আমার গল্পের রাজা তুমি
পর্ব–১ : বইয়ের পাতায় অচেনা এক রাজ্য
“তিথি, তুই আবার বই নিয়ে বসেছিস?”
ঘরের দরজা থেকে মায়ের ডাকটা আসতেই বিছানায় উপুড় হয়ে শুয়ে থাকা মেয়েটা বই থেকে চোখ না তুলেই বলল,
“হুম।”
“হুম মানে কী? দুপুরের খাবার ঠান্ডা হয়ে গেছে!”
“আচ্ছা মা, পাঁচ মিনিট!”
“তোর ওই পাঁচ মিনিট কখনো পাঁচ মিনিট থাকে?”
তিথি এবার বইয়ের ওপর থেকে মুখটা তুলে দরজার দিকে তাকাল। মুখে এমন একটা নিরীহ হাসি, যেন পৃথিবীর সবচেয়ে নির্দোষ কাজটাই সে করছে।
“মা, তুমি জানো না? গল্পের এই জায়গায় এসে বই বন্ধ করা মহাপাপ!”
তার মা বিরক্ত হয়ে বললেন,
“তোর কাছে সবকিছুই মহাপাপ! খাওয়া বন্ধ করা পাপ না, ঘুমানো বন্ধ করা পাপ না, কিন্তু বই বন্ধ করা মহাপাপ!”
তিথি মুচকি হেসে আবার বইয়ের পাতায় চোখ রাখল।
“কারণ বই আমাকে কখনো বকাঝকা করে না।”
“বই তোকে বকবে কীভাবে? বই তো মানুষ না!”
তিথি একটু থেমে খুব গম্ভীর মুখে বলল,
“মানুষই তো সবচেয়ে বেশি বকাঝকা করে, মা।”
মা আর কিছু বললেন না।
শুধু দীর্ঘশ্বাস ফেলে চলে গেলেন।
তিথি আবার বইয়ের মধ্যে ডুবে গেল।
এই মেয়েটাকে বোঝা সত্যিই কঠিন।
বাইরের পৃথিবীতে যেখানে মানুষ নতুন নতুন জায়গায় ঘুরতে যায়, বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দেয়, নতুন মানুষের সঙ্গে পরিচিত হয়—তিথির পৃথিবীটা সেখানে কয়েকটা বইয়ের পাতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ।
তার কাছে একটা উপন্যাস মানে শুধু কাগজে ছাপা কিছু শব্দ নয়।
একটা উপন্যাস মানে একটা নতুন পৃথিবী।
সেখানে সে চাইলে রাজকন্যা হতে পারে, চাইলে কোনো অচেনা শহরের বাসিন্দা হতে পারে, আবার চাইলে এমন একজন মানুষকে ভালোবেসে ফেলতে পারে—যার অস্তিত্ব বাস্তব পৃথিবীতে নেই।
আর সেই কারণেই তিথির বাস্তব পৃথিবীটা দিন দিন তার কাছে আরও অচেনা হয়ে উঠছিল।
বন্ধুরা মাঝে মাঝে তাকে বলত,
“তুই এত বই পড়িস কীভাবে?”
তিথির উত্তর হতো,
“মানুষের সঙ্গে কথা বলার চেয়ে বইয়ের সঙ্গে থাকা অনেক শান্তির।”
তারপর সবাই হাসত।
কিন্তু তিথি সত্যিই সেটা বিশ্বাস করত।
সেদিন বিকেলেও তিথি তার প্রিয় জায়গায় যাওয়ার জন্য বের হলো।
শহরের পুরোনো একটা লাইব্রেরি।
লাইব্রেরিটা খুব বড় নয়। কিন্তু তিথির কাছে সেটাই যেন পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর জায়গা।
পুরোনো কাঠের দরজা।
দেয়ালজুড়ে সারি সারি বই।
পুরোনো পাতার গন্ধ।
আর এক ধরনের অদ্ভুত নীরবতা—যেটা তিথির খুব ভালো লাগে।
ভেতরে ঢুকেই সে পরিচিত লাইব্রেরিয়ান কাকুকে সালাম দিল।
“কাকু, আজ নতুন কিছু এসেছে?”
কাকু চশমার ওপর দিয়ে তাকিয়ে বললেন,
“তুমি নতুন বই ছাড়া আর কিছু চিনো?”
তিথি হেসে বলল,
“মানুষ চেনার চেয়ে বই চেনা সহজ।”
“আবার শুরু করেছ?”
“কী করব কাকু, মানুষ তো বইয়ের মতো না। বইয়ের শেষ পাতা আগে থেকে জানা যায়।”
কাকু হেসে মাথা নাড়লেন।
“তোমার জন্য একটা নতুন বই এসেছে। ওদিকের শেষ তাকটায় রাখা।”
“সত্যি?”
তিথির চোখ চকচক করে উঠল।
সে আর এক মুহূর্তও দেরি করল না।
দ্রুত পায়ে এগিয়ে গেল লাইব্রেরির শেষ প্রান্তের দিকে।
তাকগুলো এত উঁচু যে ওপরের সারির বইগুলো দেখতে মাথা উঁচু করতে হয়।
তিথি একটার পর একটা বইয়ের নাম পড়ছিল।
হঠাৎ তার চোখ থেমে গেল।
একটা কালো মলাট।
মলাটে কোনো ছবি নেই।
শুধু মাঝখানে সাদা অক্ষরে লেখা—
“আবরার খান রাহাত”
তিথি ভ্রু কুঁচকে বইটার দিকে তাকিয়ে রইল।
“এটা আবার কেমন নাম?”
সাধারণত উপন্যাসের নাম হয় সুন্দর, রহস্যময় কিংবা কাব্যিক।
কিন্তু একটা মানুষের পুরো নামই যদি উপন্যাসের নাম হয়?
কৌতূহলটা মুহূর্তেই বেড়ে গেল।
সে হাত বাড়িয়ে বইটা টেনে নিল।
বইটা হাতে নেওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই অদ্ভুত একটা অনুভূতি হলো তার।
কেন যেন বুকের ভেতরটা হঠাৎ কেমন করে উঠল।
যেন এই নামটা সে কোথাও শুনেছে।
অনেক আগে।
কোথাও।
কিন্তু কোথায়?
তিথি নিজের মাথায় হাত বুলিয়ে বলল,
“ধুর! এত ভাবার কী আছে?”
বইটা নিয়ে সে জানালার পাশের তার প্রিয় টেবিলে এসে বসল।
চেয়ার টেনে বসে মলাটটা আবার দেখল।
আবরার খান রাহাত।
তারপর ধীরে ধীরে প্রথম পাতা খুলল।
প্রথম পাতায় কোনো লেখকের নাম নেই।
শুধু একটা ছোট্ট লাইন—
“কিছু মানুষ গল্পের চরিত্র হয়ে আসে, অথচ একদিন তারা গল্পের বাইরেও সত্যি হয়ে ওঠে।”
তিথি কয়েক সেকেন্ড চুপ করে রইল।
তারপর ফিসফিস করে বলল,
“বাহ!”
পাতা উল্টাল।
গল্প শুরু হলো।
রাহাত।
আবরার খান রাহাত।
২৮ বছরের একজন মানুষ।
গম্ভীর।
রাগী।
নিজের অনুভূতি কাউকে বুঝতে দেয় না।
একদিকে কলেজের প্রফেসর, অন্যদিকে বাবার বিশাল ব্যবসার দায়িত্ব তার কাঁধে।
তিথি পড়তে পড়তে ধীরে ধীরে চরিত্রটার মধ্যে ডুবে গেল।
“এই লোকটা এত রাগী কেন?”
কিছুক্ষণ পর নিজেই আবার বলল,
“তবে দেখতে নিশ্চয়ই ভালো।”
আরেকটু পড়ে চোখ বড় বড় করে বলল,
“উফ! এত গম্ভীর মানুষ বাস্তবে থাকলে তো আমি দুই মিনিটেই পালিয়ে যেতাম!”
কিন্তু যতই পড়ছিল, ততই রাহাতকে তার ভালো লাগছিল।
কারণ রাহাতের কঠিন স্বভাবের নিচে একটা নরম মানুষ লুকিয়ে ছিল।
তার পরিবার ছিল প্রাণবন্ত।
তার মা ভীষণ স্নেহশীল।
তার বাবা কঠোর হলেও পরিবারের প্রতি ভীষণ যত্নশীল।
আর তার ছোট ভাই?
তিথি সেই চরিত্রটার কথায় এসে এত জোরে হেসে ফেলল যে পাশের টেবিলের একজন বৃদ্ধ বিরক্ত হয়ে তাকালেন।
তিথি মুখ চেপে হাসি থামানোর চেষ্টা করল।
“এই ছেলেটা তো একদম পাগল!”
তারপর আবার পড়তে শুরু করল।
সময় কখন পেরিয়ে যাচ্ছে, সে খেয়ালই করল না।
বাইরে সন্ধ্যা নেমে এসেছে।
লাইব্রেরির আলো একে একে জ্বলে উঠেছে।
কিন্তু তিথির চোখ তখনও বইয়ের পাতায়।
তার চারপাশের পৃথিবী যেন ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে।
বাসা।
মা।
খাওয়া।
ফোন।
সবকিছু।
শুধু বই।
আর সেই বইয়ের ভেতরের মানুষগুলো।
তিথি একটা সময় বইয়ের পাতায় হাত রেখে ফিসফিস করে বলল,
“রাহাত…”
তার ঠোঁটে অজান্তেই হাসি ফুটে উঠল।
“তোমার জীবনটা যদি সত্যি হতো, তাহলে কেমন হতো?”
কথাটা বলেই নিজেই হেসে ফেলল।
“পাগল আমি! বইয়ের চরিত্রের সঙ্গে আবার কথা বলছি!”
কিন্তু সে জানত না—
কয়েক মুহূর্ত পর তার এই কথাটাই অন্য এক বাস্তবতার দরজা খুলে দিতে চলেছে।
তিথি আবার পড়তে শুরু করল।
এক পাতা।
দুই পাতা।
আরও এক পাতা।
চোখ দুটো ভারী হয়ে আসছে।
তবুও বইটা বন্ধ করার কোনো ইচ্ছা নেই।
শেষবারের মতো সে পাতার ওপর চোখ রাখল।
তারপর ধীরে ধীরে মাথাটা টেবিলের ওপর নেমে এল।
বইটা তখনও তার দুহাতের মাঝে খোলা।
চোখ বন্ধ হওয়ার ঠিক আগে তিথি অস্পষ্ট স্বরে বলল,
“রাহাত… তোমাকে একবার সামনে থেকে দেখতে ইচ্ছে করছে…”
তারপর—
সবকিছু নিস্তব্ধ হয়ে গেল।
কিন্তু তিথি জানত না,
সে শুধু ঘুমিয়ে পড়েনি।
সে এমন এক গল্পের দরজা খুলে ফেলেছে, যেখান থেকে ফিরে আসা এত সহজ হবে না।
আর ঠিক সেই মুহূর্তে—
খোলা বইয়ের পাতাগুলো বাতাস ছাড়াই ধীরে ধীরে উল্টে যেতে শুরু করল।
একটা পাতা।
তারপর আরেকটা।
তারপর থেমে গেল এমন একটি পাতায়—
যেখানে বড় বড় অক্ষরে লেখা ছিল,
“তিথি।”