নক্ষত্র
# পর্ব ১ প্রথম অংশ
#রেফা
"সব জন্মেরই নাকি একটা গল্প থাকে। কেউ সেই গল্পকে আশীর্বাদ বলে, কেউ কেবল একটি তারিখ আর একটি সময় লিখে রেখে ভুলে যায়। কিন্তু কিছু জন্ম থাকে, যেগুলোকে সময়ও পুরোপুরি ব্যাখ্যা করতে পারে না।
আমার জন্মও তেমনই একটি জন্ম।
২২ মে, ২০০৮। রাত ১টা ১২ মিনিট।
সেদিন পৃথিবী থেমে যায়নি। আকাশে কোনো উল্কা পড়েনি। বাতাসে কোনো অলৌকিক বার্তা ভেসে বেড়ায়নি। হাসপাতালের দেয়ালগুলোও আগের মতোই নিশ্চুপ ছিল। তবু সেই নিস্তব্ধ রাতের বুক চিরে ভেসে উঠেছিল এক নবজাতকের প্রথম কান্না।
সবাই বলেছিল, 'একটি মেয়ে হয়েছে।'
কথাটা সত্যি ছিল। কিন্তু সম্পূর্ণ সত্যি ছিল না।
কারণ সেই মুহূর্তে শুধু একটি শিশুর জন্ম হয়নি। জন্ম নিয়েছিল এমন এক গল্প, যার প্রতিটি অধ্যায়ে লুকিয়ে ছিল অগণিত না-বলা কথা, অসমাপ্ত প্রশ্ন, অদৃশ্য ক্ষত, নিষিদ্ধ ভালোবাসা, অচেনা ভয়, আর এমন কিছু সত্য—যেগুলো জানার জন্য হয়তো কিছু মানুষ সবকিছু হারাতেও রাজি হয়ে যেত।
অনেকেই বলে, মানুষের ভাগ্য জন্মের আগেই লেখা থাকে।
আমি জানি না কথাটা সত্য কি না।
তবে এটুকু জানি—আমার জীবনের শেষ অধ্যায়ের ছায়া, হয়তো সেই রাতেই প্রথমবার আমার ওপর নেমে এসেছিল।
কিন্তু তখন তো আমি কেবল কাঁদতে জানতাম।
জানতাম না, আমার প্রতিটি হাসির আড়ালে একদিন একটি রহস্য লুকিয়ে থাকবে।
জানতাম না, আমাকে ঘিরে থাকা কিছু মানুষ একদিন মুখোশ পরে বেঁচে থাকবে।
জানতাম না, আমার নিজের জীবনই একসময় আমার কাছে সবচেয়ে অচেনা গল্প হয়ে উঠবে।
আর সবচেয়ে আশ্চর্যের কথা
আমার জন্মের গল্পটা আজও কেউ পুরোটা জানে না।
হয়তো... এই বইয়ের শেষ পাতায় পৌঁছেও না।
হাসপাতালের কেবিনজুড়ে তখন এক অদ্ভুত নীরবতা। জানালার ফাঁক দিয়ে ভোরের প্রথম আলো ধীরে ধীরে বিছানার ওপর এসে পড়ছে। সাদা কাপড়ে জড়ানো সদ্য জন্ম নেওয়া ছোট্ট মেয়েটা নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে আছে। পাশে ক্লান্ত শরীর নিয়ে শুয়ে আছেন তার ছাব্বিশ বছরের মা (মুঞ্জুয়ারা মুন)। দীর্ঘ অপেক্ষা, অসংখ্য দোয়া আর অগণিত কষ্টের পর অবশেষে তাদের ঘরে এসেছে নতুন এক প্রাণ।
কেবিনের বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা স্বজনদের মুখে স্বস্তির হাসি। সবাই বলছে,
"আলহামদুলিল্লাহ, মা আর মেয়ে দুজনেই সুস্থ।"
কিন্তু কেউ জানত না, এই ছোট্ট শিশুর জন্ম শুধু একটি নতুন জীবনের শুরু নয়—এটি এমন এক গল্পের সূচনা, যা একদিন অনেক মানুষের জীবনকে বদলে দেবে।
দুই দিন পর হাসপাতাল থেকে বাড়ি ফিরল মা আর মেয়ে। পুরো বাড়ি যেন আনন্দে ভরে উঠল। দাদা-দাদি, নানা-নানি, খালা -খালু ,চাচা-ফুপু—সবার আদরের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠল ছোট্ট পরীটা।
সপ্তম দিনে আয়োজন করা হলো নামকরণের অনুষ্ঠান। পরিবারের সবাই অনেক নাম প্রস্তাব করলেও তার মা মুনজুয়ারা মুন ও বাবা রাকিবুল ইসলাম মৃদু হেসে একসাথে মেয়ের নাম রাখলেন ,
" মিথিলা"
সেই মুহূর্তে যেন নামটা শুধু একটি পরিচয় নয়, একটি ভাগ্যের গল্প হয়ে গেল।
দিন যায়, মাস যায়, বছর ঘুরে যায়।
হাঁটতে শেখে মিথিলা। প্রথম "মা" ডাক শুনে তার মায়ের চোখে জল নেমে আসে। বাবার আঙুল ধরে প্রথম স্কুলে যাওয়া, ঈদের নতুন জামা, বৃষ্টিতে ভিজতে চাওয়া, রাতে দাদির কাছে গল্প শোনা—সব মিলিয়ে মিথিলার শৈশব ছিল হাসি আর ভালোবাসায় ভরা।
তবে একটা বিষয় সবাই ধীরে ধীরে লক্ষ্য করতে শুরু করল।
মিথিলা অন্য বাচ্চাদের মতো ছিল না।
সে মাঝেমধ্যেই এমন কিছু কথা বলত, যা তার জানার কথা নয়। কখনো এমন মানুষের নাম বলত, যাদের সঙ্গে তার কোনোদিন দেখা হয়নি। কখনো আবার কোনো জায়গায় গিয়ে বলত,
"আমি তো এখানে আগেও এসেছি..."
প্রথমে সবাই ভেবেছিল, ছোট বাচ্চাদের কল্পনা। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ঘটনাগুলো এতটাই অদ্ভুত হতে লাগল যে পরিবারের সবার মনেই অজানা এক ভয় জন্ম নিতে শুরু করল।
এভাবেই দেখতে দেখতে কেটে গেল নয়টি বছর।
আজ মিথিলার নবম জন্মদিন।
সবার কাছে সে এখনো হাসিখুশি, শান্ত আর ভীষণ মিষ্টি একটা মেয়ে। কিন্তু সেই জন্মদিনের রাতেই এমন একটি ঘটনা ঘটল, যা শুধু তার পরিবারের নয়, পুরো গল্পের গতিপথ বদলে দিল...
সেই রাত থেকেই শুরু হলো "নিভৃত নক্ষত্র"-এর আসল অধ্যায়।
রানিং refa