#আপনি_যে_আমার_ই
#writer_Drm_Shohag
#পর্ব_০৯
(অনুমতি ব্যতীত কপি করা নিষিদ্ধ।)
মনিরা দৌড়ে ঘরে গিয়ে দ্রুত দরজা আটকে দিল। মেঝেতে বসে হাঁপানি রোগীর মতো হাঁপাতে লাগলো। ছোটবেলায় পাগলকে ভয় পেত। খেতে না চাইলে আম্মু বলতো পাগল ধরে দেব, তখন ভয় পেয়ে গপাগপ খেয়ে নিত। বড় হওয়ার সাথে সাথে সেই ভয় কেটে গেছে। পাগলরা ও তো মানুষ। বড় হয়ে এই প্রথম মনিরা পাগলের দৌঁড়ানি খেয়ে এতো ভয় পেল। সেই ছোটবেলায় যা ভয় পেত তার চেয়ে কয়েকগুণ ভয় আবার ফিরে এসেছে।
কিছুক্ষণ আগে পানি খাওয়ার যে তৃষ্ণা ছিল এখন তা বেড়ে কয়েকশ গুণ হয়ে গেছে। কিন্তুু আর উপায় নেই। পানি না খেয়ে মরে গেলেও মনিরা আর এ ঘর থেকে বাইরে পা রাখবে না।
কিছুক্ষণ পর ধীরে ধীরে দাদি-আপুর পাশে গিয়ে শুয়ে পড়ল। চোখে ঘুম নেই। ভাবল ভাগ্যিস দাদি-আপুর ঘুম গাঢ়, নয়তো কী হতো!
এতোক্ষণ ভাবনায় ডুবে থাকলেও হঠাৎ খেয়াল করল তার গায়ে ওড়না নেই। আঁতকে উঠল। হায় আল্লাহ ওড়না গেল কই? বিছানা থেকে উঠে ফোনের ফ্লাস দিয়ে পুরো ঘর খুঁজল। কোথাও নেই। তাহলে তো বাইরে পরে গিয়েছে, কিন্তুু সে কিছুতেই বাইরে যেতে পারবে না। বাইরে গেলে তার নিশ্চিত হার্ট অ্যাটাক হবে। কিন্তুু না গেলেও তো সকালে যদি কেউ দেখে ফেলে। গায়ের ওড়না বাইরে কী করে গেল তাই নিয়ে যদি প্রশ্ন করে। ভেবে ভেবে মাথা ব্যাথা শুরু হলো। সব ভাবনা রেখে ঘুমানোর জন্য চোখ বুজল। যা হবে সকালে দেখা যাবে।
এই ভেবে কিছুক্ষণের মাঝে ঘুমিয়েও গেল।
★
ইমন বার বার এপাশ-ওপাশ করছে। এই করতে করতে জোরে এক লাথি দিল ঘুমের মাঝেই। বেচারা অয়নের গায়েই লেগেছে লাথিটা। ঘুমের মাঝে ধপাস করে মেঝেতে পরেছে। কোমড়ে ব্যাথা পেয়ে উঠে বসল। কোমরে হাত বুলিয়ে বলল,
“এই বেয়াদব আমায় লাথি মারলি কেন হ্যাঁ? ইশ রে কোমড় টা বোধয় ভেঙেই গেল।”
ইমনের কোনো হেলদোল নেই। সে গভীর ঘুমে। ভালো করে খেয়াল করতেই দেখল ইমনের হাতে মেয়েদের কাপড়ের মতো কী যেন। অয়ন ধীরে ধীরে বিছানার উপর উঠল। ওড়নাটা ইমনের থেকে টেনে সরাতে চাইলে পারল না। কী শক্ত করে ধরে আছে। যেন তার প্রাণ কেড়ে নিয়ে যাচ্ছে।
ইশ কোমড়ের মধ্যে আবার কেমন করে উঠল। তাকে ফুটবল বানিয়ে সাধের ঘুম কেড়ে নিয়ে নাক ডেকে ঘুমানো হচ্ছে, ছুটাচ্ছি তোর ঘুম দাঁড়া।
অতঃপর ইমনকে জোরে ধাক্কা দিলে ইমনসহ ইমনের উপর অয়নও পরে যায়। এবার অয়ন ব্যাথা না পেলেও ইমন অনেক ব্যাথা পেয়েছে। ব্যথায় চোখ-মুখ কুঁচকে চোখ খুলে তার উপর অয়নকে দেখে চোখ বড় বড় করে চাইল। অতঃপর রেগে বলল,
“তুই আমার উপর কী করছিস?”
অয়ন ইমনের উপর থেকে উঠে বলল,
“আমাকে বিছানা থেকে ফেলে ঘুম ভাঙিয়েছিস। তাই শোধ করে দিলাম।”
ইমন অয়নের কথা শুনে ভাবল অয়ন মিথ্যে বলছে না। তার এ অভ্যাস আছে। বিছানায় কেউ না থাকলে নিজে পরে যাওয়ার অভ্যেসও আছে। কিন্তুু নাটকীয় ভঙ্গিতে বলল,
“এ আমি বিশ্বাস করি না। ওগো এ আমার কী হলো গো! আমার বন্ধু আমার নামে ভুলভাল অ্যালিগেশন দিচ্ছে গো!”
অয়ন বিরক্ত হয়ে বলল,
“তোর ওগো টা আবার কোথা থেকে আসল?”
“আসেনি আসবে। তোর ভাবতে হবে না। আমাকে ফেলেছিস ফেল। কিন্তুু তোর মতো হাতির দাদা আমার উপর উঠেছিস কেন হ্যাঁ?”
“আমি কোন দুঃখে তোর উপর উঠতে যাব? তোকে ফেলতে গিয়ে নিজেও পরেছি। তুই মানেই ঝামেলা।”
বলতে বলতে ইমনের পাশে ওড়নার দিকে চোখ পড়ল। অতঃপর বলল,
“তোর কাছে ওই কাপড় কীসের?”
হাতে নিয়ে ভালো করে দেখে বলল,
“এটা তো মেয়েদের ওড়না মনে হচ্ছে। কার গায়ের ওড়না টেনে এনেছিস? ছিঃ ছিঃ তোর চরিত্র আর ভালো হলো না। কার ওড়না এটা বলছিস না কেন?”
ইমন সিরিয়াস হয়ে বলল,
“কাহিনী ঘটে গেছে বন্ধু। বলছি, হাত বাড়া। আগে উঠি।”
অয়ন হাত ধরে টেনে তুলল ইমনকে। অতঃপর বলল,
“এবার বলে কী কাহিনী ঘটিয়েছিস? আর এই ওড়না কার?”
ইমন পাশে তাকিয়ে ওড়না দেখে সিরিয়াস হয়ে বলল,
“তোর নানির”
অয়ন ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেল। এই বেয়াদব জীবনে সোজা হবে না। ভাবল সত্যি কাহিনী বলবে, না। এর না প্যাঁচালে পেটের ভাত হজম হবে না।
অতঃপর ইমনের দিকে তাকিয়ে রেগে বলল,
“আমার নানি কে আমি-ই দেখলাম না। তোকে এসে ওড়না খুলে দিয়ে গেল?”
“হ্যাঁ গেল। স্বপ্নে এসে দিয়ে গেল। জোর করে ওড়নাটা দিল। তোর বউ কে দিতে বলেছে। নাতিবউ কে না-কি দিতে হয়। তাই দিল। নে ধর।”
অয়ন ওড়না নিয়ে ইমনের মুখে ছুঁড়ে মারল। ইমন ক্যাচ ধরে ফেলল। অতঃপর হেসে বলল,
“আরে রেগে যাচ্ছিস কেন?
তোর নানি আমাকে বলে গেল তোর বউ এর বিয়ের সময় মাথার উপর যেন এই ওড়না দিয়ে দিই।
আর বলে গেল তোর চিকিৎসা করাতে।
তোর হরমোনজনিত সমস্যা আছে। একটু আগেই তো প্রমাণ পেলাম।”
অয়ন বিরক্ত হয়ে বলল,
“এই তোর কী এতো বাজে বকে ক্লান্ত লাগে না?”
“এতো কথা বলে লাভ নাই। তোকে আজ ডক্টর দেখিয়েই ছাড়ব আমি। কাল থেকে কী ঘেঁষাঘেঁষি শুরু করেছিস।”
অয়ন ইমনের পিঠে দুটো থাপ্পড় দিয়ে বলল,
“তোর কিন্তুু খবর করব ইমন।”
“কোন নিউসে আমাকে নিয়ে খবর করবি রে? আর আমি ঠিকঠাক ভাইরাল হতে পারবো তো! আহা! কতদিনের স্বপ্ন। লাব ইউ ভাই। না বলতেই আমার স্বপ্ন পূরণ করতে চাচ্ছিস। আজকাল এমন বন্ধু ক'জন পায় বল!”
অয়ন দাঁতে দাঁত চেপে বলল,
“বাঁচালের বাচ্চা। তোকে আমি ছাড়ব না।”
“এই আবার আমায় ধরতে চাচ্ছিস। নাহ আর তো পারা যাচ্ছে না। সোহাগকে বিষয়টা জানাতেই হবে। তোকে আজই ডক্টর দেখিয়ে আনব চিন্তা করিস না আমার সোনা ভাই।”
অয়ন নিজের মাথার চুল টেনে ধরে বলল,
“মাফ চাই বাবা। জীবনে তোর পিছে লাগবো না।”
“ওকে বৎস! তুমি মাফ পেয়ে গেছো।”
“শালা তুই জীবনে মানুষ হবি না।”
★★
সোহাগ ঘুম থেকে উঠে পাশে মৌ কে ঘুমাতে দেখল। ফজর নামাজ পড়ে দু'জনেই ঘুমিয়েছিল। ফ্রেশ হয়ে ল্যাপটপ নিয়ে বসল। অফিসের কাজ জমা হয়ে গেছে বিয়ের অনিষ্ঠানে।
মৌ বেশ কিছুক্ষণ পর ঘুম থেকে উঠল। সোহাগ তা দেখে মৃদু হেসে বলল,
“এতোক্ষণে মহারানীর ঘুম ভাঙলো!”
মৌ মাথা নিচু করে মৃদু হাসল। হাই তুলে বলল,
“মহারাজা তো তার মহারানী কে জাগায় নি। উঠেই কাজ নিয়ে ব্যস্ত হয়ে গেছে।”
সোহাগ মন খারাপ করে বলল,
“কী করব বলো? আব্বু হুট করেই চলে গেল! আমার কোনো ভাই-বোন ও নেই। এজন্য চাপ বেশি থাকে।”
সোহাগ কে মন খারাপ হতে দেখে মৌ বলল,
“আচ্ছা এসব বাদ দিন। আমি আপনাকে কফি এনে দিচ্ছি। আপনি কাজ করুন।”
এই বলে মৌ হাত-মুখে পানি দিয়ে রান্নাঘরের দিকে গেল।
একটু পর মৌ তার এক হাতে এক কাপ কফি আর আরেক হাতে এক কাপ চা নিয়ে সোহাগের পাশে বসল। সোহাগ মৃদু হেসে কফির মগে চুমুক দিয়ে ল্যাপটপে মৌ কে তাদের ফ্যামিলি ফটো দেখাচ্ছিল। হুট করেই মৌ এর মুখের দিকে তাকালে সোহাগের হাসি মিলিয়ে যায়।
দূর থেকে মৌ এর কপালে ওই টিপ ভালোভাবে বোঝা না গেলেও কাছ থেকে স্পষ্ট বোঝা যায়। মৌ এর দিকে রেগে তাকিয়ে আছে সোহাগ। ল্যাপটপ থেকে চোখ সরিয়ে সোহাগের দিকে তাকাতেই মৌ দেখল সোহাগ তার দিকে কেমন রেগে তাকিয়ে আছে। তা দেখে মৌ ভ্রু কোঁচকালো। ভাবল একটু আগেই তো হাসল। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে কী এমন হলো?
কালকে রাতে আম্মুকে বলেছিল যাতে মৌ কে বুঝিয়ে বলে এই টিপ এর ব্যাপারে। আম্মু কী বলেনি? নিজে একবার বলতে গিয়েও থেমে গেল। অনেকবার বলেছে। আর ভালোভাবে সে বলতে পারবে না।
মৌ এর মুখের দিকে তাকিয়েই ঠাস করে ল্যাপটপ রেখে উঠে দাঁড়ালো। হঠাৎ এমন করায় মৌ ভয় পেয়ে গেল। কিছু বলার আগেই সোহাগ গটগট পায়ে বেরিয়ে গেল। মৌ সোহাগের পিছু যেতে গিয়ে থেমে গেল। বাড়িতে এখনো মানুষ আছে। রান্নাঘরের দিকে ছেলে যায় না, তাই নিজেকে ভালোভাবে ঢেকে গিয়েছিল। এই ভেবে আর গেল না। চা হাতে দাঁড়িয়ে ভাবতে লাগলো রাগার মতো তো সে কিছুই করেনি। তাহলে উনি লাগলো কেন?
★
সোহাগ সরাসরি নাফিসা বেগমের ঘরে গিয়ে বলল,
“আম্মু তুমি মৌ কে টিপ এর ব্যাপারে বলো নি?”
নাফিসা বেগম বসে কাঁথা সেলাই করছিলেন। হাতের কাজ। ভালো লাগা থেকে করা। সময়ের কাটানোর জন্য এই সেলাই করেন। তাই নিজেদের জন্য বানিয়ে রাখেন। সোহাগের কথা শুনে হেসে বলল,
“বলেছি তো আব্বু। কেনো বলো তো?”
সোহাগ আর কিছু শোনার প্রয়োজন মনে করল না। কিছু বলল ও না। নাফিসা বেগমের কথায় রাগ যেন তরতর করে বাড়ল। মায়ের কথার উত্তর দেয়ার প্রয়োজন মনে করল না। কোনো দিকে না তাকিয়ে গটগট পায়ে নিজের ঘরের দিকে চলে গেল।
নাফিসা বেগমের হাসি মুখে চিন্তা এসে ভিড় করল। সোহাগকে স্বাভাবিক লাগলো না। এভাবে তো কখনো যায় না। ছেলেকে কেমন যেনো রাগান্বিত লাগলো।
কালকে রাতে মৌ এসে তাকে বলেছিল খাবে না। সন্ধ্যার আগে খাওয়ায় পেট ভরা আছে। তিনিই জোর করে সন্ধ্যায় খাইয়েছিলেন। সোহাগ কখন না কখন আসতো। মেয়েটা এতোক্ষণ না খেয়ে থাকতো। তাই নিজে পাশে বসে সন্ধ্যায় খাইয়েছিল।
এজন্য রাতে আর জোর করেন নি। তখনই এই মৌ এর সাথে কথা বলেছিল।
ভাবল মৌ সোহাগকে কে বুঝিয়ে বলে দেবে। এই ভেবে সেলাইয়ে মনোযোগ দিল।
★
মৌ গরম চা হাতে দাঁড়িয়েই ভাবছিল, তার স্বামী হঠাৎ রেগে গেল কেন। বিছানায় বসতে গিয়েও সোহাগকে কে দেখে আর বসল না। মৃদু হেসে বলল,
“কোথায় গিয়েছিলেন? হঠাৎ রেগে গেলেন যে!”
মৌ এর হাসি সোহাগের সহ্য হচ্ছে না। আব্বু মারা যাওয়ার পর থেকে তার মা বেশিরভাগ সময় মন খারাপ করে থাকে। বিয়ে উপলক্ষ্যে তার মা কত দিন পর যে মন খুলে হেসেছে। তার মা কে কষ্ট দিতে চায় না বলে মায়ের পছন্দেই বিয়ে করেছে। এই মেয়ে যখন সেই মায়ের কথার অবাধ্য হবে, তখন কার মাথা ঠিক থাকবে? সোহাগের মাথা ঠিক নেই।
মৌ আবারো একটু এগিয়ে এসে একহাতে কাপ আরেকহাত দিয়ে সোহাগকে ধরতে গেলে সোহাগ তার শক্তপোক্ত হাতে মৌ এর ডান গালে একটা চড় মারল।
মৌ মোটেও এটার জন্য প্রস্তুত ছিল না। ছিটকে মেঝেতে পরে গেল।
যার ফলে মৌ এর হাতের গরম চা এর কাপ তার পায়ের উপর পরে যায়। চা অনেক গরম না হলেও, ভালোই গরম ছিল। গরম চা, কাচের কাপ দুটো একসাথে পায়ের উপর পরায় মৌ মৃদু আর্তনাদ করে উঠল। সোহাগের সেদিকে কোনো হুশ নেই।
সোহাগ রেগে মৌ এর দুই বাহু ধরে টেনে উঠালো। অতঃপর রেগে চিৎকার করে বলল,
“এই তোর কী কোনো কথা কানে যায় না? কতবার বলেছি এই টিপ সরাতে, মা বলেছে। কারো কথা শোনার প্রয়োজন মনে করিস নি? দু'দিন হলো বিয়ে হয়েছে। এখনি এতো অবাধ্যতা!
আমার কথা শুনলি না ভালো কথা। আমার মায়ের কথারও কোনো মূল্য নেই তোর কাছে?”
এই অবাধ্যতা সোহাগ মেনে নিতে পারে না। সে পর্যন্ত সীমাবদ্ধ থাকলে মেনে নিতো। কিন্তুু মায়ের কথা না শোনায় মাথা নষ্ট হয়ে গেছে। তার মা কে ভালো রাখতে সোহাগ কি-না করে! আর এই দু'দিনের মেয়ে এসে তার মাকে কষ্ট দিবে, আর সে বসে বসে দেখবে। এমন মানুষ সোহাগ নয়।
মৌ অবাক হয়ে সোহাগের দিকে তাকিয়ে আছে। বিয়ের দু'দিনের মাথা এ কেমন ব্যবহার দেখছে স্বামীর! সরাসরি তুই- এ নেমে গেছে, সাথে থাপ্পড়। মাথা ভনভন করছে। চোখ ঝাপসা হয়ে এসেছে, সোহাগকে কেমন ঝাপসা দেখাচ্ছে। করুণ চোখে সোহাগের দিকে তাকালো মৌ।
সোহাগ এর কোনো দিকে খেয়াল নেই। মৌ কে ঝাকিয়ে বলতে লাগলো,
“কথা বলছিস না কেন? বেয়াদবের মতো মুখে কুলুপ এঁটে রেখেছিস কেন বল? তোর সাহস কী করে হয় আমার কথা না শোনার? বেয়াদব মেয়ে একটা।”
মৌ কে ছেড়ে মাথার চুল খামছে বলল,
“আমি আম্মুকে আগেই বলেছিলাম আরো কয়েকটা মেয়ে দেখি। এই বেয়াদব, অবাধ্য মেয়ের মধ্যে আম্মু কী দেখেছিল আল্লাহ জানে!”
মৌ যেন সোহাগের এই কথা শুনে অনুভূতিশূন্য হয়ে গেল। তাকে তার স্বামী বিয়ে করতে চায় নি? শ্বাশুড়ি আম্মু জোর করে বিয়ে দিয়েছে তার সাথে? তাকে কী সোহাগের একটুও পছন্দ হয়নি?
চোখ থেকে টুপটাপ পানি গড়ালো। বিয়ের দু'দিনের মাথায় আল্লাহ তার কপালে এসব রেখেছিল?
সোহাগ আবার মৌ এর কাছে গিয়ে মৌ এর কপাল ঘষে দিয়ে বলল,
“কী দিয়ে লাগিয়েছিস এটা ওঠে না কেন? ট্যাটুর মতো করে লাগিয়েছিস না-কি!
এটা আমি উঠিয়েই ছাড়ব।”
অতঃপর মৌ কে ছেড়ে সারা ঘরে ব্লেড খুঁজতে লাগলো।
মৌ নির্জীব। তার পায়ের উপর গরম চা, ভারি কাপ পরেছে। পা যেন অবশ হয়ে আছে। কিন্তুু সে ব্যাথা কেন যেন অনুভব করতে পারছে না।
তার চেয়েও বেশি ক্ষত সৃষ্টি হয়েছে তার স্বামীর এই রূপ দেখে। বুক ফেটে কান্না এলো। ইচ্ছে করলো গায়ের সব শক্তি দিয়ে চিৎকার করে কাঁদতে।
সোহাগ পাগলের মতো টেবিলের ড্রয়ারে, ওয়ারড্রব এর উপর সবখানে দেখল, অতঃপর সোফার টেবিলের উপর পেয়ে তা নিয়ে দৌড়ে মৌ এর কপালে লাগাতে গেল।
মৌ সোহাগের হাতে ব্লেড দেখে আঁতকে উঠল। চোখ বড় বড় করে পেছাতে গেলে সোহাগ তার কাছে টেনে এনে বলল,
“আমার কথা আগেই শুনে নিলে এমন দিন দেখতে হতো না,
এই বলে কপালে ব্লেড এগোতে নিলে সোহাগের এর মা এসে সোহাগকে কে ধরল।
চিৎকার চেঁচামেচি শুনে নাফিসা বেগম সোহাগের ঘরের দিকে এসেছিল। সোহাগকে কে এমন পাগলের মতো করতে দেখে আঁতকে উঠল। দৌড়ে এসে সোহাগের এর হাত থেকে ব্লেড ফেলে ডান গালে জোরেসোরে একটা থাপ্পড় দিল।
মৌ চোখ বড় বড় করে মুখ চেপে কাঁদতে লাগলো।তার জন্য এই সুন্দর পরিবারে এতো ঝামেলা হচ্ছে, সে মেনে নিতে পারছে না।
নাফিসা বেগম রেগে বলল,
“এই তুই কী পাগল? এমন করছিস কেন ওর সাথে?”
সোহাগ বিচলিত হয়ে বলল,
“আম্মু তুমি আমাকে কেন মারলে? ও কত অবাধ্য দেখেছো? আমার তোমার কারো কথা শোনার প্রয়োজন বোধ করেনি। নিজের মর্জি মতো চলছে।
আমি তোমাকে বিয়ের আগেই বলেছিলাম আরও কয়েকটা মেয়ে দেখি।”
নাফিসা বেগম একবার মৌ এর দিকে তাকালো। সদ্য বিয়ে করা স্বামীর মুখে এসব শুনে মেয়েটা কেঁদে বুক ভাসাচ্ছে, আর এ ছেলের সেদিকে কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই।
সোহাগ নাফিসা বেগম কে চুপ থাকতে দেখে বলল,
“আম্মু কিছু বলছো না কেন! ও অনেক বেয়াদব আম্মু। আমি কিছু বললে একটা উত্তর দেয় না।”
নাফিসা বেগম রেগে সোহাগের গালে আরেকটা থাপ্পড় দিল। সোহাগ মাথা নিচু করে বলল,
“আম্মু অপরাধ ও করেছে। আর তুমি আমায় মারছো?”
নাফিসা বেগম রেগে বলল,
“মুখের উপর উত্তর না দেয়া বেয়াদবি নয় বুঝেছিস? এটাকে ভদ্রতা বলে।
আর তুই যেটাকে টিপ টিপ বলে মুখে ফেনা উঠিয়েছিস সেটা আসলে টিপ নয়। কালো তিল। ও তিল কীভাবে উঠাবে?
টিপ উঠাতে ব্লেড লাগে? তোর কী মাথায় বুদ্ধি নেই?”
নাফিসা বেগমের কথা শুনে সোহাগ বিস্ময় নিয়ে তাকালো তার মায়ের দিকে, অতঃপর মৌ এর দিকে। কত বড় ভুল বুঝেছে তা বুঝল! কী বলবে বুঝল না। নিজেকে অসহায় লাগলো। নিজের রাগের উপরই রাগ হলো। তার এতো রাগ আসে কই থেকে। মাথার চুল টেনে নিজেকে শান্ত করার চেষ্টা করল।
মৌ এর শরীর খুব দুর্বল লাগছে। সকালে চা তো খেতেই পারেনি। তার উপর শক্ত হাতে চড়, এতো কান্না সবমিলিয়ে ভীষণ শরীর দুর্বল লাগছে। পায়ে হয়তো ফোসকা পরেছে। জ্বলছে ভীষণ। পরে যেতে নিলে বিছানা ধরে বসে পরল। নাফিসা বেগম মৌ এর দিকে খেয়াল করতেই দৌড়ে এসে ধরল।
সোহাগ এগোতে গিয়ে থেমে গেলো। কোন মুখে মৌ কে স্পর্শ করব?
নাফিসা বেগম উদ্বিগ্ন কণ্ঠে বলল,
“ঠিক আছো আম্মু? আমায় ক্ষমা করে দিও। আমার ছেলেকে আমি সঠিক শিক্ষা দিতে পারিনি।”
মৌ কথা বলতে পারল না ঠিকই। কিন্তুু আড়চোখে সোহাগের দিকে তাকিয়ে ঠোঁট টেনে হাসল।
সোহাগ মৌ এর দিকেই তাকিয়ে ছিল। মৌ এর হাসি দেখে সোহাগের কেমন যেন লাগলো। বুকে কেমন চিনচিন ব্যাথা উঠল। শুনেছে বউ এর হাসি স্বামীর শান্তির কারণ। শুনেছে সাথে এ দু'দিন অনুভব করেছে। কিন্তুু এই হাসিতে কী ছিল! যা তার বুকে ব্যাথার উৎপত্তি ঘটালো।
এর মধ্যে মনিরা আর আকীলা বেগম এসে সোহাগের ঘরের সামনে দাড়ালো। অনেকক্ষণ থেকে চিৎকার চেঁচামেচি শুনছিল। স্বামী-স্ত্রীর মাঝে আসতে চায় নি। নাফিসা বেগমের গলা পেয়ে দ্রুত সোহাগের ঘরের সামনে এসেছিল। মৌ কে এভাবে দেখে মনিরা, আর তার দাদি-আপু দ্রুত ঘরের ভেতর গেল।
আকীলা বেগম চিন্তিত কণ্ঠে বলল,
“কী হইছে আম্মা তোর? এই অবস্থা কেমনে হইলো তোর?”
নাফিসা বেগম কী বলবেন বুঝলেন না। মৌ নিজেকে সামলে ভাঙা গলায় বলল,
”কিছু হয়নি দাদি-আপু। হঠাৎ করেই শরীর খারাপ হয়ে গেছে।”
সোহাগ মৌ এর এমন গলা শুনে অনুতপ্ত হলো। চোখ ভিজল। টমলম চোখে একবার মৌ এর দিকে তাকালো। কোন মুখে কথা বলবে।
বেশ কিছুক্ষণ মৌ এর দিকে তাকিয়ে থাকলো। একবারো আর তাকালো না মৌ। অতঃপর সোহাগ উল্টো ঘুরে ঘরের দরজার দিকে গেল। শার্ট এর হাতা দিয়ে চোখ মুছে ঘরের বাইরে বেরিয়ে গেল।
চলবে ইনশাআল্লাহ............