ফন্ট সাইজ:
থিম:
প্রেম আমার (সিজন ২)

৪৪তম পর্ব

লেখক: আয়ানা জাহান নুসরাত

#প্রেম_আমার♥(সিজন-টু)

#পর্ব_৪৪♥

#আয়ানা_জাহান_নুসরাত♥

নিস্তব্ধ, অন্ধকার ঘরটায় আজ হঠাৎ করেই কিছু ভাঙচুরের আওয়াজ সৃষ্টি হলো। ঝনঝনে এক প্রকাণ্ড আওয়াজ। তীর্থের কাকের মতো চোখে ভরাডুবি ঘুম নিয়ে ঝিমনো শাহাবুদ্দীন চমকে উঠলো হঠাৎ। দাঁড়িয়েই চেঁচাতে শুরু করলো,

------ "বড় ম্যাডাম, স্যার....আপনারা কে কোথায় আছেন জলদি আইসা দেখে যান। ছোট ম্যাডামের ঘর থেইকা ভাঙচুরের আওয়াজ আইতাছে!"

হাতে রাখা চায়ের কাপটার তোয়াক্কা না করে হন্তদন্ত হয়ে সিঁড়ি ভেঙে দোতলায় উঠলেন মিস্টার এবং মিসেস খন্দকার। দরজায় কড়া নাড়তে শুরু করে মিসেস অর্পিতা খন্দকার উচ্চস্বরে ডেকে উঠলেন,

------ "জারা, এই জারা! মা, দরজা খোল। কি হয়েছে তোর? ভাঙচুর করছিস কেনো? জারা....!"

------ "হেই প্রিন্সেস, হোয়াটস রং উইথ ইউ? প্লিজ ওপেন দ্য ডোর ডিয়ার। তোমার ড্যাড আছে তো সব ঠিক করে দেবে, ট্রাস্ট মি!"

ভেতর থেকে প্রতিউত্তরে কোনো বাক্য ভেসে এলো না। বরং ভাঙচুরের মাত্র বাড়তে থাকলো। সম্ভবত কাচের কোনো আসবাবপত্র ভাঙছে জারা। অর্পিতা খন্দকার মেয়ের এমন পাগলামো দেখে ডুকরে কেঁদে উঠলেন। স্বামীর হাত চেপে ধরে ফোঁপাতে ফোপাঁতে বললেন,

------ "ও গো, আমাদের মেয়েটার কি হয়ে গেলো গো? ও দরজা খুলছে না কেনো বলো না?"

------ "আহা, অর্পিতা শান্ত হও! এভাবে কান্নাকাটি করে মেয়ে কে তো বের করা যাবে না। আমি দেখছি, তুমি কান্না থামাও প্লিজ!"

স্ত্রী'কে সান্ত্বনা দিয়ে আবারও দরজায় করাঘাত করলেন মিস্টার জিহাদ। নরম গলায় বলতে লাগলেন,

------ "জারা, মাই লিটিল প্রিন্সেস প্লিজ কালম ডাউন। তোমার যা চাই আমি তাই এনে দিবো। তুমি জাস্ট আমায় একবার বলে দেখো। নীবিড়ের জন্য এসব পাগলামি করছ তাইতো, ফাইন! তোমার ড্যাড আছে তো। হি উইল ডেফিনিটলি ব্রিং ইউর লাভ ফর ইউ। আমায় জাস্ট আরেকটু সময় দাও প্রিন্সেস প্লিজ...!

মিস্টার জিহাদের পুরো কথা শেষ হবার পূর্বেই দরজায় খট করে আওয়াজ হলো। শুকনো মুখ, চোখে লেপ্টে যাওয়া কাজল, উষ্কখুষ্ক চুল নিয়ে পাথর রূপে বেরিয়ে এলো জারা। মেয়ের এমন বিধ্বস্ত চেহারা দেখে আত্মা কেঁপে উঠল মিস্টার এবং মিসেস খন্দকারের। সেইদিন ঘটে যাওয়া বিশ্রী ঘটনায় জারা একেবারেই চুপচাপ হয়ে গিয়েছিল। বাড়ির বাহিরে তো দূর ঘর থেকে দু-একবারের বেশি বের হয়নি সে। কিন্তু এতোটা পাগলামি তো করেনি এতোদিন। আজ হঠাৎ কি হলো মেয়েটার? মিসেস খন্দকার চিন্তিত ভঙ্গিতে মেয়ের কাঁধে হাত রাখলেন। ভেজা গলায় জিজ্ঞেস করলেন,

------ "জারা, মা ঠিক আছিস তুই?"

জারা ভাবলেশহীন ভাবে ঝটকা মেরে সরিয়ে দিলো মায়ের হাত। রক্তবর্ণ ধারণ করা চোখদুটো মিস্টার জিহাদের মুখপানে স্থির করে বলল,

------ "ড্যাড, তুমি নীবিড়কে আমার কাছে ফিরিয়ে দিতে পারবে? সত্যিই পারবে নাকি শুধু মিথ্যে সান্ত্বনা দিচ্ছ? কোনটা?"

মিস্টার জিহাদ মেয়ের এমন কঠিন প্রশ্নে কয়েক সেকেন্ডের জন্য নির্বাক রইলেন। পরমুহুর্তে ঠোঁটে মিছে হাসি ফুটিয়ে বললেন,

------ "অফ কোর্স পারব প্রিন্সেস। জাস্ট ডোন্ট ওয়ারি! ইউ নো না, টু এর ইজ হিউম্যান? নীবিড় একজন এডুকেটেড ছেলে ও নিশ্চয় বুঝবে তোমায়!"

বিনিময়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলার পাশাপাশি ঠোঁটের বাম কোণ প্রসারিত করলো জারা। তারপর চোখেমুখে ভয়ানক কাঠিন্যের ছাপ ফেলে বলল,

------ "যা পারবে না তার আশা দেওয়া বন্ধ করো ড্যাড। আই নো, উই কান্ট ব্রিং হিম ব্যাক! এখন যা করার আমিই করবো। আমি জাস্ট তোমাদের জানিয়ে রাখছি, আমি যাই করিনা কেনো তা জানার ট্রাই করবে না আর তাতে ইন্টারফেয়ারও করার ট্রাই করবে না। আই হোপ ইউ অল গট মাই পয়েন্ট, আমি ফ্রেশ হয়ে বাইরে যাবো। ড্রাইভার'কে জানিয়ে রাখো!"

একথা বলেই আবারও ঘরে ঢুকে পড়লো জারা। মিস্টার এবং মিসেস খন্দকারের প্রশ্নবিদ্ধ মুখের ওপর শব্দ করে দরজা লাগিয়ে দিলো। মিস্টার এবং মিসেস খন্দকার উভয়ের চোখমুখ থমথমে। মেয়েকে নিয়ে চিন্তার বোঝা এসে মাথায় চেপেছে দুজনেরই।

------ "আরো মাইয়ারে এমন একলা পাখির মতো উড়তে দেন, আফসোস কইরা লাভ আছে? একদিন যে মাথায় হাত পড়বই এইডা তো জানতামই!"

শাহাবুদ্দীন মুখ ফুটে না বললেও একরাশ ক্রোধ নিয়ে মনে মনে বাক্যটা আওড়াল। তার মতে জারার এমন বিগড়ে যাওয়ার পেছনে তার বাবা-মা'য়ের হাতই রয়েছে সর্বপ্রথম।

_______________________________________

টিফিন আওয়ারের পর আরো দুটো ক্লাস শেষ করে ক্লাসরুম থেকে ক্লান্ত পায়ে হেঁটে বের হলাম আমি-রাত্রি। আজ একেবারেই ক্লাসে মন বসছিল না আমার। মাথায় উল্টোপাল্টা সব ভাবনা সাথে সকালের সেই বিশ্রী ইন্সিডেন্টটাই ঘুরছিল। এখনও চোখদুটো বুজলেই মোস্তাক স্যারের সেই বিকট চেহারাটা ভেসে উঠছে কল্পনায়। আমি থেকে থেকেই আঁতকে উঠছি, না জানি স্যার মনে মনে ঠিক কত প্রকার বকা দিয়েছেন। তবে একটা জিনিস ঠিক, আমার জায়গায় যেই থাকুক না কেনো উনি উনার জায়গা থেকে ভুল। একজন প্রফেসর হিসেবে নিশ্চয় স্টুডেন্টদের মাঝে ভেদাভেদ করা উচিৎ নয়। নীবিড় ভাই বেশ করেছেন, শুধু চিন্তা ভবিষ্যৎ নিয়ে। এই ভূরিওয়ালা স্যারটা আবার কোনো দিক দিয়ে বাঁশ টাশ দিয়ে দেবে না তো!

------ "এইযে হ্যালো, গালে হাত দিয়ে কি এতো ভাবা হচ্ছে মিস ড্রামা কুইন?"

অগত্যা কোনো পুরুষালী কন্ঠস্বরের আগমনে চমকে উঠে গাল থেকে হাত সরিয়ে নিলাম আমি। নিহান ভাইয়ের দুষ্টুমি মাখা হাসি দেখে বোকা হেসে সঙ্গ দিলাম নিজেও। মাথা চুলকে বললাম,

------ "তেমন কিছু না ভাইয়া, এমনিতেই আরকি!"

------ "হয়েছে হয়েছে এতো লজ্জা পেতে হবে না। বলবে না সরাসরি বলে দিলেই পারো। আমি কি তোমায় জোর করবো নাকি?"

অনেকটা ভেংচি কাটা টাইপ ভঙ্গি করেই কথাটা বললেন নিহান ভাই।

------ "এমা না না আপনি ভুল বুঝছেন ভাইয়া, আসলে মোস্তাক স্যারের বিষয়টা নিয়ে ভাবছিলাম। এটা আর নতুন করে বলতে ইচ্ছে করছিলো না এই!"

নিহান ভাই ছোট্ট করে শ্বাস ফেললেন। দু'হাত ভাঁজ করে বললেন,

------ "আমার মনে হয়না ওই টপিকটা নিয়ে তোমার অহেতুক চিন্তা করা উচিত। স্যার ভুল করেছেন, সো এমনটা উনার সাথে হওয়াটা খুবই স্বাভাবিক। তবে আমি ভাবছি অন্য বিষয় নিয়ে। এইযে নীবিড়, যে কিনা মেয়ে স্টুডেন্টদের দিকে একবারের বেশি দুবার পলক ফেলেও তাকায় সে কি-না তোমার জন্য এতোটা রিয়াক্ট করলো! স্ট্রেঞ্জ!"

নিহান ভাইয়ের একই সুরে তাল মিলিয়ে রাত্রি বলে উঠলো,

------ "আপনারও ডাউট হচ্ছে নিহান ভাই! আমারও ব্যাপারটা কেমন যেনো ঘোলাটে লাগছে। অনু নীবিড় ভাইয়ার বেস্টফ্রেন্ডের বোন একথা আমরাও জানি আপনিও জানেন। কিন্তু তবুও এতোটা কেয়ারিং একটু বেশিই বাড়াবাড়ি রকমের মনে হয়না?"

ঠোঁট কামড়ে উত্তর দিলেন নিহান ভাই,

------ "ইয়াহ! সেটাই আমার ভাবনার বিষয়, আর শুধু আমারই নয়, লোকমুখে এই টপিক নিয়ে আলোচনাও হচ্ছে প্রচুর।"

------ "আহ! রাত্রি, এতো বেশি কথা বলিস কেনো তুই? ভালো কিছু বলতে না পারলে মুখে তালা লাগিয়ে রাখবি। এতো আজেবাজে বকবি না। আর নিহান ভাই, আপনিও কিসব আজগুবিকথায় কান দিচ্ছেন বলুন তো? আপনাকে তো সেদিনই বললাম আমি উনার বেস্টফ্রেন্ডের বোন বিধায় আমার প্রতি উনি একটু বেশিই কনসার্ন, নাথিং এলস!"

অনেকটা প্রতিবাদী গলাতেই কথাটা বললাম আমি। নিহান ভাই আমায় শান্ত করবার উদ্দেশ্যে সাথেসাথেই হাত দেখিয়ে বলে উঠলেন,

------ "ওকে ওকে রিল্যাক্স! উই আর জাস্ট কিডিং অনন্যা। ডোন্ট বি সিরিয়াস! কী তাইতো রাত্রি?"

নিহান ভাই রাত্রির পানে চেয়ে প্রশ্নটা করলেন। প্রতিউত্তরে রাত্রি তুমুল বেগে মাথা ঝাঁকিয়ে দাঁত বের করে বলল,

------ "হ্যাঁ হ্যাঁ ওই মজাই করছিলাম আরকি! এতো সিরিয়াস হবার কিছু নেই অনু সোনু!"

আড়দৃষ্টিতে চোখ রাঙিয়ে শান্ত হলাম আমি। নিহান ভাই দুবার কেশে গলাটা ঝেড়ে নিলেন। তারপর রাত্রির উদ্দেশ্যে বললেন,

------- "আব রাত্রি, তুমি আমার জন্য একটা ফেবার করতে পারবে?"

------- "অবশ্যই ভাইয়া বলুন!"

------- "একচুয়ালি আমি রিফাতে'র কাছে আমার নোটবুকটা ফেলে এসেছি। ওইযে ও ক্যান্টিনে বসে আছে, তুমি কী ওর থেকে একটু নোটবুকটা এনে দেবে? ততক্ষণে আমি নাহয় অনন্যার সাথে কথা বলি!"

রাত্রি বিনাবাক্যে মাথা ঝাঁকিয়ে রওনা হলো। রাত্রি খানিকটা দূরে পৌঁছতেই নিহান ভাই বোকা হাসলেন। দোমনা ভাব নিয়ে খানিকক্ষণ ধরে ভাবতে থাকা বাক্যটা আওড়ালেন,

------ "আব অনন্যা তোমার সাথে আমার কিছু ইম্পরট্যান্ট কথা ছিলো!"

------ "জ্বি ভাইয়া বলুন!"

নিহান ভাইয়ার ভাব-ভঙ্গিতে খানিকটা ইতস্তত বোধের লক্ষণ নজরে পড়লো। আমার ভ্রু যুগলে ঢেউ সৃষ্টি হবার পরপরই ভাইয়া বললেন,

------ "আসলে কথাটা যে তোমায় কিভাবে বলব ঠিক বুঝে উঠতে পারছিনা!"

আমার ভ্রু যুগল আরো খানিকটা কুঁচকে এলো। বিনিময়ে জিজ্ঞেস করবার জন্য মুখ খুলতে নিয়েছি সবে তার পূর্বেই নিহান ভাইয়ের কাঁধে হাত রাখলো কেউ। নিহান ভাই চমকে উঠে ঘাড় ঘোরালেন। ঠোঁটে হাসি ফুটিয়ে আগুন্তকঃ'এর উদ্দেশ্যে বললেন,

------ "আরে নীবির তুমি এখানে!"

------ "হুম এইতো ক্যাম্পাসটায় চক্কর দিচ্ছিলাম। কোথায় আজকাল কি হচ্ছে সব খবর রাখতে হয় তো তাই। তা....পার্সোনাল কথা হচ্ছিল বুঝি? আমি ডিস্টার্ব করে ফেললাম না তো?"

কথাটা যদিও হেসে হেসেই বলছিলেন তবু তাতে স্পষ্ট ভিন্ন কোনো অর্থ লুকোনো আছে বলে মনে হলো আমার। তবে নিহান ভাই বেশ স্বাভাবিক ভাবেই হেসে উত্তর দিলেন,

------- "আরে না না এসব কি বলছ? ডিস্টার্ব ফিল করবো কেনো? তেমন পার্সোনাল কোনো কথা বলছিলাম না তো। এই টুকটাক কথাবার্তা আরকি!"

নীবিড়ের ভাইয়ার আমার মুখপানে একপলক আড়চোখে তাকালেন। তারপর ঠোঁটে সেই চিরচেনা রহস্যময় বাঁকা হাসি ফুটিয়ে তুলে বললেন,

------- "বেশ! তা ল্যাব ছেড়ে বাইরে কি করছ? প্রাকটিক্যাল এভাবে মাঝপথে ছেড়ে এলে হয়? বাকিরা যে খুঁজছে তোমায়।"

নিহান ভাই হঠাৎই কিছু গুরুতর বিষয় মনে পড়েছে এমন ভাব নিয়ে কপালে হাত রাখলেন। ব্যস্ত গলায় বললেন,

------ "ওহ শিট! আমি তো প্রাকটিক্যালের কথা ভুলেই গিয়েছিলাম। একচুয়ালি রিফাতের থেকে নোটবুক আনার পথে অনন্যার সাথে দেখা হলো, ভাবলাম কথা বলি টুকটাক। থ্যাংক্স ম্যান! আর অনন্যা, সো সরি হ্যাঁ? আমি অন্যদিন কথাটা বলবো আজ একটু তাড়া আছে, আসছি।"

একথা বলেই দ্রুত পায়ে উধাও হলেন নিহান ভাই। আমি বিস্ময়ে গোলগাল চোখ করে চেয়ে রইলাম। পাছে রাত্রি নোটবুক হাতে পাশে এসে দাঁড়িয়েই প্রশ্ন ছুড়লো,

------ "সেকি, ভাইয়া নোটবুক না নিয়েই চললেন কোথায়?"

আমায় কিছু বলবার সুযোগ না দিয়ে নীবিড় ভাইয়াই বলে বসলেন,

------ "ও যেখানেই চলুক, তুমি দাঁড়িয়ে আছ কেনো? যাও দৌড় লাগাও, নোটবুকটা দিয়ে আসো।"

------- "ওমা তাইতো, আমি দাঁড়িয়ে আছি কেনো? নিহান ভাই....ও নিহান ভাই....আরে নোটবুকটা তো দিয়ে যান! নিহান ভাই....!"

উঁচু গলায় হাক ছাড়তে ছাড়তে রাত্রি দৌড় লাগাল ফের। আমি আহাম্মক সেজে একেক জনের তামাশাই দেখতে থাকলাম স্রেফ। এতো দ্রুত যে ব্যাপারগুলো ঘটলো তাতে কোনো উত্তরই দিতে সক্ষম হলাম না।

------ "এহেম এহেম, তা নিহান যেনো তোমায় কি বলতে নিয়েছিল?"

নীবিড় ভাইয়ার এমন গোয়েন্দা পুলিশের মতো করা প্রশ্নে খানিকটা অপ্রস্তুত হয়ে পড়লাম আমি। কোনোরকমে জবাবে বললাম,

------ "তা আমি কি করে জানবো, উনি তো না বলেই চলে গেলেন!"

------ "বাহ, জানার এতো কিউরিওসিটি? বেশ তো খুব ভালো!"

নীবিড় ভাইয়ার এমন হুটহাট রিয়াকশন পরিবর্তন হওয়ায় ভ্যাবাচ্যাকা খেতে খেতে জিজ্ঞেস করলাম,

------ "মানে কী? কি বলতে চাইছেন আপনি?"

নীবিড় ভাইয়া শব্দহীন হাসলেন। দু'হাত ব্লেজারের পকেটে ঢুকিয়ে স্ট্রেইট হয়ে দাঁড়ালেন। তারপর বাম সাইডের ভ্রু'টা উঁচু করে বললেন,

------ "মানে এটাই যে দিনদিন পাখনা গজাচ্ছে তোমার। সো ওয়ার্নিং দিচ্ছি, নিজের লিমিট অতিক্রম করো না। এটা একটা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রংঢং করবার জায়গা নয়।"

------ "এই ওয়েট ওয়েট! কি বললেন আপনি? রংঢং! আপনি আমার মাঝে রংঢং-এর কি দেখলেন? আমি কি অন্যান্য মেয়েদের মতো চুল কালার করে মুখে পাঁচ স্তরের ময়দা মেখে আসি? নাকি ড্যাংড্যাং করে কোমড় দুলিয়ে হেঁটে বেড়াই? কোনটা?"

------- "এর বাহিরেও কিছু সীমাবদ্ধতা তোমার জন্য বরাদ্দ আছে মিস আয়ানা!"

------- "তা কী সীমাবদ্ধতা শুনি?"

------- "কোনো বাইরের ছেলের সাথে এক্সট্রা আলাপ করা যাবে না। এইযে প্রায় প্রায়ই তোমার এই নিহান ভাইকে নিয়ে যে এতো গোসিপিং করো সেসব চলবে না। মামনী এসব করার জন্য ভার্সিটিতে এডমিট করায় নি তোমায়, কথাটা যেনো মাথায় থাকে।"

------ "আরে আজব! যএতো এতো মেয়েরা বড় ভাইদের সাথে সামান্য একটু কথা কেনো, চার পাঁচটা বয়ফ্রেন্ড বানিয়ে দিব্যি ঘুরে বেড়াচ্ছে ওদের জন্য তো এতো বাঁধাধরা নিয়ম নেই, তবে আমার জন্য এতোকিছু কেনো?"

প্রবল জেদ নিয়ে প্রশ্নগুলো করে উত্তরের প্রতিক্ষায় রইলাম আমি। নীবিড় ভাই বেশ রিল্যাক্সিং মুডেই জবাব দিলেন,

------- "কজ তোমার আর ওদের মাঝে হিউজ ডিফারেন্স আছে। ইউ অল আর নট সেইম! এতো রুলস যদি তোমার জন্য বরাদ্দ না থাকত তবে তোমার আর ওদের মধ্যে কোনো পার্থক্য থাকতো না।"

------ "দেখুন অনেক হয়েছে, আমি এতো কিছু বুঝিনা! আমি খারাপ কিছু করিনি, আর জ্ঞান থাকা পর্যন্ত করবোও না। শুধু শুধু এতো স্ট্রিক্ট বিহেভ করবেন না। সকালের জন্য আপনার যদিও একটা বিশাল ধন্যবাদ পাওয়া উচিত ছিলো কিন্তু সেইটুকু উপকারের রেশ ধরে এতো ভাও খাবেন না।"

নীবিড় ভাই ফিক হেসে ফেললেন এবার। চোখেমুখে লেগে থাকা সেই ভয়ানক ফলকটা ক্ষণিকের জন্য বিলীন হলো। মানুষটার স্নিগ্ধ হাসিতে চোখদুটো চিকচিক করে উঠলো। ক্ষণিকের সেই হাসি ত্যাগ করে আবারও সিরিয়াস মুডে ফিরলেন উনি। গম্ভীর গলায় বলে উঠলেন,

------ "তোমার এসব ফাউল কথাবার্তা তোমার পকেটেই রাখো। আমি জাস্ট ওয়ার্নিং দিয়ে রাখলাম, নিহানের আশেপাশে যেনো আর না দেখি তোমায়। শুধু নিহানই নয়, অন্য কোনো ছেলের সাথেও প্রয়োজন ছাড়া কথা বলবে না। গট ইট?"

ভেংচি কেটে "আজ্ঞে" বলে সম্মতি জানালাম আমি। নীবিড় ভাই পকেট থেকে ডান হাতটা বের করে সিল্কি চুলগুলোয় ডোবালেন।

------ "গুড, আমার নজর কিন্তু তোমার ওপর সবসময় থাকবে।"

একথা বলেই উল্টোদিকে ফিরলেন উনি। উনার ঠোঁটে লেগে থাকা চমৎকার সেই হাসিটায় কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে রইলাম। পুরোপুরো দৃষ্টির অগোচরে চলে যাবার পূর্বেই আবিষ্কার করলাম মানুষটার গায়ে পার্পেল রঙের ব্লেজারটা একটু বেশিই মানিয়েছে। অনেকটা অতিরিক্ত সুন্দরের মতো। আমার চিন্তা উনাকে নিয়ে হয়না, আমার চিন্তা হয় উনার ভবিষ্যৎ স্ত্রী'কে নিয়ে। বেচারির অর্ধেক জীবন যে ফ্যানগার্ল'দের অত্যাচারেই ধ্বংস হবে তা চোখ মেলে রেখেই ইমাজিন করতে পারছি আমি। এক্সাম্পেল স্বরূপ মুখে বড়সড় একটা ব্ল্যাকহোল বানিয়ে রাখা আশেপাশের মেয়েগুলোই যথেষ্ট!

__________________________________

অতঃপর এলো বাড়ি ফেরার পালা। রিক্সায় চেপে দুই বান্ধবী মিলে নানারকম খোশগল্পে মগ্ন হয়ে রয়েছিলাম। রিক্সা যখন রাত্রির মেসের কাছাকাছি এসে পৌঁছাল তখন খেয়াল হলো আজ বিরাট বড় এক দায়িত্ব দিয়েছিল আমায় রুশো ভাইয়া। ব্যাগে থাকা বক্সটা রাত্রিকে দিতে বলেছিল আগেভাগেই। ধুর, আমার এই ভোলামন নিয়ে আর পারিনা! দিতে বলেছিল কখন আর আমার মনে পড়ছে কখন ভাবা যায়! ভাবনার মাঝেই রাত্রির ডাকে রিক্সাওয়ালা মামা রিক্সা থামালেন। আমি তড়িঘড়ি করে ব্যাগ থেকে রুশো ভাইয়ার দেওয়া বক্সটা বের করে রাত্রির হাতে তুলে দিলাম। রাত্রির প্রশ্নবিদ্ধ চোখকে সাক্ষী রেখে বললাম,

------ "এখন কিছু আস্ক করিস না, ভেতরে কি আছে আমি নিজেও জানিনা। খুলে দেখিস, টাটা বায় বায়। এই মামা, দাঁড়িয়ে আছেন কেনো? চলুন!!

আমার দেওয়া তাড়ায় রিক্সাওয়ালা মামা রিক্সা টানতে লাগলেন। রাত্রি পেছন থেকে বারকয়েক "কে দিয়েছে, কি দিয়েছে" এধরণের প্রশ্নে গলা ফাটালেও বিশেষ লাভ করতে পারল না। আমি বেশ রিল্যাক্সিং মুডেই শিস তুলতে তুলতে দূরত্ব বাড়িয়ে চললাম। কিউরিওসিটি'টা আমারও ছিলো যদিও তবু রাত্রিই দেখুক প্রথম। কে বলতে পারে বেস্টু থেকে যদি হঠাৎ ভাবী টাবি হয়ে যায়!

রাত্রি ফুস করে শ্বাস ফেলে মেসের ভেতরে প্রবেশ করার জন্য পা বাড়াল। এতোক্ষণ যাবৎ অহেতুক দেওয়া চিৎকারগুলোর জন্যও আফসোসে ভারী হয়ে এলো বুক। রাত্রির মতে অনন্যা ভীষণ ট্যারা স্বভাবের একটা মেয়ে, ডানে যেতে বললে যাবে বায়ে আর বায়ে যেতে বললে সোজা গায়ের ওপর দিয়েই গাড়ি চালিয়ে দেবে। উফফফ! আর পারা যায় না মেয়ে'টাকে নিয়ে! কিন্তু এই বক্সটা....! কে দিয়েছে এটা? অনন্যা যে দেয় নি এটা তো শিওর। তবে কে দিয়েছে?

রাত্রি কিউরিওসিটি দমিয়ে রাখতে পারলো না। ঘরে গিয়ে আরাম করে বক্সটা খোলার ধৈর্য্য হারিয়ে রাস্তায় দাঁড়িয়েই বক্সটা খুলল। র‍্যাপিং পেপারটা ডাস্টবিনে ফেলে বিস্ময় নিয়ে ভেতরে হাত ডোবাল। খানিকটা তুলতুলে রকমের জিনিস, রাত্রি বুঝল ছোটখাটো দুটো কাপল টাইপ টেডিবিয়ার আছে হয়তো ওতে। তার গায়ে লাগানো ছোট্ট একটা কাগজ। সম্ভবত চিরকুট! রাত্রি টেডিবিয়ার দুটো উল্টেপাল্টে দেখে চিরকুটটা হাতে নিলো। তাতে আঁকাবাঁকা টাইপ হ্যান্ডরাইটিং দেখেই ভ্রু যুগল কুঁচকে এলো তার। বিস্ময় যদিও সীমার মাঝে ছিলো, কিন্তু তা তখনই আকাশ ছুঁলো যখন অস্ফুটস্বরে লেখাগুলো পড়তে শুরু করলো সে,

------ "আমি জানি আমার বাংলা হ্যান্ডরাইটিং অনেক বিশ্রী, তবে ইংলিশ,স্প্যানিশ আর চাইনিজ লেখাগুলো কিন্তু জোশ হয়। তবে কথা কিন্তু সেটা না, মেইন কথাটা হলো আমি অতিমাত্রায় লাজুক টাইপের একটা ছেলে। এতো লজ্জা যে কোন বয়ামে তুলে রাখবো ঠিক খুঁজে কূল-কিনারা পাইনা। তাই তোমার সাথে একটা বোঝাপড়ায় আসতে চাইছি। তোমার আর আমার দু'জনের মাঝে কিন্তু একটা স্পেশাল সিমিলারিটি আছে, বুঝলে? আমরা দু'জনেই অদ্ভুত ভাবে ফাটাফাটি টাইপ কপাল নিয়ে জন্মেছি। যদিও তুমি এটমবোম্ব, নিজে ফাটার পাশাপাশি অন্যকেও ফাটাও তবু আমারও যে পার্টসগুলো ফেটেফুটে একাকার হয়ে যাচ্ছে এর মূলেও কিন্তু তুমিই রয়েছে। এই ফাটাফুটা সংক্রান্ত ব্যাপারগুলো নিয়ে আসল ভান্ডাটাও দুর্ভাগ্যক্রমে ফেটে গেছে আমার। তাই বলছি এখন থেকে ওসব ইন্সিডেন্ট পার্মানেন্টলি ভুলে যাও। তুমি আমার আন্ডা ফাটিয়েছ, আমি তার বদলে তোমায় পান্ডা পাঠিয়েছি। পান্ডাদুটো নেওয়ার বিনিময়ে আমার আন্ডার কথাটা ভুলে যাও। মাথাতেও আনবেনা ওসব ঠিক আছে? ভুলে যাও কোনোকালে কিছু ফাটিয়েছিলে। তাতেও না হলে ভুলে যাও আমার ফেটে যাওয়ার মতো আদৌ কোনো আন্ডা ছিলো!

ইতি,

তোমার "লাজুক ধলা ইন্দুর"

#চলবে______________

[আগেই বলে রাখি, এখনই ফায়ার হবেন না। ধৈর্য্য রেখে গল্প পড়বেন, অগ্নি-নিত্যকে আজও দেখাতে পারলাম না। চিন্তা করবেন না ওরা নিজেদের মতো বেশ আছে। ধন্যবাদ! ]

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৪৪তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন