#বসন্তের_দিনগুলো
#লেখিকা_সিনথিয়া_জাহান (সিনু)
#পর্বঃ১৭
জানালা দিয়ে সূর্যের আলো এসে তানিয়ার চোখে মুখে পড়ল ৷ ও ভীষণ ছটপট করতেছে ৷ পুরো শরীর ঘেমে একাকার ৷ নিচে থেকে হঠাৎ তুলি বেগমের আওয়াজ কানে আসতেই তানিয়া ধড়পড় করে উঠে পড়ল ৷ ও খুব জোরে জোরে শ্বাস নিতেছে ৷ চোখ বড় বড় করে আশেপাশে তাকিয়ে অস্ফুট স্বরে বলল,,,,,
আমি না হাসপাতালে ছিলাম? এখানে কিভাবে আসলাম? আর স-স-সিনু কোথায়?
তাড়াহুড়ো করে ফোনটা হাতে নিয়ে দেখল ১০ টা বাজে ৷ ওর মাথায় কিছুই ঢুকছে না ৷ ও নিজের রুমে কি করছে? তারপর নিজের পোশাকের দিকে খেয়াল হতেই দেখল কাল রাতে গোসল সেরে যে জামা টা পড়েছিল সেটাই ওর পড়নে ৷ চুলগুলোও খোলা ৷ তানিয়া কয়েক মূহুর্ত থম মেরে বসে থাকল ৷ তারপর মস্তিষ্ক সজাগ হতেই ও বুঝতে পারল এতোক্ষন ও এসব স্বপ্নে দেখছিল ৷ তার মানে সিনুর কিছুই হয়নি ৷
তানিয়া আর এক মুহূর্ত দেরি না করে ফ্রেশ হয়ে বোরকা পড়ে নিল ৷ তারপর হন্তদন্ত হয়ে নিচে নামল ৷ ড্রয়িংরুমে যেতেই তুলি বেগম ভ্রু কুঁচকে বললেন,,,
এতো বেলা করে উঠলি কেন? আর কাল রাতে না খেয়েই কে ঘুমাতে বলেছিল?
তানিয়া স্কুটির চাবি নিতে নিতে বলল,, আমাকে ডাকোনি কেন?
ম'রার মতো ঘুমাচ্ছিলি , আমি ডাকলে কি আর উঠবি?
হয়েছে হয়েছে আমি গেলাম ৷
যাবি মানে? খেয়ে যা , কালকেও কিছু খাসনি ৷
তানিয়া সদর দরজা দিয়ে বেরিয়ে যেতে যেতে বলল,,, খাওয়ার চেয়েও জরুরি কিছু কাজ বাকি আছে আমার ৷
তুলি বেগম আহাম্মক হয়ে মেয়ের কান্ডকারখানা দেখলেন ৷ তানিয়া সর্বোচ্চ স্প্রিডে স্কুটি চালিয়ে শপের দিকে যেতে লাগল ৷ শপের কাছাকাছি এসে কোনোমতে স্কুটি টা পার্ক করে সামনের দিকে এগিয়ে যেতেই দেখল সিনু গভীর মনোযোগ দিয়ে একটা সাইনবোর্ডে কিছু লিখছে ৷ তার পাশেই অনেকগুলো চকলেট আর ফুল সাজিয়ে রাখা ৷
সিনুকে দেখতেই তানিয়া ইমোশনাল হয়ে গেল ৷ ধীর পায়ে ওর দিকে এগিয়ে যেতে লাগল ৷ ওর দিকে চোখ যেতেই সিনু চট জলদি 'আফওয়ান' লেখা সাইনবোর্ডটা উপরে তুলে মিষ্টি করে একটা হাসি দিয়ে বলল,,
কাল তো আমার সাথে ব্রেকআপ করলি তাই আবারও তোকে ইমপ্রেস করার জন্য নতুন নতুন আইডিয়া জেনারেট করতেছি ৷ তার মধ্যে এটা একটা ৷
তানিয়া হঠাৎ কেঁদে দিয়ে দৌঁড়ে সিনুকে গিয়ে জরিয়ে ধরল ৷ রাইমা আর রাইশা হতভম্ভ দৃষ্টিতে সেটা দেখল ৷ রাইশা রাইমার কানে কানে বলল,,,
এক রাতেই ওর অপরোধবোধ প্রবল হয়ে উঠল নাকি? নিশ্চয়ই পরকালে হিসাব দেওয়ার কথা মনে পড়েছিল এই গা'ধার!
রাইমা ঠোঁটে আঙুল দিয়ে বলল,, চুপ কর ৷ সামনের প্রেম কাহিনী মনোযোগ দিয়ে দেখতে দে ৷
তানিয়া সিনুকে শক্ত করে জরিয়ে ধরে ফ্যাচ ফ্যাচ করে কাঁদতে লাগল ৷ সিনু আ'হাম্মক হয়ে ওর পিঠে হাত দিয়ে বলল,,,
আমি তো ভেবেছিলাম তোর মাথায় পি'স্তল ঠেকিয়ে বলব,,'ভালোবাসা দিবি কি না বল?' কিন্তু তার আগেই পেয়ে গেলাম? আমার ঠিক হজম হচ্ছে না তানি ৷
তানিয়া ফোপাতে ফোপাতে বলল,, আমাকে ক্ষমা করে দে ৷ কাল ওসব কথা আমি মন থেকে বলিনি ৷ তুই আর রাইমা রাইশা আমার কাছে নিজের জীবনের থেকেও বেশি দামী ৷ তোর উপর তো ওটা আমার ক্ষণিকের রা'গ ছিল ৷ আর শ'য়তান এসে আমার কানে তোকে নিয়ে নানা কু'মন্ত্রনা দিয়েছিল তাই ওসব বেহুদা ফালতু কথা বলে ফেলেছিলাম ৷ মাফ করে দে সোনা ৷ আর কখনো শ'য়তানকে নিজের উপর প্রভাব বিস্তার করতে দিব না প্রমিস ৷
সিনু কপট রাগ দেখিয়ে বলল,, ওই বে'য়াদপ শ'য়তানকে ঠাটিয়ে কয়েকটা থা'প্পড় মা'রতে পারিসনি? চ'ড় মেরে ওটার দাঁত নড়িয়ে দিতি! কত্ত বড় সাহস আমার মতো ভদ্র বাচ্চাকে নিয়ে তোর কানে বি'ষ ঢালে!
তানিয়া কান্নারত অবস্থাতেই খানিকটা হাসল কিন্তু সিনুকে ছাড়ল না ৷ সিনুও পরম যত্নে তানিয়াকে নিজের সাথে জরিয়ে রাখল ৷ রাইশা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে বলল,,,
যাক বাবা এই আপদ দুটোর মান-অভিমান তো ভাঙল! নয়তো আমাদের দুজনকে জ্বালিয়ে মা'রত তাই না রাইমা?
রাইমা রাইশার ঘাড় ধরে বলল,, দেখ দেখ কেমন নব্য বিবাহিত দম্পতির মতো একে অন্যের সাথে চিপকে আছে ছ্যাহ! মনে তো হচ্ছে কোনো রোমান্টিক মুভি দেখছি ৷
রাইশা ওর কথায় হাসতে লাগল ৷ তানিয়া এখনও মৃদু কান্না করতে করতে সিনুকে জরিয়ে ধরে আছে ৷ সিনু এবার কৌতুকের স্বরে বলল,,,
এই ছাড় আমার ল'জ্জা লাগে ৷ এভাবে কেউ জরিয়ে ধরে থাকে নাকি? আমার স্বামীর অর্ধেক হক ই তো তুই ন'ষ্ট করে দিলি!
রাইশা গলা কিছুটা উচিয়ে বলল,, এই তানি ছাড়িস না ৷ আমরা দৃশ্যটা দারুন উপভোগ করছি ৷ সাথে পপকর্ন থাকলে আরো ফিল পেতাম ৷
তানিয়া এবার সিনুকে ছেড়ে দিল ৷ তারপর রাইশা রাইমার দিকে তাকিয়ে বলল,,,
তোরা হা'রামির দল! এতো ইমোশনাল একটা মুহূর্তেও ঠাট্টা করতেছিস? তোরা কি আর ভালো হবি না?
রাইমা হাই তুলে বলল,, আমরা ভালো ছিলাম কবে যে ভবিষ্যতে হবো?
তানিয়ার চোখ এখনও পানিতে ভরা ৷ সিনু সেটা নিজের হিজাব দিয়ে সন্তর্পণে মুছে দিল ৷ ওর দিকে তাকিয়ে তানিয়া মুচকি হাসল ৷ আর ওদের দুজনকে আবারও ভাব করতে দেখে রাইমা আর রাইশা তৃপ্তির হাসি হাসল ৷
দূর থেকে এক জোড়া বাদামী চোখ নিজের সিনুপাখির মুখে হাসি ফুটতে দেখে স্বস্তির নিশ্বাস ফেলল ৷ আরো কিছুক্ষণ সেদিকে তাকিয়ে থেকে সাজিদ নিজের কাজে মনোযোগ দিল ৷ সাজিদ ছাড়াও আরো এক জোড়া চোখ সামনের দৃশ্যপট দেখতে ব্যস্ত ৷ তবে কিছুটা পার্থক্য রয়েছে ৷ সাজিদ তাকিয়ে ছিল তার সিনুপাখির দিকে কিন্তু এই চোখের মালিক অন্য একজনের দিকে মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে আছে ৷
মেহমেত আশেপাশের সবকিছু ভুলে গিয়ে সামনে ক্রন্দনরত মেয়েটির দিকে অপলক চাহনিতে তাকিয়ে আছে ৷ আজ ওর কাছে মেয়েটাকে মোটেও ঝ'গড়ুটে মনে হচ্ছে না বরং ছিচ কাঁদুনে এক ছোট্ট মেয়েকে দেখতেছে যে কিনা নিজের কাছের মানুষের থেকে ক্ষমা পাওয়ার জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা করে যাচ্ছে ৷
এর আগে কখনো মেহমেতের বুকে ধুকপুকানি উঠেনি কোনো মেয়েকে দেখে ৷ কিন্তু আজ যেন হৃৎপিন্ড বাইরে বেরিয়ে আসতে চাচ্ছে ৷ ও এখনও হা হয়ে সামনের দিকে তাকিয়ে আছে ৷ কেউ মনে হচ্ছে ওর চোখ দুটোকে সামনের দৃশ্যে আটকে দিয়েছে ৷ কোনো ভাবেই সেটা সরাতে পারছে না ৷
মেহমেত নিজের বুকে হাত চেপে অস্ফুট স্বরে বলল,, এমন লাগছে কেন আমাকে? Whatever এই মহিলাকে কাঁদলে অনেক কিউট লাগে ৷
বলে মেহমেত মুচকি মুচকি হাসতে লাগল ৷ পর মুহূর্তেই মাথা ঝাকিয়ে নিজের হাসিহাসি মুখটা পরিবর্তন করে নিজেই নিজেকে বলল,,,
এএএএ মেহমেত থেমে যা নয়তো সারাজীবন ওই ঝ'গড়ি মহিলার প্যানপ্যানানি স'হ্য করতে হবে! Whatever ওই পোড়া কপালের ছেলেটা তুই ই হয়ে যাবি যাকে সমবেদনা জানিয়েছিলি!
মেহমেত ব্যঙ্গ করে বলল,, মিস ত্যানাত্যানা আর আমি! অ্যাহহহ অসম্ভব জাস্ট অসম্ভব! বে'হায়া মন তুই পদ্মা সেতুতে গিয়ে ঝাপ দে! Whatever তোর আর আমার পথ আলাদা ৷
বললেই কি আর মনকে নিয়ন্ত্রণে আনা যায়? নাহ মোটেও নাহ ৷ বেহায়া মন নিজের মর্জি মত চলতেই পছন্দ করে ৷ যেমন মেহমেত নিজেকে ভুজুং-ভাজুং বোঝালেও চোখ ঠিকই সামনের দিকে আপনা আপনি চলে গেছে যা সে আটকাতে পারেনি ৷
°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°
সিনুর গায়ের সাথে ঘেষে তানিয়া বসে আছে ৷ এমন ভাব করছে যেন ছেড়ে দিলেই ও উড়ে যাবে ৷ রাইমা ভ্রু কুঞ্চিত করে সেদিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে বলল,,,
এ তানির বাচ্চা সিনুকে কি বিয়ে করে নিজের বউ বানিয়ে নিয়ে যেতে চাস নাকি? আমার কিন্তু এতে ঘোর আপত্তি আছে ৷ কারন আমি আমার দুলাভাই হিসেবে কোনো শরীফকে মেনে নিতে পারব না!
তানিয়া কটমট দৃষ্টিতে ওর দিকে তাকিয়ে বলল,, তোর দাঁত ভেঙে দিব ফাজিল! আমি কোনো ছেলেকে বিয়ে করব, সিনুকে না ৷
দুঃখিত দয়া করে আপনি অন্যকিছু ভাঙার প্রতি নজর দিন কারন আমার দাঁত ই নেই তাহলে আপনি ভাঙবেন কি?
কথাটা রাইমা অত্যন্ত ভাব নিয়ে বলল ৷ ওর কথা বলার ভঙ্গি দেখে ওরা তিনজনই হাসতে লাগল ৷ রাইশা হাসি থামিয়ে সিরিয়াস মুখভঙ্গিতে তানিয়াকে উদ্দেশ্য করে বলল,,,
জোক্স এপার্ট ৷ তানি তুই হঠাৎ নিজের ভুল বুঝতে পারলি কিভাবে? মানে বলতে চাচ্ছি কাল তো একদম ফায়ার মুডে ছিলি ৷ সিনুকে ধা'ক্কা-ঢুক্কা মেরে একাকার করে ফেলেছিলি আর ওকে তো কিসব আউল ফাউল বি'ষের বাণ ছুড়েছিলি তাহলে আজ কি হলো?
তানিয়া তৎক্ষণাৎ সিনুর দুহাত ধরে বলল,, কাল কোথাও ব্যা'থা পাসনি তো? আমাকে মাফ করে দে ৷ আমি জীবনে এমন কাজ আর কখনো করব না ৷ প্লিজ মাফ করে দে আমাকে ৷
সিনু মুচকি হেসে বলল,, মাফ করেছি তো ৷
তানিয়া মাথা নেড়ে বলল,, না তুই এখনও মাফ করিসনি ৷ দয়া করে মাফ করে দে ৷
রাইশা কপট রাগ দেখিয়ে বলল,, কতবার মাফ চাবি? ও তোকে বহু আগেই মাফ করে দিয়েছে ৷ যদি বিশ্বাস না হয় তাহলে ওর পা ধরে ঝুলে থাক আ'হাম্মক! তবে পরে ঝুলিস আগে আমার প্রশ্নের উত্তর দে ৷
তানিয়া একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে কাল রাতে দেখা ওর স্বপ্নের কথা বলল ৷ সিনু চোখ দুটো রসগোল্লার মতো বড় বড় করে বলল,,,
মে মার গেয়া! কোন কানা ট্রাক ড্রাইভার এসে আমাকে টক্কর মেরেছিল রে? নাম বল দ্রুত নাম বল, ওটার ব্যবস্থা এখনি করতে হবে ৷
তানিয়া রাইমা,রাইশার দিকে আঙুল তুলে বলল,, ওরা জানে , ওরাই আমাকে ফোন দিয়ে তোর এ্যা'ক্সিডেন্টের কথা বলেছিল ৷
সিনু গম্ভীর মুখে ওদের দিকে এগিয়ে গিয়ে বলল,, কোন বেডা আমাকে ধা'ক্কা দিয়েছিল বল!
রাইমা আর রাইশা আহাম্মক হয়ে গেল ৷ ওরা একে অপরের দিকে হতভম্ভ দৃষ্টিতে তাকাল ৷ সিনু সিআইডির মতো করে ওদের জিজ্ঞাসাবাদ করতে লাগল ৷ রাইমা বিরক্তিতে 'চ' কারান্ত উচ্চারণ করে বলল,,,
ব'লদ আমরা কিভাবে জানব? তানিয়া স্বপ্ন দেখেছে আমরা তো দেখিনি ৷ তোর আক্কেল কবে হবে?
সিনু মাথায় হাত দিয়ে ক্যাবলা মার্কা একটা হাসি দিয়ে বলল,, ওওওওও সেটাও তো ৷
রাইশা বড় করে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,, বে'আক্কল!
সিনু সেসব পাত্তা না দিয়ে গভীর আগ্রহ ভরে তানিয়ার পাশে গিয়ে বসে বলল,,, আমার ম'রার খবর শুনে কার কেমন অবস্থা হয়েছিল রে তানি? তোরা কাঁদতে কাঁদতে দাঁত লাগিস নি?
তানিয়া মুখ বেকিয়ে বলল,, বয়েই গেছে আমার কান্না করতে ৷ তবে রাইমা আর রাইশা কি কান্না কি কান্না!
রাইমা ঘোর বিরোধিতা করে বলল,, ওই ব'লদের জন্য কে কান্না করতে যাবে? আমি স্বপ্নেও কাঁদব না আরো তো বাস্তব! আমি যেখানে সেখানে নিজের মূল্যবান চোখের পানি ন'ষ্ট করি না, ওকে?
সিনু ঠোঁট উল্টে বলল,, নি'ষ্ঠুর মেয়ে! আমি যেদিন থাকব না সেদিন তোরা আমার মূল্য বুঝবি!
তানিয়া সিনুর দিকে তাকিয়ে মনে মনে বলল,, সত্যিই মূল্য বুঝেছিলাম রে! কাল বুঝতে পেরেছি তুই আমার হৃদয়ে ঠিক কতটা জায়গা জুড়ে অবস্থান করছিস ৷
রাইশা ভ্রু কুঁচকে বলল,, কেন কোথায় যাবি তুই?
সিনু বুকে দুহাত গুজে গম্ভীর গলায় বলল,, কোথায় আবার? চলে যাব শ্বশুরবাড়িতে ৷ তখন আর র'ক্ত অশ্রু বের করেও আমাকে পাবি না হুহহহ!
চলবে,,,,