ফন্ট সাইজ:
থিম:
প্রেম আমার (সিজন ২)

১৪তম পর্ব

লেখক: আয়ানা জাহান নুসরাত

#প্রেম_আমার♥(সিজন-টু)

#পর্ব-১৪♥

#আয়ানা_জাহান_নুসরাত♥

"ভেঙে মোর ঘরের চাবি

নিয়ে যাবি কে আমারে?

ও...বন্ধু আমার!

ভেঙে মোর ঘরের চাবি

নিয়ে যাবি কে আমারে?

ও...বন্ধু আমার।"

অগ্নির গানের মাঝেই ঠোঁট উল্টে কিছু একটা ভাবলো রুশো। ভাইয়ের সাথে সমান তালে হাঁটতে হাঁটতে বলল,

----- "ব্রো, তোমার কি মনে হয় তুমি ঠিকঠাক লিরিক্স গাইছ?"

অগ্নি সুর ছেড়ে ভ্রু কুঁচকে তাকালো। জবাব স্বরূপ পাল্টা প্রশ্ন ছুড়লো,

----- "ভুলভাল লিরিক্স গাইতে যাবো কেনো?"

----- "বাট ব্রো, মানুষ তো তালা ভেঙে ঘরে ঢোকে অথচ তুমি বলছো 'চাবি'! তবে কি চাবি দিয়ে ঘর আটকানো ছিলো? স্ট্রেইঞ্জ!"

পদধ্বনিতে আলোড়িত সড়কের ফুটপাত ধরে হাঁটার পথে অগ্নির কপালেও ভাঁজ পড়লো কিঞ্চিৎ। আসলেই তো, রুশোর কথা তো একেবারে ফেলে দেওয়ার মতো নয়। মানুষ তালা ভেঙে, চুরি হোক ডাকাতি হোক কিংবা হোক কিডন্যাপিং, চাবি ভেঙে তো আর করে না। হয় চাবি দিয়ে তালা খোলে নয়তো ইটপাটকেল মেরে তালাটাই ভেঙে ফেলে। অথচ গানে বলা আছে, "ভেঙে মোর ঘরের চাবি নিয়ে যাবি কে আমার!" অদ্ভুত! অগ্নির ভাবনার মাঝেই হঠাৎ তুড়ি বাজিয়ে বসলো রুশো। উচ্ছ্বসিত কন্ঠে লাফিয়ে উঠে বলল,

----- "হেই ব্রো, আমি ঠিকঠাক লিরিক্স বানিয়ে ফেলেছি।"

অগ্নি জিজ্ঞাসুক চোখে তাকালো। রুশো সুর তুলে গাইলো,

----- "ভেঙে মোর ঘরের তালা,

নিয়ে যাবি কে রে শালা?

ও....শত্রু আমার!"

অগ্নি হঠাৎ করেই হতভম্ব হয়ে হাঁটা থামিয়ে দিলো। ভাইকে দাঁড়াতে দেখে থমকালো রুশোও। মাথা চুলকতে চুলকতে বলল,

---- "এর থেকে বেটার কিছু পাচ্ছিলাম না ব্রো, এন্ড শালা বললে কি আর বন্ধু বলা চলে? কেমন যেনো গানের মধ্যে গুরুচন্ডালী টাইপ ভাব চলে আসে না? তাই আরকি বন্ধুর বদলে শত্রু বসিয়ে দিলাম। কী হলো তো এবার ঠিকঠাক মিনিংফুল লিরিক্স?"

অগ্নি বিনিময়ে কোনো বাক্য আওড়াবার মতো পরিস্থিতিতে রইল না। ফুটপাতের সাথে লাগানো দেয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে হু হা করে হাসতে শুরু করলো সে। রুশো ভাইকে এভাবে লাগামহীন হাসতে দেখে ঠোঁট উল্টালো। মিনমিনে গলায় বলল,

------ "হেই ব্রো হাসছ কেন? ভুল কিছু বললাম নাকি?"

অগ্নি আরো কিছুক্ষণ একই ভাবে হাসতে থাকলো। এক পর্যায়ে পেট ধরে হাঁপাতে হাঁপাতে বলল,

----- "না না ভুল কিছু বলিস না, শুধু হাতুড়ি ছাড়াই গান'টার হাত-পা ভেঙে ফেলেছিস এই!"

রুশো ঠোঁট বাঁকিয়ে শার্টের কলার উঁচু করলো। ভাবখানা এমন ধরলো যেনো কতো বড় বীরের মতো কাজ করেছে সে। অগ্নি আরেকদফা হেসে দাঁড়াল। আবারও ধাপ ফেলে এগোতে এগোতে বলল,

----- "রুশো জানিস অনু এখন মনে মনে কাউকে না কাউকে ইচ্ছেমতো হাজারটা গালি-গালাজ করছে!"

রুশো দাঁড়িয়ে ছিলো এতোক্ষণ। ভাইকে কিছুদূর এগিয়ে যেতে থেকে এক ছুটে এসে পাশাপাশি অবস্থান নিয়ে বলল,

------ "কিভাবে বুঝলে?"

------ "সিম্পল ব্যাপার, মেয়েটা এতো মানুষের ভীড় সহ্য করতে পারে না। কি জানি উইন্ডো সিট পেলো কিনা, না পেলে সর্বনাশ!"

রুশো তৎক্ষণাৎ পকেট থেকে ফোন বের করলো। অনন্যার পুরো নম্বর ডায়াল করবার পূর্বেই ফোনটা আচমকাই কেড়ে নিলো অগ্নি৷ ব্যস্ত গলায় বলল,

----- "আহা এখন কল করিস না, মাত্র ট্রেন ছাড়লো নয়েজ ক্রিয়েট হচ্ছে মেইবি ভীষণ। পরের স্টেশনে পৌঁছলে কল দিস!"

রুশো চিন্তিত চিত্তে ভাবলো বিষয়টা। বিচক্ষণ ভঙ্গিমায় মুখভঙ্গি পরিবর্তন করে বলল,

----- "ইউ আর রাইট ব্রো!"

দু'ভাই মিলে খোশগল্পে মগ্ন হয়ে আরো কিছুদূর হেঁটেই পাড় করলো। কেনো যেনো গাড়ি করে আর বাড়ি ফিরতে ইচ্ছে হয়নি তাদের। ড্রাইভার কে কল করে গাড়ি নিয়ে বাবার অফিসে যেতে বলেছিল অগ্নি। সেই থেকে দুজনে স্টেশন ছেড়ে রওনা হয়েছে। পেয়ে হেটেই শহরটার কিছু অংশ ঘুরবার উদ্দেশ্য ছিলো তাদের।

চলার পথেই হঠাৎ থমকে দাঁড়ালো রুশো। দূরে কোথাও কোনো এক প্রেক্ষাপটে দৃষ্টি আবদ্ধ হলো তার। অগ্নি পাশ ফিরে ফুটপাতে বাদাম বেচতে থাকা ছেলেটার কাছ থেকে ১০ টাকার বাদাম কিনল। তার মাথায় হাত বুলিয়ে সোজা হয়ে দাঁড়াতেই রুশোকে বোকার মতো এক দৃষ্টিতে চেয়ে থাকতে আবিষ্কার করলো কোনো এক পানে। রুশো সেদিকে দৃষ্টি রেখেই অস্ফুটস্বরে বলল,

------ "ব্রো লুক!"

অগ্নি তাকালো রুশোর উল্লেখিত স্পট বরাবর। মাস্ক পরিহিত একটি মেয়ে দূর থেকে ছুটে আসছে এদিকেই। একহাত প্রসারিত করে হাঁক ছাড়ছে একনাগাড়ে। তার থেকে বেশকিছু হাত দূরত্ব রেখেই একটি বখাটে ছেলের মতো কেউ দৌড়ে চলেছে। যতোদূর সম্ভব মেয়েটির বিশেষ কিছু চুরি করে পালাচ্ছে ছেলেটি। মেয়েটি ধাওয়া করছে তার পেছন পেছন। অগ্নির ব্যাপারটা মাথায় অর্থসহ ঢোকার মুহুর্তেই তাদের পাশ কাটিয়ে গেলো ছেলেটি। পেছন থেকে ভেসে এলো সেই তীব্র চিৎকার,

----- "চোর.....! চোর......!"

----- "ওহ শিট! রুশো......রান!"

একথা বলার প্রায় সাথেসাথেই চোরটার পেছনে নিজের সর্বশক্তি প্রয়োগ করে ছুট লাগালো অগ্নি৷ রুশো কিছুক্ষণ অবুঝ বালকের মতো বোকাসোকা চোখে চেয়ে রইলো। ব্যাপারটা আন্দাজে আসতেই দৌড় লাগিয়ে বলল,

----- "ব্রো....আম কামিং!"

খুব বেশি দৌড়তে হলো না অগ্নিকে৷ তার পূর্বেই রাস্তায় পা বেজে মুখ থুবড়ে পড়লো চোরটি৷ অগ্নি কলার ধরে টেনে তুললো তাকে। হাতে থাকা লকেটটা টান মেরে কেড়ে নিয়ে বলল,

------ "কি দিন-কাল আসলো, চোর দেখি দিনের বেলা এতো মানুষের সামনেও আজকাল চুরি করে!"

----- "ভা....ভা....ভাই আমারে ছাইড়া দেন, আর কক্ষনও চুরি করুম না ভাই ছাউড়া দেন দয়া কইরা।"

ছেলেটার হাত জোর করে করা অনুরোধের মাঝেই দৌড়ে ব্রেক মেরে দাঁড়ালো রুশো। উদগ্রীব হয়ে বলল,

------ "ওয়াও ব্রো, ইউ কট দ্য থিফ ফাইনালি!"

অগ্নি লকেটটা রুশোকে দিকে ছুড়ে মেরে বলল,

----- "রুশো, ক্যাচ!"

চোখের পলকেই লকেটটা ক্যাচ ধরে আগ্রহী চোখে তাকালো রুশো। ততক্ষণে লোকজন একত্র হতে শুরু করেছে তাদের ঘিরে। মেয়েটিও হাঁপাতে হাঁপাতে এসে দাঁড়িয়েছে পেছনে। চোরটা এবার ছাড়া পেতে অগ্নির দু'পা চেপে ধরলো। ক্রন্দনমিশ্রিত কন্ঠে বলল,

------ "ভাই, ভাই আমারে মাফ কইরা দেন ভাই, আসলে আমি চুরি করতে চাইনাই ভাই। আমার গালপ্রেন্ডরে গিফট দিবার চাইছিলাম অনেকদিন ধরে, মাইয়াডা অনেক অভিমান করে আছিলো আমার ওপর ভাই। কিছু গিফট না করলে আর কথা কইতো না! এদিকে আমার পকেটে টাকা নাই। বাধ্য হয়েই চুরিডা করছি ভাই। আর কখনো এমন করবো না কছম! এবারের মতো মাফ কইরা দেন ভাই!"

----- "আরে কিসের মাফ, এই সবাই ধরো তো ব্যাটাকে, দিনে-দুপুরে চুরি করা তাইনা? গণপিটুনি না খেলে এরা শোধরাবে না।"

পাশ থেকে বেশ মোটাতাজা লোকটার কথায় চোরটাকে মারতে এগিয়ে এলো ৫-৬ জন। অগ্নি অবাকের চরম সীমায় পৌঁছালো ঠিকই তবু হঠাৎ করেই তার মনে হলো ছেলেটাকে মারা উচিত হবে না, বয়স আর কতোই হবে তার? এই সবে ১৮-১৯ বছর বয়সে পা দিয়েছে হয়তো। ভুল করে ভুল পথে এসেছে হয়তো তবু ক্ষমা তো চাইছে। অগ্নির ভাবনার মাঝেই একজন কলার ধরে গালে থাপ্পড় বসিয়ে দিলো চোরটার। দ্বিতীয় বারের মতো গায়ে হাত তুলবার পূর্ব মুহুর্তেই পেছন থেকে চিৎকার করে উঠলো মাস্ক পরিহিত মেয়েটি।

------ "প্লিজ থামুন সবাই। ছেলেটাকে মারবেন না। ও তো নিজের ভুল বুঝে ক্ষমা চেয়েছে। প্রথমবারের মতো নাহয় মাফ করে দেই আমরা? ছেলেটা ছোট! হয়তো বুঝতে না পেরে এমন একটা কাজ করে ফেলেছে। তাই বলে আপনারা যদি সকলে মিলে ওকে মারধর করেন, মরে যাবে তো ছেলেটা।"

মেয়েটির কথায় নিজেদের মধ্যে গভীর আলোচনায় মত্ত হলেন মুরব্বিরা। অগ্নি-রুশো অবুঝ ভঙ্গিতে একে-অপরের দিকে চাওয়া-চাওয়ি করলো কিছুক্ষণ। চোরটা মেয়েটির পায়ের কাছে গিয়ে বসে পড়ে কাকুতিমিনতি জুড়ে দিলো। হাত জোর করে বলল,

------ "আপামনি, আপনি আমারে বাঁচাইলেন। বিশ্বাস করেন আমি ইচ্ছা করে চুরি করিনি। কামকাজ পারিনা তো, বাপ-মা'ও নাই। আমি একলা একটা ছেলে বহু কষ্টে এডা মাইয়ারে পটাইছি। যাতে ব্রেকআপ না হয় তাই চুরিডা করছি আপা।"

মেয়েটি অবাক চোখে তাকালো। কি জামানা এলো! ছেলে কিনা গার্লফ্রেন্ডকে গিফট দেওয়ার জন্য সবশেষে চুরির পথ বেছে নিলো! ওহ মাই আল্লাহ! হতভম্ব হয়ে মুহুর্তেই দু'ধাপ পেছালো মেয়েটি।

----- "ঠিক আছে ঠিক আছে, পায়ে পড়তে হবে না। ইয়াং একটা ছেলে তুমি, টাকা নেই তো কি হয়েছে উপার্জন করবে।"

ছেলেটি উঠে দাঁড়াল। কাঁদোকাঁদো মুখ করে চেয়ে বলল,

------ "জে আপা, আমি এখন থেইকা পাইসা কামাবার চেষ্টা করমু। আপনারে লাখ লাখা শুকরিয়া আপা।"

একথা বলেই ফাঁক পেয়ে আবারও ছুট লাগালো ছেলেটি। সে যার থেকে চুরি করেছে সে ক্ষমা করলেও জনগণের গণপিটুনির হাত থেকে বাঁচতে অবশেষে পালাতে হলোই তাকে।

------ "মেয়ে তুমি চোরটাকে এমনি এমনি ছেড়ে দিয়ে ভুল করলে।"

মেয়েটি হাসলো। বিনিময়ে বলল,

----- "ভুল থেকেই যদি ছেলেটা সঠিক পথে যেতে পারে তবে ভুলই ভালো। আপনারা চিন্তা করবেন না আংকেল।"

লোকজন আর বিশেষ কথা বাড়ালো না৷ "চলুন ভাইয়েরা, এখানে থেকে আর কাজ নেই!" বলেই একে একে পাশ কাটিয়ে নিজেদের দৈনন্দিন কর্মে মত্ত হলো সকলে। তবে নিজেদের অবস্থান পরিবর্তন করলো না শুধু অগ্নি-রুশো। অগ্নির চোখেমুখে অবাক-খুশি ভাব! তাতে অনেকাংশে দেখা মিলছে মুগ্ধতার। অগ্নি-রুশোর এই অবাক দৃষ্টিকে সাক্ষী রেখেই হেসে দু'ধাপ এগোল মেয়েটি৷ রুশো আনমনেই লকেটটা হাতে তুলে দিলো তার। মাস্ক খুলে মিষ্টি হেসে বলল মেয়েটি বলল,

------ "থ্যাংক ইউ সো মাচ! আপনাদের সাথে আবারও এভাবে দেখা হবে ভাবিনি।"

মুহুর্তেই চোখ দুটো রসগোল্লা'র আকার ধারণ করলো অগ্নি রুশোর। একে-অপরের দিকে একবার, পর মুহুর্তে আবারও মেয়েটির দিকে দৃষ্টি নিক্ষেও করে বিস্মিত কন্ঠে দুজনেই একসাথে বলে বসলো,

------ "আপনি!"

__________________________________________

কপোতাক্ষ এক্সপ্রেস, নিজের বিশাল শরীর হেলেদুলে একঝাঁক মানবকূলকে নিঃসংকোচে এগিয়ে নিয়ে চলেছে খুলনার উদ্দেশ্যে। রাজশাহী স্টেশন ছেড়ে আব্দুলপুর ছুঁইছুঁই অবস্থান। একের পর এক গাছ-গাছালি বোধহয় শা শা করে ছুটে চলছে পেছনের দিকে। ট্রেন থেকে নিজেদের স্থির বলে মনে হচ্ছে আমার। অথচ প্রকৃতিকে দেখো, কি সুন্দর পায়ে চপল ছাড়াই ধেয়ে চলেছে! সেই সাথে আমার দমকা হাওয়ায় বাঁধা চুলগুলোও ডানা মেলে উড়ছে। এমনি সময় ট্রেন জার্নিকে উপভোগ করে হাওয়ায় গা ভাসানো আমি আজ ধরেছি ভিন্ন রূপ। বুক ভরে শ্বাস নেবার বদলে উথাল-পাতাল ঢেউ বইছে হৃদয়ে। পাশে বসে থাকা ব্যক্তিটাই মূলত সকল অস্থিরতাকে ঘিরে ধরেছে আজ। রাত্রির কুবুদ্ধির বেড়াজালে আজ এতোটাই বিব্রতকর পরিস্থিতির সামিল হয়েছি যে, না পারছে উঠতে না পারছি একইভাবে বসে থাকতে। বর্তমানে এই রাত্রি পেত্নিটার মাথাটাকেই মসলা ছাড়া কচকচ করে চিবিয়ে খেয়ে ফেলতে ইচ্ছে হচ্ছে ভীষণ। একইভাবে বাইরে তাকিয়ে থাকতে থাকতে ঘাড়ে টান পড়েছে বিশ্রীভাবে। এই মুহুর্তে পাশ ফিরে তাকানোটা অবধারিত। কিন্তু যদি বিলাইটার মুখ আবারও নজরে পড়ায় মেজাজটা বিগড়ে যায়? কিংবা আবারও বজ্জাতটা যদি গরম চোখে তাকায় তখন?

ধুর! যা হবে হবে। ব্যাটার জন্য নিজের ঘাড় ব্যাকা করে প্রতিবন্ধী সেজে থাকবো নাকি? মোটেই নয়! ভেবেই লম্বা শ্বাস টেনে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকালাম আমি।

নীবিড় ভাইয়া কানে হেডফোন গুঁজে চোখ দুটো বুজে রয়েছেন ঠিক সেই ফ্লাইটের দিনের মতো করেই। সিল্কি চুলগুলো হাওয়ায় খেলে বেড়াচ্ছে উনার কপাল থেকে চোখ জুড়ে। ডার্ক রেড ঠোঁটের বা কোণটা কিঞ্চিৎ বেঁকে আছে। শ্বাস-প্রশ্বাসের আনাগোনায় থেকে থেকেই উঠানামা করছে বুক। আমার হঠাৎ করেই কি যেনো হলো, চোখদুটো অজান্তেই স্থির হয়ে রইলো উনাতে। দৃষ্টি গাঢ় থেকে হলো গাঢ়তর! সুক্ষ্ম চোখের তীক্ষ্ণতা ঘুরেফিরে চললো উনার মুখেই। তার বিচক্ষণতাতেই আবিষ্কার করে ফেললাম ভয়ংকর সুন্দর এক চিহ্ন। মানুষটার বা ভ্রু'র পাশে রয়েছে ছোট্ট একটা বাদামী তিল। যা হয়তো আরো বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে উনার সৌন্দর্য! চোখদুটো ক্ষণিকের জন্য তাতেই আবদ্ধ হলো আমার। শুধুমাত্র ঘাড় ঘুরিয়ে রগের টান কাটানোর কথা মাথা থেকেই বেরিয়ে গেলো।

আমার অপলক চাহনির মাঝেই দুই ভ্রু'র মাঝে কিঞ্চিৎ ভাঁজ ফুটে উঠলো উনার। ভ্রম কেটে আচমকাই হকচকিয়ে দৃষ্টি সরিয়ে ফেললাম আমি। অস্বস্তির চরম সীমায় পৌঁছে ঘনঘন শ্বাস ফেলে জিহ্ব দিয়ে ঠোঁট ভিজিয়ে নিলাম। পাশ থেকে নীবিড় ভাইয়ার ঘুম জড়ানো কন্ঠে ভেসে এলো,

----- "হ্যাভ সাম ওয়াটার!"

আমি তটস্থ ভঙ্গিতে আড়চোখে তাকালাম। হাতে থাকা মিনারেল ওয়াটারের বোতলটা আমার দিকেই এগিয়ে দিয়েছেন উনি। ইশারায় বলছেন শুকনো গলাটা ভিজিয়ে নিতে! হায় আল্লাহ তবে কি আমায় নিজের দিকে হ্যাবলার মতো চেয়ে থাকতে দেখে ফেললেন উনি? নাকি না বুঝেই শুধুমাত্র অস্থিরতার আঁচ করতে পেরে পানি পান করতে বলছেন? সঠিক উত্তরের জানান মিললো না আমার। কাঁপাকাঁপা গলাতেই কোনোরকমে বললাম,

----- "আব....নো নিড ভাইয়া, ঠিক আছি আমি।"

নীবিড় ভাইয়া কিছু না বলেই বোতলটা আগের জায়গায় রাখলেন। ফোনে দৃষ্টি ফেলে স্ক্রল করতে ধরতেই হঠাৎ বেজে উঠলো কল। না না ভয়েস কল নয়, হোয়াটস অ্যাপ থেকে ভিডিও কল এসেছে উনার ফোনে। আড়চোখে যতোটুকু নজরে পড়লো তাতে গোটাগোটা অক্ষরে "Zara" নামটার দেখা মিললো স্পষ্ট রূপেই। মুহুর্তেই মেজাজটা চটে গেলো আমার। রাক্ষুসিটা দেখি ভিডিও কলও দেয়। হাহ! দেক অডু বা ভিডু কল তাতে আমার কি? যার মাথাটা খাচ্ছে তারই তো কোনো হুশ নেই! দেখেশুনে কেউ এমন একটা বেপরোয়া মেয়েকে বিয়ে করতে কিভাবে চায় তা আজো মাথায় খেলে না আমার। বাহিরের চাকচিক্যই কি তবে সব? ভেতরের শুদ্ধতার কোনো মূল্য নেই? বিন্দুমাত্রও না?

নীবিড় ভাইয়া খানিক দোমনা ভাব নিয়ে কলটা রিসিভ করবেন কিনা এই ভেবেই দ্বিধাদ্বন্দে ভুগলেন। উনার অস্বস্তিটা বুঝতে পেরে জানালার একদম পাশে মাথাটা সরিয়ে আনলাম আমি। অবশেষে বেশি কিছু না ভেবেই কল রিসিভ করলেন উনি। একহাত দূরত্বে মুখোমুখি ফোনটা ধরে রাখলেন।

----- "হ্যালো বেবি!"

নীবিড় ভাইয়া মৃদু হেসে "হাই" বললেন। প্রায় সাথেসাথেই কিছু একটা নজরে পড়ায় উল্টে দিলেন ফোন। হেডফোনের স্কিপারে মুখের কাছে ধরে চাপা গলায় বললেন,

----- "হোয়াট ইজ দিস জারা? নাইট ড্রেস পড়ে ভিডিও কল দেওয়ার মানে কি?"

নীবিড় ভাইয়া হয়তো ভেবেছিলেন আমি কিছু শুনতে পারবো না। অথচ এইদিকে এন্টেনার মতো কানদুটো যে খাঁড়া করে রেখেছি সেদিকে বিন্দুমাত্র ভাবাবেগ নেই উনার। ছিঃ ছিঃ ছিঃ! লজ্জায় নিজেকেই কচু গাছের সাথে ফাসি দিতে হচ্ছে করছে! ছিঃ পুরাই নাউজুবিল্লাহ মার্কা মেয়ে, নাইটি পড়ে কেউ কোনো ছেলেকে ভিডিও কল দেয় নাকি? হাজবেন্ড তো হয়নি এখনো, এটুকু কমনসেন্স কি নেই মেয়েটার?

------ "চেঞ্জ করে কল করো, এমনিতেই ট্রেনে আছি। নেটওয়ার্ক প্রবলেম করছে!"

ওপাশ থেকে প্রতুত্ত্যরে ঠিক কি জবাব এলো তা শ্রবণগোচর হলো না আমার। ২ মিনিটের মতো নীরবতা চললো। পূণরায় ফোনে কল এলে রিসিভ করলেন নীবিড় ভাইয়া।

------ "বলো, কি বলবে? ব্রেকফাস্ট করেছ নাকি এখনও শুয়েই আছো?"

......................

------ "আচ্ছা জারা আমি তোমায় পড়ে কল করি? হেডফোনটা প্রবলেম করছে, কথা ক্লিয়ার শুনা যাচ্ছে না!"

.......................

------ "দ্যটস নট পসিবল জারা, বোঝো একটু! জুনিয়রদের সাথে ট্যুরে যাচ্ছি। ওদের সামনে এভাবে লাউডে ভিডিও কলে কথা বলাটা খারাপ দেখায়।"

......................

----- "ওহ গড! ওকে ওকে। হেডফোন খুলছি নাও!"

একথা বলে নিয়েই বিরক্তিতে পিষ্ট নীবিড় ভাইয়া হেডফোন খুলে মোবাইলটা আবারও সামনে ধরলেন। আড়চোখে যতোটা দেখা গেলো তাতে জরিনা খালা ঠোঁটে মোটা করে লিপস্টিক লাগিয়ে ড্যাবড্যাব করে চেয়ে আছে। যাহ শালা! আমি তো ভেবেছিলাম নাইটড্রেস পড়া অবস্থায় বেচারি ঘুম থেকে উঠেই কল করেছে। তাহলে ঠোঁটে এতো গাঢ় রঙ কেন? ঘুমের সময় পেত্নি সেজে ঘুমোয় নাকি! ভেবেই ফিক করে হেসে ফেললাম আমি। নীবিড় ভাইয়া কিঞ্চিৎ ভ্রু কুঁচকে তাকালেন। ওপাশ থেকে জরিনা খালা প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই বলে উঠলো,

----- "হোয়াট হ্যাপেন্ড? তুমি ওদিকে তাকালে কেনো? কে আছে তোমার পাশে?"

নীবিড় ভাইয়া আচমকাই ভড়কে গেলেন। আমতা-আমতা করে বললেন,

----- "আরে তেমন কেউ না, ফার্স্ট ইয়ার স্টুডেন্ট!"

জরিনা খালার ব্যাপারটা হজম করতে কষ্ট হলো হয়তো। জটিল সমীকরণটাকে সরলে রূপান্তর করতে কুবুদ্ধি এলো আমার মাথায়। চট করে সরে এসে নীবিড় ভাইয়ার ফোনের স্ক্রিনে তাকালাম আমি। লম্বা করে দাঁত কেলিয়ে বললাম,

------ "হ্যালো জরিনা খালা থুক্কু জারা ফারা,

আজ জামা-কাপড় ঠিকঠাক আছে তো?"

মুহুর্তেই রাগে কটমট করে উঠলো জারা। দাঁতে দাঁত চেপে বলল,

------ "হোয়াট দ্য হেল নীবিড়! তুমি এই মেয়েটার পাশে কেনো বসেছ? হোয়াই?"

------ "জারা তুমি যেমনটা ভাবছ তেমন কিছু নয়, ও একচুয়ালি উইন্ডো সিট পাচ্ছিলো না তাই...."

নীবিড় ভাইয়ার এটুকু বলে নিতেই ওপাশ থেকে চিৎকার ভেসে এলো আবারও,

------ "তাই মানে কি? উইন্ডো সিট না পেলে তুমি ওকে পাশে বসিয়ে নেবে? এখন পাশে বসেছে কয়েকদিন পর কোলে বসতে চাইবে। এসব মেয়েকে আমি হাড়েহাড়ে চিনি নীবিড়। উই জাস্ট স্টে ওয়ে ফ্রম হার। যত্তসব গায়ে পড়া মেয়ে, লাইক বাস্টার্ড!"

হাতের মুঠো হঠাৎ করেই শক্ত করে চেপে ধরলেন নীবিড় ভাইয়া। এদিকে আমার ভেতরে আকাশ সমান রাগচন্ডী ভর করলেও মুখে প্রকাশ করলাম না কিছু। চুপ করে সিটে হেলান দিয়ে বসে রইলাম স্রেফ। এই মেয়ে ঠিক কতোটা নিকৃষ্ট মানসিকতা নিয়ে থাকতে পারে তার পুরোটাই দেখতে চাই আজ। তবে সেই সুযোগটুকু কপালে জুটলো না আর। নীবিড় ভাইয়া হঠাৎ ভাবমূর্তি পরিবর্তন করে ফেললেন যেনো। গম্ভীর গলায় বললেন,

------ "যে কাউকে নিজের মন মতো কথা সাজিয়ে বলে ফেলার মতো ভুল নেক্সট টাইম করিয়ো না জারা। ফিউচারে না হোক তোমায় অন্যদের থেকে এসব স্ল্যাং শুনতে হলো!

হোয়াট এভার, রাখছি। আজ আর কল করার সাহস করো না।"

মুহুর্তেই ফোনের লাইন কেটে উত্তপ্ত শ্বাস ফেললেন উনি। রক্তচক্ষু দুটো গরম করে আমার দিকে তাকিয়েই ধমক মেরে বললেন,

------ "এন্ড ইউ স্টুপিড, জাস্ট স্টে উইথইন ইউর লিমিটস! শুধুমাত্র অগ্নির বোন বলে এতোক্ষণ যাবৎ টলারেট করছি তোমায়! নয়তো......."

পুরো বাক্যটা শেষ না করেই সিটে গা এলিয়ে দিয়ে চোখ দুটো বুঝ নিলেন উনি। ঘনঘন শ্বাস ফেলে নিজেকে শান্ত করবার কঠিন পরীক্ষায় নাম যোগ করলেন। ভয়ে কুঁকড়ে কিছুক্ষণ থম মেরে রইলাম আমি! অস্থির মনটা ভয়ে চুপসে গেলেও ব্যাকুল হয়ে পড়লো পুরো বাক্যটা শুনবার আগ্রহে। সীমার মধ্যে না থাকলে কি করবেন উনি? কাচ্চি বিরিয়ানির মতো চিবিয়ে চিবিয়ে খেয়ে ফেলবেন নাকি?

#চলবে________________

(ভুল ত্রুটি ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখবেন। লেইট হওয়ার সরি!)

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ১৪তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন