ফন্ট সাইজ:
থিম:
প্রেম আমার (সিজন ২)

৭৫তম পর্ব

লেখক: আয়ানা জাহান নুসরাত

#প্রেম_আমার♥(সিজন-টু)

#পর্ব-৭৫♥

#আয়ানা_জাহান_নুসরাত♥

----- "বাড়ির বউ যখন তখন বাপের বাড়ি যাবে এ কেমন ধারা নিয়ম? সাদমান, তুই স্বামী হয়ে কি করে তোর বউয়ের কথায় উঠবস করিস?"

----- "বউয়ের আবদার পূরণ করা স্বামীর কর্তব্য, একে উঠবস করা বলেনা দাদীমা।"

দাদীমা দমলেন না। রাগী গলায় ফের বললেন,

----- "তুই আমার মুখেমুখে তর্ক করছিস সাদমান! এ দিনও দেখার বাকি ছিল আমার? তুই কি ভাবছিস যুগ বদলেছে দেখে সব বুঝে গেছিস? আমরা কিছু বুঝিনা? আমরা সংসার করিনি? শ্বশুর বাড়িতে কিভাবে চলতে হয় তা আমরা জানি না?"

নীবিড়কে বলতে না দিয়ে বেশ স্বাভাবিক গলায় বললাম আমি,

----- "আপনি শ্বশুর বাড়িটাকে জেল খানার মতো ভেবে এসেছেন দাদীমা। দোষটা পুরোপুরি আপনার নয়, আপনার শ্বশুর বাড়িরও বটে। আমি আপনার অবস্থাটা বুঝতে পারছি। এই নিন মিষ্টি খান। মাত্র ফিরলাম। এখনই এমন তেতো শব্দ মুখ থেকে বের করবেন না।"

কথাটা বলার মাঝেই এক পিস মিষ্টি দাদীমার মুখে ঢুকিয়ে দিয়েছি আমি। দাদীমা চূড়ান্ত রেগে গিয়েছেন, না পারছেন মিষ্টিটা গিলতে আর না পারছেন ফেলেতে। আমি যে এমনটা করব তা হয়তো কেউই কল্পনা করতে পারে নি। যার দরুন নিজ নিজ অবস্থানে থেকে মুখে বিস্ময়ের গুহা সৃষ্টি করল সকলেই। দাদীমা মিষ্টিটা কোনোরকমে গিলে নিয়ে অগ্নিদৃষ্টিতে তাকালেন। গম্ভীর গলায় বললেন,

------ "তোমার সাহস হলো কি করে আমায় এভাবে সকলের সামনে অপদস্ত করার?"

------ "আহা ভুল বললেন দাদীমা। আপনি অপদস্ত হতে চাইছেন ঠিক আছে কিন্তু তার মানে এই নয় যে আমার এতো মিষ্টি একটা ব্যবহারও আপনি অপদস্ত করার সাথে তুলনা করবেন।"

দাদীমা কটমটে ভঙ্গিতে আমার পানে কয়েক মুহুর্তে স্থির হয়ে চেয়ে রইলেন। তার পরপরই বাবার নাম করে জুড়ে দিলেন এক চিৎকার,

------ "সাদনান!"

বাবা হুড়মুড়িয়ে টাই খুলতে খুলতে চিনে নেমে এলেন। এসেই বাধ্যগত সন্তানের ন্যায় জিজ্ঞেস করলেন,

------ "কি হয়েছে মা? এভাবে চেঁচালে কেনো?"

------ "তোর মা কি সাধে চেঁচায়? এ কেমন ছেলের বউ নিয়ে এসেছিস? মুখে মুখে তর্ক করে, বড়দের ঠিকমতো সম্মান করতে জানে না।"

শেষের কথাটা আমার দিকে ক্ষিপ্ত দৃষ্টি নিক্ষেপ করে বললেন উনি। আমি ভাবলেশহীন কলেজ ব্যাগটা কাঁধ থেকে নামাতে নামাতে বললাম,

------ "আমি প্রয়োজনের তুলনায় অতিরিক্ত সম্মান দেই, এটা আমার বদঅভ্যাস দাদীমা। একটু কষ্ট করে মানিয়ে নেবেন প্লিজ। আপনার চেঁচাতে চেঁচাতে এনার্জি ফুরিয়ে গেলে আমায় ডাকবেন। আজ ডিনার আমি সার্ভ করব।"

কথাটা বলে নীবিড়কে ইশারায় ঘরে আসতে বলে হাঁটা ধরলাম আমি। সোফায় ফুপ্পিকে পাশ কাটিয়ে যাওয়ার সময় হেসে জিজ্ঞেস করলাম,

------ "কেমন লাগছে এখানে ফুপ্পি? সব ঠিকঠাক?"

বিস্ময়মাখা মুখে চেয়ে অবাক কণ্ঠে জবাব দিলেন ফুপ্পি,

------ "এতক্ষণ সবই ঠিক লাগছিলো রে মেয়ে। তুমি তো আমার কাঁপুনি বাড়িয়ে দিলে। তবে যাই বলো দারুণ জবাব দিয়েছ!

শেষের লাইনটা ফিসফিসিয়ে বললেন ফুপ্পি। যাতে আমি ব্যতীত তৃতীয় কেউ কথাটা শুনে না ফেলে। ফুপ্পিলে অনুকরণ করে ফিসফিসিয়ে পাশ থেকে বলল নিলুও,

------ "ভাবী ইউ রক্স নানিমা শক্স!"

আমি নিলুর মাথায় হাত বুলিয়ে মুচকি হেসে ঘরে এলাম। ওদিকে এতক্ষণে কুরুক্ষেত্র বাঁধিয়েছেন হয়তো দাদীমা। সবটা ঝাড় বাবার ওপর দিয়েই যাচ্ছে। থাক, মাঝে মাঝে মায়ের বকুনি খাওয়া স্বাস্থ্যের পক্ষে উপকারী। এতে করে গায়ের ঘাম ছোটে। গায়ের ঘাম ছুটলে চর্বি কমে, আর চর্বি কমলে ওজন কমে আর ওজন কমলে আরামে আরামে মোটু থেকে কিঞ্চিৎ পরিমাণে পাতলু হওয়া যায়। তো হলো না মায়ের বকুনি ইউ ইকুয়াল টু ওয়েট লস?

আমি ফুস করে শ্বাস ফেলে বেঁধে রাখা চুলগুলো ছেড়ে দিয়ে বিছানায় পা ছড়িয়ে বসলাম। শরীরটা বড্ড ক্লান্ত লাগছে। তবে মনটা বেশ ফুরফুরে লাগছে। ভাইয়েদের সাথে আড্ডাটা বড্ড প্রয়োজন ছিল আজ। কনফিডেন্স লেভেল তো হাই হলোই সাথে আমার মনে যত দ্বিধাদ্বন্দ ছিল তাও কেটে গেল। ভালো একটা মানসিকতা নিয়ে ফিরে দাদীমার এমন কটু কথাটা ঠিক হজম করাটা সহজ ছিল না। তখন যদি চুপ করে থাকতাম তবে নির্ঘাত পুরোটা রাত বাজে ভাবে কাটত আমার। তাছাড়া আমি ভুল তো কিছু বলিনি, গুরুজন হলেই কি উনার ভুল কথাগুলো মেনে নিতে হবে? গুরুজনেরাও তো মানুষ। আর মানুষ মাত্রই ভুল। ছোটরা ভুল করলে যেমন বড়রা ভুল ধরিয়ে দেয় তেমনই বড়রা ভুল করলেও ছোটদের সেই ভুলটা ভদ্রতার সাথে বুঝিয়ে দেওয়া উচিত।

আমি এধরণের কথা ভাবতে ভাবতেই বিছানায় গা এলিয়ে দিলাম। ভাবনায় খুব করে ডুবে থাকায় দরজায় কে দাঁড়িয়ে আছে তা খেয়াল করা হয়নি। আমি যখন খেয়াল করতাম তখন আবিষ্কার করলাম নীবিড় কনফিউজড টাইপ ভাব নিয়ে পলকহীন দেখছেন আমায়। আমি চট করে উঠে বসে উনার উদ্দেশ্যে বললাম,

------ "সেকি! দরজায় দাঁড়িয়ে আছেন কেনো? ভেতরে আসুন।"

নীবিড় এলেন এলোমেলো পা ফেলে। এসেই আমার পাশে বসলেন। কোনো কিছু নিয়ে বিভ্রান্ত এমন মুখভঙ্গি করে জিজ্ঞেস করলেন,

------ "অনন্যা, আজ তোমার বিহেভিয়ার অন্যান্য দিনের মতো লাগছে না। তোমার কি কিছু হয়েছে? আই মিন, তোমায় এভাবে এতোটা স্ট্রেইট ভাবে চলতে খুব কমই দেখছি আমি। তাই হয়তো ঠিক স্বাভাবিক লাগছে না।"

------ "আপনি এতো প্যারা নিচ্ছেন কেনো বলুন তো? আমি কি দাদীমাকে কোনো খারাপ কথা বলেছি? যদি তাই মনে হয় তবে বলুন, আমি গিয়ে ক্ষমা চেয়ে আসব।"

নীবিড় ব্যস্ত গলায় বাঁধা দিয়ে বললেন,

----- "আরে না না। ভুল বুঝছ! আমি তা বলিনি। তুমি সঠিক জবাবই দিয়েছ। কিন্তু তোমায় আগে কখনও এভাবে কথা বলতে দেখিনি তারওপর আজ আমার সাথেও অদ্ভুত আচরণ করছ তুমি।"

নীবিড়ের প্রশ্নেমাখা মুখটা দেখে বড্ড হাসি পেল আমার। হাসিটাকে ভেতরে চেপে রেখেই বললাম আমি,

----- "আহা, এতো জটিল করে ভাববেন না। মানুষ মাত্রই পরিবর্তনশীল। সময় যাচ্ছে, বুদ্ধি বাড়ছে আজীবন তো সেই হামাগুড়ি দিয়ে হাঁটা বাচ্চা থাকব না। তাইনা?"

নীবিড়ের চোখেমুখে কিছুটা ভয়ের ছাপ দেখা গেল। আতঙ্কিত হয়ে বললেন,

----- "এই তুমি আবার তোমার স্বভাবগুলো চেঞ্জ করার কথা ভাবছ না তো? যদি ভেবে থাকো তবে তা এক্ষুণি মাথা থেকে ঝেড়ে বের করে ফেলো। আমার তোমার এই চাইল্ডিশ স্বভাবগুলোই বেশি পছন্দ। খবরদার এই চঞ্চলতাগুলো হারিয়ে যেতে দিবে না!"

উনার এমন নরম গলায় দেওয়া ধমকে ঠোঁট উল্টালাম আমি। তারপর শান্ত গলায় বললাম,

----- "চিন্তা করবেন না, আমি নিজে থেকে চাইলেও নিজের এই বাজে স্বভাবগুলো পরিবর্তন করতে পারব না।"

নীবিড় খানিকটা আস্বস্ত হলেন। হাঁফ ছেড়ে বললেন,

----- "কথাটা যেনো মনে থাকে। যাও এখন ফ্রেশ হয়ে নাও। এসেই বিছানায় শুয়ে পড়েছ দেখছি।"

কথাটা বলে বিছানা ছেড়ে উঠলেন উনি। ধাপ ফেলে কিছুদূর এগোবার মধ্যে পেছন ডাকলাম আমি,

----- "শুনুন!"

নীবিড় দাঁড়ালেন। উল্টোদিকে মুখ ফিরিয়ে জিজ্ঞেস করলেন,

----- "কিছু বলবে?"

----- "হ্যাঁ, আসলে আমার একটা কথা জানার ছিল।"

নীবিড় উল্টোদিকে হাঁটা ধরে কাছাকাছি এসে দাঁড়ালেন আমার। বললেন,

----- "কি জানতে চাও বলো।"

----- "আপনাকে ইদানীং খুব চিন্তিত দেখাচ্ছে। কোনো দুশ্চিন্তার ঘটনা ঘটেছে কি? যদিও আপনার প্রফেশন সম্পর্কে আমার ততটা জ্ঞান নেই তবু কিউরিওসিটিটা দমিয়ে রাখতে পারলাম না।"

নীবিড় চট করেই উত্তর দিলেন না। কিছুক্ষণ চুপ থেকে লম্বা করে শ্বাস ফেললেন। গম্ভীর তবে নরম গলায় বললেন,

----- "অনন্যা, তুমি আমার স্ত্রী। আমার প্রফেশন, কাজ, কি করছি না করছি তা সম্মন্ধে তোমার জানার অধিকার শতাধিক। তবে আমি চাইছিলাম না তুমি আমায় নিয়ে চিন্তা করো।"

এটুকু বলে কয়েক সেকেন্ড বিরতি নিয়ে ফের বললেন,

----- " সেদিন রিসেপশনে একটা ছেলেটার থেকে তোমায় দূরে থাকতে বলেছিলাম। মনে আছে?"

আমি চট করে মনে পড়ার ভঙ্গি করে বললাম,

----- "ওইযে ম্যাট না ফ্যাট ওই লোকটা?"

----- "হ্যাঁ, ঠিক ধরেছ। ইউকে'তে ওদের একটা গ্রুপ আছে। ম্যাট সহ ৫ জন মেম্বার সেই গ্রুপে। ও গ্রুপ সহই দেশে ফিরেছে। আর যা বুঝলাম তাতে আমায় হারাবার জন্যই গ্রুপ মেম্বার নিয়ে এসেছে ও। ম্যাট আমায় চ্যালেঞ্জ করেছে। আগামী মাসে ঢাকায় ড্যান্স কম্পিটিশন হবে।"

আমার চোখদুটো বড় বড় হয়ে এলো মুহুর্তেই। চিন্তায় কপালে বিন্দু বিন্দু স্বেদজল জমতে শুরু করল। কৌতূহল মাখা গলায় প্রশ্ন ছুড়লাম আমি,

----- "কিন্তু ওরা তো পাঁচজন, আর আপনি সেখানে একা। এটা কিভাবে সম্ভব?"

শান্ত গলায় জবাব দিলেন উনি,

----- "সম্ভব! কম্পিটিশন গ্রুপের সাথে সোলো ড্যান্সারদেও হয়। তাতে আমার কোনো সমস্যা নেই। সমস্যা হয়ে দাঁড়াচ্ছে পরীক্ষাটা। পরশু থেকে ফাইনাল এক্সাম শুরু। প্রাকটিসে কনসার্নট্রেট করতে গেলে এক্সামে ইফেক্ট পড়বে। আর স্টাডিতে কনসার্নট্রেট করতে গেলে প্রাকটিস কম হবে। হ্যান্ডেল করাটা টাফ হয়ে যাবে। কাল থেকে দিন-রাত ২৪ ঘন্টার মধ্যে ৪ ঘন্টা ঘুম ছাড়া পুরোটা সময়ই ব্যস্ত থাকব।"

আমার মুখটা চুপসে এলো হঠাৎ। এই মানুষটা মাত্র ৪ ঘন্টা ঘুমোবেন আর বাকি ২০ ঘন্টা প্রাকটিস, পড়াশোনা, এক্সামের ওপরই থাকবেন! শরীর চলবে কি করে উনার? আর আমি যে উনার জন্য সারপ্রাইজ প্ল্যান করছিলাম তারই বা কি হবে? এতো ব্যস্ততায় নিশ্চয় উনার সময় নষ্ট করা যাবে না।

----- "কি হলো অনন্যা? কি ভাবছ?"

আমি চমকালাম উনার প্রশ্নে। মাথাটা দু'দিকে নাড়িয়ে বললাম,

----- "তেমন কিছু নয়, ভাবছি আপনি এতোগুলো সময় কাজের ওপর থাকবেন। রেস্ট করবেন কখন? এভাবে তো শরীর খারাপ করবে আপনার।"

নীবিড় মুচকি হাসলেন। আত্মবিশ্বাসী গলায় বললেন,

----- "সাদমান শাহরিয়ার নীবিড় এতোটা উইক নয় মিসেস আয়ানা জাহান অনন্যা! আপনার হাজবেন্ড অনেক স্ট্রং! আপনি যে তাকে নিয়ে এতোটা ভাবছেন তাই অনেক।"

কথাটা বলেই বাঁকা হেসে বাম চোখটা টিপে দিলেন উনি। বুকটা মুহুর্তেই ধক করে উঠল আমার। আমি চোখ সরিয়ে নিলাম উনার থেকে। এই মানুষ বহুত সেয়ানা, ঠিক জানেন আমায় কোথায় কিভাবে বাগে আনতে হয়। আমি আড়চোখে উনার পানে তাকালাম আরেকবার। উনি বোধহয় আমার এই চোরের মতো দৃষ্টি নিক্ষেপের অপেক্ষাতেই ছিলেন। যার দরুন তা দেখেই নিঃশব্দে হেসে বেরিয়ে গেলেন। আর আমায় হৃদ স্পন্দনের মাত্রাটা বাড়িয়ে দিয়ে গেলেন অযথাই। আমি সেই ধুকপুকানির শব্দ স্পষ্ট শুনতে পেলাম। ইশশ প্রেমে পড়ার অনুভূতিতে গুলো এতোটা তীব্র হয় কেন? বড্ড মুশকিলে পড়ে গেলাম দেখছি!

______________________________________

"একটা ছেলে মনের আঙিনাতে

ধীর পা'য়েতে এক্কা দোক্কা খেলে।

বন-পাহাড়ি ঝরনা খুঁজে,

বৃষ্টি জলে একলা ভিজে।

----- "বাব্বাহ, এত প্রেম? তা এত প্রেম এতদিন কোন সিন্দুকের ভেতরে ভর্তা বানিয়ে রেখেছিলি শুনি?"

আমি গুনগুন করে গাছে হেলান দিয়ে গান গাইছিলাম। পাশ থেকে বেগড়া দিয়ে ঠেস মারা কণ্ঠে কথাটা বলল রাত্রি। আমি উত্তর দিলাম না। মুখ ফুলিয়ে বিরক্ত দৃষ্টি নিক্ষেপ করে ফের গান ধরলাম,

------ "সেই ছেলেটা আমায় ছুঁয়ে ফেলে,

সেই ছেলেটা আমায় ছুঁয়ে ফেলে!"

------ "আচ্ছা তুই নীবিড় ভাইকে প্রপোজ করেছিস? বাসি বাসর রাত সেরেছিস? হানিমুনে কই যাবি? দুবাই, লন্ডন না সুইজারল্যান্ড?"

------ "মুন্ডুল্যান্ড!"

------ "অ্যাঁ! মুন্ডুল্যান্ড নামেও কোনো দেশ আছে নাকি? কই আমি তো জানতাম না।"

এবার রাত্রিকে লবণ-মরিচ ছাড়াই কাঁচা চিবিয়ে খাবার মতো ভয়ংকর ইচ্ছে জন্মাল আমার। সর্বপ্রথম তার মুন্ডুটাই কেটে পিস পিস করার জন্য হাতটা নিশপিশ করতে লাগল। রাত্রি আমার কটমটে চাহনি দেখে থমকাল। মাথা চুলকে মুন্ডুল্যান্ড শব্দটা যে মুন্ডু অর্থাৎ মাথা থেকে আগত তা বুঝতে পেরে জোরপূর্বক হাসার চেষ্টা করল। মিনমিন করে বলল,

------ "এই আমি এতো সিরিয়াস একটা বিষয় নিয়ে প্রশ্ন করছি আর তুই কি-না সুইজারল্যান্ড এর ল্যান্ডের সাথে মুন্ডু জুড়ে দিলি?"

------ "আর একটা বাজে কথা বললে ওই বট গাছের সাথে তোর মুন্ডু জুড়ে দেব।"

রাত্রি আমার ধমকে কেঁপে উঠে মুখে কুলু পাতল। যথাসম্ভব চাপা গলায় ফিসফিসিয়ে বলার মতো করে বলল,

------ "দোস্ত, রেগে যাচ্ছিস কেন? আমি কি তোর সাথে মজা করছি? আমি তো অতিব গুরুত্বপূর্ন একটা বিষয় নিয়ে কথা বলছি। তুই এতদিন পর বুঝলি যে তুই নীবিড়কে ভাইয়াকে ভালোবাসিস কিন্তু বাসর রাত তো পেরিয়ে গেছে তোদের। তাই বলছি আর দেরি না করে এই বিলম্বিত প্রেমের মতো বিলম্বিত বাসরটা সেরে ফেল, একটা দুইটা আন্ডাবাচ্চা ফুটা। অনেকদিন কারো খালামুনি হইনা।"

আমি হাসব না কাঁদব ঠিক বুঝে উঠতে পারলাম না। রাত্রির লেভেল ছাড়া কথায় কান দিয়ে ধোঁয়া বের হবার উপক্রম হলো আমার। যার দরুন তৎক্ষণাৎ দাঁতে দাঁত চেপে বলে উঠলাম আমি,

------ "কথাটা এমন ভাবে বললি যেনো খালামুনি হওয়া আর টাসটুস করে বিয়ের দাওয়াত খাওয়া একই কথা। গাধার হদ্দ কথাকার! আরে এখনও কনফেস করতেই পারলাম না, আর উনি প্রেম তো দূর ডিরেক্ট আন্ডাবাচ্চা অবধি চলে গেছে! অশ্লীল মাইয়া!"

রাত্রি আহ্লাদী ভঙ্গিতে গা ঘেঁষে বসল আমার। গদগদ কণ্ঠে বলল,

------ "নিজের বরের সাথে রোম্যান্স করবি এতে আবার অশ্লীলতার কি আছে? তুই মেয়েটা আসলেই ঘাড়ত্যাড়া। তোর জায়গায় আমি হলে কবেই হানিমুন সেরে ফেলতাম!"

মুহুর্তেই বিস্ফোরিত চোখে তাকালাম আমি। রাত্রি আমার এমন চাহনি দেখে থতমত খেয়ে বলল,

------ "আব মানে আমি তোর জায়গায় আর রুশো নীবিড় ভাইয়ার জায়গায়। এতো সিরিয়াসলি নেওয়ার কি আছে? এমন ভাবে তাকালি যেনো কলিজা ভুনা করে খাবি। থাক বাবা আমি আর কিছু বলব না, আমার রুশোর নাক নিয়েই আমি খুশি।"

রাগ করতে চেয়েও রাত্রির শেষোক্ত কথাটায় না হেসে পারলাম না আমি। ওর পিঠে কিল বসিয়ে দিয়ে বললাম,

------ "এতদিন ঘুষি মেরে রুশো ভাইয়ার নাক লাল করতি আর এখন লিপস্টিক মাখিয়ে লাল করছিস। বেচারা ভাইটার নাকুটা যেই টমেটো সেই টমেটোই থেকে গেল। আহা দুঃখ!"

ক্যাম্পাসের বড় মাঠটার একপাশে বসে এভাবেই আড্ডা দিচ্ছিলাম আমরা। মুড়িওয়ালা মামার লাজাওয়াব মুড়ি মাখাটা আড্ডার মজাটা বাড়িয়ে দিয়েছিল বহুগুণ। গুঁতাগুঁতি, হাসাহাসির এক পর্যায়ে চুপ করে গেলাম দু'জনেই। পেছন থেকে আগত পদধ্বনিটিও থমকাল। মোটা গলায় কেউ বলে উঠল,

------ "ওহ তাহলে তুমি এখানে!"

আমি-রাত্রি দু'জনেই বসা থেকে উঠে দাঁড়ালাম। বেশ স্বাস্থ্যবান বাবার বয়সী পুরুষ আমার উদ্দেশ্যে কথাটা বলেছেন। চোখে পাতলা ফ্রেমের চশমা। মুখে ছোট ছোট আধাপাকা দাড়ি। বেশ লম্বা মতোই। পোশাকে একধরনের সাহেব সাহেব ভাব উনার। আমার উনাকে চিনতে খুব বেশি বেগ পেতে হলো না। হাতে থাকা মুড়ির ঠোঙাটা রাত্রির হাতে ধরিয়ে দিয়ে বললাম,

------ "আমি যদি ভুল না হই তবে আপনি জারার বাবা তাইনা?"

------ "বাহ, স্মার্ট গার্ল। আমার বিবরণ জেনেই চিনে ফেলেছ দেখছি!"

------ "জ্বি, আজকালকার মেয়ে একটু স্মার্ট না হলে চলে? সে যাই হোক, আপনি হঠাৎ আমাদের ভার্সিটিতে এসেছেন কেন? বিশেষ কোনো দরকার?"

------ "দরকার ছাড়া কেউই কোথাও যায় না। তুমি-নীবিড়, আমার মেয়েকে জেলে পাঠিয়েছ। আর গতকাল শুনলাম আমার মেয়ে জেলে নেই। জেল থেকে পালিয়ে গেছে! আমার বিশ্বাস হচ্ছেনা, জারা জেল থেকে পালাতে পারে। তোমরা ওকে কোথায় লুকিয়ে রেখেছ ভালোয় ভালোয় বলে দাও। নয়তো আমি স্টেপ নিতে বাধ্য হবো।"

ভদ্রলোকের কথায় অবাক না হয়ে পারলাম না আমি। তাচ্ছিল্যের হাসি ঠোঁটে ফুটিয়ে বললাম,

------ "হাহ! আপনি কেমন বাবা মিস্টার খন্দকার? আপনার মেয়ে জেলে নেই আজ নিয়ে একটা সপ্তাহ হয়ে এলো আর আপনি গতকাল মেয়ে পালানোর খবর পেয়েছেন! হাস্যকর!"

কথাটা বলে থামলাম আমি। বিপরীতে ভদ্রলোককে কোনো জবাব দিতে না দিয়ে আবারও বললাম,

------ "শুনুন মিস্টার খন্দকার, আপনি আমার বাবার বয়সী। গুরুজন হিসেবে আমি আপনাকে যথেষ্ট সম্মান করছি। আশা করি সেই সম্মানটুকু পাবার যোগ্যতা ধরে রাখবেন।

আপনার মেয়ে যেখানে আছে ভালো আছে। আপনার যদি জারার প্রতি এতটাই কেয়ার থাকত তবে আজ এসে জারার খোঁজ চালাতেন না, আর না জারা এতটা নিচে কখনও নামতে পারত। নিজের ব্যস্ত জীবন নিয়ে ভালো থাকুন, আসছি। এই রাত্রি চল, ক্লাসের টাইম হয়ে এসেছে।"

#চলবে____________

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৭৫তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন