ফন্ট সাইজ:
থিম:
প্রণয়ঘোরের সন্ধিতে

২৫তম পর্ব

লেখক: সালমা চৌধুরী

#প্রণয়ঘোরের_সন্ধিতে (২২ এর বর্ধিতাংশ)

#লেখনীতে_সালমা_চৌধুরী

জীবনের গল্পগুলো অদৃশ্য বাঁধনে আবদ্ধ। যে যা চাই তা সহজে পাই না। হয়তো কিছু ইচ্ছেরা মনের গভীরে জায়গায় নিতে পারে না। কিছু আবার মনের গভীরে জায়গা নিতে পারলেও ভাগ্যে থাকে না।

কল্পনারা অদ্ভুত রকমের সুন্দর অথচ বাস্তবতা মস্ত কুমিরের আনাগোনা।কিছু পূর্ণতার প্রাপ্তি মেলার চেয়ে, অপূর্ণতাই শান্তি মেলে।

তাজের মেজাজ মাত্রাতিরিক্ত খারাপ। দুচোখে আগুনের ন্যায় উত্তাপ। নিলুদের বাসা থেকে বেড়িয়ে হাঁটতে শুরু করেছে৷ শরীর ঘেমে একাকার অবস্থা। নিজের উপর নিয়ন্ত্রণ হারাচ্ছে বারবার৷ হাঁটতে ইচ্ছে করছে না। ক্ষোভে নিজেকে আঘাত করতে ইচ্ছে করছে। নিলুর করা আচরণগুলো বার বার চোখের সামনে ভেসে উঠছে। অনেকটা রাস্তা পেরিয়ে একটা চায়ের দোকানের সামনে ব্রেঞ্চে বসল। মামাকে ডেকে কড়া লিকারের চা দিতে বলল।

তাজের গুরুগম্ভীর চেহারা আর অগ্নি ঝরা চোখ দেখে মামাও ঝটপট চা নিয়ে হাজির হলেন। চা হাতে দিয়ে মামা চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলেন। তাজ চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে মামার অভিমুখে চাইল। মামা এক গাল হেসে জিজ্ঞেস করলেন,

" মামা, চা কি ভালো হইছে?"

তাজ প্রতিত্তোরে বলল,

" জি।"

মামা পুনরায় প্রশ্ন করলেন,

" মামার কি মনডা বেশি খারাপ?"

তাজ মৃদু হাসার চেষ্টা করল। পরক্ষণেই জবাব দিল,

"না মামা। মন খারাপ না। চা খুব ভালো হয়েছে৷ ধন্যবাদ।"

মামা আর কথা বাড়ালেন না। তাজের হাসিমুখের দিকে তাকিয়ে নিজেও হাসলেন। যেতে যেতে বললেন,

" মামা, আর কিছু লাগলে কইয়েন।"

" আচ্ছা।"

তাজ দীর্ঘনিশ্বাস ফেলে চায়ের কাপে লম্বা চুমুক দিল। মস্তিষ্কের চলমান তোলপাড় থামাতে চায়ের বিকল্প কিছু চোখে পড়ছে না। যতবার নিলুর চেহারা চোখে ভাসছে ততবার রাগে শরীর ঝাঁকুনি দিচ্ছে। কোনোরকমে চা শেষ করে পাশে থাকা মেহগনি গাছটায় হেলান দিয়ে বসল। নৌমির বলা কথাগুলো বার বার কানে বাজছে।

" নিলু আপুকে রাজি না করিয়ে ফিরবে না কিন্তু! তুমি আজ কথা বলে আসলে আমরা আগামীকালই নিলু আপুকে ভাবি বানাতে যাব। চিন্তা করো না, মামাকে রাজি করানোর দায়িত্ব আমার। তুমি নিশ্চিন্তে থাকো।"

যে নিলুকে নিয়ে তাজের আকাশ সম ভাবনা লুকায়িত ছিল সেই নিলুই কি না এত বড় ধাক্কা দিল। তাজ নিজেকে নিজে প্রশ্ন করল,

" নিলু কেনো করল এমন? আমি ওর কি এমন ক্ষতি করেছিলাম?"

তাজকে যা ইচ্ছে বলতো তাতে কোনো আপসোস ছিল না। কিন্তু পরিবার কি দোষ করল! গতকালও যে মেয়েটা নিজের মুখে ভালোবাসার কথা বলছিল সে আজ অপরিচিতার মতো আচরণ করল। নিজেকে কি বলে সান্ত্বনা দিবে! নৌমিকেই বা কি বলবে! মেয়েটা যে বড্ড আশা নিয়ে বসে আছে। বন্ধুদের সামনেই বা কিভাবে দাঁড়াবে সে!

সেদিনও বন্ধু শামীম বলছিল,

" তুই যে নিলুর জন্য নিজের জীবনের সব শান্তি ত্যাগ করছিস সেই নিলুই কখনও তোর হবে না। কথাটা মিলিয়ে নিস।"

তাজ জিজ্ঞেস করেছিল,

" কেনো হবে না?"

শামীম বলেছিল,

" নিলু চোখে তোর প্রতি কোনো ভালোবাসাই দেখা যায় না। তুই নিলুর জেদ। ভালোবাসা না। মনে করে দেখিস, প্রথম থেকে নিলুর আচরণে জেদ প্রকাশ পেয়েছে। সে তোকে চাই মানে তোকে নিয়েই ছাড়বে। তুই প্রথম প্রথম পাত্তা দিতি না বলে পাত্তা পাওয়ার জন্য কত কি করত! যখন দেখল তুই পাত্তা দিতে শুরু করেছিস তখন শুরু হলো নতুন নাটক। তুই বন্ধুদের বেশি সময় দেস, তাকে সময় দেস না। যখন তাকে সময় দিতে শুরু করলি তখন আরও নতুন নাটক শুরু করল। নিজেই বলল, পড়াশোনা করতে, চাকরি নিতে। তারপর আবার বিয়ের জন্য প্রেশার দেয়। বিয়ের কথা বললে এড়িয়ে যায়। এমন কেনো করবে!

যে মেয়ে সত্যিকারের ভালোবাসবে সে কখনও তোর চাকরি, স্ট্যাটাস এর জন্য ভালোবাসাকে অপমান করবে না। তার বাবার আনা ১০ টা সম্বন্ধের সামনে সেজেগুজে বসতে পারছে অথচ নিজের ভালোবাসার কথা মুখ ফুটে বলতে পারছে না৷ এ কেমন মেয়ে রে বাবা!

বুঝবি বুঝবি। একদিন তুই ঠিকই বুঝবি৷ কিন্তু সেদিন আমাদের কাছেও নিজের কষ্টের কথা শেয়ার করতে পারবি না। এই আমি বলে রাখলাম। "

তাজ কথাগুলো শোনেও না শোনার ভান করেছিল। তাচ্ছিল্যের সুরে বলেছিল,

" আমার আর নিলুর বিয়েতে তোদের অবশ্যই দাওয়াত দিব৷ বাড়িঘর সাজানোর দায়িত্ব তোদের থাকবে। চিন্তা করিস না।"

অথচ আজ! কি থেকে কি হয়ে গেল। নিজের কানকে বিশ্বাস করতে কষ্ট হচ্ছে। চোখের সামনে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলোকে স্বপ্ন বলে মনে হচ্ছে।

হঠাৎ ফোন ভাইব্রেশন হতেই গভীর ভাবনায় ছেদ পরে। তাজ পকেট থেকে ফোন বের করল। নৌমি কল দিচ্ছে। রিসিভ না করেই পাশে রেখে দিল। তাজ এখন কথা বলার মতো পরিস্থিতিতে নেই । খুশির সংবাদ দেওয়ার মতো মুখটাই তো নেই। একবার ফোন বেজে শেষ হলো৷ মিনিট দুয়েক পর আবারও কল ভাইব্রেট হতে লাগল। ফোনের স্ক্রিনে তাকিয়ে দেখল আবারও নৌমির কল। ফোন হাতে নিয়ে বিরক্তিতে দুচোখ বন্ধ করে নিল। মিনিট পাঁচেক পর আবারও কল এলো। তাজ এবার আর চোখ মেলল না। কপালে বিরক্তির ভাঁজ টেনে দুচোখ বন্ধ রেখেই কল রিসিভ করে বলল,

" হ্যালো। "

" তাজ। "

কণ্ঠস্বর চিনতে তাজের এক সেকেন্ড সময় লাগল না। ঝড়ের বেগে চোখ মেলে চাইল ফোনের স্ক্রিনে৷ এবার নৌমি নয় নিলু কল করেছে। তাজ সঙ্গে সঙ্গে ফোন কাটতে নিল। ওপাশ থেকে নিলুর আর্তনাদ শুনা গেল,

" প্লিজ তাজ কল কেটো না, প্লিজ।"

তাজ চরম বিরক্তিতে দাঁতে দাঁত পিষে ধমক দিল,

"আজকের পর তোমার মুখে আমার নাম যেনো আর না শুনি।"

" আমি খুব ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম, সরি।"

" সরি! কিসের সরি? এত অপমানের পর সরি!"

" আমি সত্যি বুঝতে পারিনি। আব্বু..."

"থাক, তোমার আব্বুর অজুহাত আর দিও না। তোমার আব্বুর অজুহাত দিয়ে আর কত মিথ্যা বলবে। এতদিন বলেছিলে আমার আব্বু না আসলে তোমার আব্বুকে কিছু বলাই যাবে না। কোথায় গেল সে কথা! আজ তুমি আবার পরিবার নিয়ে যেভাবে অপমান করলে, আমার আব্বুর সামনে এই অপমানের এক ভাগও যদি করতে আমি সেখানেই সু*ইসাই*ড করতাম।

মুসকান তুই সত্যিই গ্রেট। বারবার কত সুন্দরভাবে বাঁচিয়ে দেস আমাকে।

প্রতিনিয়ত তোমার মুখে তোমার বিয়ে আর তোমার আব্বুর কথা শুনতে শুনতে মনে মনে স্থির করেছিলাম, আব্বুকে নিয়েই তোমাদের বাসায় আসবো। যা কথা হবে আব্বুর সামনেই হবে। ভাগ্যিস গতকাল মুসকানকে কথাটা বলেছিলাম। ও সাহস দিল বলেই আজ আমি একা আসলাম। তবুও ভালো আমার বাবা তো অপমানিত হলো না। "

"তাজ, তুমি কথাটা শুনো।"

তাজ কণ্ঠস্বর দ্বিগুণ ভারী করে চিৎকার দিল,

" এই মেয়ে, বলেছি না আমার নাম তোমার মুখে নিবে না। কথা কানে যাই না তোমার!"

নিলু কাঁদো কাঁদো গলায় বলল,

" সরি। "

"রাখ তোর সরি। তোর মতো মেয়েদের জন্য সমাজে ছেলেদের এই অবস্থা। তোরা ভালোবাসার নামে ছেলেদের মন নিয়ে ছিনিমিনি খেলিস৷ মন ভাঙার পর সরি বলে সেই মন জোড়া দেওয়ার চেষ্টা করিস। আমি সত্যি বোকা, না হয় তোর মতো মেয়ের জন্য এত কষ্ট করি! আজকের পর তুই আর কোনোদিন আমাকে কল দিবি না। তোর সাথে এটাই আমার শেষ কথা।"

নিলু কিছু বলতে গেল। কিন্তু তাজ মুখের উপর কল কেটে দিল।

★

সন্ধ্যার খানিক বাদে বাসায় ফিরল তাজ। চেহারায় বিষন্নতার ছায়া৷ নৌমি তাজদের বাসার ড্রয়িং রুমে বসে তাজের আব্বুর সাথে গল্প করছে। ইদানীং তাজের আব্বুর শরীর একটু বেশিই অসুস্থ। হাঁটাচলা কম করেন। বাইরে বেরই হোন না। তারজন্য নৌমি প্রতিদিন সন্ধ্যায় মামার পাশে বসে এলাকার সবার খোঁজ খবর জানিয়ে যায়। তাজের আব্বু তাজকে দেখে আস্তে করে ডাকলেন,

" তাজ।"

নৌমির ঘাড় ঘুরিয়ে তাজকে দেখার চেষ্টা করল। আজ সকাল থেকেই নৌমির মাথায় দুশ্চিন্তা ভর করেছে৷ তাজ আর নিলুর কথা মামার সামনে কিভাবে বলবে সে চিন্তায় ঘুরপাক খাচ্ছে। সেই বিকেল থেকে তাজদের বাসায় এসে বসে আছে। তাজের আব্বু ঘুম থেকে উঠার পর থেকেই নৌমির সাথে কথা বলছে। তাজ কয়েক মুহুর্ত দরজার কাছে দাঁড়িয়ে রইল। নৌমি চোখের ইশারায় জানতে চাইল,

" কি হয়েছে? "

কিন্তু তাজের রিয়াকশন বুঝা গেল না। কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে হঠাৎই দ্রুত পায়ে এগিয়ে এলো। আব্বুর সামনে এসে ধপ করে পায়ের কাছে বসে পড়ল। আব্বুর দু' পা জড়িয়ে ধরে ভারী কণ্ঠে বলল,

" আব্বু, আমি তোমার যোগ্য ছেলে হতে পারলাম না। আমাকে তুমি মাফ করে দিও।"

#চলবে....

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ২৫তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন