ফন্ট সাইজ:
থিম:
আমার গল্পের রাজা তুমি

২য় পর্ব

লেখক: Tesha Money

✍️ tesha mony

আমার গল্পের রাজা তুমি

পর্ব–২ : যে পাতায় লেখা ছিল তিথির নাম

লাইব্রেরির ঘড়িতে তখন রাত প্রায় আটটা।

চারপাশে নিস্তব্ধতা।

বাইরে হালকা বৃষ্টি শুরু হয়েছে। জানালার কাঁচে টুপটাপ শব্দ হচ্ছে। মাঝে মাঝে বাতাস এসে জানালার পর্দাটা সামান্য দুলিয়ে দিচ্ছে।

কিন্তু তিথির সেদিকে কোনো খেয়াল নেই।

সে তখন গভীর ঘুমে।

মাথাটা টেবিলের ওপর রাখা, আর দুহাতের মাঝখানে খোলা সেই বই।

“আবরার খান রাহাত।”

কিছুক্ষণ আগেও যে বইটা শুধু একটা উপন্যাস ছিল, এখন সেটার পাতাগুলো যেন অদ্ভুতভাবে জীবন্ত হয়ে উঠেছে।

খোলা পাতায় লেখা—

“তিথি।”

তারপর হঠাৎ পাতাটা নিজে থেকেই উল্টে গেল।

আরেকটা পাতা।

সেখানে লেখা—

“যে মেয়েটা গল্পের বাইরে কোনো পৃথিবী খুঁজে পায়নি, একদিন গল্পই তাকে নিজের পৃথিবী বানিয়ে নেবে।”


“এই যে!”

দূর থেকে একটা পুরুষ কণ্ঠ ভেসে এলো।

তিথি ঘুমের মধ্যেই একটু নড়েচড়ে উঠল।

“এই মেয়ে!”

কণ্ঠটা এবার আরও কাছে।

তিথি চোখ খুলল না।

“আপনি শুনতে পাচ্ছেন?”

এবার তিথি কপাল কুঁচকে ফেলল।

“উফফ… কে আবার ডাকছে?”

সে চোখ মেলল।

কিন্তু চোখ খুলতেই যেন পৃথিবীটা বদলে গেল।

লাইব্রেরি নেই।

টেবিল নেই।

বইয়ের তাক নেই।

এমনকি বাইরে বৃষ্টির শব্দটাও নেই।

তিথি ধড়মড় করে উঠে বসল।

“এটা কোথায়?”

তার সামনে দাঁড়িয়ে একজন যুবক।

পরনে গাঢ় রঙের শার্ট, মুখে বিরক্তির ছাপ। চোখ দুটো অদ্ভুত রকমের গম্ভীর।

তিথি কয়েক সেকেন্ড তার দিকে তাকিয়ে রইল।

তারপর হঠাৎ চোখ বড় বড় হয়ে গেল।

এই মুখটা—

এই চোখ—

এই গম্ভীর অভিব্যক্তি—

তিথি যেন কোথাও দেখেছে!

কিন্তু কোথায়?

হঠাৎ তার মাথায় একটা নাম ঝলকে উঠল।

রাহাত।

তিথির বুকের ভেতর ধক করে উঠল।

“আপনি…”

যুবকটা ভ্রু কুঁচকে বলল,

“আমি?”

তিথি কথা হারিয়ে ফেলল।

এটা কি সম্ভব?

না।

অসম্ভব।

সে তো একটা বই পড়তে পড়তে ঘুমিয়ে পড়েছিল!

আর এখন তার সামনে দাঁড়িয়ে আছে—

আবরার খান রাহাত!

তিথি নিজের গালে একটা চিমটি কাটল।

“আহ!”

যুবকটা অবাক হয়ে তাকাল।

“কী করছেন?”

তিথি গম্ভীর মুখে বলল,

“স্বপ্ন দেখছি কিনা চেক করছি।”

“কী?”

“কিছু না।”

রাহাত কয়েক সেকেন্ড তার দিকে তাকিয়ে রইল।

তারপর বিরক্ত হয়ে বলল,

“আপনি এখানে কী করছেন?”

তিথি চারপাশে তাকাল।

“আমি?”

“হ্যাঁ, আপনি।”

“আমি তো…”

সে থেমে গেল।

কী বলবে?

‘আমি আপনার বই পড়তে পড়তে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম, তারপর আপনার বইয়ের ভেতরে চলে এসেছি’?

এটা বললে লোকটা তাকে পাগল ভাববে।

তিথি মাথা চুলকে বলল,

“আমি আসলে… একটু পথ হারিয়ে ফেলেছি।”

রাহাতের ভ্রু আরও কুঁচকে গেল।

“পথ হারিয়ে আপনার আমার বাড়ির ঘরে চলে এসেছেন?”

তিথি চারপাশে তাকাল।

ঘরটা বিশাল।

সুন্দরভাবে সাজানো।

বড় একটা বুকশেলফ।

জানালার পাশে টেবিল।

দেয়ালে কিছু পুরোনো ছবি।

তিথির চোখ হঠাৎ একটা ছবিতে আটকে গেল।

ছবিতে রাহাত, তার বাবা-মা এবং একটা তরুণ ছেলে।

তিথি বইয়ে পড়েছিল—

এটাই রাহাতের পরিবার!

তার মুখে অজান্তেই হাসি ফুটে উঠল।

রাহাত সেটা লক্ষ্য করল।

“হাসছেন কেন?”

“আপনার পরিবারটা খুব সুন্দর।”

রাহাত থমকে গেল।

“আপনি আমার পরিবারকে চেনেন?”

তিথি বুঝতে পারল ভুল হয়ে গেছে।

“না মানে… দেখতে সুন্দর বললাম।”

রাহাত কিছু বলল না।

তারপর দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,

“আপনি এখন এখানেই থাকুন। বাইরে গেলে আমার বাবা-মা আপনাকে দেখে ফেলতে পারেন।”

তিথি অবাক।

“কেন?”

“কারণ আমি জানি না আপনি কে।”

“তাহলে আমাকে লুকিয়ে রাখছেন কেন?”

“কারণ আপনি আমার ঘরে কীভাবে এলেন, সেটাই আমি বুঝতে পারছি না।”

তিথি ঠোঁট বাঁকিয়ে বলল,

“আমিও বুঝতে পারছি না।”

রাহাত কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে থেকে বলল,

“চুপচাপ এখানে বসে থাকুন।”

“কতক্ষণ?”

“যতক্ষণ না আমি বুঝতে পারছি কী করা যায়।”

“আর যদি আমার ক্ষুধা লাগে?”

“খাবার এনে দেব।”

“পানি?”

“পানি আছে।”

“বাথরুম?”

রাহাত চোখ বন্ধ করে গভীর শ্বাস নিল।

“ওখানে।”

তিথি মুচকি হাসল।

“আপনি সবসময় এত রাগী থাকেন?”

রাহাত চোখ খুলে তাকাল।

“আপনি সবসময় এত কথা বলেন?”

তিথি এক সেকেন্ডও না ভেবে বলল,

“হ্যাঁ।”

রাহাত মাথা নাড়ল।

“বুঝেছি।”

সে দরজার দিকে এগিয়ে গেল।

তিথি পেছন থেকে বলল,

“শুনুন!”

রাহাত থামল।

“কী?”

তিথি একটু ইতস্তত করে বলল,

“আপনার নাম সত্যিই আবরার খান রাহাত?”

রাহাত এবার পুরোপুরি ঘুরে দাঁড়াল।

“হ্যাঁ। কেন?”

তিথির মুখে অদ্ভুত একটা হাসি ফুটে উঠল।

“এমনিই।”

রাহাত চলে গেল।

দরজা বন্ধ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তিথি বিছানায় বসে পড়ল।

তার বুকের ভেতর তখনও ধুকপুক করছে।

সে নিজের হাতের দিকে তাকাল।

তারপর ঘরের দিকে।

সবকিছু এত বাস্তব!

বিছানার চাদর।

জানালার পর্দা।

টেবিলের ওপর রাখা ঘড়ি।

সবকিছু।

তিথি ধীরে ধীরে ফিসফিস করে বলল,

“আমি কি সত্যিই…?”

তারপর নিজের মুখে হাত চাপা দিল।

“না না! এটা সম্ভব না।”

কিন্তু তার চোখে তখন আনন্দের ঝিলিক।

কারণ একটা কথাই তার মাথায় ঘুরছে—

সে রাহাতকে সামনে থেকে দেখেছে।

যে রাহাতকে সে মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগে একটা বইয়ের পাতায় চিনেছিল।


কিছুক্ষণ পর তিথির আর ঘরে বসে থাকতে ভালো লাগল না।

সে দরজা খুলে উঁকি দিল।

কেউ নেই।

“একটু বাইরে গেলেই বা কী হবে?”

নিজেকেই প্রশ্ন করে সে বেরিয়ে পড়ল।

করিডোর দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে নিচে নেমে এলো।

নিচে এসে সে একটা বড় ড্রয়িংরুম দেখতে পেল।

সোফায় বসে একজন ভদ্রলোক খবরের কাগজ পড়ছেন।

পাশে একজন মহিলা বসে চা খাচ্ছেন।

তিথির পা থেমে গেল।

এরা—

রাহাতের বাবা-মা!

তিথির মুখ শুকিয়ে গেল।

“ও মা!”

ঠিক তখনই মহিলা তাকিয়ে তাকে দেখে হাসলেন।

“কে মা তুমি?”

তিথি কিছু বলার আগেই পেছন থেকে রাহাতের কণ্ঠ শোনা গেল—

“মা!”

রাহাত দ্রুত নিচে নেমে এলো।

তার চোখে স্পষ্ট আতঙ্ক।

তিথি চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে।

রাহাত এক মুহূর্তের জন্য চোখ বন্ধ করল।

তারপর মায়ের দিকে তাকিয়ে বলল,

“ও… আমার নতুন PA।”

তিথি অবাক হয়ে রাহাতের দিকে তাকাল।

PA?

রাহাত যেন চোখের ইশারায় তাকে চুপ থাকতে বলল।

তার মা উঠে এসে তিথির হাত ধরলেন।

“তাই নাকি! এসো মা, বসো।”

তিথি কিছু বলার আগেই রাহাতের বাবা বললেন,

“নতুন PA? আগে তো বলোনি।”

রাহাত গম্ভীর মুখে বলল,

“আজই এসেছে।”

“তাহলে এখানে?”

রাহাত এক মুহূর্ত থেমে উত্তর দিল,

“কাজের কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আছে। তাই কিছুদিন বাড়িতে থেকেই কাজ করবে।”

তিথি মনে মনে বলল,

“বাহ! লোকটা মিথ্যাও বেশ সুন্দর বলতে পারে!”

রাহাতের মা তিথির দিকে তাকিয়ে মিষ্টি হেসে বললেন,

“তোমার নাম কী মা?”

তিথি উত্তর দেওয়ার আগেই রাহাত বলল,

“তিথি।”

তিথি অবাক হয়ে তার দিকে তাকাল।

সে কীভাবে জানল তার নাম?

রাহাতও যেন নিজের কথায় নিজেই থমকে গেল।

কারণ সত্যিটা হলো—

তিথির নাম সে জানত না।

তবুও কেন যেন নামটা তার মুখ থেকে নিজে থেকেই বেরিয়ে এসেছিল।

কয়েক সেকেন্ডের জন্য ঘরটা অদ্ভুত নীরব হয়ে গেল।

তিথি ধীরে ধীরে রাহাতের দিকে তাকাল।

রাহাতও তাকিয়ে আছে তার দিকে।

কেউ জানে না—

এই নামটা রাহাতের মুখে এল কোথা থেকে।

আর ঠিক তখনই—

রাহাতের ছোট ভাই সিঁড়ি দিয়ে নামতে নামতে চিৎকার করে উঠল,

“ভাইয়া! তোমার নতুন PA যদি এত সুন্দর হয়, তাহলে আমার পুরোনো PA-টাকে কেন—”

সে মাঝপথে থেমে গেল।

তিথির দিকে তাকাল।

তারপর রাহাতের দিকে।

তারপর আবার তিথির দিকে তাকিয়ে গম্ভীর মুখে বলল,

“ভাইয়া…”

রাহাত বিরক্ত হয়ে বলল,

“কী?”

ছেলেটা ঠোঁট বাঁকিয়ে বলল,

“তুমি ব্যবসা সামলাও, কলেজে পড়াও—এখন দেখি বাড়িতে নতুন মানুষও আনাও!”

তিথি মুখ চেপে হাসতে লাগল।

আর রাহাতের মুখটা মুহূর্তেই শক্ত হয়ে গেল।

“চুপ কর।”

ছোট ভাই হাসল।

“চুপ করলে তো আমার প্রতিভার অপমান হবে!”

তারপর তিথির দিকে তাকিয়ে বলল,

“স্বাগতম, নতুন আপু। তবে সাবধান…”

তিথি কৌতূহলী হয়ে জিজ্ঞেস করল,

“কিসের?”

ছেলেটা নাটকীয় ভঙ্গিতে বলল,

“এই বাড়ির সবচেয়ে ভয়ংকর প্রাণী হলো আমার ভাই।”

তিথি রাহাতের দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসল।

“ওনাকে দেখে তো তেমনই মনে হচ্ছে।”

রাহাত ধীরে ধীরে তিথির দিকে তাকাল।

চোখে রাগ।

তিথি হাসি থামিয়ে ফেলল।

কিন্তু কয়েক সেকেন্ড পর—

রাহাতের ঠোঁটের কোণে খুব সামান্য একটা হাসি ফুটে উঠল।

তিথি সেটা দেখে অবাক হয়ে গেল।

কারণ বইয়ে লেখা ছিল—

আবরার খান রাহাত খুব কম হাসে।

আর সেই হাসিটা—

তিথির জন্যই কি প্রথমবার?

সে জানত না।

কিন্তু একটা বিষয় তখনও অজানা রয়ে গেল—

তিথি কেন এই জগতে এসেছে?

আর সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—

রাহাত না জেনেও তার নাম কীভাবে জানল?

চলবে...............

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ২য় পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন