ফন্ট সাইজ:
থিম:
গল্পটা আমাদের ছিল

৫ম পর্ব

লেখক: জান্নাতুল ফেরদৌস জেরি

#গল্পটা_আমাদের_ছিল

#লেখিকা_জান্নাতুল_ফেরদৌস_জেরিন

#পর্বঃ৫

(অনুমতি বিহীন কপি করা নিষিদ্ধ🚫)

বিকেলের সেই গোধূলি লগ্নে, ধুলো ওড়ানো রাস্তা দিয়ে একাকী এক কিশোরী হেঁটে চলে গেল। কারো চোখের জল তাকে আটকাতে পারল না। আরিয়ান তার কথার জবাবে একটা বিদ্রুপের হাসি দিলেও তার বুকের ভেতর কেমন যেন একটা খচখচানি শুরু হলো।

​বাতাসে উড়তে থাকা ধুলিকণাগুলো যেন কিশোরীর রেখে যাওয়া কিছু অব্যক্ত অভিমান হয়ে আরিয়ানের চারপাশে ঘুরপাক খেতে লাগল। সে দূর সীমানার দিকে তাকিয়ে রইল, যেখানে গোধূলির শেষ রক্তিম আভাটা আস্তে আস্তে অন্ধকারের বুকে মিলিয়ে যাচ্ছে।

ঠিক যেভাবে মেয়েটা তার জীবন থেকে হারিয়ে গেল। নিজের অজান্তেই আরিয়ানের হাতের মুঠো শক্ত হয়ে এলো, ঠোঁটের কোণের সেই তাচ্ছিল্যের হাসিটা কখন যে এক তীব্র অপরাধবোধে রূপ নিয়েছে, তা সে নিজেও টের পায়নি।

অহংকার আর ইগোর এই লড়াইয়ে সে কি সত্যিই জিতে গেল, নাকি নিজের অজান্তেই হেরে গেল চেনা কোনো মায়ার কাছে?

​মনের ভেতরের তীব্র অস্থিরতা সামলাতে না পেরে আরিয়ান নিজের রুমে চলে এলো। ঘরের এপাশ-ওপাশ পায়চারি করতে করতে হঠাৎই তার চোখ আটকে গেল বেলকনির দিকে। ঠিক আট বছর আগের এক কনকনে শীতের রাত... এক নিষ্পাপ ছোট মেয়েকে এই বেলকনিতেই আটকে রেখেছিল সে।

পুরোনো সেই স্মৃতি মনে পড়তেই আজ আরিয়ানের বুকের ভেতরটা দুমড়েমুচড়ে গেল; তীব্র অনুশোচনায় মনে হলো—বড্ড অন্যায় করে ফেলেছে সে ওই অবুঝ বাচ্চা মেয়েটার সাথে।

​আরিয়ান যখন পুরোনো অপরাধবোধে ডুবে এইগুলো ভাবছিল, ঠিক তখনই তার ফোনের স্ক্রিনটা জ্বলে উঠল। স্ক্রিনে ভেসে উঠছে দীর্ঘদিনের গার্লফ্রেন্ড তানজিনার নাম। প্রথমবার কলটা রিসিভ করল না সে, ফোনের দিকে তাকিয়ে রইল বিরক্ত চোখে।

কিন্তু ফোনটা কেটেই আবার বাজতে শুরু করায়, একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বেডে গা এলিয়ে দিয়ে কলটা রিসিভ করল।

​ওপাশ থেকে তানজিনা ঠোঁট ফুলিয়ে, একদম বাচ্চাদের মতো গলার স্বর করে নেকামি মেশানো সুরে বলে উঠল—"কী ওয়ানু (আরিয়ান)? এতক্ষণ লাগে একটা কল রিসিভ করতে? উফফ, আমি যে কখন থেকে বাবুটার জন্য ওয়েট করছি, তোমার কোনো আইডিয়াই নেই! তুমি কি এখন আমাকে আর একটুও লাভু করো না, বলো তো?"

ওপাশ থেকে তানজিনার এমন আদিখ্যেতা শুনে আরিয়ান ক্লান্ত সুরে শুধু বলল, "শরীরটা ভালো লাগছে না তানজি, প্লিজ আজ একটু চুপ থাকো।"

​আরিয়ানের এই উদাসীনতা তানজিনার মোটেও পছন্দ হলো না। সে গলার সুর পাল্টে তড়বড় করে বলে উঠল, "আরে, চুপ থাকব মানে? কাজের কথাটাই তো জিজ্ঞেস করা হয়নি! বাবু, তুমি ওই নোংরা মেয়েটাকে ডিভোর্স দিয়ে ঘর থেকে ঘাড় ধাক্কা দিয়ে বের করছ তো? নাকি এখনো ও তোমার ওখানেই পড়ে আছে?"

​তানজিনার মুখে এই কটু কথাগুলো শুনে আরিয়ানের বুকটা যেন আরও একবার খচখচ করে উঠল। সে কোনো জবাব দিল না, ওপাশ থেকে শুধু তার ভারী নিঃশ্বাসের শব্দ পাওয়া গেল।

​আরিয়ানকে চুপ থাকতে দেখে তানজিনা এবার পুরোপুরি রেগে গিয়ে চিৎকার করে উঠল, "কী হলো? কথা বলছ না কেন? নাকি ওর ওই নোংরা চেহারা দেখে মায়ায় পড়ে গেছ? দেখো আরিয়ান, আমি আগেও বলছি, এখনও বলছি—ও যদি ওই বাসায় থাকে, তাহলে আমি তোমার সাথে আর একটা কথাও বলব না! কোনো সম্পর্কই রাখব না তোমার সাথে! কোন সাহসে ও এখনো আমার বাবুটার আশেপাশে ঘোরে? জাস্ট লাথি মেরে বের করো ওই আপদটাকে!"

​তানজিনার এমন চড়া গলা আর কান্নাকাটি মাখানো রাগ দেখে আরিয়ান ঘাবড়ে গেল। তার মনে হলো, তার ভালোবাসার 'পাখি'টা বুঝি সত্যিই খুব কষ্ট পাচ্ছে। তানজিনাকে শান্ত করার জন্য সে নিজের মন থেকে জোর করে মৃত্তিকার সমস্ত পুরোনো অপরাধবোধ আর চিন্তা ঝেড়ে ফেলে দিল।

​ফোনটা কানের আরও কাছে নিয়ে নরম সুরে বলল, "আরেহ পাখি, রাগ করছ কেন? শান্ত হও। মৃত্তিকাকে নিয়ে এত ভাবার কিছুই নেই, ও জাস্ট একটা অতীত। তোমার জায়গা আমার জীবনে সবার ওপরে, এটা তো তুমি জানো। কাঁদলে তোমাকে একদম ভালো লাগে না, লক্ষ্মীটি আর কেঁদো না।"

আরিয়ান ফোনটা কানের কাছে আরও শক্ত করে চেপে ধরে তানজিনাকে শান্ত করার জন্য নিজের মন থেকে জোর করে মৃত্তিকার সমস্ত পুরোনো চিন্তা ঝেড়ে ফেলে দিল। ঠোঁটের কোণে ফুটিয়ে তুলল এক পৈশাচিক স্বস্তির হাসি।

​"রাগ করো না বেবি, তোমার জন্য একটা দারুণ সুখবর আছে! অবশেষে সেই আপদটাকে আমি চিরতরে বিদেয় করেছি। জাস্ট কয়েক মিনিট আগে ডিভোর্স পেপারে সই করিয়ে তাকে বাড়ি থেকে ঘাড় ধাক্কা দিয়ে বের করে দিয়েছি।"

​ওপাশ থেকে তানজিনা যেন খুশিতে লাফিয়ে উঠল। তার ন্যাকা গলার স্বর উধাও হয়ে সেখানে যোগ হলো এক অদ্ভুত পৈশাচিক আনন্দ। সে চরম উৎসাহের সাথে বলল, "ওহ রিয়েলি আরিয়ান? তোমার সেই তথাকথিত 'নোংরা' বউটা সত্যি চলে গেছে? কিন্তু ও কি কোনো ঝামেলা করেনি? মানে এত সহজে ডিভোর্স দিতে রাজি হলো? কোনো টাকা-পয়সা বা ব্ল্যাকমেইল করার চেষ্টা করেনি তো?"

​আরিয়ান একটা তাচ্ছিল্যের হাসি হাসল। সিগারেটে শেষ টান দিয়ে ধোঁয়াটা ঘরের বাতাসে উড়িয়ে দিয়ে বলল, "আরে না! ও তো এই বাড়ির আশ্রিতা ছিল, কুকুরের মতো পড়ে থাকত। ওর আবার কিসের তেজ? আমার মা ওকে এমনভাবে দু-চারটে সত্যি কথা শুনিয়েছে যে সই না করে ওর আর কোনো উপায় ছিল না।

জানো তানজিনা, মেয়েটার দিকে তাকালে আজ আমার আরও বেশি ঘেন্না লাগছিল। ১৬ বছর বয়স হয়েছে অথচ আজও নিজেকে সেই ধুলোমাখা জংলিদের মতো করে রাখে। একটুও রুচিবোধ নেই। উফ, ভাবতেই পারছি না আট বছর আগে বাবা আমার ঘাড়ে এমন একটা কুৎসিত, গেঁয়ো মেয়েকে চাপিয়ে দিয়েছিল!"

​তানজিনা খিলখিল করে হেসে উঠল। সেই হাসিতে কোনো নারীসুলভ কোমলতা ছিল না, ছিল অন্য একটা মেয়ের সর্বনাশে জয়ী হওয়ার অহংকার।

সে বলল, "যাক বাঁচা গেল! আমার তো সারাক্ষণ টেনশন হচ্ছিল—তুমি ইদানীং কেমন যেন করতে, ভাবছিলাম ফিরে গিয়ে আবার ওর মায়ায় পড়ো কি না! এখন ও বিদায় হয়েছে, আমার বুক থেকে একটা মস্ত বড় পাথর নেমে গেল।"

​"মায়া? কার ওপর? ওই নর্দমার কীটের ওপর?" আরিয়ানের কণ্ঠস্বর এবার আরও বিদ্রুপাত্মক শোনাল,

"তুমি জানো না বেবি, ওকে বাড়ি থেকে বের করে দিয়ে মনে হচ্ছে আমি এখন মুক্ত বাতাসে শ্বাস নিতে পারছি। এই বাড়িতে এখন আর কোনো দুর্গন্ধ নেই। আব্বা ওর জন্য একটু চিল্লাচিল্লি করেছিল, কিন্তু আমি তো আর কারো কথা শোনার মানুষ না। এখন এই সাম্রাজ্যে শুধু তুমি আর আমি। খুব শিগগিরই তোমাকে এই বাড়ির রানী বানিয়ে নিয়ে আসব।

আর ওই মৃত্তিকা... ও তো এখন কোনো রাস্তার ধুলোয় পড়ে থাকবে, যেখানে ওর আসল জায়গা। ওর মতো মেয়েদের কপালে রাজপ্রাসাদ জোটে না, ও ধুলোবালি আর নর্দমাতেই মানায়।"

​আরিয়ান যখন ফোনে এই কথাগুলো বলে হাসছিল, তখন সে জানত না যে নিয়তি আড়ালে বসে অন্য এক খেলা সাজাচ্ছে। সে জানত না যে তার এই নিষ্ঠুরতা তাকে ভবিষ্যতে কোন চরম মূল্য দিতে বাধ্য করবে। সে জানত না যে সে যাকে আজ 'নর্দমার কীট' বলে অপমান করে রাজপথের ধুলোয় ছুঁড়ে দিল, সেই মেয়েটিই একদিন তার এই পুরো খানদানী অহংকার আর ইগো এক নিমিষে ভেঙে চুরমার করে দেবে।

____________

এদিকে মৃত্তিকার চারপাশের জগতটা যেন এক নিমিষেই স্তব্ধ হয়ে গেছে। আরিয়ানের সেই বিষাক্ত কথাগুলো তার কানের পর্দায় অবিরাম হাতুড়ির মতো আঘাত করছে। অপমানে, লাঞ্ছনায় তার মস্তিষ্ক এখন অসার। সে যে রাজপথ দিয়ে হাঁটছে, সেই হুশটুকুও তার নেই।

​চেনা শহরটার নিয়ন আলো আজ বড্ড অচেনা আর নিষ্ঠুর লাগছে তার কাছে। ১৬ বছরের একটা মেয়ে, যার এই বিশাল শহরে মাথা গোঁজার কোনো দ্বিতীয় আশ্রয় নেই, সে আজ স্রেফ এক টুকরো কাগজের টানে রাস্তার ধুলোয় নিক্ষিপ্ত হলো।

চোখের জলগুলো গাল বেয়ে নামতে নামতে কখন যে শুকিয়ে নোনতা দাগ হয়ে গেছে, মৃত্তিকা তা টেরও পায়নি। চলার পথে কেউ কেউ তাকে ধাক্কা দিয়ে চলে যাচ্ছে, কেউ বা আবার কৌতূহলী চোখে তাকাচ্ছে এই আলুথালু বেশের মেয়েটার দিকে।

কিন্তু মৃত্তিকার ভেতরটা তখন কামারশালার মতো পুড়ছিল।

​বুকের ভেতর থেকে একটা আর্তনাদ দলা পাকিয়ে গলার কাছে এসে আটকে যাচ্ছে। আচ্ছা, 'ধুলোমাখা জংলি' হওয়াটা কি তার অপরাধ ছিল? নাকি অপরাধ ছিল আট বছর আগে এক চরম কনকনে শীতে অবুঝ বয়সে এই পরিবারটার আশ্রয়ে আসা?

আরিয়ানের দেওয়া 'নর্দমার কীট' উপাধিটা তার আত্মসম্মানে বিষাক্ত তীরের মতো বিঁধে আছে। আকাশে তখন মেঘ জমছিল, হয়তো মৃত্তিকার ভেতরের এই সীমাহীন লাঞ্ছনা দেখে আকাশেরও বুক কাঁপছিল।

​শূন্য দৃষ্টিতে সামনের পিচঢালা কালো রাস্তার দিকে তাকিয়ে মৃত্তিকা মনে মনে প্রতিজ্ঞা করল—আজ এই পিচঢালা পথেই সে তার সমস্ত দুর্বলতা, তার কান্না আর আরিয়ানের প্রতি থাকা শেষ মায়াটাকেও বিসর্জন দিয়ে যাবে।

আজ সে ভেঙেছে, কিন্তু ফুরিয়ে যায়নি। এই ধুলোবালি থেকেই সে আবার উঠে দাঁড়াবে, ঠিক যেভাবে পোড়া মাটি আগুনে পুড়ে আরও শক্ত হয়। আরিয়ান খান তাকে ঘর থেকে বের করেছে, কিন্তু তার ভেতরের বেঁচে থাকার লড়াইটাকে কেড়ে নিতে পারেনি।

মৃত্তিকার চারপাশের জগতটা যেন এক নিমিষেই স্তব্ধ হয়ে গেছে। আরিয়ানের সেই বিষাক্ত কথাগুলো তার কানের পর্দায় অবিরাম হাতুড়ির মতো আঘাত করছে। অপমানে, লাঞ্ছনায় তার কিশোরী মস্তিষ্ক এখন পুরোপুরি অসার। সে যে রাজপথ দিয়ে হাঁটছে, সেই হুশটুকুও তার নেই।

​বিকেলের তপ্ত রোদটা তখন আস্তে আস্তে ম্লান হয়ে আসছে। চারপাশের ব্যস্ত মানুষগুলো যে যার মতো তাড়াহুড়ো করে বাড়ি ফিরছে। কেউ ফুটপাত দিয়ে চেনা মানুষের হাত ধরে হাসিমুখে হেঁটে যাচ্ছে, কেউ বা রিকশায় চড়ে গল্প করতে করতে বাড়ি ফিরছে।

এই ভর-বিকেলের আলোতেও মৃত্তিকার চারপাশটা যেন এক ঘন অন্ধকারে ঢেকে গেছে। চলার পথে কৌতূহলী পথচারীরা বারবার তার এই আলুথালু বেশ, চোখের জল আর শূন্য দৃষ্টির দিকে তাকাচ্ছে। কেউ কেউ পাশ কাটিয়ে যাওয়ার সময় একটু দাঁড়িয়ে ফিসফিস করে কথাও বলছে, কিন্তু মৃত্তিকা যেন এক জীবন্ত লাশ।

কোথাও একটু বসার বা জিরিয়ে নেওয়ার বিন্দুমাত্র ইচ্ছে নেই তার। অবসাদগ্রস্ত পা দুটোকে টেনে টেনে সে শুধু সামনের দিকে হেঁটেই চলেছে—অনন্তহীন, উদ্দেশ্যহীন এক যাত্রায়।

​ধুলো ওড়ানো পিচঢালা রাস্তা দিয়ে অবিরাম হাঁটতে হাঁটতে সে ভাবতে লাগল—কী অদ্ভুত নির্মম তার এই জীবন! ছোটবেলা থেকে শুরু করে আজ এই ১৬ বছর বয়স পর্যন্ত জীবনের গতিটা তার একই রকম ট্র্যাজিক রয়ে গেল। নিয়তি তাকে কখনোই একটু সুখের মুখ দেখতে দিল না।

আট বছর আগে যখন সে মাত্র আট বছরের এক অবুঝ শিশু, সেই কনকনে শীতের রাতে সে কেঁদেছিল এক টুকরো আশ্রয়ের জন্য। আর আজ এতগুলো বছর পর, যখন তার সমবয়সী অন্য মেয়েরা মাত্র কৈশোর পেরিয়ে ডানা মেলছে, পুতুলখেলার বয়সটা কাটিয়ে সবে জীবনের স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছে—ঠিক সেই ১৬ বছর বয়সের পড়ন্ত বিকেলে তাকে নিঃস্ব হয়ে, ডিভোর্সের সিলমোহর কপালে নিয়ে রাস্তায় দাঁড়িয়ে কাঁদতে হচ্ছে, হেঁটে যেতে হচ্ছে একা একা। জীবনের পরিহাস তাকে যেন একই বৃত্তে বন্দি করে রেখেছে।

​পায়ের পাতা দুটো ব্যথায় অবশ হয়ে আসছে, ছিঁড়ে যাওয়া স্যান্ডেলটা বারবার চটি জুতো চিরে নরম চামড়ায় বিঁধে রক্তারক্তি হয়ে যাচ্ছে, তবুও সে থামল না। রাস্তার ধারের কোনো কালভার্ট বা দোকানের বেঞ্চ—কোথাও তার এই ক্লান্ত শরীরটা এলিয়ে দিতে মন চাইল না।

এই নিষ্ঠুর শহরের কোথাও এই ১৬ বছরের একাকী কিশোরীটার বসার মতো এক ইঞ্চি নিরাপদ জায়গাও যে আর অবশিষ্ট নেই!

​হাঁটতে হাঁটতে ঝাপসা চোখে বিকেলের ম্লান আকাশের দিকে তাকিয়ে মৃত্তিকা মনে মনে আওড়াতে লাগল, "আজ যদি আমার মা-বাবা বেঁচে থাকতেন, তাহলেও কি আমার জীবনটা এমন হতো? মা কি পারতেন তার এই ১৬ বছরের ছোট্ট মেয়েটাকে এভাবে এক কাপড়ে পরীর মতো সাজানো সংসার থেকে এই ভর-বিকেলে রাস্তায় ছুঁড়ে ফেলে দিতে? বাবা কি পারতেন আরিয়ান নামের ওই অহংকারী লোকটার পায়ের নিচে আমার আত্মসম্মানটা এভাবে পিষে যেতে দিতে?"

​উত্তরটা মৃত্তিকার খুব ভালো করেই জানা—না,

কখনোই এমন হতো না! মা-বাবা বেঁচে থাকলে আজ এই বিশাল শহরে তার একটা নিজস্ব নিরাপদ নীড় থাকত। আরিয়ানের মা যখন তাকে কুৎসিত, জংলি বলে গালি দিচ্ছিল, তখন তার মা তাকে বুকে টেনে নিয়ে বলতেন, 'তুই তো আমার রাজকন্যা, ওরা তোকে চেনার ক্ষমতা রাখে না।'

আরিয়ান যখন আজ তাকে 'নর্দমার কীট' বলে ডিভোর্স পেপারে জোর করে সই করাচ্ছিল, তখন তার বাবা এসে আরিয়ানের কলার চেপে ধরে হুঙ্কার দিয়ে বলতেন, 'আমার ১৬ বছরের নিষ্পাপ মেয়েটার গায়ে হাত তোলার সাহস তোকে কে দিয়েছে আরিয়ান খান?'

​মা-বাবার সেই চেনা ওল আর নিরাপদ ওম আজ নেই বলেই তো সে আজ এত অসহায়। নিজের বলতে এই বিশাল পৃথিবীতে কেউ নেই বলেই তো একটা সই আর কয়েকটা কাগজের টুকরো তার শৈশব আর কৈশোরের সাজানো জীবনকে এক নিমিষে ডাস্টবিনে ছুঁড়ে ফেলে দিতে পারল।

নিয়তির কী নিষ্ঠুর খেলা, যে মা-বাবা ভালোবেসে নাম রেখেছিলেন 'মৃত্তিকা', আজ আরিয়ানের দেওয়া 'রাস্তায় পড়ে থাকা ধুলো' উপাধির সাথে সেই নামটা কত সহজেই না মিলে গেল!

​নোনতা জল আর চোখের কাজলে গাল দুটো মাখামাখি হয়ে যাচ্ছে। বিকেলের সূর্যটা তখন দিগন্তে হেলে পড়ছে, চারপাশটা আবছা গোধূলির আলোয় ঢেকে যাচ্ছে। আর সেই ম্লান আলোর মাঝেই অবিরাম হাঁটতে থাকা মৃত্তিকার ভেতরের নরম কিশোরী মেয়েটা আস্তে আস্তে শক্ত হতে শুরু করল। সে বুঝতে পারল, এই নিষ্ঠুর পৃথিবীতে অনাথের চোখের জলের কোনো দাম নেই।

আজ সে ভেঙেছে, কিন্তু ফুরিয়ে যায়নি। এই ধুলোবালি মাখা রাস্তা দিয়ে হাঁটতে হাঁটতেই সে আবার মাথা উঁচু করে দাঁড়াবে, ঠিক যেভাবে মাটি আগুনে পুড়ে আরও শক্ত হয়। আরিয়ান খান তাকে ঘর থেকে বের করেছে, কিন্তু তার ভেতরের বেঁচে থাকার লড়াইটাকে কেড়ে নিতে পারেনি।

______

রাস্তার ধারের মানুষের আর্তচিৎকার আর বাসের তীব্র হর্নের শব্দ ছাপিয়ে এক ভয়াবহ নিস্তব্ধতা নেমে এল কয়েক সেকেন্ডের জন্য। মৃত্তিকা যখন তার দুচোখ শক্ত করে বন্ধ করে নিয়েছিল, ঠিক তখনই যমদূতের মতো সেই বিশাল কোচটি তার একদম ঘাড়ে এসে পড়ে।

​ড্রাইভার শেষ মুহূর্তে ব্রেক কষার সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছিল, কিন্তু হাইওয়েতে দ্রুতগামী বাসের গতিবেগ নিয়ন্ত্রণ করা অসম্ভব ছিল।

'ক্যাঁচ-ক্যাঁচ' শব্দে টায়ার ঘষটে যাওয়ার এক বীভৎস শব্দ হলো, আর পরক্ষণেই এক প্রচণ্ড ধাক্কা। মানুষের হাড় ভাঙার এক অসহ্য 'মড়মড়' শব্দ চারপাশের কোলাহলকে স্তব্ধ করে দিল।

​বাসের সামনের বিশাল লোহার বাম্পারটি মৃত্তিকার পাঁজরে এমনভাবে আঘাত করল যে তার ১৬ বছরের ছোট শরীরটা বাতাসের ফুটবলের মতো কয়েক ফুট ওপরে উঠে গেল। তারপর কয়েকটা ডিগবাজি খেয়ে রাস্তার ধারের একটি বৈদ্যুতিক খুঁটির ওপর আছড়ে পড়ল। খুঁটির সাথে ধাক্কা লেগে তার শরীরটা আবার ফিরে এসে আছড়ে পড়ল বাসের চাকার ঠিক কয়েক ইঞ্চি দূরে। বাসের হেডলাইট ভেঙে চুরমার হয়ে কাঁচের কণাগুলো চারদিকে বৃষ্টির মতো ছড়িয়ে পড়ল।

মৃত্তিকার সেই পুরনো ছেঁড়া ব্যাগটা ছিটকে পড়ল অনেক দূরে, তার প্রিয় বইগুলো ধুলো আর রক্তে লুটোপুটি খেতে লাগল।

​পিচঢালা কালো রাস্তাটা মুহূর্তেই লাল তাজা রক্তে ভিজে উঠল। বাসের চাকার ঘর্ষণে পোড়া রবারের গন্ধ আর ছোপ ছোপ রক্তের গন্ধে বাতাস ভারী হয়ে উঠেছে। পিচঢালা রাস্তার ধারালো পাথরে মৃত্তিকার বুকের একটু ওপরে, একপাশের চামড়া পুরোপুরি ছিলে গেছে; সেখান থেকে মাংস ফুঁড়ে রক্ত চুইয়ে পড়ছে পড়ছেচামড়া অবিরাম।

মাথা থেকে বের হওয়া গরম রক্ত কালো পিচের ওপর দিয়ে নালা হয়ে পাশের ড্রেনে গিয়ে মিশছে। তার সেই জট পাকানো চুলগুলো এখন জমাট বাঁধা রক্তে লেপ্টে একাকার। তার বাম হাতটি এক অকল্পনীয় কোণে বেঁকে গেছে—হাড় ভেঙে চামড়া ফুঁড়ে বেরিয়ে এসেছে। যন্ত্রণায় চিৎকার করার ক্ষমতাটুকুও নেই; তার ফুসফুস থেকে শুধু এক ফোঁটা আর্তনাদ রক্তমাখা ফেনা হয়ে মুখ দিয়ে বেরিয়ে আসছে।

সবচেয়ে অদ্ভুত আর নির্মম ব্যাপার হলো, আরিয়ান যখন আট বছর আগে মৃত্তিকাকে অন্ধকার রাতে ওই বেলকনিতে কনকনে ঠান্ডায় আটকে রেখেছিল, তখন তীব্র ভয়ে, আতঙ্কে আর কান্নায় অবুঝ মেয়েটা কোনো উপায় না পেয়ে নিজের যে হাতটাতে নিজেই কামড় দিয়েছিল,

আজ বাসের চাকায় পিষ্ট হয়ে ঠিক সেই হাতটিই থেঁতলে গেছে। আট বছর ধরে নিজের শরীরে বয়ে বেড়ানো সেই তীব্র ভয়ের স্মৃতি, নিজের দাঁতের কামড়ের সেই পুরোনো দাগটা আজ রাজপথের ধুলোয় রক্তে মিশে গেল। যেন আরিয়ানের দেওয়া সমস্ত অতীত, সমস্ত একাকীত্ব আর তার জীবনের শেষ স্মৃতিটুকুও প্রকৃতি আজ মৃত্তিকার শরীর থেকে চিরতরে মুছে দিতে চাইছে।

ভীষণ বীভৎস এই দৃশ্য দেখে আশেপাশের মানুষজন আতঙ্কে দৌড়ে এল, কেউ কেউ ভয়ে কাছে আসতে না পেরে দূরে দাঁড়িয়ে বমি করে দিল। মৃত্তিকার একটি চোখ রক্তে ডুবে গেছে, অন্য চোখটি আধখোলা অবস্থায় আকাশের দিকে স্থির। তার সেই ছেঁড়া ব্যাগের ভেতর থেকে ছিটকে পড়া বইগুলোর একটির পাতায় রক্তের দাগ লেগে লেখাটি অস্পষ্ট হয়ে গেছে— "মানুষ বড় একা।"

​ভিড়ের মধ্য থেকে একজন যুবক চশমাটা ঠিক করতে করতে কাঁপসা গলায় বলল, "ভাইরে ভাই! এ তো বাঁচার কথা না, । পুলিশ ডাকো, লাশ নিয়ে যাক!"

​পাশ থেকে এক মধ্যবয়সী লোক মাথায় হাত দিয়ে চিৎকার করে উঠলেন, "মেয়েটা তো শেষ! মাথাটা পুরো ফেটে চৌচির হয়ে গেছে। কে রে এই পাগলানিটা? এই ভর-বিকেলে মাঝরাস্তায় এভাবে কেউ অসাড় হয়ে হাঁটে?"

​ভিড় ঠেলে এক বৃদ্ধ লাঠি ভর দিয়ে এগিয়ে এলেন। মৃত্তিকার নিথর শরীরের দিকে তাকিয়ে তার চোখ বেয়ে জল গড়িয়ে পড়ল। তিনি পরম আক্ষেপে ফুঁপিয়ে উঠে বললেন, "আহারে বাছা আমার! ঠিক যেন একটা মরা পাখির মতো পড়ে আছে। শরীরটা কী নিথর! এই অল্প বয়সের কচি মেয়টা... কার অভিশাপে আজ এই পথের ধুলোয় শেষ হয়ে গেলি রে মা!"

​বিকেলের সেই ম্লান আলোয় মৃত্তিকা নিস্পন্দ হয়ে পড়ে রইল। তার চোখ দুটো আধখোলা, যেন এখনো সে আকাশের সেই ধ্রুবতারাটা খুঁজছে, যেটা তাকে এই জীবনের অন্ধকার থেকে মুক্তি দেবে। তার সেই রক্তমাখা ঠোঁটের কোণে যেন এক অদ্ভুত, মলিন প্রশান্তি—অবশেষে সে আরিয়ানের দেওয়া 'নোংরা' অপবাদ আর এই পৃথিবীর সমস্ত লাঞ্ছনা থেকে মুক্তি পেয়েছে।

​বাসের ড্রাইভার ততক্ষণে গাড়ি ফেলে পালিয়েছে। রাজপথে যখন ১৬ বছরের একটা অনাথ মেয়ে নিজের শেষ নিশ্বাসটুকু ত্যাগ করার মরণজয়ী লড়াই লড়ছে, ঠিক তখনই বিকেলের সূর্যটাও যেন এক বুক কান্না নিয়ে দিগন্তে মিলিয়ে গেল...

চলবে......

"ভুল-ক্রটি হলে ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখবেন ধন্যবাদ"

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৫ম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন