ফন্ট সাইজ:
থিম:
শঙ্খচূড়ার রূপকথা

৬ষ্ঠ পর্ব

লেখক: ইসরাত জাহান এশা

#শঙ্খচূড়ার__রূপকথা #পর্ব_০৬🌷

#ইসরাত__জাহান__এশা

…

আজ শুক্রবার। সকাল গড়িয়ে বেলা বাড়তেই সিদ্দিক বাড়ির উঠোনে রোদের মিষ্টি আঁচ ছড়িয়ে পড়েছে। উঠোনের একপাশে পুরোনো কাঠের পিঁড়িতে মুখোমুখি বসে জমিজমা নিয়ে গভীর আলোচনায় মগ্ন তাহির সিদ্দিক ও জহির সিদ্দিক। দুজনের সামনে ধোঁয়া ওঠা চায়ের কাপ। মাঝেমধ্যে কথার ফাঁকে চায়ের কাপে চুমুক দিচ্ছেন তারা। ফুলবানু বেগম দুজনের সামনে চায়ের কাপ রেখে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইলেন। তারপর চারপাশে একবার চোখ বুলিয়ে চিন্তিত গলায় বললেন,

“তিতলি কই গেছে জানো কেউ?”

তাহির সিদ্দিক চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বললেন,

“পারুলদের লগে আছে হয়তো। চিন্তা কইরেন না আম্মা। আমার মাইয়া আইয়া পড়বো।”

ফুলবানু বেগমের কপালে চিন্তার ভাঁজ আরও গভীর হলো। আঁচলটা বুকের কাছে টেনে ধরে বললেন,

“চিন্তা করুম না আবার! একটা নাতনি আমার। সারাদিন এইদিক-ওইদিক ঘুইরা বেড়ায়। যদি কিছু হইয়া যায়, তহন কি করুম আমি?”

জহির সিদ্দিক ঠোঁট প্রসারিত করে মৃদু হাসলেন। স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে আশ্বস্ত করার ভঙ্গিতে বললেন,

“গিন্নি, এত চিন্তা কইরো না। ও আমার নাতনি। সব দিক থেইকা পারদর্শী। ওরে কোনো বিপদ ছুইতেই পারবো না। তুমি হুদাই চিন্তা করতাছো।”

ফুলবানু বেগম বিরক্ত চোখে স্বামীর দিকে তাকালেন।

“আপনারা তো আমার চিন্তাটাই বুঝতাছেন না। আর না বুঝবেন!”

কথাটা বলেই আর দাঁড়ালেন না তিনি। মুখ গোমড়া করে আঁচলটা কাঁধে টেনে হেঁশেলের দিকে চলে গেলেন। তাহির সিদ্দিক মুচকি হেসে বাবার দিকে তাকালেন। জহির সিদ্দিকও চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে আবার জমির আলোচনায় মন দিলেন। ইহান সবে ঘুম থেকে উঠে নিচে নেমেছে। ঘুমের রেশ এখনো চোখেমুখে লেগে আছে। এলোমেলো চুলগুলো হাত দিয়ে ঠিক করতে করতে উঠোনে এসে তাহির সিদ্দিকী সাতগে জহির সিদ্দিককে বসে থাকতে দেখল। তাদের সামনে গিয়ে দাঁড়িয়ে মৃদু হেসে সালাম দিলো,

“আসসালামু আলাইকুম।”

তাহির সিদ্দিক ও জহির সিদ্দিক দুজনেই কথাবার্তা থামিয়ে ইহানের দিকে তাকালেন। জহির সিদ্দিক সস্নেহে হেসে বললেন,

“ওয়ালাইকুম সালাম।”

ইহান এগিয়ে এসে তাহির সিদ্দিকের দিকে তাকিয়ে বলল,

“ফুপা, ভালো আছেন?”

তাহির সিদ্দিকের মুখেও হাসি ফুটে উঠল।

“আমি ভালো আছি। তুমি ভালো আছো? কাইল আমাগো আইতে মেলা রাইত হইয়া গেছিল, এর লাইগ্যা তোমার লগে আর কথা হয় নাই।”

ইহান মৃদু হেসে মাথা নাড়ল।

“না ফুপা, আমি বুঝতে পারছি।”

তাহির সিদ্দিক সস্নেহে বললেন,

“যাও গিয়া মুখ-হাত ধুইয়া নাস্তা-পানি করো।”

“আচ্ছা ফুপা।”

কথাটা বলে ইহান ঘুরে দাঁড়ালেও সঙ্গে সঙ্গে চলে গেল না। কেমন যেন ইতস্তত করতে লাগল। তাহির সিদ্দিক বিষয়টা লক্ষ্য করে ভ্রু কুঁচকে তাকালেন।

“কিছু কইবা?”

ইহান একটু ইতস্তত করে বলল,

“ফুপা... আপনি কি আমার উপর রাগ করে আছেন?”

তাহির সিদ্দিক মৃদু হেসে ইহানের হাত ধরে পাশে বসিয়ে নিলেন। তারপর সস্নেহে ওর মাথায় হাত রেখে বললেন,

“না গো বাবা, আমি রাগ করি নাই। তোমার বাপ আইতে দেয় নাই দেইখা তুমি আহো নাই। এতে তুমি কী করবা কও তো দেখি? তুমি যে এহন আইছো, এডাই তো অনেক।”

ইহানের চোখেমুখে স্বস্তি ফুটে উঠল। নিচু গলায় বলল,

“ফুপা, আমার বাবা জানেও না আমি এখানে এসেছি। আপনাদের দেখার জন্য মনটা কেমন ছুটে গিয়েছিল। তাই আর থাকতে পারিনি।”

“ভালো করছো। আমাগো গ্রাম ঘুইরা-ফিইরা দেখো, ভালো লাগবো। শহরের যান্ত্রিক জীবন থেইকা একটু শান্তি পাইবা।”

ইহান মুচকি হেসে বলল,

“আচ্ছা ফুপা।”

এই বলে ইহান উঠে ঘরের দিকে চলে গেল।

তাহির সিদ্দিক ওর চলে যাওয়ার দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলেন। বুকের ভেতর থেকে একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এলো। ছেলেটার প্রতি মায়াটা যেন আগের মতোই রয়ে গেছে।

ঠিক তখনই তিতলি হাতে একটা পেয়ারা নিয়ে উঠোনে ঢুকল। পেয়ারা কামড়ে খেতে খেতে নিজের মনে গুনগুন করছিল। উঠোনে বাবা আর দাদাভাইকে বসে থাকতে দেখে ওর মুখটা সঙ্গে সঙ্গে হাসিতে ভরে উঠল। পেয়ারা হাতে দৌড়ে গেল তাদের কাছে। জহির সিদ্দিক হেসে দহাত বাড়িয়ে বললেন,

“আয় বু, আমার কাছে আইসা বস তো দেখি।”

তিতলি হেসে হেঁশেল থেকে একটা কাঠের পিঁড়ি এনে দাদাভাইয়ের পাশে বসে পড়ল।

জহির সিদ্দিক ওর মাথায় হাত বুলিয়ে জিজ্ঞেস করলেন,

“বু, সকাল সকাল কই গেছিলা?”

তিতলি পেয়ারা খেতে খেতে বলল,

“বটগাছের নিচে গেছিলাম দাদাভাই। পারুলের লগে গল্প করছিলাম।”

“ও আচ্ছা। বাসায় যে কুটুম আইছে, জানো তো?”

‘কুটুম’ শব্দটা কানে যেতেই মুহূর্তের মধ্যে তিতলির হাসিমাখা মুখটা গম্ভীর হয়ে গেল। সে পিঁড়ি থেকে উঠে দাঁড়িয়ে বলল,

“দাদাভাই, ওই কুটুমের কথা আমার সামনে আর বলবা না।”

কথাটা বলেই ঠোঁট ফুলিয়ে ধুপধাপ পা ফেলে নিজের ঘরের দিকে চলে গেল তিতলি। দূরে দাঁড়িয়ে থাকা ইহানের কানে তিতলির কথাগুলো স্পষ্টই পৌঁছাল। মেয়েটার এমন রাগ দেখে ইহানের ঠোঁটের কোণে অজান্তেই মুচকি হাসি ফুটে উঠল। কিছু না বলে সেও নিজের ঘরের দিকে চলে গেল।

★

জুমার নামাজের পর। দুপুরের খাওয়া-দাওয়া শেষ করে বাড়ির সবাই যখন যে যার মতো বিশ্রামে ব্যস্ত, তখন বিকেলের নরম রোদ ধীরে ধীরে গ্রামের উঠোনজুড়ে ছড়িয়ে পড়তে শুরু করেছে। আকাশে তুলোর মতো সাদা মেঘ। দূরের মাঠ থেকে ভেসে আসছে গরুর ঘণ্টার মৃদু শব্দ। পুকুরপাড়ের নারকেল গাছের পাতাগুলো বাতাসে দুলে দুলে শোঁ শোঁ শব্দ তুলছে। বিকেলের সেই মায়াবী সময়ে ঘরের দরজা খুলে বাইরে বের হলো তিতলি।

আজ ওর সাজটাও যেন গ্রামের বিকেলের সঙ্গে মিশে গেছে। হাঁটু অবধি নেমে আসা ঘন কালো চুলগুলো লম্বা করে বেণি করা। বেণির শেষ প্রান্তে ছোট্ট বেগুনি ফিতেটা বাতাসে দুলছে। পরনে বেগুনি রঙের লম্বা স্কার্ট, তার সঙ্গে সাদা রঙের সুতির কুর্তি। গলায় পাতলা ওড়না, কানে ছোট্ট রুপোর দুল আর পায়ে রুপোর নূপুর। কোনো ভারী সাজ নয়। চোখে সামান্য কাজল, ঠোঁটে হালকা গোলাপি আভা।

তবু বিকেলের আলোয় তিতলিকে দেখে মনে হলো, গ্রামের কোনো এক পুরোনো গল্পের পাতা থেকে বুঝি মায়াবতী নেমে এসেছে।

তিতলি নিজের মতো করে আঁচলটা ঠিক করে উঠোন পেরিয়ে বাড়ির ফটকের দিকে এগিয়ে গেল। ঘরের বারান্দা থেকে ইহানের চোখ আটকে গেল তিতলির দিকে। কিছুক্ষণ সে চুপচাপ তাকিয়ে রইল। তারপর ঘরে ফিরে নিজের ক্যামেরাটা হাতে নিল ইহান।

ক্যামেরার ফিতেটা গলায় ঝুলিয়ে নিঃশব্দে বেরিয়ে এলো সে। তিতলি তখনও কিছু টের পায়নি। সে আপনমনে মেঠোপথ ধরে এগিয়ে যাচ্ছে। পায়ের নূপুরের রিনিঝিনি শব্দ বিকেলের নীরবতার সঙ্গে মিশে এক অদ্ভুত সুর তুলছে। আর কয়েক হাত দূরত্ব বজায় রেখে ক্যামেরা হাতে তিতলির পিছু নিল ইহান।

কিছু পথ যাওয়ার পর তিতলি হঠাৎই থেমে গেলো। তিতলি থামতেই ইহানও থেমে যায়। তিতলি পিছন ঘুরে ইহানকে দেখতে পেয়ে ভ্রু কুচকে বললো,

“আপনি আমার পিছুপিছু আসছেন কেনো?”

ইহান একটু সামনে এগিয়ে বললো,

“ আসলে আমি গ্রামের কিছুই চিনি না তাই তোমার পিছুপিছু আসছিলাম। আর গ্রামটা ঘুড়ে দেখার অনেক ইচ্ছা হলো। “

তিতলি কোমড়ে হাত দিয়ে বললো,

“লজ্জা করে না একটা মেয়ের পিছুপিছু আসতে? “

“ লজ্জা কেনো করবে “?

‘’ আজব লোকতো আপনি? আমার সাথে আসতে হবে না। আমি দাদাভাইকে বলবো যেনো আপনাকে নিয়ে গ্রাম ঘুড়ায়। ‘’

“ আমি তোমার সাথে ঘুরতে চাই! “

তিতলি কপালে ভাজ ফেলে বললো,

“ কতো শখ আহারে! আমি তিতলি, নিজের মর্জিমাফিক চলি। নিজের মন যা বলে আমি তাই করি। “

ইহান অসহায় গলায় বললো,

“ আমার সাথে এমন কেনো করছো তুমি? “

তিতলি হাটতে হাটতে বললো,

“ আপনি আমার শত্রু। পরম শত্রু আপনি। “

ইহানও হাটতে লাগলো। তিতলি বিরক্তি নিয়ে হাটছে কিন্তু সামনে নজর যেতেই তিতলি খুশি হয়ে গেলো। বিহার আসছে সাথে বিনয়। দুই ভাই কথা বলতে বলতে এগিয়ে আসছে। তিতলি দৌড়ে অদের সামনে গেলো। তিতলিকে দেখে বিহার, বিনয় খুশি হলো। তিতলির সাথে ইহানও গেলো। বিনয় হেসে বললো,

“ তিতলি এই ছেলে কে? “

তিতলি গম্ভীর হয়ে বললো,

“ ঢাকা থেকে এসেছে। নাম … “

“ নাম ইহান। তিতলির মামাতো ভাই। “

ইহান নিজ থেকেই বললো। যা দেখে তিতলি আরো বিরক্ত হলো। তিতলি বিনয়ের উদ্দেশ্যে বললো,

“ বিনয় ভাই এনাকে নিয়ে গ্রামটা ঘুরিয়ে নিয়ে আসোতো। আমার কাজ আছে। “

বিনয় হেসে বললো,

“ কি কাজ তোমার? “

তিতলি চুল ঘুরাতে ঘুরাতে বললো,

“ এই আমার নতুন একটা মানুষ হয়েছে তার সাথে দেখা করতে যাবো আরকি। “

ইহান বললো,

“ আমিও যাই তোমার সাথে? “

তিতলি এবার তেরে গিয়ে ইহানের মুখের সামনে আঙুল উচিয়ে বললো,

“ আমি যেহেতু বলেছি বিনয় ভাইয়ের সাথে যাবেন মানে তার সাথেই যাবেন এতো কথা কীসের? আমার কথা মতো চলতে পারলে চলবেন না চললে বট গাছে ঝুলিয়ে দিবো। “

এই বলে হাটতে লাগলো। বেচারা ইহান তিতলি ঝাড়ি খেয়ে বিনয়ের সাথে হাটতে লাগলো। বিহার মুচকি হেসে তিতলির পিছন পিছন হাটতে হাটতে বললো,

“ ব্যাপার কী আজ? তিহু রাণি দেখি আমার সাথে মিলিয়ে জামাকাপড় পরেছে? “

তিতলি পিছনে ফিরে দেখলো বিহারও বেগুনি কালার পাঞ্জাবি আর সাদা কালার পায়জামা পরেছে। তিতলি মুচকি হেসে বললো,

“ মিললে ক্ষতি কী? “

বিহার তিতলি সাথে পায়ে পা মিলিয়ে বললো,

“ নতুন মানুষটা কী আমি? “

“ মোটেও না!”

“ আমি না! ভেবে বলছোতো? ‘’

“ এতে ভাবার কী আছে? “

‘আচ্ছা থাকো তাহলে আমি যাই। আম চেয়েছিলাম এই পড়ন্ত বিকালে তোমায় নিয়ে নদীর বুকে ভেসে বেড়াবো। কিন্তু তুমি তো আমায় চিনোই না। “

তিতলির পা জোরা থেমে গেলো। তিতলিকে থামতে দেখে বিহার উলটো ঘুরে যাওয়ার জন্য উদ্যেগ নেয়। দুই পা না দিতেই তিতলি অভিমান গলায় বললো,

“ আমায় নিয়ে সত্যি নদীর বুকে ভেসে বেড়াবেন না মাঝি? “

" আমাকে তো চিনেন না তাই নিয়ে যাবো না। "

তিতলি অভিমান করে বললো,

" বেশ আমি তাহলে ওই পোটলার সাথে ঘুরতে যাই। সেও তো আমার সাথে গ্রাম ঘুরতে চেয়েছে। "

বিহান গম্ভীর হয়ে বললো,

' তাকেই কেনো যেতে হবে? চোখে কী আর কাওকে দেখেন আপনি? "

" সেওতো আমায় চিনে না। "

চলবে……….🌷

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৬ষ্ঠ পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন