ফন্ট সাইজ:
থিম:
অগাস্টিনা রেইনবো

১ম পর্ব

লেখক: নুসরাত জাহান তীব্রতা

২৪ বছরের একটা মেয়ে হয়ে কিনা আমি ২১ বছরের একটা ছেলেকে বিয়ে করবো!তাও যে কিনা প্রতিবন্ধী । টাকার লোভে তুমি কি পাগল হয়ে গেছ আম্মু? তোমার ভাই একটা স্বার্থপর আম্মু। যেই তোমার ভাই বুঝলো তার ওই ছেলেকে এখন কেউ বিয়ে করবে না ওমনি আমাদের কথা মনে পড়লো আর ড্যাং ড্যাং করে চলে আসলো। আর তুমি টাকার লোভে এখন আমার কাছে এসেছো!" চিৎকার করে কথাগুলো বলে বেডের উপর দু'হাতে মাথা চেপে ধরে বসে পড়ল রেইন।‌গতকাল রাতেই জরুরিভিত্তিক মামার অসুস্থতার খবর পেয়ে তার মা সহ সে আর তার ভাই ছুটে এসেছে। তবে অসুস্থতার মধ্যেও যে লুকিয়ে ছিল এতো বড় ফাঁদ এটা ঘুণাক্ষরেও টের পেলে কখনোই আসতো না এখানে।‌

মিসেস সাবিনা রেগে গিয়ে মুখ খুললেন এবার। রেইনের দিকে তাকিয়ে তীক্ষ্ণ গলায় পাল্টা জবাব দিলেন,

-- রেইন তুমি ভুলে যেও না কার সাথে কথা বলছো! আমি তোমার মা হই। তোমার ভালোমন্দ সবকিছুই ঠিক করার দায়িত্ব আমার। তোমার ওখানে বিয়ে হলে তুমি সুখে থাকবে। আর প্রতিবন্ধী, প্রতিবন্ধী করছো কেন? ওর শুধু একটা এক্সিডেন্টে পা দুটো ভেঙে গেছে?আর তার পিছনে তুমিও কোন না কোনভাবে দায়ী। তাই এই বিয়ে তোমাকে করতেই হবে। আর বাকি রইল বয়স, বয়স কোন ম্যাটারই করে না। তোমার বাবার থেকে একবছরের বড় ছিলাম আমি। কই আমরা সংসার করি নাই ? "

-- এক্সিডেন্ট! এক্সিডেন্ট বলছো তুমি? নে*শা করে পুলিশের হাতে ধরা খেয়ে পালানোর সময় গাড়ির নিচে পড়ছে। তুমি তো কোনোকিছুতে তোমার পেয়ারে ভাইয়ের আর তার ছেলের দোষ খুঁজে পাও না আম্মু। " একটু থেমে নিজেকে ধাতস্থ করে শান্ত গলায় বলল,

-- আর, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে ওই ছেলেকে বিয়ে করে করে আমি আমার স্বপ্নকে বিসর্জন দিতে পারবো না। নওশাদ'কে বিয়ে করলে আমার পুরো ক্যারিয়ার নষ্ট হয়ে যাবে। মিডিয়ার লোকেরা ছি ছি করবে। আমার ৬ বছরের পরিশ্রম বৃথা যাবে। তোমার টাকা লাগলে আমাকে বলো আমি তোমাকে যেভাবেই হোক টাকার ব্যবস্থা করে দিবো তবুও আমার সাথে এই নোংরা খেলাটা খেলো না দয়া করে।"

সাবিনার মুখে অসন্তোষের ছাপ , এগিয়ে এসে রেইনের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে কঠোর গলায় বলল,

-- তোমার ওই মিডিয়ার জগত আমার ভালো লাগে না তুমি বুঝো না? ফালতু এক কাজ করো তুমি। কতজন মানুষ তোমার মতো পডকাস্টারের কাজ করে রেইন ? "

রেইন ধীর গলায় বলল,

-- কিন্তু ওটা আমার স্বপ্ন। "

সাবিনার চোয়াল শক্ত হয়ে গেল। রেইনের দিকে তাকিয়ে মেজাজ নিয়ন্ত্রণে রাখার বৃথা চেষ্টা করে বললেন,

-- তুমি যদি নওশাদ'কে বিয়ে না করো তাহলে আমি চলে যাবো যেদিকে দু'চোখ যায়। তোমার ভাইকে নিয়ে ট্রেনের নিচে ঝাঁপ দিবো।

কাঁচের মতো ভেঙ্গে নিংড়ে যাওয়া দেহটা টেনে হিঁচরে বিছানায় বসলো। হেরে যাওয়া পথিকের মতো ক্ষীন গলায় বলল,

-- বাবা চলে যাওয়ার পর থেকে প্রতিনিয়ত তুমি আমাকে ব্ল্যাকমেইল করেই যাচ্ছ। এটা না করলে ওটা করে ফেলবে, ম*রে যাবে, তোমার মৃ*ত্যুর জন্য আমি দায়ী থাকবো। আমাকে একটু শান্তি দেও প্লিজ। আমি বাঁচতে চাই।

সাবিনা মেজাজ হারালেন। ড্রেসিং টেবিলের উপর একটা ধাবা দিয়ে রাগ সংযত করার চেষ্টা করলেন। রেইনকে এখনও না মানতে দেখে হুঙ্কার দিয়ে বললেন,

-- এতো বছর খাইয়ে পড়িয়ে বড় করেছি এই শোনার জন্য? তুমি এখন আমাকে জ্ঞান দিচ্ছ ? আমার মুখে মুখে তর্ক করছো? তোমার বিয়ে তো আমি নওশাদের সাথে দিয়েই ছাড়বো। "

রেইন কিছু বলল না আর । চুপচাপ পাথরের মতো বসে থাকলো নির্জীব হয়ে। সে কিছু বললেও আর কাজ হবে না। তার মা একবার যখন বলেছে তো কারো কথা শুনবে না।

রেইনের দিকে তাকিয়ে সাবিনা এবার একটু ইমোশনাল হয়ে নরম গলায় বললেন ,

-- তোমার মামা আমাদের কত্ত উপকার করেছে তুমি জানো না? তোমার ভাই রিদ অসুস্থ ভুলে গেছ তুমি? তুমি যদি নওশাদ'কে বিয়ে করো তাহলে তুমি সুখী হবে, রাজরাণির মতো থাকবে। তোমাকে আর এতো কষ্ট করতে হবে না। তোমার ভাইয়ের ভালো একটা ভবিষ্যৎ হবে তুমি যদি বিয়েটা করো। অন্ততপক্ষে আমার আর রিদের কথাটা ভেবে তুমি বিয়েটা করে নাও। তোমার মামি মামা কতো ভালো। অন্তত আমার জন্যে হলেও বিয়েটা করো তুমি। আমার লক্ষী মা না তুমি। আমাকে একবার বিশ্বাস করে বিয়েটা করো। "

মায়ের মুখের এই কথাগুলো তীরের ফলার মতো বিঁধে রেইনের বুকে । কাজল কালো চোখদুটোতে যেন এক খন্ড কৃষ্ণসমুদ্র তৈরি হয়েছে, অশ্রুর ঢেউ নিরবে তীরে এসে আছড়ে পড়বে ভাব । সে ভাবতে পারছে না তার মা তাকে রাজী করানোর জন্য এসব পর্যন্ত বলবে । বিয়েটা সে করতো যদি না নওশাদ এমন চরিত্রহীন লম্পট হতো। কোন মেয়েই তার জীবনসঙ্গী হিসেবে চরিত্রহীন ছেলে চায় না।‌ কিন্তু তাদের এক কথা "ছেলেরা একটু ওমন হয়ই। মানিয়ে নিয়ে চললেই সব হয়। "

-- আমি একটু একা থাকতে চাই। তুমি এখন যাও। "

সাবিনা মেয়ের দিকে তাকিয়ে মাথায় হাত বুলিয়ে চলে গেলেন। যাওয়ার আগে বাইরে থেকে দরজাটা আটকে গেলেন যাতে বেরুতে না পারে।

রেইন দরজার দিকে নির্বিশেষে তাকিয়ে থাকলো কতক্ষন। তার মা তাকে বিশ্বাস করে না অথচ ওনাকে বিশ্বাস করে তাকে বিয়ে করতে বলছে , জেনেশুনে আগুনের গুহায় যেতে বলছে যেখানে গেলে নিশ্চিত সবকিছু পুড়ে ছাই হয়ে মাটির সাথে মিশে যাবে।

টেবিলের উপর কপাল ঠেকিয়ে অঝোরে কাঁদছে রেইন । গাল বেয়ে গড়িয়ে পড়া অবাধ্য অশ্রুধারা নিঃশব্দে ভিজিয়ে দিচ্ছে টেবিলের মসৃণ পৃষ্ঠ । এলোমেলো কেশরাশি আড়াল করে রেখেছে অশ্রুসিক্ত মুখশ্রী ।আর বুকের গভীরে সঞ্চিত অস্ফুট বেদনার ভারে ক্ষণে ক্ষণে কেঁপে উঠছে তার কোমল কাঁধ — মনে হচ্ছে দীর্ঘদিনের সঞ্চিত অভিমান আজ সমস্ত বাঁধ ভেঙে অশ্রুর স্রোতে নিঃশেষ হয়ে যেতে চাচ্ছে।‌

হঠাৎ সেই নিস্তব্ধতার বুক চিরে সশব্দে ফোনটা বেজে উঠলো ঘরের সবকিছুকে কম্পিত করে। ক্রন্দনরত মুখটা তুলে কম্পনের উৎসের খোঁজ চালালো নিষক কালো কৃষ্ণগহ্বরের মতো অক্ষিপট নিবিষ্ট করে। সমস্ত মনোযোগ ক্ষুন্ন হলো, কান্নায় ব্যাঘাত ঘটলো তীব্র স্বরে ফোন বাজার শব্দে । রেইন মোমের মতো মোলায়েম চরণপৃষ্ঠ ভূমিতলে দাপিয়ে ফোনের সন্ধান চালালো। ইশশ! ফোনের কথা তার একটুও মনে ছিল না। আর ভাগ্যিস তার মা'ও ফোনটা নিয়ে যায়নি।

বামহস্তে চোখের পানি মুছে দ্রুত ফোনটা হাতে নেয় রেইন। স্কিনে হোস্টের নামটা দেখে চোখে পানি নিয়েও মৃদু হাসলো রেইন। কাঁপা কাঁপা হাতে ফোনটা রিসিভ করে সালাম দিলো রেইন।

-- আসসালামুয়ালাইকুম স্যার।

-- ওয়ালাইকুম সালাম। রেইন, তুমি কি ব্যাস্ত আছো এখন? আসলে তোমার সাথে কিছু গুরুত্বপূর্ণ কথা ছিল।

-- জ্বী স্যার বলেন।

-- আসলে বিরাট একটা মিস্টেক হয়ে গেছে। তুমি তো জানো Le Grand Grimoire বইয়ের রিসার্চের জন্য তোমার সিনিয়রের কাল ফ্রান্স যাওয়ার কথা। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত সে এক্সিডেন্ট করে হাসপাতালে ভর্তি আছে এই মুহূর্তে। তুমি কি এখন তার বদলে যেতে পারবে ফ্রান্সে? "Bibliothèque nationale de France" লাইব্রেরি থেকে স্পেশালভাবে পার্মিশনও নেওয়া হয়েছে রিসার্চের জন্য। তুমি কি যেতে পারবে? সব খরচ কোম্পানি দিবে। "

রেইন কিছু একটা ভেবে ধীর গলায় বলল,

-- কিন্তু স্যার ফ্লাইটের সবকিছু কি একদিনে করা সম্ভব হবে?"

-- সেটা আমার উপর ছেড়ে দাও। তোমাকে আমি কিছু ডকুমেন্টের কথা বলছি সেসব নিয়ে আসো জলদি।

রেইন গভীর ভাবনায় পায়চারি করতে করতে দাঁত দিয়ে নখ খুঁটছে। চিন্তায় তার কপালে ভাঁজ সৃষ্টি হয়েছে।

-- আচ্ছা স্যার।

-- আর ভালো কথা, তোমার Schengen visa'র কাজ সম্পূর্ণ হয়েছিল তো। এটা না হলে যেতে পারবে না।

-- হয়েছে স্যার। "

" রেইন কার সাথে কথা বলছিস তুই?" মিসেস সাবিনা দরজা খুলে খাবারের প্লেট হাতে নিয়ে প্রবেশ করতে করতে জিজ্ঞেস করল ‌ মায়ের গলার আওয়াজ পেয়ে রেইন দ্রুত কলটা কেটে হাতটা পিছনে লুকিয়ে ফেলে। কপালের শিরদাঁড়া বেয়ে ঘাম গড়িয়ে পড়ছে ভয়ে। ফ্যানের বাতাসের মধ্যেও তরতর করে ঘামছে আর মৃদু কাঁপছে। কম্পিত গলায় তোতলাতে তোতলাতে বলল,

-- ক..কই ক..কিছু না তো মা..মাআ !"

প্লেট টি-টেবিলের উপর রেখে রেইনের দিকে সন্দিহান দৃষ্টিতে তাকায় সাবিনা। তা দেখে রেইন জোর করে টেনে মুখে হাসি ফুটালো । রেইনকে এমন করতে দেখে ভ্রু কুঁচকে বলে,

-- এমন তোতলাচ্ছিস কেন আর কথা বলছিলি কার সাথে?"

-- একা একাই বলছিলাম।

-- তোর হাতে কি? বারবার এমন ঘুরে যাচ্ছিস কেন?"

মায়ের তীর্যক দৃষ্টি দেখে রেইন থতমত খায়। কথা ঘুরাতে মেকি হেসে বলল,

-- আমার কথা বাদ দাও কিন্তু তোমাকে এমন হাসি খুশি লাগছে কেন ! ব্যাপার কি?"

মিসেস সাবিনার মুখে এবার বিস্তার হাসি ফুটে উঠলো। খুশিতে গদগদ হয়ে বললেন,

-- তোর মামার সাথে আমি বিয়ে নিয়ে সবকিছু পাকাপোক্ত করে এলাম। কালকে রাতেই ঘরোয়াভাবে তোদের বিয়ে হবে। তোর মামা তো সেই খুশি আমি যখন বলেছি তুই রাজি হয়েছিস। তাইতো আর দেরি না করে কালকেই বিয়ের ডেট দিলো। "

শুভ্র পবিত্র মুখখানা শুকিয়ে যাওয়া ফুলের মতো মলিন হয়ে গেল এক নিমিষেই। একটু আগেও যেখানে হাসি ফুটেছিল এখন সেখানে ভর করেছে রাজ্যের মলিনতা। রেইন আর কিছু বলল না। মিসেস সাবিনা প্লেটে খাবার দেখিয়ে বলল,

-- খেয়ে নে । সব তোর পছন্দের। "

রেইনের মধ্যে বিশেষ আগ্রহ দেখা গেল না। ঢলে পরা মন নিয়ে সাবিনার দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল।

-- মা তোমার কাছে শেষবারের মতো কিছু চাইলে দিবে?"

প্রশ্নটা শুনতেই মিসেস সাবিনা মুখ থেকে হাসিটা সরে গেল। বিলম্বিত মুখ নিয়ে রেইনের দিকে তাকিয়ে বলল,

-- চাওয়ার মতো হলে অবশ্যই দিবো। "

-- আমি একটু স্টুডিওতে যেতে চাই আজকের মতো। দয়া করে আমাকে যেতে দাও। আর কখনো কিছু চাইবো না। ভয় পেয়ো না পালিয়ে যাবো না। "

রেইনের কথায় পুরোপুরি আশ্বস্ত হতে পারলেন না সাবিনা তা চুপসানো মুখটা দেখেই বুঝলো রেইন।

-- আম্মু শেষবারের মতো যেতে দাও প্লিজ। আমি হাত জোর করে অনুরোধ করছি। আর কখনো কিছু চাইবো না। তোমার কথামতো সব করবো।

-- সত্যি তো!"

-- হ্যা।

-- আচ্ছা তাহলে রেডি হয়ে নিচে আয়। আমি সাথীকে বলছি। ওকে নিয়ে যাবি আর তাড়াতাড়ি ফিরবি। "

সাথীর কথা শুনে রেইনের মুখ গুমড়া হয়ে গেল। সাথী তার মামাতো বোন। বয়সে তার থেকে ছোট হলেও তাকে একদম সহ্য করতে পারে না। কিন্তু কিছু করার নেই। তাকে এখন কেউ বিশ্বাস করবে না, তাই বাড়ি থেকে বের হতে হলে সাথীকে নিয়েই যেতে হবে।

সাবিনা চলে যেতেই রেইন দ্রুত তার ব্যাগ খুলে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র নিয়ে নেয়। ভাগ্যিস কাল কি মনে করে সঙ্গে এনেছিল। এখন কাজে লেগে গেল। রবের দরবারে শুকরিয়া আদায় করে রেইন দ্রুত কাপড় চেঞ্জ করে একটা লাল সবুজ আর অফ হোয়াইট স্যালোয়ার পরে গলায় একটা ওড়না ঝুলিয়ে বেরিয়ে পড়লো।

______

রাতটা কোনমতে কাটিয়ে দেয় রেইন। সকাল থেকে আবার তাকে নিয়ে হইচই পড়ে সারা বাড়িতে। পুরো বাড়ি হালকাপাতলা সাজানো হয়েছে। আত্মীয়-স্বজন কিছু কালকে এসেছে, এখনও আনাগোনা লেগেই রয়েছে। মোটামুটি বিয়ে বাড়ির আমেজ তৈরি হয়েছে বাড়িতে। রান্নাবান্না, ডেকোরেশনের কাজ চলমান এখনও। বিয়েটা ঘরোয়াভাবে হলেও আত্মীয় স্বজন সবাইকে নিমন্ত্রণ করা হয়েছে। সেক্ষেত্রে বেশ ভালো একটা সংখ্যা দাঁড়িয়েছে।

রেইনকে মেহেদী পড়িয়ে দিয়েছে তার খালাতো, মামাতো বোনেরা। কোন কিছুতে স্বায় না থাকলেও মুখ বুজে সব সহ্য করে নিচ্ছে রেইন। আবার কখনো কখনো মুখে মেকি হাসিও ফুটাতে হচ্ছে পরিস্থিতির জন্য।

দুপুর বারোটায় রেইনকে গোসল করিয়ে একটা রুমে জিরাতে দেওয়া হয়। সেসময় রেইন তার ভাইয়ের সাহায্য নিয়ে হোস্টের সাথে যোগাযোগ করেছে। ওদিকে সব রেডি। রাত আটটায় তার ফ্লাইট। সুযোগ বুঝে তাকে পালিয়ে যেতে হবে। তার ফোন ইতিমধ্যেই তার মা নিয়ে গেছে গতকাল ফিরে আসার পরই। তাই চাইলেও সবকিছু করতে পারছে না।

রেইন কল কাটার পরেই তার খাবার নিয়ে আসে তার খালাতো বোনেরা। কিছু খেতে না চাইলেও সবার জোরাজুরিতে বাধ্য হয়েই অল্প একটু মুখে তুলে। সকাল থেকে মায়ের সাথে তার বেশি একটা দেখা হয়নি। খাবার খাওয়ার পরই পার্লারের লোকেরা তাকে সাজাতে শুরু করে। মহা বিরক্ত হয় রেইন কিন্তু তার কথা কেউ শুনে না।

অবশেষে বিকাল চারটায় তাকে সাজানোর কাজ শেষ হলে সবাই হুড়মুড়িয়ে পড়ে ছবি তুলতে।

দুধে আলতা তার গায়ের রং । টানা টানা হরিণী অক্ষিপল্লব দুটো কাজল কালো কৃষ্ণগহ্বরে অন্তিনির্হিত । চারপাশে উত্থান পতন ঘটানোর জন্য তার দেওয়া একটা মুচকি হাসিই যথেষ্ঠ। কালো কুচকুচে চুলগুলো কোমর সমান। উচ্চতা তার ৫'৫"। মাঝামাঝি গড়নের ছিমছিমে পাতলা একটা শরীরে যেন রাজ্যের সৈন্দর্য আর মায়া মিশে আছে একাকার হয়ে।

রেইনের দিকে একবার তাকালে চোখ ফেরানো দায় হয়ে পড়ে। রেইন এতোই সুন্দর যে যে তাকায় সে শুধু তাকিয়েই থাকে।

_____

রেইনের পুরো নাম ঝিনুক জাহান রেইন। বাবা ইন্তেকাল করেছেন বছর পাঁচেক আগে। মা সাবিনা ইয়াসমিন। পেশায় একজন গৃহিণী। রেইনের ছোট ভাই রিদ এহসান। বয়স সবে ১০ বছর।

/______

ফটোশুটের এক পর্যায়ে রেইনের মা তার সাথে দেখা করতে আসেন।‌রেইন তখন শুধু নির্বিশেষে সরল মুখটার দিকে তাকিয়ে ছিল। আজকের পর তাকে নিয়ে কানাঘুষা শুরু হবে, তা মা তাকে কি নজরে দেখবে সে ভালোই জানে। সবকিছু জেনে সে এই রিস্ক নিতে রাজি হয়েছে। এছাড়া আর উপায় নেই। অন্ততপক্ষে ওই নওশাদকে বিয়ে করার থেকে সারাজীবন আইবুড়ো থেকে যাওয়া অনেক ভালো।

রেইনের বাসা থেকে বেরোতে বেরোতে প্রায় সাড়ে ছয়টা বেজে যায়। মাগরিবের আযানের সময় সবাই তাকে একটু নামাজ পড়ার জন্য রুমে দিয়ে গিয়ে বাইরে থেকে দরজা আটকে দিয়েছিল। আর ঠিক সেময়ই রেইন একটা কালো বোরখা পরে কিছু জামাকাপড় নিয়ে বাড়ির পিছনের গেইট দিয়ে পালিয়ে গেছে। এই বোরখা জোগাড় করতে গিয়েই আরেক ঝামেলার মুখে পড়তে হয়েছিল তাকে। সেজন্যই এতো দেরি হয়েছে আসতে ‌ । এখন সময়মত পৌঁছাতে পারলেই হলো।

রেইন সর্বশক্তি দিয়ে জোরালো গতিতে দৌড়াচ্ছে। ফ্লাইট ছাড়ার আর মাত্র চার মিনিট আছে।‌রাস্তায় জ্যামে পড়েছিল তাই পৌঁছাতে এতো দেরি হয়ে গেছে। তখন বাসা থেকে পালিয়ে আগে স্টুডিওতে গিয়েছিল। সেখানে সবকিছু ঠিকঠাক করে বোরখা খুলে বিয়ের শাড়িতেই বেরিয়ে এসেছে।সে ভেবেছিল শাড়ি খুলে কোন কমফোর্টেবল কাপড় পড়ে বেরোবে কিন্তু সময়ের অভাবে তা সম্ভব হয়নি। রেইনকে এভাবে দেখে অবাক হলেও কারোর কিছু জিজ্ঞেস করার মতো সময় ছিল না। তাই মনে এতো প্রশ্ন থাকা সত্ত্বেও কেউ কোন উত্তর পায়নি।

রেইন লাগেজ হাতে প্রাণপণে দৌড়ে বিমানের কাছে পৌঁছায়। বোর্ডিং গেট প্রায় বন্ধ করেই গ্রাউন্ড স্টাফরা। মূলত বিমান ছাড়ার ১৫-২০ মিনিট আগেই বোর্ডিং গেট বন্ধ করা হয় তবে রেইনের জন্য এতোক্ষণ এটা খুলে রাখা হয়েছিল। বিমান উড্ডয়নের সময় হয়ে যাওয়া এখন তা প্রায় বন্ধ হয়েই গেছিলো সেসময় দৌড়ে রেইন এসে সামনে দাঁড়িয়ে অনুরোধ করে তাকে ঢুকতে দেওয়ার জন্য। গ্রাউন্ড স্টাফরা রেইনের এতো জোরাজুরিতে তার বোর্ডিং পাস পরীক্ষা করে দ্রুত কেবিন ক্রুকে জানালো।

কেবিন ক্রু থেকে স্পষ্ট নাকচ করে দিলে রেইন হাঁপাতে হাঁপাতে কান্নারত গলায় বলল,

--- Please let me board. I am very late. I am sincerely sorry. It is very important for me if you would let me board the plane.

[প্লিজ আমাকে উঠতে দিন। আমি খুব দেরি করে ফেলেছি। আমি আন্তরিক ভাবে দুঃখিত। আমার জন্য এটা খুবই দরকার যদি আমাকে বিমানে উঠতে দিতেন। ]

-- Sorry maam. The captain has a direct ban. You've been waiting for a long time. The pilot is very angry with you.

[ দুঃখিত ম্যাম। ক্যাপ্টেনের সরাসরি নিষেধাজ্ঞা আছে। আপনার জন্য এমনিতেই অনেক অপেক্ষা করা হয়েছে। পাইলট আপনার উপর রেগে আছে অনেক। ]

-- Please.

-- No, I'm sorry.

কোনভাবে না মানাতে পেরে রেইন এবার লাগেজ রেখে দ্রুত বিমানের সামনে গিয়ে দাঁড়ায়। গ্রাউন্ড স্টাফ দ্রুত চেঁচিয়ে উঠে রেইনকে সরতে বলে কিন্তু রেইন বলে তাকে উঠতে দেওয়া না হলে সে নড়বে না।

বোর্ডিং স্টাফ দ্রুত আবার কেবিন ক্রুকে জানালো সমস্ত ঘটনা। বিমানের ক্যাপ্টেন "লিব্র আর্থার" বিমানের কাঁচ দিয়ে রেইনের এমন কর্মকান্ডে বিরক্ত হয় এবং সেই রাগে রেগেও যায়। একে তো রেইনের পোষাক আবার রেইনের কাজ তাকে খুবই রাগীয়ে দিচ্ছে।

-- Crazy girl.

লিব্র দ্রুত গ্রাউন্ড স্টাফকে চেঁচিয়ে বলে,

--- Is this girl crazy? Does she think the plane is a toy? What kind of crazy person is she? What else can I say about her? Everyone in this country is such a disaster. No sense of timing, no rules. Nonsense.

[ এই মেয়ে কি পাগল? ও কি বিমানকে কোন খেলনা ভেবেছে? কোথাকার কোন পাগল উনি? ওনার কথা আর কি বলবো এদেশের সবাই কেমন ডিজাস্টার । কোন টাইমিং সেন্স, কোন নিয়ম কিছু নেই। ফালতু। ]

-- Let it get on the plane anyway, nonsense.

[ যাইহোক একে বিমানে ঢুকতে দাও, ননসেন্স। ]

বোর্ডের অনুমোদন পেয়ে গ্রাউন্ড স্টাফ দ্রুত রেইনকে জানালে রেইন দৌড়ে চলে আসে।

চলবে?

#অগাস্টিনা_রেইনবো

#নুসরাত_জাহান_তীব্রতা

#সূচনা_পর্ব

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ১ম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন