#আপনি_যে_আমার_ই
#writer_Drm_Shohag
#পর্ব_১৪
(অনুমতি ব্যতীত কপি করা নিষিদ্ধ।)
মাগরিব এর নামাজ পরে মৌ দেখল সোহাগ মসজিদ থেকে এসে সোফায় বসে ল্যাপটপ নিয়ে কাজ করছে।
মৌ জায় নামাজ গুছিয়ে সোহাগের কাছে এসে সোহাের মাথার টুপি খুলে রাখল। তারপর সোহাগের এলোমেলো চুল হাত দিয়ে গুছিয়ে দিল।
সোহাগ মৌ এর দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসল।
মৌ কিছু একটা ভেবে হাত বাড়িয়ে দিয়ে বলল,
“আমার কয়েন টা দিন।”
সোহাগ ল্যাপটপে কাজ করছিল। সামনে মৌ এর হাত পাতানো দেখে ভ্রু কুঁচকে বলল,
“ওটা তো আমার স্পেশাল গিফট। গিফট দিয়ে আবার ফেরত চাচ্ছ কেন?”
“আমার লাগবে। দিয়ে দিন আমাকে।”
“বউ তুমি তো দেখছি হার কিপ্টের দাদি। পাঁচ নয়, দুই নয়, একটা টাকার কয়েন দিয়ে তাও আবার ফেরত চাচ্ছ!”
মৌ হাসল সোহাগের কথা শুনে। আজকে সোহাগ যখন দেখল তার স্পেশাল গিফট এই কয়েন, তখনকার সোহাগের এক্সপ্রেশন এর কথা মনে পরায় মৌ জোরে হেসে উঠল। হাসতে হাসতে বলল,
“তখন আপনার এক্সপ্রেশন টা অনেক বেশি সুন্দর ছিল। ভিডিও করে রাখা লাগতো।”
সোহাগ ইনোসেন্ট ফেস বানিয়ে বলল,
“তুমি আমাকে বোকা বানিয়েছো। আর ওতোগুলো চকলেট কী করলে?”
মৌ বলল,
“রেখেছি কিছু। সব দিইনি।”
অতঃপর টেবিলের ড্রয়ার থেকে কয়েকটা বের করে সোহাগের হাতে দিল। তারপর বলল,
“আজকে মনিরাকে মেরেছি।”
সোহাগ ভ্রু কুঁচকে বলল,
“এতো বড় হয়েও মারামারি কর দুই বোন? তোমার না বিয়ে হলো?”
মৌ বলল,
”পুরোটা শুনুন। অর্ধেক কথা শুনে কমেন্ট করতে থাকেন কেন?”
সোহাগ বলল,
“আচ্ছা শুনছি বলো।”
“কাল রাতে মনিরা এলোমেলোভাবে বাইরে বের হওয়ায় রেগে গিয়েছিলাম। তাই মেরেছি। আর মনিরাকে আমি কিছু বললে ও আমার সাথে বিয়াদবি করে না। মারলে তো না-ই।”
সোহাগ তার দাড়িতে হাত বুলাতে বুলাতে বলল,
“তুমি রাগ করতে পার তার মানে? এটা তো দুঃখের খবর।”
“উফ! কথার মাঝে কথা বললে ভাল্লাগে না। আর আমি রাগ করতে পারব না? আমি কী রোবট যে আমার রাগ থাকবে না!”
“আমার উপর তো রাগ কর না। হাজার রাগাতে চাইলেও রাগতে দেখিনা তোমায়।”
মৌ হেসে বলল,
“আরো কয়েকটাদিন যাক, তারপর বুঝবেন।
তবে আমি এইখানে আপনার মতো নয়। প্রথম থেকে রাগ ঝাড়তে শুরু করিনা।”
সোহাগ ভ্রু কুঁচকে বলল,
“তোমার রাগ হজম করার প্রিপারেশন নিতে বলছ?”
মৌ মাথা নাড়িয়ে হেসে বলল,
“হু, হু। তাই নিন।”
সোহাগ অসহায় হয়ে বলল,
“আচ্ছা। বউ এর রাগ হজম করতে পারাটাও অনেক গুণের। আমিও সেই গুণ অর্জন করতে পারি কী-না দেখি।”
মৌ বলল,
“আচ্ছা শুনুন।”
সোহাগ হেসে বলল,
“আচ্ছা বলুন!”
সোহাগের কথায় মৌ হেসে দিল। অতঃপর বলল,
“আমার আর মনিরার ঝামেলা হলে যার রাগ-অভিমান আগে পরে যায়, সে অপরজনকে তার পছন্দের জিনিস এভাবে গিফট করে দিই। আবার অনেক সময় দু'জনেই দিয়েছি।” অতঃপর কিছুটা মন খারাপ করে বলল,
“আর আজকে তো মেরেছি। বুদ্ধি হওয়ার পর আজ প্রথম মেরেছি। তাই পাঁচগুণ বেশি গিফট দিয়েছি।”
সোহাগ গভীর ভাবনা ভেবে বলল,
“খুবই ইন্টারেস্টিং বিষয়। আর আমার বন্ধু ইমন আর ওর ছোট বোন সবসময় দু'জন দু'জনের চুল ছিঁড়াছিঁড়ি করতেই থাকে।”
মৌ হেসে বলল,
“সে তো আমি আর মনিরা ছোটবেলায় অনেক মারামারি করেছি। আম্মু বলতো তোরা কী দুই সতীন? দুই সতীনও তোদের চেয়ে একসাথে মিলেমিশে সুখে শান্তিতে সংসার করে।”
মৌ এর কথা শুনে সোহাগ হাসতে হাসতে বলল,
”লাইক সিরিয়াসলি! সতীন! এইটা বেস্ট ছিল।”
মৌ ইনোসেন্ট ফেস বানিয়ে বলল,
“কিন্তুু এখন তো করিনা। বড় হতে হতে মনিরার ভিতর আমার প্রতি সম্মান বাড়ল, মনিরার প্রতি আমার বাড়ল স্নেহ। এখন আমি শাসন করলে ও চুচচাপ শোনে।”
সোহাগ হাসি থামিয়ে বলল,
“বুঝেছি গো এককালের দুই সতীনের এক পিস সতীন বর্তমানে আমার মৌ বউ।”
মৌ মেকি রাগ দেখিয়ে বলল,
“ধ্যাত! আপনাকে কিছু বলবোই না। শুধু ফাজমালি করেন।”
সোহাগ হাসতে হাসতে বলল,
“তাহলে কার সাথে ফাজলামি করব? গার্ল....”
মৌ এর দিকে তাকিয়ে দেখল কোমড়ে হাত দিয়ে ভ্রু কুঁচকে তার দিকে তাকিয়ে আছে।
অতঃপর কেবলা মার্কা হাসি দিয়ে বলল,
“মানে বলছিলাম যে, কি যেন?
মনে পরার ভঙ্গি করে বলল,
ও হ্যাঁ, গালে কি যেন একটা পরেছে।”
মৌ সোহাগের কাছে এসে দাঁড়িয়ে বলল,
“মানুষের কিছু একটা চোখে পরে, আর আপনার গালে পরল?”
সোহাগ হেসে বলল,
“স্পেশাল মানুষের বর তো আমি। তাই সবকিছু স্পেশাল হয়ে যাচ্ছে। বিশেষ করে গিফট!”
”হয়েছে। এবার আমার কয়েন টা দিন।”
সোহাগ তার পকেট থেকে পাঁচ টাকার কয়েন দিয়ে বলল,
“এটা নাও কিপ্টে বউ। ওই একটাকা কই যে রাখছি জানি না।”
মৌ এই কয়েন হাতে নিয়ে বলল,
“আপনি কিপ্টে।”
সোহাগ ভ্রু কুঁচকে বলল,
“আমি কী করলাম?”
“আপনি যে বিয়ে করলেন। আমাকে ট্রিট দিয়েছেন?”
সোহাগ হা করে তার বউ এর দিকে তাকালো। বিয়ে করলে বন্ধুদের ট্রিট দিতে হয় শুনেছে। কিন্তুু যাকে বিয়ে করেছে তাকেও দিতে হয়?
অতঃপর জিভ দিয়ে ঠোঁট ভিজিয়ে বলল,
“বউদের ট্রিট দিতে হয় এই নিয়ম কোথায় আছে?”
“বন্ধুদের ট্রিট দিতে হয় এই নিয়ম কোথায় আছে?”
“এটা তো বন্ধুগত অধিকার!”
“এটাও বউগত অধিকার!
আমার সবকিছুই তো তোমার বউ!
মৌ সোহাগের কথায় কিছুটা লজ্জা পেল। তা দেখে সোহাগ মুচকি হাসল। হুটহাট মৌ এর লজ্জা পাওয়াটা সোহাগের কাছে বেশ লাগে।
মৌ নিজেকে স্বাভাবিক করে বলল,
“এক টাকার কয়েন দিয়ে কার্ড উঠাতে ভালো হয়।”
সোহাগ ভ্রু কুঁচকে বলল,
“এখন এই কয়েন দিয়ে বেশি ভালো হবে। এই কয়েন এ তোমার বরের ভালোবাসা আছে।”
মৌ হেসে কয়েনটি টেবিলের ড্রয়ারে রাখল।
★★
সোহাগ আর ওয়াসিল হোসেন মসজিদ থেকে একসাথে এশার নামাজ পরে ডাইনিং এর সোফায় বসল। টুকটাক কথা বার্তা বলে ওয়াসিল হোসেন সোহাগ কে বসতে বলে ঘরে গেলেন। একটু পর হাতে কিছু এনে সোহাগের পাশে বসলেন। অতঃপর হাত বাড়িয়ে সোহাগের এর দিকে দিয়ে বললেন,
“এটা রাখো বাবা। তোমার আর তোমার দুই বন্ধুর কাপড় কিনে নিও তোমাদের পছন্দ অনুযায়ী।
সোহাগ শ্বশুরের কথা শুনে ভ্রু কোঁচকালো। ওয়াসিল হোসেন এর হাতে টাকা দেখে বোঝার চেষ্টা করল তাকে কেন এই টাকা দেয়া হচ্ছে, হঠাৎ মায়ের কথা মনে পড়ল।
নাফিসা বেগম বলতেন,
‘আব্বু এই সমাজে যোতুকের ব্যাপারটা খুব গভীরভাবে ঢুকে গিয়েছে। তুমি এ ব্যাপারে সাবধানে থাকবে।’
সোহাগ তখন মায়ের কথা সেভাবে বুঝতো না। ভাবতো সে তো মেয়ের বাড়ি থেকে বিয়ের সময় কোনো টাকা নিবে না। তার সে ইচ্ছে ছিল না। কিন্তুু আম্মুর সেই কথার অর্থ আজ ওয়াসিল হোসেন কে দেখে সোহাগ বুঝল। গভীরভাবে যৌতুক ঢুকে গিয়েছে। সোহাগ ওয়াসিল হোসেন কে কী বলবে সেটাই ভাবতে লাগলো। টাকা নেয়ার তো প্রশ্নই আসেনা।
সোহাগকে কে চুপ থাকতে দেখে ওয়াসিল হোসেন চিন্তিত হলো। ভাবল ছেলে তো অনেক বড় ঘরের। টাকা কি কম হয়ে গেল! অতঃপর সোহাগের উদ্দেশ্যে বললেন,
“এখানে ২০ হাজার আছে বাবা। আমাদের সামর্থ্য অনুযায়ী দিয়েছি। কিছু মনে কর না। এটা রাখো বাবা।”
সোহাগ ভাবনার জগৎ থেকে বেরিয়ে বিস্ময় নিয়ে তাকালো ওয়াসিল হোসেন এর দিকে। মানে ২০ হাজার টাকা দিচ্ছে। সোহ নিচ্ছে না বলে ভাবছে সোহাগের এর টাকা কম হচ্ছে।
সোহাগ ওয়াসিল হোসেন এর হাতের উপর হাত রেখে বলল,
“আপনি আমাকে যৌতুক দিচ্ছেন আব্বু?”
ওয়াসিল হোসেন মৃদু হেসে বলল,
“পাগল ছেলে। যৌতুক কেন দিব? এটা তো খুশি হয়ে দিচ্ছি।”
সোহাগ বলল,
“খুশি হয়ে দিলে কেউ ২০ হাজার টাকা দেয়? আবার ভাবে যাকে দিচ্ছি সে এটাতে খুশি হলো না-কি, আরও টাকা দিতে হবে?”
ওয়াসিল হোসেন মুখ থেকে হাসি সরিয়ে ভ্রু কোঁচকালো। সোহাগের প্রথম কথা শুনে ভাবল আসলেই কী কম হয়ে গেল টাকাটা?
তাদের অবস্থা অনেক হাই ফাই না হলেও মোটামুটি ভালো। তবে মৌ এর বিয়ের জন্য খরচ করে আপাতত হাতে বেশি টাকা নেই। কি করবে ভেবে পেল না। অতঃপর বলল,
বাবা আপাতত এটা রাখো। আমি কিছুদিনের মধ্যেই আবার দিব।
সোহাগ কপাল চাপড়ালো। সে বোঝাতে কী চাইল আর কী বুঝেছে। অতঃপর বলল,
“আব্বু আমি এই টাকাটা নিতে পারব না। কারণ এটা ইনডিরেকলি যৌতুক। আমি জানি আপনি আবার বলবেন এটা খুশি হয়ে দিচ্ছেন। কিন্তুু কেউ খুশি হয়ে দিলে এভাবে দেয় না আব্বু। আপনি খুশি হয়ে দিতে চাইলে অন্যভাবে দিতে পারেন। যেভাবে আপনার মেয়েদের খুশি হয়ে দেন।
মার্কেটে গেলে আপনার মেয়ের জন্য জামা পছন্দ হলে কিনে নেন, সেরকমই আমার জন্য কিছু পছন্দ হলে আপনি তা কিনে নিয়ে দিতে পারেন। সেটা ১০ টাকার জিনিসও হতে পারে।
আপনার জন্য একটা পাঞ্জাবি কিনলে সখ করে সেইম পাঞ্জাবি আমার জন্য কিনতে পারেন। এমনটা ভাববেন না এই কমদামি পাঞ্জাবি জামাইকে কী করে দিব?”
ওয়াসিল হোসেন অবাক নয়নে সোহাগের পানে চেয়ে আছে। সোহাগ তা দেখে মৃদু হাসল। অতঃপর দীর্ঘশ্বাস ফেলে আবার বলতে শুরু করল,
“আপনি মৌ কে ভালোবেসে দিতে পারেন। কিন্তুু আমায় এই সমাজের নিয়ম মেনে এভাবে যৌতুক দিবেন না আব্বু। সমাজে এখন অনেকেই বলে এক টাকাও যৌতুক দিতে হয়নি। অথচ ছেলের বাড়ির লোক মেয়ের বাবার উপর হাজার টা নিয়ম বেঁধে দেয় সমাজের নিয়মের দোহাই দিয়ে। ইনডিরেকলি অনেক খরচ করায়। এই যেমন ছেলের বাড়ি থেকে যে কয়জন আসবে সবাইকে কাপড় দিতে হবে। এটা সমাজের নিয়ম। এই নিয়ম তো ইসলামের কোথাও নেই। আমরা মুসলিম হয়ে ইসলামের বিধিনিষেধ না মেনে সমাজের নিয়ম কেন মানব বলুন আব্বু?”
সোহাগ আবারও থামলো। অতঃপর বলল,
“আপনি মৌ কে ছোটবেলা থেকে বড় করেছেন। এতো কষ্ট করে বড় করে আমার হাতে দিয়েছেন। মৌ এখন আমার দায়িত্বে। মৌ এর মাধ্যমে সব সুযোগ সুবিধা আমি আমার পরিবার নিবে। বড় আপনারা করলেন। সুবিধা আমরা নিব। এই ঋণ-ই তো কখনো শোধ করতে পারব না। সেই সামর্থ্য আল্লাহ আমাদের দেয়নি। তবে এমন কোনে নিয়ম আপনাদের উপর দয়া করে চাপিয়ে নিবেন না। এইসব নিয়ম মানতে গিয়ে আমায় ছোট করবেন না আব্বু প্লিজ!”
কিছুক্ষণ থেমে আবার বলল,
“আব্বু কখনো এটা ভাববেন না, জামাইকে অনেকদিন হলো দাওয়াত দেওয়া হয়না, জামাই কী ভাবল বা জামাই মন খারাপ করল কি-না? বরং ভাববেন জামাই এর সাথে অনেকদিন বসে খাওয়া হয়না। আজ বরং জামাই আর মেয়ের বাড়ি গিয়ে দুজনের সাথে একসাথে বসে খেয়ে আসি। আপনার তো ছেলে নেই আব্বু। আমাকে আপনার নিজের ছেলেই ভাবুন না আব্বু?
আমারও তে আব্বু নেই!”
ওয়াসিল হোসেন সোহাগ কে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। চোখের কোণে পানি জমেছে আবেগে। কিছুক্ষণ পর জড়িয়ে ধরেই ওয়াসিল হোসেন সোহাগের উদ্দেশ্যে বললেন,
“আমি এক ভাগ্যবান বাবা। সবাই যেমন নিজের ছেলেকে নিয়ে গর্ব করে আমি তেমন আমার এই ছেলেকে নিয়ে গর্ব করব। আমার মৌ এর ভাগ্যে আল্লাহ এমন ভালো মনের মানুষ রেখেছিল তা আমি কিছুক্ষণ আগ অব্দি ভাবতে পারিনি।”
সোহাগ তার শ্বশুরের কথা শুনে মৃদু হাসল। অনেকদিন পর যেন বাবাকে জড়িয়ে ধরল। বুক ভরে গেল শান্তিতে।
দরজায় ইমন আর অয়ন দাঁড়িয়ে ছিল। দু'জনেই মাঝে মাঝে নামাজ পরে। আজও গিয়েছিল। সোহাগ ডেকে গিয়েছিল। এতোক্ষণ দরজায় দাঁড়িয়ে সোহাগ এর সব কথা শুনছিল। তাদের বন্ধুর চিন্তা-ভাবনা যে এতে সুন্দর তারা জানতে না।
ইমন অয়নের দিকে তাকিয়ে বলল,
“সেহাগকে বন্ধু হিসেবে পেয়ে আজ অনেক বেশি গর্ব হচ্ছে জানিস। আমাদের বন্ধু ভালো জানতাম। কিন্তুু এতোটা জানতাম না।”
অয়ন চুপচাপ শুনে গেল ইমনের কথা আর অপলক শ্বশুর-জামাই এর দিকে তাকিয়ে রইল।
এর আগে কখনে শেনেইনি শ্বশুর-জামাই এর সম্পর্ক এমন হয়, আর আজ নিজের চোখেই দেখে নিল।
★★
মনিরা ভয়ে বেলকনির গ্রিল আরও শক্ত করে ধরল। পেছাতে পারছে না। যেন এক পা তুললে, চোখ একটু এদিক ওদিক করলে ওই জ্বিন এসে তাকে ধরবে। শরীর নিস্তেজ হয়ে আসছে। চোখ বুজে আবার চোখ খুললে সাদা মুখ মনিরার এতো কাছে দেখে চোখ বুজে গায়ে যা শক্তি ছিল সব শক্তি দিয়ে এক চিৎকার দিল।
চিৎকার দেয়ায় মুখ হা হয়ে গেছিল, তখন মুখে কী যেন এসে পরল। মনিরার সেদিকে খেয়াল নেই। আজ এই জ্বিন যে তাকে কী করবে সেই ভয়েই শরীর ঝিমিয়ে আসছে। তার এই চিৎকার বুঝি পুরো এলাকায় চলে গেছে। শরীর দুর্বল লাগলো।
আকীলা বেগম ঘুমিয়েছিলেন। তার ঘুম বেশ গাঢ়ো। কিন্তুু এতো জোরে চিৎকারে দ্রুত উঠে বসল। তিনি নিজেও ভয় পেয়েছে। বুকে থুতু দিয়ে বোঝার চেষ্টা করল কে চিৎকার করল। পাশে মনিরাকে না দেখে ভ্রু কোঁচকালো। দরজায় সবাই চেঁচামেচি করছে।
আকীলা বেগম বিছানা থেকে নেমে ঘরের লাইট জ্বালিয়ে আগে দরজা খুলে দিল। মৌ, ফারজানা বেগম আর ওয়াসিল হোসেন দ্রুত ঘরে ঢুকল। আশেপাশে চোখ বুলিয়ে মনিরাকে না দেখে ওয়াসিল হোসেন উদ্বিগ্ন কণ্ঠে বললেন,
“আম্মা মনিরা কই?”
আকীলা বেগম বললেন,
“আমি নিজেও ঘুম থেইকা উইঠা ওরে পাইনাই।”
বেলকনি থেকে উকি করার মতো শব্দ পেয়ে মৌ বেলকনির দিকে দৌড়ে গেল। মনিরাকে বসে উকি করতে দেখে ভয় পেয়ে গেল। মৌ মনিরাকে ধরে বলল,
“কী হয়েছে মনিরা?”
মনিরা কাঁদতে লাগলো। এতোক্ষণ ভয়ে সে মরে যাচ্ছিল। মৌ দেখে কেঁদে জড়ানো কণ্ঠে বলল,
“আপু জ্বিন এসেছিল। আর আমাকে কীসব তিতা জিনিস খাইয়ে দিয়ে গেছে।”
মনিরার পাশের ঘর মনিরার হওয়ায় মৌ বুঝেছিল মনিরাই চিৎকার দিয়েছে। আজ সারাদিন মনিরা একদম চুপচাপ ছিল। হাসিখুশি মেয়েটা হুট করেই কেমন নিরব হয়ে ছিল। ছোটখাটো ডিপ্রেশনে হয়তো ভুলভাল দেখে ভয় পেয়েছে। তাই মনিরার কথা মৌ পাত্তা দিল না।
অতঃপর ফারজানা বেগম আর মৌ মনিরাকে ধরে ওয়াশরুমে নিয়ে গেল।
মনিরার এতোক্ষণ ভয় লাগলেও এখন মনে হচ্ছে পেটের সব নাড়িভুড়ি বের হয়ে গেলে শান্তি পেত।
জীবনে এতো তিতা জিনিস মুখে পরেনি।
মৌ মনিরার মুখের দিকে খেয়াল করল, সবুজ রঙের কী যেন! আবার কেমন উকি করছে। মৌ ভ্রু কুঁচকে বলল,
“কী খেয়েছিস এগুলো?”
মনিরা বলল,
“আপু জানিনা। এগুলো খুব তিতা। মৌ মনিরার ঠোঁটের পাশ থেকে কিছুটা হাতে নিয়ে নাক এর কাছে নিয়ে বুঝল নিম এর পাতার রস।”
ফারজানা বেগম মনিরার দিকে তাকিয়ে বলল,
“এই জঙ্গলে তোকে কে এসব দিবে? জুস ভেবে নিম এর রস খেয়েছিস না-কি!”
মনিরা উকি করতে লাগলো। মৌ মনিরাকে কুলি করিয়ে বিছানায় বসে মনিরার মুখে কিছুটা মধু দিল।
মনিরার মধু খেয়ে আগের চেয়ে ভালো লাগলো। অতঃপর মৌ এর দিকে তাকিয়ে বলল,
”আপু, আম্মু সত্যি বলছি সাদা মুখওয়ালা জ্বিন এসেছিল। আমাকে বলেছে আমাকে ছাড়বে না। আর এসব কী তিতা ওয়াক!”
মৌ খেয়াল করল মনিরা এখনো হালকা কাঁপছে। ভয় পেয়েছে বুঝল। অতঃপর দোয়া পরে মনিরার শরীরে ফু দিয়ে বলল,
“শুয়ে পর। কালকে শুনব তোর কথা।”
ওয়াসিল হোসেন বলল,
“ফারজানা আসো। আর মনিরা তুমি ঘুমিয়ে পড়।”
মনিরা আর কথা বললনা। শরীর দুর্বল লাগছে। হাঁপিয়েও গেছে। অতঃপর শুয়ে চোখ বুজল।
★★
ইমন বাড়ির পিছন থেকে দৌড়ে বাড়ির সামনের দরজায় এসে দাঁড়াল।
মনিরার চিৎকারে ইমনের কানের বারোটা বেজে গিয়েছে। কানে আঙুল ঢুকিয়ে নাড়াল। মুখ থেকে মুখোস খুলে ফেলল। কালো শার্ট আর কালো প্যান্ট পরেছিল। অন্ধকারে যেন কিছু দেখা না যায়। আর মুখে সাদা মুখোস।
মনিরা ভয়ে যখন বলেছিল,
‘জ্বীন ভাই আমাকে ছেড়ে দিন।’
তখন ইমন অনেক হেসেছিল। এখন মনে হওয়ায় আবারো হাসি পেল। পকেট থেকে একটা সিগারেট বের করে মুখে রাখল। লাইটার দিয়ে জ্বালাতে গিয়ে থেমে গেল। কালকের চোর পিটানি খাওয়ার কথা মনে পরল। ভাবল ভালোই রাত হয়েছে। আর বাইরে সময় নষ্ট করা যাবে না। কালকে বাড়ি থেকে বের হওয়ার সময় মার খেয়েছে। আজ বাড়িতে ঢোকার সময় খাবে। এমনিতেও শরীরে এখনো ভালোই ব্যাথা আছে।
বেশিক্ষণ না দাঁড়িয়ে অয়নকে কল করল। কিছুক্ষণ পর অয়ন এসে দরজা খুলে ইমনের দিকে ভ্রু কুঁচকে তাকালো। ইমন অয়নকে ঠেলে ভেতরে ঢুকিয়ে বলল,
”জীবনে দেখিস নি আমাকে?”
অয়ন বলল,
“দেখেছি। কিন্তুু ব্যাপার টা বুঝলাম না। তুই বাইরে গেলি। আর পাশের ঘর থেকে মেয়ের চিৎকার আসল। কাহিনী কী?”
ইমন অয়নের হাত টেনে যেতে নিয়ে সোহাগের সামনে পরল। সোহাগ তীক্ষ্ণ চোখে ইমনের দিকে চেয়ে আছে। সোহাগকে দেখে ইমন হাতের মুখোস পিছনে লুকালো। বিড়বিড় করল,
”এটা দেখলে এই বুদ্ধিজীবী সব বুঝে যাবে।”
সোহাগ ইমনের কাছে এগিয়ে এসে বলল,
“কী বিড়বিড় করছিস? আর গিয়েছিলি কোথায়?”
ইমন হেসে বলল,
“হেহে, বাইরে গিয়েছিলাম।”
”সেটা জানি। কেন গিয়েছিলি?”
অয়ন মাথা চুলকে বলল,
”এভাবে জেরা করছিস কেন? ভাবতে দে।”
“কী করতে গিয়েছিলি সেটা আবার ভাবতে হবে?”
”তা হবে না? তুই কী মিথ্যা না সাজিয়েই ঝটপট বলে দিতে পারবি?”
চলবে ইনশাআল্লাহ.............