#আপনি_যে_আমার_ই
#writer_Drm_Shohag
#পর্ব_১৫
(অনুমতি ব্যতীত কপি করা নিষিদ্ধ)
অয়ন মাথা চুলকে বলল,
”এভাবে জেরা করছিস কেন? ভাবতে দে।”
“কী করতে গিয়েছিলি সেটা আবার ভাবতে হবে?”
”তা হবে না? তুই কী মিথ্যা না সাজিয়েই ঝটপট বলে দিতে পারবি?”
সোহাগ ইমনের দিকে এগিয়ে আসতে আসতে বলল,
“তাহলে এই ব্যাপার? আজকাল আমাকে মিথ্যে বলা হচ্ছে!”
ইমনের নিজের মাথা নিজেরই ফাটাতে ইচ্ছে করল।বেশি কথা বলার ফল এটা। মিথ্যে বলবে সেটাও বলে দিল। বিড়বিড় করল,
”ইশ! কেমন সিআইডির মতো এগিয়ে আসছে দেখো। যদিও নকল সিআইডি।”
ইমন বলল,
“হেহে, আমি খেতে গিয়েছিলাম।”
”এতো তাড়াতাড়ি মিথ্যে সাজানো শেষ?”
ইমন ভাবল বাইরে তো হাওয়া ছিল। মিটমিট বাতাস ভালোই লাগছিল। ওই মেয়েকে শায়েস্তা করেছে আর হাওয়া খেয়েছে। দুটো একসাথেই হয়েছে। একটা বললে তো আর পুরোপুরি মিথ্যা হবে না।
অতঃপর সোহাগের দিকে তাকিয়ে বলল,
”খেতে গিয়েছিলাম।”
সোহাগ দাঁড়িয়ে বলল,
”কী?”
”হাওয়া।
জানি বিশ্বাস করবিনা। কিন্তুু এটাই সত্যি,হু।”
সোহাগের হঠাৎ চোখ পড়ল ইমনের হাত এর দিকে। ইমন কথা বলার ফাঁকে কখন মুখোশ ধরে রাখা হাত সামনে এনেছে খেয়াল করেনি। সোহাগ দেখার সাথে সাথে ইমন কিছু বোঝার আগেই ইমনের হাত থেকে মুখোশ টান দিয়ে নিল।
ইমন সোহাগের থেকে সাথে সাথে নিয়ে নিল। অতঃপর বলল,
”মানুষের জিনিস এমন থাবা মেরে নিচ্ছিস কেন? শিক্ষা-দীক্ষা নেই না-কি?”
সোহাগ একটা ভ্রু উঁচিয়ে বলল,
”তোকে দেখে মনে হচ্ছে কিছু চুরি করে ফিরছিস। আজ মুখোশ পরে সত্যি সত্যি কিছু চুরি করলি না-কি?”
ইমন ইনোসেন্ট ফেস বানিয়ে বলল,
“তুই আমাকে চোর ভাবতে পারলি ভাই?”
অতঃপর অয়নের দিকে তাকিয়ে বলল,
“তুই আমার আসল ভাই। আর ও নকল ভাই বুঝলি? চল নকল ভাইয়ের শ্বশুর বাড়ি থাকা যাবে না। তোর আসল ভাইকে কত বড় অপবাদ দিচ্ছে দেখেছিস?”
অয়ন বিরক্ত হয়ে বলল,
”তোরা যা ইচ্ছা কর। আমি ঘুমোতে গেলাম।”
অয়ন যেতে নিলে ইমন অয়নের শার্ট টেনে ধরে বলল,
”তুই আমাকে ছেড়ে যেতে পারিস না আসল ভাই।”
অয়ন রেগে বলল,
”এই বেয়াদব ছাড়। বার-বিরাতে আকাম কুকাম করে এসে আমায় টানছিস কেন দুজন?”
সোহাগ ভ্রু কুঁচকে অয়নকে বলল,
”তোর আবার কী হলো? এমন রেগে আছিস কেন?”
অয়ন থতমত খেয়ে বলল,
“কিছু না।”
আসলেই অয়নের মেজাজ ইদানীং খিটখিটে থাকে। ইশরাতকে প্রায় ৬ মাস হলো দেখে না। এজন্যই হয়তো। বুঝতে পারছে না। কিন্তুু ভালো লাগছে না।
সোহাগ ইমনের দিকে তাকিয়প কিছু বলতে নিলে ইমন সোহাগের পিছনে তাকিয়ে বলল,
”ভাবি আসসালামু-আলাইকুম। ভালো আছেন?
এইতো আপনার বরকে পাঠাচ্ছি।”
ইমনের কথা শুনে সোহাগ সাথে সাথে পিছন ফিরল। কেউ নেই।
সোহাগ পিছন ফেরার সাথে সাথে ইমন ঘরের দিকে দৌড় দিল। আর বলল,
“এই নকল সিআইডি এখন যা। শুধু ইমন খানের পিছে লাগা তাই না?”
সোহাগ ভাবল, মৌ এর এখানে এসে দাঁড়ানোর কথা নয়। তার বন্ধুরা আছে। মৌ সারারাত অপেক্ষা করবে তার জন্য। কিন্তুু তার বন্ধুদের এখানে এসে তাকে ডাকবে এমন নয় মৌ। ইমন বেয়াদব তাকে বোকা বানিয়েছে, আর সেও বোকা হয়েছে।
অয়নের দিকে খেয়াল করলে দেখল অয়ন এর এ দিকে কোনো খেয়াল নেই। গভীর ভাবনায় ডুবে আছে। মেহরাব অয়নের কাঁধে হাত রাখলে অয়ন মেহরাবের দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে বলে,
“যা তাহলে। আমিও যাই। ঘুম পেয়েছে। ঘুমাবো।”
সোহাগ অয়নের মুখের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে বলল,
”তোকে অনেক ডিস্টার্ব লাগছে। এনি প্রবলেম?”
অয়ন কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,
”পরিবার বলতে তোরাই। আমার তো আর কেউ নেই। যার জন্য মন খারাপ হবে। যারা ছিল তারা আমাকে না নিয়েই চলে গেছে।”
সোহাগের খারাপ লাগলো। ছেলেটা মা, ছোট বোনকে একসাথে হারিয়েছে। বাবা থেকেও নেই। কোনোদিন ভুল করেও খোঁজ নিতে ফোন করে না। আর তার বাবা তার সাথে একবেলা কথা না বললে কেমন ছটফট করত। কিন্তুু মানুষ তো চিরদিন বাঁচে না। দীর্ঘশ্বাস ফেলে অয়নের দিকে তাকিয়ে বলল,
”তুই আঙ্কেল কে একটা কল করিস। বাবা হিসেবে কিছু না করলেও ছেলে হিসেবে তুই তোর জায়গা থেকে ঠিক থাক। মা-বাবার ঋণ তে কখনো শোধ করা যায় না বল! আর আন্টি, অমিত আল্লাহর কাছে ভালো আছেন আমাদের সবার দোয়ায়।”
অয়ন মাথা নেড়ে বলল,
“হুম।” অতঃপর ঘরের দিকে গেল।
সোহাগ দীর্ঘশ্বাস ফেলে মৌ এর ঘরের দিকে গেল।
★★
ইমন ঘরে গিয়ে মুখোশ পরে দরজার পাশে দাঁড়িয়ে আছে। অয়ন ঘরে ঢুকতে গেলেই ইমন মুখোশওয়ালা মুখ নিয়ে অয়নের সামনে দাঁড়িয়ে যায়। হঠাৎ এভাবে সামনে আসায় অয়ন কিছুটা ভয় পেয়ে পিছিয়ে যায়। অতঃপর বোঝে এটা ইমনের কাজ।
অয়নকে ভয় পেয়ে পিছিয়ে যেতে দেখে ইমন মুখ থেকে মুখোশ খুলে হাসতে হাসতে বলল,
“তুই ছেলে হয়ে ভয় পেলি। মেয়েরা তো এমনিই ভয় পায়। সেখানে ঘুটঘুটে অন্ধকারে জঙ্গল থেকে এমন মুখোশ পরে ওই মেয়ের সামনে গিয়েছি। আমি সিওর ভাই ওর জীবনে ও এতো ভয় পায় নাই। হাহ! ইমন খান একদম ছাড় দেয় না।”
অয়ন ভ্রু কুঁচকে বলল,
“যখন সবাই জানবে তখন তোকে কে ছাড় দেয় সেটা নিয়ে ভাব।”
ইমন ডোন্ট কেয়ার ভাব নিয়ে বলল,
“আরে জানবে না কেউ।”
এই বলে হাতের মুখোশ জানালা দিয়ে ফেলে দিল।
তারপর ওয়াশরুমে গিয়ে হাত-মুখ ধুয়ে নিল। হাতে এক মুঠে পানি নিয়ে অয়নের মুখে মারল।
অয়ন শুয়ে চোখ বুজে ছিল। এমনিতেই কিছু ভালো লাগছিল না। এর মধ্যে ইমনের এসব। শোয়া থেকে উঠে রেগে মৃদু চিৎকার করে বলল,
“সবসময় ভালো লাগে না ইমন। কিছু বলি না বলে মাথায় চরে বসিস। এমনিতেই মাথা ব্যাথায় মাথা ফেটে যাচ্ছে। তার মধ্যে তোর এসব বাঁদরামি আর নিতে পারছি না।”
এই বলে মুখ মুছে ওপাশ ফিরে শুয়ে পরল।
ইমন এর হাসি অয়নের প্রথম লাইন শুনেই পালিয়েছে। অয়ন অন্যসময়ও রেগে বললেও এখন কেমন অন্যরকম লাগলো। একটু খারাপ লাগলো। মজা করে যদি বলতো মাথায় চরে বসিস, এর জবাব ইমন কিছু না কিছু দিত। কিন্তুু অয়ন অনেক সিরিয়াসভাবে কথাটা বলায় ইমনের বেশ খারাপ লাগলো। তবে ইমনের রাগ-অভিমান বরাবরই কম। একটুতেই কথা অফ করে দিবে, এই অভ্যাস নেই।
অয়নের শেষ কথাটা ভাবল। অনেক মাথা ব্যাথা করছে। তার কাছে তে ওষুধও নেই। অতঃপর সোহাগকে কল করে বলল একটা টাফলিন দিতে। ঘর থেকে বেরিয়ে সোহাগের থেকে এনে অয়নের হাত টেনে বসালো।
অয়ন বিরক্ত হয়ে বলল,
“আবার কী?”
ইমন স্বাভাবিকভাবে বলল,
“মাথায় চরব না। ওষুধ খেয়ে নে।”
অয়ন ইমনের দিকে তাকিয়ে ওষুধ টা খেয়ে নিল। খারাপ লাগলো তার। আজ তার মন মেজাজ একটু বেশিই খারাপ। রেগে বলে ফেলেছে। ইমন এর ওতো অভিমান নেই। যা অভিমান করে তাতে একটু টোকা দিলেই ভেঙে যায়। এদিক থেকে মেহরাব আর সে জিতেছে ইমনকে বন্ধু হিসেবে পেয়ে।
প্রচন্ড মাথা ব্যাথা করায় ভাবল কাল ইমনের অভিমানে টোকা দিবে। আজ সত্যিই ঘুমানো দরকার। অতঃপর শুয়ে পরল।
ইমন বিছানায় অয়নের দিকে এগিয়ে গেল। অতঃপর অয়নের মাথায় হাত দিয়ে কপাল, মাথার চুল টেনে দিতে লাগলো। অয়ন মাথায় কারো হাতের স্পর্শ পেয়ে চোখ খুলে ইমনকে এভাবে দেখে মৃদু হাসল। ছেলেটা এমনই। বেশ কেয়ারিং! কে তাকে কী বলল, এসব দেখে না। এর সামনে এর শত্রু অসুস্থ হলেও ভুলে যায় ওটা তার শত্রু। সেবা করতে লেগে যায়। আর সেখানে সে তো তার পরিবারের অংশ।
অতঃপর বলল,
“সরি ভাই! মাথা ব্যাথায় মাথা গরম ছিল। কিছু ভালো লাগছিলো না। তাই ওভাবে বলেছি।”
অয়নের এইটুকু শুনেই যেন ইমন আবার আগের রুপে ফিরে গেল।
দাঁত কেলিয়ে বলল,
“পাম টাম দিতে চাচ্ছিস না-কি? আমি তোর গার্লফ্রেন্ড না। এসবের ধান্দা থাকলে ঝেড়ে ফেল। আমি তোর পিওর আসল ভাই। আমাকে পাম দিয়ে ফুলাতে পারবি না।”
অয়ন চোখ বুজে নিল। ভাবল শুরু হয়ে গেল এর রেডিও। এরই মধ্যে ইমনের ফোনে কল এলো। পকেট থেকে ফোন বের করে ইশরাত এর নাম্বার দেখে ইমনের হাসি প্রসস্থ হলো। ফোন রিসিভ করে কানে নিয়ে বলল,
“কেমন আছিস?”
ওপাশ থেকে ইশরাত হেসে বলল,
“ভালো আছি ভাইয়া। তুমি কেমন আছো?”
“হু, ভালো। কখনো জ্বিন ভূত দেখেছিস?”
ইশরাত ভ্রু কুঁচকে বলল,
“জ্বিন কই পাবো? কিন্তুু দেখার অনেক ইচ্ছা।”
ইমন এর মন বেশ ফুরফুরে লাগছে মনিরাকে শায়েস্তা করতে পেরে। হেসে বলল,
“আমি আজ জ্বিন দেখিয়েছি একজনকে।”
ইশরাত ওপাশ থেকে বলল,
“সত্যি ভাইয়া? শুনেছি জ্বিন বোতলে ভরে রাখে। তুমিও কী জ্বিন বোতলে ভরে রেখেছ না-কি?”
ইমন ফোন লাউডে দিয়েছিল। পাশ থেকে অয়ন ইশরাতের শুনে হাসতে হাসতে গড়াগড়ি খাওয়ার মতো অবস্থা। হাসতে হাসতে বলল,
“তোর ভাইয়ের কাছে জ্বিন এর খনি আছে।”
ইশরাত ভাবল হয়তো কারো মাধ্যমে ভাইয়া বোতলের জ্বিন পেয়েছে। অয়ন ভাইয়াও বলছে।
অতঃপর বলল,
“অয়ন ভাইয়া আমি জ্বিন দেখব। ভাইয়াকে বলো জ্বিন এর বোতল যেন রেখে দেয়। আমার অনেক দিনের ইচ্ছা জ্বিন দেখার।”
অয়ন এবার হাসতে হাসতে এপাশ ওপাশ করতে করতে ধপাশ করে বিছানা থেকে পরে গেল।
তা দেখে ইমন হা হা করে হেসে উঠল।
ইশরাত ভ্রু কুঁচকে বলল,
”ভাইয়া হাসছ কেন?”
“তোর কথা শুনে হাসতে হাসতে আমাদের প্রাণের অয়ন ভাই বিছানা থেকে ধপাস।”
এ কথা শুনে ইশরাতও জোরে জোরে হাসতে লাগলো।
অয়ন ইনোসেন্ট ফেস বানিয়ে বলল,
“আমাকে হেল্প না করে, আমার জন্য সমবেদনা না জানিয়ে দুই ভাই-বোন মিলে মজা নিচ্ছিস বেয়াদব?"
ওপাশ থেকে ইশরাত বলল,
“অয়ন ভাইয়া তুমি আমার ইচ্ছের কথা শুনে হেসেছ। তাই এই শাস্তি পেয়েছ বুঝলে? আর তোমার জন্য আমার পক্ষ থেকে এক বদনা সমবেদনা।”
এই বলে ইশরাত আর ইমন জোরে জোরে হাসতে লাগলো।
অয়ন অদ্ভুতভাবে আওড়াল,
”বদনা!”
বিড়বিড় করল,
“দুই ভাইবোন এক। বিচ্ছুর ছোট বোন তো বিচ্ছুই হবে।”
অয়নের মাথা ব্যাথা অনেকটা সেরে গিয়েছে। কোমড়ে ব্যাথা পেলেও তা কেন যেন গায়ে লাগছে না। ওপাশ থেকে ইশরাত এর প্রাণখোলা হাসিতে যেন তার মন-মেজাজ এক নিমিষেই শান্ত হয়ে গেল। অতঃপর নিজেও মৃদু হাসল।
বেশ কিছুক্ষণ হেসে ইশরাত বলল,
“ভাইয়া কালকে বাসায় যাবো। পরীক্ষা শেষ। নতুন ভাবিকেও দেখব।”
ইমন বলল,
“আচ্ছা তাহলে কাল সব গুছিয়ে রাখিস। আমি আর অয়ন সকাল ১০ টার মধ্যে পৌঁছে যাব।”
ইশরাত বলল,
“তোমাদের আসতে হবেনা ভাইয়া। আমি একাই যেতে পারব, খুব বেশি দূরে নয় তো।”
অয়ন মেঝে থেকে উঠে গম্ভীর কণ্ঠে বলল,
“এতো বড় হতে হবে না। আমি আর ইমন যাব এটাই ফাইনাল।”
ইশরাত আর কিছু বলল না।
★★
মৌ কে চিন্তিত দেখে সোহাগ বলল,
“কি হয়েছে? কী ভাবছ এতো?”
মৌ সোহাগের দিকে তাকিয়ে বলল,
“মনিরা চিৎকার করল। বলল ভূত দেখেছে। আর ভাত না-কি ওকে নিম পাতার রস খাইয়ে গেছে। আমি বুঝলাম না, ভূত নাহয় মনের ভুল, কিন্তুু এই নিম এর পাতার রস কোথা থেকে আসল?”
মৌ এর কথা শুনে সোহাগের কিছু একটা মনে পরল। ইমনের হাতে মুখোশ দেখেছিল। আবার মনিরার চিৎকারের পর পরই বাইরে থেকে ভিতরে আসছিল। হিসাব যেন বরাবর মিলে গেল। কিন্তুু মনিরার সাথে ইমনের কী? অকারণে অপরিচিত কারো সাথে তো ইমনের এমন করার কথা নয়। মৌ কে তার বন্ধুর কথা কিছু বলল না। ভাবল কালকে এই বিষয়ে কথা বলবে ইমনের সাথে। অতঃপর মৌ এর উদ্দেশ্যে বলল,
“কালকে এসব নিয়ে গবেষনা কইরো। আজ অনেক রাত হয়েছে। শোবে আসো।”
অতঃপর মৌ এর দিকে ভালোভাবে তাকিয়ে বলল,
“আজ তুমি একবারো মাথা থেকে কাপড় সরালে না কেন?”
মৌ বলল,
“দাদি-আপু জোর করে মাথায় তেল দিয়ে দিয়েছে। অনেক বিশ্রী লাগছে। আর সারা মুখেও তেলতেল।”
সোহাগ মৌ এর কাছে এসে মাথা থেকে কাপড় সরিয়ে দিয়ে চুলেড খোপা খুলে দিয়ে বলল,
“তুমি এতো সত্যি কথা কীভাবে বলতে পারো?”
মৌ ভ্রু কুঁচকে বলল,
”কী সত্যি কথা?”
সোহাগ হেসে বলল,
“এই যে তোমাকে বিশ্রী লাগছে। এটা তো একদম খাঁটি সত্য কথা। তেল ছাড়া লাগে শ্যাম্পুওয়ালা পেত্নী, তেল দিয়ে লাগছে তেলওয়ালা পত্নী।”
মৌ কোমড়ে দুই হাত রেখে বলল,
”বিয়ের তিনদিনের মাথায় বউ কে পেত্নী লাগছে? ধ্যাত আপনার সাথে কথাই বলব না।”
এই বলে বিছানায় গিয়ে শুয়ে পরল।
সোহাগ মৌ এর রাগ দেখে হাসল। অতঃপর মৌ এর পাশে মৌ এর দিক হয়ে শুয়ে পরল। একটু পর পর চুল ধরে টানছে। মৌ বিরক্ত হয়ে এপাশ ফিরে বলল,
“ডিস্টার্ব করছেন কেন?”
সোহাগ ইনোসেন্ট মুখ করে বলল,
“বউ কে ডিস্টার্ব না করলে তো সওয়াব হবে না। তাই!”
মৌ সোহাগের দিকে ভ্রু কুঁচকে চেয়ে বলল,
”খুব উপকার হলো আপনার হাদিস শুনে।”
সোহাগ মৌ এর দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসল। ডিম লাইটের আলোয় মৌ এর রাগান্বিত মুখ বেশ লাগছে সোহাগের কাছে।
সোহাগ মৃদু হেসে হাত বাড়িয়ে মৌ এর এলোমেলো চুলগুলো কানের পিঠে গুঁজে দিল।
মৌ চোখ বুজল। সোহাগ এর ঠোঁটের কোণে হাসি বিস্তৃত হলো। মৌ কে এভাবে দু'চোখ ভরে দেখতে তার যে কত শান্তি লাগে তা সে বলে বোঝাতে পারবে না। অতঃপর হেসে বলল,
“চোখ খোল মৌ বউ।”
মৌ চোখ খোলে না। সোহাগ মৌ এর দিকে একটু এগিয়ে মৌ এর মুখে হালকা ফু দিল।
মৌ এর চোখের পাতা মৃদু কেঁপে উঠল। সোহাগ হেসে মৌ এর গালে হাত রেখে বলল,
”চোখ খোল মৌ বউ। তোমার চোখে চোখ রেখে দৃষ্টি বিনিময় করার তৃষ্ণা পেয়েছে তোমার প্রিয় স্বামীর। চোখের পাতা উঠাও বউ!”
মৌ কয়েক সেকেন্ড পর লজ্জামাখা মুখে চোখ খুলে সোহাগের দিকে তাকালো। সোহাগ তা দেখে মৌ এর চোখের দিকে তাকিয়ে বলল,
”তোমার চোখের দিকে আজীবন তাকিয়ে থাকলেও তোমার বর এর এই তৃষ্ণা কোনোদিন মিটবেনা মৌ বউ।”
মৌ লজ্জায় চোখ নামিয়ে নিল। সোহাগ তা দেখে মৃদুস্বরে বলল,
”তুমি চোখ নামিয়ে নিলে তোমার বর তোমার দু'চোখ দেখার তৃষ্ণায় ছটফটিয়ে ওঠে বউ!”
অতঃপর সোহাগ মৌ এর থুতনিতে হাত রেখে মৌ এর মুখ উপরে উঠালো। অতঃপর মৃদুহেসে মৌ এর চোখে চোখ রেখে বলতে লাগলো,
“শ্যাম্পুওয়ালা পেত্নী হোক বা তেলওয়ালা পেত্নী,
এই পেত্নীকে দেখেই আমার দিনটা ভালো কাটে,
আর না দেখলে মনে অশান্তির আগমন ঘটে।
বুঝলে?
তোমার সৌন্দর্য আমায় টানে না, আমার মন টানে তুমি মানুষটাতে। আর তুমি মানুষ মানেই আমার ব্যাক্তিগত হুরপরী, যার সৌন্দর্য বর্ণনা করার মতো শব্দই খুঁজে পাইনা আমি, যাই বলতে যাই তাই তো কম পরে যায়।
আমি মুগ্ধ হয়ে তোমার দিকে তাকিয়ে থাকি, অন্তরে অদ্ভুদ প্রশান্তির বন্যা বয়।
আর তোমায় দেখার ব্যাঘাত ঘটলে আমার মনে তীব্র খরার সৃষ্টি হয়।
তোমার মাঝে আল্লাহ আমার অন্তরে অফুরন্ত শান্তি রেখেছে। সবার চোখে বিশ্ব-সুন্দরী কারা হয় জানিনা। তবে আমার চোখে বিশ্ব-সুন্দরী তুমি, আমার মৌ বউ।”
অতঃপর মৌ কে টেনে কিছুটা কাছে এনে মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বলল,
“ঘুমাও।”
মৌ চোখ বুজে মৃদু হাসল। নিজেকে ভাগ্যবতী লাগছে। মানুষটার রাগ বেশি। রেগে গেলে কী-করে বুঝতে পারবেনা, কিন্তুু যখন স্বাভাবিক থাকে তখনকার মানুষটা ভীষণ সুন্দর, দেখতে সুন্দর! তা তো বটেই, তবে মনটা বেশি সুন্দর। ভাবতে ভাবতে কিছুক্ষণের মাঝেই ঘুমিয়ে গেল মৌ।
সোহাগ মৌ এর ঘুমন্ত মুখটার দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসল। মুখ কিছুটা তেলতেল হয়ে আছে। খারাপ তো লাগছেনা!
অতঃপর চোখ বুজে মনে মনে আল্লাহকে বলল,
“আল্লাহ তুমি আমাদের জীবনে শান্তি বজায় রেখ সারাজীবন। একসাথে হাতে হাত রেখে চলার তৌফিক দিও। সবকিছুর মালিক তো তুমিই। কবুল কর।”
★★
মনিরার অনেক জ্বর হওয়ায় মৌ পরদিন সকালে সোহাগের সাথে তার শ্বশুর বাড়ি যেতে চাচ্ছে না।
“তোমার আব্বু-আম্মু তো আছে বউ? তুমি আমার সাথে আজকেই যেতে!”
মৌ সোহাগের কথা শুনে ভ্রু কুঁচকে সোহাগের দিকে তাকালো।
সোহাগ তা দেখে বলল,
“কিছু বলবে?”
”আপনি বুঝতে পারছেন না। মনিরা কাল রাতে কিছু দেখে অনেক ভয় পেয়েছে। যার ফল এই জ্বর। আর আমি এ বাড়ি থেকে ওকে এভাবে রেখে গিয়ে একদমই শান্তি পাবো না। কালকে চলে যাব ইনশাআল্লাহ।”
”আচ্ছা আমি ৯ টার মধ্যে এসে তোমাকে নিয়ে যাব। সবকিছু গুছিয়ে রেখ। আজ আমার কাজ আছে। নয়তো শ্বশুর বাড়ি মধুর হাড়ি রেখে যেতাম না।”
মৌ বলল,
”আব্বু রেখে আসবে। আপনাকে আবার আসতে হবে না।”
”আমার বউ কে আমি-ই নিতে আসব।”
মৌ কোমড়ে দু-হাত রেখে বলল,
”তো আমি কী বলেছি আপনার বউ কে আরেকজন নিতে আসবে?”
সোহাগ মৌ এর দিকে এগিয়ে এসে সিরিয়াস মুখ করে বলল,
”নিজের বাবা৷ নয়তো আমার শ্বশুর আব্বা উল্লেখ করবা, নয়তো কিছুই বলবা না।”
মৌ ভ্রু কুঁচকে তাকালো সোহাগের দিকে। একটু আগেই তো হেসে কথা বললো। এতো সিরিয়াস হওয়ার মতো কী হলো? অতঃপর বলল,
“কী বলব না?”
“আরেকজন নিতে আসবে বললে কেন?”
মৌ কপাল চাপড়ালো। এটা তো সে এমনি ইয়ারকি করে বলেছে। অতঃপর হেসে বলল,
“আমি ফাজলামি করেছি।”
”আমিও ফাজলামি করে গার্লফ্রেন্ড এর কথা বলেছিলাম।”
মৌ এর হাসি হাসি মুখে আঁধার নামলো। সোহাগের কাপড় ভাজ করতে করতে বলল,
“আপনার কী গার্লফ্রেন্ড ছিল? কথায় কথায় এই ওয়ার্ড টাকে টেনে আনেন কেন?”
“না ছিল না। কিন্তুু তুমি অন্যজনকে ইয়ারকি করে টেনে আনলে আমিও আনব।”
মৌ কিছু বলল না। চুপচাপ সোহাগের শার্ট-প্যান্ট ভাজ করে ব্যাগে ভরতে লাগলো। সোহাগও কিছু বলল না। মৌ হিজাব পরে মুখ ঢেকে নিল। অতঃপর বলল,
”আসুন। আমি আম্মু-আব্বুকে ডাকছি।”
এই বলে মৌ ঘর থেকে বেরোতে গেলে সোহাগ মৌ এর সামনে গিয়ে দাঁড়ালো। মৌ সোহাগের সাথে ধাক্কা খেয়ে কিছুটা পিছিয়ে গেল।
চলবে ইনশাআল্লাহ..................