#সাইকো_টাইম ( পর্ব-২৬)
লেখক- #রিয়াজ_রাজ
---------------------------------------
অন্তর সাহেবের মুখে যেনো হাসির উল্লাস ফুরফুরে উঠে৷ উনি চোখ আড়িয়ে জাহিদ সাহেবের দিকে তাকান। জাহিদ সাহেব মুখটা ভেংচি কেটে অন্যদিকে নজর দেয়।
এদিকে রিয়াজ তার বাসার সামনে চলে আসে। মুখ ভর্তি দাড়ি নিয়ে যেনো একটা পাগল আসলো। দরজার গেট খুলতেই যাবেন,তখনি রিমা " আব্বু" বলে দৌড়ে আসে। রিয়াজ পুরোপুরি অবাক। তার বিশ্বাস'ই হচ্ছেনা তার মেয়ে রিমা দৌড়ে আসতেছে। রিয়াজ বেকুবের মত দাঁড়িয়ে আছে। ততক্ষণে রিমা রিয়াজকে জড়িয়ে ধরে বলল," এতোদিন কোথায় ছিলে আব্বু??"। রিয়াজ আর সইতে না পেরে তার মেয়েকে কোলে নিয়ে চোখে মুখে চুমু খেতে লাগলো।
লাফিয়ে উঠে জোরে জোরে শ্বাস নিতে শুরু করে রিয়াজ। জঙ্গলের মাঝে রাতে শুয়ে থাকা অবস্থাতেই ঘুমিয়ে গিয়েছিলো। বৃষ্টিতে ভিজে আর চেহারার বাজে অবস্থা নিয়ে একটা অচেনা মানুষের মতোই দেখাচ্ছে রিয়াজকে। হাতে কুড়ালটা এখনো আছে। রিয়াজ কোনোভাবে শোয়া থেকে উঠে আবার সেই বাড়িতে প্রবেশ করে। তবে গর্ত দিয়ে নয়, মেইন দরজা দিয়ে। কারণ সুফিয়ানের বিষয়ে রিয়াজ এখনো কিছুই জানেনা। পেটে ক্ষুধা আর ক্লান্তিকর দেহ নিয়ে রিয়াজ সেই ইটের কাছে যায়। এতক্ষণে রিয়াজ এইটা বুঝলো, প্রথম কদিনের পানিটা বৃষ্টির ছিলো। কারণ ইট পাশে রাখা আর উপরের ঢাকনা খোলা। জানালা বেয়ে যে সামান্য পানি ঢুকেছে,সেটি খেয়েই রিয়াজ কদিন বেচে ছিলো। রিয়াজ নিচে না নেমে উপর থেকেই তাকিয়ে দেখে,সেই ঢাকনাটা শুধু লক করা নয়। ঢাকনার উপরে একটা বড় বক্স রাখা। অর্থাৎ এই বক্সের চাপেই ঢাকনাটা এতো মজবুত ভাবে আটকে ছিলো। রিয়াজ বুঝে যায়,এই ঢাকনার পাশের দেওয়ালগুলায় আঘাত করলে সে অনেক আগেই বের হতে পারতো। সাইকো রিয়াজকে এখানেও বোকা বানিয়েছে। যেথায় রিয়াজ মনে করেছে পুরো রুমটাই মজবুত। সেখানে শুধু ঢাকনাটাই বক্সের দ্বারা মজবুত ছিলো। এসব দেখে রিয়াজ মনে মনে বলতে থাকে," এই সাইকো কি খায় কে জানে৷ এতো বুদ্ধি আসে কেমনে"। এরপর রিয়াজ আবার ফিরে আসতে চায় নাজমুলের বাসায়। কারণ সুফিয়ানের সম্মন্ধে রিয়াজ এখানো কিছুই জানেনা।
এদিকে ইন্সপেক্টর অন্তর সাহেব জাহিদ সাহেবকে বললেন," এই শার্টটায় আমাকে কেমন দেখাচ্ছে"। জাহিদ সাহেব বললেন," আয়নায় তাকিয়ে দেখুন না,কেমন দেখাচ্ছে"। অন্তর সাহেব মুচকি হেসে শার্টটা দোকানিকে দিয়ে বলেন প্যাকেট করে দিতে। শুধু তাই নয়,অন্তর সাহেবের বউ বাচ্চাদের জন্যেও শপিং করে নিলেন তিনি। শাহরিয়ার সাহেবের টাকা উনি মোটেও নষ্ট করতে চান না। কিন্তু ঘটনা এই অব্দি সীমাবদ্ধ থাকলে ঠিক ছিলো। ঘটনা তো তখন ঘটে,যখন অন্তর সাহেব জাহিদ সাহেবকে বললেন," কি ব্যাপার, প্যাকেট গুলা হাতে নাও? "। জাহিদ সাহেব ভিতরে ভিতরে অন্তর সাহেবকে কয়েকটা গালি দিয়ে প্যাকেট গুলা নিয়ে নেন।
এদিকে শাহরিয়ার সাহেব পাগলের মতো তার মেয়েকে খুজে যাচ্ছেন। পুলিশ থেকে শুরু করে শহরে যত কিডন্যাপার এবং ছিনতাই কারী ও গুন্ডার দল আছে। সবাইকে টাকা দিয়ে বললেন তার মেয়েকে খুজে বের করতে। কিন্তু কারো কোনো ইনফরমেশন পাচ্ছেনা তিনি। হতাশ হয়ে যখন শাহরিয়ার সাহেব, রাস্তার পাশে একটা সিগারেট ধরিয়ে টানছিলেন। সেই মুহুর্তে থানা থেকে কল দেন আকবর হোসেন। অচেনা নাম্বার দেখে শাহরিয়ার সাহেব ভাবলেন কিডন্যাপার কল দিয়েছেন। কিন্তু কল রিসিভ করার পর,ফোনের ওপাশ থেকে আকবর হোসেন জানালেন," স্যার,আমি জানি আপনি আপনার মেয়েকে খুজে বেড়াচ্ছেন। আমাদের ইন্সপেক্টর অন্তর সাহেবকেও টাকা দিয়েছেন। কিন্তু এতে কোনো লাভ নেই। আপনার মেয়েকে একমাত্র রিয়াজ সাহেব ছাড়া কেও বের করতে পারবেনা। আপনি রিয়াজ ভাইয়ের সাথে যোগাযোগ করুন"। শাহরিয়ার সাহেব কিছুক্ষণ কথাগুলো শুনে বললেন," এই রিয়াজ আবার কে। কোনো মাস্তান?"। আকবর সাহেব একটু মুচকি হেসে বললেন," না স্যার। উনি একজন গোয়েন্দা ছিলেন। পার্সোনাল একটা সমস্যার জন্য জবটা ছেড়ে দিলেও, এখনো আগের মতো মাথা খাটাতে পারে৷ "। শাহরিয়ার সাহেব আকবর হোসেনের কথা শুনে যখন জানতে চাইলেন রিয়াজকে কোথায় পাবে। তখন আকবর হোসেন বলল," স্যার,আমাদের পুরাতন ইন্সপেক্টর এর সাথে তিনি একটা মিশনে গিয়েছিলেন। আপসোসের বিষয় হচ্ছে সুফিয়ান সাহেব ফিরে এলেও,রিয়াজ সাহেবের কোনো খোজ এখনো পাওয়া যায়নি"। কথাটা শুনেই শাহরিয়ার সাহেব একটু রেগে যায়। এবং কড়া গলায় বললেন,
- আপনার কি মনে হয়। আমি একটা পাগল? যে মিশনে গিয়ে ফিরেও এলেন না। তার কাছে সাহায্য চাইতে যাবো আমি?
- স্যার। যে ফিরে এসেছে।সে জীবিত ফিরে আসেন নি৷ তার লাশ এসেছে।
- এখন তো আপনাকে আমার গালি দিতে মন চাচ্ছে। যে ফিরে এসেছে,তার যদি লাশ'ই ফিরে আসে। তবে রিয়াজ তো এতোদিনে পচে গলে শেষ হয়ে গেছে৷ আর আপনি কি বুঝে আমাকে কল দিলেন বলবেন? এমনিই চিন্তায় মাথা কাজ করা বন্ধ করে দিলো আমার। তার উপর এইসব ফালতু কথা শুনতে ভালো লাগে?
- স্যার। ব্যাপারটা না বুঝে রিয়েকশন দিচ্ছেন। রিয়াজ সাহেবের সম্মন্ধে হয়তো আপনি জানেন না। সাইকো অপবাদ দিয়ে যে রিয়াজকে জেলে নেওয়ার পর,নিজের স্ত্রী সন্তানের খুনের কথা শুনে জেলের সবাইকে মেরে পালিয়েছেন। আমি সেই রিয়াজ সাহেবের কথা বলতেছি। এতোদিনে উনার লাশ ফিরে আসেনি এর অর্থ উনি মারা যান নি। যদি মরে যেতেন,তাহলে লাশ ফিরে আসতো। আমার বিশ্বাস উনি বেচে আছেন। আপনি আপনার মেয়েকে না খুজে উনাকে খুজে বের করুন। এতে আর কিছু আমি নিশ্চিত হই বা না হই,অন্তত এইটা নিশ্চিত যে আপনার মেয়েকে আপনি ফিরে পাবেন। বেশি দেরি হয়ে গেলে হয়তো লাশ ছাড়া কিছুই পাবেন না। আর একটা কথা তো ক্লিয়ার যে আপনার মেয়েকে কোনো কিডন্যাপার নেয় নি। এইটা সাইকোর কাজ। কারণ এইরকমভাবে সাইকো মেয়েদের নিয়ে যায়৷ আর যদি কোনো কিডন্যাপারের কাজ হতো এইটা। তবে এতক্ষণে আপনাকে তারা কল দিতো। আমার কথাগুলো আপনার ভালো নাও লাগতে পারে। তবে আপনি একটু ভেবে দেখবেন। রাখলাম,আল্লাহ হাফেজ।
কথাটা বলেই আকবর হোসেন কল কেটে দেন। শাহরিয়ার সাহেব ফোন পকেটে নিয়ে হাতে তাকিয়ে দেখে সিগারেট নিজে নিজে জ্বলে গেছে। শুট বুট গায়ের মুখ ভর্তি স্টাইলিশ করা সাদা দাড়ি এবং ব্লাক সানগ্লাস পড়া শাহরিয়ার সাহেব রাস্তার পাশেই দাঁড়িয়ে ভেবে যাচ্ছেন। একটু দূরেই দাঁড়িয়ে আছেন তার কিছু বডিগার্ড এবং গাড়ি।
এদিকে রিয়াজ কোনোভাবে হেটে জঙ্গল থেকে বের হয়ে আসে। রাস্তায় এসে দেখে,তাদের গাড়িটা এখন আর নেই। হয়তো সাইকো নিয়ে গেছে,নয়তো কোনো চোর চুরি করেছে। রিয়াজ হেটে হেটে মেইন রোডের দিকে এগুতে লাগলো।
এদিকে অন্তর সাহেব আর জাহিদ সাহেব বাসায় ফিরছিলেন। গাড়ির মাঝেই অন্তর সাহেব বললেন," ব্যাগে কত আছে আর। সামনের দোকান থেকে কিছু কসমেটিক কিনা লাগবে"। অন্তর সাহেবের উত্তরে জাহিদ সাহেব বললেন, " স্যার, যা এনেছেন তা তো মার্কেটেই খরচ করেছেন। বাকি টাকা তো আপনার বাসায় রেখে এলেন। বাসা থেকে আনতে হবে টাকা"। অন্তর সাহেব এইবার রেগে বললেন," কিহ, ৩০ হাজার টাকার শপিং করে ফেলেছি?ব্যাপারটা অশ্চর্যের তো? এখন বাসায় যাবার কাজ কি। পুলিশের পাওয়ার তো এখনো দেখোনি তুমি"। কথাটা শেষ হতে না হতে অন্তর সাহেব আবার চেচিয়ে বলল," এই গাড়ি থামাও, গাড়ি থামাও"। জাহিদ সাহেব আচমকা কথা শুনেই গাড়ি থামায়। অন্তর সাহেব বললেন," কসমেটিক এর টাকা আনতেছি দাড়াও"। এ বলেই গাড়ি থেকে নেমে রাস্তার পাশ দিয়ে হেটে আসা রিয়াজের কলার ধরে অন্তর সাহেব। রিয়াজ মাথা তুলে অন্তর সাহেবের দিকে তাকিয়ে অবাক হয়। মনে মনে বলল," এই ব্যাটা আবার কে"। গাড়িতে জাহিদ সাহেব বুঝে যায় অন্তর সাহেব একজন মানুষকে শুধু শুধু ধরে টাকা হাতিয়ে নিবে। বিরক্ত হয়ে জাহিদ সাহেব আর সামনের দিকে তাকায় নি। গাড়িতে বসেই ফেসবুকের নিউজফিডটা স্ক্রল করছিলো। এদিকে অন্তর সাহেব রিয়াজের কলার ধরে বলল,' কিরে জঙ্গলের ভিতর কি করছিলি৷ তোর এই অবস্থা কেন। নিশ্চয়ই চুরি ডাকাতি করে এসেছিস৷ কাকে ছিনতাই করলি"। রিয়াজ অন্তর সাহেবের কথা শুনে গম্ভীর গলায় বলল,
- আমার তো মনে হচ্ছে আপনি আমাকে ছিনতাই করতে এসেছেন। ( কথাটা শুনেই অন্তর সাহেব একটু ভ্যাবাচেকা খেয়ে যান। এরপর আবার রাগম্ভিত হয়ে বলল)
- এই ব্যাটা। পুলিশের সাথে কিভাবে কথা বলতে হয় তুই জানস না?
- একজন রাস্তার পথিককে কোনো কারণ ছাড়া কলার ধরাও যে অপরাধ তা আপনি জানেন না?
- তুই তো ভালো একটা বেয়াদব? এই তোর সব বের কর ( এইটা বলেই অন্তর সাহেব রিয়াজের কোমরে হাত দেয়। আর কুড়ালের স্পর্শ পায়। অন্তর সাহেব চোখ খাড়া করে রিয়াজের শার্ট তুলে কুড়ালটা বের করে নেয়। আর রিয়াজকে ঝাড়ি মেরে আবার বলল) কিরে,তুই অস্র নিয়ে ঘুরিস? আজকে তোকে অস্র মামলায় কেমনে জেলের ভাত খাওয়াই দেখ।
কথাটা বলেই তিনি রিয়াজ টেনে টেনে গাড়িতে নিয়ে আসে। এরপর গাড়ির পিছনে ঢুকিয়ে দিয়ে হাতকড়া লাগিয়ে দেয়। রিয়াজের মুখ ভর্তি দাড়ি থাকায়,জাহিদ সাহেবও তেমন একটা ছিনতে পারেনি। অন্তর সাহেব রিয়াজকে গাডির পিছনে আটকে দিয়ে,সামনে এসে বসলো। আর জাহিদ সাহেবকে বলল,"
- শালায় কুড়াল নিয়ে ঘুরে। আবার ত্যাড়া কথাও বলে।বেশ বেয়াদব।
- আপনার মতোই ( কথাটা গুনগুন করে বললেন জাহিদ সাহেব)
- কিছু বললা?
- না মানে কোথায় যাবো এখন।
- সোজা থানায় যাও। এই শালাকে আগে জেলে বন্দি করে আসি।
মাথার উপর একটা লাইট নিম নিম করে জ্বলছে। গায়ে কিছু নেই। একেবারে উলঙ্গ দেহ নিয়ে চেয়ারে বেধে রাখা হয়েছে নাজিফাকে। কালো হেলমেট এবং কালো জ্যাকেট পড়া অবয়বটা ধীরে ধীরে নাজিফার কাছে আসে৷ নাজিফা কোনোভাবে চোখ মেলে দেখতে পায়, হাতে একটা রড নিয়ে সেই অবয়বটা দাঁড়িয়ে আছে।
চলবে...........