ফন্ট সাইজ:
থিম:
গল্পটা আমাদের ছিল

১ম পর্ব

লেখক: জান্নাতুল ফেরদৌস জেরি

#গল্পটা_আমাদের_ছিল

#লেখিকা_জান্নাতুল_ফেরদৌস_জেরিন

#সুচনা_পর্ব

( অনুমতি বিহীন কপি করা নিষিদ্ধ⛔)

মফস্বল শহরের সেই পুরনো ধাঁচের মির্জা বাড়িতে আজ ভীষণ নিস্তব্ধতা। বাড়ির ড্রয়িং রুমে পাটি বিছিয়ে আরিয়ানকে বসানো হয়েছে। পাশে মসজিদের ইমাম সাহেব আর হাতে গোনা কয়েকজন মুরুব্বি। আরিয়ানের বাবা আশরাফ সাহেব গম্ভীর মুখে বসে আছেন।

আরিয়ানের পরনে সাদা পাঞ্জাবি, কিন্তু তার চেহারায় কোনো উজ্জ্বলতা নেই। সে বারবার পকেটে থাকা ফোনটার কম্পন অনুভব করছে—কেউ হয়তো অনবরত ফোন দিচ্ছে। তার ভেতরে এক ধরনের হাহাকার চলছে।

ইমাম সাহেব যখন গম্ভীর গলায় জিজ্ঞেস করলেন, "বাবা আরিয়ান, মৃত্তিকার সাথে এই বিয়েতে কি তোমার সম্মতি আছে?"

আরিয়ান কয়েক সেকেন্ড চুপ থেকে, দাঁতে দাঁত চেপে বলল, "জি, কবুল।"

একই সময়ে ভেতরের ঘরে খাটের এক কোণে বসে আছে মৃত্তিকা। তার গায়ের লাল কাতান শাড়িটা তার বয়সের তুলনায় অনেক বড়। তার দুই হাতের নখগুলো অগোছালো; মেহেদি পরানো হয়নি বলে হাতগুলো কেমন ফ্যাকাসে লাগছে। সে ঠিকমতো জানেও না 'কবুল' শব্দের ভার কতটুকু। যখন তাকে সই করতে বলা হলো, সে শুধু বড়দের ভয়ে কলম ধরল।

সবাই যখন মিষ্টি বিলি করছে, আরিয়ান দ্রুত পায়ে তার ঘরে চলে এল। কিছুক্ষণ পর মৃত্তিকাকে সেই ঘরে দিয়ে আসা হলো। মৃত্তিকা অগোছালোভাবে ঘরের এক কোণে দাঁড়িয়ে আছে, ভয়ে তার ছোট ছোট চোখের নীল মণিগুলো কাঁপছে।

আরিয়ান তার দিকে তাকিয়ে ঘৃণায় মুখ ফিরিয়ে নিল। সে কর্কশ গলায় বলল, "শোন মৃত্তিকা, বড়রা চেয়েছে তাই এই বিয়ে হয়েছে। কিন্তু মনে রাখিস, তুই এই ঘরের বউ না, শুধু একজন আশ্রিতা। তোর ওই নোংরা হাত নিয়ে আমার কোনো কিছুতে হাত দিবি না। একদম আমার চোখের সামনে থেকে দূরে থাকবি!"

রাত গভীর। আরিয়ান তার বড় শোবার ঘরের বারান্দায় দাঁড়িয়ে তার 'পাখি'র সাথে ফোনে কথা বলছে। তার গলার স্বরে এক অদ্ভুত কোমলতা, যা মৃত্তিকার জন্য কল্পনা করাও অসম্ভব।

মৃত্তিকা ঘরের এক কোণে মেঝেতে চাদর পেতে বসে আছে। শাড়ির ভারে তার ছোট শরীরটা যেন নুইয়ে পড়ছে। সে প্রচণ্ড তৃষ্ণার্ত, কিন্তু আরিয়ানের ভয়ে গ্লাস ধরতে সাহস পাচ্ছে না। অবশেষে সাহস সঞ্চয় করে সে যখন টেবিলের ওপর রাখা পানির জগটা ধরতে গেল, ঠিক তখনই আরিয়ান পেছনে ফিরল।

আরিয়ান চিৎকার করে উঠল, "খবরদার! ওই নোংরা হাত দিয়ে আমার জগে হাত দিবি না! বলেছি না, আমার কোনো কিছুতে তুই ছোঁয়া দিবি না? নিজেকে আয়নায় দেখেছিস কখনো? নখগুলো দেখ, চুলে জট পাকিয়ে আছে—ছিঃ! তোকে দেখলে আমার ঘেন্না লাগে।"

মৃত্তিকা ভয়ে হাত গুটিয়ে নিল। তার চোখ টলমল করছে। আরিয়ান তাকে মাঝপথে থামিয়ে দিয়ে আবার ফোনে ফিরে গেল। এবার সে তার পাখির উদ্দেশ্যে বলতে লাগল, যাতে মৃত্তিকা স্পষ্ট শুনতে পায়—

"হ্যাঁ জানু, বিশ্বাস করো... এই নোংরা মেয়েটার পাশে থাকা তো দূর, একই ঘরে শ্বাস নিতেও আমার কষ্ট হচ্ছে। কোথায় তুমি আর কোথায় এই আস্তাকুঁড়ের ময়লা! ও এই বাড়ির কাজের মেয়ের চেয়েও অধম। আমার ভালোবাসা শুধু তোমার জন্য, এই বাচ্চার জন্য আমার মনে কোনো জায়গা নেই।"

মৃত্তিকা জানালার গ্রিল ধরে বাইরের অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে রইল। সে মনে মনে ভাবল, "আমি কি সত্যিই এত খারাপ? আমি তো ইচ্ছা করে নোংরা থাকি না; মা নেই বলে কেউ তো আমায় চুল বেঁধে দেয় না।"

বাইরে তখন ঝিরঝিরে বৃষ্টি আর হাড়কাঁপানো উত্তুরে হাওয়া। বাসর ঘরটা দামি সুগন্ধি আর ফুলে সাজানো থাকলেও তার ভেতরকার আবহাওয়া বাইরের চেয়েও বেশি শীতল।

আরিয়ান তার গায়ের শেরোয়ানিটা ছুড়ে ফেলে দিয়ে টি-শার্ট পরে নিল। বারান্দার দরজা খুলে দিতেই কনকনে ঠান্ডা বাতাস ঘরে ঢুকে পড়ল। আরিয়ান ঘাড় ফিরিয়ে দেখল মৃত্তিকা খাটের এক কোণে জড়সড় হয়ে বসে আছে। তার ছোট ছোট হাতগুলো শাড়ির নিচে লুকানোর চেষ্টা করছে সে।

আরিয়ান দাঁতে দাঁত চেপে এগিয়ে এল। মৃত্তিকার হাতটা হ্যাঁচকা টান দিয়ে ধরে জানালার কাছে নিয়ে গেল সে। আরিয়ানের রুক্ষ কণ্ঠস্বর— "তোর সাহস দেখে তো আমি অবাক হচ্ছি! এই নোংরা শরীর নিয়ে তুই আমার বিছানায় বসার স্বপ্ন দেখিস? এই যে নখ ভর্তি ময়লা, ঘাড়ের কাছে কালচে দাগ—তোকে দেখলে আমার বমি আসে। তোর মতো একটা আস্তাকুঁড়ের আবর্জনা আমার এই পবিত্র ঘরে থাকার যোগ্য নয়! তোর মতো একটা আপদকে বিয়ে করে আমার জীবনটাই আজ ছারখার হয়ে গেল। কেন মরে যাস না তুই? তোকে দেখলে আমার দম বন্ধ হয়ে আসছে!"

মৃত্তিকা ভয়ে কুঁকড়ে গিয়ে কাঁপা কাঁপা গলায় বলল, "ভাইয়া... অনেক ঠান্ডা লাগছে... আমি দরজার পাশে মেঝেতে বসে থাকি?"

আরিয়ান অট্টহাসি দিয়ে উঠল। তারপর মৃত্তিকাকে একরকম ধাক্কা দিয়েই বারান্দায় বের করে দিল।

"ভাইয়া বলবি না একদম! আমি তোর কেউ না। এই ঠান্ডাই তোর শাস্তি। আজ রাতটা ওই বেলকুনিতেই কাটাবি। ওই ধুলোবালির মধ্যেই তোর আসল জায়গা। খবরদার, ওখান থেকে দরজা ধাক্কাবি না, তাহলে ছাদ থেকে নিচে ফেলে দেব!"

খটাস করে আরিয়ান কাঁচের স্লাইডিং ডোরটা আটকে দিল। মৃত্তিকা ওপাশ থেকে কাঁচের ওপর তার ছোট ছোট নোংরা হাত দুটো রাখল। ওপাশে আরিয়ান তখন কানে হেডফোন লাগিয়ে তার ভালোবাসার সাথে হাসাহাসি করে কথা বলছে, আর এপাশে পাতলা একটা শাড়ি পরে আট বছরের মেয়েটা ঠান্ডায় নীল হয়ে যাচ্ছে।

মৃত্তিকা কাঁদতে কাঁদতে বলল, "সবাই শুধু ঘৃণা করতে শিখেছে, কেউ তো এখন পর্যন্ত একদিনের জন্যও আমাকে যত্ন করে খাইয়ে দিল না... আমার মা থাকলে কি এমন হতো? কেন মা আমাকে এত তাড়াতাড়ি এই নিষ্ঠুর পৃথিবীতে একা ফেলে চলে গেল!"

সে তার নোংরা হাত দিয়েই নিজের চোখের পানি মুছল, আর কনকনে ঠান্ডায় বারান্দার এক কোণে গুটিসুটি মেরে পড়ে রইল।

মৃত্তিকা আকাশের দিকে তাকিয়ে বলল, "মা, আকাশ থেকে কি আমাকে দেখা যায়? দেখো না, তোমার পরীর মতো মেয়েটা আজ আস্তাকুঁড়ের ময়লা হয়ে বারান্দার কোণে পড়ে আছে। আমায় নিয়ে যাও না মা... এই পৃথিবীতে কেউ আমায় ভালোবাসে না।"

একটু থেমে...

"ও মা, কথা বলো না কেন? আমি কি দেখতে সত্যি খুব পচা? সবাই কেন আমাকে নোংরা-ময়লা বলে? তুমি কেন একা একা অত দূরে চলে গেলে মা..." বলতে বলতেই সে ডুকরে কেঁদে উঠল।

(২)

রাত তখন ৩টা। বাইরের প্রকৃতি যেন আজ মৃত্তিকার ওপর প্রতিশোধ নিতে নেমেছে। কনকনে উত্তুরে হাওয়ার ঝাপটায় বারান্দার পাতলা কাঁচের ওপাশে আট বছরের মেয়েটা শীতে নীল হয়ে কুঁকড়ে আছে। তার চোখের কোণে জমে থাকা জলটুকুও মনে হয় ঠান্ডায় বরফ হয়ে গেছে। ফোঁপানোর শক্তিটুকুও নেই, শুধু বুকটা মাঝে মাঝে হাহাকারের মতো কেঁপে উঠছে। সে বুঝতে পারছে না, এই অন্ধকারের শেষ কোথায়? কাল সকালে সূর্য কি আদৌ তার জন্য উঠবে?

ঘরের ভেতর আরিয়ান তখন অস্থিরভাবে পায়চারি করছে। সে একটা ট্রাভেল ব্যাগ গুছিয়ে নিয়েছে। হঠাৎ সে তার খুব কাছের বন্ধু শোভনকে কল দিল।

আরিয়ান ফিসফিস করে বলল, "হ্যালো? হ্যাঁ, শুনছি। আমার সব কিছু রেডি। পাসপোর্ট, ব্যাগ সব গুছিয়ে নিয়েছি। সবাই এখন গভীর ঘুমে। নোংরা মেয়েটাকে বেলকনিতে আটকে রেখেছি। আমি ঠিক ৪টার দিকে পেছনের দরজা দিয়ে বেরিয়ে পড়ব। তানজিনা এয়ারপোর্টের কাছে অপেক্ষা করবে। ৫টার সময় ফ্লাইট, দেরি করা যাবে না। এবারের ফ্লাইট মিস করা মানে জীবনটা এই 'আস্তাকুঁড়ে'র সাথে পচে মরা। আমি পালাচ্ছি রে!"

ওপাশ থেকে শোভন দীর্ঘশ্বাস ফেলে খুব গম্ভীর গলায় বলল, "আরিয়ান, তুই কি একবারও ভাবছিস তুই কী করছিস? বাইরে জানুয়ারি মাসের হাড়কাঁপানো শীত। ওই বাচ্চা মেয়েটাকে বারান্দার বরফ-ঠান্ডা মেঝেতে ফেলে রেখে তুই নিজের সুখের জন্য পালিয়ে যাচ্ছিস? এটা বিয়ে নয় আরিয়ান, এটা অপরাধ। আমার কেন জানি মনে হচ্ছে, আজকের এই কুয়াশা তোর জীবনের সব আলো গিলে খাবে। যে অভিশাপ তুই আজ কুড়াচ্ছিস, তার অনুশোচনা করার সুযোগও হয়তো আল্লাহ তোকে দেবে না।"

আরিয়ান চোয়াল শক্ত করে বলল, "আমার জীবনটা নষ্ট হতে দেব না এই আপদটার জন্য। কাল কার জন্য কী আসবে, সেটা সময়ই বলবে। আমার ভালোবাসা শুধু তানজিনার জন্য। এখন রাখছি, বের হতে হবে।"

ফোনটা কেটে দিয়ে আরিয়ান জানালার কাঁচের ওপাশে একবার তাকাল। অন্ধকারের মাঝে মৃত্তিকার সেই কাঁপতে থাকা ছোট্ট শরীরটা যেন এক তাল মাংসপিণ্ডের মতো পড়ে আছে। এক মুহূর্তের জন্য বুকটা কি কেঁপে উঠল ওর? পরক্ষণেই তানজিনার হাসিমুখ আর রঙিন ভবিষ্যতের কথা ভেবে সে মায়াটাকে ঝেড়ে ফেলল।

কী যেন ভেবে সে আবার উল্টো পায়ে জানালার দিকে ফিরে এল। বারান্দার ওপাশে মৃত্তিকা তখন কাঁচের ওপর মাথা ঠেকিয়ে বিড়বিড় করছে। আরিয়ানের ছায়া দেখে তার মনে এক বিন্দু আশার প্রদীপ জ্বলে উঠল—

"ভাইয়া কি তবে দরজা খুলে দেবে? তবে কি ভেতরে নিয়ে যাবে?"

আরিয়ান স্লাইডিং ডোরটা সামান্য ফাঁক করল। হিমশীতল হাওয়া তীরের মতো ঘরের ভেতর ঢুকে পড়ল। মৃত্তিকা অস্ফুট স্বরে বলল, "ভাইয়া... খুব কষ্ট হচ্ছে... ঘরে নেবা?"

আরিয়ান কোনো উত্তর দিল না। তার বদলে পকেট থেকে বের করল একগাদা কড়কড়ে পাঁচশ টাকার নোট। নিষ্ঠুর অবজ্ঞায় টাকাগুলো সে মৃত্তিকার সেই নীল হয়ে যাওয়া অবশ হাতের ওপর ছুড়ে মারল।

আরিয়ানের বিষাক্ত কণ্ঠস্বর ভেসে এল, "এই নে তোর ভিক্ষে! কাল সকালে যখন সবাই দেখবে আমি নেই, তখন এই টাকাগুলো দিয়ে নিজের নোংরা শরীরটা ঢেকে দিস। আর শুন, এই ঘরের বিছানায় শোয়ার যোগ্যতা তোর কোনোদিন হবে না—আজও না, ভবিষ্যতেও না। তুই ওই ধুলোবালির মধ্যেই জন্মেছিস, ওখানেই পচে মরবি।"

টাকাগুলো বৃষ্টির ছাঁটে ভিজে মৃত্তিকার পায়ের কাছে ছড়িয়ে পড়ল। বারান্দায় পড়ে থাকা মৃত্তিকা সেই ভেজা টাকাগুলোর দিকে তাকিয়ে ডুকরে কেঁদে উঠল। সে তো টাকা চায়নি, সে চেয়েছিল একটু উষ্ণতা, একটু আশ্রয়।

ঘর থেকে বের হওয়ার ঠিক আগ মুহূর্তে আরিয়ান কেন জানি আবার রুমে ফিরে এল। মৃত্তিকা ভাবল, হয়তো এবার আরিয়ানের মনে মায়া জেগেছে, হয়তো সে এবার সত্যি দরজা খুলে ওকে ভেতরে নিয়ে আসবে। কিন্তু না; আরিয়ান সুইচবোর্ডের কাছে গিয়ে বারান্দার লাইটটা 'খটাস' করে নিভিয়ে দিল!

পুরো বারান্দা মুহূর্তেই নিকষ কালো অন্ধকারে ডুবে গেল। আরিয়ান একবারের জন্যও মৃত্তিকার সেই কুঁকড়ে থাকা শরীরের দিকে তাকাল না। যেন ওই অন্ধকারের কোণে কোনো রক্ত-মাংসের মানুষ নেই, বরং এক দলা আবর্জনা পড়ে আছে। সে নিস্পৃহভাবে ব্যাগটা কাঁধে নিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল, হালকা শব্দে দরজাটা ভিজিয়ে দিয়ে।

অন্ধকার মৃত্তিকার সবচেয়ে বড় ভয়। তার ওপর কনকনে ঠান্ডা। আরিয়ানকে চলে যেতে দেখে তার বুকের ভেতর থেকে এক প্রচণ্ড আর্তনাদ বেরিয়ে আসতে চাইল।

সে চেয়েছিল চিৎকার করে পুরো বাড়ি জাগিয়ে তুলতে, বলতে— "আমাকে বাঁচাও, আমি এই অন্ধকারে একা থাকতে পারছি না!"

কিন্তু পরক্ষণেই তার মনে হলো আরিয়ানের সেই শাসানি— "দরজা ধাক্কাবি না, তাহলে ছাদ থেকে নিচে ফেলে দেব!"

মৃত্তিকা বিদ্যুৎবেগে নিজের দুই হাত দিয়ে মুখ চেপে ধরল। তার নোংরা নখগুলো গালের মাংসে বসে যাচ্ছে, কিন্তু সে মুখ খুলল না। কান্নার শব্দগুলো গলার ভেতরেই গুমরে মরতে লাগল। সে হাড়কাঁপানো ঠান্ডায় নীল হয়ে যাওয়া হাত দুটো দিয়ে নিজের মুখ আর নাক চেপে ধরে অন্ধকারের এক কোণে পড়ে রইল। সে দেখল আরিয়ানের ঘরের আব্বা আলোটুকুও মিলিয়ে গেল, আর সে পড়ে রইল এক বিশাল শূন্যতায়।

_______

এয়ারপোর্টের ঝলমলে আলোতেও আরিয়ানের মুখটা বিষণ্ণতায় ঢাকা। সে যাওয়ার আগে শুধু তার বন্ধু শোভন আর তানজিনাকে সব সত্যিটা খুলে বলেছে।

আরিয়ান দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, "জানিস শোভন, আমি লন্ডন যাওয়ার ফুল স্কলারশিপটা পাওয়ার পরই ভেবেছিলাম সবাইকে ধুমধাম করে জানাব। কিন্তু ওই একই দিনে বাবা হুট করে ওই নোংরা আপদটার সাথে আমার বিয়ে দিয়ে দিল। রাগে, ক্ষোভে আর অপমানে কাউকে কিছু বলাই হলো না। মনে হচ্ছিল আমার সব অর্জন ওই মেয়েটার ধুলোবালির নিচে চাপা পড়ে গেছে।"

তানজিনা পাশে দাঁড়িয়ে সব শুনছিল। সে হঠাৎ আরিয়ানকে জড়িয়ে ধরে ডুকরে কেঁদে উঠল। কিন্তু সেই কান্নার মাঝে কেমন যেন একটা কৃত্রিমতা বা ন্যাকামি মিশে আছে। তানজিনা কাঁদতে কাঁদতে বলল, "আরিয়ান, তুমি চলে গেলে আমি কীভাবে থাকব? ওই নোংরা মেয়েটা কি এখন তোমার বাড়িতে রানীর মতো থাকবে? আমি এটা সহ্য করতে পারছি না!"

আরিয়ান তাকে শান্ত করার চেষ্টা করছে, কিন্তু পাশে দাঁড়িয়ে থাকা শোভন পুরো দৃশ্যটা খুব তীক্ষ্ণ নজরে দেখছে। তানজিনার কান্না দেখে সে বিরক্তিতে চোখ সরিয়ে নিল।

শোভন মনে মনে ভাবল, "নাটক আর কত করবি তানজিনা? আরিয়ান তোকে ভালোবাসে বলে তোর এই সস্তা কান্না ধরতেই পারছে না। কিন্তু তুই যে আরিয়ানকে নয়, বরং ওর লন্ডনে যাওয়ার সুযোগ আর টাকাটাকে ভালোবাসিস—সেটা আমি খুব ভালো করেই জানি। আর ওই ছোট মেয়েটা... মৃত্তিকা... তাকে তোরা আস্তাকুঁড়ে ফেলে দিচ্ছিস ঠিকই, কিন্তু আমার কেন জানি মনে হচ্ছে, আরিয়ানের আসল সর্বনাশটা তোর হাত ধরেই হবে।"

আকাশপথে আরিয়ান প্লেনের এসির স্নিগ্ধ বাতাসে নিজের আরামদায়ক সিটে হেলান দিয়ে বসল। জানালা দিয়ে বাইরের মেঘের দিকে তাকিয়ে তার মনে হলো, এক ঝটকায় সে সব পঙ্কিলতা আর পিছুটান ধুয়ে-মুছে পরিষ্কার হয়ে গেছে। সে ভাবল, "যাক, অবশেষে সেই নোংরা মেয়েটার শ্বাসরোধকারী মায়া থেকে আমি মুক্ত। এখন সামনে শুধু আকাশছোঁয়া স্বপ্ন আর তানজিনা।" সে চোখ বুজে এক বুক তৃপ্তির নিঃশ্বাস নিল; অথচ একবারও তার মনে পড়ল না—তারই ফেলে আসা বারান্দার সেই হাড়কাঁপানো কনকনে ঠান্ডার কথা।

________

ঠিক সেই মুহূর্তে, মাটির পৃথিবীতে অন্ধকার বারান্দার কোণে ছোট মৃত্তিকা এক ভয়ংকর মানসিক লড়াইয়ে লিপ্ত। ভয় তাকে এমনভাবে গ্রাস করেছে যে সে নিজের অস্তিত্ব হারিয়ে ফেলছে। লাইট নেভানোর সেই ঘুটঘুটে অন্ধকার যেন তাকে গিলে খেতে আসছে। সে ভয়ে নিজের চুলগুলো মুঠি করে ধরল, যেন মাথার খুলিটা উপড়ে ফেললে এই ভয়টা চলে যাবে। সে তার অবহেলিত, জট পাকানো চুলগুলো পাগলের মতো টানছে আর দাঁতে দাঁত চেপে কান্না আটকানোর চেষ্টা করছে।

আকাশের পানে তাকিয়ে সে বলল, "আল্লাহ, আমার কি কোনো ভুল ছিল?"

শীতে থরথর করে কাঁপতে থাকা মৃত্তিকা বলে—

"আল্লাহ, আমি আর বাঁচতে চাই না। এই শীত আমাকে বরফ বানিয়ে দিচ্ছে। তুমি কি পারো না আমাকে একটুকু আলো দিতে? এই অন্ধকারের দেয়ালগুলো যেন আমাকে গিলে খাচ্ছে! আমাকে নিয়ে যাও আল্লাহ, আমি মায়ের কাছে যেতে চাই। আল্লাহ, আমি আর কোনো খাবার চাইবো না, আমাকে শুধু নিয়ে যাও... কোনো খাবার দেওয়া লাগবে না।"

কিন্তু ভয়ের প্রচণ্ডতা যখন সীমা ছাড়িয়ে গেল, সে নিজের অজান্তেই নিজের হাতের ওপর কামড় বসাল। নিজের দাঁত দিয়ে নিজের নরম চামড়া চিরে ফেলছে সে, যাতে বাইরের অন্ধকারের চেয়ে নিজের শরীরের যন্ত্রণাটা বেশি অনুভূত হয়।

রক্তাক্ত হাত আর চোখের জলে ভেসে যাওয়া ছোট মৃত্তিকা সেই মেঘের দিকেই তাকিয়ে থাকল, যে মেঘের ওপর দিয়ে আরিয়ান তখন স্বপ্নের দেশে পাড়ি দিচ্ছে। মৃত্তিকার মনে শুধু একটা প্রশ্নই বারবার ঘুরপাক খাচ্ছে— "কেন আমি জন্ম নিলাম? কেন মা আমাকে এমন একটা অন্ধকার পৃথিবীতে একা রেখে চলে গেল?"

রাতভর অন্ধকারের সাথে লড়াই করতে করতে মৃত্তিকা ক্লান্ত হয়ে পড়েছিল। ভয়ে নিজের চুল টেনে, হাত কামড়ে সে চেয়েছিল কোনোভাবে সকাল পর্যন্ত জেগে থাকতে। কিন্তু শেষ রাতের দিকে শরীরের তাপমাত্রা প্রচণ্ড কমে যাওয়ায় তার হাড়কাঁপানো কাঁপুনিটাও থেমে এল। বাতাসের কনকনে ঠান্ডা যেন তার রক্ত জমিয়ে দিচ্ছে।

ভোর হওয়ার ঠিক আগ মুহূর্তে, যখন আকাশের রঙটা কালচে নীল থেকে ফিকে হতে শুরু করেছে, তখন মৃত্তিকার আর লড়ার শক্তি অবশিষ্ট ছিল না। সে তার সেই ক্ষতবিক্ষত, নোংরা হাত দুটো বুকের ওপর গুটিয়ে নিয়ে বারান্দার ঠান্ডা দেওয়ালের সাথে মাথা ঠেকিয়ে দিল। তার চোখের পাতাগুলো ভারী হয়ে এল।

শেষবার যখন সে চোখ মেলল, দেখল দূরের আকাশে একটা আলোর বিন্দু মিলিয়ে যাচ্ছে—হয়তো আরিয়ানের সেই ফ্লাইট।

সেটা দেখে বিড়বিড় করে বলে—

"আল্লাহ... এই পৃথিবীটা আমার জন্য বড্ড নিষ্ঠুর।"

'আ...'—আর বলতে পারল না সে। তার আগেই চোখের পাতা জোড়া বন্ধ হয়ে গেল।

চলবে........

" ভুল-ক্রটি হলে ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন"!!

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ১ম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন