#পর্ব ১ শেষ অংশ
#নিভৃত নক্ষত্র
২২ মে, ২০১৭ সাল।
আজ মিথিলার জন্মদিন।
ছোট্ট সেই বাড়িটা আজ যেন আনন্দের রঙে রঙিন হয়ে উঠেছে। সকাল থেকেই একে একে বাড়িতে এসে জড়ো হয়েছেন আত্মীয়-স্বজন। এসেছে নানা-নানি, দা
দা-দাদী, ফুপু-ফুপা, চাচারা, খালা-খালু, ফুপাতো, খালাতো ভাই-বোনেরা। আশপাশের প্রতিবেশীরাও নিমন্ত্রণ পেয়ে হাজির হয়েছেন। সবার মুখে একটাই হাসি—আজ বাড়ির সবার আদরের মেয়ে, ছোট্ট মিথিলার জন্মদিন।
মিথিলাদের বাড়ি একটি ছোট্ট গ্রামে। তবে গ্রাম বললেই এখন আর আগের সেই চিরচেনা গ্রামের ছবি চোখে ভেসে ওঠে না। গ্রামের পাশেই রয়েছে বিশাল এক খেলার মাঠ, একটু সামনে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, আর তার পাশেই একটি উচ্চ বিদ্যালয়। শহরের ছোঁয়া ধীরে ধীরে গ্রামকেও বদলে দিয়েছে। তাই জন্মদিন মানেই এখন কেক কাটা, রঙিন বেলুন, ক্যামেরার ফ্ল্যাশ আর প্রিয় মানুষদের নিয়ে আনন্দের ছোট্ট এক উৎসব।
মিথিলার বাবা রাকিবুল ইসলাম এবং মা মঞ্জোয়ারা মুন—দুজনেই সরকারি চাকরিজীবী। চাকরির ব্যস্ততা যতই থাকুক, একমাত্র মেয়ের মুখের হাসির কাছে সব ক্লান্তি যেন মুহূর্তেই হার মেনে যেত।
মিথিলার বাবার পরিবার ছিল বেশ বড় এবং সবার কাছে সম্মানিত। পরিবারের কর্তা আব্দুল মালেক জীবনের এক সময়ে দুটি সংসার গড়েছিলেন। প্রথম সংসারে ছিলেন রোজুফা বেগম। তাঁদের ঘর আলো করে জন্ম নেয় এক মেয়ে ও দুই ছেলে। সবার বড় রেবেকা খাতুন, এরপর রাকিবুল ইসলাম, আর তারপর রাশেল। পরবর্তীতে দ্বিতীয় সংসারে জন্ম নেয় ছোট ছেলে হিমেল।
তবে এই পরিবারকে আলাদা করে চিনিয়ে দিত অন্য একটি বিষয়। এখানে সম্পর্কের আগে কখনো রক্তের হিসাব করা হতো না। হিমেল কে কেউ কখনো আলাদা চোখে দেখেনি, আবার শাওনও কখনো বড় ভাই-বোনদের থেকে নিজেকে ভিন্ন ভাবেনি। হাসি, কান্না, ঈদ, পারিবারিক অনুষ্ঠান, অভিমান, ভালোবাসা—সবকিছুই তারা ভাগ করে নিয়েছে একসঙ্গে। "সৎ" শব্দটি কাগজে-কলমে থাকলেও, এই পরিবারের অভিধানে তার কোনো অস্তিত্ব ছিল না। সবাই একে অপরকে নিজের রক্তের সম্পর্কের মতোই আগলে রেখেছে। হয়তো এ কারণেই পরিবারের বন্ধনটা এত গভীর ছিল।
পরিবার এর দরুন মিথিলা ও সেই ভাবে সৎ কথাটা কত গভীর টা বুঝত না আর ছোট থেকেই দুই চাচা কে বাবা বলে ডাকে সে
বাবা চাচা দের মধ্যে বংশের বড় মেয়ে বলে সকলের মধ্যমণি ছিল
অন্যদিকে, মিথিলার মায়ের পরিবারও ছিল ভালোবাসায় ভরা। নানা মুকবুল চৌধুরী ছিলেন চৌধুরী বংশের মানুষ। তাঁর পরিবারে ছিলেন এক ছেলে ও তিন মেয়ে। ছেলেটিই ছিল সবার বড়, আর তার পরেই জন্ম নেন তিন বোন—মেহরুন নেহা, মালিহা খাতুন এবং সবার ছোট মঞ্জোয়ারা মুন । ভাই-বোনদের এই বন্ধনও ছিল বেশ মধুর।
আজ সেই দুই পরিবারের প্রায় সবাই এক ছাদের নিচে। কেউ রান্নাঘরে ব্যস্ত, কেউ অতিথিদের আপ্যায়ন করছে, কেউ আবার ছোট্ট মিথিলাকে কোলে নেওয়ার জন্য যেন ছোট্ট প্রতিযোগিতায় নেমেছে। মা একবার সবার কেস গিয়ে দেখছে কার কি লাগবে আবার বেস্ট হাতে রান্না ঘরে কি যেনো করছেন, উঠোনের মাঝখানে সাজানো হয়েছে রঙিন টেবিল, তার ওপর রাখা গোলাপি ক্রিমের সুন্দর একটি জন্মদিনের কেক। চারদিকে শিশুদের কোলাহল, বড়দের হাসি আর আত্মীয়দের গল্পে পুরো বাড়িটা যেন প্রাণ ফিরে পেয়েছে।
সবাই তাকে জন্মদিন উপলক্ষে উপহার দিচ্ছেন কেও টাকা আবার কেও নতুন জামা খেলনা।
এই বিশাল আত্মীয়তার ভিড়ে মিথিলা ছিল তার মা-বাবার একমাত্র সন্তান। তাই পরিবারের সবার আদর, ভালোবাসা আর আশীর্বাদের কেন্দ্রবিন্দু ছিল সে। জন্মদিনের কেক কাটার সময় ছোট্ট মিথিলার মুখে ফুটে ওঠা নিষ্পাপ হাসিটুকু যেন সবার হৃদয়ে আলাদা এক আনন্দ ছড়িয়ে দিল।
কিন্তু সেদিন কেউ জানত না...
এই নিষ্পাপ হাসির আড়ালেই লুকিয়ে আছে এক দীর্ঘ গল্প। যে গল্পে থাকবে ভালোবাসা, বিচ্ছেদ, সংগ্রাম, অশ্রু, সাফল্য আর এমন কিছু মোড়, যা একদিন বদলে দেবে মিথিলার পুরো জীবন।
—সমাপ্ত, প্রথম পর্ব