#আপনি_যে_আমার_ই
#writer_Drm_Shohag
#পর্ব_১০
(অনুমতি ব্যতীত কপি করা নিষিদ্ধ)
চোখের পানি যতবার মুছে ফেলছে ততবার চোখ ভিজে যাচ্ছে। কী যে হয়েছে এই চোখের। বিরক্ত লাগছে। কিছু ভালো লাগছে না। অয়ন আর ইমন সকালে বাইরে হাটতে বেরিয়েছিল। সোহাগকে এমন বিধ্বস্ত অবস্থায় বাইরে যেতে দেখে দু'জনেই দ্রুত সোহাগের কাছে আসল। অতঃপর ইমন বলল,
“কী হয়েছে ভাই তোর?”
সোহাগ কোনো উত্তর না দিয়ে বাইরে যেতে নিলে অয়ন সোহাগের হাত টেনে ধরল।
সোহাগ বিরক্ত হয়ে বলল,
“ছাড় আমায়। একা থাকতে দে।”
অয়ন আর ইমন একে অপরের মুখ চাওয়াচাওয়ি করল। অতঃপর দু'জন জোর করে সোহাগকে টেনে তাদের ঘরে নিয়ে গেল।
ইমন বলল,
“কী হয়েছে তোর বল?”
সোহাগ বেশ কিছুক্ষণ পর বলল,
“আমার বউ কে মেরেছি।”
অয়ন আর ইমন বিস্ময় নিয়ে সোহাগের দিকে তাকালো। অয়ন অবাক হয়ে বলল,
“ভাই তোর বিয়ের দুইটা দিনও পূরণ হয়নি। তাতেই বউ পেটালি?”
সোহাগ মুখে হাত গুঁজে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল। ইমন আর অয়ন এবার আরো বিস্ময় নিয়ে একে অপরের দিকে তাকিয়ে সোহাগের দিকে তাকালো। সোহাগের বাবা মারা যাওয়ার পর শেষবার সোহাগ কে এতো কাঁদতে দেখেছে। সেদিন সোহাগ, অয়ন আর ইমনকে একসাথে জাপটে ধরে চিৎকার করে কেঁদেছিল। বাচ্চাদের মতো কেঁদে কেঁদে বলেছিল,
“আমার আব্বুকে তোরা এনে দে ভাই। আমার আব্বুকে ছাড়া আমার আম্মু আর আমি থাকতে পারি না। আমার আব্বুকে তোরা এনে দে।”
আজ প্রায় দুই বছর পর সোহাগকে তারা এমন বাচ্চাদের মতো কাঁদতে দেখল। ইমন সোহাগের মাথায় হাত বুলিয়ে বলল,
“ভাই শোন, বউ এর সাথে ঝগড়া সবারই হয়।”
সোহাগ চোখ মুছে ভাঙা গলায় বলল,
“আমি তো বউ এর সাথে ঝগড়া করিনি। বউ পিটিয়েছি।”
সোহাগের কথা শুনে ইমন অয়নকে ঘুতা দিয়ে বলল,
“এই বেদ্দব টার কথা শুনে বলছিস। আরে বউ কে দু'একটা চড় থাপ্পড় মারা কে বউ পেটানো বলে না, বউ সোহাগা বলে।”
সোহাগ ভ্রু কুঁচকে বলল,
“তুই এতো জানিস কীভাবে?”
ইমন ভাব নিয়ে বলল,
“সব জানতে হয় বাছা। আচ্ছা বউ কে এমন সোহাগ দিলি কেন?”
“ভেবেছি আমার অবাধ্য হচ্ছে।”
অয়ন ভ্রু কুঁচকে বলল,
“ভেবেছিস? মানে অবাধ্যতা করেনি?”
সোহাগ কান্না আটকে বলল,
“না।”
অয়ন কিছু বলতে গেলে ইমন অয়নের মুখ চেপে সোহাগকে বলল,
“আমি তো বললামই যে এটাকে স্বামী সোহাগা বলে। দেখবি একটু পরই সব ঠিক হয়ে গেছে।”
সোহাগ ইমনের দিকে তাকিয়ে কপাল কুঁচকে বলল,
“তুই ওর মুখ চেপে ধরেছিস কেন?”
ইমন অয়নের মুখ থেকে হাত ছেড়ে দিয়ে বলল,
“কারণ ও বেফাঁস কথা বলে। আর আমি ইমন খান ফাঁস কথা বলি।”
সোহাগ অয়ন দু'জনেই বিরক্ত হয়ে ইমনের দিকে তাকিয়ে আছে। সোহাগ মুখ ফিরিয়ে আবার হাত দিয়ে ঢেকে নিল। ইমন সোহাগের মন খারাপ দেখে বলল,
“জানিস সোহাগ আমাদের অয়নের অনেক বড় সমস্যা হয়ে গেছে। সোহাগ পাত্তা দিল না ইমনের কথা। তা দেখে আবার ইমন কিছু বলতে গেলে অয়ন ইমনের মুখ চেপে বলল,
“আর একবার বাজে কথা বললে একটা থাপ্পড়ও মাটিতে পরবে না। বেয়াদব।”
সোহাগ বিরক্ত হয়ে বলল,
“তোদের সমস্যা টা কি বলবি? আমাকে সান্ত্বনা না দিয়ে দু'জন দু'জনের মুখ চাপাচাপি করছিস?
অয়ন রেগে বলল,
“বউ পেটানো মানুষকে আমি সান্ত্বনা দিই না।”
অয়নের কথা শুনে সোহাগের খারাপ লাগলো। অয়ন ভুল তো কিছু বলেনি।
ইমন অয়নের দিকে রেগে তাকালো। অয়ন পাত্তা দিল না। অতঃপর ইমন সোহাগের দিকে তাকিয়ে বলল,
“আরে এতো সিরিয়াস হচ্ছিস কেন? ঠিক হয়ে যাবে। তা বউ কে মারলি কেন?”
সোহাগ আনমনে বলতে লাগলো,
“ওর কপা..... বলতে গিয়ে থেমে গেল। হুশ ফিরল। তার বউ এর কপালে তিল, এটা সে তার বন্ধুদের বলতে চায় না। সে মোহর দিয়ে বিয়ে করেছে তার বউ কে। অন্য ছেলে তার বউ কে নিয়ে কল্পনা করবে ব্যাপারটা সোহাগের আত্মসম্মানে লাগে। অতঃপর বলল,
“কিছু না।”
ইমন আর জোর করল না।
সোহাগ দাঁড়িয়ে বাইরে যেতে গিয়েও আবার ফিরে এসে বলল,
”১০ টার মধ্যে রেডি হয়ে থাকবি। আশরাফ রহমানের ওখানে যেতে হবে।”
ইমন বলল,
“তুইও যাবি? তোকে যেতে হবে না। আমি আর অয়ন যাবো। তুই আজ বাড়ি থেকে তোর বউ এর সাথে সব মিটমাট করে নে।”
সোহাগ দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
“ব্যাক্তিজীবনের সাথে কর্মজীবন মিলাতে চাই না। আমার একার মন খারাপ এর জন্য একটু পিছিয়ে গেলে কত মানুষের হাহাকার বাড়বে জানিস?”
ইমন আর কিছু বলল না। সোহাগ বেরিয়ে গেলে ইমন অয়নের কাছে গিয়ে বলল,
“এই তোর প্রবলেম টা কী হ্যাঁ? এমনি ওর মন খারাপ ছিল। তার উপর ত্যাড়া কথা বলছিলি কেন?”
অয়ন রেগে বলল,
“তুই বউ পেটানোকে সমর্থন করছিস?”
ইমন বোঝানোর স্বরে বলল,
“ও কী এতো খারাপ যে পাষাণ দের মতো বউ পেটাবে? হয়তো বড় কোনো ঝামেলা হয়েছে। জানিস তো সোহাগের রাগ বেশি। তাছাড়া ও মানুষ হিসেবে কত ভালো জানিস না?”
এ পর্যায়ে অয়ন একটু শান্ত হলো। ভাবলো আসলেই সোহাগের রাগ বেশি। হুট করে রেগে গিয়ে কী করে, কী বলে বোঝে না। একটু পর সেই আবার সব ঠিক করতে উঠে পরে লেগে যায়।
ইমন কান্নার ভান করে বলল,
“তোদের দু'জনের হয়েছে যত রাগ। মাঝখানে আমি এক এতিম।”
অয়ন রেগে বলল,
“খবরদার তোর ড্রামা শুরু করবি না।”
ইমন হেসে বলল,
“অবশ্যই জাঁহাপনা। আপনার কথা ফেলতে পারি?”
★★
আজকে কাজের মেয়ে রেহানা কাজে আসেনি। তাই নাফিসা বেগমেই রান্না করতে হলো। রেহানা যদিও রাঁধে না। কাটাকুটি করে দেয়। নাফিসা বেগম কে সব রেডি করে দেয়, তিনি রাঁধে। আজ সব একা হাতেই করতে হলো। রুটি-সবজি বানিয়েছে সবার জন্য। ভাবলো সোহাগ আর তার বন্ধুদের খেতে দিয়ে মৌ এর জন্য খাবার নিয়ে যাবে। অতঃপর ইমনদের ঘরে গেল তাদের খেতে ডাকতে।
“সোহাগ কোথায় আব্বুরা?”
ইমন ভ্রু কুঁচকে বলল,
“ও তো বেশ কিছুক্ষণ আগে ঘর থেকে বের হয়ে গেল। কেন আন্টি?”
নাফিসা বেগম কোথাও পাননি সোহাগ কে। বাইরে গেছে ভেবে দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। অতঃপর বললেন,
“তোমরা খেতে আসো আব্বু।”
এই বলে চলে গেলেন।
রান্নাঘরে গিয়ে মৌ এর জন্য রুটি-সবজি নিলেন। কালকে রাতেও খায়নি। মেয়েটা বেশি দুর্বল হয়েছে। অতঃপর খাবার নিয়ে যেতে গিয়ে সোহাগকে সামনে দাঁড়ানো দেখল। অতঃপর বলল,
“কোথায় গিয়েছিলে?”
মেহরাব ভারাক্রান্ত হয়ে উত্তর দিল,
“এইতো বাইরে।”
“আচ্ছা টেবিল গিয়ে বোস। আমি মৌ কে খাবার দিয়ে এসে তোমাকে খেতে দিচ্ছি।”
এই বলে চলে গেলেন।
সোহাগের খারাপ লাগলো। তার আম্মু তাকে আব্বু ছাড়া ডাকে না। কিন্তুু এখন ডাকলো না। রেগে আছে তার উপর। থাকাটাই তো স্বাভাবিক। সেই তো অন্যায় করেছে। অসহায় লাগলো তার। কী করে মৌ এর সামনে গিয়ে দাড়াবে। সে যে বলেছে তাকে সোহাগ বিয়েই করতে চায়নি। ভেবে চোখের কোণে পানি জমলো।
মাথা নিচু করেই টেবিলের দিকে এগিয়ে গিয়ে বসতে নিলে চেয়ারের পা এর সাথে পা বারি খায়। ব্যাথার চেয়ে বিরক্ত হলো বেশি। তার ভুল এর জন্য যেন এই চেয়ার টেবিল ও তার উপর রেগে আছে। অতঃপর পা দু'বার ঝাকিয়ে চেয়ারে চপচাপ বসল।
এরই মধ্যে নাফিসা বেগম মৌ কে খাবার দিয়ে সোহাগকে কে বসে থাকতে দেখে খাবার দিল। সোহাগ অন্যমনস্ক হয়ে ছিল। তার পাশে এসে তার আম্মু বসল। তবুও সোহাগ তার মাকে টের পায়নি।
নাফিসা বেগম গলা ঝেড়ে গম্ভীর গলায় বললেন,
“খেয়ে নাও।”
সোহাগ মায়ের কথা শুনে পাশে তাকিয়ে বলল,
“আম্মু আমি খাবো না। তোমার সাথে একটু কথা বলবো।”
“কী বলবে বলো?”
“আম্মু মৌ এর সাথে সব ঠিক করে দিবা? আমি না বুঝে ওকে অনেক কথা শুনিয়েছি। রাগের মাথায় মেরেছি।”
নাফিসা বেগম ছেলের দিকে বিস্ময়ান্বিত হয়ে তাকিয়ে বললেন,
“তুমি মৌ কে মেরেছ?”
সোহাগ মায়ের কথা শুনে মাথা নিচু করে নিল।
নাফিসা বেগম এসে দেখেছিলেন সোহাগ মৌ কে ধরে ব্লেড দিয়ে কীসব করছিল। আগে যে সোহাগ মৌ কে মেরেছে তা তিনি দেখেননি। ছেলের কাণ্ডে অবাক না হয়ে পারলেন না।
ততক্ষণে সোহাগের চোখ ছাপিয়ে পানি গড়িয়ে পরল কয়েক ফোঁটা। নাফিসা বেগম ছেলের উপর আগের চেয়েও বেশি চটলেন। ভেবেছিলেন শুধু কটু কথা বলেছে। সবে একদিন হলো বিয়ে হয়েছে। নিজের ছেলের কাছে এইটুকু আশা করেছিলেন যে তার সদ্য নতুন বিয়ে হওয়া বউ এর সাথে এমন করবে না। এমন ঝামেলা করবে সেটাই ভাবেনি। কিন্তুু মেরেছে শুনে নাফিসা বেগম বেশ রেগে গেলেন ছেলের উপর।
ভাবলেন সোহাগের তখনকার কথা।
‘আম্মু আমি আগেই বলেছিলাম আরো কয়েকটা মেয়ে দেখি।’
সোহাগের কী মৌ কে একটুও পছন্দ নয়? শুধুমাত্র তার জন্য বিয়ে করতে রাজি হয়েছিল? এমন হলে তো এই সংসার টিকবে না। ভীত কণ্ঠে সোহাগের দিকে তাকিয়ে বললেন,
“তোমার কী মৌ কে একটুও পছন্দ নয়? তুমি কী মৌ কে সহ্য করতে পারো না? আমায় খুশি করতে বিয়ে করেছ? আমি তো আমার সিদ্ধান্ত তোমার উপর চাপিয়ে দিইনি।”
সোহাগ মায়ের এসব কথায় কী বলবে বুঝতে পারছে না। নাফিসা বেগমের কথা শুনে সোহাগের চোখ পানিতে টইটুম্বুর হয়ে গেল। ভাঙা কণ্ঠে বলল,
“এমন নয় আম্মু।”
নাফিসা বেগম রাগান্বিত কণ্ঠে বললেন,
“তাহলে কেমন তুমিই বলো? বিয়ের একদিন পরে তার বউ এর গায়ে কোন স্বামী হাত তোলে বলো? একমাত্র অপছন্দের মেয়ের সাথেই এমন ব্যবহার করতে পারে। তাহলে তোমার এমন ব্যবহার আমি কী ধরে নিব বলো?”
আরও কিছু বলতে গিয়ে থেমে গেল। সোহাগের চোখ থেকে টুপটাপ পানি পরতেই আছে। মাথা নিচু করে আছে। এ পর্যায়ে নাফিসা বেগম কিছুটা নরম হলেন।
সোহাগ কিছুক্ষণ পর নিজেকে স্বাভাবিক করার চেষ্টা করে ভাঙা গলায় বলল,
“আম্মু তুমি তো জানো রেগে গেলে আমার মাথা ঠিক থাকেনা। কী বলি কি করি নিজেই জানিনা। এসব বলো না আম্মু। এমন নয়। আমায় ক্ষমা করে দাও। মৌ এর সাথে সব ঠিক করে দাও।”
নাফিসা বেগম আর কিছু বললেন না। সোহাগ আকুতি স্বরে বলল,
“আম্মু কিছু বলছো না কেন? মৌ কে বোঝাবে না?”
নাফিসা বেগম ছেলের কথা শুনে দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।অতঃপর বললেন,
“সব মেনে নেওয়া যায়। কিন্তুু তুমি ওকে পছন্দ করনি, আমার কথায় বিয়ে করেছ এটা কেন ওকে বোঝালে? ওর মনের অবস্থাটা একবার ভাবো তো।”
সোহাগ তার মায়ের দুইহাত তার হাতে আগলে বলল,
“আম্মু আমি সত্যি বুঝতে পারিনি। তুমি সব ঠিক করে দাও না আম্মু!”
নাফিসা বেগম ভেতরে ভতরে মমের মতো গলে গেলেও উপরে বেশ কঠোর থাকলেন। এই ভেবে স্বস্তি পেলেন যে ছেলে মৌ কে পছন্দ করেন। শুধু পছন্দ নয়, ভালোবাসতেও শুরু করেছেন।
অতঃপর গম্ভীর গলায় বললেন,
“আচ্ছা বলবো।”
নাফিসা বেগমের কথা শুনে সোহাগ চোখ মুছে উঠতে নিলে নাফিসা বেগম বললেন,
“তোমাকে খাইয়ে আমি খাবো।”
সোহাগ উঠতে গিয়ও আবার বসে পরল। তার আম্মু ইনডিরেকলি তাকে বলছে সে না খেলে তার আম্মুও খাবে না।
নাফিসা বেগম সোহাগ কে নিজ হাতে খাইয়ে দিতে লাগলেন।
★
মনিরা মৌ এর ঘর থেকে বেরিয়ে তাদ দাদি-আপুর কাছে যাচ্ছিল। তার আপু বলেছে দুলাভাই ও ঘরে যেতে পারে তাই তাকে পাঠিয়ে দিয়েছে।
এখানে মা ছেলেকে খাইয়ে দিচ্ছে দেখে মনে মনে রেগে গেল। তার আপু তাকে না বললেও সে বুঝেছে। আপুর গালে হাতের ছাপ দেখেছে। উজ্জ্বল শ্যামা হওয়ায় বোঝা গেছে। দুলাভাইয়ের সাথে কিছু হয়েছে তা বুঝেছে। বিয়ের একদিন পরই এমন ঝামেলা হয় তা মনিরার জানা ছিল না। ঝামেলা হয়েছে সেটা মানলো। কিন্তুু বিয়ের একদিন পরই কোন বর তার সদ্য বিয়ে করা বউ কে থাপ্পড় দেয়?
সোহাগকে মনিরা তার অপছন্দের তালিকায় এক নাম্বারে রেখেছে।
এখন নাফিসা বেগম কে এক নাম্বারে দিতে ইচ্ছে করছে। তিনি তার আপুকে রেখে এসে নিজের ছেলেকে খাওয়াচ্ছে, যদিও তার ছেলে কত অপরাধ করেছে তবুও। তার আপু ভুল করলেও বেয়াদবি করবে না। মার খাওয়ার মতো কাজ তার আপু করে না। বরং সে করে। সেই আপুকে তার স্বামী বিয়ের একদিন পরই মারল। আবার তার মা সেই ছেলেকেই কত সোহাগ করে খাওয়াচ্ছে। ব্যাপারটা মনিরার কাছে খুবই বিরক্তিকর লাগলো।
ভাবনা রেখে সোহাগদের থেকে চোখ সরিয়ে সামনের দিকে তাকিয়ে এগোতে নিলে চোখ বড় বড় করে দাঁড়িয়ে যায়।
ইমন স্বাভাবিকভাবে হেঁটে আসছিল। সামনে তাকিয়ে একটা মেয়েকে তার দিকে চোখ বড় বড় করে তাকাতে দেখে ভ্রু কোঁচকালো। ভালো করে মুখের আদল পরোখ করল। মনিরা চোখে পরার মতো সুন্দর। ইমন এক দেখাতেই বেশ ভালোই চোখে পরল তার। গোল গাল মেয়েটাকে দেখতে বেশ লাগলো।
অতঃপর মনিরার দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসল।
কিন্তুু বুঝল না তার দিকে এই মেয়ে এভাবে তাকিয়ে আছে কেন! চেনে না-কি তাকে?
মনিরা ইমনকে তার দিকে তাকিয়ে হাসতে দেখে দ্রুত মাথা নিচু করে নিল। ভয়ে হাত-পা জমে যাচ্ছে। এই বাড়ির কিছু তো চেনেও না। কোনদিকে যাবে। এই ছেলে তো তার দিকেই আসছে। মৌ এর চক্করে তো কাল রাতের কথা ভুলেই গিয়েছিল। যেভাবে তার দিকে তাকিয়ে হাসল মনে হচ্ছে বসলেই পাগল। কিছু বলার আগেই চকলেট দিয়ে পাগলটাকে মানিয়ে নিতে হবে।
ভাবনার মাঝেই মেঝের দিকে তাকিয়ে খেয়াল করল একজোড়া জোড়া পা তার খুব কাছাকাছি। ভাবাভাবি বাদ দিয়ে দ্রুত উল্টো ঘুরল। সামনে আপুর ঘর দেখে ওদিকে যাওয়ার জন্য দৌড়াতে গেল। এক পা বাড়িয়ে দ্বিতীয় পা বাড়ানোর আগেই ইমন তার সামনে দাঁড়িয়ে বলল,
“এই মিষ্টি মেয়ে আমায় দেখে পালাচ্ছ কেন?”
মনিরা ভয়ে ভয়ে একবার চোখ তুলে চাইল ইমনের দিকে। ইমন তার দিকেই তীক্ষ্ণ চোখে তাকিয়ে ছিল। চোখে চোখ পরায় মনিরা দ্রুত চোখ নামিয়ে নিল। ছেলেটা তাকে কী অদ্ভুত নামে ডাকল। ব্যাপারটা মনিরার কাছে ভালো লাগলো না।
ইমন ভ্রু উঁচিয়ে বলল,
“কী হলো বলছো না কেন মিষ্টি মেয়ে?”
মনিরা চুপ।
ইমন ভাবতে লাগলো এ বাড়িতে তো কোনো মেয়ে মানুষ থাকার কথা না। সোহাগের মামাতো খালাতো সব বোনেরা তাকে দেখলে তার সাথে কথা বলতে দৌড়ে আসে। সবার সাথেই ইমনের ভালো সম্পর্ক। সবাইকে চেনে ইমন। কিন্তুু মনিরাকে আগে কখনো দেখেছে বলে মনে হলো না। সোহাগের তো কোনো বোন ও নেই। আর সোহাগের খালাতো মামাতো বোনেরা সবাই সবার বাসায় চলে গেছে কাছাকাছি হওয়ায়। তাদের কোনো বোন হলে তাকে দেখে নিশ্চয়ই পালাতো না।
অতঃপর মনিরার মুখের দিকে ভালো করে তাকাতে চাইলে দেখল মনিরা মাথা একদম নিচু করে আছে। এমনিই মেয়েটা তার চেয়ে খাটো। আবার মাথা নিচু করে আছে। দেখতেই পাচ্ছে না ইমন। তাকে দেখে পালাক আর যাই করুক, মেয়েটা আসলেই মিষ্টি, দেখতে বেশ। মনে ধরার মতো। যদিও ইমন এমন নয় যে একজনকে দেখল আর ভালোবেসে ফেলল। যাস্ট চেহারা ভালো লেগেছে। সুন্দর জিনিস সুন্দর লাগবে এটাই স্বাভাবিক।
মনিরা স্ট্যাচু হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে আরেকটু কাছে এসে বলল,
”মিষ্টি মেয়ে কিছু বলছো না কেন? নাম কী তোমার?”
মনিরা মনে মনে দোয়া-দরুদ পড়ছে। আর আল্লাহকে বলছে,
‘আর জীবনে আপুর শ্বশুর বাড়ি আসবো না গো আল্লাহ। এবারের মতো বাঁচিয়ে দাও আমায়। তাকে চিনে ফেললে এই লোক যে কী করবে। সেদিন দু'দুটো থাপ্পড় দিয়েছিল। তখন তো খুব সাহস দেখিয়েছিল। এখন সব হাওয়া ফুস।’
ইমন এবারো জবাব না পেয়ে গম্ভীর কণ্ঠে বলল,
“নাম বলো তাড়াতাড়ি।”
মনিরা ইতস্তত করে বলল,
“মনিরা।”
“পুরো নাম”
মনিরা একবার চোরা চোখে ইমনের দিকে চাইল। অতঃপর বলল,
“সুরাইয়া আক্তার মনিরা।”
ইমন শব্দহীন হেসে বলল,
“মিষ্টি মেয়ের মিষ্টি নাম।”
অতঃপর কিছু ভেবে বলল,
”চুরি করতে আসোনি তো? যদিও পোষাক দেখে তা মনে হচ্ছেনা। কিন্তুু এখনকার সবকিছুই ডিজিটাল তো। চোরেরাও ডিজিটাল হয়ে গেছে। একদম সাহেবদের মতো করে ঘুরে বেড়ায়।”
এ কথা শুনে মনিরা রেগে চোখ বড় বড় করে ইমনের দিকে তাকিয়ে বলল,
“একদম আমাকে চোর বলবেন না। আমি দুলাভাইয়ের শালি। কোনো চোর না।”
ইমনে বিস্ময় নিয়ে মনিরার দিকে তাকিয়ে বলল,
“কিহ! তুমি সেই শালি? যে আমাকে দু'দুটো থাপ্পড় দিয়েছিল!
ডান গালে হাত বুলিয়ে বলল,
ইশ এখনো মাঝে মাঝে ব্যাথা ওঠে।”
মনিরা বোকা বনে গেল। এতোক্ষণ যে জন্য ভয় পাচ্ছিল তা নিজের মুখেই বলে দিল। ভেবেই ভয়ে ইমনের দিকে চোখ বড় বড় করে তাকালো।
ইচ্ছে করছে হাত-পা ছড়িয়ে কাঁদতে। এতোদিন এই ছেলেকে পাগল ভেবেছে। এখন নিজেকে সত্যিকারের পাগল লাগছে। নিজের পায়ে নিজে কড়াল তো পাগলেও মারে না। এবার যে তাকে এই ছেলে কী করবে আল্লাহ জানে।
মনিরা ধীরে ধীরে এক পা দু'পা করে পিছাতে লাগলো। ইমন খেয়াল করতেই রেগে বলল,
“এই মারখুতো মেয়ে আর এক পা এগোলে আমাকে দুটো থাপ্পড় দিয়েছ, আমি তোমায় গুণে গুণে ১০ টা থাপ্পড় দিব।”
মনিরা ভয়ে দাঁড়িয়ে গেল। ১০ টা থাপ্পড়? এই লোকের হাতে ১ টা থাপ্পড় খেলেই তো তাকে আর খুঁজে পাওয়া যাবে না।
অতঃপর কাঁদো কাঁদো মুখ করে বলল,
“আমাকে মারবেন না ভাইয়া। আমি আর আপনাকে মারব না। সত্যি।”
ইমনের মনিরার মুখের দিকে তাকালো। একটু বেশিই ভয় পাচ্ছে তাকে। মায়া হলো একটু। অতঃপর বলল,
“আচ্ছা মারব না।”
“সত্যি ভাইয়া? আপনি অনেক ভালো। আপনাকে আমি ৫ টা চকলেট খাওয়াব।”
ইমন ভ্রু উঁচিয়ে বলল,
“বিকেলে বাগানে পাঁচটা চকলেট নিয়ে এসো। পার্লস্ চকলেট। অন্য চকলেট নট এলাও।”
মনিরা ইমনের কথা শুনে তার দিকে অদ্ভুতভাবে তাকালো। পাঁচ বছরের বাচ্চার মতো চকলেট খেতে চাইছে। আবার একটু ভয় পেল। তাকে একা বাগানে যেতে বলছে কেন এই লোক? চকলেট এর কথা তো খুশি হয়ে এক্সসাইটমেন্টে বলেছে। সত্যি সত্যি চকলেট খাবে এতো বড় ছেলে হয়ে?
মনিরাকে চুপ থাকতে দেখে ইমন বলল,
“এই যে ভাবনা রানী ভাবনার সাগর থেকে একটু ওঠো। ভুলেও না আাসার কথা ভেব না। নয়তো আমাকে যে থাপ্পড় দিয়েছ সেটা সবাইকে বলে দিব।”
মনিরা এবার সবচেয়ে বেশি ভয় পেল। হায় আল্লাহ যদি তার আপু কে বলে দেয়। তার আপু তার খবর করবে। আর আম্মু আব্বু তো ডিটারজেন্ট ছাড়াই ধুয়ে দেবে। ভয়ে ভয়ে ইমনের দিকে কাপা কণ্ঠে বলল,
“আসব।”
ইমন মনিরার দিকেই ঠোঁটে হাসি রেখে তাকিয়ে ছিল। মেয়েটার দিকে তাকিয়ে থাকতে বেশ ভালো লাগছে। আর বেশি ইনজয় করছে মনিরার চোখে মুখে এই ভয়। মনে মনে হাসল। মেয়েটা আসলে অনেক বোকা। এতো ভয় পাওয়ার কী আছে! সে কী বাঘ না-কি ভাল্লুক!
মনিরাকে আসতে বলার দুইটা কারণ। এক হলো তাকে সেদিন লম্পট বলায়, থাপ্পড়ের চেয়ে ওই ভাষা ইমনের কাছে বেশি অপমানজনক লেগেছে। তাই একটু ভয় দেখানোর জন্য আসতে বলল। আর দ্বিতীয়ত মেয়েটার মিষ্টি মুখ আবরেকবার দেখতে পাবে। ব্যাপারটা বেশ ইনজয় করছে ইমন।
একটু পর েরতে হবে। এখন চাইলেও কিছু করতে পারবে না। তাই এই বুদ্ধি। অতঃপর মনিরার দিকে বলল,
“মিষ্টি মেয়ে এবার যাও।”
অনুমতি মেয়ে মনিরাকে আর পায় কে! এক দৌড়ে তার ঘরে গিয়ে উপস্থিত। মনিরার অবস্থা দেখে ইমন কিছুটা শব্দ করে হেসে ফেলল। সে বাঘ দেখেও এতো ভয় পায় না। এ মেয়ে তাকে যত ভয় পেল।
অয়ন বের হয়ে ইমনকে একা হাসতে দেখে বলল,
“কী রে পাগল হয়ে গেলি না-কি?”
ইমন মাথা চুলকে বলল,
“পাগল হয়নি। তবে একজনকে টাইট দিয়েছি।”
”কাকে?”
”সোহাগের শালিকে। আমাকে দুটো থাপ্পড় দিয়েছিল। আবার আমার মতো মাসুম বাচ্চা কে লম্পট বলেছিল। ভাবতে পারছিস?”
অয়ন বলল,
“তুই যদি মাসুম হোস, তাহলে পাপী কে?”
ইমন বলল,
”তুই।”
অয়ন ইমনের হাত ধরে টেনে ডাইনিং টেবিলের দিকে গেল। এর সাথে ফালতু কথায় অয়ন পারবে না। ফাও সময় নষ্ট।
★★
মৌ সকালে খেয়ে শুয়ে থাকতে থাকতে কখন যে ঘুমিয়ে গিয়েছিল বুঝতে পারেনি। ঘড়িতে ১২:৩০ বাজে। ঘরের আশেপাশে একবার চোখ বুলালো। সোহাগকে না দেখে দীর্ঘশ্বাস ফেলল। অতঃপর উঠে গোসল করে নামাজ পরে নিল।
এখনও সোহাগকে ঘরে আসতে না দেখে মৌ এর খারাপ লাগলো।
জায় নামাজে বসে ভাবতে লাগলো সে ঘরে আছে বলেই কী আসছে না? তাকে এতোটা অপছন্দ করে? নিজ ইচ্ছায় যে মৌ কে সোহাগ বিয়ে করেনি তা মৌ কে সোহাগ অনেক সুন্দর করেই বুঝিয়ে দিয়েছে। এসব ভেবে মৌ এর চোখ পানিতে ভরে উঠল।
সে তো তার স্বামীর জন্যই নিজেকে রক্ষা করেছে। কখনো কোনো ছেলের সাথে কথা পর্যন্ত বলেনি। আজেবাজে গল্প করেনি। নিরুপায় হয়ে কর্কশ কণ্ঠে মাঝে মাঝে কথা বলতে হতো প্রয়োজনে। অথচ আজ শুনতে হচ্ছে তার স্বামীর তাকে পছন্দই ছিল না।
তালাক হালাল। কিন্তুু আল্লাহর সবচেয়ে অপছন্দের কাজ এই তালাক। মৌ ভাবল সোহাগ এর সাথে ভালোভাবে কথা বলবে এই ব্যাপারে। সে তালাক চায় না। আল্লাহর অপছন্দের কাজকে সেও অপছন্দ করে। কিন্তুু সোহাগের সাথে কথা বলতে হলে আগে নিজের মনকে একটু ফ্রেশ করতে হবে। তাই ভাবল আজ সে মনিরা আর তার দাদি-আপু বাবার বাড়ি যাবে। এই ভেবে উঠে দাঁড়ালো। বাইরে বেরিয়ে এদিক-ওদিক দেখল। কোথাও সোহাগকে দেখল না। ছাদে যাওয়া হয়নি তার। নিজেকে ভালোভাবে ঢেকে ছাদে গিয়ে একপলক দেখল। কোথাও নেই। অতঃপর শ্বাশুড়ি মায়ের ঘরে গেল।
নাফিসা বেগম রান্না শেষ করে গোসল করে নামাজ পড়লেন। নামাজ শেষে জায় নামাজ উঠিয়ে গুছিয়ে রাখছিলেন। মৌ কে দেখে মিষ্টি হেসে বললেন,
“এখন শরীর কেমন লাগছে আম্মু?”
মৌ মৃদু হেসে বলল,
“আলহামদুলিল্লাহ ভালো আম্মু।”
অতঃপর শ্বাশুড়ি মায়ের পাশে বসে ইতস্তত করে বলল,
“আম্মু আজকে আমি, মনিরা আর দাদি-আপু আমাদের বাড়ি যাই?”
মৌ এর কথায় নাফিসা বেগমের মুখ থেকে হাসি মিলিয়ে গেল। বুঝলেন মেয়ে তার স্বামীর উপর মন খারাপ করে যেতে চাচ্ছে। অতঃপর মৃদু হেসে বললেন,
“আম্মু কালকে তো সোহাগের সাথে তোমাদের যাওয়ার কথা। আজকে ও একটা কাজে গিয়েছে। ও আসুক। কালকে যেও?”
মৌ মন খারাপ করে বলল,
“আব্বু-আম্মুর কথা খুব মনে পরছে।
কথাটা মিথ্যা নয়। এর আগে মৌ তার মাকে ছাড়া কোথাও থাকেনি। হঠাৎ করেই এভাবে মাকে ছাড়া থাকতে কষ্ট হচ্ছে। মনে পরছে।”
নাফিসা বেগম কী বলবেন বুঝতে পারলেন না। তিনি নিজেও বোঝেন। নিজের বাড়ি ছেড়ে আসলে কেমন লাগে! মৌ এর মা-বাবার কথা মনে পরছে এটা মিথ্যা নয়। বরং স্বাভাবিক। তিনি আর কিছু বলতে পারলেন না। এমনিতেই তার ছেলে আজ যা কষ্ট দিয়েছে। এখন সেও যদি যেতে না করে দেয় মেয়েটা খুব কষ্ট পাবে। নিজের মেয়ে নেই। মৌ সেই জায়গা পূরণ করে দিয়েছে। মা হয়ে মেয়ের আনন্দ কী করে কেড়ে নিবে! তাই আর অমত করলেন না। অতঃপর বললেন,
“আচ্ছা আম্মু যেও।”
মৌ খুশি হলো শ্বাশুড়ি আম্মুর সম্মতি পেয়ে।
মৌ বের হলে সাথে সাথে নাফিসা বেগম সোহাগের নাম্বারে কল করলেন। ওপাশ থেকে ধরল না। বেশ কয়েকবার দিলেন। একে একে ইমন, অয়নের ফোনেও দিলেন। কেউ ধরল না।
এটা নতুন নয়। বেশিরভাগ সময়ই এমন করে থাকে সোহাগরা। কিন্তুু এখন কল ধরা জরুরি ছিল। ভেবেছিল মৌ রা বের হওয়ার আগেই সোহাগকে আসতে বলবে। কিন্তুু তা আর হলো কই! অতঃপর হতাশ হয়ে ফোন রেখে দিলেন।
মৌ নাফিসা বেগমের ঘর থেকে বেরিয়ে ভাবল সোহাগ বাসায় থাকবে না এই অজুহাতেই হয়তো কাজে গেছে। বিয়ের পর মানুষ এক সপ্তাহ ছুটি কাটায়। আর সোহাগ বিয়ের পরদিন ও অফিসে গেল। হঠাৎ প্রবলেম হতেই পারে। কিন্তুু প্রতিদিন তো আর প্রবলেম হবে না।
তাকে কী সোহাগের এতোই অপছন্দ! অপছন্দই তো! কতবার বলল সে তাকে বিয়ে করতে চায়নি। মায়ের জন্যই করেছে। ভাবতেই চোখ থেকে পানি গড়িয়ে পড়ল। কতবার যে বেয়াদব বলল? সে তো মুখের উপর জবাব দেয়নি। কিচ্ছু বলেনি। ভুল বুঝলে, রাগ করলে মানুষ এতোটা রিয়েক্ট করে? তার তো জানা মতে করে না। রাগ তো সব মানুষেরই থাকে। সোহাগের রাগ তার কাছে স্বাভাবিক লাগেনি। নরমাল একটা বিষয় নিয়ে কেউ এতো রিয়েক্ট করবেনা মৌ এর ধারণা। তাকে তো সোহাগের পছন্দ না। এই অজুহাতে সে অপছন্দের বহিঃপ্রকাশ হয়ে গেছে।
ঘরে গিয়ে মেঝেত হাঁটু মুড়ে বসে হাটুঁতে মুখ গুঁজে মৌ এসব ভাবতে লাগলো। আর ফুঁপিয়ে কাঁদতে লাগলো। আর কত কাঁদবে। কিচ্ছু ভালো লাগছেনা।
কিছুক্ষণ পর উঠে চোখে মুখে পানি ছিটিয়ে মনিরাকে ব্যাগ গোছাতে বলে আসলো।
মনিরা তো মহা খুশি। তাকে আর আজ বিকেলে সেই ছেলের সাথে দেখা করতে যেতে হবেনা এই ভেবে। যদিও তার আপুর জন্য খুব খারাপ লাগছে। কী যে হয়েছে আপুর। আল্লাহর কাছে দোয়া করল যেন সব ঠিকঠাক হয়ে যায় দ্রুত।
★
বিকালে মৌ, মনিরা, আকীলা বেগম রেডি হয়ে নাফিসা বেগমকে বিদায় দিচ্ছিলেন। মৌ বারবার চোখ এদিক-ওদিক ঘোরাচ্ছিল। সোহাগকে একবারো দেখল না। সে কী বাড়ি আসেনি? শ্বাশুড়ি আম্মুকে জিজ্ঞেস করতে গিয়েও করল না। সকাল থেকে বিকাল হতে চলল অথচ একটিবার চোখের দেখা তাকে দেখতে এলো না। মানুষটা কী এতোটাই পাষাণ? না-কি তাকে আর সহ্যই করতে পারছে না বলে বাড়ি ফিরছে না। এই ভেবে মৌ এর চোখ জোড়া ভিজে উঠল। আর পিছন ফিরল না। সামনে এগলো।
মৌ আকাশের দিকে তাকিয়ে মনে মনে বলল,
“আপনি খুব ভালো থাকবেন। আমার আল্লাহ আপনায় ভালো রাখুক। আপনাকে ভালো থাকতে দেখলে যে আমি মনে শান্তি পাবো। আমায় কী মনে করবেন আপনি?
আপনি আমায় মনে করলে আমি ধন্য হব। ভীষণ মিস করব আপনাকে। আপনি না চাইলে আপনার জীবনে আর আসব না।”
নাফিসা বেগম দুপুর থেকে যে তার ছেলেকে কতবার ফোন দিয়েছে, একবাও ফোন উঠায়নি। মৌ কে নিষেধও করতে পারছে না মনে কষ্ট পাবে ভেবে।
অতঃপর মৌ রা বেরিয়ে গেল তাদের গন্তব্যে। তার কিছু সময় পরেই মেহরাব নাফিসা বেগম কে কল ব্যাক করল।
বাড়ি থেকে এতোবার কল পেয়ে সোহাগ ভয় পেয়েছে। ভাবলো কারো বিপদ হলো না তো!
নাফিসা বেগম বললেন,
কারো কিছু হয়নি। দ্রুত বাড়ি ফিরতে।
সোহাগ মিনিট ত্রিশ এর মাঝে বাড়ি পৌঁছালো।
নাফিসা বেগম কে জিজ্ঞেস করলে তিনি বললেন,
ফ্রেশ হয়ে খেতে আসতে। তখন বলবেন।
সোহাগ আর বাক্য ব্যয় না করে তার ঘরে চলে গেল। সারাদিন পর মৌ এর মুখ দেখবে বলে কিছুটা শান্তি লাগছে। কিন্তুু এ কী ঘরে তো মৌ নেই। সকালের কথা মনে পরল। ঘর ফাঁকা দেখে আতঙ্কিত হলো।
আবার ভাবল হয়তো মায়ের ঘরে আছে। সে আসবে বলে অভিমান করে গিয়েছে হয়তো।
তাই দ্রুত ফ্রেশ হয়েই নাফিসা বেগমের ঘরের দিকে গেল।
নাফিসা বেগম টেবিলে সোহাগের জন্য অপেক্ষা করছিলেন। ছেলেকে এভাবে তার ঘরে যেতে দেখে ভ্রু কোঁচকালো। অতঃপর নিজেও উঠে ছেলের পিছু গেল।
সোহাগ তার মায়ের ঘরে গিয়ে মৌ কে না দেখে ডাকলো,
“মৌ?”
কোনো সাড়া নেই। অতঃপর আবার কাতর কণ্ঠে ডাকলো,
“মৌ আছো? কোথায় তুমি?”
পিছন থেকে নাফিসা বেগম বললেন,
“মৌ তার বাবার বাড়ি।”
সোহাগ পিছন থেকে তার মায়ের এমন কথা শুনে ভয় পেয়ে গেল। মৌ তাকে ছেড়ে চলে গেল কেন? তাকে ছেড়ে যাবে না তো!
এই ভেবেই মেঝেতেই বসে পরল। চোখ থেকে ফোটা ফোটা পানি পরতে লাগলো।
নাফিসা বেগম ছেলেকে এমন অবস্থায় দেখে অবাক হলেন। দু'দিনের বউ এর জন্য এতো ভালোবাসা! আল্লাহর কাছে শুকরিয়া আদায় করলেন। অতঃপর মেহরাবের পাশে বসে বললেন,
“আমার আব্বু মেয়েদের মতো এমন কান্না করা কোথা থেকে শিখল?”
সোহাগ বাচ্চাদের মতো করে বলল,
“আম্মু মৌ কে আমার কাছে এনে দিবা? আমি সকালে ওসব কিচ্ছু মন থেকে করিনি, বলিনি বিশ্বাস কর। ওকে ভালোবাসি কি-না জানি না। কিন্তুু আমি ওকে ছাড়া ভাবতে পারছি না আম্মু।”
নাফিসা বেগম ছেলের মাথায় হাত বুলিয়ে মৃদু হেসে বললেন,
“পাগল ছেলে। কালকে তোমাদের যাওয়ার কথা ছিল। মৌ একদিন আগে গেছে। তুমি কালকে যেও।”
সোহাগ বলল,
“আজকেই যাই আম্মু?”
নাফিসা বেগম ছেলের বাচ্চামো দেখে হেসে ফেললেন। অতঃপর বললেন,
“আচ্ছা যাও। সাথে ইমন, অয়নকে নিও। রাতে একা যেতে হবে না।”
সোহাগ সম্মতি দিয়ে ইমন, অয়নকে কল করে জানিয়ে দিল। অতঃপর রেডি হতে চলে গেল।
অয়ন ভুলেই গিয়েছিল মনিরাকে বিকেলে বাগানে আসতে বলেছিল। মনে থাকলেও আসতে পারতো না। আজ অনেক কাজ এর চাপ ছিল। কাজ শেষে সোহাগ দের বাড়ি আর যায়নি। অয়ন ইমন দু'জনেই নিজ নিজ বাড়ি গেছে।
সোহাগের সাথে যেতে হবে ভেবে মনে মনে হাসল। বেচারা মিষ্টি মেয়ে তার হাত থেকে বেঁচে গিয়েও বাঁচল না।
চলবে ইনশাআল্লাহ................