ফন্ট সাইজ:
থিম:
বসন্তের দিনগুলি

৩২তম পর্ব

লেখক: সিনথিয়া জাহান

#বসন্তের_দিনগুলো

#লেখিকা_সিনথিয়া_জাহান (সিনু)

#পর্বঃ৩২

খাওয়া দাওয়া শেষে এখন সবচেয়ে পীড়াদায়ক পর্বের পালা, বিদায়ের পালা ৷ সিনুর ভিতরটা মনে হচ্ছে পু'ড়ে যাচ্ছে ৷ এই পরিবার, এই জীবন, এই বাড়ি, নিজের রুম সবকিছু ছেড়ে সম্পূর্ণ অজানা , অচেনা আর নতুন নতুন মানুষের সাথে ভিন্ন এক পরিস্থিতিতে গিয়ে থাকতে হবে ৷ এটা তো চাট্টিখানি কথা না ৷ মিনা জামিন তো বিয়ে পড়ানোর সময় থেকেই কান্না করে যাচ্ছেন ৷ এবার সাফায়েত জামানও নিজের আদরের মেয়ের বিদায়ে কেঁদে ফেললেন ৷

সিনু বাবাকে জরিয়ে কাঁদতে লাগল ৷ আর আহাজারি করে বলতে লাগল,, আমাকে এতো তাড়াতাড়ি কেন বিদায় করে দিলে আব্বু? আমি কি তোমাকে খুব বেশি য*ন্ত্রণা দিয়ে ফেলেছিলাম? কেন করলে এমন?

সাফায়েত জামান ভাষা হারিয়ে ফেললেন ৷ উনি এখন মেয়েকে কি বলে সান্ত্বনা দিবেন যেখানে নিজেকেই কোনো সান্ত্বনা দিতে পারছেন না? মিনা জামিন পাশ থেকে এসে সিনুকে জরিয়ে ধরে কাঁদতে লাগলেন ৷ তিনজনই সমান তালে কেঁদে চলেছে ৷ সিরাত ছাদে গিয়েছিল চুপি চুপি অনেকগুলো চিপস খাওয়ার জন্য ৷ নিচে নেমে সবাইকে কাঁদতে দেখে ও অবাক হয়ে গেল ৷ তানিয়ার কাছে গিয়ে জিজ্ঞাসা করল,,,

সবাই কান্না করছে কেন আপু?

ক্রন্দনরত তানিয়া চোখের পানি মুছে ক্ষীণ কন্ঠে বলল,, তোমার আপু চলে যাচ্ছে অন্যের বাড়িতে ৷

জানি তো ৷ কিন্তু কয়েকদিন পর আবার চলে আসবে তারপর আমরা একসাথে থাকব ৷

রাইমা পাশ থেকে বলল,, না বোনু সিনু এখন থেকে এ বাড়ির আত্মীয় ৷ তোমার ফুফু , মামা, মামী রা যেমন এক- দুদিনের জন্য আসে তেমনি তোমার আপুও আসবে ৷ আজ থেকে তোমার আপুর বাড়ি এটা না,সাজিদ ভাইয়ার বাড়ি হবে তোমার আপুর বাড়ি ৷

সিরাত অবাক হয়ে বলল,, আপু সারাজীবনের জন্য চলে যাবে?

রাইশা ফোপাতে ফোপাতে বলল,, হ্যাঁ রে বোনু ৷

সিরাত আশ্চর্য হয়ে গেল, অজান্তেই চোখ দিয়ে টপটপ করে পানি ঝড়তে লাগল ৷ তারপর দৌঁড়ে গিয়ে বোনের শাড়ির আঁচল টেনে ধরে বলল,,,

আপু তুমি আমাকে ছেড়ে যেও না ৷ আমি আর কোনোদিন তোমাকে জ্বালাতন করব না তবুও যেও না ৷

সিনু বোনকে ধরে জোরে জোরে কাঁদতে লাগল ৷ তারপর ছলছল চোখে তানিয়াদের দিকে তাকাল ৷ ওরা পানিতে টইটম্বুর চোখ দুটো নিয়ে ওর দিকে তাকাল ৷ তারপর ছুটে গিয়ে চারজনে একে অপরকে জরিয়ে ধরে কাঁদতে শুরু করল ৷ বিয়ে বাড়ির জাকজমক মুহূর্তেই ফিকে হয়ে গেল ৷ ওদের কান্নার আওয়াজে আকাশ বাতাস ভারী হয়ে উঠল ৷

মেহমেত সাজিদের পাশে দাঁড়িয়ে আছে ৷ কিছু বলবে না বলবে না করেও সাজিদের কাছে মুখ নিয়ে গিয়ে বলল,,,

জানি এখন কথা বলা ঠিক না তবে যা দেখছি মনে হচ্ছে সবাই আমার না মেনে নেওয়া ভাবীকে অনেক ভালোবাসে ৷ বিদায় দিলে মনে হয় কম বেশি সবাই ভালোবাসা দেখায়, তাই না? দেখ আমার না মেনে নেওয়া ভাবীর ছোট বোন কেমন কান্না করছে যেখানে সারাদিন ওরা ঝ'গড়া করে! তাই ভাবছি আমি শ্বশুরবাড়িতে পারমানেন্টলি চলে যাব তখন হয়তো তুই আমার প্রতি নিজের ভালোবাসা অন্তত দেখাবি ৷

সাজিদ দাঁতে দাঁত চেপে গম্ভীর গলায় বলল,, শ্বশুরবাড়িতে না তোকে সোজা পাবনায় রেখে আসব! মুখ বন্ধ কর বে'য়াদব!

মেহমেত ওর এক ধমকেই মুখ বন্ধ করে ফেলল ৷ তারপর সামনের দৃশ্য দেখতেই ওর ভ্রু কুঁচকে গেল ৷ তানজিদ তানিয়াকে ধরে অন্যদিকে নিয়ে গিয়ে ওর কান্না থামাতে ব্যস্ত হয়ে পড়ল ৷ এক এক করে ওদের চারজনকে সবাই আলাদা করল ৷ সাফায়েত জামান নিজের মেয়ের হাত ধরে সাজিদের সামনে নিয়ে গেলেন ৷ তারপর কান্নারত কন্ঠে বললেন,,,,

আমার মেয়েকে খবরদার কখনো ক'ষ্ট দিবে না নইলে আমি গিয়ে আমার মেয়েকে নিয়ে আসব ৷

আপনাকে সেসব ভাবতে হবে না ৷ আজ থেকে ওর দায়িত্ব আমার ৷ আপনি টেনশন মুক্ত থাকুন ৷

সাফায়েত জামান সিনুর হাত সাজিদের হাতে দিয়ে বললেন,,, নিয়ে যাও বাবা দ্রুত নিয়ে যাও নয়তো আমি যেকোন সময় মত পরিবর্তন করে ফেলতে পারি ৷

বলে উনি অন্যদিকে চলে গেলেন ৷ সাজিদ ধীর পায়ে সিনুকে নিয়ে গাড়িতে বসাল ৷ অন্যদিকে তানিয়া রাইমা রাইশা এলোমেলো দৃষ্টি মেলে সেদিকে তাকিয়ে আছে ৷ তানজিদ নিজের বোনকে আগলে নিয়ে চোখের পানি মুছে দিয়ে বলল,,,

কি হচ্ছে তানি? ও তো তোদের ছেড়ে যাচ্ছে না ৷ সিনু আশেপাশেই গিয়েছে , কোনো বাইরের দেশে যাচ্ছে না ৷

কথাটা তানজিদ রাইশা আর রাইমাকে উদ্দেশ্য করেও বলেছে ৷ তানজিদের কথায় ওরা কান্না কিছুটা থামাল ৷ রাইশা কান্না থামিয়ে তানজিদের দিকে তাকাল , তানজিদ চোখের ইশারায় ওকে শান্ত হতে বলল ৷ নাভিন শীতল দৃষ্টিতে রাইমার পানিয়ে টইটম্বুর চোখ আর লাল হয়ে যাওয়া নাকটার দিকে তাকিয়ে নিঃশব্দ হাসল ৷

এসব দৃশ্য দেখে মেহমেতের মুখটা গম্ভীর হয়ে গেল ৷ তিতি বি'রক্ত হয়ে ও গাড়িতে গিয়ে বসে পড়ল ৷ গাড়ি চলতে শুরু করল, সিনুদের বাড়ির সীমানা পেরিয়ে অনেক দূর চলে গেল ৷ পুরো রাস্তায় মেহমেত কোনো কথা বলেনি ৷ অন্যদিকে সিনু এখনও মৃদু মৃদু কাঁদতেছে ৷ সাজিদ আড়চোখে তা দেখে চলেছে ৷

সদর দরজায় সাহেরা খাতুন নিজে এসে বড় বউমাকে ভিতরে নিয়ে গেলেন ৷ তারপর সাজিদের রুমে গিয়ে বিছানায় বসিয়ে দিয়ে আসলেন ৷ সাজিদ বাড়ির আত্মীয়দের সাথে কিছুক্ষণ কথা বলে নিজের রুমের দিকে পা বাড়াল ৷ জানা কথা ওর রুমের দরজার সামনে মেহমেত, সিমরান, আরো দুজন কাজিন টানটান হয়ে দাঁড়িয়ে আছে ৷ ওদের দেখে সাজিদ কপাল কুঁচকে বলল,,

কি সমস্যা?

মেহমেত দাঁত কেলিয়ে বলল,, তুই লাখ টাকা না হোক কয়েক হাজার টাকা দিলে কোনো সমস্যা থাকবে না ৷

আমার ঠ্যাকা?

সিমরান মুখ বাকিয়ে বলল,, তোমার ই ঠ্যাকা ভাইয়া ৷ টাকা না দিলে তোমার বউয়ের কাছে যেতে দিব না ৷

সাজিদ ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে থাকল ৷ মেহমেত বলে উঠল,,,whatever কত ক'ষ্ট করে রুম সাজিয়েছি জানিস?

সাজিদের কাটকাট প্রশ্ন,, আমি সাজাতে বলেছি?

Whatever ভাই টাকা দে আর তোর বউয়ের কাছে যা তো ৷

সাজিদ কয়েক মিনিট ওদের দিকে তাকিয়ে থেকে ওয়ালেট বের করল ৷ তারপর দুটো হাজার টাকার নোট বের করে বলল,, এই নে টাকা ৷

ওরা নাক সিটকিয়ে বলল,, এতো কম টাকা আমরা নিব না ৷

ওকে তাহলে রেখে দিচ্ছি ৷ আর তোরা এখানেই পাহাড়া দে ৷ আমি গেলাম মেহমেতের রুমে ঘুমাতে ৷ বউয়ের সাথেই ঘুমাতে হবে এমন কোনো কথা নেই ৷

পরিস্থিতি হাতের বাইরে চলে যেতে দেখে মেহমেত ব্যস্ত হয়ে বলল,,, Whatever ওটাই দে ৷ তোর আজ বিয়ে ছিল জন্য একটু দয়া মায়া করলাম যাহ ৷

সাজিদের ঠোঁটের কোণে অস্পষ্ট হাসি ফুটে উঠল ৷ ও জানতো এমন কিছুই হবে ৷ বউয়ের সাথে ঘুমাবে না , এ হতেই পারে না! ওদের টাকা দিয়ে সাজিদ রুমের ভিতরে প্রবেশ করল ৷ মেহমেতরা লটকানো মুখ নিয়ে ঘুমাতে চলে গেল ৷

নিজের বিছানায় কাঙ্ক্ষিত নারী টিকে বসে থাকতে দেখে সাজিদের মন শীতলতায় ছেয়ে গেল ৷ ওকে দেখতেই সিনু নিজেকে গুটিয়ে নিল ৷ কম্পিত কন্ঠে বলল,,,

নফল নামাজ পড়ি চলুন ৷

সাজিদ অনুমতি দিতেই দুজনে নামাজ আদায় করে নিল ৷ জায়নামাজ নির্দিষ্ট স্থানে রেখে সিনু ইতস্তত করে বলল,,,

শুনুন ৷

সাজিদ ওর দিকে ঘুরে বলল,,, বলো ৷

আমি এই শাড়ি পড়ে ঘুমোতে পারব না ৷

সাজিদ সামান্য হেসে বলল,, তাহলে শাড়ি পাল্টে ফেলো ৷

আমি তো কোনো পোশাক আনিনি ৷

তুমি কেন আনতে যাবে? তোমার সব দায়িত্ব এখন আমার ৷ যাও কাবার্ডে গিয়ে দেখো তোমার জন্য পোশাক রাখা আছে ৷ যেটা পছন্দ হয় সেটা পড়ে নাও ৷ আমি বাথরুমে গিয়ে পোশাক পাল্টাচ্ছি , তুমি রুমে পাল্টাও ৷

বলেই সাজিদ বাথরুমে চলে গেল ৷ সিনু কয়েক মূহুর্ত থম মেরে থেকে কাবার্ডের দিকে চলে গেল ৷ কাবার্ড খুলতেই দেখল সেখানে বেশ কয়েকটা শাড়ি, সালোয়ার কামিজ আর বোরকা রয়েছে ৷ সিনুর মুখে হঠাৎ মুচকি হাসি ফুটে উঠল ৷ ও ওখান থেকে একটা সালোয়ার কামিজ নিয়ে নিল ৷ তারপর সেটা পড়ে নিল ৷ মাথার ক্লিপগুলো খুলে ও চুল আঁচড়াতে লাগল ৷ সাজিদ বাথরুম থেকে বলল,,,

রুমে আসতে পারি?

জ্বি আসুন ৷

সাজিদ ট্রাউজার পড়ে উদম গায়ে বেরিয়ে আসল ৷আয়নায় হঠাৎ ওর প্রতিবিম্বের দিকে তাকাতেই সিনু চট জলদি চোখ বন্ধ করে ফেলল ৷ আড়চোখে সেটা খেয়াল করে সাজিদ নিঃশব্দ হাসল ৷ সিনু তাড়াহুড়ো করে বেনি করতে লাগল ৷ সাজিদ কাবার্ড থেকে একটা কালো টি-শার্ট বের করে সেটা পড়ে নিল ৷ তার পাশাপাশি প্রথমবারের মতো সিনুকে খোলা চুলে দেখে মুগ্ধ হয়ে গেল ৷

বেনি করা শেষে সিনু বিছানায় গিয়ে অন্যদিক হয়ে একপাশে শুয়ে পড়ল ৷ সাজিদ একটা ঢোক গিলে ধীর পায়ে বিছানায় গিয়ে ওর পাশে শুয়ে পড়ল ৷ সিনু ওর দিকে পিঠ করে শুয়ে আছে ৷ সাজিদ আড় নয়নে সেদিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে হঠাৎ অপ্রত্যাশিত ভাবে সিনুকে পেছন থেকে নিজের ব্যান্ডেজে মোড়ানো হাত দুটো দিয়ে আকড়ে ধরল ৷

সাজিদের প্রথম এমন স্পর্শে সিনু কেঁপে উঠল ৷ হৃৎপিন্ড অস্বাভাবিক ভাবে উঠা নামা করতে লাগল ৷ কম্পিত কন্ঠে বলল,,,

কি করছেন?

সাজিদ অস্ফুট স্বরে বলল,, নিজের বউকে জরিয়ে ধরছি ৷ বউকে জরিয়ে ধরে ঘুমালে শরীর সুস্থ থাকে ৷ শরীরের রক্তের রঙ টকটকা লাল হয়ে যায়, বুঝেছো?

এসব আজগুবি কথা কোথা থেকে শিখেছেন?

এখন ই নিজে বানালাম ৷ তোমার স্বামী দেখো কত ট্যালেন্টেড!

সিনুর অস্বস্তি এখনও কমেনি ৷ খুব অদ্ভুত অনুভূতি হচ্ছে ৷ সাজিদের উষ্ণ আলিঙ্গন ওকে স্তব্ধ করে দিয়েছে ৷ এভাবে কিছুক্ষণ থাকার পর সাজিদ ঘোর লাগা কন্ঠে বলল,,,

আই ক্যান কিস ইউ, রাইট?

সিনু না বলতে যাবে তার আগেই সাজিদ ওর ঘাড়ে নিজের ঠোঁট ছুইয়ে দিল ৷ এতে করে সিনু শিউরে উঠে থরথর করে কাঁপতে লাগল ৷ সাজিদ ওর ঘাড়ে মুখ ডুবিয়ে রেখেই ক্ষীণ কন্ঠে বলল,,,

কাঁপাকাঁপির কিছু করিনি ৷ রিল্যাক্স আজ রাতে এতোটুকুই, আর কিছু করব না ৷ ঘুমাও তুমি ৷

সিনু মনে মনে বলল,,, ঘুম কেড়ে নিয়ে এখন আদিখ্যেতা করে ঘুমোতে বলছে দুমুখো সা'প কোথাকার!

সাজিদ কিছুক্ষণের মধ্যেই ঘুমিয়ে পড়ল সিনুর ঘাড়ে নিজের মুখ ডুবিয়ে রেখেই ৷ কিন্তু সিনুর ঘুম উড়ে গেছে ৷ অনেক সাধনার পর অবশেষে সিনু ঘুমিয়ে পড়ল ৷

ফজরের আযান কানে আসতেই সিনুর ঘুম ভেঙে গেল ৷ শুরুতে ভিন্ন রুম দেখে ওর ভ্রু কুঁচকে গেল পর মুহূর্তে মস্তিষ্ক সজাগ হতেই ওর সবকিছু মনে পড়ে গেল ৷ তারপর নিজের অবস্থান দেখতেই ও থতমত খেয়ে গেল ৷ বর্তমানে ও সাজিদের বুকে মাথা রেখে ওকে জরিয়ে ধরে শুয়ে আছে ৷ ও অপ্রস্তুত কন্ঠে বলল,,,

হায় আল্লাহ আমি এখানে কিভাবে আসলাম?

চট জলদি সিনু ওর থেকে দূরে সরার জন্য চেষ্টা করল কিন্তু পারল না কারন সাজিদও ওকে আষ্টেপৃষ্টে জরিয়ে ধরে রেখেছে ৷ সিনু নিজের শরীরের সর্বশক্তি দিয়ে সাজিদের থেকে নিজেকে ছাড়ানোর চেষ্টা করল কিন্তু বরাবরের মতো এবারও ব্যর্থ হলো ৷ ও বড় একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে সাজিদের বুকে মাথা রেখে স্থির হয়ে গেল ৷ তারপর বিদ্রুপ করে বলল,,,

এই ক্ষ*ত-বিক্ষ*ত হাত নিয়েও উনি আমাকে এতোটা শক্ত করে জরিয়ে ধরে আছেন কিভাবে?

সাজিদ ঘুম ঘুম কন্ঠে বলল,,, কারন যাকে জরিয়ে ধরে আছি সে অনেক পিচ্চু একটা মানুষ , গায়ে তার তুলার মতো ওজন তাই এই আ'হত হাতেও তাকে বেশ শক্ত করে জরিয়ে ধরা যায় ৷

সিনু হতভম্ভ হয়ে গেল ৷ ও মাথা তুলে ওর দিকে তাকিয়ে বলল,, আপনি কখন উঠেছেন?

যখন তুমি কাটা মুরগির মতো আমার বুকের উপরে ছটফটানি শুরু করেছিলে তখন ৷

সবেমাত্র সিনুর খেয়াল হলো ও সাজিদের অনেক কাছাকাছি চলে এসেছে ৷ এতে করে ও প্রচন্ড অপ্রস্তুত হয়ে গেল ৷ আবারও ওর থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে নেওয়ার জন্য সিনু ছটফট করতে লাগল কিন্তু সাজিদ ওকে ছাড়ল না ৷ সিনু ভ্রু কুঁচকে বলল,,,

ছাড়ছেন না কেন?

ছাড়ার জন্য তো ধরিনি সিনুপাখি ৷

সিনু চোখ বড় বড় করে সাজিদের দিকে তাকাল ৷ সাজিদ ঘোর লাগা দৃষ্টিতে ওর দিকে তাকাতেই সিনু সাজিদের বুকে মাথা রেখে নিশ্চুপ হয়ে থাকল ৷ আরো কিছুক্ষণ ওকে নিজের সাথে জরিয়ে রেখে সাজিদ ওকে ছেড়ে দিল ৷ তারপর দুজনে নামাজ আদায় করে নিল ৷

°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°

সকল আত্মীয় স্বজনদের সাথে পরিচিত হয়ে সিনু তাদের সাথে কিছুক্ষণ সৌজন্যমূলক আলোচনা করল ৷ দুপুরের দিকে সব আত্মীয় স্বজন যার যার বাড়িতে চলে গেল ৷ সবাই চলে যেতেই সাজিদ আর সিনু রুমে চলে গেল শপে যাওয়ার জন্য তৈরি হতে ৷ রেডি হয়ে সাজিদ সিনুকে বলল,,,

চলো আমি তোমার সাথে যাব ৷

সিনু অবাক হয়ে বলল,, আমার সাথে যাবেন মানে? আপনি নিজের বাইকে যান ৷

সাজিদ নিজের হাত দুটো উপরে তুলে বলল,, এই হাত নিয়ে বাইক চালাব?

তাহলে মেহমেত ভাইয়ার সাথে যান ৷

বউ থাকতে কেন ওই ব্রয়লার মুরগির সাথে যাব?

ওর কথায় সিনু হাসতে লাগল ৷ সাজিদ ওর হাসির দিকে অপলক চাহনিতে তাকিয়ে থাকল ৷ সেটা নজরে পড়তেই সিনু হাসি থামিয়ে দিল ৷ তারপর স্কুটির চাবি নিয়ে মৃদু স্বরে বলল,,,

আচ্ছা আসুন ৷

সবার থেকে বিদায় নিয়ে ওরা স্কুটিতে গিয়ে বসল ৷ মেহমেতও এসে নিজের বাইকে বসল ৷ সাজিদকে স্কুটিতে বসতে দেখে মেহমেত সামান্য হেসে বলল,,

কিরে সাজ্জু বেইবি বউয়ের বোরকার কোনা ধরা শিখে গেছিস এখন থেকেই? Whatever সুন্দর লাগছে দুজনকে একসাথে ৷

বলে ও বাইক নিয়ে চলে গেল ৷ মজা করলেও ওর মুখ দেখেই বোঝা যাচ্ছে বেচারার মুড অফ ৷ কাল রাতে তানিয়াকে তানজিদের সাথে দেখার পর থেকেই ওর এই অবস্থা ৷

সিনু স্কুটি চালাতে শুরু করল ৷ সাজিদ ওর পিছনে বসে ওর দিকে পলকহীন চোখে তাকিয়ে আছে ৷ একটু পর ও নিজের হাত দুটো সিনুর কোমড়ে রাখল ৷ সিনু বাকরুদ্ধ হয়ে স্কুটিতে ব্রেক কষল ৷ ফলশ্রুতিতে সাজিদ এসে সিনুর গায়ে পড়ল ৷ সিনু ওকে সরিয়ে দিয়ে বলল,,,

কোমড়ে হাত রাখলেন কেন?

সাজিদ হাই তুলে বলল,,, কোমড়ে হাত না রাখলে যদি পড়ে ম'রে যাই তাহলে তো তুমি বিধবা হয়ে যাবে ৷ তোমার কথা ভেবেই তো ওখানে হাত রেখেছি ৷ এই মেয়ে স্কুটি স্টার্ট করো দেরি হয়ে যাচ্ছে ৷

সিনু কয়েক মূহুর্ত সাজিদের দিকে তাকিয়ে থেকে চোখ সরিয়ে নিল ৷ তারপর লম্বা একটা দম ফেলে স্কুটি চালাতে শুরু করল ৷ সাজিদ ওর কোমড় শক্ত করে আকড়ে ধরে আছে ৷ শপের সামনে এসে ওরা স্কুটি থেকে নেমে পড়ল ৷ সাজিদ নিজের শপের দিকে না গিয়ে সিনুর শপের দিকে লম্বা লম্বা পা ফেলে চলে গেল ৷ তারপর শপের সামনে টাঙানো পর্দাটা ব্যস্ত হাতে নামিয়ে দিল ৷ সিনু হতভম্ভ হয়ে বলল,,,

কি করছেন?

সাজিদ পর্দাটা পাশে রেখে বলল,, এটা আমাকে অনেক ক'ষ্ট দিয়েছে তাই নিজ হাতে এটার অস্তিত্ব নিঃশেষ করলাম ৷

বলে সাজিদ নিজের শপে চলে গেল ৷ সিনু আহাম্মক হয়ে ওর যাওয়ার দিকে তাকিয়ে বলল,,, পাগল লোক!

তানিয়া , রাইমা, রাইশা ওর পিছনে দাঁড়িয়ে গলা খাকারি দিল ৷ তানিয়া বলতে লাগল,,

উহুম উহুম হাউ রোমান্টিক সিন!

সিনু বিব্রত হয়ে কাজে মন দেওয়ার চেষ্টা করল কিন্তু ওরা নাছোড়বান্দা ৷ ওর সামনে গিয়ে ইনিয়ে বিনিয়ে বিভিন্ন কথা বলতে লাগল ৷ রাইমা ওর কাধে হাত রেখে বলল,,,

তো কাল রাতে কি হলো রে? সাজিদ ভাইয়া তো মনে হয় না তোকে এমনি এমনি ছেড়ে দিবে ৷

সিনু বি'স্ফোরিত চোখে ওদের দিকে তাকাল তারপর তিনজনকে মা'রতে মা'রতে বলল,,, শা'লা রা খবরদার এসব কথা বলবি না! ছিহ তোদের ল'জ্জা করেনা?

ওরা হাসতে হাসতে বলল,, না করে না ৷

সিনু ভ্রু কুঁচকে বলল,,, কিছুই হয়নি ৷ দাঁত কেলানো বন্ধ কর ৷

°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°

আজ ভার্সিটিতে রাইমার গুরুত্বপূর্ণ ক্লাস আছে তাই ও ভার্সিটির উদ্দেশ্যে চলে গেল ৷ আসলে ওরা ব্যবসা যেমন সামলাচ্ছে পড়াশোনা টাও তেমন চালিয়ে যাচ্ছে ৷ যেদিন যেদিন ওদের ক্লাস থাকে সেদিন সেদিন ওরা মারিয়া আর নুসরাতকে কাজ বুঝিয়ে দিয়ে চলে যায় ৷ আজ রাইমার ক্লাস থাকলেও বাকিদের নেই ৷তাই ও একাই ভার্সিটির উদ্দেশ্যে চলে গেল ৷

ক্লাস শেষে রাইমা ভার্সিটিতে থেকে বেরিয়ে যাবে এমন সময় কয়েকটা ছেলে এসে ওর পথ আটকে দাঁড়াল ৷ তারপর বাজে ভাবে ওকে টোন মা*রতে শুরু করল ৷ একজন শিস বাজিয়ে বলতে লাগল,,,

হেই মিস বোরকা টা একটু খোলা যায় না? তোমাকে একটু দেখতাম ৷

রাইমার গা ঘিন ঘিন করে উঠল ৷ গম্ভীর গলায় বলল,,, পথ ছেড়ে দিন ৷

উহু আগে দেখাও তারপর ছাড়ব তোমাকে ৷

এভাবেই ছেলেগুলো ওকে টিজ করতে লাগল ৷ নাভিন ক্লাস থেকে বেরিয়ে নিজের অফিস রুমের দিকে যেতে ধরতেই মাঠের দৃশ্য দেখে সেদিকে এগিয়ে গেল ৷ পরিস্থিতি বোঝার সাথেই ওর মাথায় র*ক্ত উঠে গেল ৷ গুরুগম্ভীর ভারী নিরেট গলায় ধমকে উঠে বলল,,,

হোয়াট'স গয়িং অন হিয়ার?

নাভিনের র'ক্তহীম করা কন্ঠস্বর শুনে ছেলেগুলো ভয়ে কেঁপে উঠল ৷ ভার্সিটির স্যারদের মধ্যে নাভিনকেই ওরা বেশি ভয় পায় আর তার কাছেই কি না ধরা পড়তে হলো? নাভিন পুনরায় ধমকে উঠে বলল,,,

এসব করার জন্য ভার্সিটিতে এসেছো? তোমাদের শিক্ষা দেওয়া অতীব জরুরি হয়ে দাঁড়িয়েছে ৷ ওয়েট ইন মাই অফিসরুম , আই এম কামিং ৷

ছেলেগুলো এখনও ঠায় দাঁড়িয়ে থেকে একে অপরের দিকে ভীত দৃষ্টিতে তাকাতে লাগল ৷ নাভিন বিরক্তিতে 'চ' কারান্ত উচ্চারণ করে বলল,,

আই সেইড গোওও ৷

ছেলেগুলো এবার চট জলদি নাভিনের অফিসের দিকে চলে গেল ৷ রাইমা হতভম্ভ হয়ে এতোক্ষণ সবকিছু দেখছিল ৷ নাভিন নিজের রাগ কন্ট্রোল করে মুখে সামান্য হাসি ফুটিয়ে রাইমার দিকে এগিয়ে গিয়ে বলল,,,

ঠিক আছো?

রাইমা হাসিমুখে বলল,, হু ঠিক আছি ৷ জাযাকাল্লাহ আপনাকে প্রফেসর সাহেব ৷ অবশ্য আপনি না আসলেও আমি কিছুক্ষণের মধ্যেই আমার ক্যারাটে ওদের উপর প্রয়োগ করতে যাচ্ছিলাম ৷

নাভিন ওর কথা শুনে মুচকি হেসে বলল,, ক্যারাটে কুইন ৷ বাই দা ওয়ে ইট'স লেকচারার ৷

রাইমা স্বশব্দে হেসে উঠে বলল,, আপনিও না!

নাভিন মাথা চুলকে বলল,, চলো তোমাকে ভার্সিটির গেইট পর্যন্ত এগিয়ে দিয়ে আসি ৷

আরে লাগবে না ৷ আপনি আপনার কাজে যান ৷

সমস্যা নেই আমি এখন ফ্রি আছি ৷ চলো ৷

রাইমা আর কোনো আপত্তি করল ৷ দুজনে পাশাপাশি চলতে লাগল ৷ স্কুটির সামনে এসে দুজনে থেমে গেল ৷ রাইমা স্কুটিতে বসে হেলমেটটা মাথায় দিতে দিতে বলল,,,

আপনারও দারুন রা'গ দেখছি প্রফেসর সাহেব ৷

বলে ও চলে গেল ৷ নাভিন হাস্যজ্জ্বল মুখে সেদিকে তাকিয়ে থেকে বলল,, তোমার সাথে যে খারাপ ব্যবহার করবে তার সাথে এর চেয়েও বেশি রা'গ দেখাব আমি!এখন আপাতত ওদের ব্যবস্থা টা করি ৷

নাভিনের হাস্যজ্জ্বল মুখটা র'ক্তিম হয়ে গেল ৷ উল্টো ঘুরে ও লম্বা লম্বা পা ফেলে নিজের অফিস রুমের দিকে চলে গেল ৷

চলবে,,,,

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৩২তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন