#প্রেম_আমার♥(সিজন-টু)
#পর্ব-০৭♥
#আয়ানা_জাহান_নুসরাত♥
মেঘপুঞ্জের ফাঁকে ফাঁকে তীক্ষ্ণ আলোর ঝলকানি। বর্ষণের বেগ কমে এসেছে অনেকটা। ভেজা মাঠ, ভেজা রাস্তা, ভেজা ভবন! সবটা জুড়েই মেঘের কান্না বিরাজমান। কাঁদাপানি মাখা আমি, বৃষ্টিতে ভিজে চিপচিপে হয়ে গুটিসুটি মেরে রয়েছি। নিজেকে দু'হাতে ঢাকবার যথাসম্ভব চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। আমাদের ঘিরে দাঁড়য়েছে শতাধিক শিক্ষার্থী। সবার দৃষ্টির কেন্দ্রবিন্দু বর্তমানে আমি-নীবিড় ভাইয়া এবং সেই আগুন্তকঃ মেয়েটি!
নীবিড় ভাইয়া শার্ট ঝাড়তে ঝাড়তেই আমার দিকে চোখ গরম করে তাকালেন। ভেজা গা নিয়েও গলা শুকিয়ে আসছে আমার। পরনের জামা, পায়জামা, ওড়না সবটাই লেপ্টে আছে গায়ে। রাত্রি আমায় আড়াল করতেই পাশে এসে দাঁড়ালো। এর মাঝে আবারও প্রশ্ন ছুড়লো মেয়েটি,
----- "হেই ইউ, কি করছিলে তুমি নীবিড়ের সাথে? চোখে দেখতে পারো না? হ্যান্ডসাম ছেলে দেখলেই গায়ে পড়তে ইচ্ছে করে নাকি?"
নীবিড় ভাইয়া ঘাড় ঘোরালেন না। হাতের ইশারায় মুখটা আপাতত বন্ধ রাখতেই নির্দেশ দিলেন তাকে। মেয়েটি রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে চুপ করে রইলো। রাহিত ভাইয়ার হাতে ছিলো তখনকার সস লাগা সাদা শার্টটা। শুধুমাত্র দাগ লাগা জায়গায় পানি দেওয়ায় প্রায় শুকনোই আছে তা। নীবিড় ভাইয়া চোখের ইশারায় রাহিত ভাইকে শার্টটা দিতে বললেন। রাহিত ভাই বিনাবাক্যে উনার হাতে ধরিয়ে দিলেন তা। শার্টটা হাতে নিয়েই আমার দিকে এগোতে লাগলেন উনি। আমি নিজ থেকে আরো খানিকটা গুটিয়ে ধাপ ফেলে পেছালাম। পেছনে আরো কিছু মেয়েরা দাঁড়িয়ে থাকায় খুব বেশিদূর যেতে পারলাম না। থমকাতে হলো আমায় সাথে ভয়টা ক্রমশ বেড়েই চলল। এই বুঝি গালে পাঁচ আঙুলের ছাপ পড়লো আশংকা করেই চোখ-মুখ কুঁচকে ঘাড় বাঁকালাম আমি। তবে সন্দেহভাজন সেই চরম ভয়খানা বাস্তবে পরিণত হলো না। গালের থাপ্পড় পড়ার বদলে গায়ে জড়ালো এক স্তর আবরণ। আমি বিস্ময়ে চোখ খুলে তাকালাম। নীবিড় ভাইয়া আমায় শার্টটা পড়িয়ে দিয়েই উল্টো দিকে ফিরলেন। চোখমুখ শক্ত করে বললেন,
----- বাসায় যাও! আর এক মুহুর্ত তোমায় চোখের সামনে টলারেট করবোনা আমি।
----- স...স...সরি ভা....
----- আই সেইড আউট....!
উনার উচ্চস্বরে করা ধমকে কেঁপে উঠলাম আমি। যে যার স্থান থেকে ভয়ে সিটিয়ে রইলো। কেউ কেউ স্পট ছেড়ে ভয়ের বশিভূত হয়ে পালালো। কখন কার উপর জোয়ালামুখি উপচে পড়ে বলা বাহুল্য! আমি গুটিগুটি পায়ে এগোলাম কিছুদূর। রাত্রি এসে দু'হাতে আগলে নিলো আমায়। ফ্লোরে পড়ে থাকা ব্যাগটা টেনে কাঁধে উঠিয়েই হাটা ধরলাম দুজন। ধাপ ফেলে এগোবার মাঝেই চোখদুটো হঠাৎ ভিজে আসতে চাইলো। পাল্লা দিয়ে মোচড় দিয়ে উঠলো বুকটা। নাহ! নীবিড় ভাইয়ার জন্য নয়, উনি স্বভাবগত এমনই তা সেই প্রথম দিন থেকেই জানা কথা আমার। খারাপ লাগাটা কাজ করছে অন্য জায়গায়। ওই মেয়েটা কিছু না জেনে বুঝে কীভাবে আরেকটা মেয়েকে নিয়ে এতো বাজে মন্তব্য করতে পারলো? আরে যেই মেয়ের কিনা একটা ছেলে বন্ধু পর্যন্ত নেই তার দিকে কোন হিসেবে আঙুল তুলে বলল আমি ছেলেদের গায়ে পড়ি! শক্ত করে পলক ঝাপটে টলমলে চোখ দুটো থেকে অশ্রু গড়বার পূর্বেই আটকে নিলাম। ঠোঁটে ঠোঁট চেপে ব্যাথাটা সয়ে নিলাম নিশ্চুপেই। এর জবাব আমি দিবো, সুযোগ বুঝে সঠিক জবাবটা আমায় দিতে হবেই!
বাড়ি ফিরেই সর্বপ্রথম দেখা মিললো রুশো ভাইয়ার। প্রতিদিনকার মতোই চোখেমুখে বিচিত্র ভাব। আজ ভূতের বদলে পেত্নীর মুখোশ লাগিয়েছে সে। আমি কিছুক্ষণ ভাবলেশহীন চেয়ে রইলাম। রাত্রি মুখ ফুলিয়ে বলল,
----- "কী হচ্ছেটা কি এসব? দেখতে পারছেন না মেয়েটা কি অবস্থায় আছে? বাসায় ফিরতে না ফিরতেই আপনার প্রাঙ্ক শুরু!"
রুশো ভাইয়া তৎক্ষণাৎ মুখশ টেনে খুললো। আমায় পা থেকে মাথা অবধি দেখে নিতেই কপালে সুক্ষ্ম চিন্তার ভাঁজ ফুটে উঠলো তার। ব্যস্তস্বরে ভাইয়া প্রশ্ন ছুড়লো,
----- "হোয়াট ইজ দিস ছুটকি? ছাতা তো নিয়ে গিয়েছিলি, তবে গা ভেজা কেনো তোর? আর চেহারা এমন দেখাচ্ছে কেনো? রাস্তায় কিছু হয়েছে? কেউ টর্চার করেছে? কে করেছে ছুটকি বল! বল আমায়, আমি ওই রাসকেলের কলিজা ভুনা করে খাবো আই সোয়্যার!"
কথাটা বলেই শার্টের হাতা মোড়াতে লাগলো ভাইয়া। তার চোখেমুখে স্পষ্ট দুশ্চিন্তা সাথে অজানা কারো ওপর পাহাড় সমান ক্ষোভ। আমি চোখ উল্টে ভ্যাবাচেকা খেয়ে তাকালাম। ইতিমধ্যে ছোট্ট বিষয়টাকে তিল থেকে তাল বানিয়ে ফেলেছে রুশো ভাইয়া। মুহুর্তেই তাল থেকে রস বের করবার পূর্বে হাত দেখিয়ে থামালাম ভাইয়াকে। ব্যস্ত কন্ঠে বললাম,
----- "ভাইয়া ওসব কিছু না, তুমি ভুল ভাবছো। আসলে স্লিপ কেটে ইয়ার্ডে পড়ে গিয়েছিলাম, তাই আরকি জামা-কাপড় ভিজে গিয়েছে।"
রুশো ভাইয়ার অস্থিরতা বাড়লো বৈ কমলো না। আমার হাত পা খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে উল্টেপাল্টে দেখেতে দেখতে আবারও বলে উঠলো,
----- "বলিস কি ছুটকি! পড়লি কিভাবে? কোথায় ব্যথা লেগেছে তোর? হাতে লেগেছে, দেখি দেখি পায়ে লেগেছে নাকি খুব?"
আমি কপাল চাপড়ালাম কিছুক্ষণ। রুশো ভাইয়াটা যে আমায় মশা কামড়ালেও ব্যস্ত হয়ে মশার গালে থাপ্পড় মারতে চায় এ নতুন নয়! অথচ ভাইয়া কি জানে যে মশার গাল তার একটা নখের থেকেও হাজার গুণ ক্ষুদ্র?
জানে হয়তো। তবু মন মানে না ভাইয়ার! ভাইয়াকে থামাতে মাথাটা না সূচক ডানে-বামে নাড়ালাম আবারও। মুখে বললাম,
----- "আহা রুশো ভাইয়া, ওসব কিচ্ছু হয়নি আমার। এই গা ভিজেছে যা! তুমি টেনশন করো না তো। আমি চেঞ্জ করে এসে বলছি।"
রাত্রি বিরক্তি নিয়ে বলল,
----- "মেয়েটার ঠান্ডা লেগে যাবে এভাবে। এতো প্রশ্ন বাদ দিয়ে আন্টিকে বলুন গরম গরম আদা-চা বানিয়ে আনতে। অসুস্থ হয়ে পড়লে মসিবত!"
রুশো ভাইয়া এক মুহুর্ত দাঁড়ালো না। এই ফাঁকে ঘরে চলে এলাম আমি। রাত্রি বিছানায় বসেই অপেক্ষার প্রহর গুনছিলো। শাওয়ার নিয়ে বেরোতেই চোখ কোটর থেকে বেরিয়ে আসার উপক্রম হলো আমার। ঘর সুদ্ধ একটা নয়, দুটো নয় পুরো পাঁচ পাঁচটে মানুষের বিচরণ। আমায় ওয়াশরুম থেকে বেরোতে দেখেই একে একে প্রশ্ন ছুড়তে লাগলো সবাই। আম্মুর-ভাইয়ার অভিযোগে মাখা ধমক, আব্বুর আদুরে গলায় চিন্তার রেশ, রুশো ভাইয়া বুলিতে অভিমানে মাখা কিছু আমেজ। আমি গুটিগুটি পায়ে বিছানায় ভাইয়াদের মাঝে চুপটি করে বসলাম। রাত্রি এতোক্ষণে হয়তো আমার "ধপাসধুপুস" কাদায় লুটুপুটু খাওয়ার কাহিনী ব্যক্ত করে ফেলেছে। তবে "নীবিড় ভাইয়াকে" যথাসম্ভব উহ্য রেখেই।
ভাবনার মাঝেই হঠাৎ মাথায় টোকা পড়লো। অগ্নি ভাইয়ার ভ্রু কুঁচকানো। একমাত্র এই বান্দা ছাড়া কথায় কথায় আমার ওপর ঠাসঠুস কেউ করে না বিধায় টোকার উৎস খুঁজতে খুব বেশি বেগ পেতে হলো না। বিনিময়ে চোখমুখ কুঁচকে তাকালাম আমি। ফোসফাস করতে করতে বললাম,
----- "সমস্যা কি ভাইয়া? বলা নাই কওয়া নাই হুটহাট মারিস কেন?"
----- "চুপ কর! ঠিকঠাক দাঁড়াতে পারিস না আবার মুখে মুখে কথা? আল্লাহ তো দু দুটো সুস্থ স্বাভাবিক পা দিয়েছে নাকি, তাহলে ধুমধাম যেখানে সেখানে উল্টে পরস কেন? চোখ কি বড়ই বানাইয়া গিলে খাইছস?"
---- "আহ অগ্নি! কি হচ্ছেটা কি? মেয়েটা বাই এনি চান্স পড়ে গেছে, কোথায় টেককেয়ার করবে তা না উল্টে বকাবকি করছো!"
অগ্নি ভাইয়া আব্বুর কথার বিন্দুমাত্রও তোয়াক্কা করলো না। উল্টে বলল,
---- "ওর টেককেয়ার করতে করতে বুড়ো হয়ে যাবো। তুমি কোনো না কোনো অঘটন তোমার মেয়ে ঘটাবেই। একে ভালো কথায় সোজা করা যাবে না। মেরে-ধরে হাটা শেখাতে হবে।"
ভাইয়ার রাগ দেখে আম্মু নিজের রাগটা ঝেড়ে ফেললেন। টাওয়েল দিয়ে মাথা মুছিয়ে দিতে দিতে বললেন,
----- "আচ্ছা ছাড় ওসব! যা হয়েছে তা হয়েছে। উফফফ! মেয়েটা এখন পর্যন্ত ঠিকমতো চুলগুলোও মুছতে শেখে নি। শ্বশুর বাড়ি গিয়ে কি করবে এই ভেবেই প্রেশার বাড়ছে আমার।"
আম্মুর বিপরীতে প্রতিবাদ করবার জন্য মুখ খুলবো তার পূর্বেই রুশো ভাইয়া বোকার মতো মাথা চুলকে বলে বসলো,
----- "আচ্ছা সবই বুঝলাম বাট মনি, এই "শ্বশু আংকেল"টা কে? এন্ড ছুটকি ওই টাক্কু আংকুর বাড়িতেই বা কেনো যাবে?"
রুশো ভাইয়ার প্রশ্নে একপ্রকার তদ্ধা খেয়ে একে অপরের দিকে তাকালাম আমরা। রুশো ভাইয়া ঠোঁট উল্টে চেয়েই রইলো উত্তরের প্রতিক্ষায়। আম্মু-আব্বুর অসহায় ভঙ্গিমায় কপাল চেপে ধরলেন। পেট ফাটা হাসির জোয়ারে ফেটে পড়লাম বাকিরা। অগ্নি ভাইয়া হাসতে হাসতেই খাটে শুয়ে পড়েছে প্রায়। রুশো ভাইয়া সকলের ভাবমূর্তি দেখে নিজের উল্টে রাখা ঠোঁটখানির পুরুত্ব আরো কিছু বাড়ালো। মিনমিন করে বাচ্চাবাচ্চা গলায় বলল,
---- "হেই ব্রো, তোমরা এভাবে 'মু ফারকে' হাসছ কেনো? হু ইজ শ্বশু আংকেল? জানলে বলবে তো নাকি?"
অগ্নি ভাইয়া পেট চেপে ধরেই কোনরকমে উঠে বসলো। মুখ টিপে হেসে রুশো ভাইয়ার পিঠে চাপড় মেরে বলল,
----- "ওটা শ্বশু আংকেল নয় রে পাগলা! ওটা হলো 'ফাদার ইন ল!' তাও না বুঝলে, সহজ ভাষায় বুঝাই। শ্বশুর মিনস 'তোর বাচ্চার মাদারের ফাদার!"
_________________________________
----- "হোয়াট আর ইউ ডুয়িং জারা? তোমায় বলেছিনা, যখন তখন ক্যাম্পাসে আসবানা। ওটা আমার ভার্সিটি, পড়াশুনা করার জায়গা, নট এনি প্লেস অফ হ্যাং আউট!"
জারা কফির কাপে চুমুক দিতে দিতে উত্তপ্ত শ্বাস ফেললো। নীবিড়ের কপালে ভাঁজ ফেলানো চেহারায় তাকাবার বিন্দুমাত্র ইচ্ছে নেই তার। বলুক যা বলার। আজ নিউ ড্রেস পড়েছিলো সেই সাথে সেজেওছিলো খুব করে। নীবিড় আজ দেখা করতে পারবে না শুনেই তো বাধ্য হয়ে ক্যাম্পাসে গিয়েছিলো সে। তা না হলে ইম্প্রেস করাটা যে টাফ হয়ে পড়তো। তবু সন্দেহ! নীবিড় আদৌ তার রূপে ইম্প্রেসড হলো তো? জারার দেখামতে একবারও মোহনীয় চোখে নীবিড় তাকায়নি তার দিকে। তবে কি সব পরিশ্রম ব্যর্থ হলো? এই নিরামিষ ছেলেটা কি কখনওই বুঝবে না তার ডিমান্ড?
নীবিড় টেবিলে ভর রেখে কপালে হাত দিয়ে স্লাইড করছিলো। জারাকে চুপচাপ কফির মগে চুমুক দিতে দেখে আবারও বলে উঠলো,
----- "চুপ করে আছো কেনো জারা? উত্তর দাও। জাস্ট স্পিক আউট ম্যান!"
----- "কি জবাব দেবো আমি? হোয়াট ডু ইউ ওয়ান্ট টু হেয়ার? কেনো তোমার পার্সোনাল লাইফে ইন্টারফেয়ার করার অধিকার নেই আমার? আমি তো তোমার গার্লফ্রেন্ড! তুমি কোথায় কি করো না করো তা জানার রাইটস আছে আমার।"
এতোক্ষণে মুখ খুললো জারা। নীবিড় কিছুক্ষণ থম মেরে রইলো। অতঃপর নিজেকে সামলিয়ে, চোখমুখ শক্ত করে বলল,
----- "এক কথা তোমায় কতোবার বলবো জারা? তুমি আমার উডবি হতে পারো বাট ইউ আর নট মাই গার্লফ্রেন্ড! আমি এসব লেইম রিলেশনশিপে ট্রাস্ট করিনা।"
জারা বিস্ফোরিত চোখে তাকালো৷ নীবিড় দম নিয়ে আবারও বলে উঠলো,
----- "আর এখানে পার্সোনাল লাইফের প্রশ্ন আসছে কোথায় থেকে? তুমি জানো আমি একজন পাবলিক ফিগার! প্রেস মিডিয়া সবসময় বসে থাকে কোনো না কোনো নিউজ লিক হওয়ার অপেক্ষায়। একটা ইস্যু, জাস্ট একটা ইস্যু পেলেই খবরের পাতায়, সোশ্যাল মিডয়ায় উল্টোপাল্টা নিউজের ছড়াছড়ি শুরু হয়ে যায়। যদিও আমি ওসব গায়ে মাখিনা তবুও একটা পার্সোনাল স্পেস বলে কথা আছে জারা! তুমি টাইম চাইছ আমি যতোটা সম্ভব তোমায় টাইম দিচ্ছি। রেস্টুরেন্টে বসে এইযে কফি খাচ্ছি, তাও কিন্তু একটা দুটো শো ক্যান্সেল করে। ভুলে যেও না, তুমি জাস্ট আমার উড বি ওয়াইফ। লিগ্যালি ওয়াইফ হওনি এখনও। তোমার যতোটা রাইটস আছে তার ঊর্ধ্বে গিয়ে অলয়েজ বসে থাকতে চাও তুমি। আমি হতে পারি পাব্লিকের কাছে সেলিব্রিটি, বাট আমি কোনো ফিল্মের হিরো নই। হাজার হাজার হিরোইন নিয়ে উঠবস করা যেমন আমার ধাঁচে যায়না তেমনই ওয়াইফ হবার পূর্বেই কোনো মেয়েকে নিয়ে এতোটা ক্লোজ হওয়াটাও আমার পার্সোনালিটির সাথে খাপ খায়না।"
জারা এবার কফি মগটা টেবিলে রেখে নড়েচড়ে বসলো। নীবিড়ের চোখে চোখ রেখে কঠিন গলায় বলল,
----- "সব সময় শুধু বিয়ে বিয়ে বিয়ে! বিয়ে ছাড়া কি আর কাপলরা নিজেদের মতো টাইম স্পেন্ড করছে না? আদার্স ছেলেরা যেখানে গার্লফ্রেন্ডের সাথে রুম ডেট পর্যন্ত চলে যাচ্ছে সেখানে আমাদের মাঝে কি হয়েছে বলতে পারো? হাতটাও কোনোদিনও ঠিকমতো ধরো নি তুমি আমার।"
নীবিড় হঠাৎ করেই সটান হয়ে দাঁড়িয়ে পড়লো এবার। দু'কান দিয়ে ধোঁয়া বেরোবার উপক্রম তার। জারার দিকে ফিরেও তাকালো না সে। দৃঢ় গলায় শুধু এটুকু বলল,
----- "ওসব নোংরামি আমার কাছে এক্সপেক্ট করার মতো বোকামি করো না জারা!"
প্রতিবারই নীবিড়ের মুখ থেকে লিমিটেশন লিমিটেশন এবং লিমিটেশন, এসব শুনতে শুনতেই কানটা পেকে গিয়েছিল জারার। কিন্তু এবার মুখের ওপরই এতো কড়া জবাব দেওয়ায় প্রচন্ড রাগ হলো তার। কি ভাবে কি নীবিড় নিজেকে? ভালোবাসাকে সোজা নোংরামি বলে দিতে বিন্দুমাত্রও বাঁধলো না তার? তবে কি জারাকে সে নোংরা মেয়ে বলছে? এসব কঠিনতম বাক্যগুলো নিজ মনে আওড়াতেই আওড়াতেই ব্যাগ হাতে উঠে দাঁড়ালো জারা।
----- "ইউ নো হোয়াট, ইউ আর জাস্ট ইম্পসিবল নীবিড়!"
একথা বলেই গটগট করে রেস্টুরেন্ট থেকে বাহিরের পথে হাটা ধরলো সে। পেন্সিল হিলের খটমটে আওয়াজ তার দূরত্ব বাড়ার সাথে সাথে ব্যস্তানুপাতিক হারে ক্ষীণতর হয়ে চললো। একটা সময় গিয়ে শ্রবণগোচর হওয়ার ক্ষমতা থেকেও বঞ্চিত হলো সেই আওয়াজ। দু হাতে মাথা চেপে ধরে বসে পড়লো নীবিড়। জারাকে বেরিয়ে যেতে দেখে সাইড কর্ণারে এগিয়ে এলো ওয়েটার। ভয়ার্ত গলায় জিজ্ঞেস করলো,
----- "এনিথিং রং স্যার?"
নীবিড় নিস্ফলক চোখে তাকালো। স্বাভাবিক গলাতেই জবাব দিলো,
----- "এভ্রিথিং ইজ ফাইন ম্যান, আমার একজন ফ্রেন্ড আসবে, সো তারই ওয়েট করছি।"
ওয়েটার মাথা ঝাঁকিয়ে সম্মতি জানালো। নিঃশব্দে বেড়িয়ে গেলো মুহুর্তেই। মোবাইলটা বের করে কারো নম্বর ডায়াল করলো নীবিড়। ফোন কানে ধরে অপেক্ষা করলো রিসিভ হওয়ার,
----- "বল ব্যাটা!"
----- "কোথায় আছিস?"
----- "কোথায় আবার বাসায়!"
----- "ক্যাফে আসতে পারবি?"
----- "কখন যাবো?"
----- "কতোক্ষণের মাঝে আসতে পারবি?"
----- "দেরি হবে, তুই ঘড়ি দেখতে দেখতে ঘুমা। ৫ মিনিট লং জার্নির পর আইতাছি!"
নীবিড় হাসলো। ছেলেটাকে কিছু বলার পূর্বেই দু'ধাপ গিয়ে থাকে সে সবসময়। তার ছলে ছলে ঠাট্টাও চলে রোজ। নীবিড় ছোট্ট করে শ্বাস ফেলে বলল,
----- "আয় তবে।"
----- "এই খাড়া খাড়া খাড়া, লাইন কাটিস না। তোর কফির মগ যদি দুইটা থেকে তিনটা হয় তাহলে কি খুব বেশি প্রবলেম হবে?"
----- "কথা না পেঁচিয়ে সোজাসাপটা বলে ফেল, কাকে আনতে চাচ্ছিস?"
----- "আরে ওইযে ফরেইন থাকতো, বলেছিলাম একদিন। আমার কাজিন, ভাই লাগে ভাই!"
নীবিড় দু'বারও ভাবলো না। প্রায় সাথেসাথেই জবাব দিলো,
----- "ছেলে মানুষ! সমস্যা কি, নিয়ে আয়!"
নীবিড়ের কথামতো দু'ভাই ঝড়ের বেগে পৌঁছালো ক্যাফেতে। ডিরেকশন অনুযায়ী সাউথ কর্ণারের কেবিনে বসেছিল নীবিড়। তারাও এগোলো সেই পথেই।
নীবিড় চেয়ারে গা এলিয়ে দিয়ে চোখদুটো বুজে রিল্যাক্স করছিলো। হঠাৎ নিজের ওপর ধারাম করে কোনো বস্তা পড়ায় ভড়কে গিয়ে চোখমুখ উল্টে তাকালো। রুশো নিজের উত্তেজনা কাবু করতে পারছে না। ফ্রেন্ডের সাথে দেখা করাবে বলে সোজা 'সাদমান শাহরিয়ার নীবিড়' এর কাছেই যে তাকে নিয়ে আসা হবে তা ঘূর্ণাক্ষরেও টের পায়নি সে। অগ্নি ঠিক এই ভয়টাই পাচ্ছিলো, যখন তখন যেখানে সেখানে রুশো নামক আতংকের ওপর বিন্দুমাত্রও বিশ্বাস হয় না তার। সারপ্রাইজ দিতে এসে নীবিড়কে দেখে এক্সাইটমেন্ট আকাশ ছুঁলেও, শরীরটাকে যে একেবারে ভর্তা বানিয়ে ফেলবে তা কল্পনায়ও ভাবে নি সে। নীবিড়ের দম বন্ধ হবার উপক্রম, অগ্নি চটজলদি টেনে রুশোকে ছাড়িয়ে নিলো তার থেকে। রুশো সরে যেতেই ঘনঘন শ্বাস টানতে লাগলো নীবিড়। অগ্নি চোখ গরম করে মাথায় ঠাস করে চাটি বসিয়ে দিলো রুশোর। রাগান্বিত গলায় ধমলের সুরে বলল,
----- "রুশো তোর কি মাথার ঘিলু গলে গেছে? ওইভাবে কারো ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে কেউ? মরে যেতো তো ও!"
রুশো ঠোঁট উল্টে অপরাধীর ন্যায় তাকালো। মিনমিন করে বলল,
----- "একচুয়ালি, ওটা যে আসলেই নীবিড় ব্রো তা বিশ্বাস করতে না পেরেই আরকি গায়েব হবার ভয়ে জাম্প মেরেছি। যখন তখন স্বপ্নে এসে গায়েব হয়ে যায় কিনা!"
অগ্নি কপাল চেপে ধরে ধপ করে পাশের চেয়ারে বসে পড়লো। নীবিড় এতোক্ষণে কথা পড়লো,
----- "অগ্নি ছাড় না, ও ছোট! বোঝে নি হয়তো। ঠিক আছি আমি।"
একথা বলেই স্নিগ্ধ ঠোঁটে মুচকি হাসলো নীবিড়। এলোমেলো হয়ে যাওয়া চুলগুলোর মাঝে হাত চালিয়ে ডান হাত এগিয়ে দিলো। রুশোর উদ্দেশ্যে বলল,
----- হেই, আম সাদমান শাহরিয়ার নীবিড়। এন্ড ইউ?
রুশো এক্সাইটমেন্টে দ্রুত হাত মেলালো। নীবিড়ের হাত ঝাঁকাতে ঝাঁকাতে আগ্রহী গলায় বলল,
----- "মাই সেল্ফ, রুশো রেহনেওয়াজ। দ্য কিং অফ প্রাঙ্ক! নাম তো সুনাহি হোগা!"
নীবিড় হেসে ফেললো। রুশোকে পাশের সিটে বসতে বলে তার দিকে মুখ করে তাকালো। দুজনের উদ্দেশ্যেই বলল,
----- "খবর সবর কি? সব ঠিকঠাক?"
----- "একদম ফার্সক্লাস ব্রো! তোমাকে দেখে তো আমার লুঙ্গি ড্যান্স দিতে ইচ্ছে করছে।"
অগ্নি সহ নীবিড়ও ফিক করে হেসে ফেললো। রুশো ছেলেটাকে বেশ পছন্দ হয়েছে তার। এমন খোলা মনের কমেডি টাইপ মানুষ থাকতে কারো মুড দু সেকেন্ডর জন্যও অফ থাকতে পারেনা, এমনকটাই বুঝ দিলো মন। অগ্নি এবার কপাল কুঁচকে নীবিড়ের দিকে তাকালো। ভ্রু নাচিয়ে বলল,
----- "আমাদের খবর তো শুনলিই। তোর খবর বল, মুখচোখ এমন চুপসে যাওয়া বেলুনের মতো লাগে কেনো?"
নীবিড় দীর্ঘশ্বাস ফেললো। পাশে থাকা নিউজপেপারটা মেলে তার চোখের সামনে ধরে বলল,
-----" খবর আর নতুন কি? এইযে টাটকা টাটকা তাজা তাজা গরম গরম খবর। 'সাদমান শাহরিয়ার নীবিড়ের সাথে ভার্সিটির ক্যাম্পাসে দেখা করতে গিয়েছেন বাগদত্তা আরাহিনা জারা'।
শালা, লাইফটা হালুয়া হইতে হইতে কালুয়া হয়ে যাচ্ছে। দুদিন পর দেখবি হেডিং এ বড়বড় অক্ষরে বেরোবে, 'সাদমান শাহরিয়ার নীবিড়ের সাথে দু নম্বর কাজ সারতে টয়েলেটে গিয়েছেন মোবাইল!"
অগ্নি-রুশো একে-অপরের দিকে অবাক চোখে তাকালো। নীবিড়ের মুখে এতো খোলামেলা কথা শোনার অভ্যেস অগ্নির থাকলেও, এই সম্মন্ধে রুশো জ্ঞান ছিলো পূর্ণ শূণ্য। অগ্নি কিছুক্ষণ হাসিটাকে দমিয়ে রাখবার তাগিদে ঠোঁটে ঠোঁট চেপে ধরলো। অবশেষে হাসির সাথে যুদ্ধে নির্মম ভাবে পরাজিত হয়েই উপচে পড়লো তার ঝংকার। সাউথ কর্ণার থেকে তীব্র হাসির আওয়াজ ভেসে এলো তখনকার ওয়েটারের কানে। তার অস্থির মন আবারও প্রশ্ন করে বসলো,
----- "এনিথিং রং স্যার?"
#চলবে______________
(এক্সাম শুরু, লেখালেখি এবার যুদ্ধ চালাবে এন্সার পেপারের বিরুদ্ধে। তাতে একটু পর পর শহীদ হবে আমার হাত। সো গাইস চলো একসাথে বলে উঠো, "এক্সাম জিন্দাবাদ!")