#প্রেম_আমার♥(সিজন-টু)
#পর্ব-৭৯♥
#আয়ানা_জাহান_নুসরাত♥
আকাশটা আজ অনেকটা মেঘাচ্ছন্ন। সূয্যিমামার তেজ নেই বললেই চলে। এই কয়দিন খুব করে খেটে তাপ বিলিয়েছেন কি-না! এই স্নিগ্ধ পরিবেশে বহু সময় বাদে রাজশাহীর বাহিরে পা পড়ল আজ আমার। প্রায় চারটে ঘন্টার মতো লম্বা জার্নি শেষে পৌঁছলাম কাঙ্ক্ষিত গন্তব্যস্থান নওগাঁ-এ। নওগাঁর কাঁঠালতলীতে রাত্রিদের বাড়ি। সেখানে ওর বাবা, মা ছোট বোন থাকেন একসাথে। পড়াশোনার জন্য দূরে যেতে না হলে রাত্রিরও তাদের সাথে এখানেই থাকবার কথা ছিলো। আমার ভাগ্যটা ভালো বলে রাজশাহীর বাসিন্দা হয়ে রাজশাহী ভার্সিটিতেই টিকেছি। পরিবার থেকে দূরে থাকার কষ্টটা সেভাবে ভোগ করতে হয়নি।
আমরা গাড়ি থেকে নামলাম বেশ ক্লান্ত হয়ে। মাথাটা ভোঁ ভোঁ করে ঘুরছে আমার-অগ্নি ভাইয়ার। যতই জানালা দিয়ে কাল্লা বের করে পুরো রাস্তা আসিনা কেন, উল্টাউল্টি স্বভাব কি এতোটা সহজে পরিবর্তন করা যায়? আমাদের দু ভাই-বোনের নাজেহাল অবস্থা দেখে হেসে কুটিকুটি হলো রুশো ভাইয়া। পরমুহূর্তে হাসি থামিয়ে বলল,
------ "হেই গাইস, আই হ্যাভ এন আইডিয়া। তোমাদের উল্টি সিস্টেমকে চুটকি বাজিয়ে উল্টে দেওয়ার একটা জাবারদাস্ত প্ল্যান বের করেছি আমি।"
রুশো ভাইয়ার মুখে কথাটা শুনে চোখমুখ কুঁচকে রেখেই আগ্রহের সহিত জিজ্ঞেস করলাম আমি,
------ "কি প্ল্যান? বলো জলদি। প্রচুর ইয়াক মার্কা ফিলিংস আসছে ভাইয়া, কন্ট্রোল করা যাচ্ছেনা।"
বিনিময়ে রুশো ভাইয়া দুষ্টু হেসে দুটো লেবু দু'জনের সামনে ধরে বলল,
------ "দু'জনে লেবু দুটো নাক দিয়ে খেয়ে নে, উল্টি ভাব উল্টে গিয়ে একদম পৃথিবী ছেড়ে পালিয়ে যাবে।"
অগ্নি ভাইয়া-আমি একে-অপরের দিকে ব্ল্যাংক ফেইস বানিয়ে তাকালাম। অগ্নি ভাইয়া অনুভূতি শূণ্য হয়ে লেবু দুটো রুশো ভাইয়ার কাছেই ফেরত দিয়ে বলল,
------ "আর একটা বেকুবের মতো কথা বললে লেবু তোর পেছন দিয়ে ঢুকামু। তোর এটম বোম্বের আর ধলা ইন্দুরকে বিয়ে করা হবেনা!"
রুশো ভাইয়া চট করে লেবু দুটো নিয়ে আগের জায়গায় রাখল। "কিছুই হয়নি" এমন একটা ভাব নিয়ে হাসার চেষ্টা করে বলল,
------ "আহ ব্রো, হোয়াই সো সিরিয়াস? বিয়ের আগেই বিধবা বানাতে চাইছ কেনো এটম বোম্বকে? আমার পানিশমেন্ট কেনো ও ভোগ করবে, হুম? দ্যটস রিয়েলি নট ফেয়ার।"
অগ্নি ভাইয়া হাল্কা করে গুঁতো মেরে বলল রুশো ভাইয়াকে,
------ "আমি তোকে হাড়েহাড়ে চিনি চিকা মশাই। রাত্রির বিধবা হওয়ার ভয়ে কথাটা বলছিস নাকি রাত্রির নাম করে অজুহাত দিয়ে নিজের গা বাঁচাচ্ছিস তা খুব ভালো করে বোঝা হয়ে গেছে আমার।"
রুশো ভাইয়া কাঁদোকাঁদো মুখ করে লম্বা টান জুড়ে দিয়ে বলল,
------ "ব্রোওওও...!"
রুশো ভাইয়ার কাঁদোকাঁদো গলায় ছাড়া ডাকের বিনিময়ে কাঁধে চাপড় পড়ল। খালামুনি সুক্ষ্ম চোখে ছেলেকে দেখে বললেন,
------ " একটা সময়ের জন্য অন্তত বাঁদর থেকে মানুষ হ রুশো! মেয়ের বাড়িতে বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে এসেছি। ভদ্র ছেলের মতো চুপচাপ থাক।"
মায়ের ধমক খেয়ে ঠোঁটে আঙুল চেপে ধরল রুশো ভাইয়া। পেছনে থেকে বাড়ির বড়রা এলেন দই-মিষ্টি, ফলমূল হাতে। সবাই নেমে যাওয়ার পর নীবিড় গাড়ি ঘুরিয়ে নির্দিষ্ট স্থানে পার্ক করলেন। গাড়ির চাবি এক আঙুলে ঘোরাতে ঘোরাতে এসে জিজ্ঞেস করলেন,
------ "দাঁড়িয়ে আছ কেন তোমরা? এনিথিং রং?"
শুকনো মুখে জবাব দিলাম আমি,
------ " না না ঠিক আছি।"
নীবিড় কিঞ্চিৎ চিন্তা নিয়ে বললেন,
------ "তোমার আবার উল্টাপাল্টা প্রসেস শুরু হয়ে যায়নি তো? আসার সময় তো মেডিসিন খাইয়ে এনেছিলাম।"
কথাটা বলেই অগ্নি ভাইয়ার দিকে তাকালেন উনি। ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করলেন,
------ "শালাবাবু, আপনি ঠিক আছেন তো? নাকি এখনই উইকেট ডাউন?"
অগ্নি ভাই খুব কষ্টে একটু হাসার চেষ্টা করে বোকাবোকা গলায় বলল,
------ "ধুর ব্যাটা, ছেলেদের ফির এসব উল্টাউল্টি হয় নাকি? আমি টোটালি ফিট আছি। হুহ!"
নীবিড় চোখের দৃষ্টি আরো সুক্ষ্ম করে অগ্নি ভাইয়ার পা থেকে মাথা অবধি দেখে অবাক হওয়ার ভান করে বললেন,
------ "সর্বনাশ আমি তো তোকে এতদিন ছেলে ভেবে আমার বন্ধু হিসেবে মেনে এসেছি, ইভেন আমার বোনের সাথে এনগেজমেন্টেও করিয়ে ফেলেছি। তুই তাহলে ছেলে নস? তুই এতদিন ছদ্মবেশে ধারণ করে আমাদের এতবড় ধোঁকা দিতে পারলি?"
অগ্নি ভাইয়া কপট রাগ নিয়ে চেঁচিয়ে বলল,
------ "ওই কি বললি? কি বললি তুই? আমি মাইয়া? ব্যাটা, তুই তো মানুষই না তুই তো একটা বলদ!"
------ "আর তুই হইলি হাইব্রিড পাঠা। পাঠা মানেই তুই আবার তুই মানেই পাঠা।"
কথাটা বলেই ছুট লাগালেন নীবিড়। অগ্নি ভাই রাগে ফোণা তুলতে তুলতে পিছু নিলো নীবিড়ের। ভাইয়াদের এখানেও এসে এমন টম এন্ড জেরীর মতো ছোটাছুটি করতে দেখে হেসে ফেললাম আমরা সবাই। নিত্য আপু কপাল চাপড়ে ফুস করে শ্বাস ফেলে বলল,
------ "নাহ, এই দুটোকে নিয়ে আর পারা গেল না। দুনিয়া উলটে গেলেও এদের স্বভাব বদলাবে না। এই অনন্যা, রুশো ভাই, চলো তো সবাই ডাকছে।"
নিত্য আপুর কথার বিনিময়ে হাল্কা করে মাথা ঝাঁকিয়ে রাত্রিদের বাড়ির ভেতরে প্রবেশ করলাম আমরা। সাদামাটা, গোছানো পাকা বাড়ি রাত্রিদের। বাগানের দিকটায় আম গাছ আছে, পেয়ারা গাছ আছে সাথে আছে বেশকিছু ফুলের গাছও। বাড়িটা খুব বেশি বড় না হলেও অল্পের মধ্যেই যেনো সবকিছু কি দারুণ করে সাজিয়ে নেওয়া হয়েছে। ড্রয়িংরুমে সোফা সেট ফেলানো। তার কিছুটা দূরে ডাইনিং টেবিল আর তার পাশেই কিচেন। আংকেল আন্টি অর্থাৎ রাত্রির বাবা-মা পার্সোনালি আমায় আর আম্মু-আব্বুকেই যা চেনে। যার দরুন এতগুলো অপরিচিত মুখি দেখে খানিকটা চমকালেন বটে। হাসি মুখে সাদরে আপ্যায়ন করে বসতে বললেন সকলকে। বিনিময়ে হেসে নিজেদের আসন গ্রহণ করলাম আমরা। আমরা বসতে না বসতেই আন্টি উঠে পড়ে লাগলেন নাস্তার ব্যবস্থা করার জন্য। আন্টির এমন তাড়াহুড়ো দেখে আম্মু তাকে বাঁধা দিয়ে বললেন,
------ "আহা কি করছেন ভাবি? আমরা মাত্র জার্নি করে এলাম। এখনই মুখে কিছু তুলতে পারব না। আপনি ব্যস্ত হবেন না। সবার সাথে বসুন তো। আগে আলাপ সেরে নেই তারপর যা ইচ্ছে খাইয়েন।"
আন্টি একরাশ অস্বস্তি নিয়ে বসলেন। সকলের ওপর দ্বিধাভরা দৃষ্টি নিক্ষেপ করে প্রশ্ন ছুড়লেন,
------ "বেশ। কিন্তু ভাবি,আপনারা হঠাৎ পুরো পরিবার আমাদের এখানে এলেন যে? বিশেষ কোনো কারণ? বেড়াতে এসেছেন বলে তো মনে হচ্ছে না।"
আম্মু হেসে পলক ঝাপটে বললেন,
------ "ঠিকই আন্দাজ করেছেন, শুধু বেড়াতে আসিনি। বিশেষ এক উদ্দেশ্য আছে বৈকি! উদ্দেশ্যটা নাহয় গল্পে গল্পেই বলব। আসুন পরিচয় করিয়ে দেই সবার সাথে। ওইযে উনি হচ্ছেন আমার বোন রেহনুমা, উনার পাশে দুলাভাই, আর ও হচ্ছে রুশো আমার বোনের ছেলে।"
রুশো ভাইয়া উত্তেজনার ঠ্যালায় সালাম দিতে গিয়ে বলে ফেলল,
------ "আসকুমকুম আন্টি!"
কথাটা বলেই তৎক্ষণাৎ জিহ্ব কেটে বসল রশো ভাইয়া। আমরা চোখ বড়বড় করে তাকালাম রুশো ভাইয়ার এমন অযাচিত স্লিপ কাটার দরুন। খালামুনি ছেলের পানে চোখ গরম করে তাকালেন। আন্টি-আংকেল এমনধারা সালামের উত্তর কোনোরকমে দিতেই পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার উদ্দেশ্যে বললেন মা জননী,
------ "আব..ভাই-ভাবি, রুশো আসলে খুব এক্সাইটেড হয়েছিল তো তাই ভুল করে ওরকম বলে ফেলেছে। কিছু মনে করবেন না।"
খানিকটা হাসার চেষ্টা করে বললেন আন্টি,
------ "আরে না না ঠিক আছে। বুঝতে পেরেছি আমরা।"
আম্মু সহ মনে মনে স্বস্তির শ্বাস ফেললাম আমরাও। আম্মু কোনোরকমে ব্যাপারটা স্কিপ করে গিয়ে আমাদের একেক জনকে দেখিয়ে বলে চললেন,
------ "ও আমার ছেলে অগ্নি, অনন্যাকে তো আপনারা চেনেনই। নিশ্চয় শুনেছেন ওর বিয়ে হয়েছে। ওর পাশে ওইযে যাকে দেখছেন, ওর নাম নীবিড় আমার মেয়ের হাজবেন্ড। আর নীবিড়ের পাশে, নিত্য। ওরা দুই ভাই-বোন।"
আন্টি-আংকেল দু'জনের চোখই নীবিড়ের ওপরে আটকালো। বেশ উৎসুক দৃষ্টিতে চেয়ে গদগদকণ্ঠে বললেন আন্টি,
------ "আপনাদের সব ছেলে মেয়েই মা-শা-আল্লাহ! অনন্যার জামাই তো সাক্ষাৎ নায়কের মতো। কারো যেনো নজর না লাগে!"
আন্টির পর খানিকটা ভাবুক ভঙ্গিতে নীবিড়ের উদ্দেশ্যে বললেন আংকেল,
------ "আচ্ছা বাবা, তোমায় মুখটা কেনো যেনো বড্ড পরিচিত লাগছে। তোমায় কি কোথাও দেখেছি?"
আংকেলের প্রশ্নের বিপরীতে নীবিড়ের উত্তর দেওয়ার আগেই কোথা থেকে যেনো দৌড়ে এসে বলল রিমি,
------ "আরে আব্বু, তুমি সাদমান শাহরিয়ার নীবিড়কে চেনো না? বিডি বেস্ট ড্যান্সারের উইনার হয়েছিল যে? উনিই সেই নীবিড়!"
আংকেল-আন্টি দু'জনেই চরম অবাক হয়ে আরেকবার নীবিড়ের পানে তাকালেন। এমনভাবে সকলের কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে নজরে পড়ায় বেশ অস্বস্তিতে পড়তে হলো নীবিড়কে।
------ "সেকি! তুমিই সেই সাদমান?"
অস্বস্তিতে কুঁকড়েই হাসার চেষ্টা করে ছোট্ট করে বললেন নীবিড়,
------ "জ্বি আংকেল। আমিই সে।"
আংকেল-আন্টির চোখ দুটো যেনো চিকচিক করে উঠল। ভরাট গলায় বাবার উদ্দেশ্যে বললেন আংকেল,
------ "ভাই, জামাই হিসেবে হিরের টুকরো পেয়েছেন যে! সাদমানের মতো ছেলে হয়না। সে বহুদিন টেলিভিশনে চোখ রাখা হয়না তাই প্রথম দেখায় চিনতে পারছিলাম না। দিন দিন আরো সুন্দর যাচ্ছে দেখছি জামাই। বাহ মা-শা-আল্লাহ খুব ভালো।"
কথাটা বলেই আন্টিকে তাড়া দিয়ে বললেন আংকেল,
------ "আরে তুমি বসে রইলে কেনো? যাও যাও নাস্তার ব্যবস্থা করো। আর রাত্রি মা কোথায়? ওর বান্ধবী পুরো পরিবার নিয়ে এসেছে আর ওরই খবর নেই! এই রিমি, যা তো আপুকে ডেকে নিয়ে আয়।"
রিমি বাবার বাধ্য মেয়ের মতো মাথার ছোট্ট দুটো ঝুটি ঝাঁকিয়ে বলল,
------ "এক্ষুণি ডেকে আনছি আব্বু।"
রিমি দৌড়ে ঘরে গেল রাত্রিকে ডেকে আনতে। এদিকে আন্টিও কোনো মানা কথা না শুনেই ট্রে ভর্তি নাস্তা নিয়ে এলেন। আমি প্রথমেই এক গ্লাস পানি কয়েক ঢোকে গিলে ফেললাম। আহ, এখন অনেকটা ভালো লাগছে। গা গোলানো ভাবটা কমে এসেছে অনেকটাই। আন্টি আমাদের নাস্তা সার্ভ করা হয়ে এলেন হাত মুছে বসলেন। তার কিছু পরেই নিকটে কারো পদধ্বনি শোনা গেল। লাল টুকটুকে শাড়িতে মুড়িয়ে ফুটফুটে এক রমনীর আগমন হলো সভায়। পা'য়ে তার আলতা মাখানো। হাত ভর্তি লাল কাচের চুরি। মাথাটা আঁচল দিয়ে ঢাকা। কানে বড়বড় এক জোড়া ঝুমকো, গলায় হাড়, আর নাকে ছোট্ট একটা ফুল। সব মিলিয়ে বিয়ের আগেই যেনো নতুন বউয়ের রূপ ধারণ করেছে রাত্রি। আমরা যদিও ততটা অবাক হলাম না তাকে এই বেশে দেখে, তবে অবাকের পাল্লাটা ভারী হলো আংকেল-আন্টির। মেয়েকে এই সময় এই বেশে দেখে মাথাটা যেনো চক্কর মেরে উঠল দু'জনের। তাদের মুখে মশা-মাছি ঢোকার আয়োজন চলাকালীন সময়ে সকলকে সালাম জানিয়ে আসন গ্রহণ করল রাত্রি। মা-বাবার আড়ালে হবু জামাইয়ের দিকে চেয়ে দুষ্টু হেসে বাম চোখটা টিপে দিলো। রুশো ভাইয়ার বুকটা মুহুর্তে ধুপুস করে উঠল। ডান হাতটা অটোমেটিক্যালি চলে গেল বুকের বাম পাশে। বড়রা ব্যাপারটা লক্ষ্য না করলেও আমরা অতি চালাক বাচ্চাপার্টি তা ঠিকই ফ্রেমে বন্দী করে নিলাম। আমার পাশে অগ্নি ভাইয়া বসা ছিল। রুশো ভাইয়ার রাত্রিকে দেখে লাল টুকটুকে হয়ে যাওয়া মুখ দেখে ফিসফিসিয়ে বলল,
------ "ওই দেখ রাত্রির ধলা ইন্দুর কেমন টমেটো ইন্দুর হয়ে গেছে।"
কথাটা বলেই মুখ টিপে হাসল অগ্নি ভাই। আমরা আড়ালে আড়ালে সেই হাসির সাথে তাল মেলালাম। এই ফাঁকে আন্টি মৃদুস্বরে মেয়ের উদ্দেশ্যে প্রশ্ন ছুড়লেন,
------ "রাত্রি, তুই হঠাৎ বউ সেজে এলি কেনো?"
রাত্রি কোনো বনিতা না করে উত্তর দিলো,
------ "দু'দিন বাদে বউ তো হবোই, সাজ প্রাকটিস করতে ক্ষতি কিসের?"
আন্টি চোখ বড়বড় করে মেয়ের কথাটা হজম করার চেষ্টা চালালেন। আংকেল মা-মেয়ের গোপন আলাপনটা এড়িয়ে যেতে বড়দের উদ্দেশ্যে বললেন,
------ "তা ভাই-ভাবি, অনেক সময় তো হলো। এবার অন্তত বলুন এখানে আসার সেই বিশেষ উদ্দেশ্যটা!"
আম্মু চায়ের কাপ প্রিচে রাখতে রাখতে বললেন,
------ "ওহ হ্যাঁ যে জন্য এতো আয়োজন করে এলাম তা হলো, আপনার মেয়ের তো বিয়ের বয়স হয়েছে আমাদের বাড়ির ছেলেও বিয়ের উপযুক্ত হয়েছে। তো বলছিলাম, নিজেদের মাঝেই একটা সম্পর্ক গড়ে তুললে কেমন হয়? আপনাদের যদি কোনো আপত্তি না থাকে তবেই শুভ কাজটা সম্পন্ন করতে পারব।"
আংকেল-আন্টি অবাক হওয়ার পাশাপাশি আহামরি রকমের খুশিতে উচ্ছ্বাসিত হয়ে উঠলেন। আন্টি ভারী আহ্লাদ নিয়ে বললেন,
------ "কি বলেন ভাবি? আপনারা তারমানে রাত্রির জন্য বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে এসেছেন?"
আম্মু-আব্বু, খালু-খালামুনি সকলেই মাথা নাড়িয়ে সম্মতি জানালেন। আম্মু বাড়িয়ে বললেন,
------ "রাত্রির সম্পর্কে আমাদের নতুন করে কিছু জানার নেই। মেয়ে আগে থেকেই আমাদের খুব পছন্দের। ছেলেকে তো আপনারা আজই প্রথম দেখছেন। তো ভালোমতো দেখে বলুন ছেলে আপনার পছন্দ কি-না।"
আংকেল-আন্টি একে-অপরের দিকে চেয়ে চোখাচোখির মাঝেই নিজেদের মত বিনিময় করে নিলেন। তারপর খানিক বিরতি নিয়ে বললেন,
------ "আমাদের তো ছেলেকে অনেক ভালো লেগেছে। মা-শা-আল্লাহ লম্বাচওড়া! তা বাবা তুমি এখন কি করছ?"
আন্টির প্রশ্নটা আমাদের জন্য মোটেও বিস্ময়কর ছিলো না। আমাদের মাথায় ঠাডা পড়ল তখন যখন আন্টি প্রশ্নটা রুশো ভাইয়াকে নয়, করলেন অগ্নি ভাইয়াকে। অগ্নি ভাইয়া এমন আকস্মিক আক্রমণে থতমত খেয়ে গেল। আমতা-আমতা করে বলতে লাগল,
------ "মা...মা...মানে আমার ফাইনাল এক্সাম শেষ। এখনও কোনো জবে ট্রাই করিনি। কিন্তু আপনি আমার ক্যারিয়ার সম্পর্কে জিজ্ঞেস করছেন কেনো? পাত্র তো আমি না পাত্র তো ও!"
শেষের কথাটা রুশো ভাইয়ের দিকে আঙুল দেখিয়ে বলল অগ্নি ভাই। রুশো ভাইয়া পারে না এক্ষুণি কেঁদে ভাসিয়ে ফেলে পুরো বাড়ি। বেচারাকে এভাবে পাত্রের আসন থেকে নামিয়ে আমার এনগেজড ভাইকে বসিয়ে দেওয়া নিয়ে যেনো অভিযোগের ঝুলি ভর্তি করে ফেলেছে সে। রুশো ভাইয়া পাত্র কথাটা জেনে বড়সড় বিষম খেলে আংকেল। আম্মু দ্রুত ব্যাপারটা সামাল দেওয়ার উদ্দেশ্যে বললেন,
------ "আব ভাবি, আপনারা বোধহয় একটু ভুল বুঝে ফেলেছেন। আসলে রাত্রির সাথে অগ্নির নয়, রুশোর বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে এসেছি আমরা। আর অগ্নি তো অলরেডি এনগেজড, নিত্যর সাথে আর বিয়ে ঠিক হয়ে আছে।"
আন্টি-আংকেলের মুখ থেকে "অ্যাঁ" এর মতো আওয়াজ বেরোতে নিয়েও পেটে ফেরত গেল। গলার স্বর অনেকটা নামিয়ে হতভম্ব হয়ে বললেন আন্টি,
------ "তারমানে ওই ছেলে পাত্র! কিন্তু ও তো একটা বাচ্চাছেলে!"
আন্টির এই কথাটা বোধহয় রুশো ভাইয়ার হার্ট এট্যাক ঘটিয়ে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট ছিলো। রুশো ভাইয়া মুখটা পূর্বের থেকেও কাঁদোকাঁদো করে আমার পানে তাকাল। মিনমিন করে বলল,
------ "ছুটকি, এরা শেষমেশ আমায় বাচ্চা বানিয়ে দিলো রে!"
আমি স্পষ্ট কথাটা শুনতে না পেলেও রুশো ভাইয়ার ঠোঁটের নড়চড় দেখে ঠিকই বুঝতে পারলাম। পলক ঝাপটে সান্ত্বনা দিয়ে চুপ থাকতে বললাম কোনোরকম। নীবিড় ঘাড় চুলকে বিড়বিড় করে পাশ থেকে নিত্য আপুকে বললেন,
------ "হবু জামাইরে চোখেচোখে রাখ বোনটি, নয়তো এই পাঠারে যে কেউ নিজের জামাই বানিয়ে উড়াল দিবে!"
নিত্য আপু রাগে ফোঁসফোঁস করতে করতে জবাব দিল,
------ "ভাইয়া, কাঁটা ঘায়ে নুনের ছিঁটে দেওয়া বন্ধ করবি তুই?
নীবিড় মুখ টিপে হেসে আমার পানে চেপে বসলেন। আয়েশি গলায় বললেন,
------ "যাক বাবা, আমার অন্তত এই জামাই বদল কেসে ফেঁসে যাওয়ার চিন্তা নেই।"
আড়চোখে চেয়ে আপাতত মুখে তালা লাগাবার জন্য হুমকি দিলাম আমি। নীবিড় তখনকার মতো চুপ করে গেলেন। খালামুনি এবার নিজ থেকে মুখ খুলে বললেন,
------ "ভাই-ভাবি, আসলে আপনাদের মেয়ে আর আমাদের ছেলে একে-অপরের পছন্দ করে। ওদের মতের ওপর ভিত্তি করেই বিয়ের প্রস্তাবটা নিয়ে এসেছি আমরা। আর আমার ছেলে দেখতে কম বয়সী হলেও ওর বয়স যথেষ্ট আছে।"
আন্টির যেনো কথাটা বিশ্বাস করতে বড্ড বেশিই বেগ পেতে হলো। রাত্রির উদ্দেশ্যে চাপা গলায় বললেন উনি,
------ "শেষমেশ কি-না একটা বাচ্চাকে পছন্দ করলি? ছেলে তো বিয়ের পর বড়আপু বলে ডাকবে তোকে।"
রাত্রি ক্ষেপে উঠল মুহুর্তেই। ঠেস মারা গলায় বলল,
------ "মা, তুমি নিজের মেয়েকে একটা স্টাডি কমপ্লিট করা একটা ছেলের সামনে বুড়ি বানিয়ে দিচ্ছ? কেমন ধারা মা তুমি?"
আন্টি যদিও কথাটা চাপা গলায় বলেছিলেন কিন্তু রাত্রির ক্ষেপা গলায় বলা কথাটা বজ্রপাতের মতো শোনালো। যে যার স্থান থেকে এলোমেলো দৃষ্টিতে তাকালাম আমরা। আন্টিকে খানিকটা ধমকের সুরে বললেন আংকেল,
------ "আহ রাত্রির মা, কি করছটা কি? রুশোকে দেখতে অনেক ছোট লাগতেই পারে তাই বলে কি ও ছোট হয়ে যাবে? আগে সবার সাথে আলাপটা সেরে নাও না।"
আংকেলের ধমকে চুপ করে গেলেন আন্টি। রুশো ভাইয়ার বয়স সংক্রান্ত ব্যাপার ঘেটে যখন উদ্ধার করা হলো ভাইয়া রাত্রির থেকে ৩ বছরের বড় তখন আন্টির মুখটা একদম দেখার মতো হয়েছিল। তবে আলহামদুলিল্লাহ এই যে, ছেলে যতই বাচ্চাবাচ্চা লাগুক তার কিউটনেস এভোয়েড করা ক্ষমতা খুব কম মানুষরই আছে। আংকেল-আন্টিও তার ব্যক্তিক্রম নয়। যার দরুন রুশো ভাইয়াকেও বড্ড মনে ধরল তাদের। সব কনফিউশান দূর হওয়ার পর আংকেল রুশো ভাইয়ার উদ্দেশ্যে প্রশ্ন ছুড়লেন,
------ "তা বাবা, তুমি কি করো এখন?"
রুশো ভাইয়া দু'বার না ভেবেই চট করে উত্তর দিলো,
------ "প্রাঙ্ক করি আংকেল।"
রুশো ভাইয়ার এমন উত্তরে চোখজোড়া ফুটবল হয়ে এলো সকলের। আমি বিভ্রান্তিতে বিষম খেয়ে বসলাম তৎক্ষণাৎ। সর্বনাশ করেছে! এ কি বলে ফেলল রুশো ভাইয়া! প্রাঙ্ক কিং নামক তকমাটা এখনকার মতো ভুলে গেলে কি চলত না তার?
#চলবে_________
[ দেরি হওয়ায় ক্ষমাপ্রার্থী! 😔]