#প্রেম_আমার♥(সিজন-২)
#পর্ব-০৩♥
#আয়ানা_জাহান(নুসরাত)♥
ক্যাম্পাসের এক কোণায় নিজের গালে নিজেই একের পর এক থাপ্পড় মেরে চলেছি। ব্যাপারখানা বড়ই অদ্ভুত হলেও উপায় না পেয়ে এমন চরম বিব্রতকর পরিস্থিতির স্বীকার হয়ে নিজের গালটাকেই লাল বানাতে হচ্ছে আমায়। এমনটা কিন্তু নয় যে আমি কোনো ভুল করে অতঃপর নিজের ওপর নিজেই ক্ষিপ্ত হয়ে এরকম উদ্ভট কাহিনী বাধিয়েছি। তেমন হলে দুটো থাপ্পড়ই যথেষ্ট ছিলো! এটা কোনো ভুলের অনুশোচনা টাইপ থাপ্পড় নয়, এই থাপ্পড় কোনো মহামূল্যবান ব্যক্তির শাস্তি স্বরূপ থাপ্পড়!
ভার্সিটির প্রথম দিন একটি শিক্ষার্থীর জীবনে এক নতুন অধ্যায় স্বরূপ! এই দিনটির জন্য হাজারো জল্পনা-কল্পনা সাজিয়ে প্রত্যেকের মতোই আমি এবং রাত্রিও হয়ে ছিলাম উদ্বিগ্ন। কতশত প্লানিংয়ে মুখরিত করেছিলাম চারিপাশ! অথচ এই দিনটিই আমার জীবনের সবথেকে নিকৃষ্টতম দিন হয়ে দাঁড়াবে তা আগে জানা থাকলে নির্ঘাত ইন্টারমিডিয়েট পর্যন্তই পড়াশুনা থামিয়ে রাখতাম আমি।
তো চিন্তাধারা মাফিক আমাদের রাজশাহী ফেরার ৪ দিনের মাথায় ভার্সিটির ক্লাস শুরুর ডেইট ফিক্সড করে জানিয়ে দেওয়া হয়েছিলো। রাত্রিকে মেস থেকে পিক করে নিজের ভার্সিটি যাওয়ার পথে ভাইয়াই নামিয়ে দিয়েছিলো আমাদের। সাথে আগেভাগেই ওয়ার্ন করে দিয়েছিলো কোনো আকাম-কুকাম করা থেকে সাবধান থাকতে। ছিলামও তাই! নতুন নতুন সবার সাথেই পরিচিত হচ্ছিলাম। বেশ ভালোই কাটছিলো সময়। আমাদের নবীনদের বরণ করবার উদ্দেশ্যে ক্যাম্পাসের মিডিলে ছোট করেই একটি স্টেজ বানানো হয়েছিলো। সকল নিউ কামারদের জন্য বরাদ্দ ছিলো একটি করে রজনীগন্ধা ফুলের স্টিক। প্রোফেসর এবং ভার্সিটির দুজন সিনিয়র ফুল উপহারের দায়িত্ব নিয়োজিত ছিলেন।
আমি-রাত্রি ভার্সিটির "সাবাস বাংলাদেশ" ভাস্কর্যটি ঘুরে ঘুরে দেখবার চক্করে স্টেজ থেকে বেশ খানিকটা দূরেই চলে গিয়েছিলাম। নাম এনাউন্সমেন্ট করার সময় একবারের বেশি দুবার কানে পৌঁছোতেই কান খাঁড়া করে ছুট লাগিয়ে পৌঁছাই দুজনেই। রাত্রি প্রথমে গিয়ে প্রোফেসারের হাত থেকে ফুল নিচ্ছিলো। পেছনেই ঘাড় ঘুরিয়ে আরেকজন প্রফেসরের সাথে কথা বলছিলো বেশ লম্বা গড়নের কেউ। আমি সিরিয়ালে দাঁড়িয়ে এদিক-ওদিক চোখ বুলিয়ে যাচ্ছিলাম। বেশকিছুক্ষণ যাবৎই লক্ষ্য করছিলাম একটা ক্যারেক্টরলেস মশা আমায় যখন তখন চুম্মা থুক্কু আই মিন হুল ফুটিয়ে দিয়ে উড়াউড়ি করছিলো। তার রক্ত খাওয়ার সম্মীলনে ব্যাঘাত ঘটিয়ে নড়াচড়া করার এক পর্যায়ে মশাটি উড়ে গিয়ে বসে সেই ঘাড় ঘুরিয়ে রাখা ছেলেটির গালের ওপর। সত্যি বলতে তখন নিজের সেন্সে ছিলাম না আমি। মেজাজ প্রচন্ডরকমভাবে বিগড়ে যাওয়ায় আউট অফ মাইন্ড হয়ে মশাটাকে ভর্তা বানাবার উদ্দেশ্যে সোজা ছেলেটির গালে চাপড় বসিয়ে দিয়েছিলাম। সাথেসাথেই থমকে দাঁড়ায় কোলাহল পূর্ণ পরিবেশ! প্রোফেসারেরা সহ উপস্থিত প্রতিটি সদস্যই গোলগাল চোখ নিবন্ধন করে আমার ওপর। এদিকে মশাটার জান কবজ করার খুশিতে পৈশাচিক আনন্দ পাওয়া আমিটাকেও ভেংচি কেটে ফুসসস করে পালিয়ে যায় মশাটাও! আমি তৎক্ষণাৎ হাত সরিয়ে ভয়ার্ত চোখে তাকাই চাপড় মেরে দেওয়া মানুষটির দিকে। বেশকিছুক্ষণ একই ভাবে নিশ্চুপ হয়ে থেকে হঠাৎ করেই নিজের রক্তাক্ত চক্ষু নিক্ষেপ করে বসেন তিনি আমার ওপর। প্রায় সাথেসাথেই ভয়ে আঁতকে উঠে প্রায় স্টেজ থেকে পড়েই যেতে নিয়েছিলাম আমি। রাত্রি চটজলদি বাহু চেপে সামলে নেওয়ায় নির্ঘাত বাচাকুচা প্রেস্টিজটার ফালুদা হওয়া থেকে রক্ষা পেয়েছিলাম। অনাকাঙ্ক্ষিত কাউকে সেই মুহুর্তে চোখের সামনে দেখে চোখ খুলে হাতে চলে আসার মতো অবস্থা হয়ে পড়ে আমার। ইনি নাকি ফেমাস ড্যান্সার! তবে ভার্সিটিতে কি করছেন এই ভেবেই মাথাটা ১৮০° ডিগ্রি এংগেলে ভনভন করতে শুরু করে। পাশাপাশি নিস্তব্ধতায় মোড়ানো পরিবেশটা হঠাৎ করেই পূর্বের তুলনায় বর্গ আকারে চেঁচিয়ে মার্কেট পাবার উদ্দেশ্যে যেনো ছুট লাগায়। রাগে থরথর করে কাঁপতে থাকা সাদা বিলাইয়ের বিপরীতে সেই মুহুর্তে ঠিক কি জবাব দেওয়া উচিত, তা জানা ছিলো না আমার। যার দরুন প্রফেসরদের বিস্ময়মাখা চাহনিকে সাক্ষী রেখেই আমতা-আমতা করে বলে ফেলি,
----- "আ...আসলে হয়েছে কি ভাইয়া, আপনি তো জানেন দেশে ডেঙ্গুর প্রকোপ বেড়েছে। আর দিনের বেলায় তো এডিস মশাই কামড়ায়, তাই তো আপনাকে ডেঙ্গুর লম্বা লম্বা হাত থেকে বাঁচাতেই গালে থাপ্প...থুক্কু আই মিন হাত দিয়ে মশাটা মেরে দিয়েছি আরকি!"
বিপরীতে কিছু বলেন নি উনি! ততোক্ষণে জনে জনে হাতে মোবাইল নিয়ে ফটোগ্রাফি প্রতিযোগিতায় নেমে পড়েছে যেনো। নীবিড় ভাইয়া পরিবেশ প্রতিকূলে বুঝেই জোরপূর্বক হেসে স্যারদের নিশ্চিন্ত থাকতে বলে আমার দিকে আবারও ফিরে তাকান। দাঁতে দাঁত চেপে চাপা গর্জনে বলেন,
----- "ইউ স্টুপিড! তোমায় তো আমি পরে দেখে নিচ্ছি।"
একথা বলেই স্টেজ থেকে নেমে পড়েন উনি। উনার পিছুপিছু অন্যান্য স্টুডেন্টরাও যেতে নিতেই দু'জন কালো পোষাক পরিহিত ভদ্রলোক হাত দেখিয়ে থামিয়ে দেন তাদের। উনি স্থান ত্যাগ করতেই করুন চোখে তাকাই আমি প্রফেসরদের পানে। রাত্রি কোথায় কিছু একটা বলে আমায় বাঁচিয়ে দেবে তা না, সেই অদৃশ্য লেজ বিশিষ্ট সাদা বিলাইকে দেখেই ফিউজ উড়ে গিয়েছিলো তার। এই ফাঁকে স্যারেরা হাত দেখিয়ে বাকি স্টুডেন্টসদের শান্ত হতে বলেন। "এটা নিতান্তই একটা এক্সিডেন্ট মাত্র" এই বুঝ দিয়েই থামিয়ে রাখেন সকলকে। আমি ঠোঁট উল্টে অসহায় দৃষ্টিতে আশরাফুল নামক দাড়ি ওয়লা এবং টুপি পরিহিত স্যারের দিকে তাকাই। সেই মুহূর্তে উনাকেই একটু নরম এবং সুবিধা টাইপ ঠেকায় মিনমিন করে বলি,
----- "সরি স্যার! আমি তো স্রেফ উনার উপকার করতে চেয়েছিলাম। এরকম একটা সিচুয়েশনে ক্রিয়েট হয়ে যাবে ভাবিনি সত্যি!"
আশরাফুল স্যার ব্যাপারখানা নিউজ হয়ে যাবার ভয়ে এক প্রকার হেসে উড়িয়ে দেবার চেষ্টা চালান। এই নিয়ে যতো মাথা ঘামানো হবে ততই বেশি কথা উঠবে বুঝতে পেরে সেখানেই ঘটনাটির ইতি টেনে আবারও পূর্বের সিডিউল অনুযায়ী শুভেচ্ছা জানানো কার্যক্রমে ব্যস্ত হন। আমি চোখ-মুখ কুঁচকে কোনোরকমে ফুলের স্টিক হাতে নিয়েই রাত্রিকে টেনে এনে নেমে পড়ি স্টেজ থেকে। রাত্রি উত্তেজনায় একপ্রকার লাফাতে শুরু করে তক্ষুনি। সুপারস্টার "সাদমান শাহরিয়ার নীবিড়" কি-না আমাদের ভার্সিটিরই একজন স্টুডেন্ট, ব্যাপারটা হজম করতেই তার লেগে যায় আধঘন্টা মতো। এদিকে আমি আল্লাহ-আল্লাহ করে গুটিগুটি পায়ে এক কোণায় গিয়ে সকলের দৃষ্টির আড়াল হবার চেষ্টা চালাই। তবে ওইযে আমার ছেঁড়া-ফাটা কপাল! ঠিক 'যেখানেই বাঘের ভয়, সেখানেই সন্ধ্যে হয়' টাইপ ধাঁধায় ফেলে আমায়। সাদা বিলাইটার মুখের সামনে পড়তেই এক লম্বা রেখা বিশিষ্ট বাঁকা হাসির রেশ ঠোঁটের কোণায় ফুটিয়ে তোলেন তিনি। আর তারপর কি হয়েছে তাতো দৃশ্যমানই! গুনেগুনে নিজের গালে নিজেকেই ১০০ টা থাপ্পড় মারবার শাস্তি দিয়েছেন উনি আমায়। তাতে সঙ্গ দিয়েছেন উনার কিছু চ্যালাপেলাও!
সূর্যের প্রখর রোদে ঘাসে মোড়ানো মাঠটা যেনো দর্পন না হয়েও আলো প্রতিফলনে ব্যস্ত। আকাশে থেকে থেকেই অন্যান্য পাখিদের তুলনায় দ্বিগুণ উচ্চতায় উড়ে বেরোচ্ছে একটা-দুটো চিল। সারিবদ্ধ গাছগাছালিগুলো প্রকৃতির তপ্ত হাওয়ায় ঘাড় বাঁকিয়ে দোদুল্যমান। পুরো ক্যাম্পাস জুড়ে যে যার কাজে ব্যস্ত থাকার ভাবভঙ্গি দেখালেও ঠিকই আড়ালে আড়ালে আমায় নিয়ে কানাঘুঁষায় মুখরিত করছে নিজেদের আড্ডামহল। পাশ কাটিয়ে চলা শিক্ষার্থীরা দেখেও না দেখার ভান করে মুখ ঘুরিয়ে হেসে চলেছে। একবারের বেশি দুবার তাকালেই যে তাদেরও নাম ক্রিমিনালদের খাতায় উঠে যাবে এও স্পষ্ট। এই খোলামেলা পরিবেশেও দম আটকে রাখা আমি, অবশেষে পুরো একশোখানা থাপ্পড় গিলে নিয়ে স্বস্তির শ্বাস ফেললাম। নিজের টমেটো মার্কা গালদুটোয় হাত বুলাতে বুলাতে ঠোঁট উল্টে রাত্রির দিকে তাকালাম ইশারার আভাসে। রাত্রির চোখে-মুখে আমার কষ্টের তুলনায় সো কল্ড স্টার নীবিড়ের অটোগ্রাফ না পাবার হতাশার ছাপই বেশি৷ তখন আবারও খাতা-কলম বের করতে নিতেই রাত্রিকে থামিয়ে দেন উনি। দু'হাতে ভাঁজ করে দাঁড়িয়ে দৃঢ় গলায় বলেন,
------ "ভার্সিটিতে আমি জাস্ট একজন স্টুডেন্ট মাত্র এন্ড অলসো তোমাদের সিনিয়র। আদার্স পরিচয় ক্যাম্পাসের বাহিরে। এখন এসব নয়! তোমরা নিউ কামার, মেইবি অনেকেই আমার সিস্টেম জানো না। কয়েকদিন ক্লাস করো, পরিবেশ পরিস্থিতি দেখো, দেন বুঝবে নিশ্চয়।"
একথা শুনার পর রাত্রির ক্ষুদ্র হৃদয়টা যেনো অতিমাত্রায় ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র কণায় পরিণত হয়। অথচ এদিকে যে তাহার বেস্টুকে চড়-চাপড়ের বিশ্রী এক শাস্তি দিয়েছেন উনি, তাতে বিন্দুমাত্রও ভ্রুক্ষেপ ছিলোনা তার।
নীবিড় ভাইয়া এতোক্ষণ যাবৎ কারো সাথে হয়তো ফোনে কথা বলছিলেন। এদিকে যে আমার ১০০ খানা থাপ্পড় খাওয়া সাড়া তাতে কোনো হেলদোলই নেই উনার। মেজাজটা ক্রমশই বিশ্রী পর্যায়ে পৌঁছে যাচ্ছে আমার। উনার সাথে থাকা ২-৩ টি ছেলে যারা এতোক্ষণ যাবৎ আমায় শাস্তি দিতে চরমভাবে উৎসাহিত করবার দায়িত্বে নিয়োজিত ছিলো তারাও চুপচাপ সটান হয়ে দাঁড়িয়ে আছে চুপচাপ। নিজ থেকে ডাকতেও ইচ্ছে হচ্ছে না ব্যাটাকে। তবু উপায় নেই। রাত্রি আমার থেকে প্রায় ৪ হাত দূরে দাঁড়িয়ে। সেই হিসেবে ওকে ডাকতে গেলে নীবিড় ভাইয়ার কান টপকে ডাকাতে হবে তা স্বাভাবিক। তাই আর সাত-পাঁচ না ভেবেই মনোবল স্থির করে হাক ছাড়লাম আমি,
----- "এইযে মি. সাদা...থুক্কু নীবিড় ভাইয়া?"
নীবিড় ভাইয়া কান থেকে ফোনটা নামিয়ে তৎক্ষণাৎ কপালে ভাঁজ ফেলে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকালেন। আমি হাতের ইশারায় বোঝালাম পুরো ১০০ খানা থাপ্পড় খেয়ে পেট ফুলানো হয়ে গিয়েছে আমার।
---- "জারা, আই উইল কল ইউ লেটার ওকে?"
ফোনের ওপাশের ব্যক্তিটিকে একথা বলেই ফোন কাটলেন উনি। দু'ধাপ এগিয়ে এসে পকেটে দু'হাত গুঁজে সটান হয়ে দাঁড়িয়ে বললেন,
----- "নাও লিভ! এন্ড ইটস লাস্ট ওয়ার্নিং, ভালো হয়ে যাও। নয়তো কপালে খুব বেশি ভালো দিন নেই তোমার, কথাটা যেনো মাথায় থাকে।"
বলেই শার্টের হাতা গোটাতে গোটাতে উল্টো দিকে ফিরলেন উনি। আবারও কিছু মনে পড়ায় চোখে সানগ্লাস পড়ে নিয়ে, নিজের সিল্কি চুলগুলোর মাঝে হাত চালাতে চালাতে বললেন,
----- "এন্ড ওয়ান মোর থিংক, নাম কী তোমার?"
আমি চোখ-মুখ কুঁচকে অনিচ্ছা সত্ত্বেও জবাব দিলাম,
----- "জ্বি, আয়ানা জাহান অনন্যা!"
----- "ফার্স্ট ইয়ার.....কোন ডিপার্টমেন্ট?"
----- "কেমিস্ট্রি!"
আমার ছোট্ট করে দেওয়া জবাবে মৃদু হাসলেন উনি। উল্টো দিকে ফিরে পকেট থেকে মাস্ক বের করে পড়তে পড়তে অন্য ছেলেগুলোর উদ্দেশ্যে বললেন,
----- "শুভ, ওর নামটা মার্ক করে রাখ লিস্টে।
আর রাহিত.....সিনান গ্যারেজ থেকে গাড়ি বের কর। তোমাদের জারা ম্যামের সাথে যেই পার্সোনাল মিটিংটা ফিক্সড করা ছিলো, ওটা এটেন্ড করবো, ফাস্ট!"
_________________________________
রেগেমেগে বাড়ি ফিরেই সোফায় সজোরে লাথি মেরে চেঁচিয়ে উঠলাম আমি। তখনকার কেয়ার লেস ভাব জমিয়ে ফ্রেন্ডশিপ ভুলে যাওয়া রাত্রিও মেসে না গিয়ে ক্ষমা চাইতে এসেছে আমার পিছুপিছু। খুশিখুশি ভাব নিয়ে ভার্সিটির উদ্দেশ্যে রওনা হওয়া আমিকে এভাবে লাল-নীল-বেগুনী টাইপ মুখ করে বাসায় ফিরতে দেখে চিন্তিত হলেন মা জননী। হাতে থাকা খুন্তি কিচেনেই ফেলে বেরিয়ে এলেন কপালের ঘাম মুছতে মুছতে। আব্বু সোফার এক কোণায় বসে নিউজপেপারে মুখ গুঁজে ছিলেন। অর্ধেক খালি করা চায়ের কাপটা অধৈর্য্য হয়ে টেবিলে রেখে আমার উদ্দেশ্যে প্রশ্ন ছুড়লেন,
----- "আরে আয়ু, কি হয়েছে তোর মা? এরকম বিহেভ করছিস কেনো? ভার্সিটিতে কিছু হয়েছে?"
আব্বুর সাথে গলা মিলিয়ে আম্মুও আমায় ঝাঁকালেন, উদ্বিগ্ন গলায় বললেন,
----- "৩৪° সেলসিয়াস তাপমাত্রার দরুন কি মেজাজটাও গরম হয়ে গিয়েছে তোর? রাত্রি, কি হয়েছে বলো তো।"
রাত্রি আমার দিকে ভয়ার্ত চোখে তাকালো। আমি চোখের ইশারায় চুপ থাকতে বলতেই আমতা-আমতা করে কিছু একটা মিথ্যে সাজাবার পরিকল্পনায় পতিত হলো অগত্যাই। তবে খুব বেশি ভাবতে হলো না তাকে। তার আগেই সোফায় গা এলিয়ে দিয়ে বললাম,
----- "আর বলো না, রিকশাওয়ালা গুলোও না হয়েছে একেকটা। এখান থেকে এইটুকু ২০ টাকা ভাড়া আর চাইছে কতো যেনো?"
----- "কতো?"
----- "পঞ্চাশ টাকা!"
আব্বু-আম্মু দুজনেই হেসে ফেললেন। মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন,
----- "তুই হয়তো নতুন, বুঝতে পেরে বোকা বানাতে চেয়েছিলো।"
আমিও হেসে ভাব জমালাম। আমার অলসের ঢেঁকি ভাইয়ের কথা জিজ্ঞেস করতেই আম্মু জানালো ভাইয়া ফেরেনি এখনও। রুশো ভাইয়া খালামুনিদের ওখান থেকে ফিরে শাওয়ার নিতে ঢুকেছে। এই ফাঁকে রাত্রিকে খেতে বসালেন আম্মু। আমি গোসল করে খেয়ে নেবো বাহানা জুড়ে দিয়ে, আপাতত নিজের গালে নিজেই চড় মারা হাতদুটো দ্বারাই খাবার খাওয়ার অপমান ক্ষনিকের জন্য হলেও লুকোলাম। রাত্রি কোনোরকমে চটজলদি খেয়ে উঠে দাঁড়ালো। আমার কাছে আবারও বার কয়েক ক্ষমা চেয়ে নিয়ে বিদায় জানাতেই ঠোঁট বাঁকালাম আমি। ভেংচি কেটে বললাম,
----- "তোর মতো বেস্টু যেনো আমার প্রতিটি শত্রুর হয়।"
রাত্রি কাঁদো কাঁদো মুখ করে তাকালো। তার চোখেমুখে অনুশোচনা স্পষ্ট দেখে আর রাগ দেখিয়ে থাকতে পারলাম না আমি।
----- "চাল এবারের মতো মাফ করে দিলাম। বাট নেক্সট টাইম........!"
----- "আচ্ছা বাবা হয়েছে, এই আমি কান ধরে সরি বলছি, নাক ধরে করছি প্রমিজ! আর এরকম করবো না। এবার তো অন্তত হাস!"
আমি মুচকি হেসে গলা মেলালাম। রাত্রির বিদায় জানিয়ে সোফায় আবারও গা এলিয়ে দিলাম! খিটখিটে মেজাজটা ঠান্ডা করতে হবে আমার, আল্লাহ না করুক যেনো তৃতীয় বার সাদা বিলাইটার মুখও দর্শন করতে না হয় আমার!
____________________________
নিজের লম্বা চুলগুলো হাতের মুঠোয় নিয়ে ঘোরাতে ঘোরাতে বাগানের চওড়া পথে ধাপ ফেলে এগিয়ে চলছিলো রাত্রি। গুনগুনিয়ে গাওয়া সুরে, মুখ বাজছিলো তার কুমার সানুর গান! এমন সুখকর পরিবেশে হঠাৎ করেই আকাশ থেকে কোনোকিছু মাথার ওপর ঠাস করে পড়তেই থমকে দাঁড়ালো সে।
ওদিকে ছাদে নিজের ভেজা কাপড় গুলো নাড়তে এবং শুকনো কাপড় গুলো তুলতে উঠেছিলো রুশো। ক্লিপের সাথে বিশ্রীভাবে আন্ডারওয়্যারটা ফেঁসে যাওয়ায় এতোক্ষণ যাবৎ তার বিরুদ্ধেই যুদ্ধে নেমেছিলো সে। আন্ডারওয়্যারটা প্রায় ক্লিপ থেকে ছুটিয়ে নিতেই নিজের প্রতি প্রাউড ফিল করছিলো এমন সময় দমকা হাওয়ায় তা আলগাভাবে ধরে রাখার দরুন হাত ফসকে উড়ে যায় তার। তবে আন্ডারওয়্যারের তো আর পাখিদের ওপর পাখনা নেই, তাই আকাশে উড়ে যাবার বদলে ছাদ থেকে নিচে এক অনাকাঙ্ক্ষিত মানুষের মাথার ওপরই ল্যান্ড করে বসে সে। রুশো নিচে তাকিয়ে "ওহ নো!" বলেই বিস্ময়ে চোখ বড়বড় করে মুখে দু'হাত চেপে ধরলো। রাত্রির তীক্ষ্ণ চোখে লাভার ঝলকানি! তার মাথায় নিজের হোয়াইট কালারের আন্ডিটাকে নিশ্চিন্তে শুয়ে থাকতে দেখে চোখ-মুখে ঘূর্ণিঝড় এসে শা শা করে বইতে শুরু করেছে রুশোর। এই মুহুর্তে 'ফান্দে পড়িয়ে বগা কান্দেরে' গানটা খুব করে মনে পড়ছে তার। মান ইজ্জত যেটুকু ছিলো তা বিনা ওয়াশিং পাউডার ছাড়াই হাওয়ায় মিলিয়ে যাওয়ায় হতাশ কন্ঠে সে বলল,
----- "হায় আমার উড়ন্ত চাড্ডি, তুই কেন ভুলভাল জায়গায় ল্যান্ড করতি?"
#চলবে________________