#গল্পটা_আমাদের_ছিল
#লেখিকা_জান্নাতুল_ফেরদৌস_জেরিন
#পর্বঃ৬
( অনুমতি বিহীন কপি করা নিষিদ্ধ🚫 )
ঠিক সেই মুহূর্তে আরিয়ান তার এসিরুমে বসে আয়েশ করে কফি খাচ্ছিল আর ল্যাপটপে তানজিনার সাথে ভিডিও কলে হাসাহাসি করছিল। তার সাদা ধবধবে দামি শার্টে কোনো দাগ নেই, কোনো রক্ত নেই। সে জানেও না যে, যাকে সে 'নোংরা' বলে বের করে দিয়েছে, সেই মেয়েটি এখন শহরের রাজপথে রক্তে ভেসে নিজের শেষ নিশ্বাসটুকু ত্যাগ করার লড়াই করছে
চারপাশের সেই মরণাপন্ন নিস্তব্ধতা ভেঙে একটি রুপালি রঙের বিলাসবহুল গাড়ি ভিড় ঠেলে রাস্তার একপাশে এসে থামল। গাড়ির দরজা খুলে বেরিয়ে এলেন এক অভিজাত দম্পতি—শহরের নামকরা সার্জন ডক্টর আর. এম. এবং তাঁর সমাজসেবী স্ত্রী।
রাস্তায় তখন উৎসুক মানুষের উপচে পড়া ভিড়, কিন্তু সবাই দূর থেকে তামাশা দেখতেই ব্যস্ত। কেউ মোবাইলের ক্যামেরা তাক করে ভিডিও করছে, কেউ বা নাকে রুমাল চেপে তীব্র বিরক্তি নিয়ে বলছে— "উফ! কী নোংরা মেয়েটা! আস্ত একটা বাস বোধহয় গায়ের ওপর দিয়ে চলে গেছে।"
মানুষের এই চরম নিষ্ঠুরতা উপেক্ষা করে ডক্টর আর. এম. আর তাঁর স্ত্রী ভিড় ঠেলে ঠিক সামনে গিয়ে দাঁড়ালেন। চোখের সামনে রক্তের সাগরে ডুবে থাকা নিথর দেহটার দিকে তাকাতেই ডক্টরের হৃৎপিণ্ড যেন থমকে গেল। তিনি আর নিজেকে ধরে রাখতে পারলেন না, তীব্র চিৎকারে চারপাশ কাঁপিয়ে বলে উঠলেন, "এই! দেখছ না এখানে কী হয়েছে? কেউ একটা অ্যাম্বুলেন্স ডাকো!"
ডক্টর আর. এম. আর এক মুহূর্তও নষ্ট করলেন না। তিনি দ্রুত এগিয়ে গিয়ে পিচঢালা রাস্তার ধুলো আর রক্তের মাঝে হাঁটু গেড়ে বসলেন। চারপাশের উৎসুক লোকগুলোর মধ্য থেকে দু-একজন চেনা মুখ অমনি বাধা দিয়ে উঠল, "আরে স্যার! ধরবেন না, ধরবেন না! পুলিশি ঝামেলা হবে। তা ছাড়া মেয়েটা তো দেখেই মনে হচ্ছে কোনো পাগলানি বা পথের ভিখারি, যা চোট পেয়েছে—বাঁচবে না নির্ঘাত!"
ডক্টর আর. এম. তাদের দিকে এক পলক তীব্র ঘৃণাভরে তাকালেন। সেই চাউনিতে এত তেজ ছিল যে লোকগুলো নিমেষেই চুপসে গেল। তিনি পরম যত্নে মৃত্তিকার গলার কাছে আঙুল ছোঁয়ালেন। খুব ক্ষীণ, একদম শেষ মুহূর্তের একটা স্পন্দন আঙুলের ডগায় অনুভূত হলো। যেন প্রাণটা শরীর ছেড়ে চলে যেতে গিয়েও কারোর অপেক্ষায় আটকে আছে।
ডক্টর আর. এম. ব্যগ্র গলায় চেঁচিয়ে উঠলেন, "রিন, ও এখনো বেঁচে আছে! ওর বাঁচার জেদ অনেক বেশি মনে হচ্ছে । জলদি গাড়ির পেছনের সিটটা খালি করো!"
স্বামীর কথা শেষ হওয়ার আগেই রিন নিজের গা থেকে দামি সিল্কের ওড়নাটা টেনে খুললেন। কোনো দ্বিধা ছাড়া, কোনো সংকোচ ছাড়া সেই ওড়নাটা চেপে ধরলেন মৃত্তিকার মাথা থেকে ফিনকি দিয়ে বের হওয়া রক্তক্ষরণের ওপর।
ধবধবে সাদা ওড়নাটা মুহূর্তেই কালচে লাল রক্ত শুষে নিয়ে ভারী হয়ে উঠল। কিন্তু রিনের চোখে-মুখে কোনো ঘেন্না নেই, বরং সেখানে এক অদ্ভুত মাতৃত্ব জেগে উঠেছে। তিনি পরম মমতায় মৃত্তিকার সেই কাদা মাখা, রক্তে ভেজা মুখটা নিজের কোলে তুলে নিলেন।
তীব্র রক্তের গন্ধে রিনের নিজেরই যেখানে বমি আসার কথা, সেখানে তাঁর বুক চিরে একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এলো।
মেডিকেল কলেজের স্টিকার লাগানো দামী গাড়িটায় যখন মৃত্তিকার রক্তাক্ত শরীরটা তোলা হলো, ড্রাইভার কাঁচুমাচু হয়ে আয়না দিয়ে তাকিয়ে বলল, "স্যার, গাড়ির সিটগুলো তো একদম নষ্ট হয়ে যাচ্ছে! চামড়ার সিট, রক্ত আর কাদা লেগে তো..."
ডক্টর আর. এম. সিংহের মতো গর্জে উঠলেন, "গাড়ির সিটের চেয়ে একটা মানুষের জীবনের দাম অনেক বেশি, কাশেম! মুখ বন্ধ করে গাড়ি স্টার্ট দাও। আর হসপিটালের ইমার্জেন্সিতে ফোন করে ওটি (OT) রেডি রাখতে বলো!"
গাড়ি তীব্র গতিতে ছুটে চলল হসপিটালের দিকে। মৃত্তিকার শরীর থেকে চুয়ে পড়া রক্তে গাড়ির দামী ইন্টেরিয়র ভিজে একাকার হয়ে যাচ্ছে। রিন পরম যত্নে মৃত্তিকার জট পাকানো চুলগুলো কপাল থেকে সরিয়ে দিচ্ছিলেন। আঙুলে কাদা আর জমাট বাঁধা রক্ত লেগে যাচ্ছে, অথচ রিনের সেদিকে খেয়াল নেই।
মেয়েটির শরীরের জামা ছেঁড়া, অপুষ্টির ছাপ স্পষ্ট। কিন্তু এই রক্তাক্ত, বিধ্বস্ত অবস্থায়ও মৃত্তিকার বন্ধ চোখের পাতা আর তীক্ষ্ণ খাড়া নাকটা দেখে রিনের মনে একটা খটকা লাগল। এই মায়াবী মুখ কোনো সাধারণ পথের ভিখারির হতে পারে না। এর আড়ালে নিশ্চয়ই কোনো এক বড় অন্যায় বা দীর্ঘশ্বাসের ইতিহাস লুকিয়ে আছে।
হঠাৎ করেই ঝাঁকুনি দিয়ে গাড়িটা একটা স্পিডব্রেকার পার হতেই মৃত্তিকা যন্ত্রণায় কুঁকড়ে উঠল। তার ঠোঁটের কোণ দিয়ে এক ফোঁটা তাজা রক্ত গড়িয়ে পড়ল রিনের হাতে। অবশ, অস্ফুট স্বরে মৃত্তিকা শেষবারের মতো শুধু একটা শব্দ উচ্চারণ করল— "আব্বা..."
পরমুহূর্তেই তার মাথাটা রিনের কোলে একপাশে ঢলে পড়ল, হাতটা সিট থেকে নিচে ঝুলে গেল।
রিন আতঙ্কে আর. এম.ডক্টরের হাত চেপে ধরে কেঁদে উঠলেন, "রমেন! ও কি... ও কি আমাদের ছেড়ে চলে গেল? একটু জোরে চালাও গাড়িটা, প্লিজ!"
শহরের নামকরা 'মেট্রোপলিটন হসপিটাল'-এর ইমার্জেন্সি গেটের সামনে যখন ডক্টর আর. এম.-এর গাড়িটা এসে টায়ার কাঁপিয়ে থামল, তখন চারপাশের বাতাসে যেন এক বীভৎস আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ল।
ট্রলি নিয়ে ছুটে আসা ওয়ার্ড বয়রা যখন গাড়ি থেকে মেয়েটিকে নামাল, তখন তাদের হাত জোড়া রক্তে ভিজে গেল। মৃত্তিকার সারা শরীর রক্তে মাখামাখি, কাদা আর ধুলোয় মাটির সাথে মিশে গেছে; চেনার কোনো উপায় নেই সে আসলে কে। হাসপাতালের সাদা ধবধবে ট্রলিটা মুহূর্তে লাল হয়ে উঠল। মেয়েটির গা থেকে আসা কাদা আর রক্তের তীব্র গন্ধ পেয়ে হাসপাতালের ওয়ার্ড বয়রা পর্যন্ত তাকে ওটি-র দিকে ঠেলে নিয়ে যেতে ইতস্তত করছিল।
ডিউটি অফিসার মেয়েটির ক্ষতবিক্ষত শরীরের দিকে তাকিয়ে নাক কুঁচকে ডক্টর আর. এম.-এর দিকে তাকালেন। অত্যন্ত শীতল গলায় বললেন, "স্যার, এই আননোন কেসটা আমরা নিতে পারছি না। প্রথমত এর কোনো লোক নেই, পুলিশি ঝামেলা আছে।
দ্বিতীয়ত ওর যে কন্ডিশন—গায়ের ওপর দিয়ে বাস গেছে, শরীরের অর্ধেক হাড় মনে হয় গুঁড়ো হয়ে গেছে। ইন্টারনাল ব্লিডিং হচ্ছে প্রচণ্ড। আমাদের এখানে এই মুহূর্তে মাল্টি-অর্গান ট্রমা সেন্টারের কোনো বেড খালি নেই। আপনি একে সরকারি হাসপাতালে নিয়ে যান, স্যার। এখানে শুধু শুধু মারা গেলে আমাদের হসপিটালের রেকর্ড নষ্ট হবে।"
ডক্টর আর. এম. আর সহ্য করতে পারলেন না। ডিউটি অফিসারের কলার চেপে ধরার মতো করে গর্জে উঠলেন, "আমি এই হসপিটালের চিফ সার্জন ডক্টর আর. এম. বলছি! পেশেন্ট যদি বিনা চিকিৎসায় আমার ইমার্জেন্সি গেটে মারা যায়, তবে এই হসপিটালের লাইসেন্স আমি আজ রাতেই ক্যানসেল করাব!
কার ঘাড় কয়টা আছে আমি দেখতে চাই। জলদি ওকে আইসিইউ-তে শিফট করো, মুভ!"
চিফ সার্জনের এই রুদ্রমূর্তি দেখে পুরো ইমার্জেন্সি ব্লক কেঁপে উঠল। মুহূর্তের মধ্যে ট্রলি ছুটে গেল আইসিইউ-র দিকে। বাইরে করিডোরে রিন নিজের রক্তাক্ত ওড়নাটা হাতে নিয়ে ঠায় দাঁড়িয়ে রইলেন।
তাঁর চোখের সামনে ভেসে উঠছে মেয়েটির ওই শেষ - আকুতি—'আব্বা'।
কিন্তু আইসিইউ-তে নেওয়ার দীর্ঘ আধা ঘণ্টা পর ভেতরের লাল আলোটা নিভে গেল। নিউরো সার্জন ডক্টর আসাদ ক্লান্ত পায়ে বেরিয়ে এসে ভারী নিঃশ্বাস ফেলে মাথা নাড়লেন। তিনি আর. এম. সাহেবকে একটু আড়ালে ডেকে নিয়ে নিচু স্বরে বললেন, "আর. এম. ভাই, পেশেন্টের কন্ডিশন খুবই ক্রিটিক্যাল।
মেয়েটার মাথায় যে ইনজুরি হয়েছে সেটা 'ডিফিউজ অ্যাক্সনাল ইনজুরি' । সহজ কথায়, মস্তিষ্কের ভেতরে সব ছিঁড়ে গেছে। এ দেশে এর চেয়ে বেশি চিকিৎসা আমাদের জানা নেই। তার ওপর লিভারেও ইন্টারনাল ব্লিডিং হচ্ছে। সত্যি বলতে ভাই, এই অজ্ঞাত মেয়েটির বাঁচার সম্ভাবনা মাত্র পাঁচ পার্সেন্ট। ও অলরেডি কোমায় চলে গেছে।"
ডক্টর আসাদ আর. এম.-এর কাঁধে হাত রেখে একটু নরম সুরে বললেন, "তুমি আর ভাবি কেন এই নোংরা, পরিচয়হীন ভিখারি মেয়েটার জন্য এত ঝামেলা নিচ্ছ বলো তো? কার জন্য লড়ছ? ও তো এই হাসপাতালেই শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করবে। শুধু শুধু নিজেদের ইমোশন নষ্ট করছ।"
আসাদের কথা শেষ হতে না হতেই পেছন থেকে রিন আর্তনাদ করে উঠলেন। কখন যে তিনি এসে পেছনে দাঁড়িয়েছেন, কেউ টের পায়নি। চোখের জল মুছতে মুছতে রিন ডক্টর আসাদের সামনে এসে দাঁড়ালেন।
রিন কাঁপানো গলায় বললেন, "আসাদ ভাই, ও ভিখারি হতে পারে, পরিচয়হীন হতে পারে, কিন্তু ও তো কারো সন্তান! মরার আগে ও ডুকরে কেঁদে 'আব্বা' বলে ডেকেছে। একটা বার ভাবুন, এই মেয়েটা যদি আপনার বা আমার সন্তান হতো, তাহলেও কি আপনি বলতেন ও নোংরা? ওর বাঁচার সম্ভাবনা যদি মাত্র এক পার্সেন্টও হয়, আপনারা সেই একটা পার্সেন্ট নিয়েই লড়ুন। আমি মায়ের জাত, আমার মন বলছে মেয়েটা মরতে আসেনি, ও বাঁচবে!"
ডক্টর আর. এম. স্ত্রীর দিকে তাকালেন। তাঁর নিজের চোখও তখন পানিতে টলমল করছে। তিনি ডক্টর আসিফের হাত দুটো শক্ত করে চেপে ধরে বললেন, "আসাদ, আজ কোনো প্রফেশনাল ইগো না, আজ একজন বাবার জায়গায় দাঁড়িয়ে তোকে অনুরোধ করছি... ওটি রেডি কর। পাঁচ পার্সেন্ট আশা নিয়েই আমরা আজ টেবিল থিয়েটারে নামব। বাকিটা ওপরওয়ালার ইচ্ছে।"
ডক্টর আসাদ স্পষ্ট জানিয়ে দিলেন, যদি সত্যিই মেয়েটিকে বাঁচাতে হয় তবে আগামী কয়েক ঘণ্টার মধ্যে তাকে সিঙ্গাপুরের 'মাউন্ট এলিজাবেথ হসপিটালে' নিয়ে যেতে হবে।
কারণ, এই মুহূর্তে তার যে নিউরোলজিক্যাল কন্ডিশন, তাতে একমাত্র ওখানকার উন্নত রোবটিক মাইক্রো-সার্জারির মাধ্যমেই অলৌকিক কিছু ঘটা সম্ভব।
ডক্টর আর. এম. এক সেকেন্ডের জন্যও দ্বিধা করলেন না। নিজের আজীবনের সঞ্চয়, সামাজিক প্রতিপত্তি আর সমস্ত ক্ষমতা ব্যবহার করে তিনি জরুরি ভিত্তিতে একটি এয়ার অ্যাম্বুলেন্সের ব্যবস্থা করলেন।
এদিকে হসপিটালের কাউন্টারে ফর্মে লেখার মতো মেয়েটির কোনো পরিচয় পাওয়া যায়নি। তার সাথে থাকা রক্তে ভেজা ব্যাগটা থেকে পুলিশ শুধু উদ্ধার করেছে কয়েকটা মলাট ছেঁড়া গল্পের বই আর একটা নিব ভেঙে যাওয়া সস্তা কলম। কোনো নাম, কোনো ঠিকানা—কিছুই নেই। বাধ্য হয়েই এয়ার অ্যাম্বুলেন্সের অফিশিয়াল ফর্মে তার নাম লেখা হলো— "Unknown Patient - 01"।
এয়ারপোর্টের রানওয়েতে যখন ছোট জেট বিমানটি এসে দাঁড়াল, তখন আকাশ ভেঙে তীব্র বৃষ্টি নামছে। চারপাশ ঝাপসা করে দেওয়া এই অবিশ্রান্ত বর্ষণ যেন এক অদ্ভুত কাকতালীয় সংযোগ। ঠিক এমনই এক মেঘলা, বৃষ্টিভেজা রাত জড়িয়ে ছিল আট বছর আগে মৃত্তিকার বাসর রাতেও!
মৃত্তিকাকে যখন ভেন্টিলেটর, মনিটর আর অজস্র লাইফ-সাপোর্ট পাইপের বেড়াজালে মুড়িয়ে অতি সাবধানে বিমানে তোলা হচ্ছিল, তখন তাকে চেনার আর কোনো উপায়ই অবশিষ্ট ছিল না। মাথায় জরুরি সার্জারির প্রয়োজনে ডাক্তাররা তার সেই জট পাকানো চুলগুলো সম্পূর্ণ কামিয়ে ফেলেছেন। চোখের ওপর, কপালে, গালে—সারা মুখমণ্ডল সাদা ব্যান্ডেজে ঢাকা। চেনা চ্যাপ্টা নাক আর বন্ধ চোখের পাতাটুকু ছাড়া অবশিষ্ট নেই কিছুই।
ইঞ্জিনের গর্জন তুলে বিমানটি রানওয়ে ছেড়ে মেঘের বুক চিরে আকাশের দিকে ডানা মেলল। কেবিনের মৃদু আলোয় রিন এসে বসলেন মৃত্তিকার পাশে। আলতো করে হাত রাখলেন মেয়েটির ঠান্ডা, ব্যান্ডেজ করা অবশ হাতটার ওপর। নিজের অজান্তেই রিনের চোখ থেকে এক ফোঁটা তপ্ত জল গড়িয়ে পড়ল মৃত্তিকার নিথর আঙুলে।
তিনি ডুকরে কেঁদে উঠে বলল, "কে এই মেয়েটি? যার কোনো পরিচয় জানি না, অথচ যার জন্য আমার ভেতরটা এভাবে ভেঙে চুরমার হয়ে যাচ্ছে? কার এত বড় অভিশাপ আর নির্মমতা নিয়ে ও আজ মাঝরাস্তায় এসে থমকে দাঁড়াল? ওর শরীর থেকে আসা এই ধুলো, কাদা আর রক্তের গন্ধ কেন আমার মাতৃত্বকে বারবার নাড়া দিচ্ছে?
কেন মনে হচ্ছে, ও কোনো সাধারণ দুর্ঘটনার শিকার নয়—এর আড়ালে লুকিয়ে আছে জঘন্য কোনো অন্যায় আর এক আকাশ সমান দীর্ঘশ্বাস?"
বাইরে তখনো বজ্রপাতের শব্দে আকাশ কাঁপছে, আর বিমানের ভেতরে এক অচেনা মেয়ের প্রাণ বাঁচানোর জন্য চলছে এক অসম, নিঃশব্দ লড়াই।
---------------
বিমানটি যখন গগনবিদারী শব্দ করে মেঘের বুক চিরে সিঙ্গাপুরের উদ্দেশ্যে উড়াল দিল, তখন নিচে পড়ে রইল এক নিষ্ঠুর শহর, ক্ষমতার দম্ভে অন্ধ এক অহংকারী আরিয়ান আর এক বিধ্বস্ত, অপরাধী পরিবার। তারা টেরও পেল না, কোন জীবন-মরণের খেলায় এক অচেনা ফেরেস্তা এসে তাদের সমস্ত পাপের সাক্ষীটাকে চিরতরে এই শহর থেকে দূরে সরিয়ে নিয়ে যাচ্ছে।
সিঙ্গাপুরের সেই নামকরা অত্যাধুনিক হাসপাতালের স্টেরাইল রুমে যখন মৃত্তিকাকে নিয়ে যাওয়া হলো, তখনো সে রক্ত, কাদা আর ধুলোর এক বীভৎস পিণ্ড। প্রথম দেখায় সেখানে নিয়োজিত বিদেশি নার্স এবং প্যারামেডিকরা পর্যন্ত শিউরে উঠেছিলেন। ডক্টর আর, এম আর রিন বাইরে করিডোরে অস্থির হয়ে পায়চারি করছিলেন। প্রতিটা সেকেন্ড যেন এক একটি যুগের মতো ভারী মনে হচ্ছিল
ভেতরে তখন মৃত্তিকার শরীর থেকে সেই নোংরা, রক্তে ভেজা তালি দেওয়া সুতির শাড়িটা কাঁচি দিয়ে কেটে সরিয়ে ফেলা হচ্ছিল। বিশেষ অ্যান্টিসেপটিক সলিউশন দিয়ে যখন তার শরীরের জমাট বাঁধা কালচে রক্ত আর রাস্তার পিচ ধুয়ে পরিষ্কার করা শুরু হলো, তখনই ঘটল সেই বিস্ময়কর ঘটনা।
কাদা আর রক্তের সেই কুৎসিত আস্তরণটা সরে যেতেই ওটি-র (OT) অ্যাসিস্ট্যান্ট নার্সের হাতের সুতি গজ আচমকা থমকে গেল। সে বিস্ময়ে ডক্টর চ্যানের দিকে তাকাল। সেই নোংরা, তালি দেওয়া পোশাকের নিচে লুকিয়ে ছিল গভীর কিছু ক্ষত।
কিন্তু ডক্টর চ্যানকে সবচেয়ে বেশি চমকে দিল অন্য কিছু। বাসের চাকার তাজা ক্ষত আর বুকের উপরের ছাড়াও মেয়েটির পিঠে আর কোমরে এমন কিছু গভীর, কালচে দাগ রয়ে গেছে—যা কোনো দুর্ঘটনার নয়। ডক্টর চ্যান একজন অভিজ্ঞ সার্জন হিসেবে এক পলকেই বুঝলেন, এই দাগগুলো অনেক পুরোনো এবং কোনো এক পৈশাচিক ও নির্মম অত্যাচারের নীরব সাক্ষী! কিন্তু এই মরণাপন্ন অবস্থায় সেই রহস্য নিয়ে ভাবার কোনো অবকাশ তাদের ছিল না...
১২ ঘণ্টার পর
অপারেশন থিয়েটারের বাইরে ডক্টর রাশেদ ও মেহেরিন স্তব্ধ হয়ে বসে আছেন। দীর্ঘ ১২ ঘণ্টার এক ম্যারাথন অপারেশন। বাইরে সিঙ্গাপুরের আকাশে তখন ভোরের আলো ফুটছে। ঠিক তখনই ওটি-র ওপরের লাল আলোটা নিভে গেল। ভারী কাঁচের দরজা ঠেলে ক্লান্ত পায়ে বেরিয়ে এলেন প্রধান রোবটিক সার্জন ডক্টর চ্যান। তাঁর চোখেমুখে কোনো স্বস্তি নেই, বরং মিশে আছে এক গভীর, বিষণ্ণ বিস্ময়।
রিন বুকভরা আশা নিয়ে ছুটে গেলেন, "ডক্টর চ্যান? আমার মেয়েটা... ও ঠিক আছে তো?"
ডক্টর চ্যান তাঁর সার্জিক্যাল গ্লাভস জোড়া খুলতে খুলতে ডক্টর রাশেদের দিকে তাকালেন। একজন ডাক্তার অন্য ডাক্তারের ভাষা বোঝেন। ডক্টর চ্যান আলতো করে মাথা নাড়লেন, যাঁর অর্থ—পৃথিবীর সব বিজ্ঞান যেখানে এসে হার মেনে যায়।
তিনি অত্যন্ত ভারী গলায় বললেন, "আই অ্যাম সরি, ডক্টর আর. এম. । উই ট্রাইড আওয়ার বেস্ট। কিন্তু ওর লিভারের ইন্টারনাল হ্যামারেজ আমরা কোনোভাবেই থামাতে পারিনি। রোবটিক মাইক্রো-সার্জারি দিয়ে মস্তিষ্কের ড্যামেজ কিছুটা রিকভার করা গেলেও, বডি আর রেসপন্স করছে না। মাল্টি-অর্গান ফেইলিওর শুরু হয়ে গেছে।"
রিন চিৎকার করে উঠতে চাইলেন, কিন্তু তাঁর গলা দিয়ে কোনো শব্দ সরল না। ডক্টর চ্যান দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, "ওর হার্টবিট ড্রপ করছে। বড়জোর আর কয়েক মিনিট... আপনারা চাইলে শেষ দেখা দেখতে পারেন।"
কাঁচের ওপারে, আইসিইউ-র লাইফ সাপোর্ট মনিটরের দিকে রিন তাকালেন। ধক করে উঠল তাঁর বুক। মনিটরের সবুজ রেখাটি, যা এতক্ষণ আঁকাবাঁকা হয়ে জীবনের জানান দিচ্ছিল, তা আস্তে আস্তে সোজা লাইনে পরিণত হতে শুরু করেছে। ডিক-ডিক শব্দটা ক্রমশ ধীর হয়ে আসছে।
রিন কাঁচের দেয়ালে হাত চাপড়ে ডুকরে কেঁদে উঠলেন। যে মেয়েটির পরিচয় তিনি জানতে পারলেন না, যাকে একটা বার 'মা' বলে ডাকার সুযোগ পেলেন না, সে আজ চিরদিনের জন্য শান্ত হয়ে যাচ্ছে। হাসপাতালের ধবধবে সাদা বিছানায় শুয়ে থাকা মৃত্তিকার সেই ব্যান্ডেজ করা শরীরটা যেন এক নিথর পাথরের মূর্তি। কোনো ছটফটানি নেই, কোনো যন্ত্রণা নেই।
অবহেলা, লাঞ্ছনা আর আরিয়ানের দেওয়া সমস্ত নির্মমতার ওপাড়ে, এক আকাশ দীর্ঘশ্বাস বুকে নিয়ে 'Unknown Patient - 01' নামের মেয়েটি মরণাপন্ন নিস্তব্ধতার দেশে পাড়ি জমাল। সব লড়াইয়ের অবসান ঘটিয়ে সে এখন এক টুকরো নিথর লাশকাটা শরীর মাত্র!
চলবে........
" ভুল-ক্রটি হলে ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখবেন ধন্যবাদ "