ফন্ট সাইজ:
থিম:
প্রেম আমার (সিজন ২)

১৩তম পর্ব

লেখক: আয়ানা জাহান নুসরাত

#প্রেম_আমার♥(সিজন-টু)

#পর্ব-১৩♥

#আয়ানা_জাহান_নুসরাত♥

কানের কাছে এলার্ম ক্লকটা তীব্র শব্দে বাজছে অনেকক্ষণ ধরেই। তবে তাকে ডান্ডা মেরে ঠান্ডা করার জন্য হলেও চোখদুটো মেলে তাকাতে ইচ্ছে জাগছে না আমার। অন্যদিনের তুলনায় আজ ঘুমটা একটু বেশিই হয়ে গিয়েছে। সাথে রেশটাও বেড়েছে তীব্রতর ভাবে। জানালা ভেদ করে সকালের মিষ্টি আভা এসে চোখেমুখে পড়ছে। অন্ধকার ঘরটা আলোকিত হয়েছে অনেকটা। এবার বিছানা ছেড়ে উঠা ফরজ হয়ে পড়েছে তারপরও আমার অলস মন! শুয়ে শুয়েই কল্পনাতে বিছানা ছেড়ে উঠে পড়েছি টাইপ কাঁচা স্বপ্নের জাল বুনতে ব্যস্ত।

ঘুমের ঘোরেই টের পেলাম ঝিঁঝি পোকার ন্যায় বিরক্তিকর শব্দটা বাজছে না আর। থেমে গিয়েছে আচমকাই। কেউ কি ঘরে এলো তবে? সকাল হয়েছে বহুক্ষণ, তবু ক'টা বাজে এখন? আজকে যেনো কয় তারিখ? ঘুমু ঘুমু মস্তিষ্কে জোর খাটিয়েই আজকের তারিখটা হিসেব মিলিয়ে জানবার চেষ্টা চালালাম। কাল শনিবার ছিলো, অর্থাৎ ১০ তারিখ তাহলে আজ নিশ্চয়ই রবিবার, ইয়া আল্লাহ ১১ তারিখ! নিজের ক্ষুদ্র মস্তিষ্কে এটুকু আওড়াতেই এক লাফ মেরে উঠে বসলাম আমি। ঘুমে কাতর চোখদুটো থেকে ঘুমের রেশটা যে কখন ছুটে পালালো টেরই পেলাম না। পিটপিট করে ঘরের প্রতিটি কোণায় চোখ বোলালাম। আলমারি থেকে বেশকিছু কাপড় নামাতে দেখা গেলো আম্মুকে! বিস্ময়টা পূর্বের তুলনায় অত্যধিক বেড়ে গিয়ে আকাশ ছুঁল। সর্বনাশ! সাদা বিলাইটার হোয়াইট শার্ট আর ব্ল্যাক কোটটা তো আলমারিতেই ফেলে রেখেছি আমি। আম্মুর নজরে পড়লে নির্ঘাত কেলেঙ্কারী বাঁধিয়ে ফেলবেন তিনি।

ভয়ে কাবু হয়ে চটজলদি বিছানা ছেড়ে নামলাম আমি। শুকনো গলায় বার কয়েক ঢোক গিলতে গিলতে হঠাৎই মা জননীর সামনে গিয়ে সটান হয়ে দাঁড়ালাম। আম্মু ভ্রু কুঁচকে বিরক্তির জানান দিলেন। গম্ভীর গলায় বললেন,

----- "বেলা করে ঘুম থেকে উঠলি, এদিকে ২ টায় যে ট্রেন সেই খবর মাথায় আছে নাকি বালিশেই ফেলে রেখেছিস?"

চিন্তায় পড়ে ঘাম ছুটতে শুরু করলেও জোরপূর্বক দাঁত কেলালাম। আরো দুটো সেট ড্রেস বের করে আলমারি লাগিয়ে ব্যস্ত গলায় বললাম,

----- "এলার্ম বন্ধ করে দিলে অথচ ডাকলে না কেনো আম্মু?"

----- "লম্বা সফরে যাচ্ছিস, ভাবলাম একটু বেশি করে ঘুমিয়ে নে। তোর তো আবার জার্নির পথে ঘুমোবার অভ্যেস নেই। দে কাপড়গুলো গুছিয়ে ব্যাগে রাখি। তিন দিনের ট্যুরে যাচ্ছিস অথচ কোনো গোছগাছ করিস নি, অদ্ভুত মেয়ে তুই!"

আবারও হেসে আম্মুর নাকটা টেনে দিলাম আমি। ঘুম জড়ানো গলায় আলগাভাবে জড়িয়ে ধরে বললাম,

------ "কারণ আমি তো জানি তার জন্য তুমি আছো। ঠিক সময় মতো সবটা রেডি করে দিবে।"

আম্মু ঠোঁট বাঁকিয়ে নিজের থাকে ছাড়িয়ে নিলেন আমায়। কাপড় ভাঁজ করতে করতে অভিমানী গলায় বললেন,

----- "তোকে দেখার জন্য সবসময় আমি থাকবোনা অনু! তোকে নিজে থেকেই সবটা সামলাতে হবে। নিজেকে আগলে রাখতে হবে, নিজেকেই লড়াই করতে হবে। শিখতে হবে সব কিছু।"

ঠোঁট উল্টে কিঞ্চিৎ বিরক্তির শিস তুলে বললাম,

----- "আহ আম্মু! এসব কথা কেনো বলো বলোতো? তুমি থাকবে না কেনো? কোত্থাও যাবে না তুমি বুঝলে? আর আমিও কোত্থাও যাবো না। এই তোমার আঁচল ধরেই ঘুরঘুর করবো সবসময়!"

আমার বোকাবোকা কথায় হেসে ফেললেন আম্মু। ব্যাগ গুছিয়ে পাশে রেখে বললেন,

----- "হয়েছে হয়েছে কোথাও যেতে হবে না। আপাতত ফ্রেশ হয়ে নিচে আয়। ব্রেকফাস্ট সেরে বের হবি সবাই।"

আমি মাথা নাড়িয়ে সম্মতি জানালাম। আম্মু আমার এলোমেলো চুলগুলোয় আলতোভাবে ছুঁয়ে দিয়ে উল্টো দিকে ফিরলেন। যেতে যেতে আবারও বললেন,

----- ফ্রেশ হওয়া হলে, ব্রাশ,পেস্ট ব্যাগের সাইড পকেটে ঢুকিয়ে নিস কিন্তু।

________________________________________

ডাইনিং টেবিলে চুপচাপ মুখ গোমড়া করে খাবার গিলছে রুশো ভাইয়া। পাশেই মুখভার করে জুসের গ্লাস খালি করছি আমি। অগ্নি ভাইয়ার একের পর এক এডভাইজ শুনতে শুনতে কানটা ঝালাপালা হয়ে যাবার উপক্রম দাঁড়িয়েছে আজ। তবে রুশো ভাইয়ার মুখ গোমড়া হবার পেছনে দায়ী অন্য কোনো কারণ। মূলত পরিবারের সকলকে ছেড়ে আমার ট্যুরে যাওয়ার ব্যাপারটা একদমই ভালো লাগছে না তার৷ একদিন নয় দুদিন নয় টানা তিন তিনটে দিন শহর ছেড়ে অন্য কোনো গন্তব্যে তার ছুটকির বাস হবে তা ভাবতেই শিউরে উঠছে ভাইয়া। আমার ঘুমকাতুরে ভাইটাও আজ এতো জলদি কি করে ঘুম থেকে উঠলো এই ভেবে মাথা ঝিমঝিম করছে আমার। আজ কোনো ডাক ছাড়াই কি সুন্দর উঠে পড়েছে সে। রোজ দিন এভাবে চললেই তো মা জননীর আক্ষেপটা কমে!

আমাদের আলাপ-আলোচনার মাঝেই কাঁধে ট্রাভেলিং ব্যাগ ঝুলিয়ে দরজায় কড়া নাড়লো রাত্রি। আম্মু গিয়ে দরজা খুলে ভেতরে আসতে বলল তাকে। সান্নিধ্যে মাখা হাসিতে ঠোঁট রাঙাল সে। মূলত সেদিনকার বিশ্রী ইন্সিডেন্টটার পর থেকেই ভীষণ লজ্জার সম্মুখীন হয়ে চলতে হচ্ছে তাকে। একে তো এমন উদ্ভট সেজে সকলের সামনে বের হওয়া, তার ওপর খালামুনির সামনেই তার ছেলের উত্তম-মধ্যম সাধিত করতে চাওয়া, সবটা মিলেই রাত্রি চরমভাবে বিব্রত হয়ে পড়েছিল।

রাত্রির আগমনে আমার মুখে এক চিলতে হাসি ফুটে উঠলেও রুশো ভাইয়ার গোমড়া মুখখানি আরো তীব্র আকারে গুমোট বাঁধতে শুরু করলো। আজ তো খালামুনি বাসায় নেই, সেই সুযোগে যদি আবারও নাকটা টমেটো বানিয়ে ছাড়ে তখন? ভয়টা ক্রমশ মাথাচাড়া দিয়ে উঠলো ভাইয়ার৷ নিজেকে যথাসম্ভব আড়াল করতে সামনে থাকা প্লেট দিয়েই মুখ ঢাকবার প্রচেষ্টা চালালো সে।

রাত্রি ধাপ ফেলে এগিয়ে এসে ব্যস্ত গলায় বলল,

------ "অনন্যা, রেডি হবি কখন? সময় তো যায় যায়।"

----- "ধুর মিয়া, এখনও বহুত টাইম আছে! ডিরেক্ট স্টেশনে গেলেই তো হয়। ভার্সিটি যাইতে লাগতো না। চুপচাপ বস তো! খেয়েছিস?"

রাত্রি মাথা ঝাঁকিয়ে সম্মতি জানালো। পাশ থেকে রুশো ভাইয়া প্লেট সরিয়ে মাথাটা হাল্কা উঁচু করে বলল,

----- "হ্যালো ময়দা সুন্দরী! ময়দা দিয়ে গরম গরম লুচি করেছে মনি, খাবে?"

রাত্রি ফোঁস করে উঠলো মুহুর্তেই। মনে মনে হাজারটা গালিগালাজ ননস্টপ দিতে থাকলো। শুধু মুখে বলা হয়ে উঠলো না আম্মুর উপস্থিতিতে। আম্মু রুশো ভাইয়ার মাথায় আলতো করে চাটি বসিয়ে দিলেন। অভিযোগের সুরে বললেন,

----- "আহ, রুশো তুই কী জীবনেও শোধরাবিনা? চুপ কর তো! রাত্রি মা, তোমায় খেতে দেই?"

রাত্রি স্মিথ হেসে বলল,

----- "না না আন্টি, মাত্র খেয়ে বেরিয়েছি। পেটে একদম জায়গা নেই!"

আম্মু আজ আর জোর করলেন না। ভরা পেটে জোরজুলুম করে খাওয়ানো মানেই পেটের ভারসাম্য বিনষ্ট হয়ে উল্টি প্রসেস অন হয়ে যাওয়া। যা জার্নি পথের জন্য মোটেই মঙ্গলকর নয়।

খাওয়া শেষ করে ঘরে ফিরে চটজলদি তৈরি হয়ে নিলাম আমি। ব্ল্যাক এন্ড হোয়াইট স্কার্ট সাথে গায়ে জড়ালাম অনেকগুলো কালারের কম্বিনেশনে তৈরি স্কার্ফ। চুলগুলো রাবার ব্যান্ড দিয়ে বেঁধে ঠোঁটে হাল্কা করে লিপগ্লোস লাগিয়ে নিলাম। ফটাফট ব্যাগ ঘাড়ে ঝুলিয়ে পাম্পশো পড়তে পড়তে রাত্রির উদ্দেশ্যে বললাম,

----- "চল, আমি রেডি!"

রাত্রি হতভম্ব হয়ে কয়েক সেকেন্ড চেয়ে রইলো অপলক। বিস্মিত হয়ে বলল,

----- "ব্যাস এইটুকুই?"

----- "এইটুকু মানে? আর কি করবো?"

রাত্রি হতাশ চোখে তাকালো। নিজেকে আরেকবার আয়নায় দেখে নিয়ে ছোট্ট করে শ্বাস ফেলে বলল,

------ "কিছু না, তুই তো আর সাজগোজ বুঝিস না, বলেই বা কি লাভ?"

তৎক্ষণাৎ তীক্ষ্ণ দৃষ্টি নিক্ষেপ করলাম আমি। ক্যামেরাটা গলায় ঝুলিয়ে বললাম,

------ "ওটাকে সাজগোজ বলেনা রে পাগলি, ওটাকে বলে 'আ কিউট লেডি টার্নস ইনটু ইন্সট্যান্ট পেত্নি'!"

________________________________________

রাজশাহী রেলওয়ে স্টেশনে আজ ভীড় জমেছে প্রচুর। চারিদিকে হাজারো মানুষের আনাগোনা। এই ব্যস্ত স্টেশনে সামান্য পিঁপড়ে সমতূল্য আমি, পিটপিট করে চোখ ঘুরিয়ে চলেছি এদিক থেকে ওদিক। অগ্নি ভাইয়া, রুশো ভাইয়া দুজনেই শক্ত করে দু'হাত আঁকড়ে ধরেছে আমার। মাঝ থেকে রাত্রিটা বড্ড বাড় বেড়েছে, লাফিয়ে লাফিয়ে হেটে বেড়াতে চাইছে সে।

ভার্সিটি থেকে সকলেই এতোক্ষণে স্টেশনে পৌঁছেছে যতোদূর সম্ভব। এক, দুই, তিন, চার, পাঁচ! পুরো পাঁচ পাঁচটা প্লাটফর্মের ঠিক তিন নং প্লার্টফর্মে দাঁড়িয়ে আছে কপোতাক্ষ এক্সপ্রেস। আমাদের স্টুডেন্টদের ফুল প্যাকেজ করে রাখায় বরাদ্দ তার দুটো বগি। বর্তমানে সেই পথেই এগোচ্ছি আমরা।

চলার পথে হঠাৎই এক মহিলা চেঁচিয়ে উঠলো তীব্র শব্দে। রাত্রি ছিটকে এসে ধাক্কা খেলো রুশো ভাইয়ার গায়ে। ভদ্র মহিলা প্রকান্ড কম্পাংকে চেঁচিয়ে বললেন,

----- "ওমারে পাওডা শেষ করি দিলো রে! ওই মাইয়া চোক্ষে দেখবার পারো না? আমার উপ্রে চড়তেছ কোন আক্কেলে? যত্তসব বেয়াদব চেংরীর ঘর!"

রাত্রি থতমত খেয়ে নিজেকে সামলাল। রুশো ভাইয়া ফিক করে হেসে ফেলে বলল,

----- "এক্সট্রিমলি সরি চাচি-আম্মা, আসলে ও চোখে দেখতে পারে না, ওইযে অন্ধ, প্রতিবন্ধী বলে বুঝেন না?"

মহিলা কোমড়ে হাত রেখে সোজা হয়ে দাঁড়ালেন। কর্কশ গলায় ধাপ ফেলে যেতে যেতে বললেন,

----- "হইছে বাহে, কানা মাইয়াডারে দেইখা রাখবার পারো তো! এরপর থেইকা একলা একলা হাটবার বারণ করবা।"

রুশো ভাইয়া স্মিথ হেসে সম্মতি জানালো। মহিলা যেতেই পাশ থেকে তুমুল হারে পেটে গুঁতো পড়লো তার। এদিকে হেসে কুটিকুটি হলাম অগ্নি ভাইয়া-আমি।

------ "এই আমি কানা? আমি চোখে দেখিনা? থামুন, দেখাচ্ছি মজা, আজ যদি আপনার নাক পুরোপুরি ভর্তা না বানিয়েছি তাহলে আমার নামও.....!"

রুশো ভাইয়া তৎক্ষণাৎ নাক চেপে ধরলো। মিনমিনে গলায় বলল,

----- "স্টপ স্টপ স্টপ, কিছু করার আগে ভেবে নিও ময়দা সুন্দরী, তোমাকে কানা উপাধি না দিলে স্টেশনে ফ্রি ফ্রি প্রেস্টিজের চাটনি বানাতে তুমি।"

রাত্রি কিছু বলতে চেয়েও বললো না। রাগে ফোসফাস করতে করতে এগোল সাবধানে। খুব বেশি দূরে নয়, মাত্র ৫-৬ হাত দূরত্ব দেখা মিললো এক পরিচিত মুখের। গায়ে ব্ল্যাক হোয়াইট শার্ট তার ওপর ব্ল্যাক সেইডের জ্যাকেট। ঝলমলে চুলগুলো চিকচিক করছে মানুষটার। বরাবরের মতো কপালে পড়ে আছে তাদের কেউ কেউ। চিপ বেয়ে দুফোঁটা ঘাম গড়িয়ে পড়লো পলকেই। ব্যস্ত ভঙ্গিমায় স্টুডেন্টদের ট্রেইনে উঠতে বলছেন তিনি। প্রফেসরেরা সকলের ব্যাগগুলো সযত্নে উঠিয়ে দিচ্ছেন। নীবিড় ভাইয়া দৃষ্টি সীমার মাঝে আবদ্ধ হতেই হাঁক ছাড়ল অগ্নি ভাই। তৎক্ষণাৎ কান খাঁড়া করে তাকালেন উনি। বাকিদের উঠিয়ে দিয়ে দু'ধাপ এগোলেন। ভাইয়ার মাথায় হাল্কা করে চাটি বসিয়ে বললেন,

----- "এতো লেইট করলি কেন শালা? ট্রেন ছেড়ে দিলে কি হতো?"

অগ্নি ভাইয়া ঠোঁট বাঁকিয়ে চাটিটা শোধ দিয়ে বলল,

----- "রাইট টাইম জানি না বোধহয়!"

নীবিড় ভাইয়া হাসলেন। এক পলক আমার দিকে চেয়ে দৃষ্টি সরিয়ে বললেন,

----- "বোনকে বল ট্রেনে উঠতে, আর মাত্র ১০ মিনিটের মাথায় ছাড়বে ট্রেন। বাই দ্য ওয়ে মেডিসিন খাইয়ে এনেছিস তো?"

----- "মেডিসিন! কিসের মেডিসিন?"

নীবিড় ভাইয়ার জবাবের পূর্বেই আগ বাড়িয়ে রুশো ভাইয়া বলল,

----- "কী! আমার ছুটকি অসুস্থ নাকি? ও মাই গড! কি হয়েছে ওর?

নীবিড় ভাই আবারও মুচকি হাসলেন। রুশো ভাইয়ার চুলগুলো এলোমেলো করে দিয়ে বললেন,

----- "কিছু হয়নি বাট হওয়ার চান্স আছে, বোঝো না তোমার ছুটকির আবার জার্নি পথে উদ্ভট সব ক্রাইসিস শুরু হয়?"

রুশো ভাইয়া মাথা চুলকালো। বিশেষ কোনো উত্তর খুঁজে না পেয়ে অগত্যাই ঠোঁট উল্টাতে হলো তাকে। খিটখিটে মেজাজ নিয়ে অবশেষে আমিই বলে বসলাম,

----- "ট্রেনে জার্নি করতে পারি আমি ভাইয়া, আপনি শার্ট খারাপ হবার ভয়ে থাকবেন না।!"

মুহুর্তেই বিস্ময়ে গোলগাল চোখ করে তাকালো ভাইয়ারা। মাঝ থেকে ভয়ার্ত চোখে তাকালো রাত্রি। এতোক্ষণ সেদিনকার চাউমিন এক্সিডেন্টের কথা মনে পড়ায় লজ্জায় চুপসে ছিলো সে। তবে এবার রিয়াকশন দেখানো বোধহয় বাধ্যতামূলক হয়ে দাঁড়ালো তার।

----- "কি বলছিস বলতো তোরা? জার্নি ক্রাইসিস আবার শার্ট খারাপ! এসবের মানে কি?"

নীবিড় ভাইয়া ভড়কে গেলেন সামান্য। চোখ গরম করে পলক ফেলে চেয়ে আবারও স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বললেন,

------ "ও কিছুনা, ছাড় ওসব! দেরি হয়ে যাচ্ছে। রাত্রি, তোমরা উঠে পড়ো যাও। টিকিট মিলিয়ে বসতে হবে না, যেখানে ফাঁকা সিট পাবে উঠে বসো।"

রাত্রি মাথা নাড়িয়ে সম্মতি জানালো। আমার হাত ধরে টেনে চোখের ইশারায় বলল, "অনন্যা, চল।" রাত্রির হাতের বাঁধন ছাড়িয়ে ভাইদের দিকে মুখ করে তাকালাম আমি। রুশো ভাইয়ার চোখে গভীর মায়ায় মুখরিত স্বচ্ছ প্রতিবিম্ব। তাতে অনেকাংশে দেখা মিলছে নিজের। সেই মায়ার বাঁধনে বন্দী হয়ে ভাইয়াকে আঁকড়ে ধরে বিদায় জানালাম আমি। পাশ থেকে অগ্নি ভাইয়া চোখের পলক ফেলে বলল,

----- "সাবধানে যাস শাঁকচুন্নি!"

ঠোঁট বাঁকিয়ে পলক ঝাপটে মাথা নোয়ালাম। অগ্নি ভাইয়া নীবিড় ভাইয়ার দু'হাত আঁকড়ে ধরে ধরা গলায় বলল,

----- "এই দুই ভাইয়ের কলিজাটাকে তোর ছায়ায় রেখে দিলাম। বোনটাকে একটু দেখে রাখিস, সামলে রাখিস রে ব্যাটা!"

নীবিড় ভাইয়া হেসে জড়িয়ে ধরলেন ভাইয়াকে। উষ্ণ আলিঙ্গনে শুদ্ধ বন্ধুত্বের জানান দিলেন তাতে। মৃদু গলায় বললেন,

----- "আচ্ছা, রাখবো!"

________________________________________

ট্রেনে উঠে মেজাজটাই বিগড়ে গেলো আমার। জানালার ধারের একটা সিটও খালি নেই। সবকটা বিচ্ছুগুলোর দখলে বর্তমান। হায় হায় কি হবে এবার আমার? খুব তো বড় গলায় বলে ফেললাম উল্টাউল্টি হবে না, এখন তো নিজেরই সন্দেহ হতে শুরু করেছে। আদৌ ৬ ঘন্টার পথে পেটটা ঠিক থাকবে তো আমার? ভাবনার মাঝেই ধাক্কা মেরে ভ্রম কাটালো রাত্রি। জিজ্ঞাসুক গলায় বলল,

----- "কিরে বসবিনা?"

----- "বসবোটা কোথায় বলতে পারিস? একটা উইন্ডো সিটও তো খালি নাই, ট্রেনের ছাদে উঠবো নাকি?"

রাত্রি পড়লো মহাচিন্তায়। লেফট সাইডের সারিতে শুধুমাত্র দুটো সিট খালি, তাও আবার জানালার ধারে নয়। জানার ধারের সিটটায় শর্টস পড়ে বসে আছে একটি মেয়ে। চেহারাতেই কেমন যেনো ডাকিনী ডাকিনী ভাব। রিকুয়েষ্ট করলে সিট ছেড়ে দেবে বলে তো মনে হয়না। তবু অনিশ্চিত আশা নিয়ে মেয়েটিকে রিকুয়েষ্ট করলো রাত্রি। অথচ পেলো এক কর্কশ মার্কা ভেংচি! মেয়েটা সাফ সাফ বলে দিলো, "এই সিট তার বাপের না হলেও সে সেখান থেকে এক চুল পরিমাণও নড়বে না!" রাত্রি মুখ কালো করে এদিক ওদিক তাকালো। মনে মনে মেয়েটাকে ঝাঁঝালো গলায় বললাম, "নড়িস না পেত্নি নড়িস না, প্রাকৃতিক চাপ আসলে বাথরুম যাস কেমনে আমিও দেখবো হুহু!"

মনে মনে হাজারো ক্ষোভ ঝাড়লেও এই মুহুর্তে হাত-পা ছাড়িয়ে কান্না করতে ইচ্ছে জাগছে আমার। যাবো না আমি সুন্দরবন, ট্রেনেই ডেডবডি হওয়ার থেকে বাসায় বসে আঙুল কামড়ানো অনেকগুণ ভালো। এখনও হাতে সময় আছে, ট্রেন ছেড়ে দেবার পূর্বেই নেমে যেতে হবে আমায়!

----- "বইন তুই যা, আমি বাসায় যাবো!"

----- "হোয়াট? পাগল হয়ে গেছিস তুই? বাসায় যাবি মানে কি?"

----- "দেখ, আমার সোজাসাপ্টা আলাপ, উইন্ডো সাইট সিট না পেলে আমি যাচ্ছিনা। সুমন স্যারকে বল আমি নামবো!"

রাত্রি চরম বিপাকে পড়ে কপাল চাপড়াতে লাগলো। আশেপাশে চোখ ঘোরাতে ঘোরাতে হঠাৎ আশাভরা গলায় বলল,

------ "দোস্ত! পেয়ে গেছি!"

----- "মানে? কি পেয়ে গেছিস?"

আরে ওইযে ওই দেখ নীবিড় ভাইয়ার পাশের সিট খালি, চলনা ভাইয়াকে একটু বলি যাতে উইন্ডো সিটটা ছেড়ে তোকে বসতে দেয়!

রাত্রির কথায় চরম অবাক হলাম আমি। ঝাঁঝালো গলায় বললাম,

----- "রাত্রি, তুই গাজা খাইছোস? ওই বিলাইটার পাশে বসবো আমি? ইম্পসিবল!"

রাত্রি আমার পুরো কথাটা শুনার পুর্বেই ছুট লাগালো। নীবিড় ভাইয়ার নিকটে পৌঁছে অসহায় গলায় বলল,

------ "ভাইয়া, একটু শুনবেন?"

নীবিড় ভাইয়া ভীষণ মনোযোগ দিয়ে সামনের ছেলেটাকে কিছু একটা বুঝিয়ে বলছিলেন। রাত্রির ডাকে কপাল কুঁচকে বললেন,

----- "হুম বলো! কি হয়েছে?"

----- "ভাইয়া আপনি কি একাই দুটো সিট নিয়ে যাচ্ছেন?"

----- "হ্যাঁ, কেনো? সিট কি শর্ট পড়েছে তোমার? হিসেবে তো আরো এক্সট্রা পাবার কথা!"

রাত্রি খানিক দোনামোনা ভাব নিয়ে বলল,

----- "আসলে ভাইয়া, অনন্যা জানালার পাশে সিট ছাড়া বসতে পারেনা। জানেনই তো ওর আবার জার্নিতে ভীষণ প্রবলেম হয়, আবার যদি বমি টমি করে ফেলে তখন?"

নীবিড় ভাই কপালে সুক্ষ্ম বিরক্তির ভাঁজ ফেলে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকালেন। আমি ততক্ষণে রাত্রি কাছে পৌঁছে চিমটি বসিয়ে দিয়েছি গায়ে। দাঁত দাঁত চেপে ক্রমান্বয়ে বলে চলেছি,

----- "বলদির বাচ্চা, তোকে বলেছি উনাকে এই বিষয়ে কিছু বলতে? আমি যাবো না মানে যাবো না। এখনও দু মিনিট বাকি আছে। আমি নামবো, ব্যাস!"

নীবিড় ভাইয়া হঠাৎ করেই সটান হয়ে দাঁড়িয়ে পড়লেন। পেছনের খালি সিটটায় একটি মেয়ে বসা দেখে নিয়ে আরো খানিকটা বিরক্ত চোখে তাকালেন। সকলের অবাক দৃষ্টি আমাদের ওপর আবদ্ধ হতেই গম্ভীর গলায় বললেন,

----- "ট্রেন ছেড়ে দিবে। ঝামেলা না বাড়িয়ে চুপচাপ বসতে বলো তোমার বান্ধবীকে!"

রাত্রি এক প্রকার লাফিয়েই ধাক্কা মেরে সিটে বসিয়ে দিলো আমায়। নীবিড় ভাইয়া যে তাকেও বসতে দিয়ে পেছনের মেয়েটার পাশে কখনোই বসতে যাবেন না তা জানা কথা, যার ফলশ্রুতিতে আমায় একলা বসিয়ে দিয়েই আমোদিত গলায় রাত্রি বলল,

----- "থ্যাংকিউ সো মাচ ভাইয়া, আপনাকে যে কি বলে ধন্যবাদ দিবো! উফফফ বাঁচালেন আমায়। বাই দ্য ওয়ে, আমাদের তো বাসে করে যাওয়ার কথা ছিলো। হঠাৎ সিদ্ধান্ত বদলে ট্রেনে যাচ্ছি কেনো আমরা?"

নীবিড় ভাইয়া নিজের সিল্কি চুলগুলোর মাঝে হাত চালিয়ে একপলক আমার দিকে তাকালেন। দৃষ্টি সরিয়ে গম্ভীর গলায় বললেন,

----- "যাতে তোমার বেস্টফ্রেন্ডের মতো আরো কিছু স্টুপিডের জন্য কারো ড্রেস খারাপ না হয়!"

#চলবে_________________

(রি-চেইক করার সময় পাইনি, বানান ভুল হতে পারে ভীষণ। ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন প্লিজ!)

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ১৩তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন