#অতৃপ্ত_চাহনা
#তুরঙ্গনা
পর্ব—||০৮||
"হেই বাডি,দেখো ওটা আমার নতুন মিস৷... আ...কি যেন নাম...মিস তেঁতোকা! কিন্তু সে অনেক ভালো, একদম আমার স্কুল ফ্রেন্ড মিষ্টির মতো রসগোল্লা।"
ঈয়াশের কথায় প্রত্যুকার করার সুযোগ হলো না আধীরের। সে কপাল কুঁচকে তৃতীকার দিকে চেয়ে রয়েছে। ওদিকে তৃতীকাও যেন তীব্র বিস্ময়ের চাহনিতে আধীরের দিকে তাকিয়ে।
---"এ খারুস, এখানে কি করছে? ইনিই কি তবে..."
তৃতীকা মনে মনে এরূপ কিছু আওড়িয়ে, পুনরায় সেদিনের কথা ভাবতে লাগল। গতকালই হয়তো এ বাড়ি হতে বের হবার মূহুর্তে, ঈশানী ফোনে কারো সাথে কথা বলার সময় 'আধীর' নামটা উচ্চারণ করেছিল। তখনও তৃতীকা ঈশানীর কথার সুরে ভেবেছিল,এই আধীরই হয়তো ঈশানীর স্বামী আর ঈয়াশের বাবা। কিন্তু এটা মোটেও বুঝতে পারেনি যে—তার অফিসের গম্ভীর খারুস বস ওরফে আধীর রায়ান চৌধুরীই সেই আধীর।
তৃতীকার চাহনি হতে যেন বিস্ময়ই কাটছে না। কেমন অবিশ্বাস্য ঠেকছে। সে যেখানেই যায়, সেখানেই কেনো এই আধীর রায়ানের উৎপত্তি হয়—তাই সে বুঝতে পারে না।
এদিকে আধীর কিছু না বলে, গম্ভীর্যের সহিত তৃতীকার দিকে তাকিয়ে রইলেও—পাশ হতে হাফসা বেগম বলে ওঠে,
"আরে নতুন মেডাম যে...!এই দেখো,আধীরকে পেয়ে তোমার কথা তো প্রায় ভুলেই গিয়েছিলাম। হ্যাঁ,রে আধীর। এটা ঈয়াশের নতুন মেডাম৷ মাইয়াটা অনেক ভালো, মাশাল্লাহ!"
হাফসার কথায় আধীর কিছুই বলে না। এবারও সে নির্বিকার। এদিকে আধীরকে এভাবে অদ্ভুত গম্ভীর নজরে একটানা তাকিয়ে থাকতে দেখে, তৃতীকা কিঞ্চিৎ ইতস্ততবোধ করে। সে আধীরের নজর হতে চোখ সরিয়ে পালাতে চেয়েও,বরাবরের মতোই পরাস্ত হয়। এটা কেনো হয়, তার উত্তর তৃতীকা এখনো প্রায়নি৷ মোটামুটি এসব ছোটখাটো কারণ মিলিয়েই,সে আধীরের উপর সবসময় বিরক্ত হয়ে থাকলেও,আপাতত কি করবে তাই বুঝে উঠতে পারছে না।
তৃতীকা এবার নিজেকে যথাসাধ্য সামলানোর চেষ্টা করে। ইতস্ততভাবেই সবার উদ্দেশ্যে বলে,
"আ...আমি বরং এখন আসছি।"
তৃতীকা এই বলেই, সামনের দিকে পা বাড়াতে নিলে,হাফসা পুনরায় বলে ওঠে,
"আরে, আগেই কোথাও যাচ্ছো? এদিকে আসো... আমার আধীর বাবার সাথে একটু আলাপ-পরিচয় করে যাও..."
হাফসার কথা শেষ হতে না হতেই, পাশ থেকে ঈশানী খানিক কেশে ওঠে। যেন নিজের মায়ের এসব কথার উদ্দেশ্য সে ঠিক ভালোই বুঝতে পেরেছে। যার ফলে, সে স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা, তৃতীকার উদ্দেশ্যে বলে,
"আচ্ছা, তুমি সাবধানে যেও।"
ঈশানীর কথায়, তার মা বাঁধা হয়ে কিছু বলতে নিলে—ঈশানী আড়ালে তার হাত চেপে, চাপা স্বরে আওড়ায়,
"মা! এখনই এসব না..."
মেয়ের নিষেধাজ্ঞায়, হাফসা বেগমও চুপ হয়ে যায়। ওদিকে তৃতীকা অনুমতি পেয়েই,একপ্রকার ছুটে বাড়ি হতে বেড়িয়ে পড়ে। বারান্দার কাছে আসতেই ভারী শ্বাস ফেলে, মনে মনে আওড়ায়,
"এই লোক এতো অদ্ভুত কেনো?"
অতঃপর বাহিরে এখনো বৃষ্টি হতে থাকায়, সে আনমনেই আধীরের নীল ছাতাটা—পুনরায় নিজের সাথে করে নিয়ে চলে যায়।
অন্যদিকে তৃতীকা চলে যেতেই আধীর স্বাভাবিক হয়। একসাথেই ঈশানী তার প্রয়োজনে ড্রইং রুম হতে চলে যেতেই, হাফসা বেগম আধীরের উদ্দেশ্যে উচ্ছ্বসিত স্বরে বলল,
"আধীর, মাইয়াটা সুন্দর না?"
হাফসা বেগমের ফিসফিস করে বলা কথায়, আধীর অজান্তেই খানিকটা চমকে তার দিকে তাকায়। তার সাথে সাথে ঈয়াশও হাফসার দিকে তাকিয়ে বলে,
"হু,এই মিস তেঁতোকা অনেক সুন্দর।একদম বগুড়ার দইয়ের মতো মিষ্টি।"
ঈয়াশের অবুঝ কথায়, হাফসা হেসে ফেলে বলে,
"আব্বা, ওইটা তেঁতোকা না, তৃতীকা।"
তবে এতোকিছুর পরও আধীর বরাবরের মতোই কিছুই বলছে না। সে ভিন্ন এক চিন্তায় বারবার হারিয়ে যাচ্ছে। সবশেষে আড়ালে নিজের ফোনের নোটিফিকেশন চেক করে,অজান্তেই ভারী দীর্ঘ শ্বাস ফেলে।
○
ঈয়াশ চৌধুরী ওরফে ঈশানীর ছেলে হলো আধীরের ভাগ্নে। অর্থাৎ ঈশানী তার নিজের বোন না হলেও—ফুপাতো বোন। আর হাফসা বেগম তার ফুপি৷তবে এখানে কিছুটা প্যাচগোচ রয়েছে। এই ‘চৌধুরী ম্যানশন’ হলো আধীরের দাদার পৈতৃক ভিটা। এবং আধীরের বাবারা ছিলেন দুই ভাই ও এক বোন। যেখানে আধীরের বাবা হলেন সবার বড়, অতঃপর তার আরো এক ভাই এবং সবচেয়ে ছোট হলো ঈশানীর মা হাফসা বেগম।
আর ঈশানীর বিয়ে হয় আধীরের ছোট চাচার একমাত্র ছেলের সাথে। অর্থাৎ ঈশানী ও তার স্বামী মামাতো-ফুফাতো ভাই-বোন। ফলাফল সরূপ, ঈয়াশ এই চৌধুরী বংশেরই ছেলে। এবং কিছু রহস্যেঘেরা অতীতের জন্যই, ঈশানী ও তার মা হাফসা বেগম এই চৌধুরী বাড়িতেই, বছরের পর বছর হতে শুধু তারা দুজন মিলেই বসবাস করছে।
এটাই ছিল মোটামুটি আধীরে সাথে ঈয়াশের পরিচয় পর্ব। যেখানে সামান্য কিছু ধোঁয়াশা এখনও অব্দি রয়েই গিয়েছে।
○
বাড়ি ফিরতে ফিরতে অনেকটা সন্ধ্যা হয়ে গেল তৃতীকার। রিকশা করে এসেও, এতো সন্ধ্যা নেমে যাওয়ার ব্যাপারটা তার মোটেও পছন্দ হলো না। এখন তো আরো দিন প্রতিনিয়ত ছোট হচ্ছে। কিছুদিন পর টিউশনি হতে ফিরতে ফিরতে দেখা যাবে, চারপাশে ঘুটঘুটে অন্ধকার নেমে গিয়েছে।
তৃতীকা খানিকটা হতাশা নিয়েই, বাড়ির দিকে এগোতে থাকে। চারপাশটা এমনিতেই নানা গাছপালায় পরিত্যক্ত জঙ্গলের মতো রূপ নিয়েছে। আর এমন অন্ধকার সন্ধ্যায় ঝিঁঝি পোকামাকড়ের অদ্ভুত আওয়াজে, তৃতীকার গা নিমিষেই ছমছম করে ওঠে।
সে অহেতুক এসবে মাথা ঘামাচ্ছে—এ ভাবনাতে আবার খানিকটা বিরক্তও হলো। তবে এই মূহুর্তে এসে তার আচমকা ছাতার দিকে নজর পড়ে। এখন বৃষ্টি পুরোপুরি থেমে যাওয়ায়,ছাতাটা এখনো তার হাতেই গুটিয়ে রাখা। সে ছাতাটার দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতেই ভারী শ্বাস ফেলে বলল,
"খারুসটা ওখানেই ছিল। ছাতাটা তখনই দিয়ে এলেই ভালো হতো।অবশ্য তখন দিয়ে দিলে,এখন আবার ভিজেই বাড়ি ফিরতে হতে।উফ! এতো ভেবে আমার কি কাজ? কাল দিয়ে এলেই কাহিনি ফুড়ুৎ। যাই হোক, বেটা নিজে খারুস হলেও,তার বউ আর ছেলেটা বেশ সুন্দর। এতো ভালো মানুষ এই বেটার কপালে কিভাবে জুটলো, কে জানে?"
তৃতীকা এইসব ভাবতে ভাবতেই নিচ তলা অব্দি চলে এসেছে। আবার আরো কিসব ভেবেই সে বিড়বিড় করে আওড়ায়,
"খারুস বেটা কি কঞ্জুস! আমি কি ওনার ছাতা খাব নাকি? আগ বাড়িয়ে ছাতা দিয়ে,আবার বলে, ‘মনে করে ছাতাটা দিয়ে যাবেন।’ এ্যাহ,কি ন্যাকা!"
তৃতীকা একের পর এক উল্টোপাল্টা চিন্তাভাবনা করছে,আর বিড়বিড়িয়ে আধীরের নামে মুখ ভাঙিয়ে চলেছে। শেষমেষ নিজের প্রতি ও আধীরের উপর চাপা রাগ, ক্ষোভ,বিরক্তি নিয়েই সে বলে,
"ওহ্ খোদা! এই বুড়ো বেটাকে আমার সহ্য হয়না কেনো, তুমিই বলো!"
---"হ্যালো বেইবি!
তৃতীকা নিজের সাথে আনমনে ভালোই কথা বলছিল। তবে আচমকা হঠাৎ কোনো এক পুরুষালী কন্ঠে তার রুহু অব্দি চমকে উঠল। তৃতীকা খেয়াল করে দেখে, তার সামনে বাড়িওয়ালার সেই বখাটে ছেলেটা দাঁড়িয়ে রয়েছে। কালো-শ্যামলা চেহেরা, নেশাখোরের ন্যায় চোখে-মুখে উন্মাদন, ঠোঁটের কোণায় এক বিদঘুটে হাসি। এছাড়া কিছুক্ষণ পরপরই ঘর্মাক্ত এলোমেলো কোঁকড়ানো চুলগুলো, হাত দিয়ে ব্যাক ব্রাশ করছে বিধায়— দেখতেও এক নরপিশাচের মতো লাগছে।
তৃতীকা একটা কথা না বলেই, দ্রু সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠতে চায়। আর ঠিক তৎক্ষনাৎ সেই ছেলে তৃতীকার বাম হাত চেপে ধরে। তৃতীকা খানিকটা ভয় ও বিস্ময়ের সহিত,তার দিকে পেছনে ফিরে তাকায়। দ্রুত হাতটা সরিয়ে নিতে মোচড়ানো শুরু করলে, ছেলেটা তার হাত আরো শক্ত করে চেপে ধরে বলে,
"হেই ডার্লিং! এতো তাড়া কিসের তোমার? দেখলাম নিজে নিজেই কথা বলছিলে। তো একটু-আধটু কথাবার্তা তো আমার সাথেও বলতে পারো।"
এই বলেই ছেলেটি পুনরায় তার বত্রিশ পাটি দাঁত বের করে, বিদঘুটে হাসিতে মেতে উঠল। অন্যদিকে তৃতীকা ভেতরে ভেতরে অনেকটা ভয় পেলেও, নিজেকে যথাসাধ্য সামলে কড়া স্বরে বলে ওঠে,
"হাত ছাড়ুন আমার। অসভ্যতা করলে, ফলাফল কিন্তু মোটেও ভালো হবে না।"
---"ওহ আচ্ছা? তোমার বুঝি অনেকগুলো রূপ? আমাকে একটা দেখাও না প্লিজ? তোমার ফিগার কিন্তু পুরো..."
ছেলেটা তৃতীকার শরীরের দিকে কুরুচিপূর্ণ চাহনিতে তাকিয়ে পর্যবেক্ষণ করছিল এবং কথাগুলো বলছিল। কিন্তু শেষ অব্দি তৃতীকা বিষয়গুলো মোটেও আর সহ্য করতে পারল না। তার চোখের কোণায় পানি জমে উঠলেও, মুখশ্রী জ্বলে উঠেছিল তীব্র ক্ষোভে। সে দুদণ্ড ভাবনা-চিন্তা না করে, অকস্মাৎ ছেলেটির গাল বরাবর সজোরে চ'ড় মে'রে দেয়।
নিমিষেই রোগাপাতলা ছেলেটা গিয়ে ছিঁটকে দেওয়ালের সাথে ধাক্কা খায়। আর তৃতীকা তার হাত ছাড়া পেতেই, কোনোমতে দৌড়ে দোতলায় নিজের ঘরে চলে যায়।
এদিকে ছেলেটি নিচ হতেই, প্রচন্ড রাগ-ক্ষো'ভের দৃষ্টিতে তৃতীকাকে চেয়ে চেয়ে দেখছিল।ঠোঁটের কোণায় এক জোরপূর্বক তীক্ষ্ণ হাসি। তার হাতটা এখনও তৃতীকার চ'ড় মা'রা স্থানে শক্ত করে চেপে রাখা। গালটা ব্যাথায় জ্বলজ্বল করছে। তবে তার চোখে তৃতীকার প্রতি যে আক্রোশ জ্বলছে—তা নিমিষেই বুঝিয়ে দেয়,এ চ'ড়ের ফলাফল মোটেও ভালো হবে না।
____
রাত বারোটা পেরিয়ে গিয়েছে। অথচ তৃতীকার চোখে ঘুম নেই। আজ বাড়ি ফিরে কোনো প্রকার রান্নাও করেনি সে। যথারীতি তার রাতের খাবারটাও আর খাওয়া হলো না৷ এভাবেই সেই সন্ধ্যা হতে আনমনে বসে সে। কিছুই যেন ভালো লাগছে না।
বাড়িওয়ালার ছেলের নাম সে ঠিক জানে না। আর তা জানানোরও প্রয়োজন বোধ করেনা তৃতীকা। লোকটিকে তার শুরু হতেই প্রচন্ড বিরক্ত লাগে। এক কথায় যাকে বলে অসহ্যকর।কিন্তু এই মূহুর্তে বাড়ি ছাড়তে পারছে না বিধায়,এর কোনে সমাধানও হচ্ছে না। বাড়িওয়ালাকে এইসব বিষয়ে বললে, সে হয়তো তার চরিত্র নিয়েই কথা তুলবে।
তৃতীকা আর এসব নিয়ে ভাবতে চায় না৷ সন্ধ্যায় তীব্র অক্রোশে সে ছেলেটিকে একটা সজোরে চ'ড় মে'রে দিলেও, ঘরে এসে দরজা বদ্ধ করে সে অঝোরে কেঁদেছে।
শহরের জীবনে টিকে থাকতে হয়তো সে, নিজেকে দৃঢ় রাখার এক তীব্র প্রচেষ্টা করে—কিন্ত বাস্তবে তো সে খুবই দুর্বল। এতো লোকজনের মাঝে একা-একলা টিকে থাকার মতো গড়ে ওঠা ব্যক্তি তো সে নয়।
তৃতীকার সামনে ভার্সিটির সিনিয়রদের সেসব নোট খাতা পড়ে রয়েছে। আজ নিজের পড়াও যেমন হয়নি, তেমনি এদের নোটগুলোও সেভাবে একটাও তুলে শেষ করতে পারেনি। তৃতীকা খাতাগুলোর দিকে চেয়ে থাকতে থাকতেই, প্রচন্ড বিরক্ত হলো। এবং হঠাৎই রেগে গিয়ে অকস্মাৎ একহাতের থাবা দিয়ে সবগুলো বই-খাতা সে বিছানা হতে ছুঁড়ে ফেলে দিলো। এবং তৎক্ষনাই দু-হাত একত্র করে, অঝোরে কান্নায় সিক্ত হলো।
তার সর্বস্ব এখন ঘিনঘিন করছে। ছেলেটার হাত ধরার দৃশ্য বারংবার মনে পড়তেই অদ্ভুত সব পাগলামি করতে ইচ্ছে হচ্ছে । যেন এই মূহুর্তে ওই ছেলে সহ পৃথিবীর সবাইকে শেষ করে দিতে পারলে, তার শান্তি হতো।কিন্তু তৃতীকা জানে এসব সে করতে পারবে না। তাই মিথ্যে কল্পনা করেও কোনো লাভ নেই।
---"বাবা-মা! তোমরা কেনো আমাকে একা ফেলে চলে গেলে? কেনো আমায় নিজেদের সাথে করে নিয়ে গেলে না? আমার আর ভালো না এই পৃথিবী। আমি ক্লান্ত...আমি ভীষণ ক্লান্ত…!"
তৃতীকা কাঁদতে কাঁদতে কয়েকবার ফুঁপিয়ে উঠল। তার কান্নার শব্দ তীব্র না হলেও, পরিত্যক্ত এক ঘরে শুভ্রতায় মোড়ানো অল্প বয়সী এই রমণীর কান্না যেন—এক অশরীর রূপে ধরা দিচ্ছে।
_________
আজ চৌধুরী ম্যানশনেই থাকতে হবে বিধায়,আধীরের হাতে তেমন কোনো কাজকর্ম নেই। নয়তো তার প্রয়োজনীয় সবকিছুই, তার নিজস্ব ফ্ল্যাটে রেখে আসা। হ্যাঁ, এতো বড় একটা বাড়ি থাকতেও, আধীর আলাদাভাবে একাই একটি ঢাকার আভিজাত্যপূর্ণ ফ্ল্যাটে থাকে। মাঝেমধ্যে ঈয়াশের জন্য এখানে এলেও,একরাতের বেশি সে কখনোই থাকেনা৷
চৌধুরী ম্যানশনে আধীরের নিজস্ব কক্ষ রয়েছে। প্রতিবার এলে সে এখানে থাকে। তার কক্ষ হওয়ায়, এটি থাকে সর্বদা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন। এবং বাড়িতে আধীর এলে ঈয়াশও সেই রাত টুকু,তার সাথে এই রুমেই কাটায়।
ঈয়াশ বিছানার একপাশে নীরবে ঘুমিয়ে রয়েছে। রুমের সবগুলো লাইট নিভানো। শুধুমাত্র বিছানার পাশের টেবিল ল্যাম্পটা মৃদুভাবে জ্বলছে। তারই আলোয় ঘরের জানালার পাশে দেখা যাচ্ছে, এক গম্ভীর মানবের বিস্তৃত ছায়া।
আধীর জানালার পাশে দাঁড়িয়ে কারো সাথে কথা বলছে। পরনে সুট-বুটের পরিবর্তে, আজ শুধুই সাদা রঙের পাঞ্জাবী।সাদামাটা বেশভূষায় দেখতেও বেশ ভিন্ন লাগছে বরাবরের চেয়ে। কিন্তু চোখে-মুখে থাকা স্পষ্ট গম্ভীর্যের ছাপ বারংবার প্রমাণ করে দেয়—এটাই সেই গম্ভীর আধীর রায়ান চৌধুরী।
আধীরের চোখ-মুখে গম্ভীর্যের পাশাপাশি, সন্দিহান অভিব্যক্তির এক মৃদু রেখা। সে শুরুতেই ফোনের অপর প্রান্তে থাকা ব্যাক্তিটির উদ্দেশ্যে বলে,
"কাজ হয়েছে তো?"
অতঃপর একে একে টুকটাক নানান কথাবার্তার পর, সে ফোনটা রেখে দেয়। এই পুরো সময়টাতে যেন ফোনের অপর প্রান্তে থাকা ব্যক্তিটিই শুধু কথা বলে গিয়েছে। আর আধীর শুধু তা মনোযোগ সহকারে শুনেছে।
ফোন রেখে দেওয়ার পর আধীর ভারী শ্বাস ফেলে। কিছুটা চিন্তিত ও অস্থির ভঙ্গিতে সে,দূরের এক রাস্তার ধারে ল্যাম্পপোস্টের ঘোলাটে আলোর দিকে চেয়ে থাকে। নিশীথের শীতল বাতাস তার সর্ব গায়ে এসে লাগছে। কিন্তু সে নিস্পৃহে ভেবে চলেছে ভিন্ন কিছু। খানিকটা সময় পেরিয়ে যাবার পর, আধীর বিড়বিড়িয়ে গম্ভীর্যের সহিত আওড়ায়,
"মিস তৃতীকা তালুকদার! আমার সন্দেহ তবে ভুল ছিল না।"
এইটুকুই বলা মাত্রই সে মৃদুভাবে কিঞ্চিৎ রুক্ষ বাঁকা হাসে। পরক্ষণেই আবার কি যেন ভেবে, কিছুটা সন্দিহান স্বরে আওড়ায়,
"আমার সন্দেহ যদি পুরোপুরি সত্যি হয়,তবে আপনিই সেই তালুকদার বংশের মেয়ে।যাকে আমি...কিন্তু আপনি কেনো বললেন,আপনার বাড়ি নারায়নগঞ্জে...আপনার বাড়ি তো...মিথ্যে কেনো বললেন আপনি? নাকি আপনি আমাকে চিনতে পেরেছেন।...এটা কি করে সম্ভব। এতো বছর পরও, ও আমাকে চিনবে কি করে?"
একে একে নিজেকে করা, নানান অর্ধপূর্ণ কথাবার্তা ও প্রশ্নের পর আধীর নিস্পৃহেই দীর্ঘ শ্বাস ফেলে। এই মূহুর্তে সে ভাবছে, তৃতীকাকে নিয়ে তার পরবর্তী পদক্ষেপ ঠিক কি হওয়ায় উচিত।
চলবে________