#প্রেম_আমার♥(সিজন-টু)
#পর্ব-৬২♥
#আয়ানা_জাহান_নুসরাত♥
আজ কুয়াশার পরিমাণটা তুলনামূলক কম। বড্ড খাটুনি খেটেই উঁকি দিতে সক্ষম হয়েছেন সূয্যিমামা। নিজের উষ্ণতা বিলিতে দিতে শুরু করেছেন তোড়জোড়। ঠান্ডা পরিবেশটা তার এই কঠোর প্রচেষ্টার ফলেই সহনীয় ঠেকছে। মাঠে গোল হয়ে বসে শিক্ষার্থীরা নেমেছে রোদ পোহাবার প্রতিযোগিতায়।
ক্লাস শেষে আমি-রাত্রি তখনকার কথানুযায়ী ক্যান্টিনে গিয়ে দাঁড় হলাম। সেখানে আমাদের পূর্বেই নিহান ভাইকে অপেক্ষা করতে দেখায় বেশ অবাক হলাম। উনার চোখেমুখে উত্তেজনা। যেনো কোনো না কোনো বিষয় নিয়ে ছটফট করছেন উনি। আমায় দেখতেই মুখে প্রাপ্তির হাসি ফুটিয়ে তুললেন, পরমূহুর্তে আমার পাশে দাঁত কেলিয়ে থাকা রাত্রিকে দেখে নিতেই হাসিটায় খানিকটা মলিনতার ভাব ছেয়ে গেলো মনে হলো। নিহান ভাই তবু হেসেই এগিয়ে এলেন। চেয়ার টেনে আমাদের বসতে ইশারা করে বললেন,
------ "থ্যাংক গড তোমরা এসেছ, বসো বসো। কি খাবে বলো। চিপস, চকলেটস, পেস্ট্রি অর সামথিং?"
রাত্রি নিশ্চয় লম্বা কোনো ফর্দ খুলে বসত। তবে তাকে কিছু বলার সুযোগ না দিতেই তৎক্ষণাৎ বলে বসলাম আমি,
------ "না না ভাইয়া, আমরা কিছু খাবো না। আপনি কিছু খেলে নিন।"
------ "সেকি! কিছু না খেলে ব্যাপারটা কেমন দেখায়?"
------ "একচুয়ালি ভাইয়া আমরা অফ পিরিয়ডে খেয়েছিলাম। এখন আর কিছু খেতে ইচ্ছে করছেনা।"
নিহান ভাইয়ার মুখটা নিমিষেই কালো করে বললেন,
------ "খাবেইনা? বেশ, কিন্তু আমার যে খিদে পেয়েছে! তোমরা না খেলে আমি একা একা কি করে খাই বলো তো? নিজের কাছেই কেমন অস্বস্তিকর বোধ হবে। থাক তবে, বাসায় গিয়েই খেয়ে নেব একেবারে।"
আমাদের জন্য অহেতুক নিহান ভাই খিদে নিয়ে বসে থাকবেন ব্যাপারটা মানা যায় না। আর আমি এই কয়দিনে নিহান ভাইকে যেটুকু চিনেছি তাতে এভাবে আমাদের সামনে একা একা খাওয়ার পাত্র উনি নন, সে যতই আমরা নিজে থেকে খাবো না খাবো না করি না কেনো। আমি বেশ ভেবে নিয়েই খাবার জন্য হ্যাঁ সূচক মত প্রকাশ করতে যাচ্ছিলাম তবে এবারও স্বভাবগত দোষে হাত উঠিয়ে বসলো রাত্রি। গদগদ কণ্ঠে বলে উঠল,
------ "আরে ভাইয়া আমি থাকতে আপনি খেতে পারবেন না তা কি কখনো হতে পারে? আপনি চট করে দুটো বার্গার নিয়ে আসুন তো৷ অনু থাকুক বা না থাকুক আমি আপনার সাথে আছি। প্যারা নাই চিল!"
আমি সরু চোখে রাত্রির মুখপানে তাকালাম। অতিরিক্ত বাড়িয়ে বলার অপরাধে গোপনে কোমড়ে বসালাম জোরালো একখানা চিমটি। মেয়ে লোক সম্মুখে চেঁচিয়ে মানসম্মান প্যাকেট করার ভয়ে ব্যাথাটা দাঁতে দাঁত চেপে হজম করে নেওয়ার চেষ্টা চালালো। তবে ভাববার বিষয় ভিন্ন। রাত্রির বিহেভে আজকাল পরিবর্তন আসতে শুরু করেছে লক্ষ্য করছি! "প্যারা নাই চিল" এ ধরনের কথাবার্তা তার মুখে কখনও শুনেছি বলে মনে পড়ছে না। এসব কথাবার্তা সচারাচর রুশো ভাইয়ার মুখেই শুনতে পাওয়া যায়। ও মা গড, তবে কি রুশো ভাইয়ার সাথে থেকে থেকে ভাইয়ার ডায়ালগগুলো নিজের মধ্যে ধারণ করতে শুরু করেছে ও? কী আশ্চর্য!
নিহান ভাই রাত্রির কথায় প্রাপ্তির হাসি হেসে জিজ্ঞাসুক চোখে আমার পানে তাকালেন। অনেকটা অনুনয়ের সুরেই বললেন,
------ "অনন্যা, দেখো রাত্রিও খাবে বলছে। এখন তুমি না খেলে ব্যাপারটা খারাপ দেখায়?"
------ "ঠিক আছে ভাইয়া, আপনি আমার জন্যও নিয়ে আসুন।"
মুহুর্তেই নিহান ভাইয়ের চোখদুটো চিকচিক করে উঠল। খুশিতে উত্তেজনা ভরা গলায় বললেন,
------ "যাক, অবশেষে রাজি হলে! তা কি খাবে? সমুচা, সিংগারা, স্যান্ডউইচ আর কি?
------ " এতো ব্যস্ত হবেন না ভাইয়া, আমার জন্যও মিনি সাইজের একটা বার্গার আনুন তাতেই হবে।"
নিহান ভাই পলক ঝাপটে ক্যান্টিনের ভেতরে দৌড় লাগালেন। ফিরলেন তিনটে বার্গার সাথে তিনটে চারশো মি.লি এর কোক নিয়ে। আমার যা মনে হলো তাতে রাত্রি আজকাল বেশ পেটুক স্বভাবের হয়ে যাচ্ছে। কারণ খানা স্পষ্ট, নিহান ভাইয়া বার্গার টেবিলে রেখে চেয়ারে বসতে না বসতেই সস মাখিয়ে কামড় বসাতে শুরু করেছে যে সে। আমি সামান্য কেশে নিয়ে নিজের জন্য বরাদ্দকৃত বার্গারটায় কামড় বসালাম। নিহান ভাইয়ার পানে পূর্ণ দৃষ্টি নিক্ষেপ করে জিজ্ঞেস করলাম,
------ "তা ভাইয়া, কি যেনো বলতে ডেকেছিলেন বলুন।"
নিহান ভাইয়ার মুখটা বেশ অস্থির দেখাল। চাপা কোনো দুশ্চিন্তায় এই শীতেও কপাল ঘামছে উনার। আমি কপালে সুক্ষ্ম চিন্তার ভাঁজ ফেলে আবারও বলে উঠলাম,
------ "নিহান ভাই, কোনো সমস্যা? আপনাকে এমন অস্থির দেখাচ্ছে কেনো। কি বলতে ডেকেছিলেন বলুন!"
নিহান ভাই থতমত খেয়ে কোনোরকমে বললেন,
------ "হ্যাঁ হ্যাঁ বলছি, তোমরা খেতে থাকো। বলছি!"
এবার খানিকটা খটকা লাগতে শুরু করলো আমার। কি এমন বলবে নিহান ভাই, যার জন্য এতো দোনা-মোনা! ভাবনার মাঝেই রাত্রি পুরো বার্গারটা পেটে চালান করে পানি খেল। কানের কাছে মুখ নিয়ে এসে ফিসফিসিয়ে বলল,
------ "দোস্ত, আমার না একটু ওয়াশরুম যাইতে লাগত!"
ফিসফিসিয়ে জবাব দিলাম আমি,
------ "খুব কি ইমারজেন্সি?"
রাত্রি মুখটা করুন করে মাথা ঝাঁকাল। নিহান ভাই আমাদের দুই বান্ধবীকে ফিসফিসিয়ে কথা বলতে দেখে জিজ্ঞেস করলেন,
------ "রাত্রি-অনন্যা, কোনো সমস্যা?"
------ "না না ভাইয়া আসলে ওর একটু ওয়াশরুমে যেতে হবে। আপনি একটু বসুন আমরা দু মিনিটের মধ্যে আসছি।"
আমায় উঠতে দেখে চট করেই বাঁধা দিলো রাত্রি। ব্যস্ত গলায় বলল,
------ "এই থাক থাক, তোর যেতে হবে না আমি একাই যেতে পারব।"
------ "কিন্তু...."
------ "অনন্যা, ছেড়ে দাও না। ও যখন বলছে একা যেতে পারবে তবে যেতে দাও।"
রাত্রির সাথে তাল মিলিয়ে নিহান ভাইয়ারও বাঁধা দেওয়ায় মিইয়ে এলাম আমি। ছোট্ট করে শ্বাস ফেলে বললাম,
------ "আচ্ছা, সাবধানে যা।"
___________________________________________
নীবিড় নিজের ব্যাচমেটদের সাথে প্রজেক্ট নিয়ে গভীর আলোচনায় মগ্ন। বলা যায় আলোচানার মূখ্য কেন্দ্র সেই। বাকিরা মন দিয়ে স্রেফ তার হ্যাঁ তে হ্যাঁ আর না তে না মিলিয়ে চলছে।
------ "বি এটেনটিভ! আমরা কিন্তু ট্রাই-কপ্টার বা কোয়াড-কপ্টার বানাচ্ছিনা, উই আর গোয়িং টু মেক আ হেক্সা-কপ্টার। এই ড্রোনে ছয়টা মটর এবং ছয়টা প্রোপেলার থাকবে। এর বিশেষ দিকটি হচ্ছে এই ড্রোন ছবি তোলার জন্য শুধু সাধারণ ক্যামেরাই নয়, হাই রেজুলেশনের ডিএসএলআর ক্যামেরাও বহন করতে পারে।"
নীবিড়ের বক্তব্যের মাঝেই হঠাৎ করে ডেকে উঠল কেউ,
------ "ভাই!"
কথার মাঝে বাঁধার সৃষ্টি হওয়ায় কপালে বিরক্তির ভাঁজ ফেলল নীবিড়। আড়চোখে রাহিতের অস্থির মুখটার দিকে তাকিয়ে বলল,
------ "অসময়ে বিরক্ত করবি না রাহিত। বাইরে যা!"
কথাটা বলেই রাহিতকে বিশেষ পাত্তা না দিয়ে সকলের উদ্দেশ্যে আবারও বলে উঠল নীবিড়,
------ "এখন প্রশ্ন উঠতে পারে ড্রোন বানাতে কি কি লাগবে? আমরা এর আগেও অনেক ড্রোন বানিয়েছি তবে সেগুলো মূলত ট্রাই-কপ্টার বা কোয়াড-কপ্টার। তবু যেহেতু বানিয়েছি সেহেতু আমাদের কম-বেশি সবারই ইন্সট্রুমেন্টস সম্পর্কে ধারণা থাকার কথা। কী আছে তো?"
বিনিময়ে সমস্বরে উচ্চারিত হলো দুটি মাত্র শব্দ,
------ "জ্বি ভাই!"
------ "ভেরি গুড! সো আমরা ব্রাশলেস মটর ইউজ করব। কজ এই ব্রাশলেস মটর অন্যান্য মটরের তুলনায় বেশি স্পিন করতে পারে..."
নীবিড়ের পুরো কথাটা শেষ হবার পূর্বেই ওপাশ থেকে আবারও ভয়ার্ত গলায় বলে উঠল রাহিত,
------ "ভাই, কথাটা একটু শুনো। আসলে কথাটা ভাবিকে নিয়ে!"
রাহিতের ডাকে নীবিড়ের কথায় সামান্য বাঁধার সৃষ্টি হয়েছিল ঠিকই তবে কথা না থামিয়ে কন্টিনিউ বলেই চলছিলো সে৷ কিন্তু যখনই "ভাবি" শব্দটা কান অবধি পৌঁছল তখনই চট করে বোর্ডের সামনে থেকে সরে এসে দরজার কাছে দাঁড়াল সে। অস্থির গলায় জিজ্ঞেস করল,
------ "অ...অনন্যাকে নিয়ে? কোথায় ও? কি হয়েছে ওর? ও ঠিক আছে তো? কিরে কিছু বলছিস না কেনো? কেউ ওকে আমায় নিয়ে কিছু বলেছে তাইনা? আমি জানতাম। ঠিক জানতাম এমন কিছুই হয়েছে! চল, আমিও দেখি কার বুকের পাটা নতুন করে জন্মেছে যে কি-না সাদমান শাহরিয়ার নীবিড়ের ওপর দিয়ে তার ওয়াইফ কে কথা শোনায়!"
সামান্য অনন্যা বিষয়ক কোনো কথা শোনা মাত্রই নীবিড়ের এমন অস্বাভাবিক অস্থিরতায় ঘাবড়ে গেল রাহিত। কয়েক সেকেন্ড আগেও যে তাকে পাত্তাই দিচ্ছিল না তার স্ত্রীর সম্মন্ধে কোনো কথা বলতে এসেছে জেনেই এতোটা অধীরতা! রাহিত চরম অবাক হলো। তাড়াহুড়ো করে নীবিড়কে শান্ত করার জন্য বলে উঠল,
------ "ভাই ভাই শান্ত হও। তুমি যেমন ভাবছ তেমন কিছুই না!"
নীবিড় ক্ষণিকের জন্য থমকাল। ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করল,
------ "তাহলে কেমন? কি বলতে এসেছিস বল! অনন্যার কি হয়েছে বল!"
নীবিড়ের ধমকের সুরে বলা কথাগুলোয় বরাবরই আত্মা কেঁপে ওঠে রাহিতের। তবে বহুদিনের চেনা মানুষ কি-না, তাই নীবিড়ের এই হাই ভোল্টেজের ধমকগুলো গিলে নেবার অভ্যেস হয়ে গেছে তার। রাহিত গলা ঝেড়ে সাহস জুগিয়ে নিলো। বলতে শুরু করল,
------ "ভাই, আসলে ক্যান্টিনে নিহান ভাইয়ের সাথে ভাবিকে কথা বলতে দেখলাম। তা দেখেই ছুটে এলাম তোমাকে জানাতে।"
নীবিড়ের হাতের মুঠো আপনা-আপনিই শক্ত হয়ে এলো। কপালের রগ ফুলে উঠল চাপা কোনো রাগে। গলাটা যথাসম্ভব গম্ভীর করেই জিজ্ঞেস করল,
------ "শুধু কি ওরা দু'জনেই আছে? রাত্রি নেই?"
------ " ভাই, রাত্রিকে তো ওদের সাথে দেখলাম না। পার্সোনাল কোনো কথা বলতেই দেখা করেছে যা মনে হলো!"
"পার্সোনাল" শব্দটা যেনো রাগের মাত্রা বহুগুণ বাড়িয়ে দিলো নীবিড়ের। রাহিতের শার্টের কলার মুহুর্তেই চেপে ধরে রক্তচক্ষু নিয়ে তাকাল সে। নীবিড়ের এমন ভয়ানক রূপ দেখে চুপসে গেল রাহিত। চোখ বড়বড় করে শুকনো ঢোক গিলতেই কলার ছেড়ে বড়বড় পায়ে ক্লাসরুম থেকে বের হলো নীবিড়। রাহিত যেনো নিজের অর্ধমৃত প্রাণটাকে পুনরায় ফিরে পেল। বাপরে বাপ! কারো পার্সোনাল এসিস্ট্যান্ট হওয়া বুঝি এতোটাই কষ্টকর! যা দেখেছে তা বলাতেই প্রাণ যায় যায় অবস্থা। কী সাংঘাতিক ব্যাপার স্যাপার!
______________________________________
------ "নিহান ভাই, চুপ করে গেলেন কেনো? কথাটা পুরোপুরি বলে ফেলুন।"
নিহান ভাই ভয়ে কুঁকড়ানো চোখে আমার পেছনে তাকিয়ে। কথা বলতে বলতে হঠাৎ উনার এমন লুক দেবার কারণ বোঝা গেল না। যার দরুন আমিও নিহান ভাইয়ের দৃষ্টি অনুসরণ করে পেছনে তাকালাম তাই। নীবিড় ভাইয়া পেছন থেকে সেকেন্ডের মধ্যেই ঝড়ের বেগে এসে আমার হাত চেপে ধরলেন। চেয়ার থেকে টান মেরে উঠিয়ে বললেন,
------ "বাসায় চলো!"
হঠাৎ করেই হতবুদ্ধিকর ভাব নিয়ে এদিক-ওদিক তাকালাম। বোকাবোকা গলায় জিজ্ঞেস করলাম,
------ "কিন্তু আমি তো নিহান ভাইয়ার সাথে কথা বলছিলাম। ভাইয়ার আমাকে গুরুত্বপূর্ণ কিছু জানানোর জন্য ডেকেছেন।"
নীবিড় ভাইয়া সুক্ষ্ম চোখে তাকালেন নিহান ভাইয়ার পানে। দাঁতে দাঁত চেপে চাপা গলায় বললেন,
------ "ওকে তো আমি পরে দেখে নেবো। আপাতত তুমি আমার সাথে বাসায় চলো! এর ওপরে কোনো কথা না!"
এরপর একপ্রকার জোরজবরদস্তি করেই আমায় ক্যান্টিন থেকে টেনে-হিঁচড়ে গাড়িতে গিয়ে বসালেন। আমার কোনো প্রশ্নের উত্তর না দিয়েই গাড়ি টান দিলেন চরম স্পিডে। পুরো রাস্তায় অসংখ্য বার উনাকে এমন অদ্ভুত বিহেভ করার কারণ জিজ্ঞেস করেছি আমি, কিন্তু ফলাফল সেই আগের মতো গোলগোল্লা।
উনি গাড়ি থামিয়ে আমায় বাসার ভেতরে নিয়ে যেতে লাগলেন। ড্রয়িংরুমে শ্বশুর মশাই বসে নিউজ পড়ছিলেন। নীবিড় ভাইয়াকে আমায় এভাবে টানতে টানতে ভেতরে আনতে দেখে দু পায়ে সটান হয়ে দাঁড়ালেন। ব্যস্ত গলায় জিজ্ঞেস করলেন,
------ "একি নীবিড়, তুই অনন্যাকে এভাবে টেনেহিঁচড়ে বাসায় নিয়ে আসছিস কেনো?"
বাবার ছোড়া প্রশ্নের বিপরীতে দুদন্ড দাঁডালেনও না উনি। আগের মতোই আমার হাত চেপে ধরে সিঁড়ি ভেঙে উপরে উঠতে উঠতে বলে উঠলেন,
------ "তোমার বউমা বিপথে গেলে তার কিস্তি আমাকেই দিতে হবে বাবা, তুমি এসবের মাঝে একদম জড়াবে না বলে রাখলাম।"
একথা বলার পরপরই ঘরে এনে শব্দ করে দরজা লাগিয়ে দিলেন নীবিড় ভাইয়া। ব্যাপারগুলো এতোটা দ্রুত ঘটতে থাকল যে মাঝথেকে কোনো একশন নেওয়ার মতো সুযোগটুকুও পেলাম না আমি। এতক্ষণ বাদে উনার হাত থেকে ছাড়া পেয়ে লম্বা করে দম নিলাম। হাঁপাতে হাঁপাতে বললাম,
------ "আপনি কি শুরু করেছেন একটু বলবেন? সেই তখন থেকে প্রশ্ন করে যাচ্ছি, আপনি উত্তর না দিয়ে সোজা বাসায় টেনে আনলেন। আর বিপথে যাচ্ছি মানে কি? বাবাকে এমনটা বললেন কেনো আপনি?"
নীবিড় ভাইয়া শীতল চোখে তাকালেন। সেই গম্ভীর শীতল চোখ জানিনা কতটুকু ভয়ানক তবে তার চাহনিতে আচমকাই ঢোক গিলতে হলো আমার। নীবিড় ভাইয়া এবারেও কোনো জবাব না দিয়ে সোজা দেয়ালের সাথে চেপে ধরলেন আমায়। হাতদুটো শক্ত করে নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে দেয়ালে ঠেকালেন। উনার উত্তপ্ত শ্বাস সরাসরি মুখের ওপর পড়ায় ভয়ে একেবারেই কুঁকড়ে গেলাম আমি। কাঁপাকাঁপা গলায় বললাম,
------ "আ...আপনি আমার সাথে এমন করছেন কেনো? দে..দেখুন আমার ভয় করছে!"
------ "তাই! ভয় করছে? খুব ভয় করছে তাইনা? এতোই যখন প্রাণে ভয় তবে নিহানের সাথে আলাদা বসে কথা বলার সময় সেই ভয় কোথায় গিয়েছিল? নাকি ভুলে গিয়েছিলে আমি তোমার হাজবেন্ড?"
আমি চোখদুটো মুহুর্তেই খিঁচে বন্ধ করে নিলাম। মাথাটা ভনভন করে ঘুরতে শুরু করলো আমার। নিহান ভাইয়ার সাথে একটু কথা বলায় এমন কোন গ্রহ দূষিত করে ফেললাম যে উনি আমার সাথে এমন ব্যবহার করছেন? সেদিন জোর করে বিয়ের সময়ও নিহান ভাইকে নিয়ে বাজে কথা বলেছিলেন উনি। ভাই-বোনের মতো সম্পর্কে উনি এমন জঘন্য ভাবনা কি করে আনতে পারেন?
________________________________________
রাত্রি ওয়াশরুম থেকে বের হয়ে লম্বা করে হাঁফ ছাড়ল। বিড়বিড় করে বলল,
------ "ইশশ, দুনিয়ার সব মাইয়াদের হিশু কি আজকের দিনেই লাগছিল? উফফ মা গো! সিরিয়াল ধরে দাঁডায় থাকতে থাকতে কোমড়টাই বাঁকা হয়ে গেল।"
কথা বলে নিয়েই খিটখিটে মেজাজে ধুপধাপ পা চালিয়ে ক্যান্টিনে গিয়ে পৌঁছল সে। নিহানকে কপাল চেপে ধরে চেয়ারে বসে থাকতে দেখে চমকে উঠল। আশেপাশে নজর ঘুরিয়ে অনন্যার সন্ধান চালিয়ে যখন বিফল হলো তখন নিহানের কাছাকাছি গিয়ে জিজ্ঞেস করল,
------ "নিহান ভাই, আপনি এভাবে একা একা বসে আছেন যে? অনন্যা কোথায়?"
নিহান চট করে মাথা তুলে তাকাল। রাত্রির প্রশ্নের কোনো উত্তর না দিয়ে কোকের তিনটে বোতল তার হাতে ধরিয়ে দিয়ে বলল,
------ "ও বাসায় গেছে, আমারও একটু তাড়া আছে বুঝলে। আমার আসছি, কোকগুলোর তো এভাবে অপচয় হবে। তুমি বরং এগুলো রাখো কেমন?"
রাত্রি বোকার মতো মাথাটা কাঁত করে "আচ্ছা" বলল। নিহান দ্রুত পা চালিয়ে সেখান থেকে বিদায় হলো। তার চোখমুখ অনেকটা লাল দেখাচ্ছিল। তবে তাতে রাত্রির খুব বেশি যায় এলো না। মেয়ে একটার বদলে তিন তিনটে কোকের বোতল পেয়েই মহাখুশি! রাত্রি হেলেদুলে কোকের বোতলগুলো কোলে করে নিয়ে যেতে যেতে বলে উঠল,
------ "অনুটা আমায় এভাবে না বলে চলে গেলো! কাজটা মোটেও ঠিক করলো না ও। তবে ওর জন্য যেহেতু এতগুলো কোকাকোলা ফ্রি ফ্রি পেলাম সেহেতু ওকে ক্ষমা করা যেতেই পারে। কিরে কোকু তোরা কি বলিস?"
রাত্রির কল্পনায় কোকের বোতলে চোখ-মুখ দুটোয় উপস্থিত। সেই দন্তহীন মুখ নাড়িয়ে চাড়িয়েই বলল তারা,
------ "হ্যাঁ হ্যাঁ ক্ষমা করে দাও, ক্ষমা করে দাও। আমরা তোমার পেটে ঢুকে যেতে প্রস্তুত!"
#চলবে________
[ কিচ্ছু বলবো না। জনগণ আমার ওপর প্রচুর ক্ষেপা! 😑 ]