#রাগে_অনুরাগে_তুমি || পর্ব ১১ ||
#কলমে_ইসরাত_জাহান_এশা
রাত অনেক গড়িয়ে গেছে। শহরে বেশিরভাগ আলো নিভে গেছে। কোথাও কোথাও শুধু ল্যাম্পপোস্টের হলদেটে আলো জ্বলছে। ফাঁকা রাস্তায় মাঝে মাঝে দু-একটা গাড়ি ছুটে যাচ্ছে। ঘড়ির কাঁটা তখন প্রায় আড়াইটা ছুঁইছুঁই।এই সময়েই তূর্যের গাড়ি ধোঁয়া উড়িয়ে এসে থামলো শেখ বাড়ির গেটের সামনে। বনানী থেকে উত্তর বাড্ডা—এই রাস্তা সাধারণত এক ঘণ্টার মতো লাগে। কিন্তু তূর্য যেন আজ সব নিয়ম ভেঙে দিয়েছে। মাত্র কুড়ি মিনিটেই সে পৌঁছে গেছে। গাড়ি বন্ধ করে কিছুক্ষণ চুপচাপ বসে রইলো সে। তারপর ধীরে ধীরে গাড়ি থেকে নেমে এলো। কয়েক পা হাঁটলো। আবার থামলো। গেটের সামনে দাঁড়িয়ে কিছুক্ষণ পায়চারি করলো। কিন্তু হঠাৎই তার নিজের মাথায় প্রশ্ন জাগলো— সে এখানে কেন এসেছে? তার তো মাথা ধরেছে। পেটেও খুব খিদে। মাকে ডাকলেই তো খাবার পেয়ে যেত। তাহলে সে এখানে কেন? তূর্য বিরক্ত হয়ে নিজের চুলে হাত চালালো।
— “ধুর!”
নিজের উপরই যেন খুব রাগ হলো তার। কিন্তু এখন যখন এসে পড়েছে তাহলে ভেতরে ঢুকতেই পারে। সে তো চুরি করতে আসেনি। বড় বড় পা ফেলে গেটের সামনে এসে দাঁড়াতেই কপাল কুঁচকে তাকালো দারোয়ানের দিকে। দারোয়ান নাক ডেকে ভোঁস ভোঁস করে ঘুমাচ্ছে। তূর্য বিরক্ত হয়ে বিড়বিড় করে বললো—
— “এসব দারোয়ানদের নিয়ে পারা যায় না! রাতভর ঘুমাবে, মাস শেষে টাকা নেবে।”
এই বলে গেটে একটা জোরে থাবড়া মারতেই দারোয়ান হকচকিয়ে উঠে বসলো। গেটের সামনে তূর্যকে দেখে সে সাথে সাথে চিনে ফেললো। তরিঘরি করে গেট খুলে দিলো। তূর্য ভেতরে ঢুকতেই সে দাঁত বের করে সালাম দিলো—
— “সালাম স্যার!”
তূর্যও হালকা মাথা নেড়ে সালামের জবাব দিলো।কিছুদূর এগিয়ে গিয়ে আবার থামলো সে। পেছনে ফিরে বললো—
— “এই গেট ছাড়া আর কোনো দরজা দিয়ে ভেতরে ঢোকা যায়?”
দারোয়ান মাথা নাড়িয়ে বললো—
— “না তো স্যার।”
তূর্য কপাল চুলকে বললো—
— “তোমাদের নীরা ম্যাডামের বারান্দা কোনটা, চেনো?”
— “হ, স্যার! চিনি তো।”
— “আমাকে নিয়ে চলো সেখানে।”
— “আইচ্ছা স্যার।”
দারোয়ান সামনে হাঁটতে লাগলো। কিছুক্ষণ পর এসে একটা জায়গায় দাঁড়িয়ে বললো—
— “এইডাই স্যার, নীরা ম্যাডামের বারান্দা।”
তূর্য তাকিয়ে দেখলো— ঘরের ভেতরে ব্লু রঙের ড্রিম লাইট জ্বলছে। মুহূর্তের জন্য সে স্থির হয়ে রইলো। তারপর আবার বললো—
— “ভেতরে যাবো কীভাবে?”
দারোয়ান একটু ভেবে বললো—
— “স্যার, চঙা আছে… আনমু?”
তূর্য ভ্রু কুঁচকে বললো—
— “চঙা কী?”
দারোয়ান হেসে বললো—
— “আরে স্যার, চিনেন না? চঙা হইলো মই। সিঁড়ির লাহান, কাঠের বানানো।”
তূর্য বললো—
— “ও আচ্ছা। যাও, নিয়ে আসো।”
দারোয়ান চঙা আনতে গেলো। ততক্ষণ তূর্য নীরার বারান্দার দিকে তাকিয়ে রইলো।কিছুক্ষণ পর দারোয়ান তার বড় ভুঁড়ি দুলাতে দুলাতে কাঁধে করে মই নিয়ে এলো। বারান্দার সাথে লাগিয়ে দিলো। তূর্য সেটা দেখে বললো—
— “রেলিং কোথায়? আমি উঠবো কীভাবে?”
দারোয়ান বললো—
— “আরে স্যার, এইডাতে রেলিং ফেলিং থাকে না। এক ধাপে পা, আরেক ধাপে হাত দিয়া ধরতে ধরতে উঠতে হয়। আপনে উঠেন, আমি ধরতাছি। পড়বেন না।”
তূর্য ঠান্ডা গলায় বললো—
— “No thanks. I will manage.”
দারোয়ান দাঁত বের করে হাসলো।
— “স্যার, মেডাম কী রাগ কইরা বাপের বাড়ি আইছে? ঝগড়া হইছে বুঝি? নির্ঘাত মোবাইলও ধরতাছে না। এই লাইগাই তো আপনে এই রাইতে এইহানে আইছেন, তাই না স্যার?”
তূর্য ভ্রু কুঁচকে বললো—
— “Set-up! নিজের কাজ করুন। আর কাজ ফেলে ঘুমাচ্ছেন কেন? এখন যদি চোর এসে পড়তো তখন?”
দারোয়ান পেট চাপড়ে বললো—
— “কিতা যে কন না স্যার! এই পেটমোটা রফিক যেইহানে, সেইহানে চোর কেন—চোরের বাপও আইতে পারবো না!”
তূর্য হাত পকেটে ঢুকিয়ে বললো—
— “কেন? ম্যাজিক জানেন নাকি?”
রফিক হেসে বললো—
— “না স্যার। চোর আইলে আমি এমন জোরে একখান পাদ দিমু—ওরা উল্টাইয়া পইড়া যাইবো! আমার পাদের গন্ধে চোর বাপ বাপ কইয়া দৌড় দিবো! আর যদি না যায়—তাইলে চোরের মুখের উছায় বইয়া পাদ দিয়া দিমু! আমার আবার কাজের টাইমেই পাদ আসে। আমার বউও এই লাইগা খালি বাপের বাড়ি যায়!”
তূর্য মুখ কুঁচকে বললো—
— “ভাষা ঠিক করুন। এসব কী ধরনের কথা?”
রফিক হেসে বললো—
— “কিল্লায় স্যার, আপনের পাদ আসে না নাকি? ও আইচ্ছা বুঝছি… বড়লোকদের পাদ আটকাইয়া রাখনের মেশিন থাকে!আমরা গরিব মানুষ স্যার… পাদ দিলে পেট শান্তি হয়। আহা… কী শান্তি!”
তূর্য বিরক্ত হয়ে কপালে হাত চাপা দিলো।
★
★
রাত তখন আরও গভীর। চারপাশ একদম নিস্তব্ধ। মাঝে মাঝে দূরের কোথাও কুকুরের ডাক শোনা যাচ্ছে। আকাশে পূর্ণিমার চাঁদটা যেন আরও উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে। সেই নরম সাদা আলো ছড়িয়ে পড়েছে চারদিকে। শেখ বাড়ির চারপাশেও গভীর নীরবতা।
নীরার ঘরের বারান্দার নিচে দাঁড়িয়ে আছে তূর্য। তার সামনে কাঠের সেই মই—যেটাকে দারোয়ান রফিক “চঙা” বলেছিল। তূর্য কয়েক সেকেন্ড মইটার দিকে তাকিয়ে রইলো। তারপর বিরক্ত গলায় বললো—
“এই জিনিস দিয়ে মানুষ ওঠে কীভাবে!”
রফিক দাঁত বের করে বললো—
“আরামসে স্যার! এক ধাপে পা, আরেক ধাপে হাত। দেখবেন কিচ্ছু হইবো না।”
তূর্য আর কিছু না বলে ধীরে ধীরে মইতে পা রাখলো। সাবধানে ধরে ধরে ওপরে উঠতে লাগলো সে। নিচে দাঁড়িয়ে রফিক ফিসফিস করে বললো—
“স্যার সাবধানে… পড়ে যাইয়েন না।”
তূর্য দাঁত চেপে বললো—
“চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকুন।”
কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই সে বারান্দার রেলিং টপকে ভেতরে উঠে গেল। রফিক নিচে দাঁড়িয়ে ফিসফিস করে বললো—
“আল্লাহ ভরসা!”
★
বারান্দায় দাঁড়িয়ে কিছুক্ষণ স্থির হয়ে রইলো তূর্য। ভেতরের ঘর থেকে নীল রঙের ড্রিম লাইটের আলো বের হয়ে আসছে। রাতের নরম বাতাস পর্দাটা আস্তে আস্তে দুলিয়ে দিচ্ছে। তূর্য ধীরে ধীরে জানালার কাছে এগিয়ে গেল। ভেতরে তাকাতেই তার চোখ কয়েক সেকেন্ডের জন্য স্থির হয়ে গেল। বিছানার ওপর নীরা শুয়ে আছে। মাঝখানে নীরা… এক পাশে নাহিয়ান… আরেক পাশে মুন্নি। নাহিয়ান মায়ের হাত জড়িয়ে ঘুমিয়ে আছে। মুন্নি আবার নীরার হাত শক্ত করে ধরে রেখেছে। তার পাশে সেই চিরচেনা পুতুল—কিরা। নীরার মুখে গভীর ঘুমের শান্ত ছাপ। চাঁদের আলো আর ড্রিম লাইটের মিশ্রণে তার মুখটা যেন আরও নরম আর শান্ত লাগছে। তূর্য অনেকক্ষণ চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইলো। তার চোখে তখন অদ্ভুত এক দৃষ্টি। ক্লান্তি…বিরক্তি… অস্থিরতা….. সবকিছু যেন এক মুহূর্তে কোথায় মিলিয়ে গেল। সে ধীরে ধীরে বারান্দার দেয়ালে হেলান দিয়ে দাঁড়ালো। মাথার ভেতর একটা অদ্ভুত ভাবনা ঘুরতে লাগলো। সে এত রাতে এখানে কেন এসেছে? তার চোখ শুধু বিছানার দিকে আটকে আছে। হঠাৎ ঘুমের মধ্যেই মুন্নি একটু নড়েচড়ে উঠলো।তারপর আরো শক্ত করে ধরলো। নীরা ঘুমের মধ্যেই তাকে আরও একটু জড়িয়ে ধরলো। এই দৃশ্যটা দেখে তূর্যের ঠোঁটের কোণে অজান্তেই একটা হালকা হাসি ফুটে উঠলো।
সে ধীরে ধীরে মাথা নিচু করলো। তারপর ধীরে ধীরে বিছানার কাছে গিয়ে ছেলের কপালে চুমু দিলো। নীরার দিকে তাকিয়ে থাকলো কিছুক্ষন। নাহিয়ানের থেকে নীরার হাত ছাড়িয়ে নিলো। নাহিয়ানকে একটু সরিয়ে মাঝখানে শুইয়ে দিলো। নীরাকে পাশে আনতেই সে বুঝলো— বিছানায় আর তেমন জায়গা নেই।
দুইজন বড় মানুষ ঠিকমতো ঘুমাতেই পারবে না। আর এখানে তো দুইটা ছোট বাচ্চাও আছে। তূর্য আর কিছু না ভেবে অল্প জায়গাটুকু নিয়ে শুয়ে পড়লো। তবে তার শরীরের অর্ধেকের বেশি ভর পড়ে রইলো নীরার উপরেই। তূর্য নীরার গলার ভাঁজে মুখ ডুবিয়ে চোখ বন্ধ করলো। অদ্ভুত এক শান্তি লাগছে। কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই তার মাথায় একটা চিন্তা এলো—তার মাথা ধরা তো ছিল… কিন্তু এখন কেন যেন আর নেই। কেন নেই—সে জানে না। আর জানতেও চায় না। তূর্য নীরাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরেই শুয়ে রইলো। নীরার উপর ভারি কিছু চাপ লাগতেই তার ঘুমটা একটু নড়ে উঠলো।
গলার কাছে উষ্ণ নিশ্বাসের ছোঁয়া পেয়ে শরীর কেঁপে উঠলো তার। চোখ খুলতেই সে বুঝতে পারলো— একটা পুরুষ তাকে জড়িয়ে ধরে শুয়ে আছে। কিন্তু সেই পুরুষ কে—এটা বুঝতে তার এক মুহূর্তও লাগলো না। এই দুই মাসে তূর্যের পারফিউমের গন্ধ তার মুখস্থ হয়ে গেছে। এটা তারই গন্ধ। তার হালাল পুরুষ। কিন্তু সে এখানে এলো কীভাবে? আর এভাবে ঘুমাচ্ছে কেন? নীরা ধীরে ধীরে ডাকলো—
“এই শুনছেন…”
তূর্য একটু নড়েচড়ে আবার তাকে আরও শক্ত করে জড়িয়ে ধরলো। নীরা আবার ডাকলো—
“শুনছেন…”
এবার একটু জোরেই ডাকলো। তূর্য কপাল কুঁচকে ঘুম জড়ানো গলায় বললো—
“স্টুপিড মহিলা… ডাকছো কেন? ঘুমাতে দাও।”
কিছুক্ষণ চুপ থেকে আবার বিড়বিড় করলো—
“Nice smell…”
নীরা বিস্ময়ে স্থির হয়ে রইলো।
চলবে…...