ফন্ট সাইজ:
থিম:
নিভৃত নক্ষত্র

৪র্থ পর্ব

লেখক: Refa

নিভৃত নক্ষত্র

পর্ব — ৪

সেদিন বিকেল থেকেই মিথিলার মনটা কেমন অস্থির হয়ে ছিল।

নতুন বাসায় আসার পর কয়েকটা দিন কেটে গেছে। তবুও জায়গাটাকে এখনও নিজের বলে মনে হয় না। চারপাশে সবকিছুই নতুন—নতুন ঘর, নতুন দেয়াল, নতুন মানুষ, এমনকি জানালার ওপাশের শহরটাও।

বিকেলের শেষ আলোটা জানালা দিয়ে ঘরের মেঝেতে এসে পড়েছিল। মিথিলা চুপচাপ জানালার পাশে দাঁড়িয়ে নিচের রাস্তার দিকে তাকিয়ে ছিল।

মানুষজন ব্যস্ত হয়ে এদিক-ওদিক যাচ্ছে। গাড়ির হর্ন, রিকশার ঘণ্টা, দোকানিদের ডাক—সব মিলিয়ে চারপাশে কেমন একটা অস্থির শব্দ।

এসবের মাঝেও তার মনে পড়ছিল গ্রামের বাড়িটার কথা।

সেখানে বিকেল নামলেই সবকিছু ধীরে ধীরে শান্ত হয়ে আসত। উঠোনে গরুগুলো ফিরত, পাশের বাড়ি থেকে কারও ডাক ভেসে আসত। দূরে কোথাও পাখিরা ডেকে উঠত।

এখানে তেমন কিছু নেই।

হঠাৎ পেছন থেকে দাদার গলা শোনা গেল,

—“মিথিলা কই রে আপা? কোথায় গেলি?”

মিথিলা জানালা থেকে মুখ ফিরিয়ে বলল,

—“এই যে দাদা।”

দাদা দরজার কাছে দাঁড়িয়ে ছিলেন।

—“এতক্ষণ ধরে ডাকছি, শুনতে পাস না?”

মিথিলা হালকা হেসে বলল,

—“জানালার কাছে দাঁড়িয়েছিলাম।”

দাদা কাছে এসে কিছুক্ষণ তার মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন।

—“মন খারাপ?”

মিথিলা তাড়াতাড়ি মাথা নাড়ল।

—“না।”

দাদা মুচকি হেসে বললেন,

—“তোর এই ‘না’ বলাটাই তো বলে দেয় মন খারাপ।”

মিথিলা এবার কিছু বলল না।

দাদা তার পাশে এসে দাঁড়ালেন। দুজনেই কিছুক্ষণ চুপ করে বাইরে তাকিয়ে রইলেন।

তারপর দাদা ধীরে ধীরে বললেন,

—“শোন আপা, সবকিছু নতুন বলে এখন একটু খারাপ লাগছে। কিছুদিন পর দেখবি, এই জায়গাটাও তোর নিজের মনে হবে।”

মিথিলা আস্তে করে জিজ্ঞেস করল,

—“সত্যি?”

—“সত্যি। মানুষ যেখানে থাকে, সেখানেই একসময় তার স্মৃতি তৈরি হয়।”

মিথিলা কথাটা মনে মনে ভাবল।

হয়তো সত্যিই তাই।

হয়তো এই অচেনা জায়গাটাতেও একদিন তার নিজের কিছু স্মৃতি তৈরি হবে।

হঠাৎ দাদা বললেন,

—“আচ্ছা, তোর জন্য একটা খবর আছে।”

মিথিলা সঙ্গে সঙ্গে তাকাল।

—“কী খবর?”

দাদা একটু হেসে বললেন,

—“তোর স্কুলের ব্যবস্থা হয়ে গেছে।”

মিথিলা কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।

—“স্কুল?”

—“হ্যাঁ। পরশু থেকে স্কুলে যাবি।”

মেয়েটার চোখে একসঙ্গে ভয় আর আনন্দ ফুটে উঠল।

—“আমি... এই শহরের স্কুলে পড়ব?”

দাদা হেসে বললেন,

—“তা না হলে কি প্রতিদিন গ্রামে যাতায়াত করবি?”

মিথিলা হেসে ফেলল।

দাদা তার মাথায় হাত রেখে বললেন,

—“ভয় পাবি না আপা। প্রথম দিন একটু অচেনা লাগবে। তারপর সব ঠিক হয়ে যাবে।”

সেদিন রাতে মিথিলা অনেকক্ষণ ঘুমাতে পারল না।

বিছানায় শুয়ে বারবার স্কুলটার কথা ভাবছিল।

কেমন হবে স্কুলটা?

কেউ কি তার সঙ্গে কথা বলবে?

কেউ কি তার বন্ধু হবে?

নাকি সবাই তাকে অচেনা মনে করে দূরে থাকবে?

প্রশ্নগুলো মাথার ভেতর ঘুরতেই থাকল।

পরদিন সকালে ঘুম থেকে উঠেই সে নিজের জামাকাপড় গুছিয়ে রাখল। ব্যাগটা একবার খুলে দেখল, আবার বন্ধ করল। তারপর আবার খুলল।

দাদি দূর থেকে দেখে বললেন,

—“এতবার ব্যাগ খুলছিস কেন?”

মিথিলা একটু লজ্জা পেয়ে বলল,

—“কিছু না।”

দাদি আর কিছু বললেন না। শুধু বললেন,

—“আগে খেয়ে নে।”

মিথিলা মাথা নাড়ল।

পরদিন সকালে দাদা আর রাসেলের সঙ্গে মিথিলা স্কুলের উদ্দেশে বের হলো।

মিথিলার দাদার চাকরি সুবাদে একটি টয়োটা কোম্পানির ছোট গাড়ি রয়েছে সে গাড়িতে মূলত সব জায়গায় যাতায়াত করে তারা

গাড়ির জানালা দিয়ে সে চুপচাপ বাইরে তাকিয়ে ছিল।

শহরটা আজও তার কাছে অচেনা।

তবু আজকের অনুভূতিটা একটু আলাদা।

আজ সে শুধু এই শহরের রাস্তা দিয়ে যাচ্ছে না।

আজ সে এই শহরের একটা নতুন জীবনে পা রাখতে যাচ্ছে।

কিছুক্ষণ পর গাড়িটা একটা বড় স্কুলের সামনে এসে থামল।

মিথিলা জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে রইল।

বড় একটা গেট। ভেতরে অনেকগুলো গাছ। ইউনিফর্ম পরা ছেলেমেয়েরা এদিক-ওদিক হাঁটছে।

কেউ বন্ধুদের সঙ্গে গল্প করছে, কেউ দৌড়ে ভেতরে ঢুকছে।

মিথিলার বুকের ভেতর ধুকপুক শুরু হয়ে গেল।

দাদা গাড়ি থেকে নেমে দরজা খুলে বললেন,

—“চল আপা।”

মিথিলা ধীরে ধীরে গাড়ি থেকে নামল।

কিছুক্ষণ গেটের সামনে দাঁড়িয়ে রইল সে।

তারপর দাদার হাত ধরে ভেতরে ঢুকল।

স্কুলের অফিসে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র নিয়ে তারা বসলো।

একজন শিক্ষক রেজিস্টারটা সামনে টেনে নিলেন।

—“নাম?”

দাদা মিথিলার দিকে তাকিয়ে বললেন,

—“মিথিলা, তোর পুরো নামটা বল তো।”

মিথিলা একটু ইতস্তত করল।

তারপর নিচু গলায় বলল,

—“মিথিলা ইয়াসমিন রাহা।”

এই পুরো নামটা কেউ ডাকে না তাকে। প্রথম নাম ধরেই সবাই ডেকে অভ্যস্ত তবে আজ প্রথমবার নতুন করে নিজের পুরো নামটা শুনে পুরো শরীরে লোমকূপ গুলো যেন দাঁড়িয়ে গেল

শিক্ষক নামটা রেজিস্টারে লিখতে লাগলেন।

তারপর প্রয়োজনীয় আরও কিছু তথ্য জানতে চাইলেন।

দাদা একে একে সব তথ্য দিতে লাগলেন।

মিথিলা চুপচাপ বসে রইল।

তার চোখ আটকে ছিল রেজিস্টারের পাতায়।

সেখানে পরিষ্কার করে লেখা—

মিথিলা ইয়াসমিন রাহা।

নিজের পুরো নামটা একটা নতুন স্কুলের রেজিস্টারে দেখে তার বুকের ভেতর কেমন যেন একটা অনুভূতি হলো।

এতদিন এই নামটা শুধু তার নামই ছিল।

আজ মনে হলো, এই নামটার সঙ্গেই বুঝি তার জীবনের একটা নতুন অধ্যায় শুরু হচ্ছে।

তৃতীয় শ্রেণীতে নতুন করে ভর্তি করা হলো তাকে

গ্রামেও সে তৃতীয় শ্রেণীতে ভর্তি খাওয়ার পর মাত্র চার মাস ক্লাস করেছে তারপরে শহরে চলে এসেছে সেজন্য নতুন করে আবার তৃতীয় শ্রেণীতে ভর্তি করা হলো তাকে

কাগজপত্রের কাজ শেষ করে শিক্ষক বললেন,

—“ঠিক আছে। ভর্তি হয়ে গেছে। পরশু থেকে ক্লাসে আসবে।”

দাদা উঠে দাঁড়িয়ে মিথিলার দিকে তাকিয়ে হাসলেন।

—“শুনলি আপা? এবার কিন্তু নিয়ম করে স্কুলে যেতে হবে।”

মিথিলাও ছোট্ট করে হাসল।

—“হুম, দাদা।”

অফিস থেকে বেরিয়ে আসার সময় মিথিলা আরেকবার পেছনে তাকাল।

বড় স্কুলের গেটটা তার চোখের সামনে দাঁড়িয়ে ছিল।

একটা নতুন জায়গা।

নতুন মানুষ।

নতুন ক্লাস।

আর নতুন একটা পরিচয়।

মিথিলা ইয়াসমিন রাহা।

সে জানত না এই স্কুলে তার জন্য কী অপেক্ষা করছে।

জানত না কাদের সঙ্গে তার বন্ধুত্ব হবে, কে তাকে আপন করে নেবে, আর কে তার জীবনে এমন কিছু স্মৃতি রেখে যাবে যেগুলো সে চাইলেও কোনোদিন ভুলতে পারবে না।

সে শুধু জানত—

গ্রাম থেকে শহরে আসার পর আজ প্রথমবার তার মনে হলো, হয়তো এই নতুন জীবনটাকে ভয় পাওয়ার দরকার নেই।

হয়তো এই শহরেই তার জন্য এমন কিছু অপেক্ষা করছে, যার কথা সে এখনো জানে না।

দাদার ডাক আবার কানে এলো,

—“চল আপা।”

সে স্কুলে ছোট্ট মাঠটাতে তাকিয়ে ছিল অনেক বাচ্চারা সেখানে খেলাধুলা করছে আচ্ছা তারাও কি আমার বন্ধু হবে কথাটা ভাবতে ভাবতে সামনে হাত ছিল সে ঘাড় ঘুরিয়ে আবার কুলটাকে দেখে নিল

মিথিলা ধীরে ধীরে দাদার সঙ্গে হাঁটতে শুরু করল।

পেছনে পড়ে রইল স্কুলের গেট।

আর সামনে—

তার অজানা এক নতুন পথ।

চলবে...

পর্ব টা একটু ছোট হয়ে গিয়েছে

তবে এর পরের গুলা বড় করে দিবো ইনশাল্লাহ

প্রিয় পাঠিকারা, ❤️

নিভৃত নক্ষত্রের আরেকটি পর্ব এখানেই শেষ হলো। 🌸

মিথিলার নতুন জীবনের এই পথচলা আপনাদের কেমন লাগছে, জানাবেন কিন্তু। আপনাদের ছোট্ট একটা মন্তব্য, ভালো লাগা কিংবা মতামতই আমাকে পরের পর্বটা আরও সুন্দর করে লিখতে অনুপ্রেরণা দেয়। 🥹❤️

গল্পটা যদি আপনাদের মনে একটুও জায়গা করে নিয়ে থাকে, তাহলে একটু ভালোবাসা দিয়ে পাশে থাকবেন।

আপনাদের উৎসাহ পেলেই খুব শিগগিরই নিয়ে আসব নিভৃত নক্ষত্র — পর্ব ৫। ✨

ততদিন মিথিলার গল্পটা মনে রাখবেন। 🌙

— Refa

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৪র্থ পর্ব শেষ করেছেন।

আগের পর্ব উপন্যাস সমাপ্ত

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন