার দায়িত্ব নিবি? কতো জনকে পড়বি কত কি করবি এক ?, কিন্তু ওদের সাথে নিয়ে কাজ করলে তুই হয়তো আরো আরো বেশি করতে পারবি তুই কি চাস না এই কাজটা আরও বড় হোক? আরও বেশি মানুষের কাছে পৌঁছাক?”
জাহির চুপ করে রইল। তার দৃষ্টি এখনো সামনের দিগন্তে স্থির।
আফ্রিদি— “শোন ভাই, দুনিয়াটা একা চলার জায়গা নয়। মাঝে মাঝে কিছু মানুষকে গ্রহণ করতে হয় শুধু নিজের জন্য নয়, বরং যাদের জন্য তুই কাজ করছিস তাদের স্বার্থে। হামদানকে ইনভেস্টর হিসেবে নয়, একজন পার্টনার হিসেবে দেখ। তুই যদি রুড হয়ে থাকিস, তবে মানুষ তোর মহৎ উদ্দেশ্যটা দেখার আগেই তোর ব্যক্তিত্বের দেয়ালের কাছে হেরে যাবে। তোর এই জেদ কি বাচ্চাদের চেয়েও বড়?”
জাহির একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। আফ্রিদির কথাগুলো যুক্তির খাতিরে হলেও তার মনের ভেতরটা একটু নরম হলো। সে জানে আফ্রিদি ভুল বলছে না।
জাহির— “তুই বলতে চাইছিস আমি ইগো সরিয়ে ওনার সাথে কথা বলব?”
আফ্রিদি হেসে ফেলল— “ইগো নয় রে পাগল, এটাকে বলে ‘ডিপ্লোম্যাসি’। যা, ভেতরে গিয়ে ওনাকে একটু আপ্যায়ন কর। আর সুহানার ওপর ওই অহেতুক পাহারাটা একটু কমা। মেয়েটা জানালার ধারে মুখ ভার করে বসে আছে, দেখলেই মায়া লাগে ওরে তোর সাথে থাকবে কি করে ?।”
জাহির আফ্রিদির দিকে তাকিয়ে বলল— “তুই বড্ড বেশি কথা বলিস আফ্রিদি। চল, ভেতরে যাওয়া যাক।”
আফ্রিদি জাহিরের পিঠ চাপড়ে দিয়ে বলল— “এটাই তো আমার কাজ! চল।”
যেতে যেতে জাহির একপলক সুহানার দিকে তাকাল। সতর্ক চোখে চারপাশটা পরখ করে নিল সে—কাছাকাছি কেউ নেই তো? এরপর সে পুনরায় স্থির দৃষ্টিতে সুহানার দিকেই তাকিয়ে রইল। সুহানা তখন আনমনা হয়ে অপলক তাকিয়ে ছিল অসীম আকাশের পানে, বাইরের জগতের কোনো কিছুরই যেন তাকে স্পর্শ করছিল না।
দুই ভাই আবার ড্রয়িং রুমের দিকে পা বাড়াল। জাহিরের মনের কুয়াশা কিছুটা হলেও কাটল, তবে হামদানকে নিয়ে তার মনের ভেতরের সেই খোজখোচনি এখনো পুরোপুরি মিলিয়ে যায়নি।
ড্রয়িং রুমে ফিরে আসতেই হামদান চওড়া হাসি দিয়ে পুনরায় জাহিরকে সঙ্গ দেওয়ার প্রস্তাব দিলেন। আফ্রিদির সেই কথাগুলো জাহিরের মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছিল। সে এবার নিজের মেজাজ কিছুটা নিয়ন্ত্রণ করে হামদানের পাশে গিয়ে বসল। পরিবেশটা আগের চেয়ে অনেক সহজ হয়ে এল।
জাহির শান্ত স্বরে বলল— "ঠিক আছে হামদান সাহেব, আপনার দূরদর্শী চিন্তাগুলো আমি গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করব।"
সন্ধ্যার অন্ধকার গাঢ় হতেই ডাইনিং টেবিলে রাজকীয় খাবারের সুবাস ছড়িয়ে পড়ল। জাহাঙ্গীর সাহেব, সাবেরা বেগম, রুবাইদা এবং পরিবারের বাকি সদস্যরা সবাই এসে মিলিত হলেন। হামদান অত্যন্ত মার্জিতভাবে সবার সাথে আলাপ জমিয়ে তুললেন। খাওয়া শেষে তিনি তার কর্মচারীকে ইশারা করতেই সে সুদৃশ্য কয়েকটি গিফট বক্স নিয়ে এল।
হামদান একে একে সবার হাতে উপহার তুলে দিলেন। জাহাঙ্গীর সাহেবের জন্য দামী আতর, সাবেরা বেগমের জন্য মখমলের জায়নামাজ, রুবাইদা আর রুহানীর জন্য দুবাইয়ের বিখ্যাত স্বর্ণালঙ্কার এবং জাহির - আফ্রিদির জন্য লেটেস্ট গ্যাজেট।হামদানের সৌজন্যে সবাই বেশ আপ্লুত। কেউ জানে না আফ্রিদি জাহিরের বিবাহ সম্পর্কে জানায়নি কেউকে সুহানা এর সমস্যা হবে সেই জন্য তাই এ কথা গোপন আছে সবার কাছে এখানে কোনো কাউকে ঢুকতে দেওয়া হয়না কোনো রিপোর্টার কেও নয়।
যাওয়ার সময় হামদান জাহিরের হাতে একটি এক্সট্রা গিফট বক্স দিয়ে মৃদু হেসে বললেন— "এটি আপনার পরিবারের অন্য কোনো সদস্যের জন্য রেখে দিন, যাকে আমি আজ দেখতে পেলাম না।"
বিদায় নেওয়ার আগে হামদান গাড়ির কাছে গিয়ে হঠাৎ থেমে গেলেন। তার তীক্ষ্ণ দৃষ্টি চারপাশটা একবার খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখল। সে যেন কাউকে খুঁজছিলেন, কারো একঝলক দর্শনের অপেক্ষায় ছিলেন। কিন্তু কাঙ্ক্ষিত কাউকে না পেয়ে তিনি গাড়িতে উঠে বসলেন। জাহির আড়াল থেকে হামদানের এই অস্থিরতা লক্ষ্য করল, তার মনের ভেতর সন্দেহের মেঘটা আবারও দানা বাঁধল।
গাড়িটি চোখের আড়াল হতেই জাহির দ্রুত পায়ে বাড়ির ভেতরে ঢুকল। সোজা দোতলায় গিয়ে নিজের সেই রুমের দরজা খুলল যেখানে সে সুহানাকে রেখেছিল।
সুহানা তখনো বিষণ্ণ মনে বসে ছিল বেডের উপরে। দরজার শব্দে সে চমকে পেছনে তাকাল। দেখল জাহির দাঁড়িয়ে আছে—চোখেমুখে এক ক্লান্তিকর প্রশান্তি। জাহির ধীর পায়ে সুহানার সামনে গিয়ে দাঁড়াল।
সুহানা জাহিরের চোখের দিকে তাকাল। সেই চোখে তখন শাসনের চেয়ে অনেক বেশি গভীর এক মায়ার টান স্পষ্ট হয়ে ফুটে উঠছিল। বাড়ির কোলাহল তখন থিতিয়ে এসেছে, কেবল জানালার বাইরে ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক আর দুজনের নীরব হৃৎস্পন্দন সন্ধ্যার নিস্তব্ধতাকে পূর্ণতা দিচ্ছিল।
______________________________
বিকেলের আলো ফুরিয়ে যখন ম্লান সন্ধ্যা নামছে, তুহিনার মনের আকাশেও তখন বিষণ্ণতার ছায়া। সে এক দৃষ্টিতে বিছানার ওপর রাখা লাগেজটার দিকে তাকিয়ে রইল। ধীর কণ্ঠে অনেকটা স্বগতোক্তি করার মতো করে জিজ্ঞেস করল— "আজকেই যেতে হবে?"
আফ্রিদি ড্রয়ার থেকে প্রয়োজনীয় কিছু কাগজপত্র গোছাতে গোছাতে উত্তর দিল— "হ্যাঁ পাখি, যেতেই হবে। কাল দুপুরে ম্যাচ আছে, অথচ এর মধ্যে দুটো প্র্যাকটিস সেশন মিস করে ফেলেছি। হাতে অনেক কাজ জমে আছে।"
তুহিনা আর কিছু বলল না, ম্লান মুখে বসে রইল। একটু আগেই ফিনা হুট করে চলে গেছে। যাওয়ার সময় কোনো সুনির্দিষ্ট কারণ দর্শায়নি সে, শুধু যাওয়ার তাড়া ছিল চোখেমুখে। সুহানাও আর জোরাজুরি করেনি; কারণ সে জানে এটা তার নিজের বাড়ি নয় যে কাউকে সারাক্ষণ আটকে রাখবে। পরিস্থিতি আর সম্পর্কের সমীকরণগুলো এখন বড্ড দ্রুত পাল্টে গেছে। আগের সেই দিনগুলো যেন কুয়াশার মতো ফিকে হয়ে আসছে।
তুহিনা পরম যত্নে আফ্রিদির যাবতীয় জিনিস গুছিয়ে দিচ্ছে। একসময় যে কাজগুলো বাড়ির অন্য কেউ করে দিত, তুহিনা আসার পর থেকে সেগুলো তার একান্ত অধিকারে চলে এসেছে। কাপড় ভাঁজ করা থেকে শুরু করে পারফিউমটা ঠিক জায়গায় রাখা—সবই সে করছে নিখুঁতভাবে, যদিও তার মুখটি অভিমানে ভার হয়ে আছে। বিচ্ছেদের সুর তাকে কুঁকড়ে দিচ্ছে, কিন্তু নিয়তির কাছে সে নিরুপায়।
গোছগাছ শেষ করে আফ্রিদি তুহিনার কাছে এসে দাঁড়াল। মায়ায় ভরা দৃষ্টিতে তাকিয়ে সে তুহিনাকে আলতো করে সোফায় বসাল। তারপর তুহিনার পেট স্পর্শ করে গভীর মনোযোগ দিয়ে কিছু একটা পর্যবেক্ষণ করার চেষ্টা করল। এক চিলতে হাসি তার ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল।
আফ্রিদি ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করল— "আচ্ছা কি বেবি আছে সেটা কবে নিশ্চিত হওয়া যাবে?"
তুহিনা ম্লান হেসে তার দিকে চাইল। সেই হাসিতে মাতৃত্বের এক অদ্ভুত আভা আর প্রিয়তমকে বিদায় দেওয়ার বিষাদ মিশে ছিল। সে মৃদু স্বরে উত্তর দিল— "পরের চেকআপেই সবটা জানা যাবে।"
আফ্রিদি তুহিনার কপালে একটি দীর্ঘ চুমু এঁকে দিল। বাইরের ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক আর ঘরের ভেতরের এই নিস্তব্ধ আবেগ মিলেমিশে এক নতুন উপাখ্যান লিখে যাচ্ছিল, যেখানে বিরহ আছে ঠিকই, কিন্তু নতুন প্রাণের আগমনের সম্ভাবনা সেই বিরহকে এক গভীর প্রতীক্ষায় রূপ দিল।
ঘড়ির কাঁটা টিকটিক করে এগিয়ে চলছে, কিন্তু ঘরের ভেতর সময় থমকে গেছে। জাহিরের সমস্ত গোছগাছ শেষ, ব্যাগগুলো দরজার কাছে সারিবদ্ধভাবে রাখা। অথচ সে নিজে এক ঘণ্টা ধরে সোফায় গালে হাত দিয়ে বসে আছে, আর তার ঠিক সামনেই সুহানাকে বসিয়ে রেখেছে টেবিলের উপরে নিজের পা দিয়ে সুহানার পা ধরে রেখেছে। জাহিরের তীক্ষ্ণ আর নেশাতুর দৃষ্টি সুহানার অস্তিত্বকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পড়ছে। সুহানা কয়েকবার উসখুস করে ওঠার চেষ্টা করতেই জাহির গম্ভীর গলায় বলে উঠেছে— “চুপ করে বসো। পালানোর চেষ্টা করবে না একদম সব পালাই পালাই বন্ধ এখন।”
সুহানা অবশেষে ধৈর্য হারিয়ে বলে উঠল— “কী দেখছেন এভাবে? এক ঘণ্টা ধরে স্রেফ তাকিয়ে আছেন, কিছু বলছেনও না। আমার পায়ে ঝিঁঝিঁ ধরে গেল, লেট মি গো!”
জাহির এবার একটু নড়েচড়ে বসল। সে ধীরপায়ে উঠে এসে সুহানার সামনে দাঁড়াল। সুহানা মাথা উঁচিয়ে তাকাতেই জাহির ওর দুই কাঁধে হাত রেখে ওকে তুলে সোফায় বসলো নিজেও বসলো ঘুরে তাকালো, হাত বাড়িয়ে সোফার সাথে মিশিয়ে ধরল। জাহিরের শরীরের সেই পরিচিত সুবাস আর নৈকট্যে সুহানা বরাবরের মতো একটু ছটফট করে উঠল— “কী করছেন? ছাড়ুন বলছি!”
জাহির সুহানার অবাধ্য চুলগুলো কানের পিঠে গুঁজে দিতে দিতে ফিসফিস করে বলল— “নয়দিন সুহু। টানা নয় দিন তোমাকে দেখতে পাব না, তোমার এই চড়বড়ানি শুনতে পাব না। ভাবতেই আমার দম বন্ধ হয়ে আসছে।”
সুহানা মুখ ঘুরিয়ে নিয়ে বলল— “আমার ভালোই তো হবে। আপদ বিদায় হবে, আমি শান্তিতে থাকতে পারব। আমার পিছনে লেগে থাকার মতো কেউ থাকবে না।”
— “সত্যিই কি শান্তিতে থাকতে পারবে?” জাহির এবার সুহানার একদম কাছে মুখ নিয়ে এল। তার উষ্ণ নিশ্বাস সুহানার ঘাড়ের ওপর আছড়ে পড়ছে। সুহানা কাঁপাকাঁপা স্বরে বলল— “হ্যাঁ, পারব!”
জাহির এবার সুহানার চিবুকটা ধরে নিজের দিকে ফেরাল। তার চোখে এক গভীরতা। সে সুহানার চোখের দিকে তাকিয়ে গাঢ় স্বরে বলল— “আমি জানি তুমি আমাকে মিস করবে না, কিন্তু আমি তোমাকে প্রতিটা মুহূর্তে অনুভব করব। ন হাজার মানুষের চিৎকারের মাঝে আমি এই ঝাঁঝালো কন্ঠ খুজবো।জেদ তোমার অনেক, তাই না?”
বলেই জাহির আচমকা সুহানাকে নিজের বুকের মাঝে পিষে ধরল। সুহানা অপ্রস্তুত হয়ে হাত-পা ছুড়তে লাগল— “আরে কী অসভ্যতা! ছাড়ুন, আপনি বড্ড বেহায়া!”
জাহির ওর ছটফটানিকে পাত্তা না দিয়ে ওর কপালে একটা দীর্ঘ আর তৃষ্ণার্ত চুমু এঁকে দিল। তারপর সুহানার কানের লতিতে ঠোঁট ছুঁইয়ে মৃদু স্বরে বলল— “এই একয়দিন নিজের খেয়াল রাখবে। কোনো উটকো ঝামেলায় জড়াবে না আর ওই ফ্যাকাশে লোকের ধারেকাছেও যাবে না। মনে থাকবে?”
সুহানা লজ্জায় আরক্তিম হয়ে জাহিরের বুকে একটা ধাক্কা দিয়ে নিজেকে ছাড়িয়ে নিল। সে হাপাচ্ছে, তার হূদস্পন্দন তখন রেসের ঘোড়ার মতো দৌড়াচ্ছে। সে রাগে মুখ বেঁকিয়ে বলল— “যান ! আপনার এই হুকুমগিরি আর ভালো লাগে না। তাড়াতাড়ি গিয়ে হারুন!”
জাহির এবার শব্দ করে হেসে উঠল। সে ব্যাগটা হাতে তুলে নিয়ে দরজার দিকে এগিয়ে গেল। যাওয়ার আগে একবার পেছন ফিরে চোখের ইশারায় একরাশ ভালোবাসা আর অধিকারবোধ ছুড়ে দিয়ে বলল— “হারব না সুহু। কারণ জেতার পর আমাকে তোমার এই রক্তিম মুখটা দেখতে ফিরে আসতে হবে হেরে তোমার সামনে লুসার হয়ে আসা যাবে না ইগো হার্ট হবে আমার।”
জাহির ঘর থেকে বেরিয়ে আসতেই ঘরটা বিষণ্ণতায় ডুবে গেল। সুহানা অস্থির পায়ে সরে এল। জাহির ইতিমধ্যে নিচে নেমে গেছে। মা আর বাবার রুমে গিয়ে বিদায় জানিয়ে সে যখন বাইরের চত্বরে এল, দেখল আকাশজুড়ে পূর্ণিমার চাঁদ রুপোলি আলো ছড়াচ্ছে সে গাড়ির কাছে চলে গেলো। বাইরে চেয়ারে তুহিনাকে এক হাতে জড়িয়ে বসে আছে আফ্রিদি; তুহিনা মাথা হেলিয়ে দিয়েছে তার প্রিয়তমের কাঁধে। চাঁদের আলোয় এই বিচ্ছেদদৃশ্য এক কাব্যিক রূপ নিয়েছে।
জাহিরের ব্যাগগুলো একজন কর্মী গাড়িতে তুলে দিল। সাবেরা বেগম ছেলেকে এগিয়ে দিতে চেয়েছিলেন, কিন্তু অনেক রাত হওয়ায় জাহির তাকে বারণ করল। এদিকে সুহানা রুমে ফিরে আসতেই দেখল টেবিলের ওপর জাহিরের ফোনটা পড়ে আছে। বুকটা ধক করে উঠল তার; ফোন ছাড়া মানুষটা এত দূরে যাবে কী করে? সে ফোনটা হাতে নিয়ে ঝড়ের বেগে নিচে নামল।
সুহানা হাঁপাতে হাঁপাতে সেখানে গিয়ে পৌঁছাল। ড্রাইভার সিটে বসে পড়েছে, জাহিরও পা বাড়িয়েছে গাড়িতে ওঠার জন্য। সুহানাকে ওভাবে ছুটতে দেখে সে হকচকিয়ে গেল। সুহানা ফোনটা বাড়িয়ে দিতেই জাহির কপালে হাত ঠেকাল— “শিট! ফোনটা ফেলে যাচ্ছিলাম। থ্যাঙ্ক ইউ, সুহু।”
জাহির গাড়িতে উঠতে যাচ্ছিল, কিন্তু সুহানার ভেতরে তখন এক অন্যরকম টান কাজ করছিল। সে অবচেতনেই জাহিরের শার্টের হাতাটা টেনে ধরল,…. শুনুন
জাহির থামল, ঘাড় ঘুরিয়ে কোমল স্বরে বলল— “বলুন?”
সুহানা মাটির দিকে তাকিয়ে অত্যন্ত নিচু স্বরে বলল— “সাবধানে থাকবেন। আর... সাবধানে বাড়িতে ফিরে আসবেন। আসসালামু আলাইকুম।”
জাহির এবার সম্পূর্ণ ঘুরে দাঁড়াল। সুহানার এই আকস্মিক উদ্বেগ তার বুকের ভেতর বসন্তের হাওয়া বইয়ে দিল। সে এক চিলতে তৃপ্তির হাসি হেসে জবাব দিল— “ওয়া আলাইকুম আসসালাম।”
গাড়ি ছেড়ে দিল। সুহানা মেইন গেটের কাছে দাঁড়িয়ে হাত নাড়ল। গাড়িটা যখন অন্ধকারের বাঁকে হারিয়ে গেল, সুহানা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বাড়ির দিকে ফিরল। পাশে তুহিনাও আছে। দুই বোন নিঃশব্দে ভেতরে ঢুকে পড়ল। সুহানা সদর দরজাটা বন্ধ করতে যাবে, এমন সময় দেখল অন্ধকার চিরে কেউ একজন হন্তদন্ত হয়ে দৌড়ে আসছে।
সে আর কেউ নয়, জাহির! তুহিনা ততক্ষণে ভেতরে চলে গেছে। জাহিরকে এভাবে ফিরতে দেখে সুহানা উদ্বিগ্ন হয়ে কয়েক পা বাইরে বেরিয়ে এল। কিন্তু জাহির তাকে কথা বলার কোনো সুযোগই দিল না। সে কাছে এসেই সুহানার ঠোঁটে এক অতর্কিত হামলা চালাল। সুহানা স্থির হয়ে গেল; তার সমস্ত ইন্দ্রিয় এক মুহূর্তের জন্য কাজ করা বন্ধ করে দিয়েছে।
তুহিনা একটু দূরে দাঁড়িয়ে সুহানাকে না দেখে পেছন ফিরতেই এই দৃশ্যটি দেখে ফেলল। সে আলতো করে ঠোঁট টিপে হাসল এবং দ্রুত চোখ সরিয়ে নিও— ‘পাগল একটা!’
জাহির তার মনের খোয়াইশ মিটিয়ে সুহানাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। তার বুকের ধুকপুকানি তখন সুহানার কানে বাজছে। সে ফিসফিস করে বলল— “আই মিস ইউ সো মাচ, ষোলোআনা!” এরপর সুহানার দুই গালে শব্দ করে দুটি গাঢ় চুমু খেয়ে সে সোজা হয়ে দাঁড়াল। নিজের ঠোঁট মুছে নিয়ে চোখের পলকে বলল— “আসছি আমি, বাই! খেয়াল রাখবে নিজের।”
যেমন ঝড়ের মতো এসেছিল, তেমনি ঝড়ের গতিতেই জাহির গেটের দিকে দৌড়ে গেল। আফ্রিদি গাড়িতে অপেক্ষা করছিল। জাহির ফিরে এসে গাড়িতে বসতেই আফ্রিদি কোনো প্রশ্ন করল না, শুধু মৃদু হেসে হেলান দিয়ে বসল। দুই ভাইকে নিয়ে গাড়ি আবার রাতের বুক চিরে চলতে শুরু করল।
সুহানা তখনো সেই একই জায়গায় স্থাণুর মতো দাঁড়িয়ে। তার ঠোঁট থেকে তখন বিন্দু বিন্দু রক্ত —জাহিরের সেই উন্মত্ত ভালোবাসার চিহ্ন। সে আঙুল দিয়ে রক্তটুকু মুছে নিল এবং ধীরপায়ে ভেতরে ঢুকে দরজাটা টেনে দিল। রাতের এই নিস্তব্ধতায় দুই জোড়া মন এখন দুই ভিন্ন গন্তব্যে, কিন্তু তাদের হৃদয়ের সুতোটা সেই একই গভীরতায় বাঁধা পড়ে রইল।---
চলবে….
{“এই গল্পের সমস্ত চরিত্র, ঘটনা এবং কাল সম্পূর্ণ কাল্পনিক। বাস্তব কোনো ব্যক্তি বা ঘটনার সাথে এর কোনো মিল থাকলে তা নিতান্তই কাকতালীয় বলে গণ্য হবে। গল্পের প্রয়োজনে সৃষ্ট কোনো পরিস্থিতিকে বাস্তব জীবনের সাথে মিলিয়ে না নেওয়ার অনুরোধ রইল। এছাড়া, অনিচ্ছাকৃত কোনো বানান ভুলের জন্য অগ্রিম ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি। আশা করি, আপনারা গল্পের মূল ভাবাবেগটুকুই গ্রহণ করবেন”}
সম্পূর্ণ উপন্যাসের লিংক 🖇️
https://www.facebook.com/share/p/1E8un1tWhL/
পেজ লিংক 🖇️ [Midnight Tales by Joy]
https://www.facebook.com/share/18DrFSvtcF/
আইডি লিংক 🖇️[MD Suhan Joy]
https://www.facebook.com/share/18Arx2QfVM/
#প্রেমের_আলোড়ন
#md_suhan_joy
#midnight_tales_by_joy
#উপন্যাস
Thank You🍀
(Don’t copy without permission)
Enjoy your reading 🎀