#বসন্তের_দিনগুলো
#লেখিকা_সিনথিয়া_জাহান (সিনু)
#পর্বঃ১৬
পরিবেশ টা বেশ জমজমাট হয়ে উঠেছে ৷ নিয়ামত আলম আর জোসনা সুলতানা ওদের সকলের সাথে খুনশুটিতে মেতে উঠেছে ৷ যদিও সিনুর প্রচন্ড মুড অফ তবুও সেটা এই আনন্দে ভাটা ফেলতে পারেনি ৷ তানিয়া সিনু ব্যতীত সকলের সাথেই হেসে খেলে কথা বলছে তাতে করে সিনুর মনটা অত্যধিক খারাপ হয়ে গেল ৷
সাজিদের বে'হায়া চোখ বারবার একজনের উপর আটকে যাচ্ছে ৷ শত চেষ্টা করেও নিজের বে'হায়া চোখকে বাধা দিতে পারছে না ৷ আড়চোখে সাজিদের সব কাজ এক জোড়া অভিজ্ঞতা সম্পন্ন চোখ খেয়াল করল ৷ এমন দৃশ্য দেখে চোখের মালিক বেশ খুশি হয়েছে বলে মনে হলো ৷
মেহমেত বাচ্চাদের মতো আঙ্কেল আন্টির সাথে অনর্গল কথার বুলি ফুটাতে লাগল ৷ তা দেখে তানিয়ার চোখমুখ কুঁচকে গেল ৷ বিরবির করে বলল,,,
এই লোককে আমার স'হ্য হয় না কেন? আমার এই ১৯ বছরের জীবনে এমনটা তো কখনো হয়নি! কারো প্রতি আমার রাগ বেশিক্ষণ থাকে না তাহলে এটার বেলায় সমস্যা কি?
তানিয়াকে বিরবির করতে দেখে মেহমেত গল্প থামিয়ে ভ্রু কুঁচকে ওর দিকে তাকিয়ে বলল,, Whatever নিশ্চয়ই মনে মনে আমাকে গা'লি দিচ্ছেন?
তানিয়া গম্ভীর মুখে ওর দিকে চোখ তুলে তাকিয়ে বলল,, আমার থেকে গা'লি খাওয়ার মতো যোগ্যতা টাও আপনার নেই mr. Whatever!
এই যে মিস ত্যানাত্যানা আমার মাথা খারাপ করবেন না বলে দিলাম নয়তো...
মেহমেতদের কথা টেনে নিয়ে তানিয়া তৎক্ষণাৎ বলল,, নয়তো কি? কি করবেন আমাকে? মারবেন? কাটবেন? নাকি বি'ষ খাওয়াবেন?
এমন লো ক্লাস বুদ্ধি আমি ইউজ করি না ৷ Whatever আমি আপনাকে কোলে তুলে ডাস্টবিনে ফেলে দিব নয়তো চলন্ত গাড়ির সামনে ধাক্কা দিব নয়তো ড্রেনে বা নর্দমায় ফেলে দিব আর নয়তো প্লেনে উঠিয়ে প্যারাসুট ছাড়াই আপনাকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিব! আমার মা'রার পদ্ধতিগুলো একটু অ্যাডভেঞ্চারাস, বুঝেছেন মিস ত্যানাত্যানা?
ওর কথা শুনে তানিয়া ব্যতীত সবাই হাসতে লাগল ৷ তানিয়া তো চোখ দিয়েই মেহমেতকে গিলে খাবে এমন একটা অবস্থা ৷ অত্যন্ত কর্কশ কন্ঠে ও বলল,,,
mr. Whatever আমারও কিছু ইউনিক পদ্ধতি জানা আছে ৷ যেমন ধরুন জোর করে খাইয়ে খাইয়ে আপানাকে ব্রয়লার মুরগির মতো ফোলাবো তারপর যখন কোনো মেয়ে আপনাকে পাত্তা দিবে না তখন আপনি ডিপ্রেশনে চলে যাবেন যেটা আমাকে পৈশাচিক আনন্দ দিবে!
বলে তানিয়া বাকা হাসল ৷ ওর এমন অদ্ভুত কথা শুনে আবারও সবাই হেসে উঠল ৷ সিনু তানিয়ার পিঠে হাত রেখে হাসতে হাসতে বলল,,,
জাস্ট অসাধারণ তানি ৷তোর মতো উচ্চ লেভেলের ভাদাইম্মা বুদ্ধিমতী মেয়েকে নিজের বেস্ট ফ্রেন্ড হিসেবে পেয়ে আমি ধন্য ৷
তানিয়া মুখের সমস্ত হাসির রেশ গায়েব করে অত্যন্ত জোরে নিজের পিঠ থেকে সিনুর হাতটা সরিয়ে দিয়ে বলল,,, আমি কারো বেস্ট ফ্রেন্ড না ৷ আমার সাথে যেন দ্বিতীয়বার কথা বলতে না দেখি ৷ নয়তো কি করব সেটা আমি নিজেও জানি না ৷
তারপর বসা থেকে উঠে তানিয়া সকলের উদ্দেশ্যে বলল,, আমি একটু আসছি ৷ মারিয়া আর নুসরাত একা হয়তো কাস্টমারদের সামলাতে পারছে না ৷
তানিয়া ভিতরে চলে গেল ৷ সিনুর মুখটা করুন হয়ে গেল ৷ ও মাথা নিচু রেখে বসে আছে ৷ জোসনা সুলতানা চিন্তিত স্বরে বললেন,,,
তোমাদের দুজনের কি হয়েছে?
সিনু কোনো জবাব দিল না ৷ সিনুর হয়ে রাইমা বলল,,, আসলে আন্টি সামান্য ভুল বোঝাবুঝি হয়েছে ৷ তবে চিন্তার কোনো কারন নেই ৷ তানিয়ার মাথা টা ঠান্ডা হলেই ও আবার আগের মতো হয়ে যাবে ৷ এই মুহূর্তে ওর মেজাজ অত্যন্ত হট হয়ে আছে তাই কি করছে সেটা ও নিজেও বুঝতে পারছে না ৷
মেহমেত ব্যঙ্গ করে মনে মনে বলল,, এ্যাহহ অ'পমান করল আমাকে , রা'গ দেখালো আমাকে , এখন আবার আমার না মেনে নেওয়া ভাবীর সাথেও রুড আচরণ করছে! এই মেয়ের মাথা কি আগুনের তৈরি নাকি?Whatever যার সাথে বিয়ে হবে সে ছেলের কপাল পোড়া ৷ এখন থেকেই তোর জন্য মন থেকে সমবেদনা জানাচ্ছি রে ভাই!
সিনুর অসহায় মুখটার দিকে সাজিদ নির্নিমেষ তাকিয়ে আছে ৷ ওর দিকে তাকিয়ে থেকেই সাজিদ মনে মনে বলল,,,
পারলে তোমার সমস্ত কষ্টগুলো নিজের নামে লিখিয়ে নিতাম সিনুপাখি! তোমার এই শুকনো মুখটা যে আমাকে ভীষণ পীড়া দেয়! মুখে একটু হাসি ফুটিয়ে তোলো সিনুপাখি নয়তো আজ রাতে আমি ঘুমোতে পারব না ৷
একজন স্টাফ এসে সাজিদ আর মেহমেতকে উদ্দেশ্য করে বলল,, স্যার কয়েকজন লোক এসেছে আপনাদের সাথে দেখা করতে ৷ কিছু জরুরি কাজ আছে নাকি ৷
সাজিদ সিনুর থেকে চোখ সরিয়ে স্টাফ টিকে বলল,, তুমি উনাদের বসতে দাও ৷ আমরা আসছি ৷
স্টাফটা মাথা হেলিয়ে চলে গেল ৷ সাজিদ নিয়ামত আলম আর জোসনা সুলতানার থেকে বিদায় নিয়ে শপে যাওয়ার জন্য পা বাড়াল ৷ সাজিদ যেতে ধরেও আরো একবার পিছু ঘুরে সিনুর দিকে তাকাল ৷ এই দৃশ্যটাও সেই চোখ জোড়ার কাছে ধরা পড়ল ৷
নিয়ামত আলম সিনুকে মন খারাপ করে থাকতে দেখে ওর দিকে এগিয়ে গিয়ে ওর মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বলল,,,
শোনো বাচ্চা আমরা তার উপরেই অভিমান করি যাকে আমরা ভালোবাসি ৷ তাই ধৈর্য ধরে তানিয়ার অভিমান ভাঙাও ৷ ও তোমাকে অনেক ভালোবাসে তাই তো তোমার বলা সামান্য একটু কথাতেই বাচ্চাটা আ'ঘাত পেয়েছে ৷ বুঝেছো তো এখন তোমার কি করা উচিত?
সিনু মুখে হাসি ফুটিয়ে বলল,, হ্যাঁ বুঝেছি আঙ্কেল ৷ আপনাকে জাযাকাল্লাহ আমার বুদ্ধি খুলে দেওয়ার জন্য ৷
পাশ থেকে রাইশা বলে উঠল,, তোর বুদ্ধি কি এতোক্ষন সুপার গ্লু দিয়ে আটকানো ছিল?
সিনু হেসে উঠে কৌতুকের স্বরে বলল,, না তুই কব্জা করে রেখেছিলি নিজের কাছে ৷
সিনুকে একটু স্বাভাবিক হতে দেখে রাইমা বলল,, হামারা সিনু বাপাস আ গেয়া ৷
তুম হিন্দি পারতাহে?
রাইমা ভাব নিয়ে বলল,, তুসছে জাদা পারতাহে ৷
রাইশা রাইমার গাল টেনে ধরে বলল,, হ্যাঁ হ্যাঁ তুই সব পারিস ৷ তবে বলতে বাধ্য হচ্ছি তোরা দুজন রাজাকারের বংশধর নয়তো বাংলা ভাষাকে এভাবে ভুলে যেতে পারতি না!
রাইমা মুখ ভেংচি কেটে বলল,, উহু আমরা না ৷ ওটা ওই গম্ভীর মুখের প্রফেসর ৷
সিনু হেসে উঠে বলল,, নাভিন ভাইয়া তো ইংল্যান্ডের ভুল করে ফেলে যাওয়া বংশধর , রাজাকারের বংশধর না ৷
তোর ওই ভাই সবার ই বংশধর!
°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°
সন্ধ্যার আগে আগে নিয়ামত আলম আর জোসনা সুলতানা চলে গেছেন ৷ শপের কাজ গোজ-গাজ করে চারজনই বাড়ি যাওয়ার জন্য প্রস্তুতি নিতে লাগল ৷ তানিয়া রোবটের মতো স্কুটি বের করার জন্য এগিয়ে গেল ৷ সিনু ওর পথ আগলে বলল,,,
ওই তানি এমন করিস কেন? আমার একদম ভালো লাগছে না ৷
তানিয়া গম্ভীর কন্ঠে বলল,, সামনে থেকে সর ৷
সিনুও জোর দিয়ে বলল,, না আমি সরব না ৷ তুই আগে আমার কথা শোন ৷
তানিয়া একই টোনে বলল,, সামনে থেকে সর ৷
সরব না ৷ বলে সিনু তানিয়ার দু কাধ ঝাঁকিয়ে বলল,, এতোটা নি'র্দয় কবে থেকে হয়ে গেলি?
তানিয়া বিরক্তিতে 'চ' কারান্ত উচ্চারণ করে সজোরে সিনুকে ধা'ক্কা দিল ৷ সিনু পড়তে ধরেও শেষ মুহূর্তে গিয়ে নিজেকে সামলে নিল ৷ ও অবাক হয়ে তানিয়ার দিকে তাকিয়ে আছে ৷ রাইমা, রাইশা দ্রুত ওদের দিকে এগিয়ে আসল ৷ রাইশা কিছুটা ধ'মকের স্বরে বলল,,,
কি হচ্ছে তানিয়া? মাথা খারাপ হয়ে গেছে তোর?
তানিয়া সে কথার জবাব না দিয়ে সিনুকে উদ্দেশ্য করে বলল,, আমার জীবনের সবচেয়ে বড় ভুল কি জানিস? তোর সাথে বন্ধুত্ব করা! যদি পারতাম তাহলে তোর-আমার প্রথম সাক্ষাৎ আমি আমার স্মৃতি থেকে চিরতরে মুছে ফেলতাম!
বলে তানিয়া মাথায় হেলমেট চাপিয়ে স্কুটিতে করে সেখান থেকে চলে গেল ৷ পিছন থেকে রাইমা চেঁ'চিয়ে উঠে বলল,,,
এবার তুই অতিরিক্ত বাড়াবাড়ি করছিস তানিয়া! আজকের বলা এই কথাগুলোর জন্য তুই খুব পস্তাবি! অপরাধবোধে ভুগবি!
সিনু ছলছল চোখে তানিয়ার যাওয়ার দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে ৷ ওর কোনো হেলদোল নেই , স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছে ৷ রাইমা আর রাইশা ওকে গিয়ে ধরল ৷ সিনু পানিতে টইটম্বুর চোখ দুটো তুলে ওদের দুজনের দিকে তাকিয়ে বলল,,,
ও এভাবে বলতে পারল? আমি কি এতোটাই খারাপ? আমার খুব কষ্ট হচ্ছে রে? ও কেন বোঝে না আমি ওকে কতটা ভালোবাসি? তোরা তিনজন যে আমার কতটা প্রিয় সেটা কেন বোঝাতে সক্ষম হই না আমি? আমি ব্যর্থ, ভীষণভাবে ব্যর্থ ৷
রাইমা সিনুর চোখের পানি মুছে দিয়ে নরম কন্ঠে বলল,, আমরা সব জানি ৷ তোকে বোঝাতে হবে না ৷ আর ওই তানিয়াকে তো আমরা কাল রিমান্ডে নিব দেখি কিভাবে তোকে ইগনোর করার সাহস পায়!
রাইশা ওর সাথে তাল মিলিয়ে বলব,, হ্যাঁ ঠিক ৷ কাল ওর মাথায় পিস্তল ঠেকিয়ে বলব, সিনুকে ভালোবাসা দিবি কিনা বল! তখন দেখব কোথায় পালায় ও?
ওর কথা শুনে সিনু ক্রন্দনরত অবস্থাতেই হেসে উঠল ৷ রাইমা তাড়া দিয়ে বলল,,
কালকের বিষয় কাল দেখা যাবে ৷ এখন বাসায় যাওয়া যাক ৷ আমাদের দেরি হয়ে যাচ্ছে ৷
তারপর ওরা তিনজন স্কুটিতে চড়ে বাসার উদ্দেশ্যে চলে গেল ৷ দূর থেকে এতোক্ষন এক জোড়া আহত চোখ এই দৃশ্য দেখতেছিল ৷ সাজিদ অস্ফুট স্বরে বলল,,,
সিনুপাখি ডোন্ট লুজ হোপ ৷
°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°
তানিয়া তিরিক্ষি মেজাজ নিয়ে বাসায় পৌঁছাল ৷ সরাসরি রুমে গিয়ে ও জামাকাপড় নিয়ে বাথরুমে চলে গেল ৷ এই তপ্ত রোদে কাজ করে ভীষণ ক্লান্ত হয়ে গিয়েছিল তার উপর সিনুর সাথে এই ঝামেলা ৷ তাই এই মুহূর্তে গোসল করা অতীব জরুরি ৷ গোসল সেরে ভেজা চুলগুলো মুছে তানিয়া ফ্যানের নিচে এসে বসল ৷ শরীরটা এখন বেশ সতেজ লাগছে ৷
তানিয়া জানালা দিয়ে বাইরের মিশকালো অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে আছে ৷ আজকের দিনে ওর করা সমস্ত কাহিনী গুলো এক এক করে মস্তিষ্কে এসে ধরা দিতে লাগল ৷ সিনুকে ধাক্কা দেওয়া আর অজান্তেই বলে ফেলা কথাগুলো মনে পড়তেই তানিয়ার মুখ খানিকটা চুপসে গেল ৷ বিরবির করে বলল,,,
আমি আজ একটু বেশিই রিয়েক্ট করে ফেলেছি ৷ সিনু হয়তো অনেক কষ্ট পেয়েছে ৷
এমন সময় ওর ফোনটা বেজে উঠল ৷ ফোনের স্ক্রিনে রাইশার নামটা জ্বলজ্বল করছে ৷ তানিয়া ভ্রু কুঁচকে ফোনটা রিসিভ করে কিছু বলার আগেই ওপাশ থেকে রাইশার কান্নারত কন্ঠস্বর ভেসে আসল,,,
সিনু এ্যাক্সিডেন্ট করেছে তানি! আমরা ওকে হাসপাতালে নিয়ে যাচ্ছি তুই দ্রুত আয় ৷
কথাটা কোনোমতে শেষ করে রাইশা ফোন কেটে দিল ৷ তানিয়া ফোন কানে নিয়ে কয়েক সেকেন্ড অবিচল ভাবে বসে থাকল ৷ ওর মস্তিষ্ক কাজ করছে না ৷ রাইশার বলা কথাগুলো এখনো ও ধরতে পারেনি ৷ কিছু সময় পর বুঝতেই তানিয়া তাড়াহুড়ো করে গায়ে বোরকা চাপিয়ে দৌঁড়াতে দৌঁড়াতে বাড়ির বাইরে চলে গেল ৷
তানিয়ার মা তুলি বেগম পিছন থেকে বারবার ডাকলেও ও কোনো জবাব না দিয়ে উদভ্রান্তের মতো স্কুটি স্টার্ট করে বাড়ির সীমানা পেরিয়ে গেল ৷ ও সর্বোচ্চ স্প্রিডে স্কুটি চালিয়ে যাচ্ছে ৷ রাস্তায় খুব একটা ভীড় না থাকায় ও খুব দ্রুতই হাসপাতালে পৌঁছে গেল ৷
রিসেপশনিস্টের থেকে ক্যাবিন রুম জেনে নিয়ে ও দৌঁড়াতে দৌঁড়াতে সেদিকে ছুটে গেল ৷ দৌঁড়ানোর সময় অনেকের সাথে ধাক্কা লাগলেও তানিয়ার সেদিকে কোনো খেয়াল নেই ৷ কাঙ্ক্ষিত ক্যাবিনের সামনে যেতেই ওর পা থেমে গেল ৷ সিনুর বাবা-মা, সিরাত , রাইমা, রাইশা সবাই অটি রুমের সামনে দাঁড়িয়ে ক্রমাগত পায়চারি করছে ৷
তানিয়ার দিকে চোখ যেতেই রাইমা আর রাইশা ওর দিকে এগিয়ে গেল ৷ তানিয়া কম্পিত কন্ঠে বলল,,
কি-কি-কিভাবে হলো? স-স-সিনু কেমন আছে?
রাইমা ক্রন্দনরত কন্ঠে বলল,, হঠাৎ একটা ট্রাক এসে ওর স্কুটিতে ধা'ক্কা মে'রেছিল ৷ সিনুর অবস্থা খুব একটা ভালো নয় ৷
তানিয়া বিস্ফোরিত চোখে ওর দিকে তাকিয়ে বলল,, কি! ভালো নয় কেন? ডাক্তারদের বল ওকে ভালো করে দিতে ৷
রাইশা নিজের কান্না আটকে বলল,,, দোয়া কর সিনুর যেন কিছু না হয় নয়তো আমরা বাঁচতে পারব না ৷
রাইমা জোর দিয়ে বলল,, এসব কি বলছিস? খবরদার এমন কথা বলবি না! ওর কিছু হতে পারে না ৷
তানিয়া ওকে থামিয়ে দিয়ে কাঁদতে কাঁদতে বলল,,, আমার জন্যই এমন হয়েছে ৷ নিশ্চয় আমার বলা কথাগুলো ভাবতে ভাবতে ও স্কুটি চালাচ্ছিল যার দরুন আজ ওর এই অবস্থা হয়েছে!
রাইমা আর রাইশা ওকে সান্ত্বনা দিয়ে বলল,, নিজেকে দোষ দিস না তানি ৷ এতে তোর কোনো হাত ছিল না ৷ আর আমাদের সিনু অনেক স্ট্রং , ওর কিছুই হবে না ৷ আল্লাহ ওকে বাঁচিয়ে দিবে ৷
অটি রুমের লাইট নিভে গেল ৷ একজন ডাক্তার দরজা খুলে বেরিয়ে আসল ৷ সেটা দেখতেই তিনজনই দৌঁড়ে সেদিকে চলে গেল ৷ সিনুর বাবা সাফায়েত জামান উত্তেজিত হয়ে বললেন,,,
আমার মেয়ে কেমন আছে?
ডাক্তার টা মুখের মাস্ক খুলে উদাস মুখে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন,,, আপনারা ধৈর্য ধরুন ৷ এ সময় নিজেকে সামলানো উচিত ৷
তানিয়া চেঁচিয়ে উঠে বলল,, ধৈর্য ধরব মানে? সিনু এখন কেমন আছে বলুন ৷
ডাক্তার ওর দিকে তাকিয়ে বলল,, সরি টু সে বাট সি ইজ নো মোর ৷ এক্সচুয়েলি উনাকে হাসপাতালে আনার পথেই উনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছেন ৷
কথাটা শুনতেই সিনুর মা জ্ঞান হারিয়ে মেঝেতে লুটিয়ে পড়লেন ৷ সাফায়েত জামান বুকে হাত দিয়ে ধপ করে বেঞ্চে বসে পড়লেন ৷ সিরাত মায়ের পাশে গিয়ে জোরে জোরে আপু বলে কাঁদতে লাগল ৷ ওদিকে তানিয়া, রাইমা, রাইশা ফ্যাল ফ্যাল করে এখনো ডাক্তারের দিকে তাকিয়ে আছে ৷ ওরা কিছু বুঝতে পারছে না ৷
তানিয়া মুখে জোরপূর্বক হাসি টেনে বলল,, আপনি আমাদের সাথে মজা করছেন তাই না? সিনু আমাকে শা'স্তি দেওয়ার জন্য আপনাকে এসব করতে বলেছে,ঠিক বলছি তো?
ডাক্তার অসহায় মুখে ওর দিকে তাকিয়ে বলল,, আই এম সরি বাচ্চারা কিন্তু আসলেই তোমাদের বান্ধবী আর বেঁচে নেই ৷
তিনজনই একে অপরের দিকে তাকিয়ে হঠাৎ গগনবিদারী আ'র্তনাদ করে কেঁদে উঠল ৷ তানিয়া কাঁদতে কাঁদতে আহাজারি করে বলতে লাগল,,,
আমার প্রতি অভিমান নিয়েই চলে গেলি? তোর থেকে যে আমার মাফ চাওয়া বাকি আছে সিনু ৷ আমাকে এতো বড় শাস্তি দিস না! আমাদের ছেড়ে কিভাবে যেতে পারলি?
তানজিদ ছুটতে ছুটতে এগিয়ে এসে তানিয়াকে ধরে বলল,, কি হয়েছে তানি?
ভাইয়া ও ভাইয়া আমার সিনু কোথায় হারিয়ে গেল? আমি ওকে খুব কষ্ট দিয়েছি ৷ আমার থেকে ক্ষমা না নিয়েই কেন চলে গেল? ওকে ফিরিয়ে এনে দাও আমার কাছে ৷ পাগলিটা বুঝলোই না আমি ওকে কতটা ভালোবাসি ৷ ওই ছেলের পক্ষ নিয়েছিল জন্য আমার জেলাস ফিল হয়েছিল তাই ওর প্রতি রাগ করেছিলাম ৷ সিনু একটাবার ফিরে আয়, আমি আর কখনো তোর সাথে খারাপ আচরণ করব না ৷ সবসময় তোকে আগলে আগলে রাখব ৷ ফিরে আয় ৷
চলবে,,,,,