#প্রেম_আমার♥(সিজন-টু)
#পর্ব-৬১♥
#আয়ানা_জাহান_নুসরাত♥
সকাল প্রায় ১১ টার কাছাকাছি সময়ে আমারা পৌঁছলাম ভার্সিটির চত্ত্বরে। অনেকটা ভূত দেখার মতোই আশেপাশে ছেলে-মেয়েগুলো চমকে উঠল। যেনো বহুদিন পর হঠাৎ চেনা-পরিচিত ভূতেদের নতুন রূপে আবিষ্কার করছে তারা। আমি সিটে থেকেই বাহিরের পরিবেশটা পর্যবেক্ষণ করতে গেলে পড়লাম। কোটটা টেনেটুনে নিজেকে ভালোমতো মুড়িয়ে গলায় মাফলার পেঁচিয়ে নিলাম। নীবিড় ভাইয়া চোখ থেকে সানগ্লাসটা খুলে নামিয়ে রাখলেন। গেইট খুলে সর্বপ্রথম নিজে বের হলেন তারপর আমার পাশের গেইটটা খুলে ঝুঁকে দাঁড়ালেন। চারিপাশের গমগমে পরিবেশটায় চোখ বুলিয়ে বললেন,
------ "এসো!"
আমি পলক ফেলে তাকালাম। কেনো যেনো গাড়ি থেকে নামতে ইচ্ছে করছেনা। কে জানে আজ ক্লাসমেইটরা কেমন ব্যবহার করবে। নিশ্চয় অন্যরকম চোখে দেখবে। ভার্সিটির সকলের ক্রাশ বলে কথা, উনার বউ হিসেবে আমায় মেনে নেওয়া কি ততটা সহজ হবে? আমি তো নিজের চোখে দেখেছি, জরিনা খালার সাথে ঠিক করে রাখা সম্পর্কটা বিচ্ছিন্ন হওয়ার পর ভার্সিটিতে একপ্রকার উৎসব শুরু হয়ে গিয়েছিল। একেক জনের সে এক এক রকম খুশির আমেজ! এইযে এতো এতো ফ্যানগার্ল, তারা কি খুব সহজেই ব্যাপারটা হজম করতে পারবে?
------ "অনন্যা! কি ভাবছ? এসো!"
নীবিড় ভাইয়ার ডাকে ভ্রম কাটলো আমার। চটপট সিট ছেড়ে গাড়ি থেকে বেরিয়ে জোরপূর্বক হাসলাম আমি। নীবিড় ভাইয়া সুক্ষ্ম চোখে তাকালেন। আগাগোড়া পর্যবেক্ষণ করে বললেন,
------ "তুমি কি কোনো কারণে নার্ভাস অনন্যা?"
------ "আব না না, নার্ভাস হবো কেনো। এমনিতেই অনেকদিন পর ভার্সিটিতে আসছি তো তাই একটু অন্যরকম লাগছে।"
আমার জবাবে বোধহয় পুরোপুরি সন্তুষ্ট হলেন না উনি। ছোট্ট করে শ্বাস ফেলে বললেন,
------ "বেশ, চলো ক্লাসে পৌঁছে দিয়ে আসি তোমায়। আর একটা কথা, যদি কেউ তোমায় আমার নাম করে বাজে কিছু বলে দেন ভুলেও চুপ করে থাকবে না। সোজা এসে আমায় বলবে, ঠিক আছে? যদিও মনে হয়না কারো বলার সাহস হবে বাট তবুও যদি, বাই এনি চান্স কেউ কিছু সামনাসামনি হোক বা পেছনে বলে তবে কোনো বনিতা না করে আমায় জানাবে। ইজ ইট ক্লিয়ার?"
আমি মাথাটা কাঁত করে হ্যাঁ সূচক জবাব দিলাম। তারপর উনার সাথে তাল মিলিয়ে দু-তিন ধাপ এগোতেই কোথা থেকে যেনো দৌড়ে হাজির হলো রাত্রি। এসেই গদগদ কণ্ঠে বলে উঠলো,
------- "আরে অনু তুই এসেছিস! এই এতক্ষণে আসার সময় হলো তোর? ভাইয়া ও আজকেও দেরি করে ঘুম থেকে উঠেছে তাইনা?"
নীবিড় ভাইয়া হেসে জবাব দিলেন,
------- "ও তোমার ফ্রেন্ড, শীতে কখন ঘুম থেকে ওঠে জানো নিশ্চয়!"
------ "তা নয়তো কি! জানো ভাইয়া, ওকে কম্বলের ভেতর থেকে টেনেটুনে ক্লাসে নিয়ে যেতে হতো আমার। এতো অলস হয়ে যাচ্ছে দিন দিন!"
নীবিড় ভাইয়ার সামনে আমার খুল্লাম খুল্লাম বদনাম করার অপরাধে ক্ষিপ্ত হলাম আমি। সরু চোখে রাত্রির পানে চেয়ে বললাম,
------ "তুই আজকাল একটু বেশিই কথা বলছিস রাত্রি, ক্লাসে চল দেখাচ্ছি মজা!"
রাত্রি শুকনো ঢোক গিলে চেপে গেলো এবারের মতো। আমার ডান হাতটা চেপে ধরে ব্যস্ত গলায় বলে উঠল,
------ "আচ্ছা ভাইয়া, আমাদের ক্লাসের সময় হয়ে গেছে। আমরা আসছি কেমন? এই অনু চল দেরি হয়ে যাচ্ছে তো!"
কথাটা বলেই টেনে ক্লাসের উদ্দেশ্যে নিয়ে যেতে ধরলো আমায় রাত্রি। নীবিড় ভাইয়া এগিয়ে দিবেন ভেবে রেখেছিলেন যার দরুন তৎক্ষণাৎ হাতটা বাড়িয়ে "আরে..." বলে উঠতেই সান্ত্বনা স্বরূপ উল্টোদিকে ফিরে বললাম আমি,
------ "আপনাকে আসতে হবে না, আমি রাত্রির সাথে আছি। চিন্তা করবেন না!"
নীবিড় ভাইয়া হয়তো আশ্বস্ত হলেন। পকেটে দু'হাত গুঁজে ততক্ষণ চেয়ে রইলেন যতক্ষণ পর্যন্ত না দৃষ্টির আড়াল হই আমি। আমি না দেখলে হয়তো বুঝতাম না, মোড় ঘোরার সময় যখন উল্টোদিকে ফিরে তাকালাম তখনও উনার ক্ষুদ্র গড়ন নজরে পড়লো। তৃষ্ণায় মাখা চোখগুলো তখনও আমাতেই আটকে। আমি সেদিক পানে অবাক চোখে তাকালাম, মুহুর্তেই রাত্রির হাতটান পড়ায় মিলিয়ে যেতে হলো দেয়ালের আচ্ছাদনে।
_____________________________________
দীর্ঘ দুই ঘন্টা যাবৎ মোট ৩ টে ক্লাস শেষ হলো। পুরোটা সময় হোয়াইট বোর্ডের মাঝেই নিজের দৃষ্টি স্থির রেখেছিলাম আমি। আজ জীবনে প্রথম বোধহয় পেছনে সিট খালি থাকার পরও একেবারে সামনের সিটে বসেছি। বলা যায় এই ভার্সিটি লাইফে এ এক দূর্লভ দৃশ্য! আমি মোটেও সেরকম পড়ুয়া স্টুডেন্ট নই, অবশ্য সেরকম ফাঁকিবাজ যে তেমনটাও নই। পড়ার ফাঁকে ফাঁকে একটু আধটু এদিক-ওদিক মন না দিলে যেনো আমার চলে না। রাত্রিও ঠিক আমার ধাঁচেরই। সে যতই মন দিয়ে পড়াশুনা করার ভান ধরে থাকুক তার মন যে ভেতরে ভেতরে ধিতাং ধিতাং করে তা বেশ জানা আমার। যেহেতু আমরা দু'জনেই এক গোয়ালের গাভী, সেহেতু রোজ পেছনে বসে একে-অপরের সাথে খুশুরফুশুর চালিয়েই পাড় করতাম ক্লাসের অর্ধেকটা সময়। তবে আজ এই দীর্ঘ দু ঘন্টায় রাত্রির সাথে এক ফোঁটা কথাও বলিনি আমি। বসেছি একদম শুরুর সারিতে যাতে অন্য কোনোদিকে মনোযোগ না দৌড় মারে আমার।
তৃতীয় ক্লাসের পর চতুর্থ ক্লাসের বেলায় শোনা গেলো সালাম স্যার আসেন নি আজ। কোনো এক বিশেষ কারণে ঢাকায় গিয়েছেন তিনি। সেহেতু উনার ক্লাসটা আজ হৈ-হুল্লোড় করেই পাড় হবে বোঝা গেল। রাত্রি ক্যালকুলাসের মোটা বইটা বন্ধ করে রাখল। আমার ভাবুক ভঙ্গিমায় এলোমেলো মুখটার পানে সুক্ষ্ম চোখে তাকিয়ে বলল,
------ "তোর ব্যাপার'টা কি রে অনন্যা? কি এতো ভাবছিস তুই? সেই তখন থেকে স্ট্যাচুর মতো বসে আছিস!
ভাবনায় ডুবে থেকেই উত্তর দিলাম আমি,
------ "রাত্রি তুই কি আশেপাশের খোঁজ খবর রাখছিস?"
------ "আশেপাশের খোঁজ খবর মানে? কিসের খবর রাখার কথা বলছিস তুই?"
আমি এবার পলক ফেলে তাকালাম। খানিকটা চাপা স্বরে বলে উঠলাম,
------ "আওয়াজগুলো ঠিক ডান দিক থেকে আসছে, তবে পেছনের সারি থেকে। বামসাইডের নয়েজগুলো স্কিপ করে একটু শোনার চেষ্টা কর।"
বিনিময়ে রাত্রির কপালে দৃঢ় ভাঁজ পড়লো। শতশত কথাবার্তার মাঝে আলাদাভাবে কোনো গভীর আলোচনা শুনবার জন্য কানের ওপর বেশ জোর খাটাতে হলো। অতঃপর রাত্রিও শুনতে সক্ষম হলো কিছু অস্পষ্ট কণ্ঠস্বর। মূলত আমায় আর নীবিড় ভাইয়াকে নিয়েই বসানো হয়েছে সমালোচনা সভা। তার থেকেই কিছু বক্তব্য ভেসে আসছে,
"আরে সব ঢং, বুঝিস না? সাদমান শাহরিয়ার নীবিড়ের বউ হয়েছে, ভাব হবে না? তাইতো প্রথমদিন থেকেই দেখ সামনের সিটে বসতে শুরু করেছে।"
"আরে রাখ তো সেসব আমার মাথায় তো এখনও ঢুকলো না, ওই মেয়ের মাঝে এমন আছে কী? শুধু পারে তো বোকার মতো হাসতে। সেরকম আহামরি সুন্দরও না! আমাদের ভার্সিটিতে এতো সুন্দর সুন্দর মেয়ে আছে, মিডিয়ায় এতো ফেমাস ফেমাস হিরোইন আছে, মডেলস আছে সেসব ছেড়ে কি-না ওর মতো একটা মেয়েকে বিয়ে করলো! নিশ্চয়ই কোনো না কোনো ঘাপলা আছে।"
"ঘাপলা বলতে কী বোঝাতে চাইছিস? নীবিড় তো সেদিন মিডিয়ার সামনেই বলল ওরা গোপনে বিয়ে করেছে। শুনেছি ওর ভাই আর নীবিড় নাকি বেস্ট বাডি। আম শিওর কোনো না কোনো ভাবে বডি শো করেই নিজের জালে ফেলেছে......."
ব্যাস এরপর আরো অনেক কথাই চলতে থাকলো। তার কিছু কানে এলো বা কিছু এলো না। সেসব কানে পৌঁছন মাত্রই হাতের মুঠো শক্ত হয়ে এলো রাত্রির। আমার বাম হাতটা চেপে ধরে জোরালো গলায় বলল,
------ "এরপরও কি আমাদের চুপ করে থাকা উচিত? অনু চল, এক্ষুনি নীবিড় ভাইয়াকে গিয়ে বলব আমি!"
রাত্রি বেঞ্চ থেকে উঠতে নিয়েছিল সবে। তবে আমি চট করেই হাত ধরে আটকে দিলাম তাকে। শান্ত থাকতে ইশারা করে বললাম,
------ "রাত্রি থাম, এতো অস্থির হোস না! ওদের যা বলার আমিই বলব। এসবে উনাকে ডাকতে হবে না!"
------ "কিন্তু তুই..."
রাত্রিকে আর কিছু বলতে না দিয়ে পলক ঝাপটে অভয় দিলাম আমি। হেসে বললাম,
------ "আমায় বিশ্বাস করিস না রাত্রি?"
বিনিময়ে মাথাটা হাল্কা করে ঝাঁকাল রাত্রি। আমি হেসে ওকে বেঞ্চে বসিয়ে রেখেই পেছনে সেই আলোচনা সভার দিকে পা বাড়ালাম। গোল হয়ে চারজন মেয়ে বসিয়েছে সেই আলোচনা সভা। আমি যেতেই প্রত্যেকের মুখে তালা পড়লো। তাদের মাঝে একজন বিস্ময় ভরা চোখে চেয়ে জিজ্ঞেস করলো,
------- "অ..অনন্যা তুমি!"
বিনিময়ে চওড়া হাসিতে ঠোঁট রাঙালাম আমি। পাশে রাখা চেয়ারটা টেনে তাদের কাছাকাছি বসে বলে উঠলাম,
------- "হ্যাঁ আমি, তা এতো চমকাচ্ছ কেনো তোমরা? তোমাদের সাথে বুঝি বসতে পারিনা?"
------- "না না পারবে না কেনো। অবশ্যই পারবে!"
------- "বেশ! তা তোমাদের নামগুলো? কাকে কি বলে ডাকবো?"
আমার এমন বন্ধুসুলভ আচরণে বুকের ভেতরে জমা সন্দেহটা বোধহয় উধাও হলো তাদের। হাসিমুখে একে একে নিজেদের নাম বলে চলল,
------ "আমি শ্রুতি।"
------ "আমি ঊর্মি।"
------ "আমি রিয়া আর ও রিনা!"
সবার নাম জেনে নেওয়ার পর ছোট্ট করে শ্বাস ফেললাম আমি। ভ্রু চুলকে প্রশ্ন ছুড়লাম,
------- "তা একেক জনের নাম তো মা-শা-আল্লাহ, মুখের ভাষা কেনো নাউজুবিল্লাহ?"
প্রায় সাথেসাথেই চার জোড়া চোখ গোলাকার ধারণ করলো। উত্তেজনা দমিয়ে রাখতে না পেরে বলে উঠল রিনা,
------- "এক্সিকিউজ মি! কি বললে তুমি?"
বিনিময়ে বেশ রিল্যাক্স গলাতেই বললাম আমি,
------- "বললাম যে, লোকে বলে লম্বা মানুষের বুদ্ধি হাটুতে থাকে কিন্তু তোমরা তো ততটা লম্বা নও। তোমাদের বুদ্ধির ছিড়ি এমন কেনো? নাকি সব সুবুদ্ধি মেকআপের পেছনে ঢেকে রেখেছ?"
এবার চেতে উঠল মিস শ্রুতি সুন্দরী। সিট ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে ভারী বিস্মিত গলায় বলল,
------- "হেই ইউ, তুমি কি আমাদের ইনসাল্ট করছ?"
------- "অপমান? এমা না না। তোমাদের অপমান করার ক্ষমতা আমার আছে নাকি? ওইযে কথায় আছে না যাদের আত্মসম্মান নেই তাদের আবার কিসের অপমান?"
এবারের কথাটার পর সিট ছেড়ে উঠে পড়ল বাকি দু'জনও। একেকজনের মুখের অবস্থা অগ্নিশর্মা! মেয়েরা যে বেশ ভালো মতোই ক্ষেপেছে বুঝলাম। তাদের মাঝে মিস রিনাকেই অতিমাত্রায় রাগান্বিত বলে মনে হলো আমার। মেয়ে একেবারে আঙুল তুলে উঁচু গলায় বলে উঠল,
------- "লিসেন, তুমি কিন্তু আমাদের ঠান্ডা মাথায় অপমান করছ। আমাদের আত্মসম্মান নেই একথা বলার সাহস পেলে কোথায় তুমি?"
রিনার কথায় বড্ড অবাক হলাম আমি। গালে হাত থেকে অবিশ্বাস্য গলায় বললাম,
------- "সেকি! তোমাদের আত্মসম্মানও আছে নাকি? জানতাম না তো। যে মেয়েরা জোট হয়ে অন্য কোনো মেয়েদের বডি শেমিং করে তাদের আবার আত্মসম্মানও থাকে? ওয়াও! ইন্টারেস্টিং তো!"
আমার কথায় যেনো একে একে সকলের চোখে মুখেই খানিকটা ভয়ের ছায়া দেখা গেল। ঊর্মি ইশারায় রিনাকে চুপ থাকতে বলে খানিকটা ইতস্তত বোধ নিয়ে বলল,
------- "ওহ, তাহলে তুমি সব শুনতে পেয়েছ?"
------- "শোনা বা না শোনাটা কি আদৌ ম্যাটার করে? আমি শুনলেও তোমরা বলতে, না শুনলেও তোমরা বলতে এবং নিজেদের চিপ মেন্টালিটির প্রমাণ দিতে!"
------- "হেই ইউ, জাস্ট মাইন্ড ইওর ল্যাঙ্গুয়েজ! আমাদের মেন্টালিটি ঠিকই আছে। সত্যিই তো বলেছি আমরা। তোমার মধ্যে এমন কী আছে যার জন্য নীবিড় তোমায় এতো সহজে বিয়ে করে নিলো? প্রথম প্রথম তো ফিরেও তাকাত না তোমার দিকে!"
ঊর্মির মানা কথা না শুনে নিজের ভেতরের কথাগুলো স্বীকার করায় বেশ সন্তুষ্ট হলাম আমি। সামান্য গলাটা কেশে নিয়ে নিজের মাফলারটা খুলে রিনার উন্মুক্ত ঘাড়ে জড়িয়ে দিলাম। স্বাভাবিক গলায় বললাম,
------- "শরীর দেখাকে যদি কোনো সৎ ছেলেকে পটিয়ে ফেলা যেতো তবে সর্বপ্রথম এই তোমাদের মতো অর্ধনগ্ন হয়ে ঘুরে বেরানো মেয়েদের প্রেমই পড়তেন উনি। বুঝলে রিনা....ওহ মাই গড আমি তো খেয়ালই করিনি! তুমি তো দেখছি জারার মাস্টার কপি। রিনা ইজ ইকুয়াল টু জরিনা খালা-২! ওয়াও গ্রেইট কানেকশন। এই সত্যি করে বলো তো জারা কি তোমার বোন টোন লাগে নাকি? তোমাদের মাঝে তো চরম মিল!"
রিনা ছিঁটকে সরে দাঁড়ালো আমার থেকে। ঘাড় থেকে মাফলারটা খুলে উঁচু গলায় বলল,
------- "ইউ ইডিয়ট! সাহস কি করে হয় তোমার আমাকে এভাবে বলার?"
আমি চট করেই ক্যাচ ধরে মাফলারটা নিলাম। মাফলারটা হাতে পেঁচাতে পেঁচাতে ঠান্ডা গলায় বললাম,
------- "সাহসের প্রশ্ন যখন আসছেই তবে জেনে রাখো, সত্য বলতে অনন্যা ভয় পায় না। এতদিন সকলে শুধু আমার ঠান্ডা রূপটাই দেখেছিলে, আমায় দেখে নিতান্তই বোকাসোকা ভেবে এসেছিল। হ্যাঁ আমি ঠান্ডা প্রকৃতির, মাথা গরম করি না কারো সাথে দুর্ব্যবহার তো দূর সামান্য উঁচু গলায় কথা বলি কিন্তু তাই বলে এটা ভেবো না আমি রোবট। আমিও তোমাদের মতোই রক্তে-মাংসে গড়া একজন মানুষ, আমারও তোমাদের মতো ইমোশন আছে। আমি শুধু তোমাদের একটা ছোট্ট শিক্ষা দিয়ে রাখলাম। কারো সম্পর্কে ভালো কিছু বলতে না পারো অন্তত খারাপ কিছু বলো না। সত্যি বলতে, তোমাদের মতো মেয়েদের সাথে কথা বলতেও রুচিতে বাঁধে আমার। এখনও সময় আছে, ভালো হয়ে যাও। আসছি!"
কথাগুলো বলে নিয়ে আর এক মুহুর্ত দাঁড়ালাম না আমি। ক্লাস ছেড়ে বড়বড় পায়ে বের হয়ে গেলাম মাঠে। পেছন থেকে রাত্রির আমার নাম করে দেওয়া ডাক কানে ভেসে এলেও সাড়া দিলাম না। ক্যান্টিনে একটি টেবিলে কাঙ্ক্ষিত মুখটি নজরে পড়তেই সেদিক পানে পা বাড়ালাম। মানুষটার সামনে সটান হয়ে দাঁড়িয়েই বলে উঠলাম,
------- "শুনুন, আপনি কি আমায় পছন্দ করেন?"
আমার এমন হঠাৎ আগমনের পাশাপাশি ছোড়া অযৌক্তিক এক প্রশ্নে হকচকিয়ে গেলেন নীবিড় ভাইয়া। হাতের ইশারায় রাহিত এবং শুভ ভাইয়াকে যেতে বলে উঠে দাঁড়ালেন। অবাক কণ্ঠে পাল্টা জিজ্ঞেস করলেন,
------- "এসব কি ধরণের প্রশ্ন অনন্যা? তোমায় অপছন্দ করতে যাবো কেনো? আফটার অল তুমি আমার ওয়াইফ!"
------- "ওহ, শুধুমাত্র আপনার সাথে একটা এক্সিডেন্টের জন্য বিয়ে হয়েছে বলে আপনি আমায় পছন্দ করেন? একজন মানুষ হিসেবে নয়?"
নীবিড় ভাইয়া পূর্বের তুলনায় অবাক হলেন আরো। গালে হাত রেখে গম্ভীর গলায় জিজ্ঞেস করলেন,
------- "অনন্যা কেউ কি তোমায় কিছু বলেছে? তুমি হঠাৎ এরকম বিহেভ করছ কেনো?"
------- "নাহ, কেউ কিছু বলেনি আমায়। আপনি যা করছিলেন তাই করুন। ক্লাস আছে, আসছি!"
কথাটা বলেই উল্টোদিকে ছুট লাগালাম আমি। নীবিড় ভাইয়া বার কয়েক পিছু ডাকলেন। তবে লাভ করতে পারলেন না কোনো। উনার ডাকে সাড়া না দিয়ে যখন ক্লাসে ঢুকতে পা বাড়ালাম ঠিক তক্ষুনি পাশ থেকে অন্য এক পরিচিত গলা ডেকে উঠল,
------- "আয়ানা?"
আমি থমকালাম। চোখমুখ ভাবমূর্তি পরিবর্তন করে হাসিমুখে নিহান ভাইয়া দিকে তাকিয়ে জবাব দিলাম,
------- "আরে নিহান ভাই, কেমন আছেন আপনি?"
------- "আমি বেশ আছি, তুমি ভালো আছ তো?"
------- "জ্বি ভাইয়া, আলহামদুলিল্লাহ আছি।"
নিহান ভাইয়ার মুখটা খানিকটা চিন্তিত দেখাল। এদিক-ওদিক আড়চোখে তাকিয়ে বলে উঠলেন,
------- "বলছিলাম যে ক্লাস শেষে তোমার কি একটু সময় হবে? তোমার সাথে কিছু জরুরী কথা ছিলো!"
খানিকটা ভেবে জবাব দিলাম,
------- "হ্যাঁ হ্যাঁ অবশ্যই সময় হবে ভাইয়া।"
------- "গ্রেট! তবে ক্লাস শেষে ক্যান্টিনে তোমার সাথে দেখা হচ্ছে। কেমন?"
মাথা ঝাঁকিয়ে সম্মতি জানালাম আমি। এর আগেও নিহান ভাই কিছু একটা বলতে চেয়েছিলেন, সেদিন কোথা থেকে যেনো নীবিড় ভাইয়া এসে উনাকে প্রাকটিক্যাল ক্লাসে পাঠিয়ে দিলেন তারপর আর নিহান ভাইয়ার সাথে কথা বলাই হলো না। আজ আবারও যখন বলতে চাইছেন তবে নিশ্চয় গুরুত্বপূর্ণ কিছুই বলার আছে ভাইয়ার! কিন্তু কি? কী এমন জরুরী কথা থাকতে পারব আমার সাথে নিহান ভাইয়ার?
#চলবে_________