#প্রেম_আমার♥(সিজন-টু)
#পর্ব-০৮♥
#আয়ানা_জাহান_নুসরাত♥
রৌদ্রময় সকালগুলো দিনকে দিন গুমোট বাঁধতে শুরু করেছে। সূয্যিমামা হঠাৎ করেই লজ্জায় লুকোচ্ছে মুখ। মেঘের ভেলা ভাসছে নীলচাদরে, তাতে মুখরিত হচ্ছে আকাশের বুক।
কাথা মুড়িয়ে থাকা সিক্ত আমিটা থেকে থেকেই কেঁপে উঠছি, ফ্যানের রেগুলেটরটা বোধহয় ঘড়ির কাটার বিপরীত দিকে আরো কিছু ঘুরিয়ে রেখে দেওয়া উচিত ছিলো আমার। বড্ড শীত শীত করছে আজ। এইরে জ্বর-টর আসবে নাকি আবার? আশংকা হলো ভীষণ! ভয়ে মাখা হৃদয় নিয়েই উঠে বসলাম আমি। অগোছালো চুলগুলো হাতের মুঠোয় নিয়ে হাত-খোপা করতে করতে গিয়ে ফ্যানের পাওয়ারটা কমিয়ে দিলাম খানিক। জানালা ভেতর থেকে লাগিয়ে দিয়েছিলাম রাতেই। পর্দাটাও সরিয়ে রাখা হয়নি। ক'টা বাজে এখন? ৬ টা না ৭ টা? ডিম লাইটের মৃদু আলোয় ঠিক বোঝা হয়ে উঠলো না। জানালার কোল ঘেঁষে দাঁড়ালাম আমি। পর্দা সরিয়ে জানালা খুলে একরাশ বিস্ময় নিয়ে তাকালাম। মেঘলা আকাশ, দূরে কোথাও কিচিরমিচির করে ডাকছে পাখিরা। বইছে শীতল বাতাস! আহা কি প্রশান্তি! বুক ভরে সতেজ প্রশ্বাস টানলাম। ভেতরে যতো উষ্ণ শ্বাস আটকে ছিলো সবটা বিলিয়ে দিলাম প্রকৃতির বুকেই। হঠাৎ করেই মনটা হাল্কা হয়ে এলো, পলকহীন চেয়ে রইলাম কিছুক্ষণ। অবচেতন মন নিঃশব্দেই বিস্মিত হয়ে বলে উঠলো, "প্রকৃতি বুঝি এতোটাই সুন্দর!"
৭ টা বেজে ৪৫ মিনিট।
ফ্রেশ হয়ে বেরিয়ে বিছানাটা গুছিয়ে রাখলাম কোনোমত। যেনো অন্ততপক্ষে মা জননী ঝাড়ি মারার মুহুর্তে বলতে পারি, "এইতো বিছানা গুছিয়েছি, বকো না তো এতো!"
রাত্রির মেসেজ ভাসছে ফোনে। নোটিফিকেশন এসেছে বহুক্ষণ, তবে সাইলেন্ট থাকায় বুঝিনি তখন। "দোস্ত, আজ জলদি জলদি ভার্সিটি আসবি প্লিজ, ঠিক ৯ টায়!" মেসেজটা দেখে কিঞ্চিৎ ভ্রু কুঁচকালাম আমি। দৈনিক জলদি যেতে বলে কি এমন মহাভারত শুদ্ধ করে মেয়েটা তা আজো বুঝে উঠা হলো না আমার। খিদে পেয়েছে ভীষণ! পেটের ভেতরটা মেঘ ডেকে উঠার মতো গর্জে উঠছে। অনেকটা "ভুটুর-ভাটুর" টাইপ সেই আওয়াজ! ভাবলাম, একেবারে রেডি হয়েই নিচে নামি বরং। ড্রেস বের করবার তাগিদে আলমারি খুলে কাপড়ের থাকে থাকে হাত ডোবালাম। হঠাৎ চোখ আটকালো অনাকাঙ্ক্ষিত কোনো বস্তুটায়। কোণঠাসা হয়ে আলমারির সাইডে পড়ে রয়েছে তারা। আমি কিছুক্ষণ ভাবুক ভঙ্গিতে চেয়ে থেকে, কিছু একটা ভেবে টেনে বের করলাম তাদের। ভাবতেই অদ্ভুত লাগে যে তারা দুটোই আমার দু দুটো কুকামের স্বীকার। একজন যদিও সসের দাগে আক্রান্ত ছিলো, প্রথমজন তো দম আটকিয়েই কুপোকাত! তবে ভ্যানিশ পাউডার দিয়ে বাসায় এসে পরিষ্কার তো করেছি, আমি না নিয়ে এলে ডাষ্টবিনেই তো ঠিকানা হতো পাছে। তাই তো বলি একটু শুকরিয়া করো মাঝেমাঝে।
নীবিড় ভাইয়ার ব্ল্যাক জ্যাকেট এবং শার্টটা হাত নিয়ে উল্টেপাল্টে দেখতে লাগলাম। ড্রেসিং টেবিলের অবস্থান সন্নিকটেই। হোয়াট শার্টটা আচমকাই গায়ে ঢুকিয়ে ঘুরে ঘুরে নিজেকে দেখতে পর্যবেক্ষণে নেমে পড়লাম। আরে বাহ, বেশ লাগছে তো! এই প্রথম তালগাছ হয়েও কিছুটা গর্বিত হলাম আমি। শার্টটা লুজ হলেও একেবারে ডুবে যাবার মতো হয়নি। বাসায় পড়া টপস হিসেবে দিব্যি চলে যাবে ভেবেই ফিক করে হেসে ফেললাম। কিন্তু এটাতো ফেরত দিতে হবে বিলাইটাকে। জ্যাকেটটা যদিও নিজ থেকেই ফেলে দিয়েছিলেন, শার্টটা তো পড়িয়েছিলেন অন্য কারণে। ভেবেই ঠোঁট উল্টালাম আমি। হঠাৎ দরজায় টোকা পড়লো, চটজলদি লুকিয়ে রাখার মতো সুযোগটুকু পেলাম না। ওপাশ থেকে কেউ আমোদিত গলায় বলে উঠলো,
----- "হেই ছুটকি, গুড্ডু মর্নিং!"
রুশো ভাইয়ার কন্ঠে স্বস্তি ফিরে পেলাম অনেকটা, মুখ ঘুরিয়ে হেসে বললাম,
----- "গুড মর্নিং ভাইয়া!"
রুশো ভাইয়া ভেতরে প্রবেশ করেই অবাক হলো হঠাৎ! আমায় টি-শার্টের ওপর হোয়াইট শার্ট পড়ে থাকতে দেখে ভ্রু কুঁচকে ঠোঁট বাঁকাল। জিজ্ঞাসুক কন্ঠে বলল,
----- "হাইলা! ছুটকি তুই শার্ট পড়েছিস! তাও আবার জেন্টস শার্ট!"
আমি ভাইয়াকে তৎক্ষণাৎ ইশারায় চুপ করে থাকতে বলে চোখ-মুখ কুঁচকালাম। শার্টটা খুলে ভাঁজ করতে করতে বললাম,
----- "আস্তেধীরে বলো ভাইয়া, আম্মাজান দেখলে কপাল বরাবর খুন্তি ঢুকিয়ে এপার-ওপার বৃত্ত বানিয়ে ফেলবে।
রুশো ভাইয়া ঠোঁটে তৎক্ষণাৎ আঙুল চেপে ধরতেই আবারও বললাম,
----- "আসলে হয়েছে কি, সেদিন রাত্রির সাথে মলে গিয়েছিলাম। এই জ্যাকেট আর শার্টটা ভীষণ ভালো লেগেছ। জেন্টস হতে পারে তবু কিনেছি, আব...বাসায় তো অন্তত পড়তে পারবো নাকি?"
রুশো ভাইয়া ঠোঁট উল্টালো। গালে হাত দিয়ে হঠাৎ কিছু মনে পড়ার ভঙ্গিতে বলে উঠলো,
----- "বাট কালই তো ভিজে বাড়ি ফিরলি, ইফ আম নট রং এটা ওই শার্টটাই, যেটা গায়ে জড়ানো ছিলো তোর৷ ভেবেছিলাম আস্ক করবো বাট কি যে হলো, পরে জিজ্ঞেস করতেই ভুলে গেলাম!"
এবার কি উত্তর দিবো ভেবে পেলাম না। থতমত খেয়ে কিছুক্ষণ আমতা-আমতা করে জবাব দিলাম,
----- "হ্যাঁ হ্যাঁ ঠিকই ধরেছ তুমি, আসলে শার্টটা কেনার পর বাসায় এনে দেখি টাইড হচ্ছে আর শর্টও ভীষণ। তাই ওইদিন চেঞ্জ করে নিয়েছিলাম। বৃষ্টিতে ভিজে যাওয়ায় কাজে দিয়েছিল অবশ্য!"
একথা বলেই আলমারিতে গুছিয়ে রেখে দিলাম শার্ট সহ জ্যাকেটটাও। রুশো ভাইয়া আর পাছে কিছু বলল না। তিন ভাই-বোন মিলে ঝটপট ব্রেকফাস্ট সেড়ে নিলাম। খালামুনিরদের বাসায় আসার কথা আজ, ছেলেকে নিয়ে আম্মুর সাথে জরুরী গোল মিটিং বসাবেন তিনি। বাচ্চা বড় হয়েছে, তবু এভাবে হাওয়ায় গা ভাসানো নিয়ে বহু অভিযোগ তার। ভাবতে ভাবতেই সোফার ওপর ফেলে রাখা ব্যাগটা কাঁধে নিলাম আমি। অগ্নি ভাইয়ার আজ অফ ডে চলে ভার্সিটিতে। রেকর্ডিংটায় আজ সময় দেবে ভেবেই লিরিক্সের খাতাটা খুলে বসেছে সে। সবার থেকে বিদায় নিয়ে হাটা ধরলাম ভার্সিটির উদ্দেশ্যে। পথে হঠাৎই রুশো ভাইয়া পেছন থেকেই হাঁক ছেড়ে বলল,
----- "ক্লাস শেষে একটা মিসড কল দিস ছুটকি, আমি নিয়ে আসবো তোকে।"
_______________________________
রাত্রির চোখে-মুখে চরম উত্তেজনা। শুধু রাত্রিই নয়, ভালো করে খেয়াল করলে দেখা যাবে একমাত্র আমি বাদে সবার ভাব-ভঙ্গিতেই আনন্দের ঝলকানি। এই দম বন্ধকর পরিবেশে নিজেকে নিজের কাছেই এলিয়েন লাগছে আমার। বিরক্তিটা ক্রমশই মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে। সবার হৈচৈ এর মাঝেই হাত উঠিয়ে কোলাহল থামাতে বললেন 'নিহান' ভাই। নীবিড় ভাইয়ার কানে কানে কিছু একটা বলে মিটিমিটি হাসলেন। নীবিড় ভাইয়াও মুচকি হেসে সঙ্গ দিলেন। সকলের উদ্দেশ্যে বললেন,
----- "যে অহেতুক চেঁচাবে তার বাজেটের সাথে দুই গুণ যোগ করা হবে কিন্তু, সো সাবধান!"
রাত্রি সহ সকলে চুপচাপ ঠোঁটে আঙুল চেপে ধরলো। নিহান ভাই রসিকতায় ভরা মানুষ। হেসে ফেলে আমোদিত গলায় তিনি বললেন,
----- "আমার ডাউট লাগছে এই ভেবে যে তোমরা সুন্দরবনের বাঘ দেখে ততোটা ভয় পাবে কিনা, যতোটা ভয় পাও নীবিড়কে।"
সবাই যে যার স্থান থেকে ঠোঁট উল্টে মাথা নোয়াল। যার অর্থ 'নীবিড় ভাইয়াকে যমের মতো ভয় পায় তারা।' নিহান ভাই হাসলেন। সকলের বাজেটটা বুঝিয়ে দিয়ে টিচার্চসদেরস মতামত নিয়ে ডেইট ফিক্সড করলেন আগামী ১১ তারিখ। আরো বলা হলো ফার্স্ট ইয়ারের ৫ টি ভাগ করা হয়েছে উপরমহল থেকে। এতোগুলো স্টুডেন্ট একসাথে নিয়ে যাওয়া সম্ভব নয় কোনোকালেই। সেই হিসেবেই এই ভাগাভাগির ব্যাপারখানা তৈরি হয়েছে। মোট কথায় কর্তৃপক্ষ থেকে সিদ্ধান্তটা আসেনি শিক্ষাসফরে যাবার। স্টুডেন্টসরাই মূলত উঠে পড়ে লেগেছিলো। আমাদের ডিপার্টমেন্ট এবং ম্যাথম্যাটিক ডিপার্টমেন্টের শিক্ষকেরা দায়িত্বে থাকছেন প্রথম সিফটের স্টুডেন্টসদের। সাথে থাকছেন ফাইনাল ইয়ারের কিছু সিনিয়র। কথায় আছে জুনিয়রেরা টিচার্সদেরও ততোটা ভয় পায় না, যতটা না ভয় পায় সিনিয়রদের। তবে সেসবে আমার কোনো চিন্তা কিংবা ভাবনার সূত্রপাত ঘটেনি। প্রথমতঃ জার্নি নামক আবারও সেই ভয়াবহ প্যারা অতঃপর সুন্দরবনের মতো রিস্কি জায়গায় ভ্রমণ। আল্লাহ মালুম বেঁচে ফিরবো নাকি কঙ্কাল হয়ে ফিরবে আমার লাশ! এসব ভাবতে গেলেই মাথাটা ভনভন করে ঘুরছে আমার।
আমার ষোল আনা ভাবনার মাঝেই সাইকেল চালিয়ে বসলো কেউ। কোনো পরিচিত গলার স্বর নিকটে আবিষ্কার করতেই ঘোলাটে দৃষ্টি স্পষ্ট করবার জন্য পিটপিট করে তাকালাম। নিহান ভাইয়ের মুখে মিষ্টি হাসি। আমি জিজ্ঞাসুক চোখে তাকাতেই ভাইয়া বললেন,
----- "কি ব্যাপার? সবার এতো হৈচৈ অথচ তুমি এভাবে চুপসে আছো কেনো? ট্যুরে যাওয়ায় মন নেই নাকি?"
রাত্রি চোখ-মুখ কুঁচকে তাকালো আমার দিকে। যার অর্থ "একদম নেগেটিভ এন্সার দিবি বলে দিলাম, তোর না যাওয়া মানে আমার আকাশ সমান আনন্দ মাটি হয়ে যাওয়া।" রাত্রির চোখের ভাষা পড়তে খুব বেশি ভাবতে হলো না আমার। অনিচ্ছা সত্ত্বেও মুখে মিথ্যে হাসি ঝুলিয়ে জবাব দিলাম,
----- "আব... না না সেসব কিছু নয় নিহান ভাই। আমিও এক্সাইটেড, শুধু ভাবছিলাম বাসা থেকে পারমিশন দেবে কিনা।"
----- "ওহ কাম অন, তোমরা এখন আর স্কুল পড়ুয়া বাচ্চা নও। ভার্সিটিতে পড়ছ, পড়াশুনা করবে ট্রাভেলিং করবে, শিখবে জানবে লাইফটা এনজয় করবে। এর পরেও যদি ফ্যামিলি তোমায় ইনসিকিউরড ভাবে দেন তোমার বাবার নম্বরটা আমায় দিও৷ আমি বুঝিয়ে বলবো কেমন?"
অস্বস্তিতে জিহ্ব দিয়ে ঠোঁট ভিজিয়ে নিলাম আমি। সামান্য হাসার চেষ্টা করে বললাম,
----- "না না ভাইয়া ঠিক আছে। আমরা যাবো।"
----- "দ্যটস গুড! বাই দ্য ওয়ে তোমরা কেমিস্ট্রি ডিপার্টমেন্টে তো তাইনা?"
বিনিময়ে মাথা ঝাঁকিয়ে সম্মতি জানালাম দুজনেই। নিহান ভাই কিছু একটা ভেবে ঘাড় ঘুরিয়ে উল্টোদিকে ফিরলেন, গলা উঁচু করে হাঁক ছেড়ে বললেন,
----- "নীবিড় ভাই, একটু এদিকে এসো তো।"
নিহান ভাইয়ের ডাক পড়ায় ভীড় ঠেলে এগিয়ে এলেন নীবিড় ভাইয়া। আমায় দেখেই কপালে কিঞ্চিৎ ভাঁজ ফেলে শ্বাস ফেললেন। নিহান ভাই হেসে উনার উদ্দেশ্যে বললেন,
----- "ফার্স্ট ট্রিপে কি তুমি যাচ্ছো জুনিয়রদের সাথে?"
নীবিড় ভাইয়া এবার সুক্ষ্ম চোখে একবার আমার দিকে তো আরেকবার নিহান ভাইয়ের দিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করে বললেন,
----- "ইয়াহ, বাট কেনো বলো তো?"
---- "নাহ, তেমন কোনো ব্যাপার নেই। ফার্স্ট ট্রিপে গেলে আমার একটু সুবিধে হতো আরকি!"
----- "হেই সরি ব্রো, ট্যুরের চক্করে শো পিছিয়ে দিয়েছি। এখন না গেলে পরে আর যাওয়া হবে না।"
নিহান ভাই ছোট্ট করে নিঃশ্বাস ফেললেন। নীবিড় ভাইয়ার কাঁধে হাত রেখে বললেন,
----- "ওকে ডুড, কোনো ব্যাপার না। সেলিব্রিটি মানুষ, এতোটা টাইম বের করে যে সবকিছু মেইনটেইন করছে এই অনেক।"
নীবিড় ভাই স্মিথ হেসে চোখ ঝাপটালেন।
নিহান ভাই ব্যস্ত ভঙ্গিতে আবারও এগোলেন ভীড়ে। নীবিড় ভাইয়াও স্পট ত্যাগ করতে উদ্যত হতেই কুনুই দিয়ে পেটে গুঁতো মেরে বসলো রাত্রি। ফিসফিসিয়ে বলল,
----- "এই অনু, নীবিড় ভাইয়ার শার্টটা!"
রাত্রির কথায় চট করে মনে পড়ে গেলো শার্টটার কথা। নীবিড় ভাই দু'ধাপ এগিয়েছেন সবে। এক ছুটে উনাকে থামাতে ঠিক সামনে গিয়ে দু'হাত মেলে দাঁড়ালাম আমি। উনার কুঁচকে রাখা ভ্রু কে সাক্ষী রেখেই জোরপূর্বক হাসি ফোটালাম ঠোঁটে। নার্ভাস হয়ে আমতা-আমতা করে বলতে লাগলাম,
----- "ভা...ভা....ভা...ভাইয়া! একটা 'ভাপা পিঠা' ছিলো!"
----- হোয়াট!
----- "থুক্কু একটা প্রয়োজনীয় কথা ছিলো।"
----- "তা কী সেই প্রয়োজনীয় কথা?"
বুঝলাম মুখে কিছু বলতে গেলেই স্লিপ কেটে যাবে। যার দরুন চটজলদি ব্যাগের চেইন খুলে শার্টটা বের করলাম আমি। উনার চোখের সামনে তুলে ধরে বললাম,
----- "এইযে আপনার শার্টটা!"
শার্টটা দেখে পূর্বের তুলনায় আরো দ্বিগুণ হারে ভ্রু কুঁচকালেন উনি। পকেটে দু'হাত গুঁজে ঠোঁট বাঁকিয়ে বললেন,
----- "সো আমি কি করবো?"
----- "কি করবেন মানে? আপনার শার্ট আপনি ফিরিয়ে নেবেন।"
তাচ্ছিল্যের হাসি হাসলেন উনি। নিজের সিল্কি চুলগুলোর মাঝে বা হাত চালিয়ে বললেন,
----- "ওটার প্রয়োজন তোমার হাত থেকে সস লাগার মুহুর্তেই শেষ হয়ে গিয়েছে। নিয়ে যাও, যা ইচ্ছে করো, আমি শার্টটা নিচ্ছি না।"
বেকুব সেজে একে-অপরের দিকে তাকালাম আমি-রাত্রি। নিমিষেই কপালে সুক্ষ্ম বিরক্তির ভাঁজ ফুটে উঠলো আমার। নীবিড় ভাইয়া তাতে বিন্দুমাত্র ভ্রুক্ষেপ দেখালেন না। খুব স্বাভাবিক ভঙ্গিতেই একপা দু'পা করে এগিয়ে চললেন কোথাও বা কোনো এক ভিন্ন গন্তব্যে!
______________________________
ঠোঁট উল্টে মুখ ফুলিয়ে বসে আছে রুশো। মনটা ভীষণ গুমোট বেঁধে আছে তার। চোখ দুটো আধখোলা অবস্থায় রেখে দু'হাতে গাল ধরে বিষণ্ণ মনের জানান দিয়ে চলেছে সে। সামনেই অগ্নি হাতঘড়ি নিয়ে পর্যবেক্ষণে নেমেছে। কোনো এক বিশেষ কারণবশত রুশোর মুখের কথা চট করেই বিশ্বাস করে না সে। তার প্র্যাঙ্কের দরুন এতোটাই সন্দেহ মনে বাসা বেঁধেছে যে রুশো যদি সশরীরে সামনে এসে দাঁত কেলিয়েও বলে, "ব্রো হেয়ার আই এম!" তাও বোধহয় বিশ্বাস করতে দুবার ভাববে অগ্নি। অগ্নি খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে ঘড়ির প্লেটটা দেখে নিতেই ছোট্ট করে শ্বাস ফেললো। রুশোর পছন্দের গোল গোল পাথরগুলো নেই এটায়। বাদবাকি সব এক, ভিন্নতা নেই আর। তবু ছেলেটার মুখ কালচে বর্ণ ধারণ করেছে। একে পিংক কালার ঘড়ি কিনতে বেগড়া দিয়েছে ভাই, তারওপর যেটা নিলো তাও এখন এসে দেখে চেঞ্জড! অগ্নি শার্টের হাতা ফোল্ড করতে করতে উঠে দাঁড়ালো। ঘড়িটা বক্সে রেখে রুশোর উদ্দেশ্যে বলল,
----- "চল, শপিং মল যাবো।"
রুশো ঠোঁট উল্টে চোখ তুলে তাকালো। ইশারায় বোঝালো "হুয়াই ব্রো?" অগ্নি তাড়া মেরে টেনে তুললো তাকে। ভাইয়ের চুল ব্রাশ করতে করতে বলল,
----- "তোর পেঁচার মতো মুখ দেখতে ভাল্লাগেনা যে।"
_____________________________
নিত্য গালে হাত রেখে বসে আছে মলে। সেলসম্যানের নিকট বহু অভিযোগ ছিলো তার। ঠিকঠাক প্যাকিং করতে পারে না আবার বিক্রেতা হতে এসেছে কিভাবে কে জানে। আচ্ছা আদৌ কি ওরা আসবে? নাকি নিত্যর এভাবে ছুটে আসাটা বেকারে যাবে? নিত্য আরো কিছুক্ষণ বসে রইলো দোকানেই। কেনো যেনো যেতে ইচ্ছে করছে না তার। অস্থির মনটা নিজে নিজেই বলে উঠছে, "আসবে, আসবে অপেক্ষা কর কিছু আর!" নিত্যর ভাবনার দেয়াল ছিন্ন করে কাচের দরজা ঠেলে ভেতরে প্রবেশ করলো কেউ বা কারা। নিত্য আশাভরা চোখে তাকালো, মনের আশা পূর্ণ হলো না তবু। দুটো মহিলা এসে নিজেদের মতো ঘড়ি বাছাই পর্বে নাম ফেললো। সেলসম্যান অপরাধীর কন্ঠে বলল,
----- "ম্যাম, আই থিংক উনাদের কোনো প্রবলেম হয়নি তাই আসে নি চেঞ্জ করাতে। তাছাড়া দুটো ঘড়িই তো প্রায় সেইম ছিলো। উনাদের যেহেতু কোনো প্রবলেম হয়নি তাই আরকি বলছিলাম আপনিও একটু কনসিডার করুন প্লিজ। আই এম এক্সট্রিমলি সরি। এরপর থেকে এমন ভুল আর হবে না কখনোও।"
নিত্য একরাশ বিরক্তি নিয়ে চেয়ে রইলো। মাথা মোটাটা ভাবছে ঘড়ি নিয়ে যতো প্রবলেম তার! আরে ও তো বরং এই ঘড়িটার মতোই সেইম আরেকটা চেয়েছিলো। এক পিসই থাকায় বাধ্য হয়ে প্রায় সেইম মডেলটা নিয়েছিলো সে। তবে ভাগ্য বলেও এক চিরন্তন সত্য আছে। অদ্ভুত ভাবে ঘড়ি দুটো নিজেদের অবস্থান পাল্টে কি দোটানাতেই না ফেলেছে নিত্যর মন। নিত্য চাইছে একটিবার হলেও রুশোরা আসুক। একটিবারের জন্য হলেও অন্তত দেখতে চায় সে তাদের।
প্রায় আধঘন্টা পাড় হবার উপক্রম! দোকানে বোকার মতো এতোক্ষণ থাকাটা ঠিক শোভা পায় না তার। তাছাড়া ওরা যে এক্সচেইঞ্জ করবে এরও তো কোনো গ্যারান্টি নেই। একথা ভেবেই উঠে দাঁড়ালো নিত্য। বুক চিরে উত্তপ্ত নিঃশ্বাস ফেলে কাচের দরজা ঠেলে বের হতে যাবে এমন সময়ই অপর পাশে দরজার হ্যান্ডেল ধরে ধাক্কা মারলো কেউ। নিত্য আচমকাই টাল সামলাতে পারলোনা। টাইলস করা ফ্লোরে স্লিপ কেটে পড়তে নিতেই এক ছুটে কাছে এসে ধরে ফেললো মানুষটি। নির্ঘাত মান-সম্মান ধুলোয় মিশে যাবে ভেবে চোখমুখ কুঁচকে ফেললো নিত্য! কিন্তু একি, সে তো পড়ে যায়নি। বরং কারো উষ্ণ বাহুডোরে আষ্ঠেপৃষ্ঠে বাঁধা পড়েছে সে। নিত্য পিটপিট করে চোখ মেলে তাকাতে লাগলো। নিকটেই সেই বাচ্চা বাচ্চা গলার ছেলেটার কন্ঠে ভেসে এলো,
----- "হাইলা! এতো পুরা ফাটা পোস্টার নিকলা হিরোর সিমিলার হুইলা!"
_________________________________
আজ আবারও ক্যাম্পাসে এসেছে সেই উন্মুক্ত পা জোড়া নিয়ে, মিস সো কল্ড জরিনা থুক্কু জারা। মেজাজটা তুঙ্গে পৌঁছেছে আমার। কেনো যেনো সেদিনের ইন্সিডেন্টটার পর থেকেই মেয়েটাকে দেখলে ভেতরে এক অদ্ভুত গান ভেসে আসে আমার। গানটার লিরিক্স কিছুটা এমন, "মার ঝাড়ু মার ঝাড়ু মেরে ঝেটিয়ে বিদেয় কর!"
নীবিড় ভাইয়ার কপালে ভাঁজ পড়েছে, উডবিকে দেখলে তো মন ময়ূরের ন্যায় নেচে উঠার কথা ছিলো, সেখানে অদ্ভুত এক কারণে বিরক্ত বোধ করছেন উনি। ব্যাপারটায় রাত্রি-আমি দুজনেই খানিকটা কনফিউজড। তবে সেসবে আমার কিছু যায় আসে না। মূলত শার্টটাকে ফিরিয়ে নেওয়া থেকে প্রত্যাখ্যান করায় এই মুহুর্তে সালা বিলাইটার মাথা চিবিয়ে চিবিয়ে খেয়ে ফেলতে ইচ্ছে হচ্ছে ভীষণ। তার উপর জুটেছে এই জরিনা খালা! কোমড় দোলাতে দোলাতে গাড়ি থেকে নেমে ভেতরে আসছে সে। আমাদের কাছাকাছি পৌঁছেই হঠাৎ ব্রেক মেরে বসলো ঢঙ্গীটা। মুখ বাঁকিয়ে অন্যমনস্ক ভাব নিয়ে বলল,
----- "উফফফ! আজকাল ভার্সিটিতে সালোয়ার পড়েও কেউ আসে নাকি! হাও পোর!"
রাত্রি রেগেমেগে হাত খামচে ধরলো আমার। হঠাৎ করেই আমার কোনো রিয়াকশন দেখা গেলো না। বেশ স্বাভাবিক ভঙ্গিতেই রাত্রি পানে তাকালাম আমি। গভীর কোনো চিন্তায় মগ্ন হবার মুখশ্রী ফুটিয়ে বললাম,
----- "কেহ মরে বিল ছেঁচে,
কেহ খায় কই!
মেয়ে তোমার হাটু দেখা যায়,
জামা কাপড় কই?"
#চলবে________________
(গঠনমূলক মন্তব্য করবেন প্লিজ, নেক্সট নাইস বলে অহেতুক সময় অপচয় করবার কোনো মানে হয়না।)