ফন্ট সাইজ:
থিম:
শঙ্খচূড়ার রূপকথা

৮ম পর্ব

লেখক: ইসরাত জাহান এশা

#শঙ্খচূড়ার__রূপকথা #পর্ব__০৮🌷

#ইসরাত__জাহান__এশা

…..

তিতলি কথা শেষ করে স্কুলের উদ্দেশ্যে রওনা হলো। তার চলে যাওয়ার পথের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল বিহার। ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল মৃদু হাসি।

“তুমি আমাকে যে কারণেই ডাকো না কেন, এই বিহার হাওলাদার তোমার ডাকে সাড়া দেওয়ার জন্য সর্বক্ষণ প্রস্তুত, তিহু রাণি।”

নিজের মনেই কথাটি বলে বিহারও ধীর পায়ে নিজের গন্তব্যের দিকে চলে গেল।

•

বেলা গড়িয়ে দুপুরের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। স্কুলের মাঠের এক পাশে বসে আছে তিতলি, পারুল ও শিউলি। চারপাশে শিক্ষার্থীদের ছোটাছুটি, হাসি-আড্ডা—সব মিলিয়ে বেশ প্রাণবন্ত পরিবেশ। অথচ তাদের মাঝেই পারুলকে আজ বেশ অন্যমনস্ক লাগছে।বিষয়টি বেশ কিছুক্ষণ ধরেই লক্ষ্য করছিল তিতলি। অবশেষে আর চুপ থাকতে না পেরে সে পারুলের দিকে তাকিয়ে বলল,

“পারুল, কী হয়েছে তোর?”

পারুল ধীরে ধীরে মুখ তুলে তিতলির দিকে তাকাল। তার চোখেমুখে স্পষ্ট আতঙ্ক। কিছুক্ষণ ইতস্তত করে ভীত কণ্ঠে বলল,

“সই, তুই তো জানিস আমার বাড়িতে আমার বৃদ্ধ বাবা ছাড়া আর কেউ নেই। আমার ভাইয়েরাও আমাদের কোনো খোঁজ নেয় না। এই অবস্থায় দীপ্তর সঙ্গে সম্পর্কে জড়ানোটা আমার উচিত হচ্ছে না। আজকাল রাতে আমার ঘুম আসে না। কেমন যেন ভয় লাগে, সই।”

তিতলির বুকটা কেমন যেন মোচড় দিয়ে উঠল। সে আর কিছু না বলে পারুলকে নিজের কাছে টেনে জড়িয়ে ধরল।

“ভয় পাস না, সখী। কিছু হবে না তোর। আমি তো আছি।”

কিন্তু তিতলির আশ্বাসেও পারুলের ভয় কাটল না। সে আরও ভীত কণ্ঠে বলল,

“সই, তুই বুঝতে পারছিস না। গতকাল রাতে আমার বাড়িতে কেউ এসেছিল।”

তিতলি সঙ্গে সঙ্গে পারুলকে ছেড়ে তার মুখের দিকে তাকাল।

"কী বলছিস?”

"হ্যাঁ, সই। কেউ একজন এসেছিল। কে এসেছিল, কেন এসেছিল—কিছুই জানি না। কিন্তু আমার মনটা কেমন যেন অশুভ সংকেত দিচ্ছে। মনে হচ্ছে, এরপরের লাশটা আমি হব না তো?”

“কীসব বলছিস তুই?” তিতলি কিছুটা বিরক্ত হয়ে বলল। “তোর মাথা ঠিক আছে? সারাদিন এসব নিয়ে ভাবিস বলেই এমন মনে হচ্ছে। কিছুই হবে না তোর। বেশি ভয় লাগলে তুই আমার সঙ্গে থাকবি। কিন্তু এসব কথা আর মুখে আনবি না, বুঝেছিস?”

পারুল মাথা নিচু করে রইল।

“আমি নিজের মনটাকেই শান্ত করতে পারছি না, সই। দীপ্ত যেদিন তার মনের কথা আমাকে বলেছিল, সেদিন থেকেই আমার মন অশান্ত হয়ে আছে। ঠিকমতো খেতে পারি না, ঘুম আসে না। সারাক্ষণ শুধু ভয় হয়।”

কথা বলতে বলতে পারুলের চোখে পানি এসে গেল। একসময় সেই অশ্রু গড়িয়ে পড়ল তার গাল বেয়ে।

তিতলি সযত্নে তার চোখের পানি মুছে দিয়ে বলল,

“আমার লক্ষ্মী সই, কাঁদিস না। তোর সইয়ের ওপর বিশ্বাস নেই? এই গ্রামে যেন আর একটি লাশও না পড়ে, সেই চেষ্টা আমিও করছি।”

পারুল চোখের পানি মুছে তিতলির দিকে তাকিয়ে বলল,

“কী করবি সই?”

তিতলি কিছুক্ষণ নীরব রইল। তারপর সোজা হয়ে বসে দৃঢ় কণ্ঠে বলল,

“কিছু একটা তো করতেই হবে। আর মাত্র কয়েক দিন পর বুধবার। সময় একদম হাতে নেই। তার আগেই আমাকে সবকিছু খুঁজে বের করতে হবে।”

পারুল উৎকণ্ঠিত কণ্ঠে বলল, “তাহির কাকাও তোকে এসবের মধ্যে জড়াতে নিষেধ করেছে।”

তিতলির চোখে এবার দৃঢ়তা ফুটে উঠল। “আব্বাজান যতই নিষেধ করুন না কেন, এবার আমি তাঁর নিষেধ কানে তুলব না। মৃণালিনির মৃত্যু থেকে শুরু করে আসমানের পাগল হয়ে যাওয়া, তারপর তার হঠাৎ নিখোঁজ হয়ে যাওয়া—এরপর একের পর এক কিশোরী মেয়ের মৃত্যু। তার ওপর একই সময়ে লাশ পাওয়া যাচ্ছে। সবকিছু কেমন যেন একটি রহস্যের সঙ্গে জড়িয়ে আছে। প্রতিবারই কোনো না কোনো জায়গায় আমার খটকা লাগে। মনে হয়, এই ঘটনাগুলোর পেছনে একই রহস্য লুকিয়ে আছে। অথচ কোনোভাবেই এর সমাধান হচ্ছে না।এর পেছনে যে-ই থাকুক না কেন, যত গভীরেই এই রহস্য লুকিয়ে থাকুক—আমি তাকে খুঁজে বের করবই। এই গ্রামের আর কোনো মেয়ের লাশ আমি দেখতে চাই না। সত্যিটা প্রকাশ না হওয়া পর্যন্ত আমারও শান্তি নেই।”

পারুল নিঃশব্দে তিতলির দিকে তাকিয়ে রইল। তার ভয় তখনও কাটেনি।

••

ঝকঝকে নীল আকাশটা হঠাৎ করেই কালো মেঘে ঢেকে গেল। মুহূর্তের মধ্যেই চারদিক অন্ধকারে ছেয়ে গেল। আকাশের বুক চিরে বারবার বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে, আর তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বিকট শব্দে গর্জে উঠছে মেঘ। স্কুল ছুটি হতেই তিতলি দ্রুত পা চালিয়ে বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা হলো। পারুল অবশ্য অর্ধেক ক্লাস করেই বাড়ি চলে গিয়েছিল। তার সঙ্গে শিউলিও চলে গেছে। ফলে এখন একাই ফিরতে হচ্ছে তিতলিকে।

কিন্তু মাঝপথে আসতেই হঠাৎ ঝমঝম করে বৃষ্টি নেমে এলো। মুহূর্তের মধ্যেই তিতলি ভিজে একাকার হয়ে গেল। ভেজা কাপড় শরীরের সঙ্গে লেপ্টে আছে। ঠান্ডা বাতাসে তার শরীর কাঁপছে। অথচ বাড়ি যেতে এখনো অনেকটা পথ বাকি। তিতলি এদিক-ওদিক তাকিয়ে দেখল, কোথাও আশ্রয় নেওয়া যায় কি না। একটু দূরে একটি পুরোনো চিলেকোঠার মতো বাড়ি তার চোখে পড়ল। বৃষ্টির হাত থেকে বাঁচতে তিতলি দৌড়ে গিয়ে বাড়িটির নিচে দাঁড়িয়ে পড়ল। চারপাশটা বেশ নোংরা ও অযত্নে পড়ে আছে। আগাছায় জায়গাটা প্রায় ঢেকে গেছে। বাড়িটাকেও বহুদিনের পরিত্যক্ত মনে হচ্ছে। তিতলি মনে মনে ভাবল, হয়তো এই বাড়িতে কেউ থাকে না। তাই আর বেশি কিছু না ভেবে সেখানেই দাঁড়িয়ে রইল। কিন্তু সময় গড়াতে লাগল। বৃষ্টির থামার কোনো লক্ষণই নেই। বরং কিছুক্ষণ পর বৃষ্টি আরও জোরে নামতে শুরু করল। চারপাশে শুধু বৃষ্টির শব্দ। হঠাৎ বাড়িটির ভেতর থেকে ভারী কিছু পড়ে যাওয়ার শব্দ হলো।বতিতলি আঁতকে উঠল।

মুহূর্তের মধ্যে তার বুকের ভেতরটা ধক করে উঠল। এতক্ষণ যে বাড়িটাকে পরিত্যক্ত মনে হচ্ছিল, সেই বাড়ির ভেতর থেকে শব্দ আসছে! তিতলি স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। বাড়িটা লোকালয় থেকে বেশ খানিকটা ভেতরে। তার ওপর ঝুম বৃষ্টি, চারপাশের অন্ধকার আর মাঝে মাঝে বিদ্যুতের ঝলকানি—সব মিলিয়ে জায়গাটার পরিবেশ মুহূর্তেই ভৌতিক হয়ে উঠেছে।

তিতলি ধীরে ধীরে পেছনে ফিরে তাকাল। তার চোখ আটকে গেল একটি ছোট জানালায়। কিছুক্ষণ দ্বিধায় দাঁড়িয়ে থাকার পর সাহস সঞ্চয় করে তিতলি জানালাটির কাছে এগিয়ে গেল। চারপাশে একবার তাকিয়ে খুব সাবধানে জানালাটি খুলে ভেতরে উঁকি দিল। ঘরের ভেতরে হলদেটে রঙের একটি টিমটিমে বাতি জ্বলছে। আলো এতটাই ম্লান যে ঘরের সবকিছু স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে না। তবে সেই আবছা আলোয় তিতলি কাউকে বসে থাকতে দেখল। তার বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল। তিতলি চোখ কুঁচকে আরও ভালো করে দেখার চেষ্টা করল। মানুষটির মুখটা দেখতে পেয়ে তিতলির শরীর যেন অবশ হয়ে গেল।

ভয়ে সে কয়েক পা পিছিয়ে গেল। চোখেমুখে আতঙ্ক স্পষ্ট। আর এক মুহূর্তও সেখানে দাঁড়ানোর সাহস হলো না তার। তিতলি জানালার কাছ থেকে সরে এসে ছুটে বেরিয়ে গেল বাড়িটির আঙিনা থেকে। বাইরে তখনও মুষলধারে বৃষ্টি।, কাদা কিংবা বজ্রপাত—কোনো কিছুর দিকেই তার খেয়াল নেই। সে শুধু দৌড়াচ্ছে। তাকে এখন দ্রুতই বাসায় যেতে হবে এ ভেবেই সে দৌড়াচ্ছে। তার বুক ধড়ফড় করছে। নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে। ভয়ে হাত-পা কাঁপছে। মনে হচ্ছে, পেছন থেকে কেউ যেন তাকে অনুসরণ করছে। তিতলি বারবার পেছনে তাকাতে চেয়েও তাকাতে পারছে না।

এদিকে তিতলি বাড়ি ফিরতে দেরি করছে দেখে তাহির সিদ্দিকের মনটা অশান্ত হয়ে এলো । বাইরে তখনও বৃষ্টি। মেয়েটা এখনো ফেরেনি। শেষ পর্যন্ত আর ঘরে বসে থাকতে পারলেন না তিনি। একটি ছাতা হাতে নিয়ে মেয়েকে নিয়ে আসতে বেরিয়ে পড়লেন।

কিছুদূর যেতেই দূর থেকে কাউকে দৌড়ে আসতে দেখা গেল। তাহির সিদ্দিক চোখ কুঁচকে তাকালেন। মেয়েকে এভাবে দৌড়ে আসতে দেখে তার বুকের ভেতর অজানা এক আশঙ্কা চেপে বসল। তিনি নিজেও দ্রুত পা চালিয়ে মেয়ের দিকে এগিয়ে গেলেন।

তিতলিও দূর থেকে তার আব্বাজানকে দেখতে পেল।

বাবাকে দেখেই যেন তার বুকের ভেতরের ভয়টা খানিকটা কমে গেল। তাহির সিদ্দিক মেয়ের কাছে পৌঁছাতেই তিতলি ছুটে গিয়ে তাকে জড়িয়ে ধরল।

তার পুরো শরীর কাঁপছে। তাহির সিদ্দিক মেয়ের এমন অবস্থা দেখে নিজেই আতঙ্কিত হয়ে পড়লেন। তিনি মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে উদ্বিগ্ন কণ্ঠে বললেন,

“আম্মাজান, কী হইছে আপনার? এমনভাবে দৌড়াইয়া আসছেন ক্যান?”

তিতলি কাঁপতে কাঁপতে বাবাকে আরও শক্ত করে জড়িয়ে ধরে বলল,

“আব্বাজান... বাসায় চলুন। আমারে নিয়ে বাসায় চলুন, তাড়াতাড়ি।”

তাহির সিদ্দিক মেয়ের আচরণের কোনো কারণই বুঝতে পারলেন না। তবু আর কোনো প্রশ্ন করলেন না।

মেয়েকে নিজের কাছে রেখে দ্রুত বাড়ির দিকে রওনা হলেন।

•

সন্ধ্যার দিকে এসে বৃষ্টির তীব্রতা অনেকটাই কমে এল। আকাশের কালো মেঘ ধীরে ধীরে সরে যাচ্ছে। টিনের চালে বৃষ্টির টুপটাপ শব্দও আগের তুলনায় অনেক মৃদু। কিন্তু সিদ্দিক বাড়িতে তখনও স্বস্তি ফেরেনি।

তিতলির শরীরে প্রচণ্ড জ্বর উঠেছে। জ্বরে তার পুরো শরীর কাঁপছে। কপাল পুড়ে যাচ্ছে, অথচ হাত-পা বরফের মতো ঠান্ডা। চোখ দুটোও কেমন নিস্তেজ হয়ে এসেছে। তিতলির মাথার পাশে বসে ফুলবানু বারবার চোখের পানি মুছছেন আর কপালে জলের পট্টি দিচ্ছেন। কাঁদতে কাঁদতে বললেন,

“আমার ফুলের মতো নাতিনের কী হইল গো আল্লাহ! জ্বর তো কমতেছেই না। কোন শকুনের নজর পড়ল আমার উড়ন্ত পাখিটার উপর!”

পাশেই চুপচাপ বসে আছে ইহান। কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই যেন ছেলেটা একেবারে বদলে গেছে। তার মুখের হাসি নেই, চোখেমুখে গভীর চিন্তার ছাপ।

বারবার সে তিতলির দিকে তাকাচ্ছে। তিতলির এমন অবস্থা সে কিছুতেই মেনে নিতে পারছে না।

তাহির সিদ্দিক ডাক্তার আনতে বেরিয়ে গেছেন।

অন্যদিকে জহির সিদ্দিকও নাতনির পাশে বসে আছেন। বৃদ্ধ চোখ জোড়ায় উদ্বেগ স্পষ্ট। ঘরের ভেতর তখন কেবল তিতলির কাঁপুনির শব্দ, ফুলবানুর কান্না আর বাইরে থেমে আসা বৃষ্টির টুপটাপ শব্দ।

চলবে…….

#নোটঃ ৫০০+ রিয়েক্ট না উঠলে নয় নাম্বার পর্ব আসতে দেরি হবে বলে দিলাম। এবার আপনাদের উপর নির্ভর করছে। আমি অনেক অসুস্থ বহু কষ্টে লিখেছি। চোখ ব্যাথা, মাথা ব্যাথা । ফোনের দিকে তাকাতে কষ্ট হচ্ছে অনেক। রেসপন্স করবেন সবাই। পড়ে মতামত জানাবেন। আপনারা এখনি রিয়েক্ট দেওয়া বন্ধ করে দিচ্ছেন। আর অনেকেই বলেন ইনবক্সে পর্ব যেনো বড় করে দেই। লাইক সিরিয়াসলি!! আপনারা রেসপন্স করবেন না আবার এর থেকেও বড় পর্ব চাচ্ছেন!! আমারতো কষ্ট লাগে। একটা রিয়েক্ট আর একটা কমেন্ট করতে এক মিনিটও লাগে না। একটুতো আমার উপর মায়া করুন 🥹🥲 আর আমার এক্টিভ পাঠকদের জানাই অনেক অনেক ভালোবাসা ☺️🌸

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৮ম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন