#প্রণয়ঘোরের_সন্ধিতে (২২)
#লেখনীতে_সালমা_চৌধুরী
নিস্পন্দ পরিবেশ৷ নিলুর মামা খালারা একে অপরের দিকে মুখ চাওয়াচাওয়ি করছেন। নিলুর আব্বু স্তব্ধ চোখে তাজের দিকে চেয়ে আছেন। ভ্রু জোড়া কুঁচকে আছে। নিলুর আম্মুর চোখে রাজ্যের বিস্ময়। অবিশ্বাস্য দৃষ্টিতে একবার তাজের দিকে দেখছেন আবার ঘাড় ফিরিয়ে নিলুকে দেখার চেষ্টা করছেন। তাজের নিঃশ্বাস আঁটকে আছে গলায়। এ এক ভয়ানক পরিস্থিতি। এত গুলো চোখ এক দৃষ্টিতে তাজকে দেখছে। কারো মুখে কোনো শব্দ নেই। অনেকটা সময় নীরবতায় কাটল। তাজ রয়েসয়ে নিঃশ্বাস ছেড়ে পুনরায় বলল,
" আংকেল, আপনি বোধহয় আমার কথা বিশ্বাস করতে পারছেন না। নয়তোবা আমাকে ঠিকমতো ভরসা করতে পারছেন না। আপনি বললে আমি খুব শীঘ্রই আব্বুকে নিয়ে আপনাদের বাসায় আসবো।"
তাজকে থামিয়ে দিয়ে নিলুর আব্বু গুরুগম্ভীর কণ্ঠে প্রশ্ন করলেন,
"তুমি কি বলছো, বুঝে বলছো তো?"
"জি আংকেল। আমি আর নিলু দু'জন দু'জনকে পছন্দ..."
এরমধ্যে নিলু উপর থেকে নেমে এসে তাজের কাছে দাঁড়াল। রাগান্বিত কণ্ঠে হুঙ্কার দিল,
" তুমি কোন সাহসে আমার বাড়িতে এলে!"
তাজ সহ উপস্থিত সকলে হতভম্ব হয়ে গেল। তাজের আতঙ্কিত দুচোখ প্রশস্ত হলো। মনের ভেতরে চলমান উত্থান পতন হঠাৎই স্তব্ধ হয়ে গেল। তাজ বাঁকা চোখে নিলুর দিকে তাকিয়ে রইল৷ মেয়েটার চোখে-মুখে তীব্র আক্রোশ। বিরক্তিতে কপালে কয়েক স্তর ভাঁজ পড়েছে। নিলুর আব্বু ধমকের স্বরে মেয়েকে বললেন,
" নিলু, থামো।"
" আব্বু, প্লিজ। তুমি কিছু বলো না।"
পুনরায় তাজকে উদ্দেশ্য করে বলল,
" শুনো তাজ, তোমার সাথে আমার কোনোদিন কোনো প্রকার সম্পর্ক ছিল না। তুমি আমার ক্লাসমেট ছিলে এটুকুই আমাদের পরিচয়। তোমার ভাবনা চিন্তা তোমার মধ্যে রেখে এক্ষুনি আমাদের বাসা থেকে বেড়িয়ে যাও। "
তাজের মেজাজ গরম। বাড়ি ভর্তি মানুষের সামনে নিজের সম্মান বাঁচিয়ে চলে যাবে নাকি নিলুর বলা মিথ্যার প্রতিবাদ করবে সেটা ভাবতে খানিক সময় নিল। আজ যদি চুপ করে উঠে যায় তাহলে আর কোনোদিন এই পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে পারবে না। তাজ মনে মনে আওড়াল,
"নিলু কি ওর আব্বুর ভয়ে এসব বলছে?"
তাজ শান্ত কণ্ঠে বলল,
" নিলু, তুমি একটু সাহস রাখো। আংকেলকে কথা বলতে দাও প্লিজ।"
নিলু পুনরায় চিৎকার করল,
" আব্বু কি বলবে! তোমার মতো লো ক্লাস এক ছেলে কিছু বললেই কি আমার আব্বু বিশ্বাস করে নিবে? কখনোই না। এক ক্লাসে ছিলাম বলে দুই কয়েকবার বন্ধুর মতো কথা হয়েছে। তুমি এটাকে ভালোবাসার নাম দিচ্ছো? ছিঃ তাজ। তোমার থেকে এটা আশা করি নি।"
নিলুর আব্বু নিলুকে থামিয়ে দিয়ে বললেন,
" তোমার সাথে যদি তাজের কোনো সম্পর্ক না-ই থাকবে তাহলে সে আমার বাড়িতে ঢুকে, আমার সামনে বসে আমার মেয়েকে বিয়ের প্রস্তাব দেওয়ার সাহস কোথায় পাবে! "
তাজ গোল গোল চোখে নিলুকে দেখছে। এই নিলু তাজের জন্য বড্ড অপরিচিত। মনে হচ্ছে এই নিলুকে আজ প্রথমবার দেখছে৷ মুখের উপর তিন বছরের সম্পর্কে অস্বীকার করা সাহস কিভাবে হলো! নিলুর আব্বুর কোনো কথায় তাজের মাথায় ঢুকছে না। তাজ শুধু অবাক চোখে নিলুকেই দেখছে।
নিলু গলা ঝেড়ে আমতা আমতা করে বলল,
" আমার বিয়ে ঠিক হয়েছে শুনেই বোধহয় এরকমটা করছে৷ "
নিলুর আব্বু ভ্রু কুঁচকে বললেন,
" নিলু সত্যি কথা বলো! আমি তোমাকে বিশ্বাস করতে পারছি না।"
নিলুর আম্মু এগিয়ে এসে নিলুর পাশে দাঁড়ালেন৷ নিলুর কাঁধে হাত রেখে নরম স্বরে বললেন,
" তাজ যা বলছে তা কি সত্যি? তুই নির্ভয়ে বল! "
"আমি বললাম তো আম্মু। আমি তাজকে বন্ধুর বাইরে কিছুই ভাবিনি। এখন সে যদি আমাকে তার প্রিয়তমা ভেবে বসে এতে আমার তো কোনো দোষ নেই। আমি তাকে এরকম কোনো প্রতিশ্রুতি কোনোদিন দেইনি।"
মিনিটে মিনিটে তাজের হার্টবিট বাড়ছে। মুখের উপর মিথ্যা বলে তারপর সেটাকে ঠিক প্রমাণ করার অভিনব কৌশল জানা মেয়ে সে। অথচ তাজের চোখে মুখে এখনও রাজ্যের আশা। নিলু আব্বুর ভয় কাটিয়ে উঠতে পারলেই হয়তো বা সত্যিটা বলবে। তাজ দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে ছোট করে বলল,
" নিলু, ভয় পেয়ো না। আমি তোমার পাশে আছি। আমার উপর একটু বিশ্বাস রাখো।"
নিলু গর্জে উঠে বলল,
" একদম চুপ। তুমি আর একটা কথাও বলবে না। তোমাদের মতো ছেলেদের সাহস দিলে তোমরা মাথায় উঠে বসো। যেই শুনেছো আমার বিয়ে ঠিক হয়েছে ওমনি আমাকে ছোট করতে উঠেপড়ে লেগেছো। আমার বাবা-মা আত্মীয়স্বজনদের সামনে আমাকে খারাপ মেয়ে প্রমাণ করতে উঠেপড়ে লেগেছো। তোমাদের মতো ছেলেরা এর থেকে ভালো আর কি পারবে! কখন কোন পরিস্থিতিতে ঠিক কি বলতে হয় এই জ্ঞানটুকুও তোমার নেই। পারিবারিক শিক্ষা বলতে কিছুই নেই তোমার।"
তাজ এতক্ষণ ধৈর্য নিয়ে থাকলেও এখন আর নিজেকে সংযত রাখতে পারল না৷ পরিবার নিয়ে কথা বললে কারোরই মাথা ঠিক থাকে না। তাজ বসা থেকে উঠে নিলুর মুখোমুখি দাঁড়াল। অগ্নি দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল,
" আমাদের মতো ছেলেদেরকেই তোমাদের মতো মেয়েরা নাকে দঁড়ি দিয়ে ঘুরাও। প্রেমের নাম করে নিজের ইচ্ছে মতো চালাও। বিয়ের সময় আসলে পরিস্থিতির স্বীকার বলে নিজের স্বাধীনতায় পরিবারের পছন্দ মতো একজনকে বিয়ে করে দিব্যি সংসার করো। অথচ আমাদের মতো ছেলেরা তোমাদের মতো মেয়েদের মুখে হাসি ফুটানোর জন্য নিজের পড়াশোনা, ক্যারিয়ার সব বাদ দিয়ে তোমাদের সময় দেই। আর যখন ক্যারিয়ারে ফোকাস দেওয়ার সময় আসে তখন তোমরা বিয়ের জন্য চাপ দেওয়া শুরু করে দাও। আসলে তোমরা সবসময় নিজেকে লয়াল রাখতে চাও। বন্ধু, পরিবার, সম্পর্ক সবেতেই তোমরা লয়াল। পরিবারের সামনে নিজেকে লয়াল প্রমাণ করতে গিয়ে ৩ বছরের সম্পর্কে বেমালুম ভুলে যাওয়া তোমাদের মতো মেয়ের কাছে কিছুই না। জাস্ট কিচ্ছু না। আমাদের মতো ছেলেরা তোমাদের খারাপ প্রমাণ করার চেষ্টা করে না। তোমরা নিজেরা নিজেদের করা অপকর্মে ফেঁসে যাও। আর সেই কারণে তোমরা খারাপ প্রমাণ হও। আর রইল বাকি পারিবারিক শিক্ষা। তোমার থেকে আমার পারিবারিক শিক্ষা অনেক ভালো । অন্ততপক্ষে বাবা মায়ের মুখের উপর জোর গলায় মিথ্যা বলার সাহস আমরা আমাদের পরিবার থেকে পাই নি। এই শিক্ষা তোমাদের মতো মেয়েরা পেয়েছে। ভালো থেকো। আশা করি আমার মতো ছেলের মুখোমুখি তোমার আর হতে হবে না।"
তাজ কথাগুলো বলে শেষ করে এক নজর নিলুর আব্বুর দিকে তাকিয়ে দীর্ঘ কদম ফেলে ড্রয়িং রুম থেকে বেরিয়ে এলো। নিলু চাপা নিঃশ্বাস ছেড়ে তাজের গমন পথে চেয়ে রইল। নিলুর আব্বুও নিশ্চুপ৷ বাড়িতে উপস্থিত মেহমানরা নিজেদের মধ্যে ফিসফিস করতে লাগলেন।
#চলবে....