#অগাস্টিনা_রেইনবো
#পর্বসংখ্যা_০২
#নুসরাত_জাহান_তীব্রতা
🚫 অনুমতি ব্যতীত কপি করা নিষিদ্ধ 🚫
“Dubai International Airport” ( DXB ) পৃথিবীর বিলাসবহুল আভিজাত্যেপূর্ণ এয়ারপোর্টের একটি। মরুর বুকে গড়ে ওঠা এক ঐশ্বর্যমণ্ডিত আধুনিক রাজপ্রাসাদ এই এয়ারপোর্ট। সুবিশাল প্রাঙ্গণ জুড়ে ছড়িয়ে থাকা অপূর্ব স্থাপত্য , কাঁচ ও ধাতুর নিখুঁত কারুকাজ, মৃদু সোনালী আলোর আবেশ আর চারপাশের রাজকীয় জৌলুস–সব মিলিয়ে প্রতিটি কোন যেন বিলাসিতার নিজস্ব গল্প বলে । ছাদের নিচে মানুষের ব্যস্ত পদার্পন আর ফিসফিস করে বলা কথাগুলো চারপাশের পরিবেশকে ভারী করে তুলেছে। তবুও এর সৈন্দর্য এতোই মনোমুগ্ধকর আর চোখ জুড়ানো যে কেউ একবার তাকালে অবাক হয়ে তাকিয়েই থাকে।
"Air France" ফ্রান্সের একটা পরিচিত এবং জনপ্রিয় এয়ারলাইন। এই বিমানেই বাংলাদেশ টু প্যারিস যাত্রা করছে রেইন। বাংলাদেশ থেকে উড্ডয়নের পর দীর্ঘ ছয় ঘন্টার আকাশযাত্রা শেষ করে মধ্যরাতের সময় বিমান দুবাইয়ের রানওয়েতে অবতরণ করলো। দুবাইয়ের টাইমে তখন রাত বারোটা। আর বাংলাদেশ সময়ে রাত দুইটা।
অবতরণের প্রায় দুই ঘন্টা পর "এয়ার ফ্রান্স" এয়ারলাইন পুনরায় দুবাই থেকে প্যারিসে যাত্রা শুরু করবে। রেইন এই দু'ঘণ্টা দুবাই এয়ার পোর্ট ঘুরে দেখতে দেখতেই কাটিয়েছে। সময় যে কীভাবে ফুরিয়ে গেছে তা টেরও পায়নি সে। প্লেন ছাড়ার সময় হয়ে আসলে কারেন্সি এক্সচেঞ্জ করে শুধু একটা কফি আর হালকা পাতলা খাবার কিনে দ্রুত ফিরে এসেছিল।
সিটে মাথা হেলিয়ে চোখ বন্ধ করে টেনে লম্বা একটা শ্বাস টানলো। ফ্লাইট ছাড়ার সময় হয়ে এসেছে। রেইনের পরনে এখনো বিয়ের শাড়ি আর দুপাট্টা। ডাগর ডাগর হরিণী চোখ জোড়ায় কাজল দেওয়া। মুখের ভারী মেকাপ আগেই তুলে ফেলেছিল। রেইনের ভাবনার মধ্যেই ককপিট থেকে ক্যাপ্টেনের শান্ত, আত্মবিশ্বাসী আর পেশাদার কন্ঠ শুনতে পেল ।
-- "Ladies and gentlemen, welcome aboard. This is your Captain, "Libro Arthur" speaking.
We will be departing for Paris shortly.
Please fasten your seatbelts, return your seats to the upright position, and follow all safety instructions.
We wish you a pleasant and enjoyable flight."_*
[“সম্মানিত যাত্রীবৃন্দ, আপনাদের স্বাগতম। আমি আপনাদের ক্যাপ্টেন , লিব্র আর্থার । আমরা কিছুক্ষণের মধ্যেই গন্তব্যের উদ্দেশ্যে উড্ডয়ন করতে যাচ্ছি। অনুগ্রহ করে সিটবেল্ট বাঁধুন, আসন সোজা করে রাখুন এবং নিরাপত্তা নির্দেশনাগুলো অনুসরণ করুন। আপনাদের যাত্রা শুভ ও আনন্দময় হোক।”]
পরপর ইংরেজি এবং ফরাসি দুটো ভাষায়ই ক্যাপ্টেন অভিনন্দন জানালো সবাইকে। রেইন কফির কাপ নিয়ে চুমুক বসালো আর ভাবলো ক্যাপ্টেনের কন্ঠস্বরে একটু বেশিই গাম্ভীর্যভাব ছিল। যাত্রীদের সাথে কেউ এমন ভয়েজে কথা বলে? অন্ততপক্ষে একটু নমনীয় সুরে তো বলা যায়। এমন অনেক যাত্রী আছে যাদের প্রথম বিমানে ওঠা তারা তো এমন কন্ঠস্বর শুনে আশ্বস্ত হওয়ার বদলে ভয়ই পাবে। যদিও লিব্র অনেক আত্মবিশ্বাসের সুরে বলেছে তবুও রেইনের কাছে তার গাম্ভীর্যের কারণে আত্মবিশ্বাস চাপা পড়ে গেল। ক্যাপ্টেনকে নিজের চোখে না দেখলেও তার গম্ভীর ভয়েস শুনে মনে মনে কল্পনা করে নিল ক্যাপ্টেন চেহারাটা–একটা ভুঁড়িওয়ালা, পেটমোটা, টাকলা ব্যাটা হবে। যার মধ্যে রসকষ কিছুই নেই।
দুবাই থেকে প্যারিসের আকাশ যাত্রা প্রায় সাড়ে সাত ঘন্টার। এই সময়ের মধ্যে দুবার খাবার দেওয়া হয়েছে। দীর্ঘ এই যাত্রা শেষ করে বিমান অবশেষে প্যারিসের *Charles de Gaulle Airport* এর রানওয়েতে অবতরণ করে। ফ্লাইট থেকে ক্লান্ত দেহে নেমে পড়ে রেইন। এতো ধকল আর দীর্ঘ যাত্রাতে তার শরীর ঢলে পরেছে।
এয়ারপোর্টটা বেশ চাকচিক্যে ভরপুর। অভিজাত পূর্ণ ব্যাক্তিদের বসবাস ফ্রান্সে। হাজার হাজার মানুষের আনাগোনা লেগে আছে এয়ার পোর্টের ভিতরে। নিরাপত্তাকর্মী, পুলিশ সেনারা সবকিছু তদারকি করছে ভালোমতন।
সূর্যের কড়া রোদের তাপ এসিপূর্ণ এয়ারপোর্টের ভিতরে অনুভব না করা গেলেও কাঁচ ভেদ করে পৌঁছানো আলোতেই তা আন্দাজ করা যাচ্ছে।
এখন প্যারিসের সময়ের ভোর সাতটা আর বাংলাদেশের সময়ের বেলা এগারোটা চলছে। বিমানে রেইন বেশি একটা ঘুমাতে পারে নাই। তাই মেজাজ কিছুটা বিক্ষিপ্ত।
ইমিগ্রেশনের সম্পুর্ণ কাজ শেষ করে লাগেজ কালেকশন করতে করতে অলরেডি সাড়ে নয়টা বেজে যায়। ক্লান্ত দেহে রেইন লাগেজ নিয়ে ইমিগ্রেশন সাইড থেকে বেরিয়ে আসে। তার এখন সর্বপ্রথম এবং সর্বপ্রধান কাজ হচ্ছে সিম কেনা। এয়ার পোর্ট থেকে কারেন্সি এক্সচেঞ্জ করে নিয়েছে, এতে আপাতত কোন সমস্যা হবে না। বেশকিছু দিন ভালোভাবেই চলে যাবে।
লাগেজ নিয়ে বাসের টিকিট কাটার জন্য বাসস্টপের দিকে এগিয়ে যায় রেইন। বিমানবন্দরের নির্দিষ্ট কাউন্টার থেকে গন্তব্যের বাসের টিকিট নিয়ে নির্ধারিত স্টপেজে এসে দাঁড়াল।বাস ছাড়ার আর কিছুক্ষণ সময় আছে তাই আশেপাশে একটু ঘুরে দেখতে কৌতুহলী মনে হাঁটতে থাকল। বাসস্টপের উল্টোপাশে গাড়ির পার্কিং এড়িয়া। সারি সারি গাড়ি শা শা করে চলাচল করছে। রেইন অবাক বিষ্মায়িত নয়নে সবকিছু পর্যবেক্ষণ করছে। এদেশের মানুষের একজন আরেকজনের দিকে তাকানোর মুরদ পর্যন্ত নেই। সবাই সবার নিজের মতো চলছে। আশেপাশে কে মা*রা গেল কিংবা মা*রামা*রি লাগতো তাতে বিশেষ আগ্রহ নেই এদের।
রেইন আশেপাশে তাকিয়ে হাঁটতে হাঁটতে একটা গাড়ির কাছে পৌঁছাতেই লক্ষ্য করলো গাড়ির মধ্যে থাকা একটা যুবক তার দিকে হা করে তাকিয়ে আছে। রেইনের দৃষ্টি খাড়া হয়, দ্রুত পথ পরিবর্তন করে চলে আসলে নিলে পিছন থেকে কেউ ফ্লার্টিং স্বরে বলল,
-- হেই বিউটিফুল লেইডি । ইউ আর সো হট এন্ড সে**** ।"
দাঁতে দাঁত চেপে রাগ সংযত রাখার বৃথা চেষ্টা চালালো রেইন। কোন ঝামেলা চায় না বিধায় রাগ নিয়ন্ত্রণ করছে।
বেশভূষায় সুদর্শন যুবকটাকে একজন ক্রিকেটার লাগছে। ছেলেটার পরনের সাদা ফুলহাতা টিশার্টের উপর ফ্রান্স লেখা। বামহাতের বগলের নিচে একটা ক্রিকেট ব্যাট ধরে রেখেছে।
-- What's your name beautiful lady?"
রেইন এবারেও জবাব দিলো না। রাগে নাকের পাটা ফুলে গেছে। সূর্যের আলো সরাসরি রেইনের মুখের উপর তীর্যকভাবে পড়তে তাতেও বিরক্ত সে। নাকের পাটা ফুলিয়ে চোখ গরম করে তাকিয়ে আছে।
ছেলেটা ফিচেল হাসলো। দু'পাশে দু'টো গজদাঁতে হাসির সৈন্দর্য যেন দ্বিগুন বৃদ্ধি পেয়েছে। ছেলেটার চেহারা যেমন সুন্দর দাঁত তার থেকেও বেশি সুন্দর। সাদা ধবধবে দাঁতগুলো বেশি বড়ও না আবার একেবারে ছোটও না। তবে অদ্ভুত ব্যাপার হচ্ছে ছেলেটার সামনের সবগুলো দাঁত সমান।
-- হেই আ'ম লিওন অ্যারন। আ্য ফ্রেঞ্চ ক্রিকেটার। "
-- ইউ আর ভেরি বিউটিফুল। আই ফেল ইন লাভ উইথ ইউ অ্যাট ফার্স্ট সাইট। হোয়াট ইজ ইয়োর নেম?”
--- “ইউ আর সাচ অ্যান অ্যানয়িং বয়!” রেইন বিরক্তি সহকারে কথাটা পুনরায় চলে যেতে উদ্যত হলো।
-- Why are you ignoring me? Do you know how many girls are crazy about me? Do you have any ideas?" [ তুমি আমাকে ইগনোর করছো কেন? তুমি জানো আমার জন্য কত মেয়ে পাগল? তোমার কোন আইডিয়া আছে ! ]
রেইনের পদযুগল থেমে গেল অযেহেতুক কথাবার্তায়। পিছনে ফিরে এগিয়ে এসে ছেলেটার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে সোজাসাপ্টা বলল,
-- "What does it matter to me whether you are a cricketer or a Home Minister? And what does it matter to me whether a girl or a boy follows you? Don't bother me anymore! Then I will be forced to take action against you."
[আপনি ক্রিকেটার হোন কিংবা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী তাতে আমার কি? আর আপনার পিছনে মেয়ে ঘুরুক বা ছেলে এতে আমার কি? আমাকে আর বিরক্ত করবেন না আপনি! তাহলে আমি আপনার বিরুদ্ধে অ্যাকশন নিতে বাধ্য হবো। ]
ছেলেটার ফর্সা মুখশ্রীতে থমথমে ভাব বিরাজ করলো সর্বত্র। এরকম প্রত্যাখ্যান তার ভাবনায় ছিল না কিংবা কখনো কারো কাছে থেকে প্রত্যাখ্যান হয়নি বোধহয়! রেইনের অবশ্য এতে মাথাব্যথা নেই। ছেলেটাকে বিষ্ময়পূর্ণ মুখশ্রীতে রেখেই বামহাতে লাগেজ টেনে বাসে পৌঁছানোর পণ করলো।
কিছুটা অগোছালো আর ধীরস্থির পায়ে এগুতেই তৃতীয়বারের মতো সেই একই গাম্ভীর্য পূর্ণ স্বরটা শুনতে পেলে দ্বিধাদ্বন্দ্ব নিয়ে চট করে পিছনে ফিরে তাকালো।
তাকে বিরক্ত করা সুদর্শন ছেলেটা আরেকটা ছেলের সাথে রাগান্বিত মুখে কথা বলছে। রেইন কিছুটা কৌতুহল নিয়ে সেই লোকটার মুখ দেখার জন্য উঁকিঝুঁকি দিয়েও হতাশ হলো। উল্টোদিকে ঘুরে তাকিয়ে শাসিয়ে কিছু একটা বলছে বোধহয় ওই লিওনকে।
এক মুহুর্তের জন্য ওই সাদা শার্টের সাথে কালো ফরমাল প্যান্ট পরা ছেলেটাকে তার ক্যাপ্টেন মনে হয়েছিল। অবিকল সেই গলার স্বর, কথা বলার স্টাইল। সব কথাগুলো স্পষ্ট শুনতে না পেলেও রাগান্বিত সুরে বলা কথাগুলো রেইনের কানে ঠিকই ভেসে আসছে।
ছেলেটাকে একপলক দেখার আগ্রহ ধামাচাপা দিয়ে রেইন নিজের গন্তব্যের উদ্দেশ্যে স্থির মনোনিবেশ করলো।
ফোঁস করে একটা শ্বাস ফেলে কাঙ্ক্ষিত বাসে গিয়ে উঠে বসলো। জানালার পাশে সিট না পাওয়ায় তার মন কিছুটা খারাপ। তার আশা ছিল প্যারিস শহরটাকে দেখবে কিন্তু তা আর হলো কই!
বাস ছাড়ার পাঁচ মিনিট বাকি আছে। যাত্রীরা সবাই নিজেদের নির্ধারিত স্থানে বসে কানে এয়ারফোন লাগিয়ে গান শুনছে। প্রায় ৮০% মানুষের কানেই হেডফোন অথবা এয়ারফোন আর বাদ বাকিরা বই পড়ছে। কোন কোলাহল নেই, কোন বিজ্ঞাপনের শব্দ নেই, কেউ হইচই করছে না। জনমানবহীন কোন দ্বীপের মতোই শান্ত বাসের পরিবেশ।
-- Excuse me. Can you hear me, miss?
[ অনুগ্রহ করে আপনি কি আমাকে শুনতে পাচ্ছেন মিস?]
আচমকা অতি সন্নিকটে কারো রাশভারী কন্ঠে ভাবনাচ্যুত হয়ে ডাগর ডাগর অক্ষি মেলে উপরে তাকাতেই অবাক হলো! এতো সেই ক্রিকেটার মতো গড়ন যে তাকে একটু আগে বিরক্ত করছিল। মাস্কের আড়ালে মুখটা না দেখতে পেলেও ছেলেটার সম্পূর্ণ গড়ন সেই ক্রিকেটারের অবিকল। রেইন কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে ছেলেটার আগাগোড়া অবাক চোখে পর্যবেক্ষণ করলো। একটু আগেই তো ক্রিকেটার পোষাক পরে ব্যাট হাতে দাঁড়িয়ে ছিল তবে এখন এই পোষাকে? তারচেয়েও বড় কথা ওত দামী গাড়ি ছেড়ে বাসে কি করছে? তার পিছু পিছু চলে আসে নি তো?
-- ইউ!" অবাক হয়ে বলল রেইন।
-- হোয়াট!" দৃঢ় কন্ঠে জবাব দিলো। স্বরটা কিছুটা সেই পাইলটের মতো। ছেলেটার ভাবভঙ্গি এমন তাকে যেন চেনেই না! অথচ একটু আগেও দিব্যি তার সাথে ফ্লাট করছিল। তবে.. রেইন আর কিছু ভাবতে পারলো না। তার ভুল হতে পারে। সেই ছেলেটার ভয়েজ এমন না। তবুও একটা কিন্তু থেকে যায়।
রেইন পুনরায় জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকালো। ছেলেটার মুখে একটা ওয়ান টাইম কালো মাস্ক, মাথায় কালো একটা ক্যাপ ভ্রু পর্যন্ত নামানো। ছেলেটার সাথে চোখাচোখি হতেই ভারী আশ্চর্য হলো। চোখের মণি নীল রঙের। চোখের বাইরের কোণ সামান্য সরু হওয়ায় এধরনের চোখকে তীক্ষ্ণ বা গভীর দৃষ্টির চোখও বলে। নয়নের উপর যেন নিপুণ হাতে আঁকা দুটি কৃষ্ণধনুক—ঘন, সুগঠিত ভ্রুযুগল। রেইন বেশিক্ষণ সেই তীক্ষ্ণ চোখজোড়ায় তাকিয়ে থাকতে পারলো না। চোখ নামিয়ে নিল। তারই ভুল হয়েছে। লিওনের চোখের মণি হালকা বাদামী আর এই যুবকের নীল।
--The seat next to you is mine, so if you could give me a little side!
[ আপনার পাশের সিটটা আমার, তাই যদি একটু সাইড দিতেন!]
বিরক্তমাখা কন্ঠস্বর শুনে রেইন কিছু না বলে চুপচাপ চেপে বসে।
বাস এগিয়ে চলছে সমান্তরাল প্রশস্ত রাস্তাটা দিয়ে। রাস্তার দুধারে সারি সারি রাজকীয় দালান, নিচতলায় ছোট ক্যাফে বা দোকানে মানুষের আনাগোনা আর রাস্তার পাশের সারি সারি গাছ—সব মিলিয়ে রাস্তাগুলোতে পুরনো ইউরোপীয় শহরের আবহ। কোথাও কোন যানজট নেই, নেই কোন কোলাহল। শান্ত প্রকৃতির অনন্য রূপ যেন ফুটে ওঠেছে প্যারিসে।
রেইন এবার বাসের ভিতরে চিত্র অক্ষিবন্দি করতে শুরু করলো। না এখানে কারোর অন্যদিকে তাকানোর ফুরসৎ নেই। রেইন একটু হলেও আশঙ্কায় ছিল তাকে এই পোষাকে দেখলে এখানের মানুষ নাক সিঁটকাবে। কিন্তু তা হলো না, ঘটলো উল্টো। রেইন নিজেই কে কি করছে তা দেখছে অথচ তাকে কেউ ভালোভাবে দেখেছে কিনা সন্দেহ।
--Where are you from?
প্রশ্নটা শুনে রেইন পাশ ফিরে তাকালো। ছেলেটা ফোনে নিমগ্ন হয়েই প্রশ্নটা করেছে বলে ধারণা ।
-- I'm from Bangladesh.
-- Oh. I should have understood when I first saw you. [ওহ। আমার আগেই বোঝা উচিত ছিল যখন প্রথমবার আপনাকে দেখেছিলাম। ]
-- Are you insulting me or my country?
[আপনি কি আমাকে কিংবা আমার দেশকে অপমান করছেন! ] রেইন চোখ সরু করে ভ্রু কুঁচকে তাকালো।
-- It doesn't matter. I'm just saying don't violate other people's privacy.
[ সেটাতে কিছু যায় আসে না। শুধু বলতে চাচ্ছি অন্যের প্রাইভেসি নষ্ট করবেন না।]
-- I'm sorry. রেইনের কথা কান পর্যন্ত পৌঁছালো কিনা কে জানে । এদিকে আর ভুলেও ফিরে তাকালো না।
অনেক্ষণ ভেবেচিন্তে রেইন অপ্রস্তুত গলায় গলা ঝেড়ে জিজ্ঞেস করল,
--Are you Leon?" [ তুমি কি লিওন?]
--Nope. [ না ]
ছেলেটার গুরুগম্ভীর স্বরে রেইনের আর কিছু জিজ্ঞেস করার সাহস হলো না। লিওন নামটা শোনার পর ছেলেটার মুখশ্রীতে রাগের আভাস রেইন লক্ষ্য করেছিল।
পুরো রাস্তাতে আর কোন কথা বলেনি দুজন। রেইন নিজের মতো থেকেছিল আর ছেলেটা ফোনেই মত্ত ছিল। রেইনের নির্দিষ্ট গন্তব্যে যাওয়ার আগেই ছেলেটা নেমে পড়ে বাস থেকে। তবে একটা জিনিস রেইন কিছুতেই মিলাতে পারছিল না। তারই বুঝতে ভুল নাকি ওটা আসলেই লিওন ছিল!
দেড়ঘন্টার বাস জার্নি করে অবশেষে নির্দিষ্ট হোটেলে পৌঁছালো রেইন। সাড়ে এগারোটা বেজে গেছে ঘড়ির কাঁটায়। সূর্য তখন মাথার উপর বিরাজ করছে। হোটেলের চেকইনের আনুষ্ঠানিকতা শেষ করে ফ্রেশ হয়েই হালকা খাবার খেয়ে একটা ঘুম দেয় রেইন।
____
রেইনের ঘুম ভাঙে বিকাল চারটায়। হালাল খাবার সহজে এভেলএবল না থাকায় খাবার নিয়ে বেশ পোহাতে হয়েছে তাকে। আগে থেকে হালাল খাবারের কথা বলা থাকলেও সমস্যার বেশি একটা সমাধান হয়নি। তাই রেইন হালকাপাতলা কিছু খেয়েই সুপারশপের উদ্দেশ্য বের হয়। বেশ কিছু প্রয়োজনীয় জিনিস কিনতে হবে তাকে।
প্যারিসের সুপার মার্কেটগুলো সাধারণত বেশ পরিপাটি, গুছানো ও আধুনিক। একেরপর এক সারিতে সাজানো থাকে নানা ধরনের পণ্য। কোয়ালিটি দাম অনুযায়ী সবকিছু সারিবদ্ধভাবে রাখা হয় ক্রেতাদের সুবিধার্থে।
রেইন সুপার মার্কেটে যেতে যেতে চারদিকে সন্ধ্যা নেমে আসে। বিল্ডিং, রাস্তা, মার্কেট সব জায়গায় সোডিয়াম লাইটের আলোয় আলোকিত করে তুলছে আস্তে আস্তে।
টুকটাক প্রয়োজনীয় কিছু জিনিস কিনতে কিনতে সন্ধ্যা পেরিয়ে যায়। যেহেতু তার প্যারিসে তার প্রথমবার আসা সেহেতু বেগ পোহাতে হয়েছিল তাকে।
রেইন ফুটপাত ধরে হাঁটার সময়ই বৃষ্টি পরতে শুরু করে। বৃষ্টি থেকে বাঁচতে রেইন দূরে একটা বন্ধ দোকান দেখতে পেয়ে এগিয়ে যায়। তার মতো আরো অনেকেই ওখানে দাঁড়িয়ে আছে। বৃষ্টির বেগ বেড়েছে, এক হাতে জিনিসপত্র নিয়ে ফোন অন করে দেখে আটটা বেজে গেছে। সিমটা কালকেই কিনেছিল, আগেরটা বাংলাদেশেই ফেলে এসেছে।
রেইন অধীর আগ্রহে বৃষ্টির দিকে তাকিয়ে মনে মনে ভাবছে বৃষ্টি কখন থামবে। হঠাৎ তার দৃষ্টি আটকে যায় এক ছাতার নিচে থাকা দুটো ছেলেমেয়ের উপর। ছেলেটাকে কিছুটা পরিচিত মনে হতেই ভ্রু খানিকটা কুঁচকে ভাবনায় নিমগ্ন হলো।
রেইনের ভাবনার মধ্যেই ছাতার নিচে থাকা ছেলেটা রেইনের দিকে এগিয়ে আসলো। বিষ্ময়ে চোয়াল ঝুলে পড়ার উপক্রম লিওনকে এখানে দেখে।
-- Hey beautiful, what are you doing here?
[ হেই সুন্দরী, তুমি এখানে কি করছো?]
রেইন জবাব না দিয়ে সন্দিহান দৃষ্টিতে তাকালো। ছেলেটাকে মোটেও তার ভালো মনে হয় না।
-- What do you think about that?
[ তাতে আপনার কি?]
--" Will you be my girlfriend? I really like you.
[ তুমি কি আমার গার্লফ্রেন্ড হবে? আমার তোমাকে সত্যি খুব পছন্দ হয়েছে।
রেইন চোখ বড়বড় করে একবার ছাতার নিচে দাঁড়িয়ে থাকা মেয়েটার দিকে তাকালো। নিঃসন্দেহে অনেক সুন্দরী এবং স্মার্ট। মেয়েটাকে যেভাবে গলা জড়িয়ে ধরে রেখেছিল তাতে তো বোঝাই যায় মেয়েটার সাথে তার গভীর সম্পর্ক। চোখেমুখে অসন্তোষ প্রকাশ করে বলল,
-- What about that girl?
[ওই মেয়েটা কি হয় তোমার? ]
লিওন আবার দাঁতগুলো বের করে চমৎকার একটা হাসি দিলো।
-- She is my girlfriend.
[সে আমার গার্লফ্রেন্ড।]
রেইনের মেজাজ বিগড়ে গেলো। দাঁতে দাঁত চেপে বলল,
-- If she's your girlfriend, how dare you propose to me again?
[সে তোমার গার্লফ্রেন্ড হলে তুমি আবার আমাকে প্রস্তাব দিচ্ছো কোন সাহসে? ]
ছেলেটার ভ্রু কুঁচকে গেল আপনাআপনি। হিসেব না মিলাতে পেরে ফের বলল,
-- You’re so rude. You’re exactly like my utterly unbearable, ill-mannered brother. You can’t even be compared to other girls. Girls are usually soft, obsessed with dressing up, and willing to do anything for money. But you! You walk around without even wearing makeup. And yet, I still like you. I fell in love with you when I saw you in that red dress."
[ তুমি খুবই রুড। পুরো আমার অসহ্যকর বেয়াদব ভাইটার মতো। তোমাকে মেয়েদের কাতারে ফেলা যায় না। মেয়েরা হয় নমনীয়, সাজগোজ পাগল আর টাকার জন্য সব করতে পারে। কিন্তু তুমি! মেকাপ ছাড়া ঘুরে বেড়াও। কিন্তু তবুও আমি তোমাকে পছন্দ করি। আমি তোমাকে সেই লাল পোষাকটায় দেখে ভালোবেসে ফেলেছি। ]
রেইন রাগ সংযত করছে দাঁত চেপে। লিওন আবার বলতে শুরু করলো,
-- You know I have a lot of money. I have a big house next to the Eiffel Tower. I have a car. What more do you want in a girlfriend? ”
[ তুমি জানো আমার অনেক টাকা আছে । আইফেল টাওয়ারের পাশেই আমার বড় বাড়ি আছে। গাড়ি আছে। গার্লফ্রেন্ড হওয়ার জন্য আর কি চাই তোমার? ]
-- Do you think I'm greedy? Or a beggar? "
[ আপনার কি আমাকে দেখে লোভী মনে হচ্ছে? নাকি ভিখারি? ]
-- I didn't mean to say that."
[আমি তা বলতে চাইনি। ]
বৃষ্টি কিছুটা কমেছে দেখে রেইন লিওনকে পাত্তা না দিয়েই চোখমুখ শক্ত করে চলে যায়। লিওন দুবার পিছু ডেকেছিল তবে সে আর থামেনি।
রেইন একটা পুরনো লাইব্রেরিতে আসে "Le Grand Grimoire (The Grand Grimoire)" এর আর্টিকেল খুঁজতে। অনেক খোঁজাখুঁজির পরেও কিছু না পেয়ে হতাশ হয়ে লাইব্রেরির মালিকের সাথে কথা বলে জানতে পারে সমস্ত কপি শেষ হয়ে গেছে। এই মুহূর্তে তার কাছে কিছুই নেই।
রেইন তবুও কিছুক্ষণ সবগুলো থাক ভালোভাবে খুঁজে দেখছিল। যদি পেয়ে যায়! উপরের থাকগুলো দেখার জন্য একটা টুল এনে ওটার উপর উঠে দাঁড়িয়ে একাগ্রচিত্তে খুঁজতে থাকে। উপরের ফাইলগুলো হাতের নাগাল না পেয়ে পায়ের আঙুলের উপর ভর দিয়ে উঁচু হয়ে ধরার চেষ্টা করলো। একটু একটু করতে করতে অবশেষে সফল হয়ে আর্টিকেলটা হাতে পেয়ে যেই না স্বাভাবিকভাবে দাঁড়াবে ওমনি টুলটা কাৎ হয়ে যায়। ভয় পেয়ে রেইন ভারসাম্য রক্ষা করতে না পেরে পিছনদিকে পরে যেত নেয়। ভয়ে চোখ বন্ধ করে ফেলে তৎক্ষণাৎ। তার আজ শেষ দিন। চোখ বন্ধ করে নানান ভাবনার মধ্যেই খেয়াল করলো সে এখনো ব্যাথা পায়নি । শুন্যে ভাসার মতো অনুভূতি হচ্ছে। চট করে চোখটা খুলে নিজেকে কারো কোলে দেখে চোখ বিস্ময়ে বড় বড় হয়ে যায়।
রেইনের বিস্ময়ের মধ্যেই ছেলেটা তাকে নামিয়ে দিয়ে পাশ থেকে তার সংগ্রহ করা আর্টিকেলটা নিয়েই চলে যায়। রেইন শুধু বোকার মত তাকিয়েই থাকে। এক্ষেত্রেও সে ঘোরের মধ্যে থেকে ছেলেটার মুখটা দেখতে পারেনি। তবে বাসে তার পাশে বসা ছেলেটার আদলই লাগলো।
রেইন মাথা চুলকে একবার পড়ে যাওয়া টুলটার দিকে তাকায় আরেকবার ছেলেটার গমনের পথে তাকায়।
---
চলবে?