#প্রেম_আমার♥(সিজন-টু)
#পর্ব-৭৬♥
#আয়ানা_জাহান_নুসরাত♥
কান্টিনে বসে জুসের বোতলে চুমুক বসাচ্ছি আমি। গ্রীষ্ম না আসতেই দিনে বেশ গরম পড়তে শুরু করেছে। সূয্যিমামাটা কি সুন্দর খিলখিল করে হাসছে। তার ঝলমলে রোদে মাঠ-প্রান্তর হলদেটে বর্ণ ধারণ করেছে। বাতাস বইছে না যদিও তবু পরিবেশটা ভালো লাগছে। চোখে অকারণেই নেমে আসছে রাজ্যের ঘুম। আমি ঘুমু ঘুমু ভাব নিয়ে বোতলের জুসটুকু শেষ করে থামলাম। টেবিলে মাথা লাগিয়ে চোখদুটো বন্ধ করে নিলাম। রাত্রি ফোনে গুঁতোগুঁতি করছিল। আমায় শুতে দেখে হঠাৎই চিৎকার করে উঠল,
------ "অনুউউউউউ।"
ঘুমের ঘোরে আচমকা তার তীব্র চিৎকারের জন্য মোটেও তৈরি ছিলাম না আমি। কানের পর্দা যেন ভেদ করে চিৎকারটা মস্তিষ্কে গিয়ে পৌঁছল। মাথা উঠিয়ে কপট রাগ দেখিয়ে বললাম আমি,
------ "সমস্যা কি? ষাঁড়ের মতো চেঁচাচ্ছিস কেন? একটু শান্তি মতো বসতেও থাকতে দিবি না নাকি?"
রাত্রির চোখেমুখে বিন্দুমাত্র অনুশোচনার ছাপ দেখা গেল না বরং উৎসুক ভঙ্গিতে বলল সে,
------ "আরররেহহ, সাধে কি আর চেঁচালাম? দেখ কে মেসেজ পাঠিয়েছে।"
কথাটা বলে ফোনের স্ক্রিনটা আমার দিকে ঘোরাল রাত্রি। আমি বিড়বিড় করে স্ক্রিনে ভেসে থাকা মেসেজটা পড়তে লাগলাম,
------ "রাত্রি, আজ নিহানদের এখানে তোমাদের সকলের দাওয়াত। সুখবর আছে। অনন্যার ফোন বন্ধ পেলাম তাই তোমায় জানালাম। ওকে বলে তোমরা সবাই চলে এসো বিকেলের মধ্যে। আর হ্যাঁ রুশো, অগ্নি ভাইকেও এনো পারলে। অগ্নি ভাইকে সরি বলা হয়নি আমার।"
মেসেজটা পরে খানিক ভাবার ভান করে বললাম আমি,
------ "সুখবর! কি সুখবর হতে পারে কোনো আইডিয়া আছে কি তোর রাত্রি?"
------ "আমি জানলে কি এতক্ষণ চুপ থাকতাম নাকি? গেলেই বোঝা যাবে। এই ওরা আবার গোপনে বিয়ে টিয়ে করে ফেলেনি তো? আমি না কেমন একটা বিয়ে বিয়ে গন্ধ পাচ্ছি!"
রাত্রির গদগদ কণ্ঠে বলা কথাটার বিনিময়ে ভাবলেশহীন তাকালাম আমি। এই মেয়ের মাথায় বিয়ে সংক্রান্ত ব্যাপারগুলো এতোটাই বাজেভাবে গেঁথে গেছে যে আমি যদি এক নম্বর সারার জন্য ওকে বলি, "দোস্ত তুই থাক আমি একটু আসছি।" তবে ও বড়বড় চোখ করে জিজ্ঞেস করবে, "কেন রে? বিয়ে করতে যাচ্ছিস?"
আমি ফুস করে শ্বাস ফেলে রাত্রির মাথায় হাল্কা করে বারি মেরে দিলাম। ঘুমঘুম ভাবটা কিভাবে যেন কেটে গেল বুঝতেই পারলাম না। রাত্রিকে মেসে পাঠিয়ে আমি নীবিড় বাসায় ফিরলাম। ওদিকে ভাইয়াদেরও জানিয়ে দিলাম নিহান ভাইয়দের ওখানে যেতে হবে তার জন্য যেনো যেন জলদি জলদি রেডি হয়ে চলে আসে।
------ "অনন্যা, এ সময় রেডি হচ্ছ যে! কোথাও বেরোবে?"
শাওয়ার নিয়ে বের হয়ে ভেজা চুলগুলো মুছছিলাম। এমন সময় পেছন থেকে আগত প্রশ্নে টনক নড়ল আমার। বিস্ময় নিয়ে পাল্টা জিজ্ঞেস করলাম,
------ "আরে নিত্য আপু তুমি! আজ এতো জলদি জলদি ভার্সিটি থেকে ফিরলে কিভাবে?"
বিছানায় বসতে বসতে বলল নিত্য আপু,
------ "আজ তেমন ক্লাস ছিলো না। প্রাকটিক্যাল কিছু টাস্ক দেখিয়ে ছেড়ে দিয়েছে। তা বললে না তো কোথায় যাচ্ছ?"
------ "ওহ, আমরা নিহান ভাইদের বাসায় যাচ্ছি। ভাবলাম তুমি আজও আসতে দেরি করবে তাই তোমায় ছাড়াই যেতে হবে। আজ তাড়াতাড়ি এসে খুব ভালো করেছ। এখন চটপট রেডি হয়ে নাও তো। আমরা একটু পরই বের হবো।"
------ "সেকি নিহানদের ওখানে! হঠাৎ দাওয়াত করল যে?"
আমি ব্যস্ত ভঙ্গিতে মুখে ফেইস পাউডার লাগাতে লাগাতে জবাব দিলাম,
------ "তা তো জানিনা। তবে জারা বলল সুখবর আছে। নিশ্চয় ভালো কিছু ঘটেছে বলেই দাওয়াত করেছে। এখন আর দেরি করো না তো আপু, যাও ভাইয়ারা চলে এলো বলে।"
নিত্য আপুর মুখটা মুহুর্তেই বদলে গেল। আগ্রহী গলায় জিজ্ঞেস করল,
------ "ভাইয়ারা মানে? রুশো ভাইরাও কি যাচ্ছে?"
নিত্য আপুর ভেতরে কি চলছে তা আন্দাজ করতে পেরে দুষ্টু হেসে বললাম আমি,
------ "হ্যাঁ যাচ্ছে তো। সাথে সময়টাকে আরেকটু আনন্দময় করতে তোমার ভূমিকম্পও যাচ্ছে।"
------ "যাহ দুষ্টু মেয়ে!"
কথাটা লাজুক গলায় বলে মুখ লুকিয়ে পালাল নিত্য আপু। নিত্য আপুকে এভাবে গাল লাল করে পালাতে দেখে হেসে ফেললাম আমি। মন দিলাম আবারও তৈরি হয়ে নেওয়ার ব্যস্ততায়। নীবিড় ওয়াশরুমে শাওয়ার নিচ্ছিলেন। খানিক বাদে বের হলেন দরজা ঠেলে। দরজা খোলার শব্দে মুখ তুলে তাকালাম আমি। উনার উন্মুক্ত বুক, পিঠ দেখে চোখ দুটো বড়বড় হয়ে এলো আমার। সর্বনাশ করেছে! এভাবে কেউ খালি গায়ে ওয়াশরুম থেকে বের হয় নাকি? ঘরে যে একটা মেয়ে মানুষ আছে তা কি উনি জানেন না? নীবিড় টাওয়েল দিয়ে মাথা মুছতে মুছতে আমার কাছাকাছি এসে দাঁড়ালেন। জ্ঞানশূন্য আমি বোকার মতো পলকহীন চেয়েই রইলাম উনার পানে। আমায় এভাবে তাকিয়ে থাকতে দেখে ভ্রু নাচালেন উনি। ভেজা চুলগুলোয় হাত ডুবিয়ে বললেন,
------ "ওভাবে কি দেখছে মেয়েটা?"
আমি তৎক্ষণাৎ চোখ নামিয়ে নিলাম। শুকনো ঢোক গিলে নিজ মনেই নিজেকে গালি দিয়ে চললাম লাগাতার। দিন দিন কেমন যেনো অসভ্য হয়ে যাচ্ছি! এভাবে হ্যাংলার মতো কেউ তাকায় থাকে নাকি? কিন্তু আমারই বা কি দোষ? উনি ওভাবে আমার সামনে এলেন কেন? ঢেকেঢুকে আসা যেত না?
------ "বিড়বিড় করে কি বলছ অনন্যা? লুক এট মি, এদিকে তাকাও!"
আমি চোখ ছোট ছোট করে কিঞ্চিৎ মুখ ঘোরালাম। নীবিড়ের ঠোঁটে বাঁকা হাসি। মাত্রই শাওয়ার নিয়েছেন বলে ঠোঁটদুটো আরো লাল দেখাচ্ছে। উনার সুঠাম বুক বেয়ে জল গড়িয়ে পড়ছে ফোঁটায় ফোঁটায়। আমি চোখমুখ কুঁচকে জবাব দিলাম,
------ "জামা কাপড় ঠিকঠাক করে পরেন না কেনো বলুন তো? যান, শার্ট-গেঞ্জি যাই হোক পরে নিন। জলদি! এভাবে আমার সামনে একদম আসবেন না।"
------ "কেন? উন্মুক্ত বুকটা দেখতে কি খুব বেশি খারাপ লাগছে? নাকি উল্টোটা?"
উনার এমন শীতল কণ্ঠে কেঁপে উঠলাম আমি। গায়ের লোমগুলো দাঁড়িয়ে গেলো শিহরণে। উফফ এই মানুষটা বোঝানে না কেন উনাকে এভাবে দেখলে মাথা কাজ করেনা আমার? ইচ্ছে হয় ঝাপটে ধরি মুহুর্তেই। কিন্তু না এখন তো তা করা যাবে না। উনার এই ঝামেলাগুলো শেষ হোক, তারপরই একটা স্পেশাল সময় ঠিক করে উনাকে চমকে দেব আমি। আমি গলাটা ঝেড়ে নিয়ে উনার পানে তাকালাম। উনি পলকহীন চেয়েই ছিলেন আমার মুখপানে। আমায় লজ্জায় লাল হয়ে যাওয়া মুখটা দেখে ঠোঁটের কোণ প্রসারিত করলেন। মুখটা আরেকটু কাছে নিয়ে এসে ফিসফিসিয়ে বললেম,
------ "এতো লজ্জা পাচ্ছ কেন? আমি তো আমার বউয়ের সামনেই খালি গায়ে দাঁড়িয়েছি অন্য কোনো মেয়ের সামনে নয়।"
আমি সরু চোখে তাকালাম উনার পানে। খানিকটা ঝাঁজ নিয়ে বললাম,
------ "ওয়েট, অন্য কোনো মেয়ের প্রসঙ্গ উঠছে কেন এখানে?"
নীবিড় ফিক করে হেসে ফেললেন। গাঢ় কন্ঠটা নামিয়ে জিজ্ঞেস করলেন,
------ "আজকাল বড্ড জেলাস ফিল করতে শুরু করেছ দেখছি! ব্যাপার কি? বাই এনি চান্স তুমি আমার প্রেমে ট্রেমে পড়ে যাওনি তো?"
"হ্যাঁ পড়েছিই তো। ভয়ানক প্রেমে পড়েছি আপনার! যেই প্রেম থেকে বেঁচে ফেরার বিন্দুমাত্র সুযোগটুকু নেই।" কথাটা মনে মনে বললেও মুখে বললাম,
------ "ইহহ, মোটেও না। আপনি আমার হাজবেন্ড সো অন্য কোনো মেয়ের সাথে আপনাকে আমার পছন্দ হবে না তা স্বাভাবিক। এখন সরুন তো আমায় রেডি হতে দিন।"
নীবিড় আবারও মুচকি হাসলেন তবে সরলেন না। চেয়ার থেকে টাওয়েলটা নিয়ে হঠাৎই আমার চুলগুলো মুছতে শুরু করলেন।
------ "আরে আরে কি করছেন?"
------ "শাট আপ অনন্যা! এতো বড় হয়েছ অথচ এখনও চুল মুছতে শিখলেনা। পিঠ অর্ধেক ভিজে গিয়েছে যে সেদিকে খেয়াল রেখেছ?"
আমি ঠোঁট উলটে বললাম,
------ "চুল মুছতে ভালো লাগেনা। অলসতা ভর করে।"
নীবিড় ভ্রু কুঁচকে বললেন,
------ "তোমার দ্বারা এর থেকে বেশি কি আশা করা যায়? অলসতার ওপর যে পিএইচডি করে ফেলেছ তা খুব ভালোই জানা আছে আমার। আর হেয়ার ড্রায়ার ইউজ করতে কি হয় তোমার?"
গাল ফুলিয়ে বললাম আমি,
------ "ভালো লাগে না। ঠান্ডাঠুন্ডা মাথাটাকে একদম গরমাগরম বানিয়ে ফেলে। ঘুরেফিরে যেই লাউ সেই কদুই! গোসল করে লাভ কি হলো?"
নীবিড় হতাশ চোখে তাকালেন। জানেন আমার সাথে কথায় পারবেন না। যার দরুন ছোট্ট করে শ্বাস ফেলে আমার চুলগুলো মুছে দেওয়ার কাজে ডুব দিলেন আবারও।
------ "যাহ শালা, ভুল টাইমে এন্ট্রি মারছি!"
------ "ওত্তেরি! দাঁড়ায় দাঁড়ায় কি দেখছ ব্রো, পাতলি গালি সে নিকাল লো!"
দুটি পুরুষালি কন্ঠ থেকে বাক্যদুটো কানে পৌঁছতেই সতর্ক হয়ে পেছন ফিরে তাকালাম আমরা। অগ্নি ভাইয়া, রুশো ভাইয়া দৌড়ে পালাতে পা বাড়িয়েছিল সবে তবে তাদের পালাতে না দিয়ে উঁচু গলায় বললেন নীবিড়,
------ "এখানেও নটাংকি! মার না খেতে চাইলে চুপচাপ ঘরে আয় দুটোয়। আমি তোদের মতো খুললাম খুললাম কিছু করিনা ভুলে যাস না।"
ভাইয়াদের মুখ মুহুর্তেই কদুমার্কা হয়ে গেলো। গাল ফুলিয়ে বলল রুশো ভাইয়া,
------ "ব্রো, মেইনে কুছ নেহি কিয়া।"
------ "ঠিক! তুমনে কুছ নেহি কিয়া মাগার বহুত কুছ কিয়া।"
নীবিড়ের মুখে রুশো ভাইয়ার স্টাইলে হিন্দি শুনে চোখ কপালে তুললাম আমি। অগ্নি ভাইয়া এসে উনার পিঠে ধাক্কা মেরে বলল,
------ "চাল যা, মেরে যেইসা তো কই নেহি কিয়া!"
------ "ইতনা মাত উড়ো অগ্নি ব্রো, তুমহারা কারনা কিছিনে নেহি দেখা মাগার ম্যাইনে দেখ লিয়া!"
রুশো ভাইয়ার কথার বিনিময়ে ধমকে উঠল অগ্নি ভাই,
------ "আবে এ, মু ফার দুংগা তেরা। চুপ কার!"
------ "আহ থামবে তোমরা? কিসব আধভাঙা হিন্দি বলে ভাষার হাত-পা ভেঙে দিচ্ছ! আমাদের তো একটা জায়গায় যেতে হবে। নয় কি?"
রুশো ভাইয়া-অগ্নি ভাইয়া থামল। তারপর নীবিড়কে এখনও খালি গায়ে দেখে ঠোঁট উল্টে বলল রুশো ভাই,
------ "আচ্ছা আমরা তো রেডি কিন্তু নীবিড় ব্রো এখনও খোলামেলা হয়ে আছ কেন?"
নীবিড়কে বলতে না দিয়ে বললাম আমি,
------ "ওহ তোমাদের বলা হয়নি, উনি আমাদের সাথে যাচ্ছেন না। কাল থেকে উনার এক্সাম শুরু। একদমই টাইম ওয়েস্ট করা যাবেনা, বোঝই তো ফাইনাল এক্সাম বলে কথা।"
মুখটা দুঃখী দুঃখী করে বলল রুশো ভাই,
------ "তাও ঠিক! ব্রো তোমাকে খুব মিস করব আমরা।"
------ "আই'ল মিস ইউ টু গাইস। আচ্ছা বাকিরা কই? রাত্রি আসেনি এখনও?"
নীবিড়ের কথাটা বলার প্রায় সাথেসাথেই দ্রুত পায়ে ঘরে এলো নিত্য আপু, রাত্রি। এসেই চেঁচিয়ে বলল,
------ "আমরা রেডি!"
------ "ভেরি গুড, যেতে লাগ তবে। আর অগ্নি, আজ আমি থাকছি না সো সবাইকে দেখে রাখার দায়িত্ব তোর।"
------ "আর ব্রো আমার কি দায়িত্ব?"
রুশো ভাইয়ার আগ্রহী গলায় করা প্রশ্নের বিনিময়ে নাকটা টেনে দিয়ে বললেন নীবিড়,
------ "আপাতত নিজের নাকটাকে যত্ন রাখ তাতেই চলবে।"
রুশো ভাইয়া ঠোঁট উল্টে বোকার মতো নিজের নাকটায় নিজেই আদর করতে লাগল। সবাই যখন ঘর ছেড়ে বের হলো তখন সর্বশেষে ঘর ছেড়ে বের হতে লাগলাম আমি। বের হওয়ার পূর্বে আরেকবার ফিরে তাকালাম অপলক চেয়ে থাকা মানুষটার পানে। দু'হাত ভাঁজ করে দেয়ালে হেলান দিয়ে ঠিক আমার যাওয়ায় পানেই চেয়ে ছিলেন উনি। আমি ফিরে তাকাতেই শীতল গলায় বললেন,
------ "সাবধানে যেও! আর চিন্তা করো না, দাদীমাকে আমি সামলে নেব।"
আমিও হেসে পলক ঝাপটে সম্মতি দিলাম। বের হলাম নিহান ভাইয়ের বাড়ির উদ্দেশ্যে। প্রায় ২০ মিনিটের মাথায় পৌঁছলাম নির্দিষ্ট গন্তব্যে। রাস্তায় ফলমূল, মিষ্টি-সন্দেশ কেনায় কিছু সময় বেশি লেগেছিল। আমারা পৌঁছতেই আতিথেয়তায় ব্যস্ত হয়ে পড়ল জারা-নিহান ভাই। বলে রাখা ভালো বাড়িটায় এখনও কোনো সার্ভেন্ট রাখা হয়নি। তবে ওরা দু'জন একা থাকে না। নিহান ভাইয়ের এক ছোট ভাই থাকে, সে এখন বাসায় নেই প্রাইভেটে গিয়েছে।
------ "তা কি মনে করে এতো আয়োজন?"
------ "এই তোমরা কি লুকিয়ে বিয়ে টিয়ে করে ফেলেছ?"
পাশ থেকে কথার মাঝখানে বেগড়া দেওয়ায় অগ্নিদৃষ্টিতে তাকালাম আমি। রাত্রির হাতে চিমটি বসিয়ে দিয়ে মুখে জোরপূর্বক হাসি ফুটিয়ে বললাম,
------ "আব ওর কথায় কিছু মনে করো না। ও মজা করছে।"
জারা-নিহান ভাই দু'জনেই হাসল। জারা মিষ্টি গলায় বলল,
------ "রাত্রির তারমানে বিয়ে করার খুব শখ হয়েছে যা বুঝলাম।"
রাত্রি এবার মুখ লাল করে প্রসঙ্গ পাল্টাতে উদ্যত হলো। জারার আবারও হেসে বলল,
------ "হাহাহা মেয়ে লজ্জা পেয়েছে। আচ্ছা যাই হোক, যেই সুসংবাদটা দেওয়ার জন্য তোমাদের ডেকেছি তা হচ্ছে নিহানের আরপিএম কোম্পানির জবটা হয়ে গেছে।"
আমরা বিস্ময়ে একে-অপরের দিকে চেয়ে একসাথে বলে উঠলাম,
------ "সত্যিই!"
------ "হ্যাঁ সত্যি! এতোদিন টিউশনি করিয়ে ইনকাম করতাম যদিও। তবু অনেক টানাপোড়েনের মুখে পড়তে হতো। বিশেষ করে এই বাড়িটা কেনার জন্য অনেক খাটতে হয়েছে। আল্লাহর রহমতে জবটা হওয়ায় অনেক সুবিধা হলো।"
------ "আলহামদুলিল্লাহ, তা নিহান আমরা তো ব্যাচমেটই হবো। তুমি করেই বলছি।"
অগ্নি ভাইয়ার বলা কথাটায় স্মিথ হেসে বললেন নিহান ভাই,
------ "হ্যাঁ হ্যাঁ অবশ্যই। আর ও তোমার ছোট ভাই? অনার্স ফার্স্ট না সেকেন্ড ইয়ার?"
রুশো ভাইয়া আহত দৃষ্টিতে তাকাল কথাটা শুনে। চোখমুখ উলটে বলল,
------ "হে উপারওয়ালে আমাকে দেখে কি এতই ছোট মনে হয়? এই যে লেগপিস, তোমার জান্টুশকে মেন্টস খাইয়ে সবার পরিচয় দিয়েছ অথচ আমার পরিচয়টাই দাও নি। এই বিচার কি মানা যায়?"
রুশো ভাইয়ার কথায় নিহান ভাই ব্যতীত সকলেই হু হা করে হেসে উঠলাম। জারা হাসতে হাসতে বলল,
------ "নিহান, রুশো উইএস থেকে অনার্স কমপ্লিট করে এসেছে। ও এতোটাও বাচ্চা নয়।"
নিহান ভাই অবিশ্বাসের দৃষ্টিতে তাকাল। অবাক কণ্ঠে বলল,
------ "রিয়েলি!"
এবার ভাব দেখিয়ে বলে উঠল রাত্রি,
------ "আজ্ঞে হ্যাঁ নিহান ভাইয়া, ক'দিন বাদে আমরা বিয়ে করতে যাচ্ছি। ব্যাস বাসায় ওর প্রস্তাব পাঠানো বাকি।"
------ "ওহ মাই গড, হি লুকস সো ইয়াং!"
রুশো ভাই এবার যেন একটু হাওয়ায় উড়ল। কোটের কলার ঠিক করে গর্বের সহিত বলল,
------ "হাহ! নট অনলি ইয়াং আই এম দ্য কিউটেস্ট গাই ইউ নো?"
আবারও একপ্রকার হাসির রোল পড়ে গেল আড্ডামহলে। হাসি ঠাট্টার মাঝেই নিহান ভাই অগ্নি ভাইয়ার পাশে বসল। গলার স্বর বেশ নামিয়ে বলল,
------ "অগ্নি, আমি জানি তুমি এখন জারার সাথে সহজ ভাবে বিহেভ করছ। কিন্তু ও একটা সময় তোমার সাথে অন্যায় করেছে। ও কেন করেছে, কেন খারাপ পথে গিয়েছিল তার সবটা নিশ্চয় তোমার জানা। তবু আমি ওর হয়ে তোমার কাছে ক্ষমা চাইছি।"
নিহান ভাইয়ের কথার মাঝেই বলে উঠল জারা,
------ "নিহান তুমি কেন ক্ষমা চাইছ? তোমার তো কোনো দোষ ছিল না। আমি ভুল করেছি, আমি দোষী। ভাইয়া, আমায় মাফ করে দেবেন প্লিজ। আমি আসলে তখন একটা বাজে সময়ের ভেতর দিয়ে যাচ্ছিলাম। কি করছিলাম নিজেই বুঝছিলাম না। আমায় ওপর কোনো রকম রাগ বা ক্ষোভ নিয়ে থাকবেন না প্লিজ।"
------ "আরে আরে কি শুরু করলে তোমরা? আমি তোমাদের ওপর রেগে থাকতে যাব কেন? আয়ু যেদিন আমায় তোমাদের পাস্ট সম্পর্কে সব খুলে বলল সেদিনই আমি তোমায় মাফ করে দিয়েছি জারা। এমন হয়, মানুষ মাত্রই ভুল। তুমি প্লিজ আর সরি বলে পুরোনো কথা মনে করিও না। আমরা এনজয় করতে এসেছি রাইট? আর তোমরা দাওয়াত করেছ জেনে তো আমি দুপুর থেকে খাই'ই নি। একদম জমিয়ে খাব বলে পেটের কূয়ার সমান জায়গা রেখে এসেছি।"
অগ্নি ভাইয়ার এমন বন্ধুসুলভ আচরণে প্রাপ্তির হাসি ফুটে উঠল জারা-নিহান ভাইয়ের মুখে। জারা যে অগ্নি ভাইয়াকে সরি বলতে না পেরে কতটা অস্থিরতায় ভুগছিল তা তার পূর্ব মুখভঙ্গি দেখেই বুঝেছিলাম আমি। ইশশ মেয়েটার এই সৎ ছবিটা কত অন্ধকারের মাঝেই না হারিয়ে ছিল। জারার মুখে এখন তৃপ্তির হাসি দেখা যায়। সেই হাসিতে কোনো স্বার্থ নেই। চোখে কোনো লোভ নেই, নেই মনে কোনো অহংকার। সত্যিই "ভালোবাসা" ছোট্ট একটা শব্দ মাত্র হলেও পুরো পৃথিবীকে বদলে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে।
_______________________________________
আড্ডার মাঝে খাওয়া-দাওয়ার পর্ব শুরু হলো। আমরা সকলেই যথারীতি খেতে বসলাম। জারা রান্না টুকটাক পারে। নিহান ভাই অবশ্য এদিক থেকে বেশ এগিয়ে। ছেলে হয়েও দারুণ রান্না করতে পারেন। রান্নার প্রশংসায় একেকজন পঞ্চমুখ হলাম আমরা। রাত্রি আর অগ্নি ভাইয়া খেয়েদেয়ে পেট ফুলিয়ে ফেলেছে। আপাতত তারা উঠে হাঁটাচলা করার পর্যায়ে নেই। নিত্য আপু অগ্নি ভাইয়ার এমন রাক্ষুসে ভাবে খাবার অপরাধে মুখ ফুলিয়ে আছে। বাগানে গিয়ে একটু আলাদা সময় কাটাবে তার জন্য টেনেটুনেও অগ্নি ভাইয়াকে উঠাতে পারেনি। এদিকে রুশো ভাইয়া গালে হাত রেখে বসে। রাত্রিকে এমন গোলুমোলু অবস্থায় দেখে বেচারার বড়ই দুঃখ হচ্ছে। মাঝেমাঝে চাচ্ছে তাকে কোলে উঠিয়ে পৃথিবী ভ্রমণ করাতে আবার পরমুহূর্তেই মনে পড়ছে রাত্রি ৫৫ কেজি। ওকে তুলতে গেলে পশ্চাৎ ফেটে গিয়ে কেলেংকারী ঘটে যাবে।
আমার ভাবনার মাঝে কলিং বেল বেজে উঠল। জারা আমাদের বসতে বলে উঠল দরজা খোলার জন্য। সবার চোখেমুখেই "কে এলো" এই প্রশ্নের উত্তর সম্পর্কে কৌতূহল ছেয়ে এলো। কারণ এ বাড়িতে ঘটা করে আমাদের না ডাকলে অন্য কেউ আসার সম্ভাবনা একেবারেই শূণ্য। জারা দরজা খুলে দিতেই ছিঁটকে সরে এলো। জারার এমন আকস্মিক স্থান পরিবর্তনে চমকে দাঁড়িয়ে পড়লাম আমরা। দরজার ওপারে দাঁড়িয়ে থাকা ব্যক্তিদের দেখে অবাক ভাবটা বেড়ে গেল বহুগুণ। মিস্টার এবং মিসেস খন্দকার দাঁড়িয়ে, সাথে তাদের দু'জন গার্ড। মিসেস খন্দকার মেয়েকে দেখেই চোখের পানি ছেড়ে দিলেন। ভেজা গলায় বললেন,
------ "তুই এতদিন আমাদের থেকে লুকিয়ে ছিলি কেন রে মা? তোর বাবা কথা না হোক অন্তত আমার কথাটা একবারও মনে পড়ল না?"
জারা উত্তর দিলো না। দৌড়ে গিয়ে চেপে ধরল নিহান ভাইয়ের হাত। মিস্টার খন্দকার এসব দেখে রেগে আগুন হয়ে বললেন,
------ "জারা, জাস্ট লিভ হিম। আমরা তোমাকে নিতে এসেছি। কাম উইথ আস!"
------ "নো ড্যাড, আমি ওকে ছেড়ে তোমাদের সাথে যাবো না। কিছুতেই না।"
মিস্টার খন্দকার অবাক হলেন মেয়ের এমন পরিবর্তন দেখে। তবু দমলেন না। পূর্বের তুলনায় আরো তেজি গলায় বললেন,
------ "ভুলে যেও না আমরা তোমার প্যারেন্টস! আমায় একশন নিতে বাধ্য করো না জারা।"
------ "একশন! রিয়েলি মিস্টার খন্দকার আপনি একশন নিতে চাইছেন? মেয়েকে ফিরিয়ে নিতে আজ সেই বাবা একশন নিতে চাইছে যেই বাবা মেয়ে জেলে এক সপ্তাহ ধরে নেই তার খবর'টুকুও জানত না। ব্যাপারটা হাস্যকর নয় কি?"
আমার কথার পরিপ্রেক্ষিতে একে একে উপস্থিত সকলকেই খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখলেন মিস্টার খন্দকার। তারপর কটমটে চাহনি নিক্ষেপ করে বললেন,
------ "ওহ, তারমানে এসব আগে থেকে প্ল্যান করা! দেন আই ওয়াজ রাইট। তোমরা আমাদের মেয়েকে লুকিয়ে রেখে একটা বাজে ছেলের সাথে জড়িয়েছ। তোমরা ভাবতে পারছ আমি যদি পুলিশে ফোন করি তবে ঠিক কি হতে পারে?"
------ "বেশিকিছু হবে না আংকেল। ব্যাস মাঝথেকে আপনার বিএম এর নিউজটা লিক হয়ে যাবে। আর তারপর কি হতে পারে তা নিশ্চয় আপনার জানা।"
উপরোক্ত কথাটা দরজার ওপার থেকে ভেসে এলো হঠাৎ। আমরা সকলেই চমকে সেই কথার মালিকের পানে তাকালাম। ফুল ব্ল্যাক আউটফিট। শার্ট-প্যান্টস, তারওপর ব্ল্যাক লেদারের জ্যাকেট। চোখে ব্ল্যাক সানগ্লাসেস। সিল্কি চুলগুলোর কিছু কপালে পড়ে আছে। ঠোঁটে সেই চিরচেনা বাঁকা হাসি। দু'হাত পকেটে গুঁজে রিয়েল লাইফের হিরোর মতো হেঁটে ভেতরে এলেন নীবিড়। গ্লাসেস খুলে মারাত্মক এক কিলার লুক দিলেন। উনাকে এখানে এই সময় আবিষ্কার করে বুকের ওপর চেপে রাখা পাথরটা যেনো মুহুর্তেই নেমে গেল আমার। আমার মতো মিস্টার এবং মিসেস খন্দকার বাদে বাকিদের ঠোঁটেও প্রশান্তির হাসি ফুটে উঠল। পেছন থেকে রুশো ভাইয়া বলে উঠল,
------ "ওয়াট এন এন্টি ব্রো! আহা কি লুক! আমি যদি মেয়ে হতাম তবে ডিফেনটলি ছুটকির আগে তোমায় পটিয়ে ফেলতাম।"
ঠোঁটের কোণ প্রসারিত করে বললেন নীবিড়,
------ "এই জন্যেই উপরওয়ালা তোমায় মেয়ে বানায় নি রুশো।"
রুশো ভাইয়া বোকার মতো হেসে চুপ করে গেল। মিস্টার খন্দকারের সামনে নীবিড় যখন হাত ভাঁজ করে দাঁড়ালেন তখনই শুকনো ঢোক গিললেন ভদ্রলোক। আমতা-আমতা করে বললেন,
------ "কি...কিসব বলছ তুমি নীবিড়? দেখো আজেবাজে কথা বলবে না এখন। আ..আমরা আমাদের মেয়েকে নিতে এসেছি। ওকে নিয়েই চলে যাব ব্যাস।"
নীবিড় মিস্টার খন্দকারের ভয়ে মাখা মুখটা যেনো খুব করে উপভোগ করলেন। তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে বললেন,
------ "দেখুন আংকেল, আমরা আপনার মেয়েকে আটকে রাখার মতো কেউ নই। আপনার মেয়ে নিজ ইচ্ছায় নিহানকে বেছে নিয়েছে। আর বলে রাখা ভালো নিহানই সেই ছেলে যেই ছেলের সাথে সম্পর্ক মেনে না নিয়ে আপনি এই আমাকেই বিয়ে করার জন্য জারাকে ফোর্স করেছিলেন।"
মিস্টার খন্দকারের চোখমুখে ঘামের অস্তিত্ব দেখা গেল। মিসেস খন্দকার আগ বাড়িয়ে বললেন,
------ "মানে কি এসবের? জারা কোনো ছেলেকে পছন্দ করত? কই আমি তো এ বিষয়ে কিছু জানিনা।"
------ "সহজ হিসাব। আপনাকে জানানো হয়নি বলেই আপনি জানেন না। কি আংকেল, এম আই রাইট?"
নীবিড়ের শীতল গলায় বলা একেকটা কথা সূঁচের মতো বিঁধতে থাকত মিস্টার খন্দকারের বুকে। পারেন না সবকিছু তছনছ করে ফেলেন। তিনি কৌশলে প্রসঙ্গ বদলাবার জন্য বললেন,
------ "দেখো নীবিড়, জারা কবে কাকে পছন্দ করত তা কোনো ফ্যাক্ট নয়। আমার মেয়ে যথেষ্ট এডুকেটেড, স্মার্ট। ওর সাথে এই ছেলের যায় না।"
------ "চোখে চশমা আর গায়ে সাধারণ পোশাক দেখেই আপনি জাজ করে ফেললেন ছেলে আনস্মার্ট, আনএডুকেইটেড? বাহ, মিস্টার খন্দকার বাহ! আপনাকে আংকেল বলে ডাকতেও না রুচিতে বাঁধছে আমার।"
------ "নীবিড় তুমি কিন্তু এবার আমায় ইনসাল্ট করছ। আমি তোমার বাবার বয়সী ভুলে যেও না।"
নীবিড় শব্দ করে হাসলেন এবার। বাম সাইডের ভ্রু উঁচু করে ঠোঁট বাঁকিয়ে বললেন,
------ "এখন কেউ যদি স্বইচ্ছায় অপমানিত হতে চায় তাহলে আমার কি করার বলুন? দেখুন মিস্টার খন্দকার, আমি চাইনা আপনাকে অপমান করতে। বাট আপনি আমায় বাধ্য করছেন। জাস্ট লুক এট জারা। যেই জারার আপনাকে দেখে বুকে ঝাঁপিয়ে পড়ার কথা সেই জারা আপনাকে দেখে ভয়ে দূরে সরে যাচ্ছে। কারণ সে জানে আপনি ওকে সুখে থাকতে দেবেন না। সুখের নামে টাকা দেখিয়ে বেঁধে রাখবেন। আর মজার ব্যাপার হলো আপনি নিজেই জানেন না কিভাবে সুখে বেঁচে থাকতে হয়। আপনি এই দুনিয়ায় শুধু টাকাই চিনে এসেছেন। টাকা থাকলেই সব ঠিক আর টাকা না থাকলেই সব শেষ! না, আমি বলছিনা টাকা ছাড়া জীবন চলে। জীবনে চলার পথে টাকা দরকার কিন্তু তাই বলে জীবনের লক্ষ্য একমাত্র টাকা নয়। এইযে আন্টির চোখে আপনার জন্য ভয়, আপনার বাধ্য হয়ে চলার তাড়না এসব ভালোবাসার অংশ নয়। আন্টিকে আপনি নিজের দাপটের ওপর রেখেছেন। মেয়েটার জীবনও নিজ হাতে শেষ করে দিয়েছেন। আমার মা আমায় কথা দিয়ে গেছে আপনাদের তো দেয়নি। আপনারা যদি আমার সাথে জারার মতের বিরুদ্ধে গিয়ে বিয়ে ঠিক না করতেন তবে জল এতদূর গড়াত না। না আপনার মেয়ে তার ভালোবাসার মানুষটাকে হারিয়ে বাজে পর্যায়ে যেত আর না জেল খাটত। আর এই এতকিছু হয়ে যাবার পর, আপনার মেয়ে আজ আপনাকেই ভয় পাচ্ছে। বাবা নামক যে ছায়ার কাছে মেয়েরা সবথেকে নিরাপদ আজ সেই ছায়ার থেকেই দূরে পালাচ্ছে। তবু আপনি নিজের ভুলগুলো উপলব্ধি করতে পারছেন। একের পর এক অপরাধ করেই যাচ্ছেন। কেন মিস্টার খন্দকার? হোয়াই?"
নীবিড় থামলেন শ্বাস নেবার জন্য। পুরো বাড়ি উনার চিৎকারে নিস্তব্ধ হয়ে রইল। শুধু শোনা গেল নীবিড়ের ঘন ঘন শ্বাস ফেলার আওয়াজ। উনার চোখদুটো লাল বর্ণ ধারণ করেছে। উত্তেজিত হয়ে যাওয়ায় ঘেমে চুলগুলো ভিজে গিয়েছে। আমি উনার কাছে ছুটে গিয়ে দাঁড়ালাম। উনার ডান হাতটা শক্ত করে মুঠোয় নিয়ে মৃদু গলায় বললাম,
------ "শান্ত হন প্লিজ। এতটা উত্তেজিত হবেন না।"
নীবিড় পলক ঝাপটে বললেন,
------ "আমি ঠিক আছে অনন্যা। চিন্তা করো না।"
মিসেস খন্দকার হু হু কেঁদে উঠলেন এবার। কাঁদতে কাঁদতে হেঁচকি তুলে ফেললেন এক পর্যায়ে। নিত্য আপু গিয়ে উনার কাঁধে হাত রাখলেন। ভদ্রমহিলা স্বামীর উদ্দেশ্যে বললেন,
------ "অনেক সহ্য করেছি জারার বাবা। আর নয়, আমি আমার মেয়ের পাশে আছি। ও যাকে ভালোবাসে তার সাথেই ওর বিয়ে দেব আমি। তুমি আমায় আটকাতে পারবে না।"
কথাটা বলেই ভদ্রমহিলা জারার কাছে গেলেন। মমতার হাত বাড়িয়ে বললেন,
------ "তোর মা কাজের ব্যস্ততায় তোকে একদম সময় দিতে পারেনি রে। আমায় ক্ষমা না করতে পারিস একটাবার বুকে আসবি?"
জারা নিজেকে ধরে রাখতে পারল না আর। মা'র বুকে ঝাঁপিয়ে পড়ে সেও নোনাজল ছেড়ে দিল চোখের। মিস্টার খন্দকার সবটা দেখে চুপ করে রইলেন। একটা পর্যায়ে বলার মতো কিছুই খুঁজে পেলেন না। নিজের করা ভুলগুলোর জন্য এতোটাই অনুতপ্ত হলেন যে বল ছেড়ে ধপ করে মেঝেতে হাটু গেড়ে বসে পড়লেন। জারা মা'কে ছেড়ে দৌড়ে এলো বাবার কাছে। বাবার পাশে বসে অশ্রুসিক্ত চোখে চেয়ে বলল,
------ "ড্যাড, তুমি আগে কি করেছ না করেছ তা আমি মনে রাখতে চাইনা। আমি চাই আমার পরিপূর্ণ একটা পরিবার। আমি নিহানকে খুব ভালোবাসি ড্যাড। ওকে ছাড়া আমি থাকতে পারব না। এতগুলো বছর পর ওকে পেয়ে আমি আর হারাতে পারব না ড্যাড, ট্রাস্ট মি আই জাস্ট কান্ট!"
মিস্টার খন্দকার কাঁপাকাঁপা হাতটা মাথায় রাখলেন মেয়ের। ভাঙাভাঙা গলায় বললেন,
------ "এ জীবনে অনেক অন্যায় করে ফেলেছি আমি। আমি ক্ষমা যোগ্য নই! মাই ডিয়ার প্রিন্সেস, তুমি নিহানকে যখন এতটাই ভালোবাসো তবে তোমার পছন্দেই সব হবে। আমি আমার ভুলগুলো শুধরে নিতে চাই।"
জারা সহ আমরা সকলেই অবাক দৃষ্টিতে তাকালাম। জারারা উৎসুক গলায় বলল,
------ "ড্যাড তুমি সত্যি আমাদের মেনে নিচ্ছ?"
------ "ইয়েস মাই ডটার। আমি সত্যিই তোমাদের মেনে নিচ্ছি। তুমি কষ্ট করে নিহানের ফ্যামির সাথে আমাদের কন্টাক্টটা করিয়ে দেও।"
মুহুর্তেই ঘরে এক প্রকার উৎসব ছেঁয়ে গেল। জারা-নিহান ভাই নিজেদের ঠিকানা খুঁজে পেয়ে প্রাপ্তির হাসি হাসল। নীবিড় মিস্টার খন্দকারের মনটাকে আরেকটু সহজ করতে বললেন,
------ "আপনার এই সিদ্ধান্তের জন্যে আমি আবারও আপনাকে আংকেল ডাকছি। আর ছেলেকে নিয়ে সন্দেহে ভুগবেন না। নিহান একজন সৎ ছেলে, ও চাইলেই এতদিনে আপনাদের না জানিয়ে জারাকে বিয়ে করে ফেলতে পারত। কিন্তু ও তা করেনি। একই বাড়িতে থেকেও দু'জন আলাদা ঘরে থেকেছে। এমন ছেলে সহজে পাওয়া যায় না। এমন জামাই পাচ্ছেন, তার জন্য মন খুলে হাসুন। আর হ্যাঁ আপনার ওই ধান্দাটা বন্ধ করার সিদ্ধান্তটাও যতদ্রুত সম্ভব নিন। ইউ নো না ক্রাইম ইজ ক্রাইম? এখানে মাফের কিছু নেই।"
মিস্টার খন্দকার হাল্কা করে মাথা ঝাঁকিয়ে সম্মতি জানালেন। আমি নীবিড়ের পানে কৃতজ্ঞতার চোখে তাকালাম। উনার স্নিগ্ধ মুখখানায় একরাশ মুগ্ধতা খুঁজে পেয়ে বললাম,
------ "আপনি কি ম্যাজিক জানেন? যখনই কোনো খারাপ সময় আসে তখনই টুপ করে কিভাবে হাজির হন বলুন তো।"
------ "হ্যাঁ জানি তো। ছোটবেলায় বাবার সাথে জেদ দেখিয়ে যখন নামের সঠিক বানান বদলে "নিবিড়" থেকে "নীবিড়" করেছিলাম ঠিক তখনই থেকেই।"
#চলবে___________
[ আজ অনেক দেরি হয়ে গেল তাইনা? দুঃখিত! মা জননী বোম্ব হয়ে গিয়েছিল। আর বোম্ব ফাটুক কেউই নিশ্চয় চায়না। তাই আমিও বোম্ব ফাটার হয়ে বিরতি নিয়েছিলাম। ]