ফন্ট সাইজ:
থিম:
প্রেম আমার (সিজন ২)

৮৩তম পর্ব

লেখক: আয়ানা জাহান নুসরাত

#প্রেম_আমার♥(সিজন-টু)

#পর্ব-৮৩♥

#আয়ানা_জাহান_নুসরাত♥

দেখতে দেখতেই প্রথম রাউন্ড শেষ হলো। ফলাফল ঘোষণা বাকি মাত্র। চারিদিকে কৌতূহল। কারা বাদ যাবে, কারা টিকে থাকবে এই নিয়েই দর্শকদের ভারী হয়ে আছে বুক। প্রতিযোগীদের আপন লোকেদেরও একই হাল। যেমনটা হয়ে রয়েছে আমাদের। বিচারকেরা কি করবেন জানা নেই তবে একজন নিরপেক্ষ দর্শক হিসেবে আমি বলতে পারি প্রথম রাউন্ডে নীবিড়, ম্যাটের টিম, একটি মেয়ে যে ক্লাসিকাল ড্যান্স করে এবং আরেকটা চার সদস্যের বয়ব্যান্ড নিঃসন্দেহে পরবর্তী রাউন্ডে চলে যাবে। তবে বাকি ৬ টা টিমও অনেক ভালো পারফরম্যান্স দিয়েছে আমার ব্যর্থতা আমি তাদের মাঝে কম্পেয়ার করে বলতে পারছিনা কে টিকবে, আর কে এখানেই থেমে যাবে।

নীবিড়সহ বাকি প্রতিযোগীদের রেস্টরুমে আনা হয়েছে। খানিক বাদেই জানানো হবে ফলাফল। আমি নীবিড়কে দেখবার জন্য সেই রুমে প্রবেশ করলাম। নীবিড়ের ঘেমে যাওয়া শরীরটা প্রথম চোখে পড়ল আমার। উনি ক্লান্ত মুখেই মৃদু হেসে কাছে ডাকলেন আমায়। একজন স্টাফ উনার গা মুছে দিচ্ছিল। সাথে ফ্রেশ এয়ার দিচ্ছিল শ্বাস নিতে সমস্যা হওয়ায়।

------ "আপনি ঠিক আছেন?"

নীবিড় মাথা ঝাঁকিয়ে বললেন,

------ "হ্যাঁ, ঠিক আছি। তুমি একা কেনো? বাকিরা কোথায়?"

নীবিড়কে আপাতত বলা যাবে না বাকিদের অবস্থান। যদি জানতে পারে একেক জন একেক কাজে নিয়োজিত অর্থাৎ গোয়েন্দাগিরি করছে তবে নিজে থেকেই বেগড়া দেবেন উনি। দেখা যাবে স্টেপ গুলিয়ে ফেলে ক্রিমিনাল খুঁজতেই মন দেবেন। এমনিতেই প্রাকটিসের সময় পেয়েছেন নগণ্য তারওপর অসুস্থ শরীর নিয়ে মানসিক চাপটা বড্ড বাজে প্রভাব ফেলবে উনার ওপর।

------ "কি হলো? চুপ করে গেলে যে?"

আমি ভাবনাজগৎ থেকে বেরিয়ে কোনোরকমে জবাব দিলাম,

------ "আব...আসলে ওরা সিটে বসেছিল। এতো মানুষের ভীড়ে গরম লাগায় রুমে গিয়েছে। চলে আসবে এক্ষুণি।"

নীবিড় আমার উত্তরে সন্তুষ্ট হলেন। দু সেকেন্ডের মতো বসে থেকে আরো কিছু ফ্রেশ এয়ার ক্যাচ করে উঠে দাঁড়ালেন। কস্টিউম চেঞ্জ করতে হবে সবারই। এক একজন ঘেমে বাজে অবস্থায় আছে বর্তমান। নীবিড়ের কস্টিউম চেঞ্জ করাবার জন্য যে লোকটি নিয়োজিত ছিল সে মাত্রই যেতে নিয়েছিল তবে আমি তাকে অনুসরণ করে ডেকে উঠলাম তৎক্ষণাৎ। লোকটি হাঁটা থামিয়ে দাঁড়ালো। প্রশ্নোক্ত মুখে জিজ্ঞেস করল,

------ "ইয়েস ম্যাম?"

------ "থামুন, আমিও আপনার সাথে যাবো আমার হাজবেন্ডের কস্টিউম সিলেক্ট করতে।"

লোকটি আমার এমন আক্রমণে থতমত খেয়ে গেল। বোকাবোকা গলায় জিজ্ঞেস করল,

------ "কিন্তু ম্যাম, আপনি কেনো শুধু শুধু হয়রান হতে যাবেন? তার জন্য তো আমরা আছিই৷"

আমাদের কথোপকথনের মাঝে নীবিড় এসে ঢুকলেন। বিভ্রান্ত চিত্তে জিজ্ঞেস করলেন,

------ "কি হচ্ছে এখানে? অনন্যা, তুমি উনাকে আটকাচ্ছ কেনো?"

নীবিড়ের বিপরীতে দ্রুত জবাব দিলাম আমি,

------ "আব না না উনাকে আটকাতে যাব কেনো? আমি তো শুধু বলছিলাম আপনার কস্টিউমটা আমি সিলেক্ট করব। আর দেখুন না উনি বলছেন আমায় সিলেক্ট করতে দেবেন না।"

শেষের কথাটা শুনে ভ্রু কুঁচকে লোকটার দিকে তাকালেন নীবিড়। নীবিড়ের এমন রাগান্বিত চাহনি দেখে ভয়ে কুঁকড়ে বলে উঠল লোকটি,

------ "স্যা..স্যার, রাগ করবেন না। ম্যাম আমায় ভুল বুঝছেন। আমি তো শুধু বলেছিলাম উনার কষ্ট করার কোনো প্রয়োজন...."

লোকটিকে কথার মাঝখানে বাঁধা দিয়ে কঠিন গলায় বললেন নীবিড়,

------ " ও যখন বলছে ও সিলেক্ট করবে তখন আপনি এতো কথা বাড়াচ্ছেন কেনো? যান, ও যেটা চুজ করবে তাই নিয়ে আসুন।"

লোকটি নীবিড়ের শান্ত গলার ধমক খেয়ে শুকনো ঢোক গিলল। উনার কথামতো বাধ্য হয়ে কাবার্ডের সামনে নিয়ে গেল আমায়। আমার সর্বপ্রথম নজর পড়ল সর্ববামের গোল্ডেন কালারের কস্টিউমটার ওপর। মূলত অন্যান্য কস্টিউমগুলোর থেকে কিছুটা দূরত্বে আলাদা করে রাখা হয়েছে কস্টিউমটাকে। আমার সন্দেহ তীব্র হলো। এরমাঝে লোকটা হাত দেখিয়ে বলল,

------ "ম্যাম, ওই গোল্ডেন কস্টিউমটা দেখুন। পারফেক্ট না? ওটা স্যারের জন্য স্পেশালি আলাদা করে রাখা হয়েছে।"

কস্টিউমটা যথেষ্ট সুন্দর হলেও নাক কুঁচকে মিথ্যে আওড়ালাম আমি,

------ "ইশশ কি বাজে চয়েজ আপনাদের। কালারটা দেখেছেন? গোল্ডের মতো তো নয়ই বরং দু নম্বর কাজের মতো লাগছে।"

লোকটা গোলগাল চোখে করে তাকাল মুহুর্তেই। দু নম্বর কাজের অর্থটা জানেনা বিধায় চোখমুখ কুঁচকে জিজ্ঞেস করল,

------ "ইয়ে মানে ম্যাম, দু নম্বর কাজটা আবার কি?"

আমি বুক ফুলিয়ে শ্বাস নিয়ে ধমকে উঠলাম,

------ "আপনাকে এতোকিছু জানতে হবে না। এইযে, এই কস্টিউমটা আমার পছন্দ হয়েছে। এটাই পড়বেন উনি, দ্যটস ফাইনাল।"

কথাটা বলেই নেভি ব্লু এবং ব্ল্যাকের কম্বিনেশনে বানানো কস্টিউমটা বের করলাম আমি। লোকটা আমার পানে হতভম্ব হয়ে চেয়ে থাকার মাঝেই বিনাবাক্যে নীবিড়ের কাছে পৌঁছালাম। উনার দিকে কস্টিউমটা এগিয়ে দিয়ে বললাম,

------ "এইযে ধরুন, এটা পড়ুন। একদম ব্লু-বেরি লাগবে আপনাকে!"

নীবিড় বিস্ময় নিয়ে কস্টিউমটা হাতে নিলেন। উনার চোখেমুখে স্পষ্ট কনফিউশানের ছাপ। হঠাৎ উনার সাথে এমন চিপকু গামের মতো লেগে আছি, এ ব্যাপারটা বোধহয় ঠিক স্বাভাবিক লাগছে না উনার কাছে। সে যাই হোক, উনার স্বাভাবিক লাগুক কিংবা অস্বাভাবিক লাগুক। উনাকে একটা মুহুর্তের জন্যও চোখের আড়াল হতে দেওয়া যাবে না আমার। কিছুতেই না।

_____________________________________

আমার ভাবনা তবে সঠিকই হলো। বিচারকেরা আমার ধারণার মাঝে নীবিড় সহ বাকি তিনটে টিমকেই প্রথম রাউন্ড জিতে পরবর্তী রাউন্ডে পৌঁছাবার কথা এনাউন্স করলেন। সাথে আরো একজন সোলো ড্যান্সার এবং একটি টিম উত্তীর্ণ হলো। বাদ পড়লো চারটে টিম। তাদের শুকনো মুখটা দেখে কেনো যেনো খারাপ লাগা কাজ করলো আমার। কিন্তু খারাপ লাগলেও সাধারণ বিষয়টা যে মেনে নিতেই হবে। প্রতিযোগিতায় হার-জিত থাকবে এটাই স্বাভাবিক। আমি ফুস করে শ্বাস ফেলে এদিকে-ওদিক তাকালাম। কে জানে ভাইয়ারা ঠিক কি করছে এখন, রাত্রি-নিত্য আপুরও দেখা মিলছে না।

আমার ভাবনার মাঝেই ফোন বেজে উঠলো। কানে ব্লুটুথ সেট করে স্টেজের কাছ থেকে অনেকটা দূরে সরে এলাম আমি। গানের তীব্র শব্দে নয়তো কোনো কথাই স্পষ্ট শুনতে পারবো না।

------ "হ্যালো আয়ু? শুনতে পাচ্ছিস?"

চারিদিকে নজর রাখতে রাখতে জবাব দিলাম আমি,

------ "হ্যাঁ ভাইয়া শুনছি, বলো।"

------ "আমাদের কেনো যেনো এখানকার স্টাফদের আচরণ সুবিধার ঠেকছে না। ম্যাটের যে গার্ডগুলো আছে তাদের সাথে একটু বেশিই মেলামেশা করছে। কিছু না কিছু গন্ডগোল তো আছেই।"

আমি কপালে দৃঢ় ভাঁজ পড়ল। উত্তেজিত হয়ে বললাম,

------ "বলো কি, এখন কি করবো?"

------ "তোকে কিছু করতে হবে না। ওদিকের খবর কি তাই বল।"

আমি ছোট্ট করে শ্বাস ফেলে বললাম,

------ "নীবিড়ের কস্টিউমে পাউডারের মতো কিছু পেয়েছিলাম আমি। খুব সম্ভবত ইচিং হওয়ার জন্য পাউডারটা শার্টে লাগিয়েছিল কেউ। তবে আমি কৌশলে শার্টটা চেঞ্জ করিয়ে নিয়েছি। এবারেও রিস্ক নেইনি। মেকআপ আর্টিস্টরা যে কস্টিউম চুজ করেছিল সেটাও বদলে দিয়েছি।"

ওপাশ থেকে স্বস্তির শ্বাস ফেলতে শোনা গেল। গলাটা ভিজিয়ে নিয়ে বলল অগ্নি ভাই,

------ "সাবাশ! ভালো করেছিস। আচ্ছা সেকেন্ড রাউন্ড কি শেষ হয়েছে?"

------ "না, একটা মেয়ের পারফরম্যান্স বাকি।"

------ "গুড, আরো সতর্ক হয়ে যা। আমাদের তো ফাঁটা কপাল, এতো কাছে থেকেও অন্তত নীবিড়ের লাইভ পারফরম্যান্স দেখতে পারছিনা। থাক, কি করা করার? বাসায় ফিরে ইউটিউবে দেখে নিব। আচ্ছা রাখছি, কিছু হলে সঙ্গে সঙ্গে কল করবি। একা মাতব্বরি করতে যাবিনা! ঠিক আছে?"

ফিসফিসিয়ে বললাম আমি,

------ "ঠিক আছে ভাইয়া।"

তারপর দু-ভাই বোনের ফোনালাপ শেষ হলো। তার কিছু পরেই সেকেন্ড রাউন্ডেরও ইতি ঘটলো। এবার খানিকটা নার্ভাস লাগছে আমার। এবারের প্রতিটা পারফরম্যান্সই যথেষ্ট ভালো হয়েছে। সত্যি বলতে ম্যাটের স্যাথে আমার শত্রুতা থাকলেও তাদের টিমের সাথে নেই। ওদের পারফরম্যান্সও চোখে লাগার মতো ছিলো। আমি দরজায় এক সাইডে দেয়ালে হেলান দিয়ে এসব ভাবছিলাম। এমন সময় স্টেজ থেকে ক্লান্ত পায়ে এগিয়ে এলেন নীবিড়। দুজন স্টাফ উনার দু'বাহু ধরেছিল। এবারও ঘেমে গোসল করে ফেলেছেন উনি। ঘন ঘন শ্বাস ফেলছেন। চুলগুলো ভিজে লেপ্টে আছে কপালের সাথে। আমার চোখেমুখে চিন্তার ছাপ পড়ল। টেনশনে কপালে জমতে শুরু করলো বিন্দুবিন্দু ঘাম। আজ বুঝছি, লোকে শুধুই একজন আর্টিস্টের সফলতা দেখে কিন্তু এই সফলতার পেছনে যে ঠিক কতটা পরিশ্রম করতে হয় তা দেখেনা। উনার মতো আরো হাজার হাজার আর্টিস্ট আছেন যারা স্টেজে নিজেদের সবটা দিয়ে লোকের মন জয় করেছেন কিংবা করে চলছেন কিন্তু দিনশেষে তারাও মানুষ। রক্তে-মাংসে গড়া শরীরটাও বিশ্রাম চায়। আমরা সাধারণ মানুষেরা যেই সময়টুকু পাই, সেই সময়টুকুও তারা পায়না। কাজের ওপরই লেগে থাকতে হয় সবসময়। অথচ তাদের এই কষ্টটা কেউ দেখেনা, দেখে শুধু সফলতা, টাকা-পয়সা। আমজনতার মতে একজন আর্টিস্ট অতিমাত্রায় সুখী ব্যক্তি। 'আহা কি আনন্দ আকাশে বাতাসে' করেই কাটায় তারা দিন। তাদের জীবনে কোনো দুঃখ-কষ্ট নেই, তারা চাইলেই সব কিছু করতে পারে। টাকার বিনিময়ে সমস্ত অভাব দূর করতে পারে কিন্তু তারা জানে না, টাকা দিয়ে আর যাই হোক সুখ কেনা যায় না।

নীবিড় আমার পানে চেয়ে দূর্বল হাসলেন। ফ্লোরে গা এলিয়ে দিয়ে বললেন,

------ "এভাবে দাঁড়িয়ে না থেকে বসলেও তো পারো।"

কথাটা বলার মাঝেই স্টাফেরা ভেজা গা মুছে দিতে লাগলেন উনার। উনার এমন ক্লান্ত, মলিন চেহারা বুকে দামামা বাজাতে শুরু করলো আমার। বুকের বাম পাশে চিনচিনে এক ব্যথার সৃষ্টি করল। কিন্তু আফসোস আমি চাইলেও উনাকে ম্যাজিক করে সুস্থ করে দিতে পারব না, চাইলেই এক ঝলকে উনার ক্লান্তি দূর করতে পারবো না, চাইলে পারবোনা উনাকে এই জায়গা থেকে দূরে কোথাও নিয়ে যেতে। যেখানে থাকবে না কোনো দুঃখ, থাকবে না কোনো কষ্ট। কাঙ্ক্ষিত সেই জনমানবশূন্য নিঝুম দ্বীপ বাস্তবে নেই, সে-তো কল্পনাতেই সই মাত্র।

আমি টলমলে পায়ে হাটু গেড়ে বসলাম উনার পাশে। নীবিড় জোরে জোরে শ্বাস-প্রশ্বাস চালালেন। উনার বা হাতটা নিজের মুঠোয় নিয়ে ভেজা গলায় বললাম আমি,

------ "খুব কষ্ট হচ্ছে তাইনা?"

নীবিড় শুয়ে থেকেই মাথাটা ডানে-বামে নাড়ালেন। মৃদু হেসে বললেন,

------ "চিন্তা করো না। ঠিক আছি আমি অনন্যা।"

আমি পলক ঝাপটে নিজেকে ধরে রাখলাম। আমাদের থেকে খানিকটা দূরে বসেছিল ম্যাট। পায়ের ওপর পা তুলে আয়েশ করে পানি খাচ্ছিল। আমার শুকনো মুখটা দেখেই বাঁকা হাসলো। সাথে টিপে দিলো বাম চোখটা। আমি মুহুর্তেই উত্তপ্ত শ্বাস ফেলে অন্যদিকে মুখ ঘুরিয়ে নিলাম। বিরক্তিতে শরীরটা কাঁপতে লাগলো আমার। এর মাঝে নীবিড় উঠে দাঁড়ালেন। ম্যাটের পানে নিজের ধারালো দৃষ্টি নিক্ষেপ করে পরমুহূর্তে আমার পানে তাকালেন। দৃঢ় গলায় বললেন,

----- "জাস্ট ইগনোর হিম। শুধুমাত্র আমার কম্পিটিটর বলে এখন পর্যন্ত গায়ে হাত তুলিনি ওর।"

----- "তার কোনো প্রয়োজন নেই নীবিড়। আপনি আপনার পারফরম্যান্সে ফোকাস করুন।"

নীবিড় কিঞ্চিৎ মাথাটা নাড়িয়ে বিশ্রাম নেবার জন্য বসলেন। স্টাফদের মাঝে দু'জন হাতে ট্রে নিয়ে প্রবেশ করল রেস্টরুমে। ট্রে'তে প্রত্যেকের জন্য এনার্জি ড্রিংক্স রাখা। প্রচুর এনার্জি লস করার ফলে এই ড্রিংক্সটার প্রয়োজন ছিলো বড্ড।

স্টাফ বাকিদের ড্রিংক্স সার্ভ করে যখন নীবিড়ের দিকে অবশিষ্ট গ্লাসটা বাড়ালো ঠিক তক্ষুণি কোথা থেকে যেনো ঝড়ের গতিতে রুমে প্রবেশ করলো রুশো ভাই। এসেই ঝট করে গ্লাসটা কেড়ে নিলো। আহামরি কোনো খাজানা পেয়ে গেছে এমন ভাব ধরে হাঁপাতে হাঁপাতে বলল,

------ "আহ, এটলাস্ট এনার্জি ড্রিংক্স পেয়েছি। থ্যাংকিউ সো মাচ ব্রো! প্রচুর এনার্জি লস হয়েছে আমার, সো আই থিংক তোমার থেকে এটা বেশি দরকার আমার।"

কথাটা বলেই গ্লাস হাতে উলটোদিকে ছুটে পালালো রুশো ভাই। আমি সহ বাকি প্রত্যেকে হতভম্ব হয়ে ক্ষণিকের 'রুশো' নামক ঝড়টার পানে চেয়ে রইল। রুশো ভাইয়া সম্পূর্ণ দৃষ্টিসীমার বাইরে যাওয়ার পরও কনফিউশান থেকে গেল অনেকের মাঝে। কেউ কেউ ফিসফিসিয়ে বলে উঠল,

------ "ওহ মাই গড! হোয়াট ওয়াজ দ্যট?"

নীবিড় এলোমেলো দৃষ্টিতে তাকালো আমার পানে। আমিও বোকা চোখে তাকালাম উনার পানে। ঠিক সেই মুহুর্তেই ফোনে কল এলো, চুলের ভেতরে হাত ডুবিয়ে কলটা রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে ভেসে এলো,

------ "ছুটকি, বোন আমার, ওদিকটা কোনোরকমে সামলে নে। ওই ড্রিংক্সে পেট খারাপের মেডিসিন ছিলো। ছিনিয়ে আনা ছাড়া উপায় ছিলো না আমার হাতে।"

কথাটা বলেই কলের লাইন কাটলো রুশো ভাই। আমি পুরো ব্যাপারটা বুঝতে পেরে জোরপূর্বক হেসে বললাম,

------ "হেহে! একটা গিয়েছে তো কি হয়েছে? আ...আ..আমি আপনার জন্য এনার্জি ড্রিংক্স বানিয়ে আনছি। রুশো ভাইয়ার কাজে কিছু মনে করবেন না। আর এর আগে কিছু মুখে দেবেন না ঠিক আছে?"

নীবিড় স্রেফ বোকাসোকা মুখ করে মাথা নোয়ালেন। আমি আর এক মুহুর্ত দাঁড়ালাম না। ছুট লাগালাম এখানকার মস্ত সেই কিচেনে। আসার পথে শোনা গেল দেয়ালে কারো মুষ্টিবদ্ধ হাতে আঘাতের আওয়াজ। সে আঘাতটা রাগের, সেই আঘাতটা ব্যর্থতার এবং নিঃসন্দেহে সেই আঘাতটা ম্যাটের। সেই আঘাত, তার একের পর এক প্ল্যান ফ্লপ হওয়ারই বহিঃপ্রকাশ।

____________________________________

১০১ নম্বর কামরায় নিস্তব্ধতা। চেয়ারে স্থির হয়ে বসে আছে এক স্বাস্থ্যবান পুরুষ। ঝাঁকড়া চুলগুলো বেয়ে টপটপ করে ঘাম গড়িয়ে পড়ছে। মোটা রশি দিয়ে হাত-পা বাঁধা তার। পেটটা বেশ ঢোলুমোলু হওয়ায় বেচারার এভাবে আষ্ঠেপৃষ্ঠে বাঁধা অবস্থায় বসে থাকতে বড়ই কষ্ট হচ্ছে। তবে তার সেই কষ্ট নিয়ে ভাববার মতো দুটো দুটো জ্যান্ত মানুষ থাকলেও, ভাবনাটা সৃষ্টি হবার নয়। রুশোর হাতে রান্নাঘরে ব্যবহৃত গরম খুন্তি। চোখমুখ টসটসে লাল। অগ্নির চোখে আজ আগুন জ্বলছে। যেনো খুনে পাপ না থাকলে এক্ষুণি জ্যান্ত কবর দিয়ে ফেলত তাকে।

রেস্টরুম থেকে বের হওয়ার পথে রান্নাবান্নার কাজে নিয়োজিত লোকটাকে কৌশলে ভুলিয়ে ভালিয়ে এ ঘরে নিয়ে এসেছে রুশো-অগ্নি। উদ্দেশ্য মোটেও সুখকর ছিলো না লোকটার জন্য। তবে উদ্দেশ্যখানা বড়ই সোজাসাপটা। অনেকটা ডিটারজেন্ট ছাড়াই বাংলা ধোলাই দেওয়ার জন্য নিয়ে আসা হয়েছে তাকে। যার সামান্য নমুনা মাত্র এই চেয়ারে রশি দিয়ে বাঁধাটা।

------ "রুশো, বলত এই ব্যাটার সাথে এখন ঠিক কি করা উচিত?"

অগ্নির প্রশ্নে ভাবুক ভঙ্গিতে জবাব দিলো রুশো,

------ "মোটাসোটা একটা বল্টু তো। পিটিয়ে মজা পাওয়া যাবে খুব। এক একটা মাইর ইকুয়ালটু উঁচ্চ মাত্রার ফাট্টাস!"

অগ্নি লোকটার পা থেকে মাথা অবধি আরেকবার চোখ বুলিয়ে নিলো। ভিলেনি হাসি হেসে বলল,

------ "মজাটাকে আরেকটু মাসালাদার বানানো গেলে কিন্তু ফাটাফাটি হবে। আমার কাছে দারুণ একটা জিনিস আছে।"

লোকটার ভয়ে প্যান্ট ভিজিয়ে ফেলার উপক্রম হওয়া কালীন চোখমুখ উজ্জ্বল করে বলল রুশো,

------ "কি আছে ব্রো? জলদি দেখাও!"

অগ্নি বাঁকা হেসে ব্যাগ থেকে একটা কাচের বোতল বের করলো। যার ভেতর কিলবিল করতে থাকা তেলাপোকার দল দেখে এক লাফ মেরে বিছানায় উঠে বসল রুশো। ভয়ার্ত গলায় বলল,

------ "ব্রোওও, দূ...দূ..দূরে রাখো ওগুলো আমার থেকে। আর তোমার ব্যাগে ওগুলো কি করছে?"

অগ্নি রুশোকে শান্ত হতে ইশারা করে বলল,

------ "আবে রিল্যাক্স, তোরে ডরাইতে বের করি নাই। হ্যাঁ অবশ্য তোর ওপর রিভেঞ্জ নিতেই এই ব্যবস্থা করছিলাম বাট এই ব্যাটায় চালটা উলটে দিলো।"

রুশো চোখ লাড্ডু বানিয়ে বলল,

------ "হোয়াট! লাইক রিয়েলি ব্রো! তুমি আমার ব্রো হয়ে আমার সাথে এমনটা করতে পারলে? কিভাবে ব্রো কিভাবে?"

সাথেসাথেই ধমকে উঠল অগ্নি,

------ "আব্বে চুপ! তুই যখন ভূত সাইজা আমার ওপর প্রাঙ্ক করস তখন যেমনে ভুইলে যাইস আমি তো ব্রো ঠিক তেমনেই আমিও তোর ওপর প্রাঙ্ক করতাম। তোর ভাগ্য ভালা দেইখা বাইচ্চা গেলি। এখন ভ্যাতকান্দুরার মতো চোখমুখ না উল্টায় এদিক আয়। এ ব্যাটারে তেলাপোকার সাগরে ভাসামু।"

রুশো কাঁদোকাঁদো মুখ করেই উঠে এলো। লোকটার মাথার ঘাম পা স্পর্শ করে ফেলেছে। পুরো মুখ স্কচটেপে বেঁধে রাখায় সামান্য "উউউ-আয়ায়া" করতে পারছেনা বেচারা। অগ্নি রুশোকে ইশারায় লোকটার জিপার দেখিয়ে বলল,

------ "চেইন খোল। ব্যাটারে আজকে চিনামু অগ্নি কি জিনিস।"

রুশো তেলাপোকা ভর্তি বোতলটা থেকে দূরত্ব বজায় রেখে পেটমোটা লোকটার প্যান্টের চেইন খুলল। অগ্নি আর এক মুহুর্ত অপেক্ষা না করে লোকের আন্ডারওয়্যারের ভেতরে ছেড়ে দিলো দশ-বারোটার মতো তেলাপোকা। লোকটা পারেনা মাটি ফাঁক করে পাতালে ঢুকে যায়। মুখ খুলে সামান্য চিৎকারের সুযোগটুকু নেই। চোখ বেয়ে জল গড়ানোতেই থেমে আছে স্রেফ। চেয়ারটা মৃদু কাঁপছে লোকের সর্বশক্তি দিয়ে নড়াচড়া করায়। অগ্নি-রুশো সেদিকে পাত্তা না দিয়ে কিচেন থেকে নিয়ে আসা হাতা-খুন্তি দিয়েই উদাম কেলানি শুরু করলো। রুশো বেছে বেছে বারি মেরে চলল লোকটার পশ্চাতে। রুশো কাছে এ যেন এক দারুণ খেলা বলে মনে হলো। আহ্লাদী কণ্ঠে ভাইয়ের উদ্দেশ্যে বলল,

------ "দেখেছ ব্রো, তোমায় বলেছিলাম না? এই কদম আলীকে পেটালে দারুণ সব আওয়াজ হবে? মোটকা'টাকে মেরে প্রচুর শান্তি পাচ্ছি। যেনো ফাট্টাস ফুট্টুস করে বোম্ব ফুটছে! আহা আহা !"

অগ্নি লোকটার পিঠে হাতার বারি মারতে মারতে জবাব দিলো,

------ "তাইলে থামতাছিস কেন? যত ইচ্ছা পেটা। নীবিড়কে পেট খারাপের ওষুধ খাওয়ানো তাইনা? শালা, ভোটকা ব্যাটার পেট'টাই আইজ ফাটায়া ফেলামু।"

#চলবে_______________

[ আজ আর বড় করতে পারলাম না। অগ্নি-রুশো বাংলা ধোলাই দিতে খুব ব্যস্ত। ওদের একটু সময় দিন বরং। ]

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৮৩তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন