ফন্ট সাইজ:
থিম:
গল্পটা আমাদের ছিল

২য় পর্ব

লেখক: জান্নাতুল ফেরদৌস জেরি

#গল্পটা_আমাদের_ছিল

#লেখিকা_জান্নাতুল_ফেরদৌস_জেরিন

#পর্বঃ২

(কপি করা নিষিদ্ধ🚫)

সকাল গড়িয়ে রোদ চনমনে হয়েছে, কিন্তু আরিয়ানের ঘর থেকে কোনো সাড়া নেই। চারদিকের উৎসবের আমেজটা যেন এক অদ্ভুত নীরবতায় ঢেকে গেছে। আরিয়ানের মা রেহানা বেগম তীব্র বিরক্তি নিয়ে দরজায় কড়া নাড়লেন। তিনি প্রথম থেকেই এই বিয়েটা কোনোভাবেই মেনে নিতে পারেননি। মনে মনে বিষ উগরে দিয়ে ভাবছিলেন, "আমার রাজপুত্তুর ছেলের পাশে ওই আস্তাকুঁড়ের ময়লাকে এনে কেন যে স্বামী জোর করে বসিয়ে দিল! এখন হয়তো রাজকন্যে সেজে নাক ডেকে ঘুমাচ্ছে অসভ্য মেয়েটা। নবাবজাদীর ঘুম আর ভাঙে না!"

অনেকক্ষণ ডাকার পরও কোনো সাড়াশব্দ না পেয়ে তিনি বিরক্ত হয়ে দরজায় জোরে একটা ধাক্কা দিতেই দেখলেন কপাটটা ভেতর থেকে স্রেফ ভেজানো। ঘরে পা রাখতেই তিনি স্থাণু হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন। বিছানার চাদর একদম পরিপাটি, কোথাও কোনো ভাঁজ নেই। আরিয়ান ঘরে নেই। কিন্তু তাঁর নজর কাড়ল ঘরের এক কোণে থাকা হালকা খোলা বারান্দাটা।

সেখানের হিমশীতল, কালচে মেঝের ওপর মৃত্তিকা নিথর হয়ে পড়ে আছে। কাল রাতের কনকনে ঠান্ডায়, কুয়াশায় ভিজে তার গায়ের লাল বেনারসি শাড়িটা শরীরের সাথে লেপ্টে গেছে। ৮ বছরের ছোট্ট কচি হাত দুটো দেয়াল খামচাতে খামচাতে রক্তাক্ত, নখগুলো উল্টে গিয়ে রক্ত জমাট বেঁধে আছে। আর পিঠের ওপর জট পাকিয়ে ছড়িয়ে আছে তার অবিন্যস্ত চুলগুলো। দেখে মনে হচ্ছে কোনো এক জল্লাদ একটা নিষ্পাপ পাখিকে ডানা কেটে খাঁচায় ফেলে রেখেছে।

রেহানা বেগম এই বীভৎস দৃশ্য দেখে আর্তনাদ করে ওঠার বদলে ঘৃণাভরে মুখটা কুঁচকে বলে উঠলেন, "দেখো মাগো দেখো, অলক্ষ্মী কাণ্ড! বাসর রাতেই আমার সোনার ছেলে বাড়ি ছাড়া, আর এই অপয়া মেয়েটা সকালবেলা বারান্দায় ঢং করে মটকা মেরে পড়ে আছে! নির্ঘাত আমার আরিয়ানকে জাদুটোনা করে কিছু বলেছে, নইলে আমার অমন শান্ত ছেলে এভাবে কাউকে না বলে পালিয়ে যায়?"

চিৎকার শুনে বাড়ির বাকি মানুষগুলোও নীলা, সায়ান হন্তদন্ত হয়ে ছুটে এল। কিন্তু বারান্দার ওই দৃশ্য দেখে কেউ মৃত্তিকাকে একটা বার হাত দিয়ে তোলার সাহস পেল না। একটা পশুপাখি মরতে বসলেও মানুষ যেভাবে এগিয়ে যায়, আভিজাত্যের অহংকারে অন্ধ এই মানুষগুলোর মনে সেই মায়াটুকুও জাগল না। যেন ওই মরণাপন্ন বাচ্চাটাকে ছুঁলে তাদের শরীরে কোনো ছোঁয়াচে রোগ লেগে যাবে, তাদের আভিজাত্য ধুলোয় মিশে যাবে!

নীলা ওড়না দিয়ে নাক চেপে ধরে দূর থেকে দাঁড়িয়ে বলল, "মা, ওর শরীর তো একদম নীল হয়ে বরফের মতো ঠান্ডা হয়ে গেছে। হাত-পায়ের আঙুলগুলো কেমন যেন বেঁকে গেছে। মরে টরে গেল নাকি? উফ, বিয়ের পরদিনই বাড়িতে একটা লাশ! কী অশুভ মেয়ে রে বাবা!"

মৃত্তিকা এত এত মানুষের শব্দ শুনতে পেয়ে খুব হালকা করে চোখ খোলে। তার শরীরের ভেতরটা তীব্র শীতে অবশ হয়ে এলেও, শেষ প্রাণস্পন্দনটুকু তখনো বাঁচার জন্য ভেতরে ভেতরে ছটফট করছিল। চারপাশের চেনা মানুষের গলার আওয়াজ পেয়ে সে খুব ধীর গতিতে তার ভারী চোখের পাতা দুটো একটুখানি মেলল। ঝাপসা চোখে সে দেখল—তার চোখের সামনে দাঁড়িয়ে আছে তার নিজের চেনা আন্টি, চেনা আপু। কিন্তু কেউ তাকে কেন বুকে টেনে নিচ্ছে না? কেন সবাই তাকে দেখে আরও দু-পা পিছিয়ে যাচ্ছে?

​প্রচন্ড যন্ত্রণায় মৃত্তিকা তার অবশ হয়ে যাওয়া রক্তাক্ত হাতটা একটু ওপরে তোলার চেষ্টা করল। তার ফেটে যাওয়া, শুকিয়ে কাঠ হওয়া ঠোঁট দুটো সামান্য নড়ে উঠল। সে কোনো আওয়াজ করতে পারল না, কিন্তু তার চোখের কোণ দিয়ে গড়িয়ে পড়া জলের ধারা আর ঠোঁটের আকুতি স্পষ্ট বলে দিচ্ছিল, সে বলতে চাইছে—"আ.....আন্টি... আমাকে একটু বাঁচাও... আমার খুব কষ্ট হচ্ছে... আমি আর সহ্য করতে পারছি না..."

​

মৃত্তিকা তার কাঁপতে থাকা রক্তাক্ত আঙুলগুলো দিয়ে রেহানা বেগমের শাড়ির আঁচলটা একটুখানি ছোঁয়ার চেষ্টা করল। একটুখানি চেনা ওম, একটুখানি আশ্রয়ের আশায় সে তীব্র যন্ত্রণার মাঝেও অস্ফুটে বলতে চাইল, "আন্টি, আমি কোনো অন্যায় করিনি... আমাকে এই ঠান্ডা থেকে তোলো..."

​কিন্তু রেহানা বেগম পরম মমতায় সেই কচি হাতটা চেপে ধরার বদলে, নিজের দামি শাড়িটা এক ঝটকায় সরিয়ে নিলেন। যেন কোনো বিষাক্ত সাপ তাকে ছুঁতে এসেছে! সেই ঝটকায় মৃত্তিকার দুর্বল হাতটা ধপ করে আবার সেই বরফঠান্ডা শক্ত মেঝের ওপর আছড়ে পড়ল।

নখ ফেটে আবার নতুন করে রক্ত চুইয়ে পড়তে লাগল।

​এই বয়সে যে বাচ্চার মায়ের কোলে থাকার কথা, পুতুল খেলে বেড়ানোর কথা, সে আজ এক ফোঁটা জলের জন্য, একটুখানি ভালোবাসার জন্য একদল পশুর সামনে পড়ে কাতরাচ্ছে। তার কপাল বেয়ে তখন তীব্র জ্বরের ঘাম ঝরছে, আর চোখের কোণ দিয়ে গড়িয়ে পড়া নোনা জল কানের পাশ দিয়ে মেঝের ধুলোয় মিশে যাচ্ছে। কিন্তু সেই করুণ আর্তনাদ শোনার মতো কোনো মানুষ সেই ঘরে উপস্থিত ছিল না, সেখানে দাঁড়িয়ে ছিল কেবল আভিজাত্যের অহংকারে অন্ধ কিছু জানোয়ার

তিনি উল্টো সায়ানের দিকে তাকিয়ে চেঁচিয়ে উঠলেন, "সায়ান, ওদিকে যাস না! ছোঁয়া লাগাস না! কাজের লোকদের ডাক, ওরাই টেনেটুনে বের করুক এই আপদকে!"

রেহানা বেগম শাড়ির আঁচলটা ঝটকা দিয়ে সরিয়ে নেওয়ার পরও মৃত্তিকা হাল ছাড়ল না। বাঁচার আকুতি একটা আট বছরের বাচ্চাকে কতটা অসহায় করে তুলতে পারে, তা হয়তো সেখানে দাঁড়িয়ে থাকা পাথরের মূর্তিদের জানা ছিল না।

​মৃত্তিকা তার ভাঙা, অবশ হয়ে যাওয়া শরীরটাকে কোনোমতে একটুখানি টেনে রেহানা বেগমের পায়ের দিকে এগোনোর চেষ্টা করল। মেঝের শক্ত পাথরে ঘষা লেগে তার কনুইয়ের চামড়া ছিলে গেল। সে তার রক্তাক্ত, কাঁপতে থাকা দুটি হাত জোড় করে রেহানা বেগমের দিকে তাকাল। তার চোখের দৃষ্টিতে তখন এক মহাসমুদ্র মিনতি।

​শুকিয়ে যাওয়া ঠোঁট দুটো আঠার মতো লেগে যাচ্ছিল, তাও সে শেষবারের মতো ফিসফিস করে বলার চেষ্টা করল, "আন্টি... ও আন্টি... আমি আর কখনো আরিয়ান ভাইয়ের সামনে যাব না... আমি কোনো খাবারও চাইব না... আমাকে একটা অন্ধকার ঘরে বন্ধ করে রাখো, তাও প্লিজ এই ঠান্ডা থেকে তোলো... আমার খুব কষ্ট হচ্ছে আন্টি... আমার মা নেই... আমাকে একটু বাঁচাও..."

​মৃত্তিকার এই বুক ফাটা মিনতি, এই করুণ আকুতি ঘরের দেয়ালগুলোতে ধাক্কা খেয়ে ফিরে এল, কিন্তু রেহানা বেগম কিংবা নীলার মনে এক ফোঁটা মায়ার জন্ম দিতে পারল না। তারা শুধু ঘৃণাভরে তার এই ছটফটানি দেখল।

​হঠাৎ করেই মৃত্তিকার পুরো শরীরটা তীব্র এক ঝাঁকুনি দিয়ে উঠল। কপাল বেয়ে আগুনের মতো গরম ঘাম ঝরে পড়ল। ১০৫ ডিগ্রি ছোঁয়া তীব্র জ্বরের ঘোরে তার চারপাশের চেনা মুখগুলো আচমকা অন্ধকার হয়ে আসতে লাগল। তার জোড় করা হাত দুটো আর শরীরকে ধরে রাখতে পারল না; নিস্তেজ হয়ে তা আবার সেই বরফঠান্ডা মেঝের ওপর আছড়ে পড়ল।

​চোখের কোণ দিয়ে শেষ এক ফোঁটা তপ্ত জল গড়িয়ে পড়ার আগেই মৃত্তিকার চোখের পাতা দুটো ধীরে ধীরে বুজে গেল। তীব্র জ্বরের নীল যন্ত্রণা সইতে না পেরে, অবুঝ মেয়েটা আবার এক গভীর অন্ধকারের মাঝে অজ্ঞান হয়ে তলিয়ে গেল। পুরো বারান্দাটা আবার এক নিথর, নিস্তব্ধ শ্মশানে পরিণত হলো।

ঠিক তখনই আরিয়ানের বাবা আশফাক সাহেব ঘরে ঢুকলেন। ছেলের ঘর খালি দেখে তার বুকটা কেঁপে উঠল ঠিকই, কিন্তু বারান্দায় মৃত্তিকার ওই দশা দেখে আশফাক সাহেব যেন হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে ফেললেন। রক্ত জল করা ঠান্ডায় একটা অবুঝ শিশু এভাবে নীল হয়ে পড়ে আছে! তিনি আর এক মুহূর্ত ভাবলেন না, একাই ছুটে গিয়ে মৃত্তিকাকে নিজের বুকের সাথে পাঁজাকোলা করে জড়িয়ে তুললেন। কাদা আর ময়লা তাঁর দামি পোশাকে লেগে গেল, কিন্তু সেদিকে তাঁর খেয়াল নেই।

আশফাক সাহেব চারপাশের মানুষের দিকে তাকিয়ে সিংহের মতো গর্জে উঠলেন, "তোরা কি সব মানুষ, না জানোয়ার রে? একটা ৮ বছরের বাচ্চা এভাবে মরতে বসেছে আর তোরা এখনো দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে তার জাত-কুল নিয়ে খোঁচাখুঁচি করছিস? আরিয়ান যা করেছে তার শাস্তি সে পাবে, কিন্তু এই মেয়েটার যদি কিছু হয়, তবে আমি কাউকে আস্ত রাখব না!"

তিনি কারো বাধা বা নিষেধের তোয়াক্কা না করে মৃত্তিকাকে বুকে চেপে ধরে গাড়ির দিকে ছুটলেন। রেহানা বেগম পেছনে দাঁড়িয়ে মুখ বাঁকিয়ে বিষ ছড়ালেন, "নিজের পেটের ছেলের কোনো খোঁজ নেই, এখন এই ডাস্টবিনের নোংরা মেয়েটাকে নিয়ে উনি আদিখ্যেতা করতে চললেন! লোক হাসানো ছাড়া আর কিছু না!"

হাসপাতালের ঠান্ডা, সাদা করিডোরে মৃত্তিকা একটা স্ট্রেচারের ওপর নিথর হয়ে পড়ে আছে। তার গায়ের সেই কাদা মাখা লাল বেনারসি শাড়িটা জায়গায় জায়গায় ছিঁড়ে গেছে, চুলগুলো জট পাকিয়ে মুখের সাথে লেপ্টে আছে। যেন কোনো এক রাজকন্যাকে কেউ টেনে এনে নরকে ছুড়ে ফেলেছে। সেই বীভৎস রূপ দেখে ডিউটিতে থাকা নার্স থেকে শুরু করে জুনিয়র ডাক্তাররা পর্যন্ত দূর থেকে নাক কুঁচকে চলে যাচ্ছে।

একটা কুকুরের ছানা রাস্তায় কাতরালেও মানুষ যেভাবে মায়া দেখায়, এই ৮ বছরের মেয়েটার জন্য কারো মনে সেই মায়াটুকুও জাগল না। অস্পৃশ্য কোনো বস্তুর মতো সবাই ওকে এড়িয়ে চলছে, কেউ একটা বার এগিয়ে এসে ওর নাড়িটা ছুঁয়ে দেখার প্রয়োজনও মনে করল না।

একজন নার্স তো দূর থেকে ওড়না দিয়ে নাক চেপে ধরে আশফাক সাহেবকে বলেই ফেলল, "স্যার, মেয়েটা তো প্রচণ্ড নোংরা, গা থেকে কেমন একটা গন্ধ আসছে! আমাদের পরিষ্কার বেডগুলো সব নষ্ট হয়ে যাবে। মনে হচ্ছে স্রেফ ভয়ে জ্ঞান হারিয়েছে, কিছুক্ষণ বাইরে ফেলে রাখলে এমনিতেই জ্ঞান ফিরে আসবে। আপনি বরং ওকে নিয়ে বাইরে একটু অপেক্ষা করেন, ভেতরে এনে নোংরা ছড়াবেন না।"

আশফাক সাহেব স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন। তাঁর কানে বাজছে নিজের স্ত্রীর নিষ্ঠুর বুলি, আর চোখের সামনে দেখছেন এই তথাকথিত শিক্ষিত সমাজের পৈশাচিক নির্দয়তা। একটা নিষ্পাপ প্রাণ ধুঁকে ধুঁকে মরছে, অথচ এরা দেখছে তার গায়ের কাদা! তাঁর বুকের ভেতরটা অপমানে, ঘেন্নায় আর রাগে ফেটে যেতে চাইল। তিনি চিৎকার করে বলতে চাইলেন, "এটা একটা আট বছরের বাচ্চা মেয়ে! তোমরা কি আগে ওর নোংরা শরীর দেখবে, নাকি ওর ভেতরে ছটফট করতে থাকা প্রাণটা বাঁচাবে? তোমাদের নিজেদের কি কোনো সন্তান নেই?"

কিন্তু তিনি অনেক কষ্টে নিজের দাঁতে দাঁত চেপে রাগটা সামলালেন। কারণ তিনি জানেন, এখন ঝগড়া করতে গেলে ডাক্তাররা জেদ করে মৃত্তিকার চিকিৎসা আরও পিছিয়ে দেবে। তিনি দেয়ালের দিকে তাকিয়ে দুই হাত মুষ্টিবদ্ধ করে নিলেন, টপ টপ করে তাঁর চোখের কোণ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ল। তিনি মনে মনে বললেন—"মৃত্তিকা মা, তোর এই নরকযন্ত্রণার জন্য আজ আমি দায়ী। তোকে যদি জোর করে আমার ওই পশুতুল্য ছেলে আরিয়ানের সাথে বিয়ে না দিতাম, তবে আজ তোকে এই বয়সে এতটা অবহেলা আর অপমান সইতে হতো না। আমাকে ক্ষমা করিস মা!

একটু পর একজন সিনিয়রের কড়া নির্দেশে, অত্যন্ত অনিচ্ছাসত্ত্বেও একজন আয়া এগিয়ে এল। কিন্তু তার চোখে-মুখে চরম বিরক্তি। মৃত্তিকার গায়ের ময়লা কাপড়গুলো পরিষ্কার করার জন্য সে তাকে টেনে-হিঁচড়ে ওপাশে নিয়ে গেল। আদর তো দূরের কথা, একটা পশুকেও যেভাবে মানুষ হাত দেয়, সেটুকু মায়াও দেখাল না। যেন একটা নোংরা বস্তা পরিষ্কার করছে! কোনো রকমে কেবল গালের ওপর জমে থাকা শুকনো কাদা আর ময়লাটুকু খসখসে একটা কাপড় দিয়ে ঘষে মুছে দিল সে, ব্যস, ওইটুকুই! চামড়া ছিলে লাল হয়ে গেলেও তার একটুও দয়া হলো না। এর বাইরে আর একটা সুতোয় হাত দেওয়ারও প্রয়োজন মনে করল না। যেন দায়সারাভাবে একটা ঘেন্নার কাজ শেষ করেই সে হাঁফ ছেড়ে বাঁচল।

হাসপাতালের চেনা সাদা দেয়াল আর ওষুধের কটু কড়া গন্ধে মৃত্তিকার যখন জ্ঞান ফিরল, তখন জানালার বাইরে দুপুরের কড়া রোদ এসে পড়েছে তার মুখের ওপর। চোখ মেলতেই তার কাল রাতের সেই নরককুণ্ডের কথা মনে পড়ে গেল—সেই অন্ধকার, কনকনে ঠান্ডা বারান্দা, আর আরিয়ানের সেই পৈশাচিক, নিষ্ঠুর মুখ। ভয়ে আর আতঙ্কে তার কচি বুকটা ধক করে উঠল, সে শিউরে উঠে আবার শক্ত করে চোখ দুটো বন্ধ করে ফেলল।

ঠিক তখনই তার কপালে একটা পরম মমতাময়ী, উষ্ণ হাতের ছোঁয়া পেল সে। চোখ খুলে দেখল আশফাক সাহেব তার শিয়রে বসে আছেন। তাঁর চোখেমুখে রাজ্যের ক্লান্তি, দুশ্চিন্তা আর এক মহাসমুদ্র অপরাধবোধ।

আশফাক সাহেব খুব নরম, ভাঙা গলায় বললেন, "মা... ভয় নেই রে, আমি আছি। এখন কেমন লাগছে তোমার?"

মৃত্তিকা কথা বলতে চাইল, কিন্তু তৃষ্ণায় আর যন্ত্রণায় তার গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে। বুক চিরে কোনো আওয়াজ বেরুল না। সে শুধু বড় বড় দুটি চোখে ফ্যালফ্যাল করে আশফাক সাহেবের দিকে তাকিয়ে রইল। তার সেই কাদা মাখা ছোট্ট হাত দুটো এখন ব্যান্ডেজ করা। নখের ভেতর জমে থাকা কালচে ময়লাগুলো পরিষ্কার না করেই নার্সরা অবহেলা করে ব্যান্ডেজটা মুড়িয়ে দিয়েছে, সেই কালচে দাগগুলো সাদা ব্যান্ডেজের ওপর থেকে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে।

আশফাক সাহেব আবার বললেন, "আমি জানি মা, এই বাড়িতে তোমার সাথে খুব বড় অন্যায় হয়েছে। আরিয়ান যা করেছে তার কোনো ক্ষমা নেই। কিন্তু আমি কথা দিচ্ছি, আজ থেকে এই বাড়িতে তোমার পরিচয় বদলে যাবে। তোমাকে আর কেউ একটা তুচ্ছ কথা বলার বা অবহেলা করার সাহস পাবে না। তুমি তাড়াতাড়ি সুস্থ হয়ে ওঠো মা, তোমাকে আমি নিজের মেয়ের চেয়েও বেশি করে আগলে রাখব।"

মৃত্তিকা অস্ফুট স্বরে, অত্যন্ত দুর্বল ও কাঁপতে থাকা গলায় শুধু বলল, "আব্বা... উনি কি চলে গেছেন? উনি কি আর আমাকে ওই ঠান্ডা বারান্দায় ফেলে রাখবেন না? আমি আর কোনোদিন আরিয়ান ভাইয়ের ঘরে যাব না আব্বা, আমাকে আর ওইখানে পাঠাইয়েন না..."

একটা আট বছরের বাচ্চার মুখে এই আকুতি শুনে আশফাক সাহেবের মনে হলো কেউ যেন তাঁর বুকে জ্যান্ত তলোয়ার চালিয়ে দিল। নিজের জন্ম দেওয়া পশুতুল্য ছেলের নির্মমতার কথা যখন একটা অবুঝ শিশু এভাবে চাবুকের মতো পিঠে মারে, তখন একজন বাবার আর মাথা তুলে দাঁড়ানোর ক্ষমতা থাকে না। আশফাক সাহেব অপরাধীর মতো মাথা নিচু করে ফেললেন। চোখের জল আড়াল করার কোনো জায়গাটুকুও তাঁর ছিল না।

তিনি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে মৃত্তিকার সেই ব্যান্ডেজ করা ছোট্ট হাতটা নিজের দুই হাতের তালুর ভেতর নিলেন। নখের ভেতর জমে থাকা কালচে ময়লাগুলো সাদা ব্যান্ডেজের ওপর থেকে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে—যা হাসপাতালের নার্সদের অবহেলার প্রমাণ। আশফাক সাহেব পরম মমতায় সেই ব্যান্ডেজের ওপর নিজের ঠোঁট ছুঁইয়ে কেঁদে উঠলেন।

তারপর খুব ভাঙা, রুদ্ধ গলায় বললেন, "না রে মা... সে চলে গেছে। সে অনেক দূরে পালিয়ে গেছে। সে আর কখনো এই বাড়িতে ফেরার সাহস পাবে না। আজ থেকে এই আব্বা বেঁচে থাকতে তোমার গায়ে একটা আঁচড় দেওয়ার ক্ষমতাও কারো নেই। তুমি আমার মেয়ে মা, আমার নিজের মেয়ে..."

তিনি একটু থামলেন, চোখের জলটা হাতের উল্টো পিঠ দিয়ে মুছে মৃত্তিকার কপালে আলতো করে হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বললেন, "সে যে আজ কী অমূল্য রতন হারিয়ে পালাল, সেটা সে যেদিন টের পাবে—সেদিন আর ফেরার কোনো পথ থাকবে না। তুমি এখন ওসব আর কিচ্ছু ভাবো না মা। এই পাপী আব্বার দিকে তাকিয়ে তোমাকে যে তাড়াতাড়ি সুস্থ হয়ে উঠতে হবে!"

মৃত্তিকা আর কোনো কথা বলল না। 'উনি চলে গেছেন আর আসবেন না'—এই কথাটুকু শোনার পর তার ছোট্ট বুক থেকে যেন এক মস্ত বড় ভয়ের পাহাড় নেমে গেল। সে ক্লান্তিতে চোখ দুটো বুজে আশফাক সাহেবের হাতের চেনা ওমটুকু আঁকড়ে ধরে রইল। তার চোখ বেয়ে শেষ এক ফোঁটা জল গড়িয়ে বালিশে মিশে গেল।

চলবে......

(ভুল-ক্রটি হলে ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন)

(আমি নতুন যদি শব্দ ভুল হয় আমাকে বলবেন আমি ঠিক করার চেষ্টা করবো)

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ২য় পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন