#প্রেম_আমার♥(সিজন-টু)
#পর্ব-৭৮♥
#আয়ানা_জাহান_নুসরাত♥
----- "এমনটা না করলে কি হতো না?"
নীবিড় উত্তর দিলেন না। আগের মতোই কপালে ভাঁজ রেখে পায়ের পোড়া জায়গায় আলতো করে অ্যান্টিসেপটিক মলম লাগিয়ে চললেন। উনি আমার পা ধরায় বেশ অস্বস্তিতে ভুগতে হচ্ছে আমায়। প্রথমে যখন পা ধরে তাতে ঠান্ডা পানি ঢালছিলেন তখনও বলেছিলাম পা স্পর্শ করার দরকার নেই। কিন্তু উনি তো উনিই। নিজের মন যা চাইবে তাই করবেন, অন্যের কথা শোনায় এলার্জি আছে কি-না।
----- "দেখুন, আমি মানছি দাদীমা আমার সাথে একটু রুড বিহেভ করেছেন কিন্তু তাই বলে উনাকে এভাবে চলে যেতে বলাটা বাড়াবাড়ি হয়ে গেল না?
নীবিড় আমার পায়ে মলম লাগানো হয়ে এলে উঠে পাশে বসলেন। গম্ভীর কণ্ঠে বললেন,
----- "কোনটা ঠিক কোনটা ভুল তা অন্তত আমায় বোঝানোর প্রয়োজন নেই। আর যদি লিমিটের কথা বলে থাকো তবে তা সবার আগে ক্রস করেছেন উনি।"
আমি উনার গম্ভীর গলায় কথাটা শুনে আবারও শুকনো ঢোক গিললাম। ভুলক্রমে কেটে যাওয়া আঙুলটায় ভর রাখতেই ব্যাথায় কুঁকড়ে উঠলাম। যার দরুন মুখ ফসকে বের হলো মৃদু চিৎকার, "আহহহ!"
নীবিড় ব্যস্ত ভঙ্গিতে তাকালেন আমার পানে। আমি দ্রুত ওড়নার নিচে হাতটা লুকোতে গিয়েও ব্যর্থ হলাম। নীবিড় ঝট করে ডান হাতটা টেনে নিজের কোলের ওপর রাখলেন। বৃদ্ধা আঙুলে ব্যান্ডেজ করা দেখে সাথেসাথেই কোনো প্রতিক্রিয়া দেখালেন না। কিছুক্ষণ চুপ থেকে নিজের রাগটাকে নিয়ন্ত্রণে এনে বললেন,
----- "হাতও কেটেছ দেখছি! তা এতক্ষণ লুকিয়ে রেখেছিলে কেন?"
ভয়ার্ত গলায় আধভাঙ্গা বুলি আওড়ালাম আমি,
----- "আব..লুকিয়ে রাখার কি আছে? আমি তো ব্যান্ডেজ করেই নিয়েছি। যে অল্প একটু কেটে গেছে, এ কোনো ব্যাপারই না!"
নীবিড় এবার সরাসরি চোখের দিকে তাকালেন আমার। আমি শ্বাস আটকে ধরলাম তৎক্ষণাৎ। উনার জ্বলন্ত চোখদুটো দেখে আত্মা কেঁপে উঠল আবারও। আমার জবাবে বিন্দুমাত্রও সন্তুষ্ট না হওয়ায় জোরালো গলায় উনি বললেন,
------ "এরপরেও তুমি বলছ আমি বাড়াবাড়ি করেছি? হাত কেটে গেছে, পা পুড়ে গেছে, নিজের চেহারার দিকে তাকিয়েছ একবার? যে তোমায় আমি এক মুহুর্তের জন্যও বাবার বাড়ি-শ্বশুর বাড়ির মাঝে কোনো পার্থক্য বুঝতে দেই না, সেই তোমার অবস্থাটা উনি এই দু'দিনে কি করেছে দেখেছ?"
------ "আপনি প্লিজ শান্ত হন। আপনি আমায় ভুল বুঝছেন। দেখুন, সংসারে এমন ছোটখাটো এক্সিডেন্ট সবারই কম-বেশি হয়ে থাকে। প্রথম প্রথম রান্না শিখতে গেলে এমন হওয়াটা স্বাভাবিক। এখানে দাদীমার তো কোনো দোষ নেই। সব বউয়েরাই রান্নাবান্না করে। এখন আমায় আপনি রান্না করতে না দিলে সেটা তো দাদীমার দোষ নয়।"
------ "ওহ রিয়েলি? তোমার কি মনে হয় শুধুমাত্র তোমায় রান্না করতে পাঠিয়েছে বলে এতটা রিয়্যাক্ট করছি আমি?"
আমি চোখমুখ কুঁচকে জবাব দিলাম,
------ "আর কিসের জন্য? রুড বিহেভ করেছে সেজন্য?"
নীবিড় ঝড়ের গতিতে আমার গা ঘেঁষে বসলেন। দু'হাতে আমার দু'বাহু শক্ত করে চেপে ধরে বললেন,
------ "উনি তোমায় প্রথম থেকেই পছন্দ করতেন না অনন্যা। যেহেতু উনি জানেন বিয়েটা হুট করে হয়ে গেছে, তেমন কোনো কাজ পারোনা তুমি সেহেতু উনার উচিত ছিল প্রথমেই তোমায় জাজ না করা। কিন্তু উনি তাই করলেন। শুধু এখানেই নয়, তুমি রান্না জানো না জেনেও তোমায় এই ক্লান্ত শরীরে রান্না করতে পাঠালেন। মাছ কাটতে গিয়ে হাত কেটে ফেলেছ, প্যান পায়ে ফেলে পা'টা পুড়িয়ে ফেলেছ এসব দেখেও উনার সব চিন্তা শুধুমাত্র রান্না নিয়ে। এতকিছুর পরও তুমি আমায় বলছ আমার এমনটা করা ঠিক হয়নি? হাহ? উনি নিজের নাতবউয়ের সাথে এমন আচরণ করছেন না জানি আমার মা বেঁচে থাকতে তার সাথে কতটা বাজে ব্যবহার করেছেন! আচ্ছা অনন্যা, আজ যদি তোমার জায়গায় আমি থাকতাম তুমি কি পারতে আমার সাথে হওয়া অন্যায়গুলো মুখ বুজে সহ্য করতে?"
আমি নীবিড়ের চোখে স্পষ্ট নোনাজল দেখতে পেলাম। অতিরিক্ত রেগে যাওয়ায় চোখদুটো যেনো জ্বলছে উনার। আমি জবাব দেওয়ার মতো কোনো শব্দই খুঁজে পেলাম না। আর না পারলাম উনার চোখ থেকে নজর সরাতে। নীবিড় হঠাৎ করেই আমার বাহু ছেড়ে দিয়ে দাঁড়িয়ে পরলেন। মুখটা অন্যদিকে ফিরিয়ে তাচ্ছিল্যের হাসি ফুটিয়ে বললন,
------ "ওহ, আমি ভুলেই গিয়েছিলাম। তুমি তো আর আমায় ভালোবাসো না। তোমার জায়গায় আমি থাকলে হয়তো তোমার কোনো যায়ও আসত না। কিন্তু আমার যায় আসে। তোমার কোনো কষ্ট আমি সহ্য করতে পারিনা। এখন তোমার যদি মনে হয় আমি বাড়াবাড়ি করছি তবে তাই।"
কথাটা বলেই বড়বড় ধাপ ফেলে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গেলেন উনি। বের হবার আগে দরজাটা এমনভাবে চাপিয়ে দিয়ে গেলেন যার দরুন প্রকাণ্ড এক শব্দ হলো। আমি আবারও কেঁপে উঠলাম। চোখ বেয়ে নিজের অজান্তেই বেরিয়ে গেল দু'ফোঁটা নোনাজল। নীবিড় বেরিয়ে যাবার পর আমি একইভাবে বসে রইলাম সেই জায়গায়। বিন্দুমাত্র নড়চড় করলাম না। একটা সময় নিত্য আপু নিঃশব্দে ঘরে এসে ডাকল আমায়,
------ "অনন্যা?"
আমি দ্রুত চোখ মুছে মুখে হাসি ফুটিয়ে পেছন ফিরে তাকালাম। উঠে দাঁড়াতে উদ্যত হতেই ব্যস্ত গলায় হাত দেখিয়ে বলল আপু,
------ "এই এই উঠিও না। বসে থাকো, আমি আসছি।"
আমি মুচকি হেসে আবারও বসলাম। নিত্য আপু এসেই আমার পা উল্টেপাল্টে দেখল। দাঁতে দাঁত চেপে আফসোসের সুরে "শ" এর মতো লম্বা আওয়াজ করে বলল,
------ "কানে হেডফোন ঢুকিয়ে রেখেছিলাম আর এদিকে এতকিছু হয়ে গেল! এখন কি খুব জ্বালা করছে অনন্যা?"
------ "নাহ, আগের থেকে জ্বালা কমেছে অনেকটা।"
কথাটা বলেই কিছু মনে পড়ার ভান করে আবারও বললাম আমি,
------ "আচ্ছা আপু, দাদীমা কোথায়?"
নিত্য আপুর মুখটা অন্ধকার দেখাল। ফুস করে শ্বাস ফেলে বলল,
------ "দাদীমা চলে গেছে অনন্যা।"
"দাদীমা চলে গেছেন" একথা শোনা মাত্রই বুকটা ধক করে উঠল আমার। ভেজা গলায় বললাম আমি,
------ "তোমরা আটকানোর চেষ্টা করো নি?"
------ "করেছি কিন্তু দাদীমা শোনেন নি।"
আমি আশাহত হয়ে চুপ করে রইলাম। ভেতরে ভেতরে একদিকে যেমন নীবিড়ের জন্য খারাপ লাগা কাজ করছে আরেকদিকে খারাপ লাগা কাজ করছে দাদীমার চলে যাওয়ার জন্য। নিত্য আপু হয়তো আমার ভেতরের অবস্থাটা বুঝল। আমায় সান্ত্বনা দেওয়ার জন্য পাশে বসে কাঁধে হাত রাখল। নরম গলায় বলল,
------ "মন খারাপ করো না অনন্যা। যা হওয়ার ছিল তাই হয়েছে। তাছাড়া দাদীমা যা করেছে তা মোটেও ভালো করেনি। এমন একটা সিচুয়েশন ক্রিয়েট হওয়া খুবই স্বাভাবিক ছিল।"
আমি মিথ্যে হাসিতে ঠোঁটের কোণ প্রসারিত করলাম। নিত্য আপু উঠতে উঠতে বলল আবার,
------ "আচ্ছা শোনো, এখন বেশি হাঁটা চলা করো না। শুয়ে থাকো। কোনো কিছু প্রয়োজন হলে আমায় বলো। আর ভাইয়া তো আছেই। মনে হয়না ঘটা করে আমায় ডাকতে হবে তোমার।"
আমি মাথাটা হাল্কা করে নাড়িয়ে সম্মতি জানালাম। নিত্য আপু ঘর ছেড়ে বের হতে নিয়েছিল এমন সময় নীবিড় ঘরে ঢুকলেন। এক হাতে প্লেট আরেক হাতে পানি ভর্তি গ্লাস নিয়ে। নিত্য আপুকে দেখেই প্রশ্ন ছুড়লেন,
------ "এখানে কি করছিস তুই? যা, খেতে যা।"
নিত্য আপু অবাক হওয়ার ভান করে উল্টো প্রশ্ন ছুড়ল,
------ "খাবো? রান্না কে করল?"
------ "অর্ডার করে আনিয়েছি। এতো পকপক না করে যা, ফুপ্পি ডাকছে তোকে।"
------ "কিন্তু অনন্যা?"
নীবিড় বিরক্ত চোখে তাকালেন। হাতে থাকা প্লেটটা দেখিয়ে বললেন,
------ "ওকে নিয়ে তোর ভাবতে হবে না। আমি আছি ওকে নিয়ে ভাবার জন্য।"
নিত্য আপু যেতে যেতে কুনুই দিয়ে হাল্কা করে ধাক্কা দিল নীবিড় ভাইয়ার পিঠে। অন্যমনস্ক ভঙ্গিমায় সুর তুলে বলল,
------ "ভাইটা আমার ভোলাভালা,
প্রেমের জ্বালে ফেঁসে,
বউ ছাড়া কিছু বোঝে না
একি হলো শেষে?"
------ "নিত্য তুই যাবি?"
নীবিড়ের পাল্টা ধমকে দৌড়ে হাসতে হাসতে পালাল নিত্য আপু। আমি জিহ্ব দিয়ে ঠোঁট ভিজিয়ে নিলাম। নীবিড় প্লেটের ঢাকনা সরিয়ে পাশে রাখল। তাতে আমার পছন্দের পোলাও আর মুরগীর রোস্ট। খুব যত্ন করে হাতে খাবারের এক লোকমা উঠিয়ে মুখের সামনে ধরলেন আমার। গম্ভীর গলায় বললেন,
------ "হা করো।"
আমি বাধ্য মেয়ের মতো হা করলাম। তবে দূর্ভাগ্যবশত খাবারের সাথে সাথে কামড় বসিয়ে দিলাম উনার হাতেও। নীবিড় ধীর গলায় "আউ" করে উঠলেন। আমি তৎক্ষণাৎ খাবারটুকু গিলে নিয়ে জিহ্ব কামড়ে ধরে বললাম,
------ "আব...সরি সরি আমি ইচ্ছে করে কামড় দেইনি। অন্যমনস্ক ছিলাম তাই বুঝতে পারিনি।"
নীবিড় আর কিছু বললেন না। বুঝতে পেরেছেন এমন ভঙ্গি করে আবারও খাইয়ে দিতে লাগলেন। আমিও একের পর এক লোকমা গিলতে লাগলাম। খাওয়ার এক পর্যায়ে বলে উঠলাম,
------ "আপনি খাচ্ছেন না কেন? শুধু আমায় খাইয়ে চলছেন যে?"
নীবিড় আমার দিকে পানি এগিয়ে দিয়ে বললেন,
------ "আমি খেয়ে নেব তোমার আমায় নিয়ে ভাবতে হবে না।"
কথাটায় বড্ড রাগ হলো আমার। পরেরবার যখন মুখে খাবার তুলে ধরলেন ঠিক তক্ষুণি স্ব-ইচ্ছায় কামড় বসিয়ে দিলাম উনার হাতে। নীবিড় গুঙিয়ে উঠলেন মৃদুস্বরে। হাত ঝাড়তে ঝাড়তে বললেন,
------ "আহহ, কি শুরু করেছ? তোমার দাঁতে অনেক ধার, ব্যথা লাগছে তো!"
------ "আমার এই ধারালো দাঁতের কামড় যদি আর খেতে না চান তবে নিজেও চটপট খাওয়া শুরু করুন। নয়তো যত বারই আমায় খাওয়াতে আসবেন ততবারই খাবারের বদলে কামড় খাবেন।"
নীবিড় এলোমেলো দৃষ্টিতে তাকালেনা আমার পানে। এক মুহুর্তের জন্য এতক্ষণের মন খারাপের কারণগুলো সাইডে রেখে দাঁত কেলালাম আমি। নীবিড় আমার সাথে পেরে না উঠে ছোট্ট করে শ্বাস ফেলে কিঞ্চিৎ ঠোঁটের কোণ প্রসারিত করলেন। বাধ্য হয়ে নিজের পেটেও খাবার চালান করতে লাগলেন। কিছুটা খেয়ে যখন আমার সামনে আবারও এক লোকমা খাবার নিয়ে এলেন তখন দুষ্টু হেসে খাওয়ার পর বা'হাতে উনার হাতটা খপ করে চেপে ধরলাম আমি। নীবিড় চমকালেন। উনার চমকানোর মাত্রাটা আরো কিছু বাড়িয়ে উনার হাতে ছোট্ট ছোট্ট করে পাঁচ-ছয়টার মতো চুমু এঁকে দিলাম আমি। নীবিড় অবাকের ওপর অবাক হয়ে চললেন। চোখদুটো যেনো এই কোটর থেকে বেরিয়ে হাতে চলে আসবে উনার। আমি দুষ্টু হেসে উনাকে কোনো প্রশ্ন করতে না দিয়েই বলে উঠলাম,
------ "আই নো ইটস উইয়ার্ড বাট রোস্টটা এককথায় অসাধারণ ছিলো। পেট ভরে গেছে তাই আর খেতে পারলাম না। পারলে আপনার হাত'টাই চেটে খেয়ে নিতাম কিন্তু তা তো সম্ভব নয় তাই চুমু খেয়েই ক্ষান্ত থাকলাম। কিছু মনে করবেন না কেমন?"
নীবিড়ের প্রশ্নমাখা বেকুব টাইপ ফেইস দেখে চরম রকমের হাসি পেল আমার। বহু কষ্টে হাসিটাকে পেটেই চেপে রাখলাম৷ নীবিড় কি করবেন ভেবে না পেয়ে চুপচাপ খাওয়ায় মন দিলেন। যা বুঝলাম তাতে উনি যতই লুচু টাইপ বিহেভ করুক, আমি যদি লুচি হয়ে যাই তবে বেচারা লুচু থেকে লজ্জিত লিচু হতে বাধ্য।
_____________________________________
পেরিয়েছে কুড়িটা দিন। এই কুড়িটা দিন খুব সাধারণ ভাবেই কেটেছে আমার। ফুপ্পি-নিরু কিছুদিন থেকে চলে গেছেন। যাওয়ার আগে ফুপ্পি খুব করে দোয়া দিয়ে গেছেন আমায়। আমার পা'য়ের পোড়া ক্ষতটাও সেরে এসেছে। হাতও তিন'দিনের মাঝেই ঠিক হয়ে গেছিল। ভাইয়াদের এ বিষয়ে বলি নি। বলিনি রাত্রিকেও। রাত্রিকে বলা মানেই রুশো ভাইয়ার কানে যাওয়া, আর রুশো ভাইয়ার কানে যাওয়া মানেই পুরো দুনিয়া ফেটে যাওয়া। যার দুটোর একটাও চাইছিলাম না আমি। এই কুড়িটা দিন আমার খুব স্বাভাবিক ভাবে গেলেও স্বাভাবিক ভাবে যায়নি নীবিড়ের। মানুষটা পুরোটা সময় হয় পড়া নয়তো প্রাকটিসের ওপর থেকেছেন। এতোটা হার্ডওয়ার্ক করেছেন যা দেখে নিজেকে নিতান্তই বলদ মনে হচ্ছে আমার। মনে শুধু একটাই প্রশ্ন জাগছে, "ভাউ, কি করলাম জীবনে?" আর উত্তর বরাবরের মতো কুসুম ছাড়া আন্ডা। যেই আন্ডা ঘোড়ার আন্ডা না হয়ে হাতির আন্ডা হওয়ার যোগ্যতা রাখে। কারণ ঘোড়ার আন্ডার থেকে হাতির হান্ডা বড় হবে, আর বড় একটা আন্ডা অথচ শুধুই লবডঙ্কা হলে আমার জীবনের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হবে। আমি ফুস করে শ্বাস ফেলে দোলনা থেকে নেমে দাঁড়ালাম। আজ নীবিড়ের শেষ পরীক্ষা। বাড়ি ফিরবেন খানিক বাদেই। আমাদের এখন ছুটি চলছে। এই ছুটিকে কাজে লাগিয়ে কথা আছে আগামীদিনই রাত্রিদের বাসায় বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে যাব। এখন মেয়ে সঙ্গে করে প্রস্তাব নিয়ে যাওয়া ব্যাপারটা একটু উদ্ভট হয়ে যাচ্ছে বিধায় রাত্রি আগে ভাগেই নওগাঁ চলে গেছে। রুশো ভাইয়া এই সময় বসে নেই অবশ্য। সারাদিন কেয়ারলেসের মতো ঘুরে বেড়ানো স্বভাব বদলে নিজের যত্ন নিতে শুরু করেছে, এখন এক ঘন্টার আগে রুশো ভাইয়াকে ওয়াশরুম থেকে বের করাই যায়না।
আমার ভাবনার মাঝে পাশ থেকে "ভাউউ" করে উঠল কেউ। আমি ভয় পেলাম না ঠিকই তবে একটু চমকালাম। নিত্য আপু আমায় ভয় পাওয়াতে ব্যর্থ হয়ে সামনে এসে মুখ ফুলিয়ে বলল,
------ "ধুর, কোথায় ভাবলাম গগনফাটা চিৎকার দিয়ে ধপাস করে পড়ে যাবে তা না!"
আমি ফিক করে হেসে বললাম,
------ "আমার চিৎকারে গগন ফেটে গেলে তো সমস্যা। তাই আর ভয় পাওয়া হলো না।"
নিত্য আপু ডান ভ্রু'টা উঁচু করে কাঁধে হাল্কা করে চাপড় মেরে বলল,
------ "ওউহ! স্মার্ট গার্ল, হাহ!"
আমি আবারও হাসলাম। নিত্য আপুর হাতে লম্বা একটা লিস্ট দেখে ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করলাম,
------ "নিত্য আপু, তোমার হাতে কি ওটা? কিসের লিস্ট?"
------ "ওহ এটা? এটা শপিং এর লিস্ট। ক'দিন পর খুব কেনাকাটা করতে হবে কি-না!"
------ "কেনাকাটা? কিসের জন্য? কোনো অকেশন আছে নাকি?"
নিত্য আপু খানিকটা অবাক হওয়ার ভান করে বলল,
------ "সেকি তুমি জানো না কম্পিটিশনের পরের দিনই ভাইয়ার জন্মদিন?
আমি যেন ধারাম করে আকাশ থেকে পড়লাম। মুখটা ফ্যাকাশে হয়ে এলো বেদনায়। দুঃখী দুঃখী গলায় বললাম,
------ "তুমি এখন এসে কেন বললে? আগে বলো নি কেন? আমায় তো কেউ জানায়ও নি।"
নিত্য আপু বোকাবোকা ফেইস বানিয়ে বলল,
------ "ওমা বলিনি তোমাকে? আচ্ছা আচ্ছা সরি। এখন তো বলেছি। এখনও অনেক সময় আছে জন্মদিনের। এর মাঝে কোনো প্ল্যান থাকলে কাজে লেগে পড়।"
আমি কিছুক্ষণ চুপ থেকে হঠাৎই চোখমুখ উজ্জ্বল করে বললাম,
------ "আহ কি শোনালে গো আপু! আমি না এমনই একটা স্পেশাল দিনের খোঁজে ছিলাম। এসব ঝামেলা শেষ হয়ে গেল উনাকে কাঙ্ক্ষিত সারপ্রাইজটা দেব বলেই দিন গুনছিলাম।"
------ "বাব্বাহ তা কি সারপ্রাইজ দেবে শুনি?"
আমি লাজুক হেসে বললাম,
------ "তা নাহয় উনাকেই আগে দেই তারপর তোমাদের বলব।"
নিত্য আপু আমার গাল টেনে দিয়ে মিষ্টি করে হাসল। দেখতে দেখতেই বিকেল গড়িয়ে পড়ল। নীবিড়ের অপেক্ষার প্রহর শেষ হলো। নীবিড় বাসায় এসেই আমাদের এক চমৎকার হাসি উপহার দিয়ে শাওয়ার নিতে ঢুকলেন। মানুষটা ভীষণ ক্লান্ত হয়ে গেছেন। ঘেমে শার্টটা গায়ের সাথে লেগে গিয়েছিল একদম। নীবিড় শাওয়ার সেরে বের হতেই হট চকলেটের মগ উনার দিকে এগিয়ে দিলাম আমি। নীবিড় চমকালেন। ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করলেন,
------ "হট চকলেট! কে বানিয়েছে?"
এমন পঁচা একখানা রিয়াকশন দেওয়ায় গাল ফুলিয়ে অভিমানী গলায় বললাম আমি,
------ "আমি থাকতে অন্য কেউ বানাতে যাবে কেন?
নীবিড় মগটা হাতে নিয়ে বিশ্বাস করতে পারছেন না এমন ভাব নিয়ে বললেন,
------ "সিরিয়াসলি তুমি বানিয়েছ?"
------ "তা নয়তো কি? ভূত?"
নীবিড় মগে চুমুক বসালেন। আমি অধীর আগ্রহে উনার দিকে চেয়েছিলান। উনার ভ্রু জোড়া নিজেদের মাঝখানের দূরত্ব বাড়িয়ে যখন ঠোঁটে হাসি ফুটিয়ে তুলল তখনই খুশিতে চোখদুটো চিক চিক করে উঠল আমার। নীবিড় আরো এক চুমুক খেয়ে উচ্ছ্বাসিত গলায় বললেন,
------ "ওহ মাই গড! অনন্যা, ইটস টু গুড! উফফ, কিভাবে বানালে?"
------ "কিভাবে আবার ইউটিউব মামার দেখানো পথ দেখে।"
নীবিড় আয়েশ করে হট চকলেট খেতে খেতে বললেন,
------ "ইয়াম্মি, জাস্ট ফাটাফাটি হয়েছে! তা আমার বউ তো দেখি আজকাল বেশ রাঁধুনি হয়ে যাচ্ছে! ব্যাপার কি হ্যাঁ?"
নাক ফুলিয়ে বললাম আমি,
------ "দেখুন এবার কিন্তু একটু বেশি বেশি হয়ে যাচ্ছে। এসব চা,কফি,হট চকলেট বানিয়ে না কেউ রাঁধুনি হয়ে যায় না। আমি রান্নাবান্নায় ভীষণ কাঁচা, একথা সত্যি।"
নীবিড় হাসলেন। পুরোটা হট চকলেট পেটে চালান করে বললেন,
------ "টুকটাক যা করছ এই অনেক। ধীরেধীরে শিখে যাবে। এক্সাম তো ভালোয় ভালোয় শেষ হলো, শুধু কম্পিটিশনটা যাক তারপর একসাথে রান্নাঘর দখল করব কেমন?"
উনার কথায় শব্দ করে হাসলাম আমি। আমাদের কথার মাঝে কোথায় থেকে যেনো হুড়মুড়িয়ে ঘরে ঢুকলো রুশো ভাইয়া। এসেই ব্যস্ত গলায় বলল,
------ "ব্রো ব্রো ব্রো, আই এম ইন ডেঞ্জার। হেল্প মি ব্রো!"
আমি-নীবিড় দু'জনেই মুখ বিকৃত করে একে-অপরের দিকে তাকালাম। নীবিড় ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করলেন,
------ "রুশো তুমি এভাবে এলে যে? কি হেল্প চাইছ? কি বিপদে পড়েছ?"
গলায় দুঃখী দুঃখী ভাব এনে বলল রুশো ভাইয়া,
------ "ব্রো, এটম বোম্ব বলেছে আমার এই ফ্ল্যাট টামিতে এবস আই মিন মাসল দেখতে চায়। এখন আমি তো জিম টিম করিনা। এই ডেঞ্জার থেকে একমাত্র তুমিই আমায় উদ্ধার করতে পারবে ব্রো। এমন এক্সারসাইজ শিখাও যেটা করলে দু'দিনে এবস ভিজিবল হয়।"
নীবিড় হতভম্ব হয়ে রুশো ভাইয়ার আবদার খানা হজম করার চেষ্টা চালালেন। সান্ত্বনা স্বরূপ বললেন পরে,
------ "ইয়ে মানে রুশো, তুমি এবস ভিজিবল করতে চাইছ ভালো কথা বাট উইথইন টু ডেইস তো পসিবল নয়। বাট আমি তোমায় সবথেকে দ্রুত এবস ভিজিবল করার ওয়ার্ক আউট দেখাতে পারি।"
------ "ওকে ব্রো, তাই দেখাও। আমি অক্ষরে অক্ষরে তোমার দেখানো প্রত্যেকটা ওয়ার্ক আউট ফলো করব। এমন হার্ড ওয়ার্ক করবো যেনো আমায় কেউ মারতে এলে সেই উল্টে ব্যাথা পেয়ে অজ্ঞান হয়ে যায়।"
নীবিড়-আমি একে-অপরের দিকে আবারও হতভম্ব তাকালাম। পরমুহূর্তেই হতভম্ব ভাবটা কেটে গেল। দু'জনেই ফিক করে হেসে ফেলে একটা সময় ঘর কাঁপিয়ে হাসতে লাগলাম। রুশো ভাইয়া ঠোঁট উলটে ডাগরডাগর চোখ করে আমাদের হাসির কারণ উদ্ধার করার চেষ্টা চালাল। অবশেষে ব্যর্থ হয়ে মাথা চুল্কে বলল,
------ "ইয়ে তুমলোগ হাসতে কিউ হো রে বাবা?
মেইনে কেয়া কুছ গালাত কাহা?"
#চলবে___________