ফন্ট সাইজ:
থিম:
অতৃপ্ত চাহনা

৯ম পর্ব

লেখক: তুরঙ্গনা

#অতৃপ্ত_চাহনা

#তুরঙ্গনা

পর্ব—||০৯||

আজ ভার্সিটিতে যাওয়ার বিন্দুমাত্র ইচ্ছে হয়নি তৃতীকার। ভোর রাত পর্যন্ত জেগে,সকালে আর ওঠা হয়নি তার। মাথাটা বেশ ঝিমঝিম করছিল ঘুম হতে ওঠার পর থেকেই। যথারীতি আজ সে সকালে কিছু রান্নাও করেনি। খাওয়ার বিন্দুমাত্র ইচ্ছে তার নেই।

সকালটা কোনোমতে কাটিয়ে দিয়ে, একটু আগেই অফিসে এসে পৌঁছালো সে। আজ চেহেরায় সেই প্রানবন্ত হাসির দেখা নেই। মলীন মুখশ্রীতেও তাকে আজ দেখতেও বেশ অদ্ভুত লাগছে। তৃতীকা ভারী শ্বাস ফেলে, নিজের ডেস্কে গিয়ে চুপচাপ বসে পড়ে। আশেপাশে না তাকিয়েই, নিজের সকল অবশিষ্ট কাজকর্ম করতে লাগে।কোনোদিকেই নজর দেওয়ার মতো বিন্দুমাত্র সময় তার নেই।

এরইমাঝে তার সম্মূখের পথ দিয়েই, নিজের কেবিনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিলো আধীর। এই সময়ে তৃতীকার দিকটায় এমপ্লয়িদের আসার কথা নয় বিধায়, আধীর তার স্বভাবসুলভ গম্ভীর্যের সহিতেই কোনো দিকে না তাকিয়েই এগিয়ে যায়।তবে হুট করে কি যেন ভেবে, আচমকা পাশে ফিরতেই নজরে পড়ে তৃতীকাকে।

আজ এতো তাড়াতাড়ি তৃতীকাকে অফিসে দেখে আধীর খানিকটা অবাক হয়। না চাইতেও, অজান্তেই তার কপাল কিঞ্চিৎ কুঁচকে যায়। সে মনে মনে কিছু একটা ভেবে নিয়েই, ভারী দীর্ঘ শ্বাস ফেলে। আর যাই হোক, অফিসের এমন টাইমে সে অন্তত তৃতীকার কাছে গিয়ে আগ বাড়িয়ে গল্প-আলাপ জুড়ে দেবে না। অন্তত এমন স্বভাবের মানুষ আধীর রায়ান নয়।

আধীর পুনরায় নিজের তীব্র গম্ভীর্য নিয়েই, নিজের কেবিনে প্রবেশ করে। আর এদিকে তৃতীকার তার কাজের প্রতি অত্যধিক মনোযোগী থাকায়, আধীরের বিষয়টা লক্ষই করে না।

আধীর চলে যেতেই প্রায় আরো কিছুটা সময়ের মাঝেই, অফিসে বাকি এমপ্লয়িগুলোও প্রবেশ করে। যথারীতি আজ জারাও তৃতীকাকে এতো আগে অফিসে দেখে কিছুটা অবাক হয়। একইসাথে অবাক হয় তৃতীকার অদ্ভুত গাম্ভীর্যতাকে লক্ষ করে। তবে এসবে তার কিছুই যায় আসে না। কেননা এই অফিসে তৃতীকা মেয়েটাই হলো তার কাছে সবচেয়ে অসহ্যকর। আর সে শুধু একটি মোক্ষম সুযোগের অপেক্ষা করছে—যার মাধ্যমে সে তৃতীকাকে তার মনের মতো করে জব্দ করবে।

_____

বরাবরের মতো আজও আধীর তৃতীকাকে নিজের কেবিনে ডেকেছে। অবশ্যই তা কাজের সূত্রেই। তৃতীকা তার বিধ্বস্ত চেহেরা নিয়েই, নীরবে আধীরের কেবিনে প্রবেশ করে। এবং প্রতিবারের মতো আধীরকে সে ফাইলের মাঝেই ডুবে থাকতে দেখে।

তৃতীকা ভেতরে প্রবেশ করতেই, আধীর গম্ভীর স্বরে ফাইলের দিকে মাথা নিচু করে থাকা অবস্থাতেই, তৃতীকার কাছে তার প্রয়োজনীয় ফাইলগুলো চেয়ে নে। তৃতীকা তার নিয়ে আসা হাতের ফাইলগুলো আধীরের কাছে এগিয়ে দিয়ে চুপচাপ সম্মূখে দাঁড়িয়ে থাকে।

আধীর ফাইলগুলো কিছুক্ষণ চেক্ করার পর, তৃতীকার দিকে তাকাতেই থমকে যায়। তৃতীকা মাথাটা কিঞ্চিৎ ঝুকিয়ে চুপচাপ দাঁড়িয়ে। পরনে সেই একই রকমের ড্রেসআপ। তবে কিছু তো একটা গড়মিল রয়েছে।তখন দূর হতে এতসব খেয়াল না করলেও,এখন বেশ অদ্ভুত লাগছে তাকে। আজকের তৃতীকা অন্যসকল দিন হতে অনেক বেশি ভিন্ন। পরিপাটি জামাকাপড়েও,তাকে অনেক বেশি অগোছালো ও বিধ্বস্ত ঠেকছে। ঠিক এমনটাই মনে হলো আধীরের।

সে লেদারের মোটা ফাইলটা বন্ধ করে, ভারী শ্বাস ফেলে। নিজের হাতে থাকা সাইন-পেনটাকে স্পিন আকারে দুবার ঘুরিয়ে শান্ত-গম্ভীর স্বরে তৃতীকার উদ্দেশ্যে আওড়ায়,

"মিস তৃতীকা! আপনি ঠিক আছেন?"

তৃতীকা কোনো এক গভীর ভাবনায় মগ্ন ছিল। আচমকা আধীরের কন্ঠস্বরে সে কিঞ্চিৎ চমকে ওঠে। সে নিজেকে স্বাভাবিক দেখাতে স্থির রইলেও,আধীর ব্যাপারটা বেশ স্পষ্ট ভাবেই বুঝতে পারে। একইসাথে তার কপালের মৃদু ভাজটাও দৃঢ় হয়।

আধীর তৃতীকার উদ্দেশ্যে আবারও আওড়ায়,

"মিস তৃতীকা...এনি প্রবলেম?"

---"জ্বী...আমি...আমি একদম ঠিক আছি।"

তৃতীকার এহেন দ্বিধাদ্বন্দ্বের কন্ঠস্বরে আধীর কিছুক্ষণ চুপ থাকার পর বলল,

"ওকে!"

এই বলেই সে আবারও চুপচাপ নিজের কাজে মনোযোগী হয়। অথচ সে চাইছে—তৃতীকার সাথে কিছু ভিন্ন বিষয়ে কথা বলতে। কিন্তু একটা অদ্ভুত সংকোচবোধ কাজ করছে নিজের মাঝে।হঠাৎ নিজের এমন পরিবর্তনতে আধীর নিজেই এখন বেশ অবাক।

সবগুলো ফাইল চেক করে, সাইন করার পর, আধীর নিস্পৃহে তা তৃতীকার দিকে ঠেলে দিয়ে ভারী শ্বাস ফেলে। তৃতীকার দিকে আড়চোখে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকার পর পুনরায় দীর্ঘ শ্বাস ফেলে সে।

ঘটনাটা সকাল বেলার। অনেকদিন পর আধীরের সাথে ঈয়াশ,হাফসা আর ঈশানী খেতে বসেছে। সকলের চোখেমুখে প্রফুল্লতা। তবে আধীর বরাবরের মতে গম্ভীর্যের সহিত ধীরে ধীরে নিজ গতিতে খেয়ে চলেছে।

এরইমাঝে হাফসা বেগম কি যেন ভেবেই আচমকা তার উদ্দেশ্যে বলে,

"আধীর! বাপ, তোমারে একটা কথা বলার ছিল।"

আধীর হাফসার কথায় নির্বিকারে বলে,

"জ্বী...।"

আধীরের অনুমতি পেতেই, হাফসা খানিকটা উচ্ছ্বাসের সহিতেই বলতে শুরু করে,

"বাপ, বয়স তো তোমার কম হলো না। এবার একটু বিয়ে-শাদি নিয়ে তোমার সিরিয়াস হওয়া উচিত। মেয়ের ঘরের নাতীকে দেখার তো সৌভাগ্য হয়েই গেল। এবার যদি ছেলের ঘরের..."

হাফসার কথা শেষ হতে না হতেই, আধীর শান্ত-গম্ভীর স্বরে আওড়ায়,

"ফুপি,আমি আগেও অনেকবার বলেছি—আমি এখন এসব নিয়ে ভাবছি না।"

---"এখন ভাববে না তো কখন ভাববে?"

---"আমার মতে আমার এসব নিয়ে ভাবার বয়স পেরিয়ে গিয়েছে। তাই এসব অযৌক্তিক বিষয়ে আলোচনা করে সময় নষ্ট না করাই ভালো।"

আধীরের এহেন কথায় হাফসা কিঞ্চিৎ বিরক্ত হলো। পাশ হতে ঈশানী হতাশায় ভারী শ্বাস ফেলল। অথচ আধীর নির্বিকারে খেয়ে চলেছে।

---"আধীর, এতো বাড়াবাড়ি করা বন্ধ করো। তোমার কথাবার্তার হাবভাব এমন যেন,তুমি বুড়ো হয়ে গিয়েছো তাই তোমার বিয়ের ব্যাপারে ভাবাটাও এখন অসম্ভব। সারাজীবন কি একা একাই কাটাবে নাকি?"

হাফসার বিরক্তসূচক কথাবার্তায়, আধীর খেতে খেতেই মৃদু মুচকি হাসে।

---"আমার তো একা থাকতে কোনো সমস্যা হচ্ছে না। আর এতো যে বিয়ে বিয়ে করছো— এই বুড়ো বয়সে আমাকে, কোন বাবা তার মেয়ে দেবে, শুনি?"

আধীরের এহেন কথায় হাফসা বিরক্ত হয়ে খাবার রেখেই চুপচাপ বসে রইল। ওদিকে ঈশানী বলল,

"ভাই, এবার কিন্তু সত্যিই বেশি বেশি হচ্ছে। তুমি এমন একটা ভাব করছো যেন—তুমি আশি বৎসরের কোনো বুড়ো। অথচ..."

---"এইটটি না হলেও,আ'ম থার্টি সেভেন...ইশানী!"

---"তো সাইত্রিশ হওয়া আর এমন কি? এর চেয়ে কত বুড়ো বুড়ো মানুষ গিয়ে বিয়ে করে। এছাড়া তুমি কি বাকিদের মতো নাকি। থার্টি সেভেন হলেও, দেখতে তো সাতাশ বছরের ছোঁকড়ার মতোই লাগে। আর বলছো মেয়ে...তুমি যাস্ট বলো, তুমি বিয়ের জন্য রাজি। মেয়ে কোথায় হতে কিভাবে আনতে হবে, সব আমাদের উপর ছেড়ে দাও। প্রয়োজনে মেয়ে কি'ডনা'প করতে হলে, তাই করব।"

আধীর আর কিছুই না বলে কিঞ্চিৎ মুচকি হাসে। তার সম্পূর্ণ নজর খাবারের প্লেটে। এখন অব্দি মুখ তুলেও কারো দিকে তাকায়নি। এরইমাঝে আবার আচমকা, হাফসা কি যেন ভেবে নিয়ে আধীরের উদ্দেশ্য বলে ওঠে,

"এরে আধীর,কাল যে মেয়েটা এসেছিল...ঐ ঈয়াশের মিস। ওকে না আমার অনেক পছন্দ হয়েছে। তুই যদি বলিস, তাহলে তৃতীকে এ বাড়ির বৌ করে আনলে হয় না?"

এ কথা শেষ হতে না হতেই, আধীর বিস্ময়ে বেশম খেয়ে উঠল। সে বিস্মিত স্তব্ধ চাহনিতে হাফসার দিকে তাকাতেই, হাফসা চুপসে যায়। অথচ ঈয়াশ ওদিকে কি বুঝল কে জানে,সে খাবার রেখেই খুশিতে লাফিয়ে উঠে বলে,

"ইয়ে! ঐ মিস তেঁতোকা রসগোল্লা আমার মামুর বউ হবে? আমার মামী হবে?"

এ দফায় যেন আধীর আবারও স্তব্ধ হয়ে যায়। বিষয়টা বুঝতেই, ঈশানী ঈয়াশকে থামিয়ে চাপা স্বরে আওড়ায়,

"ঈয়াশ, তোমার খাওয়া শেষ হলে ঘরে যাও। আর এসব বিষয়ে খবরদার তোমার মিসকে কিছু বলবে না।"

এই বলেই ঈয়াশকে ঈশানী ঘরে পাঠিয়ে দেয়। ওদিকে হাফসা আবারও কিছুটা ইতস্ততস্বরে বলে,

"আধীর, তৃতীকাকে কি তোর পছন্দ..."

হাফসার কথা আর শেষও হয়না। বরং তার পূর্বেই আধীর তার খাবার রেখেই উঠে পড়ে। ঈশানী আর হাফসা এমন মূহুর্তে কিছু বলতে চেয়েও যেনো আর আধীরকে থামাতে পারে না।

আধীর নির্বিকারে উঠে চলে যেতেই, ঈশানী তার মায়ের উদ্দেশ্যে চাপা স্বরে আওড়ায়,

"মা,তুমি পাগল হয়ে গিয়েছো? তৃতীকার বয়স কত কম। আর আধীর ভাইয়ের...দুজনের কিভাবে সম্ভব? তুমি যাস্ট পাগলামি করছো।'

আধীর যেতে যেতে ঈশানীর চাপা কন্ঠ স্বরও খুব ভালোমতোই শুনতে পেল। এবং সর্বশেষ কি যেন ভাবতে ভাবতেই দীর্ঘ শ্বাস ফেলল।

○

আধীর চুপচাপ বসে বসে সকালের ঘটনা গুলোর পুনরাবৃত্তি করছিল মানসপটে। মন-মস্তিষ্কে অনেক কিছুই তার ঘুরপাক খাচ্ছে। কিন্তু এখন তার কি করা উচিত তাই বুঝে উঠতে পারছে না।

এদিকে তৃতীকা ফাইলগুলো গুছিয়ে নিয়েছে। এবার এখান থেকে চলে যাবার পালা। কিন্তু যেই না সে, কাজ শেষে নিজের মাথা তুলেছে—ওমনি আধীরের নিস্প্রভ দৃষ্টির মুখোমুখি হয়। আধীর এতোক্ষণ তাকে একনাগাড়ে চেয়ে চেয়ে দেখছিল এবং নিজের ভাবনার অন্তরালে ডুবে যাচ্ছিল। কিন্তু আচমকা তার দিকে তৃতীকা তাকাতেই, সেও কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে যায়। ওদিকে তৃতীকার কাছেও ব্যাপারটা বেশ অদ্ভুত লাগে।

তৃতীকা সময় নষ্ট না করেই নিজের চোখ সরিয়ে নেয়। আর ঠিক তৎক্ষনাৎ আধীরও নিজেকে স্বাভাবিক করে ফেলে।

---"স্যার, আমি আসছি।"

---"জ্বী।"

আধীর নিমিষেই নিজের কাজে মনোযোগী হবার চেষ্টা করছে। তৃতীকার নিস্পৃহে চলে যাবার অনুমতি চাইতেই—সে নিজের মন্তব্য ছোট্ট পরিসরে জানিয়ে দেয়। তৃতীকাও আর দেরি না করে উল্টো ঘুরে, চলে যেতে উদ্বেগ প্রকাশ করে। তবে আচমকাই আবার আধীর গম্ভীর স্বরে পেছন হতে আওড়ায়,

"মিস তৃতীকা!"

আধীরের ডাকে, তৃতীকা পেছনে ফিরে তাকায়। আর ঠিক তৎক্ষনাৎ আধীর নিজের হাত দুটো মুঠো করে, তৃতীকার দিকে তাকিয়ে বলল,

"অফিস শেষে নিচে আমার ওয়েট করবেন। আপনার সাথে আমার কিছু গুরুত্বপূর্ণ কথা রয়েছে।"

আচমকা আধীরের এহেন কথায় তৃতীকা খানিকটা অবাক হয়। তবে আজকের মন-মেজাজ তেমন ভালো নেই বিধায়, সে এসব নিয়ে আর মাথা ঘামায় না। আলতোভাবে মাথা নাড়িয়ে বলে,

"জ্বী।"

_____

অফিস শেষে আধীর দ্রুতই আজ নিচে নেমে এলো। তবে অফিসের নিচে কোথাও তৃতীকাকে না দেখে তার কপাল কিঞ্চিৎ কুঁচকে গেল। সে আশেপাশে একনাগাড়ে সবদিকটাই লক্ষ করে দেখার চেষ্টা করল—আদোও তৃতীকা কোথাও রয়েছে কিনা! কিন্তু না, আশেপাশে কোথাও তৃতীকা নেই।

তৃতীকার বিষয়ে কাউকে জিজ্ঞেস করতে চেয়েও—সে নিজেকে থামায়। এইকাজ করা হয়তো মোটেও ঠিক হবে না। তবে তৃতীকাকে না দেখে,তার মেজাজ খানিকটা কড়া হয়। কিছুটা বিরক্তি নিয়েই সে মনে মনে আওড়ায়,

"আমি বলার পরও চলে গেল?"

___

আধীর গম্ভীর্যের সহিত গাড়ি চালাচ্ছে। মন-মেজাজ হুট করেই খিটখিটে হয়ে গিয়েছে। নিজেকে শান্ত রাখতে চেয়েও, পারছে না। এরইমাঝে রাস্তায় আচমকা ট্রাফিক জ্যামের মাঝে আঁটকে যায় সে। এই রাস্তা ফাঁকা, তো এই শত শত গাড়ি একত্রে চুপ হয়ে দাঁড়িয়ে। এসব দেখে মেজাজটা যেন তার আরো বেশি বিগড়ে যায়।

এরই মাঝে আচমকা তার নজর পড়ে, রাস্তার কিনারা দিয়ে হেঁটে চলা এক বিধ্বস্ত রমণীর দিকে। মৃদুছন্দে হেঁটে চলেছে। আশেপাশের তাকানোর মতো কোনো তোরজোর নেই তার। ওড়নাটা একপাশে কোনোমতে ঝুলে রয়েছে। আশেপাশে কি হচ্ছে তাতেও কোনো খেয়াল নেই। চুলগুলো ধুলোবালির হাওয়ায় এলোমেলোভাবে উড়ে বেড়াচ্ছে। অথচ মেয়েটি সর্বদা নির্বিকারে হেঁটে চলেছে।

এই মেয়েকে দূর হতে চিনতেও আধীরের একটুও সময় লাগল না। তবে তৃতীকাকে সকাল হতেই কিছুটা অদ্ভুত লেগেছে বিধায়,এখন তার এই অবস্থা দেখে সে কিছুটা বিচলিত। মনে মনে ভাবতে শুরু করেছে, তৃতীকার আদতে হয়েছেটা কি? সে কি সত্যিই তার ব্যাপারে কিছু জানে? গতকাল অফিস অব্দিও তো সব ঠিক ছিল। কিন্তু টিউশনিতে হঠাৎ দুজনের চোখাচোখি—এরপরই কি তৃতীকার এমন হাল হলো? কিন্তু কেনো?

আধীরের এসবের ভাবনাচিন্তার মাঝেই,আচমকা পেছন হতে গাড়ির হর্ন বেজে ওঠে। সে ভাবনায় ডুবে গিয়েছিল বিধায়,আশেপাশের কথা প্রায় ভুলতেই বসেছিল।

আচমকা হর্নের শব্দে আধীরের ধ্যান তৃতীকা হতে সরে আসে। সে বাকিদের সাথে তাল মেলাতে গাড়িটা সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যায়। তবে কিছুক্ষণ বাদেই আচমকা পাশে তাকাতেই সে সম্পূর্ণ স্তব্ধ হয়ে যায়।

তৃতীকা অদ্ভুত ভাবে গা ঢুলতে ঢুলতেই সামনের দিকে এগোচ্ছিল। সকাল হতে এখন অব্দি না খেয়ে থাকায়, তার এখন এই দশা। এর উপর গতকালের অপ্রত্যাশিত ঘটনা—সবমিলিয়েই সে আজ প্রায় বিধ্ব'স্ত। এমনকি আসার সময় আধীরের কথাটাও তার মাথা হতে বেড়িয়ে গিয়েছে বিধায়—আধীরের জন্য নিচে দাঁড়ানোও হয়নি তার। কি হতে কি হচ্ছে, তাই যেন বুঝে উঠতে পারছে না সে।

আর এরইমাঝে আচমকা তার মাথাটা চক্কর দিয়ে ওঠে। শুরু হতেই ঝিমঝিম করছিল,তবে এই পর্যায়ে এসে আর নিজেকে সে সামলাতে পারেনা। নিজের অর্ধছিঁড়ে জুতোয় নিয়েই, নিমিষেই হোঁচট খেয়ে পড়ে যায় রাস্তায়। হাতের ব্যগটাও ছিঁটকে পাশে পড়ে যায়।

তৃতীকা উঠতেও চেয়েও কোনোপ্রকার শক্তি সঞ্চয় করতে পারেনা। হাতদুটো তার ধুলোবালিতে মাখা পিচ ঢালা রাস্তার উপরে রাখা। হাতের উপর ভর দিয়েই,মাথা নুইয়ে বসে রয়েছে সে। কোনোমতেই মাথা সোজা করতে পারছে না।

এদিকে এমন পরিস্থিতিতে চারপাশে ভীড় জমে গেল। সবাই যে যার মতো গোল হয়ে আশেপাশে দাঁড়িয়ে রয়েছে।তার প্রতি কৌতুহলী হয়ে দেখতে। অথচ এই শহরের এতো র'ক্ত মাংসে গড়া প্রাণীগুলোর মাঝে কেউই তাকে সাহায্য করার প্রয়োজন বোধ করল না।

অন্যদিকে আধীর আর এসব দেখে চুপ হয়ে থাকতে পারল না। শুরুতে সে সম্পূর্ণ স্তব্ধ হয়ে রইলেও,এবার সে তার গাড়িটা মাঝ রাস্তাতে ফেলেই গাড়ি হতে বেড়িয়ে আসে। চারপাশের মানুষজন গাড়ি সরানোর জন্য চিৎকার চেঁচামেচি শুরু করলেও—সেসবের কোনো কিছুই যেন আধীরের কর্নপাত হচ্ছে না।

সে একপ্রকার ছুটে যায় তৃতীকার কাছে। ত্বরিত তৃতীকার পাশে হাঁটু গেড়ে বসে, তাকে আগলে ধরে রেখে সামনালোর চেষ্টা করে। একইসাথে সে এলোমেলো স্বরে আওড়ায়,

"মিস,তৃতীকা আপনি... "

আধীর কথা বলতে বলতেই, তৃতীকাকে টেনে তুলে দাঁড় করাবার চেষ্টা করে। তৃতীকাও নিভু নিভু দৃষ্টিতে আধীরের দিকে একপলক তাকায়। তবে পরক্ষণেই সব যেন স্তব্ধ হয়ে যায়। আধীরের কথা শেষ হতে না হতেই, তৃতীকা সম্পূর্ণ অচেতন হয়ে আধীরের বুকের একপাশে ঢলে পড়ে।আচমকা এহেন ঘটনায়, অসাবধায় তৃতীকা নিজের সম্পূর্ণ ভর ছেড়ে দিয়ে, নিচে পড়ে যেতে নিলেও—আধীর তৎক্ষনাৎ তাকে সামলে নিজের বক্ষস্থলের সাথে আগলে নেয়। এবং এই গম্ভীর স্বভাবের মানবটিও তখন, প্রচন্ড অস্থির স্বরে বলতে লাগল,

"এ্যাই তৃতীকা, কি হয়েছে তোমার? এ্যাই প্লিজ, চোখ খোলো!"

চলবে________

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৯ম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন