ফন্ট সাইজ:
থিম:
প্রেম আমার (সিজন ২)

৮০তম পর্ব

লেখক: আয়ানা জাহান নুসরাত

#প্রেম_আমার♥(সিজন-টু)

#পর্ব-৮০♥

#আয়ানা_জাহান_নুসরাত♥

----- "প্রাঙ্ক করো মানে? ভাবি কি বলছে আপনার ছেলে?"

পরিস্থিতি বাজে পর্যায়ে পৌঁছে যাবার আগেই চট করে বললাম আমি,

----- "আ..আংকেল ভাইয়া একটু মজা করছে, ওর কথা সিরিয়াসলি নিবেন না। ভাইয়া খালুর বিজনেসেই হাত দিয়েছে। আলাদা কোনো জব করছে না।"

আংকেল সন্তুষ্ট হলেন এবার। বাকিরাও আড়ালে কপালের ঘাম মুছল। আন্টি-আংকেল ছেলে সম্পর্কে আর খুব বেশি কিছু জানতে চাইলেন না। মেয়ের যখন নিজেরই পছন্দ সেখানে খুঁটিনাটি দেখে বিয়ের আলাপ করাও শুধু সময়ের ব্যয়। যেই সময়টুকুর কাজে লাগিয়েই বিয়ের কথা ফাইনাল করা হলো। বিয়ের ডেইটটা যদিও এত দ্রুত ঠিক করা হলো না তবে কথা আছে অগ্নি ভাইয়া আর নিত্য-আপুর বিয়ের সাথে তাদেরটাও সেরে ফেলা হবে।

______________________________

আমাদের রাজশাহী ফিরতে ফিরতে সন্ধ্যে নেমে এলো।

অন্ধকার শহরটার বুক চিরে ধেয়ে চলল চার চাকাওয়ালা গাড়িটা। জানালা ভেদ করে আসা ঠান্ডা বাতাসে খোলা চুলগুলো উড়ছে আমার। যা বুঝলাম তাতে দিনের বেলায় খারাপ লাগা ভাবটা বেশি হয়, রাতের আবহাওয়ায় তুলনামূলক কম। আর রাজশাহীর বুকে রাতটাই তো অন্যরকম!

রাজশাহী শহরটা অন্য বড়বড় শহরগুলোর মতো নয়। "গ্যাঞ্জাম" শব্দটার খুব কমই পরিচিত এ শহরে। যার দরুন বুক ভরে শ্বাস নেওয়া যায়। রাতে শহরটা এক চমৎকার রূপ ধারণ করে। রোডের চারিপাশে রং-বেরঙে আলোর ছড়াছড়ি সৌন্দর্যটাকে বাড়িয়ে দেয় কয়েকগুণ। আঁধারে ধুলোবালি দেখা যায়না, পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন একটা গোছালো প্রতিচ্ছবি ফুটে ওঠে। লোকে বলে ঢাকা তো রাজধানী, তাতে নিশ্চয় আহামরি কিছুই থাকবে। তবে আমার ব্যক্তিগত ভাবে ঢাকা শহর পছন্দ নয়, ঢাকা শহরে বুক ভরে শ্বাস নেওয়া যায় না। বিষাক্ত বাতাসে বলে মনে হয়। গাছগাছালির দেখা পাওয়া বড্ড কষ্টকর সেখানে। সাথে রাস্তায় তো লেগেই থাকে লম্বা জ্যাম। তারওপর প্রতিনিয়ত ঘটা অগ্নিকাণ্ড, এক্সিডেন্ট তো আছেই। সেই অপছন্দের শহরেই আবারো যেতে হবে আমাদের। পরশু নীবিড়দের ড্যান্স কম্পিটিশন হবে ঢাকার বুকে। বড়বড় ড্যান্সারেরা অংশ নেবে তাতে। পপ, হিপহপ, ক্লাসিকাল প্রায় সব ধরনের ড্যান্সেরই সুযোগ আছে সেখানে। আমার চিন্তাটা নীবিড়ের বিপরীতে থাকা একাধিক মেম্বারের টিমদের নিয়ে। বিশেষ করে ওই ম্যাট নামক ব্যক্তিটি যে ৫ জনের টিম নিয়ে ভাগ নেবে তাকে নিয়ে। ইউকের মতো দেশ থেকে একটা প্রতিষ্ঠিত ব্যান্ড নিশ্চয় দূর্বল হবে না। আর তাদের মূল উদ্দেশ্যই যেখানে নীবিড়কে হারানো সেখানে চিন্তাটা মাত্রাতিরিক্ত তো হওয়া স্বাভাবিকই।

----- "অনন্যা? এই অনন্যা? কখন থেকে ডাকছি! গাড়ি থেকে নামবি না নাকি?"

আমি চমকালাম হাতে কারো স্পর্শ পেয়ে। মা জননী উঁচু গলায় ডাকছেন আমায়। ইতিমধ্যে নির্ঘাত বেশ কয়েকবার ডেকেও ফেলেছেন। নেহাতই ভাবনায় ডুবে ছিলাম বিধায় শুনতে পারিনি। আমি তাড়াহুড়ো করে মাথা ঝাঁকিয়ে গাড়ি থেকে নামলাম। নীবিড় খানিকটা দূরে ভ্রু কুঁচকে দাঁড়িয়ে ছিলেন। আমি নামতেই কাছাকাছি এসে দাঁড়ালেন উনি। সবার আড়ালে ধীর গলায় জিজ্ঞেস করলেন,

----- "কি ভাবছিলে এতো? কোনো সমস্যা হয়েছে কি?"

মাথাটা ডানে-বামে নাড়িয়ে বললাম আমি,

----- "না না কোনো সমস্যা হয়নি। ঠিক আছি আমি।"

নীবিড় আমার থেকেও যেনো আমায় বেশি চেনেন। যার দরুন কথাটা বিশ্বাস না করলেও আপাতত চুপ রইলেন। ম্যানশনে আমাদের ছোটদের নামিয়ে দিয়ে ড্রাইভারকে বলা হলো গুরুজনদের বাড়িতে পৌঁছে দিয়ে আসতে, যেহেতু রুশো ভাইয়া বায়না ধরেছিল আজ আমাদের সাথে থাকবে বলে। আর রুশো ভাইয়ার বায়না মানেই মাঝ থেকে অগ্নি ভাইয়ার ফায়দা। নিত্য আপুর সাথে প্রেমালাপনের সুবর্ণ সুযোগখানা এতো সহজে কি আর হাতছাড়া করা যায়? উহুম একদম নয়! তাই অগ্নি ভাইয়াও প্রথম প্রথম থাকতে না চাওয়ার ভান করেছিল পরবর্তীতে যদিও হার মেনে নেওয়ার এক্টিং তাকেই করতে হয়েছিল।

আমরা বাসায় ফিরে সর্বপ্রথম ফ্রেশ হয়ে নিলাম। হাল্কা কিছু নাস্তা সেরে নিয়ে নিজেদের ঘরে ফিরে এলাম। রুশো ভাইয়ার ঢুলুমুলু চোখ। বেচারা ঘুমে কিছু দেখছেনা চোখে। বাধ্য হয়েই রুশো ভাইয়াকে শুইয়ে দিতে ও'ঘরে নিয়ে গেল অগ্নি ভাই। আমি হাঁফ ছেড়ে বসলাম। নীবিড় গায়ের শার্টটা বদলে আরামদায়ক টি-শার্ট পরে নিয়ে বিছানায় বসলেন। কয়েক সেকেন্ড আমার পানে স্থির দৃষ্টিতে চেয়ে থেকে ভ্রু নাচালেন। আমি ঠোঁট উল্টে জিজ্ঞেস করলাম,

------ "ওভাবে ড্যাবড্যাব করে চেয়ে ভ্রু নাচাচ্ছেন কেন? কি চাই?"

------ "আপনার মনে কি চলছে তা জানতে চাই।"

আমি ঠোঁট কুঁচকে সুক্ষ্ম নজর নিক্ষেপ করলাম উনাতে। পরমুহূর্তে নিজের চিন্তাটা লুকিয়ে রাখার উদ্দেশ্যে ঠোঁটে লম্বা হাসি ফুটিয়ে বললাম,

------ "আ..আমার মনে আবার কি চলতে যাবে? তেমন কিছুই না। আমি কিসব উল্টোপাল্টা কল্পনা করি তা তো জানেনই। বেকার জানতে চেয়ে সময় নষ্ট করবেন না।"

নীবিড়ের দৃষ্টি গাঢ়তর হলো। শীতল গলায় বললেন উনি,

------ "টাইম ওয়েস্ট হলে হবে। বলো কি ভাবছিলে। আমি তোমার কপালে টেনশনের স্পষ্ট ছাপ দেখেছি। সো ডোন্ট ইভেন ট্রাই টু হাউড এনিথিং!"

বুঝলাম এই বান্দার থেকে আদৌ কিছু লুকিয়ে কূল পাবো না আমি। যার দরুন ফুস করে শ্বাস ফেলে বললাম,

------ "আসলে পরশু আপনার কম্পিটিশনটা নিয়ে একটু টেনশনে আছি। এমনিতেই আজকে ক্লান্ত হয়ে ফিরলেন হাতে মাত্র একটা দিন!"

নীবিড় ঠোঁটের কোণ প্রসারিত করে মিছে হাসি হাসলেন। অভয় দিয়ে বললেন,

------ "চিন্তা করো না অনন্যা। আজ পর্যন্ত তোমার হাজবেন্ড কোনো চ্যালেঞ্জে হারেনি, ইন-শা-আল্লাহ আগামীতেও হারবেনা।"

আমি পলক ঝাপটে মাথা নাড়ালাম। নীবিড় বিছানা ছেড়ে উঠলেন। ঘর থেকে বেরোনোর উদ্দেশ্যে হাঁটা ধরতেই পিছু ডাকলাম আমি।

------ "আবার কোথায় যাচ্ছেন? রেস্ট করবেন না?"

নীবিড় দাঁড়ালেন। পিছন ফিরে মলিন হাসিতে ঠোঁটে রাঙালেন। উনার ক্লান্ত, ঘুমুঘুমু চোখটা বন্ধ হয়ে আসতে চাইছে তবু বেশ সহজভাবেই বললেন,

----- "দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়েই রেস্ট করা হয়ে গেছে আমার। তুমি বরং রেষ্ট করো আমার কাজ আছে। "

----- "কাজ! এখন আবার কিসের কাজ?"

নীবিড় যেন বলতে চাইছিলেন না আমায়। হয়তো জানতেন, আমায় বললে চিন্তার পরিমাণটা আরও বাড়বে। বাঁধা দিবো কিংবা বিপত্তির সৃষ্টিও করব।

নীবিড়ের চুপ থাকার মাঝেই আবারও প্রশ্ন করে উঠলাম আমি,

----- "কি হলো চুপ করে আছেন কেন? বলুন!"

নীবিড় আমায় কখনোই অবজ্ঞা করার সাহস করেন নি। এবারেও করলেন না। ভারী গলায় বললেন,

----- " প্র্যাকটিস করতে হবে অনন্যা। সময় নেই হাতে।"

আমার কপালের দৃঢ় ভাঁজ পড়ল। তারমানে কি? মানুষটা মাত্র এলেন বাসায়। দুটো মুখে দিয়ে একটু রেস্ট পর্যন্ত করবেন না? এভাবে কি শরীর চলবে? অসুস্থ হয়ে পরবেন তো উনি।

নীবিড় আমায় বিচলিত হতে দেখে দু'ধাপ এগিয়ে এলেন। ক্লান্ত মুখেই সতেজ হাসি ফোটাবার চেষ্টা চালিয়ে বললেন,

----- "ব্রেইনে এতো প্রেশার ফেলার কোনো দরকার নেই। আমি ঠিক আছি। কোনো কিছু পেতে হলে একটু পরিশ্রম করতে হয়, কথাটা জানো তো?"

বিনিময়ে শুকনো মুখে কিঞ্চিৎ মাথা ঝাঁকালাম আমি। নীবিড় আবারও বললেন,

------ "তাহলে আমায় না আটকিয়ে নিজে রেস্ট করো। কিছু খাবে? রবি কাকু বলে পাঠিয়ে দেব?"

------ "নাহ, কিছু লাগবে না আমার। আপনি যান। মন দিয়ে প্রাকটিস করুন।"

নীবিড় আমায় বোঝাতে সক্ষম হয়েছেন ভেবে স্বস্তির শ্বাস ফেলে প্রাকটিস রুমে গেলেন। উনি যেতেই ক্লান্ত শরীরটা বিছানায় ছুড়ে মারলাম আমি। বিরক্তিটা মাথা চাড়া দিয়ে উঠল। চুলগুলো ছিঁড়ে যা ইচ্ছে তাই করে ফেলতে ইচ্ছে হচ্ছে এখন। মানুষটা আমার সামনে এতটা কষ্ট করছেন অথচ আমি কিছু করতেই পারছিনা। উফফ! কি অসহ্যকর যন্ত্রণা! ইচ্ছে তো করছে ওই মাহিন না ম্যাট তাকে গিয়ে গুলি করে বুক ফুটো করে দেই। উড়ে যাক জান, পড়ে যাক নিথর দেহ। খুনের দায়ে প্রয়োজনে জেলেই যাই না আমি, তাও অন্তত আমার নীবিড়টা তো শান্তিতে থাকুক। এই ব্যস্ত জীবনে আর কত কষ্ট করবেন উনি? একজন প্রফেশনাল ড্যান্সার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হবার এত বছর পরে এমন একটা কম্পিটিশন রাখার আদৌ কোনো মানে আছে?

সব হয়েছে ওই নোংরা ছেলেটার জন্য। সব নষ্টের মূল ওই ম্যাটের বাচ্চা ফ্যাট!

ব্যাটা জঙ্গি, হাতির দাঁত, মুরগীর দুর্গন্ধযুক্ত বিষ্ঠা, ছাগলের গোল গোল শুকনো পটি, গরুর কেকের মতো গোবর, কাকের ক্রিমের মতো দুই নম্বর কাজ, চামচিকার ইয়াক মার্কা উল্টি! আহহহহহ! এতো গালিগালাজ করেও কেনো শান্তি পাচ্ছিনা আমি? মাদুরটাকে পিটিয়ে ওয়াশিং মেশিনে চুবালেও যেন রাগ কমবে না আমার!

আমি আরো কিছুক্ষণ বিছানায় গড়াগড়ি খেয়ে উঠে দাঁড়ালাম। কিছুতেই শান্তি মিলছে না। কিছু একটা করতে হবে? কিন্তু কি করব? নীবিড়ের জন্য বরং লেবুর শরবত বানিয়ে নিয়ে যাই? হ্যাঁ! এটাই ভালো হবে। শরবত খেলে অনেকটা রিফ্রেশ ফিল করবেন উনি।

ভাবনামতো কিচেনে গিয়ে ঝটপট লেবুর শরবত বানিয়ে নীবিড়ের প্রাকটিস রুমের উদ্দেশ্যে হাঁটা ধরলাম আমি। সেই পথে প্রথমেই পড়ল ভাইয়াদের ঘর। আমি চুপিচুপি একবার ঢু মারলাম। রুশো ভাইয়া উল্টো হয়ে ঘুমিয়ে। মাথাটা বালিশে বাঁকা করে রাখায় গালের এক সাইড ভর্তা হয়ে আছে। গালের দৃশ্যমান পাশটা কি সুন্দর ফুলে আছে। ঠোঁটটাও বাচ্চাদের মতো উল্টে রেখেছে। মোটকথায় দেখতে ছোটখাটো একটা কিউটের ডিব্বা বৈ কিছু লাগছে না। কে বলবে এই ছেলেটা কিছুদিন বাদে বিয়ের পীড়িতে বসতে চলেছে? লাল টুকটুকে বউ ঘরে তুলতে চলেছে?

আমার খুব লোভ হলো রুশো ভাইয়ার গালটা টেনে দেওয়ার কিন্তু এই শরবত হাতে যেতে গেলে অঘটন ঘটিয়ে ফেলব নির্ঘাত। যার দরুন আর গালটা টেনে দেওয়া হলো না। দরজাটা আগের মতোই চাপিয়ে হাঁটা ধরলাম আমি। নিত্য আপু এই সময়টায় বই পড়ে। অধিকাংশ মেডিক্যাল স্টুডেন্টদের এক বিশেষ লক্ষণ আছে, তারা গলা ফাটিয়ে ছাড়া বই পড়তেই পারে না। নিত্য আপুও তার ব্যতিক্রম নয়। আমি অবাক হলাম নিত্য আপুর ঘর পেড়িয়ে যাওয়ার সময়। আজও সবসময়ের মতো ভেতর থেকে কথা শোনা যাচ্ছে তবে তা বই পড়ার নয়। আমি দাঁড়ালাম। কানটা খাড়া করে একটু শোনার চেষ্টা করতেই বুঝলাম ঘরে একা নেই সে। আমার ভূমিকম্প ভাইয়াও উপস্থিত সেই ঘরে। দুটো প্রেমের ভোমর মনের সুখে গল্প করছে। একটু পরপরই খিলখিল করে হাসছে। আমি আর দাঁড়ালাম না। দ্রুত পায়ে এগিয়ে চললাম। এই মুহুর্তে তাদের একদমই বিরক্ত করা চলবে না।

আমি থমকালাম নীবিড়ের বিশাল প্রাকটিস রুমের সামনে এসে। ভেবেছিলাম দরজা লাগানো থাকবে কিন্তু দরজাটা হাট করে খোলা দেখে কপাল কুঁচকে এলো৷ ভেতর থেকে কোনো মিউজিকের আওয়াজও আসছে না। উনি কি তবে বিরতি নিলেন? আমি দরজায় হাল্কা ধাক্কা দিলাম। ভেতরে নজর ফেললাম নীবিড়ের সন্ধানে। মুহুর্তেই হাত থেকে ঠাস করে পড়ে গেল শরবতের গ্লাসটা। কাচের গ্লাস ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে ছড়িয়ে পড়ল ফ্লোরে। ভেতরে পা চেপে গোঙাতে থাকা মানুষটা চমকাল। দ্রুত উঠার চেষ্টা করতে গিয়েও ব্যর্থ হলো। আমি কাচের তোয়াক্কা না করেই দৌড়ে ভেতরে প্রবেশ করলাম। ভাগ্য ভালো, পায়ে ঘরে পড়ার জুতো ছিলো যার দরুন পায়ে কাঁচ বিঁধল না। নীবিড়কে উঠতে বাঁধা দিয়ে উনার পাশে ধপ করে হাটু গেড়ে বসলাম আমি। থরথর করে কাঁপতে থাকা গলায় বলে উঠলাম,

------ "নীবিড়! কি হয়েছে আপনার? আপনি এভাবে মেঝেতে বসে গোঙাচ্ছিলেন কেনো? কোথাও ব্যাথা পেয়েছেন? দেখি, আমায় দেখান।"

কথাগুলো বলার সময় আপনা-আপনিই যেনো চোখ থেকে ঝরঝর করে পানি পড়তে শুরু করল আমার। নীবিড় আমায় দেখে ঘাবড়ে গেলেন। নিজের ব্যথাটা চেপে রেখে কোনোরকমে বললেন,

------ "এই মেয়ে, কাঁদছ কেনো তুমি? আমি ঠিক আছি। দেয়ালে পা লাগায় একটু চোট পেয়েছি। তেমন চিন্তার কিছু হয়নি।"

উনার কথাগুলো বিন্দুমাত্র প্রভাব ফেলল না আমাতে। বরং উনার পা সরিয়ে নেওয়ায় আরো বিচলিত হয়ে পড়লাম আমি। জেদি গলায় বললাম,

----- "দেখুন আপনি সবসময় আমার কাছ থেকে নিজের আঘাতগুলো লুকোবার চেষ্টা করেন কিন্তু আর না। দেখান বলছি আমায়! আমি আপনাকে চিনি, সামান্য দেয়ালে লাগলে আপনি এতোটা ব্যথায় কাতরাতেন না।"

নীবিড় কি করবেন ভেবে না পেয়ে আমার গালে আলত করে হাত রাখলেন। আমার গলা ভারী হয়ে চলল ক্রমান্বয়ে। কথাগুলো গলাতেই আটকে যেতে লাগল। নীবিড়ের গা বেয়ে ঘাম গড়িয়ে পড়ছে। চুলগুলো ভিজে লেপ্টে আছে কপালে। চোখমুখ লালবর্ণ ধারণ করেছে। এমন একটা পরিস্থিতিতেও কিচ্ছু হয়নি এমন ভাব নিয়ে বললেন,

----- "অনন্যা, ডোন্ট বি প্যানিক। প্লিজ শান্ত হও। পা'টা জাস্ট মচকে গেছে নাথিং এলস। দেখ!"

কথাটা বলে মচকে যাওয়া পা'টা দেখালেন আমায়। আমি কিছুটা শান্ত হলাম। পা'টায় আলত করে হাত রেখে ভেজা গলায় বললাম,

----- "আপনি একটু সাবধানে প্রাকটিস করবেন তো নাকি? কি অবস্থা করেছেন! খুব বেশি লেগেছে না?"

নীবিড় মাথাটা ডানে-বামে নাড়িয়ে বললেন,

----- "বলছি তো ততটা লাগেনি। প্লিজ এবার কান্না থামাও। তোমার কান্না আমার সহ্য হয়না। কেনো বুঝতে চাও না তুমি?"

কথাটা বলে দু'হাতে চোখ মুছে দিলেন উনি আমার। ততক্ষণে চেঁচামেচির শব্দে নিত্য আপু-অগ্নি ভাই এসে দাঁড়িয়েছে দরজায়। ফ্লোরে কাচ পড়ে থাকতে দেখেই ঝট করে অগ্নি ভাইকে আটকাল নিত্য আপু। ব্যস্ত গলায় বলল,

----- "অগ্নি থামো, কাচ আছে সাবধানে!"

অগ্নি ভাই থামল। কাচ টপকে কৌশলে ঘরে ঢুকে আমাদের এমন পরিস্থিতিতে দেখে ছুটে এলো। দু'জনেই বিচলিত হয়ে প্রশ্ন ছুড়লো,

----- "একি, কি হয়েছে তোমাদের? অনন্যা, ভাই তোরা এভাবে মেঝেতে বসে আছিস কেনো?"

----- "নীবিড়, পায়ে কি হয়েছে তোর? আর আয়ু, কাঁদছিস কেনো তুই? বাইরে কাচ পড়ে আছে। কি হচ্ছে এসব?"

হেঁচকি তুলতে তুলতে জবাব দিলাম আমি,

----- "ভাইয়া, উনি প্রাকটিস করতে করতে পা মচকে ফেলেছেন। দেখো না, উঠে দাঁড়াতে পারছেন না।"

অগ্নি ভাইয়ার মাথায় হাত পড়ল। নিত্য আপুকে দ্রুত কাঁচগুলো সরিয়ে দিতে বলে কাঁধে ধরে তুলল নীবিড়কে। শীঘ্রই ঘরে নিয়ে যেতে হবে উনাকে। নিত্য আপু যতটা পারল কাচগুলো এক পাশে সরিয়ে রাখল। অগ্নি ভাই নীবিড়কে নিয়ে ঘর ছেড়ে বের হতেই এক মুহুর্তের জন্য থামকালাম আমি। কেনো যেনো ভেতরে ভেতরে একটা খটকা কাজ করছিল। আমি চোখমুখ মুছে আবারও ফিরে এলাম নীবিড় যেখানে বসেছিলেন সেই জায়গায়। ফ্লোরের একটা জায়গা একটু বেশিই চকচক করছে বলে মনে হলো। আমি ঝুঁকে বসলাম। সুক্ষ্ম নজর ফেলে সেই চকচকে জায়গা হাত দিতেই পিচ্ছিল কোনো পদার্থের অস্তিত্ব আবিষ্কার করলাম। সেকি! এখানে এমন কিছু কোথা থেকে এলো? আমার যতদূর জানা নীবিড়ের প্রাকটিস রুম সবসময়ই ক্লিন করে রাখা হয়। এমন তেল জাতীয় কিছু আসার তো প্রশ্নই আসেনা। তবে কি এর জন্যই পা মচকে পড়ে গেছেন উনি? নীবিড় যেহেতু জুতো পড়েই প্রাকটিস করেন তাই হয়তো টের পাননি। নাহলে পায়ে কিছু লাগলে তো ঠিকই টের পেতেন। আমি উঠে দাঁড়ালাম। এই নিয়েই পরেও ভাবা যাবে আগে উনার পাশে থাকতে হবে আমার। পরশু কম্পিটিশন আর আজই এমন একটা এক্সিডেন্ট মোটেও আশা করার মতো নয়। উনাকে যে করেই হোক সুস্থ করে তুলতে হবে। তুলতেই হবে!

#চলবে_________

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৮০তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন