ফন্ট সাইজ:
থিম:
নিকুঞ্জ কাহন

১৮তম পর্ব

লেখক: নুজহাত আদিবা

‎#নিকুঞ্জ_কানন

‎#নুজহাত_আদিবা

[পর্ব ১৮]

‎(কপি ও অন্যত্র ব্যবহার কঠোরভাবে নিষিদ্ধ❌)

পুরো বাড়িতে আনন্দের পুলকিত আবেশে ছড়াছড়ি। প্রথম কারণটা তরীর এ প্লাস পাওয়ার খুশিতে। আর দ্বিতীয় কারণটা হলো এ প্লাস পাওয়ার খুশিতে তরীর অজ্ঞান হয়ে যাওয়া! তরীকে কোলে নিয়ে আহসান তখন পানি ছিটা দিয়েছে। এবং দীর্ঘ আধাঘন্টা শোভা আর রুমি তরীর মাথায় পানি ঢালার পর তাঁর জ্ঞান ফিরেছে। সেকি হাসাহাসি তরীকে নিয়ে! তরী লাজুক মুখে ভেজা চুল নিয়ে নিজের পাসের মিষ্টি খেলো। তরী জ্ঞান হারানো নিয়ে এত মাতামাতির মাঝে মাজদাকই মিষ্টি আনিয়েছেন। মধুবিবি তো তরীর সামনে বারবার বলেই যাচ্ছেন,

" দেখছো? কইসিলাম না খাজা বাবার মাজারের তাবিজ কোনোদিন বিফলে যায় না। ঠিকই তো ভালোমতো পাস দিয়া বাইর হইলা। আজকা একবার যাইয়ো আমার সঙ্গে। মানতের মোমবাতি মাজারে দিয়া আসুম।"

মধুবিবির কথা শুনে আহসান পাশ ফিরে মুখে হাত দিয়ে হেসে ফেললো। ইশ! তাবিজের লেখাটা যদি একবার মধুবিবিকে পড়ে শোনাতে পারতো! হাহা!

★

সেদিন সকালে আর আহসান কাজে গেল না। দুপুরের খাবার খেয়ে একেবারে কাজে গেল। মাজদাক অবশ্য মিষ্টিমুখ করেই কাজে চলে গেছেন। আহসানের কাঁধে খুশির আনন্দে আলসেমি ভর করেছে। কী যে হলো তাঁর! তরীকে ফেলে কাজে যেতে ইচ্ছেই হলো না। দুপুরে খেয়ে নিজেকে বেশ ঠেলেঠুলেই অফিসে গেল সে। আজ শোভা তরীর খুশিতে পোলাও আর রোস্ট রান্না করেছে। তরীর সবচেয়ে পছন্দ খাবার পোলাও রোস্ট বলেই এই আয়োজন। তবে, দুঃখের বিষয়! এত পছন্দের খাবার হওয়া সত্ত্বেও তরী খেতেই পারলো না। খাবারটা মজা হয়েছে। কিন্তু তরীর শরীরটা আজ ভালো নেই। মুরগি তো মুখে ছোঁয়াতেই পারলো না। কেমন তিতকুটে একটা গন্ধ! অনেক কষ্টে অল্প ক'টা সাদা পোলাও খেলো। তাও হজম হলো না! খেয়েদেয়ে উঠতেই গড়গড়িয়ে বমি হলো। তরী সবার শেষেই খেতে বসেছিল। শোভা কয়েকবার আহসানের সঙ্গে তরীকে খেতে জোরাজোরি করেছিলেন। তরী শরীরের খারাপের অজুহাত দিয়ে পরে খাবো বলে এড়িয়ে গিয়েছিল। সবার খাওয়া শেষে রুমি আর তরী একসঙ্গে খেতে বসেছিল। তরীর বমি হওয়ার পরপরই মাথা চক্কর দিয়ে উঠলো। রুমি তরীকে পেছন থেকে ধরে বললো,

" কী হয়েছে ভাবী? শরীর খারাপ?"

তরী রুমির কাঁধে মাথা এলিয়ে দিয়ে বললো,

" সকাল থেকেই জানি না কী হলো। মাথাটা কেমন যেন ঘুরছে। গা'টা কেমন যেন গুলিয়ে আসছে।"

রুমি তরীকে পিঠে হাত বুলিয়ে দিয়ে বললো,

" বেশি খারাপ লাগছে ভাবী? একটু স্যালাইন গুলে দেই?"

তরী মাথা দুলিয়ে না বোঝালো। ফের বললো,

" কিছু লাগবে না। আমি একটু ঘরে গিয়ে ঘুমোলেই ঠিক হয়ে যাবে।"

রুমি আর কিছু বললো না। তরীকে ঘরে দিয়ে এসে ফ্যানের পাখাটা বাড়িয়ে দিলো। শোভার ঘরে উঁকি দিয়ে দেখলো শোভা ঘুমোচ্ছেন। আজ সকাল থেকেই বাড়িতে কাজ একটু বেশি ছিল কিনা। প্রথমে সব তরিতরকারি কুটে ফেলেছিলেন। তরীর পাসের খবর শুনে সব ফ্রিজে রেখে আবার মশলা বেঁটে রোস্ট চুলোয় দিয়েছিলেন। রুমি মধুবিবির ঘরের সামনে দিয়ে যাওয়ার সময় মধুবিবি বললেন,

" এই রুমি! এদিকে আয় তো।"

রুমি দরজা ধরে উঁকি দিয়ে বললো,

" কী হয়েছে বুবু?"

মধুবিবি আলনা থেকে বোরকা বের করে বললেন,

" তোর ভাবীরে বল ভালো কাপড় পইড়া ঘোমটা দিতে। খাজা বাবার মাজারে মোমবাতি দিতে যামু।"

রুমি প্রত্যুত্তরে বললো,

" ভাবী কীভাবে যাবে? ভাবীর তো শরীর ভালো নেই।"

মধুবিবি পানের পিক ফেলে বললেন,

" কেন? কী হইসে তাঁর?"

রুমি ঘরে এসে বললো,

" জিজ্ঞেস করলাম ভাবী বললো শরীর ভালো নেই। খাবার টেবিলেও তেমন কিছু খায়নি। যা খেয়েছিল বমি করে উগলে দিয়েছে।"

মধুবিবি সবটা শুনে রুমিকে বললেন,

" আমি একটু তোর ভাবীর কাছে গেলাম। তুই আমার ঘরে বয়।"

মধুবিবি সচারাচর তরীদের ঘরে সেভাবে আসেন না। আজ কী হলো কে জানে! ঘরে ঢুকেই তরীর মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বললেন,

" এই বউ? কী হইসে তোমার? "

তরী মধুবিবির গলা শুনে মাথা তুলে কোনো রকমে উঠে বসলো। টলমল করতে করতে বললো,

" কিছু না বুবু। ওই মাথাটা একটু ঘুরছে।"

মধুবিবি তরীকে ভালোমতো পর্যবেক্ষন করলেন। তাঁর চেনা চোখ কখনো ভুল করতেই পারে না। তরীকে ফিসফিস করে বললেন,

" এই মাসে সবকিছু ঠিকঠাক হইসে তোমার?"

তরী প্রথমে বুঝতে পারলো না। মধুবিবি আবার ইঙ্গিত করতেই বললো,

" না বুবু।"

মধুবিবি তরীকে ইশারায় উঠে দাঁড়াতে বললেন। তরী উঠে দাঁড়াতেই মধুবিবি তরীর পেট টিপে-টুপে কী যেন দেখতে লাগলেন। তরীর সেসব ঠিক বুঝলো না। মধুবিবি তরীর শাড়ির আঁচলটা ঠিক করে দিয়ে বললেন,

" তুমি হাত-মুখ ধুইয়া বসো। আমি দিলুর মায়রে ফোন লাগাইতেসি।"

তরী ধীর পায়ে হাতমুখ ধুতে চলে গেল। মধুবিবি ঘরে গিয়ে রুমিকে নিজের বাটন ফোনটা দিয়ে বললেন,

" দিলুর মা-রে একটা ফোন লাগা তো রুমি। আমার নাম নিয়া বল তাড়াতাড়ি আইতে।"

আধাঘন্টা পরে দিলুর মা সত্যি সত্যি এলো। বোরকা পরিহিত এক মধ্য বয়স্কা নারী। তরী তাঁকে দেখে উঠে দাঁড়ালো। মধুবিবি দিলুর মাকে উদ্দেশ্য করে বললেন,

" বউয়ের মাথা ঘোরে; বমি হয়। আমার তো মনে হইতাসে পেটে পোনা আসছে। তুমি একটু ভালোমতো দেখো তো দিলুর মা। বয়স হইসে ভুল ও হইতে পারে।"

দিলুর মা তরীকে বিছানায় বসিয়ে কী কী অদ্ভুত সব প্রশ্ন জিজ্ঞেস করলেন। মধুবিবির মতো পেট টিপে দেখলেন। চোখ, জিহ্বা সব দেখলেন। তারপর মধুবিবিকে বললেন,

" যা ভাবসেন তাই চাচী। পেটে সন্তান আসছে! মাসিকের তারিখ ধরলে এক মাসের মতোন চলে। তাও একটু ডাক্তারের কাছে নিয়া টেস্ট করাইয়া দেইখেন। খাওয়া দাওয়া বাড়াইয়া দেন। বউয়ের শরীর অনেক দূর্বল। এমনেই চিকনা-চাকনা তাঁর মধ্যে এখন পেটে আরেকজন। খেয়াল রাইখেন চাচী; আমি আসি।"

তরী সবটা শুনে বিস্মিত! খালাম্মা এটা কী বললো? আহসান বারবার করে বলে দিয়েছিল এখন যেন সন্তানের কথা তরী মাথায় না আনে। পিলগুলোও তো ঠিকঠাক নিয়েছিল। বাবুটা কীভাবে এলো পেটে? বাবুটার জন্যই কী আজকাল এত খারাপ লাগে? শুধু বমি পায় আর দূর্বল লাগে! তরী আহসানের বলা কথাগুলো মনে করতেই ভয়ে আতংকে কেঁদে ফেললো। আহসান বাবুটার কথা শুনলে তাঁকে আর আস্ত রাখবে না। যদি বার করে দেয় বাড়ি থেকে? বাবুটাকে যদি না মেনে নেয়? তরী বালিশে মুখ গুঁজে ঠোঁটে আঁচল গুঁজে কাঁদতে লাগলো। মধুবিবি তরীর কান্না দেখে হতবিহ্বল হয়ে বললেন,

" এই বউ? কী হইসে তোমার? শরীরটা বেশি খারাপ লাগতাসে? এমনে কানতাসো কেন? এক গ্লাস ঠান্ডা লেবুর শরবত কইরা দেই?"

তরী মধুবিবির শাড়ির আঁচল চেপে ধরে বললো,

" বুবু উনি আমাকে বাড়ি থেকে বের করে দেবেন। উনি এখন বাবু চান না। উনি বলেছিলেন বাবুর কথা যেন এখন একেবারেই মাথায় না আনি। উনি যে-ই ঔষধগুলো খেতে বলেছিলেন। আমি তো ওগুলো খেতাম। বাবুটা কীভাবে চলে এলো? উনি জানতে পারলে আমাকে ছেড়ে দেবেন। আমি সত্যি বলছি বুবু! আমি বাবুটাকে আনিনি। বাবুটা কী করে এলো আমি জানি না। আমি এখন কী করবো? ঔষধ খেয়ে নষ্ট করে দেবো বুবু?"

তরীদের কয়েক বাড়ি পরেই আনিস চাচাদের বাড়ি। আনিস চাচার দুটো বাবু। প্রথম বউ হঠাৎ স্ট্রোক করে মা'রা যাওয়ায় দ্বিতীয় বিয়ে করেছিলেন। বিয়ের সময় নতুন চাচীকে শর্ত দিয়েছিলেন কোনোদিন সে বাবু নিতে পারবে না। কিন্তু, বিয়ের আটমাস পরেই কীভাবে যেন নতুন চাচীর পেটে একটা বাবু চলে আসে। আনিস চাচা বাবুটার কথা শুনেই এলাকায় সালিশ বসিয়েছিল। মুরুব্বিদের সামনে বেলী চাচীকে বলেছিল যে বাচ্চাটা রাখলে চাচীকে সে তালাক দেবে। সংসার হারানোর ভয়ে পরে বেলী চাচী বাবুটা ঔষধ খেয়ে নষ্ট করে দিয়েছিল। আহসান এখন যদি সত্যি সত্যি তরীর নামে সালিশ বসায়? ভয়ে তরীর মুখ লাল হয়ে গেল। মধুবিবি তরীর অবস্থা দেখে বললেন,

" ছি ছি! কী কও এসব বউ? পেটের পহেলা প্রথম বাচ্চা। আল্লাহর রহমত এমনে নষ্ট করতে চাও? শোনো বাচ্চাটা আল্লাহ তোমারে রহমত হিসাবে দিসে। আমার আহসানরে আমি ভালো কইরাই চিনি। বাড়ি ফিরলে শান্ত হইয়া তারে বুঝায়া বললে সে বুঝবো। আর যত যাইহোক ভুলেও ওইসব উল্টাপাল্টা ঔষধ খাইবা না। আল্লাহর মাল আল্লাহ বুঝবো। ব্যাডা মানুষ ওইরকম অনেক কথাই কয়। সব কথা ধরতে নাই। হুদাই কাইন্দা শরীর খারাপ কইরো না। যাঁর কথা শুইনা কানতাসো। পরে দেখবা সন্তানের খুশিতে সেই ফালাইতাসে।"

মধুবিবি উঠে গিয়ে তরীর জন্য লেবুর শরবত বানালেন। তরী ঝাপসা চোখে গ্লাস হাতে নিয়ে বসে রইলো। বাবুটা তাঁকে কী মসিবতে ফেললো! তরী পেটে হাত রেখে বললো,

" তোমার বাবা তোমাকে চায় না বাবু। তুমি কেন আসলে? এখন যদি আমাকে উনি বার করে দেয়? আমার নামে সালিশ বসালে আমি কী করবো? তুমি কথা শোনো না কেন বাবু?"

তরী ঘর ছেড়ে সেদিন বেরোলোই না। কোথায় পাস করেছে আনন্দ করার দিন। বাবুটা তাঁকে কী বিপদে ফেললো! আহসান আসার আগে লুকিয়ে পরতে হবে। মধুবিবি আহসানকে সব বলে দিলে সর্বনাশ হয়ে যাবে! আহসান যদি তাঁকে মা'রে?

★

আহসান রাতে হেলতে দুলতে ক্লান্ত শরীরে বাড়ি ফিরলো। বাড়িতে ঢুকতেই মধুবিবি তাঁকে ডেকে পাঠালেন। আহসান গামছা দিয়ে কপালের ঘাম মুছে মধুবিবির ঘরে গিয়ে বসলো। মধুবিবি রুমিকে ইশারা দিয়ে ঘর থেকে বের হয়ে যেতে বললেন। রুমি তাই করলো। রুমি চলে যেতেই মধুবিবি আহসানকে বললেন,

" তোমার বউ তো কাইন্দা কাইটা ভাসায়া ফেলতেসে!"

আহসান হতভম্ব হয়ে বললো,

" কেন? পাসের খুশিতে? মেয়েটার কী হলো? খুশিতে বেহুশ হয়ে যাচ্ছে। আবার খুশিতে কেঁদে বুক ভাসাচ্ছে!"

মধুবিবি পানের খিলি বানাতে বানাতে বললেন,

" কী হইসে জানবা কেমনে? তুমি হইলা ব্যস্ত মানুষ। বউয়ের খবর রাখার সময় তোমার আছে?"

আহসান ভ্রু কুঁচকে বললো,

" কী হয়েছে বুবু তরীর?"

মধুবিবি পানের খিলি মুখে পুরে বললেন,

" কী হইসে শুনতে চাও? তাঁর পেটে তোমার সন্তান আসছে। দেড় মাসের সন্তান। সকালে সে এই কারণেই বেহুশ হইসে। দুপুরেও বমি কইরা সব উগলায়া দিসে। তুমি বউটার দিকে একটুও খেয়াল রাখো না।"

সন্তানের কথাশুনে আহসান চমকে উঠলো। বুকের ভেতরে কেমন যেন একটা অনুভূতির সৃষ্টি হলো। কাঁপা কাঁপা গলায় বললো,

" তরী বলেছে তোমাকে এসব?"

মধুবিবি কপট রাগ দেখিয়ে বললেন,

" তাঁর বলতে হইবো কেন? আমার চোখ নাই? দিলুর মা'রে ডাক দিয়া পাঠাইসিলাম। সেও দেইখা একই কথা বলসে।"

আহসানের শিরদাঁড়া খাড়া হয়ে গেল। সন্তান আসছে তাঁর? আবার ভয় হয়! তরীর অপোক্ত শরীর। এত ধকল সইতে পারবে তো? বাচ্চাটার জন্য তরীর যদি ক্ষতি হয়? আহসানকে নীরব থাকতে দেখে মধুবিবি বললেন,

" শোনো ভাই, সন্তান হইলো আল্লাহর তরফ থেইকা আসা নেয়ামত। তুমি তারে বলসো তুমি এখন সন্তান চাও না। তোমার ভয়ে সে আমারে বলতেসে ঔষধ খাইয়া বাচ্চা নষ্ট কইরা ফেলবো। বাচ্চাটার দোষ কী? সন্তানের কথা শুইনা তাঁর সঙ্গে রাগারাগি কইরো না। আল্লাহ খুশি হইয়া দিসে; মাইনা নেও। বাচ্চায় যখন আব্বা কইয়া ডাকবো। তখন দেখবা কইলজা কেমন ঠান্ডা হইয়া যায়।"

আহসান মুখে কিছু বললো না। তরীর ওপরে মনে মনে প্রচন্ড ক্ষিপ্ত হলো। নাহয় কথার ছলে তরীকে সে বলেছিল যে এখন তাঁর বাচ্চা চাই না। ইচ্ছে ছিল তরীর পড়াশোনা একটা স্টেবল পর্যায়ে এলে সন্তান নেওয়ার। কিন্তু, এখন যখন বাচ্চাটা চলেই এসেছে। তাঁকে ঔষধ খেয়ে নষ্ট করবার মতো ভয়ানক কথা কী করে মুখে তুললো তরী? যতই হোক সন্তানটা তাঁর। তরী সন্তানটাকে এভাবে হেলায় হারিয়ে দিতে কেন চাইছে? বাচ্চাটার শরীরে আহসানের র'ক্ত বইছে। সেটা কী ভুলে গেছে তরী? আহসান শান্ত স্বরে বললো,

" বুবু আমি এখন সন্তান চাইনি সেটা সত্য। তরীর বয়স কম; অপরিপক্ক শরীর। চেয়েছিলাম তরীর পড়াশোনা একটা স্টেবল পর্যায়ে এলে সন্তান নেবো। সন্তান এসেছে তা নিয়ে আমার কোনো আপত্তি নেই। কিন্তু, তরীর ওপরে প্রচন্ড মেজাজ খারাপ লাগছে। কী বুঝতে কী বুঝেছে কে জানে! নিজের সন্তান নিয়ে ওসব কেউ ভাবে?"

মধুবিবি আহসানের পিঠে হাত বুলিয়ে দিয়ে বললেন,

" বুঝে নাই হয়তো। থাক তারে বকাঝকা কইরো না। একটু খেয়াল রাইখো। শরীরটা অনেক দূর্বল। এখন তো আর একলা না। পেটে আরেকজন আছে।"

আহসানকে মধুবিবির ঘর থেকে বের হতে দেখে তরী বুক খামচে ধরলো। সর্বনাশ! বুবু সব বলে দিয়েছে আহসানকে। কী হবে এখন? ভয়ে তরী দরজার সামনে দাঁড়িয়ে রইলো। আহসান ঘরে ঢুকতেই নিচে বসে আহসানের পা জড়িয়ে ধরে বললো,

"বিশ্বাস করুন আমার ভুল হয়ে গেছে। বাবুটা কীভাবে এলো জানি না। আপনি পিলগুলো দিয়েছিলেন না?ওগুলো নিয়ম করে সত্যি খেয়েছিলাম। আপনি না চাইলে ঔষধ খেয়ে বাবুটাকে নষ্ট করে দেবো। আপনি তাও আমাকে ছেড়ে দেবেন না! আপনি যা বলবেন তাই করবো। আমাকে দরকার হলে বাড়ি পাঠিয়ে দিন। তাও আমাকে তালাক দেবেন না!"

আহসান দীর্ঘশ্বাস ফেলে তরীকে টেনে ওপরে তুললো। কাঁদতে কাঁদতে তরীর হেঁচকি উঠে গেছে। তরীর গালে হাত রেখে বললো,

" তুমি আমাকে এতটা খারাপ ভাবো তরী? একটা সন্তান বাবা মায়ের ভুল হয় কখনো? এই সন্তানটা তোমার প্রতি আমার ভালোবাসার প্রতীক।আর তুমি ওকে নষ্ট করতে চাইছো?"

তরী কোনো জবাব দিতে পারলো না। আহসান তরীকে বিছানায় বসিয়ে বুকে টেনে নিলো। কপালে চুমু দিয়ে বললো,

" এখন থেকে আর হেয়ালি করবে না। রোজ এক গ্লাস করে দুধ আর দুটো ডিম খাবে। ভারী কাজ করার দরকার নেই। এখন কিন্তু আর একা নও। বাবুটার একটু খেয়াল রাখতে হবে তো নাকি?"

তরী আহসানের বুক থেকে মাথা উঁচু করে বললো,

" আপনি আমার ওপরে রেগে নেই তো? আমি কিন্তু ইচ্ছে করে.."

আহসান তরীকে বাকিটুকু শেষ করার আগেই থামিয়ে দিয়ে বললো,

" ওসব থাক। বাবু নিজে থেকে আসতে চেয়েছে। তাই এসেছে! ওসব নিয়ে এত ভেবে কাজ নেই। যা বলেছি মনোযোগ দিয়ে শুনবে। শরীরের কী হাল দেখেছো?নিজের আর বাবুর দুজনের খেয়াল রাখবে।"

তরীকে সবকিছু বুঝিয়ে দিয়ে আহসান যে-ই না তরীর পেটে হাত রাখলো। তরী সুরসুরিতে খিলখিল করে হেসে উঠলো।আহসান পেটে হাত রাখা অবস্থাতেই বললো,

" বাবুর আম্মু হাসছে কেন?"

তরী খিলখিল করে হাসতে হাসতে বললো,

" বাবুর বাবা বাবুর আম্মুকে বকেনি তাই!"

★

সকালে আহসান তরীকে নিয়ে ডক্টরের কাছে গেল। তরীকে বেশ কিছু টেস্ট আর আল্ট্রা করতে দেওয়া হলো। ডক্টর খাওয়া দাওয়ার একটা চার্ট দিয়ে দিলেন। সেই থেকে তরীর ওপরে অত্যাচার শুরু হলো। সকালে নাস্তায় আহসান তাঁকে ঠেসেঠুসে জোর করে খাওয়ায়। দুপুর থেকে শোভা একটার পর একটা তরীর জন্য তৈরি করতেই থাকেন। রাতের কথা মনে করলে তরীর আরো ভয় হয়। বাবু আসার পর থেকে রীতিমতো তাঁকে খাওয়া দাওয়া নিয়ে কী যে ঝামেলায় পরতে হচ্ছে। কিছুই মুখে রুচে না। মধুবিবি বাজার থেকে শুকনো বরই আর তেঁতুল কিনে তরীর জন্য আঁচার করেছেন। তরী এতে বেজায় খুশি। আজকাল তাঁর আরো বেশি বেশি টক খেতে ইচ্ছে হয়। মধুবিবিও আজকাল খুব ব্যস্ত। দিনরাত এক করে বাবুর জন্য কাঁথা সেলাই করেন।

চলবে...

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ১৮তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন