পর্ব ৩
নিভৃত নক্ষত্র
লেখক: Refa
মানুষের জীবনে এমন কিছু সকাল আসে, যেদিন ঘুম ভাঙলেও মনে হয়—আর একটু যদি চোখ বন্ধ করে রাখা যেত! হয়তো সবকিছু আগের মতোই থেকে যেত। কেউ বিদায় নিত না, কেউ দূরে চলে যেত না, আর ছোট্ট একটা মনকে এত বড় হয়ে উঠতেও হতো না।
মে মাসের শেষ দিক।
বৈশাখের রোদ তখনও মাটিকে ছেড়ে যায়নি। ভোরের নরম আলো দোতলা মাটির বাড়িটার দেয়ালে এসে পড়েছে। আমগাছের পাতায় জমে থাকা শিশির অনেক আগেই শুকিয়ে গেছে। হালকা বাতাসে কাঁচা আমের গন্ধ ভেসে বেড়াচ্ছে। দূরে মাঠের দিক থেকে ভেসে আসছে গরুর ঘণ্টার টুংটাং শব্দ। কোকিলটা আজও ঠিক আগের মতোই ডাকছে।
প্রকৃতি কিছুই জানে না।
সে জানে না, আজ এই বাড়ির ছোট্ট মেয়েটা নিজের সবচেয়ে প্রিয় পৃথিবীটা ছেড়ে চলে যাবে।
গত সপ্তাহেই নয় বছরে পা দিয়েছে সে।
জন্মদিনে খুব বেশি আয়োজন হয়নি। তবু তার কাছে সেটাই ছিল পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর দিন। মা নিজের হাতে সেমাই আর পায়েস রান্না করেছিলেন। রাসেল বাবা শহর থেকে ফেরার সময় লাল ফিতে লাগানো একটা ছোট্ট পুতুল এনেছিলেন। দাদু হেসে বলেছিলেন, "আমাদের নাতনি তো একেবারে বড় মেয়ে হয়ে গেছে।" আর দাদী, মুখে যতই রাগী ভাব দেখান না কেন, সবার অগোচরে পাঁচশো টাকার একটা নতুন নোট তার হাতে গুঁজে দিয়ে বলেছিলেন, "কাউকে বলবি না।"
সেদিন সে শুধু হেসেছিল।
কিন্তু আজ...
আজ সেই হাসিটা কোথায় যেন হারিয়ে গেছে।
ঘুম ভাঙার পর অনেকক্ষণ বিছানায় চুপচাপ শুয়ে রইল।
মাটির দেয়ালের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে তার মনে হচ্ছিল, দেয়ালগুলোও বুঝি আজ তাকে চুপচাপ দেখছে।
এই ঘরেই তো সে বড় হয়েছে।
এই জানালার পাশে বসে বর্ষার বৃষ্টি দেখেছে।
এই বারান্দা থেকেই প্রথম ঘুড়ি উড়তে দেখেছিল।
এই সিঁড়ি বেয়ে কতবার দৌড়ে উঠে আবার পড়ে গিয়ে হাঁটু ছড়িয়েছে!
আজ সবকিছু রেখে চলে যাবে?
কেন যেন কথাটা তার ছোট্ট মাথায় ঠিক ঢুকছিল না।
ধীরে ধীরে খাট থেকে নেমে খালি পায়ে বারান্দায় এল।
মাটির শীতল স্পর্শটা পায়ে লাগতেই সে একটু থেমে গেল।
শহরের বাড়ির মেঝেও কি এমন ঠান্ডা হবে?
নাকি একেবারেই আলাদা?
সে জানে না।
সে তো কোনোদিন শহরে থাকেনি।
সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমেই সোজা আমগাছটার কাছে গেল।
গাছটা যেন তার অপেক্ষাতেই দাঁড়িয়ে ছিল।
দু'হাত দিয়ে গাছের গুঁড়িটা জড়িয়ে ধরল।
চোখ বন্ধ করে দাঁড়িয়ে রইল কিছুক্ষণ।
তার খুব ইচ্ছে করছিল গাছটাকে বলতে—
"আমি একটু পরে আবার চলে আসব। তুমি কোথাও যেও না।"
কিন্তু সে জানে না, "একটু পরে" বলতে কতদিন লাগে।
একদিন?
এক মাস?
নাকি অনেকগুলো ঈদ?
নয় বছরের একটা মেয়ে সময়কে এভাবেই গোনে।
ঠিক তখনই একটা দোয়েল উড়ে এসে ডালে বসল।
সে মুচকি হেসে তাকিয়ে রইল।
পাখিটা এক ডাল থেকে আরেক ডালে উড়ে বেড়াচ্ছে।
তার মনে খুব ছোট্ট একটা ইচ্ছে জাগল।
ইস... আমারও যদি ডানা থাকত!
তাহলে সকালে দাদীর সঙ্গে শহরে যেতাম...
আবার বিকেলের আগেই উড়ে মায়ের কাছে ফিরে আসতাম।
রাতে মায়ের পাশে ঘুমিয়ে, সকালে আবার দাদুর সঙ্গে শহরে চলে আসতাম।
তাহলে কাউকে ছেড়ে থাকতে হতো না।
এই ছোট্ট হিসাবটাই তার কাছে একদম ঠিক মনে হলো।
ঠিক তখনই রান্নাঘর থেকে মায়ের ডাক ভেসে এল—
— "মিথি... কোথায় গেলি মা? নাস্তা করে নে।"
সে দৌড়ে ভেতরে ঢুকল।
রান্নাঘরে ঢুকেই দেখল মা ভাত বেড়ে রাখছেন।
চোখ দুটো লাল।
মা কি কেঁদেছেন?
সে কাছে গিয়ে মায়ের মুখের দিকে অনেকক্ষণ তাকিয়ে রইল।
তারপর খুব আস্তে জিজ্ঞেস করল,
— "মা... তোমার চোখে কী ধোঁয়া লেগেছে?"
মা একটু চমকে উঠে হেসে ফেললেন।
আঁচল দিয়ে চোখ মুছে বললেন,
— "হ্যাঁ রে, চুলার ধোঁয়া।"
সে বিশ্বাস করে ফেলল।
কারণ নয় বছরের শিশুরা এখনও মায়ের মিথ্যেগুলোকে সত্যি ভেবেই বড় হয়।সে আর কিছু জিজ্ঞেস করল না।
মায়ের পাশে এসে চুপচাপ বসে রইল।
চুলার আগুনে হাঁড়ির নিচটা লাল হয়ে আছে। ভাতের গরম ধোঁয়া উঠছে। রান্নাঘরের ছোট্ট জানালা দিয়ে একফালি রোদ এসে মাটির মেঝেতে পড়েছে। কত সাধারণ একটা সকাল।
তবু আজ সবকিছু কেমন অন্যরকম লাগছে।
মা থালায় ভাত তুলে সামনে এগিয়ে দিলেন।
— "খেয়ে নে মা। তারপর তো রওনা হতে হবে।"
সে থালার দিকে তাকিয়ে রইল।
হঠাৎ খুব আস্তে বলল,
— "মা... আমি যদি রাতে তোমাকে খুব দেখতে চাই?"
মায়ের হাত থেমে গেল।
কয়েক মুহূর্ত তিনি কোনো উত্তর দিতে পারলেন না।
তারপর মেয়েটার গাল দুটো নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে বললেন,
— "তাহলে আমাকে ফোন দিবি। আমি তোকে গল্প শোনাব।"
সে মাথা নাড়ল।
কিন্তু তার ছোট্ট মনে আবার নতুন একটা প্রশ্ন এলো।
— "ফোন রেখে দিলে... তখন?"
এবার মা আর হাসতে পারলেন না।
তিনি শুধু তাকে বুকে জড়িয়ে ধরলেন।
এমন শক্ত করে ধরলেন, যেন এই আলিঙ্গনটা অনেক দিনের জন্য জমা করে রাখছেন।
ছোট্ট মেয়েটা অবাক হয়ে গেল।
মা আজ এত আদর করছে কেন?
সে তো মাত্র কয়েক দিনের জন্যই শহরে যাচ্ছে...
তার ছোট্ট মন এখনও বুঝতে পারেনি, কয়েক দিনও কখনও কখনও খুব দীর্ঘ হয়ে যায়।
ঠিক তখনই উঠোন থেকে রাসেল বাবার গলা শোনা গেল।
— "মা, সব গুছানো হয়েছে? গাড়িটা চলে এসেছে।"
সে তাড়াতাড়ি উঠে দাঁড়াল।
রাসেল বাবা।
রক্তের সম্পর্কে চাচা হলেও, জন্মের পর থেকেই তাকে "বাবা" বলেই ডেকে এসেছে সে।
কখনও মনে হয়নি, তিনি আলাদা কেউ।
রাসেল বাবা ঘরে ঢুকেই মুচকি হেসে বললেন,
— "আমার ছোট্ট রাজকুমারী তো এখনও তৈরি হয়নি!"
সে দৌড়ে গিয়ে রাসেল বাবার হাত ধরল।
— "বাবা... শহরে কী অনেক বড় বড় বাড়ি?"
— "অনেক বড়।"
— "আমগাছ আছে?"
রাসেল বাবা একটু থেমে হেসে বললেন,
— "খুব কম।"
সে আবার জিজ্ঞেস করল,
— "মাঠ আছে?"
রাসেল বাবা এবার উত্তর দিতে গিয়ে থেমে গেলেন।
কিছুক্ষণ পর শুধু বললেন,
— "আমাদের গ্রামের মতো নয়।"
কথাটা শুনে তার বুকের ভেতরটা কেমন যেন ফাঁকা হয়ে গেল।
সে আর কিছু বলল না।
চুপচাপ বাইরে বেরিয়ে এল।
উঠোনে দাদু দাঁড়িয়ে আছেন।
ব্যাংকে চাকরি করেন বলে বছরের বেশিরভাগ সময় শহরেই থাকতে হয় তাঁকে।
আজ ছুটি নিয়ে নিজেই এসেছেন নাতনিকে নিয়ে যেতে।
দাদু তাকে দেখেই হাত বাড়িয়ে বললেন,
— "এই যে, আমার সঙ্গী! শহরে গিয়ে কিন্তু আমার সঙ্গে রোজ হাঁটতে বের হবি।"
সে মৃদু হেসে মাথা নাড়ল।
দাদুর পাশে দাঁড়াতে তার ভালো লাগে।
দাদুর কথা বলার ভঙ্গিটাও কেমন শান্ত।
কিছু দূরে দাদী মালপত্র গুছিয়ে দেখছেন।
মুখে আগের মতোই কঠিন ভাব।
— "ওই ব্যাগটা ভালো করে ধরো। বইগুলো যেন ভিজে না যায়।"
— "ওই ট্রাঙ্কটা আগে গাড়িতে তোলো।"
সবাইকে নির্দেশ দিচ্ছেন।
যেন কোনো ভুল না হয়।
সে আস্তে আস্তে দাদীর পাশে গিয়ে দাঁড়াল।
একটু ইতস্তত করে বলল,
— "দাদী..."
— "কী?"
— "আমি রাতে যদি মাকে মনে করি?"
দাদী হাতের কাজ থামালেন না।
শুধু বললেন,
— "মনে করবি। মানুষ যাদের ভালোবাসে, তাদের মনে পড়েই।"
কথাটা বলেই আবার কাজে ব্যস্ত হয়ে গেলেন।
কিন্তু তিনি খেয়াল করেননি—
এই ছোট্ট উত্তরটুকু শুনে মেয়েটা আর কিছু জিজ্ঞেস করেনি।
তার মনে হলো,
তাহলে শুধু আমারই না... দাদীরও কী কাউকে মনে পড়ে?
হঠাৎ উঠোনের ওপরে একটা ঝাঁক শালিক উড়ে গেল।
সে অনেকক্ষণ আকাশের দিকে তাকিয়ে রইল।
পাখিগুলো একসঙ্গে কোথায় যেন চলে যাচ্ছে।
তার মনে হলো,
ওরা নিশ্চয়ই আবার সন্ধ্যা হলেই নিজেদের বাসায় ফিরে আসবে।
কিন্তু...
আজ সন্ধ্যায় সে আর এই উঠোনে ফিরবে না।
আমগাছটার নিচেও বসবে না।
মা বিকেলে বারান্দা থেকে ডাকলেও দৌড়ে যেতে পারবে না।
ছোট্ট বুকটার ভেতর হঠাৎ কেমন ব্যথা করে উঠল।
সে ধীরে ধীরে গিয়ে আমগাছটার গুঁড়িতে হাত রাখল।
খুব আস্তে, যেন শুধু গাছটাই শুনতে পায়—
— "আমি চলে যাচ্ছি... তুমি আমাকে ভুলে যেও না।"আমগাছটা নিশ্চুপ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।
হয়তো গাছেরা কাউকে বিদায় দিতে জানে না।
তারা শুধু অপেক্ষা করতে জানে।
হয়তো সে আবার একদিন ফিরে এসে এই গাছটার গায়ে আগের মতোই হেলান দিয়ে বসবে—এই আশাতেই গাছটা নীরবে দাঁড়িয়ে থাকবে..........
মে মাসের শেষ বিকেল।
জানালার কাঁচে রোদের শেষ আলো এসে পড়েছে। দীর্ঘ পথ পেরিয়ে গাড়িটা যখন শহরের সরু গলিটায় ঢুকল, তখন মিথিলার মনে হলো—পৃথিবীটা যেন হঠাৎ করেই বদলে গেছে।
এখানে বাতাসের গায়ে ধানের গন্ধ নেই।
কাঁচা আমের টক গন্ধ নেই।
দূরে কোথাও গরুর ঘণ্টার শব্দ নেই।
শুধু একটার পর একটা দালান। ইট, সিমেন্ট আর লোহার তৈরি অচেনা পৃথিবী।
গাড়ি থামতেই দাদু নেমে লোহার গেট খুললেন।
রাসেল বাবা একে একে মালপত্র নামাতে শুরু করলেন। বড় লোহার ট্রাঙ্ক, কাপড়ের ব্যাগ, বইয়ের কার্টন—সব সিঁড়ি বেয়ে দোতলায় তুলতে হবে।
দাদীও ব্যস্ত হয়ে পড়লেন।
— "ওই ব্যাগটা সাবধানে ধরো।"
— "ট্রাঙ্কটা আগে ভেতরে রাখো।"
— "কাচের জিনিসগুলো আলাদা করো।"
সবাই যেন নিজের নিজের কাজেই ডুবে আছে।
শুধু মিথিলা দাঁড়িয়ে আছে সিঁড়ির নিচে।
ছোট্ট স্কুলব্যাগটা দুই হাতে শক্ত করে ধরে।
তার মনে হচ্ছিল...
এত বড় শহরে সে যেন কাউকেই চেনে না।
দাদু ফিরে তাকিয়ে মুচকি হেসে বললেন,
— "কী হলো দাদুভাই? দাঁড়িয়ে আছিস কেন? চল।"
সে ধীরে ধীরে সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠতে লাগল।
প্রতিটি ধাপ যেন তাকে গ্রামের বাড়ি থেকে আরও একটু দূরে নিয়ে যাচ্ছে।
দোতলায় উঠে লম্বা বারান্দাটা দেখে সে থেমে গেল।
বারান্দার দুই পাশে মুখোমুখি দুটি ফ্ল্যাট।
দুটোর দরজাই বন্ধ।
চারদিকে এমন নীরবতা যে নিজের নিঃশ্বাসের শব্দও শোনা যায়।
দাদু চাবি ঘুরিয়ে দরজা খুলতেই নতুন রঙের হালকা গন্ধ ভেসে এল।
মিথিলা আস্তে করে ভেতরে ঢুকল।
একবার ডানদিকে তাকাল।
একটা ঘর।
বামদিকে আরেকটা ঘর।
সামনে ডাইনিং।
তার পাশেই রান্নাঘর।
দুইটা বেডরুমের সঙ্গে দুইটা ছোট বারান্দা।
সবকিছুই সুন্দর।
পরিপাটি।
তবু...
তার ছোট্ট মনটা কিছু একটা খুঁজে বেড়াতে লাগল।
হয়তো একটা আমগাছ।
হয়তো মাটির উঠোন।
হয়তো বিকেলের খেলাধুলার শব্দ।
কিন্তু কিছুই নেই।
ডাইনিংয়ের দেয়াল ঘেঁষে একটা ভাঁজ করা তোষক রাখা ছিল।
সে ধীরে ধীরে গিয়ে তোষকের ওপর বসে পড়ল।
দুই হাঁটু জড়িয়ে বসে চুপচাপ চারদিকে তাকিয়ে রইল।
রাসেল বাবা আর দাদু তখনও মালপত্র তুলছেন।
ভারী ট্রাঙ্ক কাঁধে নিয়ে বারবার সিঁড়ি ভাঙছেন।
ঘামে তাঁদের শার্ট ভিজে গেছে।
দাদী রান্নাঘরে হাঁড়ি-পাতিল গুছিয়ে আবার বেরিয়ে এসে বললেন,
— "রাসেল, ওই বইয়ের কার্টনটা ছোট ঘরে রাখো।"
— "দাদু, আলমারিটা এই দেয়ালের পাশে দিলেই হবে।"
ঘরটা ধীরে ধীরে সংসারের রূপ নিতে শুরু করল।
মিথিলা শুধু দেখছিল।
কথা বলার মতো কাউকে পাচ্ছিল না।
ঠিক তখনই...
টক...
সামনের ফ্ল্যাটের দরজাটা হালকা শব্দ করে খুলল।
সে চমকে তাকাল।
দরজার ফাঁক দিয়ে প্রায় তিরিশ বছরের এক আপা বেরিয়ে এলেন।
হাতে পানিভরা জগ।
বারান্দার টবগুলোতে পানি দিতে দিতে নতুন মুখটা দেখে থেমে গেলেন।
হেসে বললেন,
— "নতুন এসেছো?"
মিথিলা লজ্জায় মাথা নিচু করে ফেলল।
অচেনা কারও সঙ্গে কথা বলতে তার সবসময়ই সংকোচ লাগে।
রাসেল বাবা হাসিমুখে বললেন,
— "জি আপা, আজই এলাম।"
আপা এগিয়ে এসে মিথিলার দিকে তাকিয়ে বললেন,
— "তোমার নাম কী?"
সে খুব আস্তে বলল,
— "মিথিলা।"
— "বাহ! খুব সুন্দর নাম। কোন ক্লাসে পড়ো?"
— "চতুর্থ।"
— "এখানে কোনো বন্ধু নেই তো? ভয় লাগছে?"
মিথিলা একটু ভেবে মাথা নাড়ল।
— "একটু..."
আপা মায়াভরা গলায় বললেন,
— "ভয় পেও না। কয়েক দিনের মধ্যেই সব চিনে ফেলবে।"
মিথিলা কোনো উত্তর দিল না।
তার ছোট্ট মনে তখন অন্য প্রশ্ন।
বন্ধু কি এত সহজেই হয়ে যায়?
আপা নিজের ফ্ল্যাটে ফিরে গেলেন।
বারান্দাটা আবার আগের মতো চুপচাপ হয়ে গেল।
মিথিলা তোষকের ওপর ফিরে এসে বসল।
জানালার বাইরে তাকাল।
সন্ধ্যার আলো ধীরে ধীরে নরম হয়ে আসছে।
দূরের আকাশটা কমলা রঙে রাঙা।
কিন্তু সেই আকাশের নিচে নেই তার গ্রামের মাঠ।
নেই আমগাছ।
নেই সেই দোয়েল পাখিটা।
তার মনে হলো—
গ্রামের খোলা আকাশে উড়তে থাকা পাখিটাকে যদি এই শহরে এনে রাখা হয়...
তাহলে সেও কি এমন চুপচাপ হয়ে যাবে?
এই ভাবনাটা ভাবতে ভাবতেই তার চোখ দুটো ভারী হয়ে এল।
সারাদিনের ক্লান্তি, দীর্ঘ পথ আর মাকে ছেড়ে আসার কষ্ট—সব মিলিয়ে ছোট্ট শরীরটা আর জেগে থাকতে পারল না।
সে তোষকের ওপর আস্তে করে মাথা রাখল।
বাইরে তখনও রাসেল বাবা আর দাদু শেষ কয়েকটা মালপত্র তুলছেন।
দাদীর ব্যস্ত কণ্ঠ ভেসে আসছে—
— "ওই বাক্সটা এদিকে রাখো।"
— "আর একটা ব্যাগ নিচে আছে।"
শব্দগুলো ধীরে ধীরে দূরে সরে যেতে লাগল।
মিথিলার চোখ বন্ধ হয়ে এল।
নতুন শহরে...
নতুন বাড়িতে...
তার প্রথম ঘুম নেমে এল নিঃশব্দে।কতক্ষণ ঘুমিয়েছিল, সে জানে না।
চোখ খুলতেই প্রথমে কিছুই চিনতে পারল না।
সাদা ছাদ।
অচেনা দেয়াল।
জানালায় হালকা রঙের পর্দা।
কিছুক্ষণ সে স্থির হয়ে শুয়ে রইল।
তারপর হঠাৎই সব মনে পড়ে গেল।
সে আর গ্রামের দোতলা মাটির বাড়িতে নেই।
সে শহরে।
নতুন বাড়িতে।
নিঃশব্দে উঠে বসে চারদিকে তাকাল।
যে ডাইনিংটা কিছুক্ষণ আগেও বাক্স, ট্রাঙ্ক আর এলোমেলো মালপত্রে ভরা ছিল, এখন অনেকটাই গুছিয়ে গেছে।
লোহার ট্রাঙ্কটা দেয়ালের পাশে রাখা।
বইয়ের কার্টনগুলো এক কোণে সাজানো।
খাটে বিছানা পাতা হয়েছে।
জানালায় পর্দা ঝুলছে।
আলনায় কয়েকটা কাপড়ও টাঙানো।
মুহূর্তের মধ্যে ফাঁকা একটা ফ্ল্যাট যেন ছোট্ট একটা সংসারে পরিণত হয়েছে।
রান্নাঘর থেকে ভেসে আসছে গরম পরোটা ভাজার গন্ধ।
সেই গন্ধে তার হঠাৎ খুব ক্ষুধা পেল।
সে ধীরে ধীরে তোষক থেকে নেমে রান্নাঘরের দিকে এগোল।
দাদী চুলার সামনে দাঁড়িয়ে একটার পর একটা পরোটা সেঁকছেন।
কপালে ছোট ছোট ঘামের ফোঁটা জমেছে।
চুলার পাশে একটা কেটলিতে চা ফুটছে।
মাঝেমধ্যে তিনি রান্নাঘর থেকে মুখ বাড়িয়ে বলছেন,
— "বাবা, তাড়াতাড়ি হাত-মুখ ধুয়ে বসো। দেরি হয়ে যাবে।"
ডাইনিং টেবিলে দাদু সাদা শার্ট পরে বসে আছেন।
শার্টের হাতা গুটিয়ে ঘড়ির দিকে একবার তাকালেন।
ব্যাংকে পৌঁছাতে হবে।
প্রতিদিনের মতো আজও সময়মতো বের হতে হবে।
রাসেল বাবা তখনও শেষ ব্যাগটা খুলে বইগুলো আলমারিতে রাখছেন।
সকাল থেকে একটানা কাজ করতে করতে তিনিও বেশ ক্লান্ত।
মিথিলা দরজার পাশে দাঁড়িয়ে চুপচাপ সব দেখছিল।
তার মনে হচ্ছিল...
এই বাড়ির সবাই যেন খুব ব্যস্ত।
শুধু সে-ই যেন কারও কাজে লাগছে না।
সে আস্তে আস্তে রান্নাঘরে ঢুকে বলল,
— "দাদী... আমি কিছু করব?"
দাদী একবার তাকিয়ে মৃদু হেসে বললেন,
— "এখন কিছু করতে হবে না। তুই আগে হাত-মুখ ধুয়ে আয়। তারপর একসঙ্গে নাস্তা করব।"
সে মাথা নেড়ে বাথরুমের দিকে গেল।
নল খুলতেই ঠান্ডা পানি হাতে পড়ল।
মুখে পানি দিয়ে যখন আয়নায় তাকাল, নিজের মুখটাই কেমন যেন অচেনা লাগল।
চোখ দুটো একটু ফুলে আছে।
হয়তো পথে ঘুমিয়েছিল বলে...
নাকি মাকে ছেড়ে আসার জন্য...
সে নিজেও বুঝতে পারল না।
হাত-মুখ ধুয়ে ফিরে এসে ডাইনিংয়ের চেয়ারে বসতেই দাদু হেসে বললেন,
— "কী দাদুভাই, শহরের বাড়ি কেমন লাগছে?"
সে একটু ভেবে উত্তর দিল,
— "সুন্দর..."
কথাটা বলেই থেমে গেল।
দাদু বুঝলেন, এই "সুন্দর"-এর ভেতরে কতটা শূন্যতা লুকিয়ে আছে।
রাসেল বাবা তার সামনে একটা প্লেট এগিয়ে দিলেন।
— "খেয়ে নাও মা। তারপর তোমাকে পুরো বাড়িটা ভালো করে ঘুরিয়ে দেখাব।"
সে ছোট্ট করে হাসল।
কিন্তু সেই হাসি চোখ পর্যন্ত পৌঁছাল না।
খেতে খেতেই হঠাৎ তার মনে পড়ল—
এই সময়টায় মা কী করছেন?
হয়তো গ্রামের বাড়িতে রাতের রান্না করছেন।
হয়তো বারান্দায় দাঁড়িয়ে আকাশের দিকে তাকিয়েছেন।
হয়তো...
মা-ও কি এখন তাকে মনে করছেন?
তার বুকের ভেতরটা আবার হালকা করে মোচড় দিয়ে উঠল।
সে মুখ নিচু করে পরোটার ছোট্ট টুকরো ছিঁড়তে লাগল।
ঠিক তখনই বাইরে মসজিদ থেকে মাগরিবের আজান ভেসে এল।
সে চমকে জানালার দিকে তাকাল।
আজানের সুর তো একই...
তবু কেন যেন সবকিছু এত অচেনা লাগছে।
তার মনে হলো—
জায়গা বদলে গেলে শুধু বাড়ি বদলায় না, মানুষের মনও যেন একটু বদলে যায়।আজান শেষ হতেই চারদিকে এক অদ্ভুত নীরবতা নেমে এল।
মিথিলা ধীরে ধীরে উঠে বারান্দায় গিয়ে দাঁড়াল।
বারান্দার লোহার গ্রিল দু'হাতে শক্ত করে ধরে সামনের দিকে তাকিয়ে রইল।
সন্ধ্যা পুরোপুরি নেমে এসেছে।
একটার পর একটা বারান্দায় বাতি জ্বলছে।
কোথাও চাপা স্বরে টেলিভিশনের শব্দ, কোথাও রান্নার মসলার গন্ধ, কোথাও ছোট্ট একটা বাচ্চার কান্না।
এত মানুষ...
এত ঘর...
তবু যেন কেউ কাউকে চেনে না।
গ্রামে সন্ধ্যা নামলেই সবাই বাড়ির উঠোনে বসত।
কেউ গল্প করত, কেউ পিঁড়িতে বসে শাক কাটত, কেউ গরু নিয়ে ফিরত।
আর শিশুরা?
তারা তখনও খেলতে খেলতে বাড়ি ফিরতে চাইত না।
মিথিলার মনে পড়ে গেল।
এই সময়টায় হয়তো গ্রামের মাঠে এখনো তার বন্ধুরা খেলছে।
রিমি নিশ্চয়ই তাকে খুঁজছে।
রাজু হয়তো বলছে,
— "মিথি কোথায় গেল?"
ভাবতেই তার গলাটা ভারী হয়ে এল।
চোখ তুলে আকাশের দিকে তাকাল।
শহরের আকাশটাও আজ কেমন ছোট ছোট লাগে।
চারদিকে এত উঁচু দালান যে আকাশটা যেন টুকরো টুকরো হয়ে গেছে।
সে খুব আস্তে নিজের মনেই বলল,
— "আমাদের গ্রামের আকাশটা অনেক বড় ছিল..."
ঠিক তখনই একটা পাখি উড়ে এসে পাশের দালানের ছাদে বসল।
সে অনেকক্ষণ পাখিটার দিকে তাকিয়ে রইল।
তার মনে হলো,
গ্রামের খোলা আকাশে উড়তে থাকা পাখিটাও যদি একদিন এই শহরে এসে আটকে যায়... তারও কি আমার মতোই মন খারাপ হবে?
ছোট্ট একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এল।
বাতাসটা মুখে এসে লাগল।
কিন্তু এই বাতাসে ধানের গন্ধ নেই।
ভেজা মাটির গন্ধ নেই।
কাঁচা আমের গন্ধও নেই।
তার মনে হলো, এই শহরের বাতাসও বুঝি দৌড়াতে ভুলে গেছে।
রাসেল বাবা কখন যে তার পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন, সে খেয়ালই করেনি।
মৃদু হেসে বললেন,
— "কী দেখছো?"
সে চোখ না সরিয়েই বলল,
— "কিছু না..."
তারপর একটু থেমে জিজ্ঞেস করল,
— "বাবা... এখানে কী তারা দেখা যায়?"
রাসেল বাবা আকাশের দিকে তাকালেন।
হালকা মেঘের ফাঁকে একটা-দুটো তারা জ্বলছে।
তিনি আঙুল তুলে দেখালেন,
— "ওই যে... দেখো।"
মিথিলা অনেকক্ষণ তাকিয়ে রইল।
তারপর ছোট্ট করে হেসে বলল,
— "আমাদের গ্রামের তারাগুলো অনেক বেশি ছিল।"
রাসেল বাবা কিছু বললেন না।
শুধু মেয়েটার মাথায় আলতো করে হাত রাখলেন।
কখনও কখনও সান্ত্বনা দেওয়ার জন্য শব্দের দরকার হয় না।
রাত একটু একটু করে গভীর হতে লাগল।
ঘরের ভেতর দাদী বিছানা গুছিয়ে ফেলেছেন।
দাদু ব্যাংকের পরের দিনের কিছু কাগজপত্র দেখে নিচ্ছেন।
সবকিছু ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হয়ে আসছে।
শুধু মিথিলার মনটা এখনও সেই গ্রামের দোতলা মাটির বাড়ির উঠোনেই রয়ে গেছে।
ঘুমাতে যাওয়ার আগে সে একবার জানালার পর্দাটা সরিয়ে বাইরে তাকাল।
দূরে কোথাও একটা আলো জ্বলছে।
সেই আলো দেখে তার হঠাৎ মনে হলো—
হয়তো এই মুহূর্তে তার মা-ও গ্রামের বাড়ির বারান্দায় দাঁড়িয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে আছেন।
হয়তো একই তারাটাকেই দেখছেন।
এই ভাবনাটা মনে আসতেই তার ছোট্ট মুখে খুব ক্ষীণ একটা হাসি ফুটে উঠল।
সে ধীরে ধীরে বিছানায় গিয়ে শুয়ে পড়ল।
চোখ বন্ধ করার আগে খুব আস্তে ফিসফিস করে বলল,
— "মা... আমি ভালো আছি। তুমি কেঁদো না..."
কথাগুলো কেউ শুনল না।
শুধু জানালার বাইরে রাতের বাতাস নিঃশব্দে বইতে থাকল।
আর সেই রাতেই, অচেনা শহরের বুকের মধ্যে, ছোট্ট মিথিলার নতুন জীবনের প্রথম অধ্যায় নীরবে শুরু হয়ে গেল।