#গল্পটা_আমাদের_ছিল
#লেখিকা_জান্নাতুল_ফেরদৌস_জেরিন
#পর্বঃ৩০
~~ অনুমতি বিহীন কপি করা নিষিদ্ধ 🚫 ~~
⚠️ সতর্কীকরণ ⚠️
এই গল্পটি সম্পূর্ণ কাল্পনিক। এতে কিছু সহিংস, মানসিকভাবে সংবেদনশীল ও গালিগালাজপূর্ণ বিষয়বস্তুর উল্লেখ রয়েছে। লেখক কোনো ধরনের সহিংসতা বা অনৈতিক কাজকে সমর্থন করেন না। অনুগ্রহ করে গল্পটিকে শুধুমাত্র একটি সাহিত্যকর্ম হিসেবে পড়ুন।
ইশতিয়াক দেওয়ান চরম আক্রোশে মাকসুদ চৌধুরীর দিকে তাকিয়ে এক প্রকার থুতু ছিটানোর মতো করে বললেন—
— "দেখ মাকসুদ? এই বাসার মেয়ে আমি আমার ঘরে তুলব না? এইটুকু একটা মেয়ে এতগুলো মুরুব্বির সামনে দাঁড়িয়ে কীভাবে অপমান করছে আমাদের! সবাইকে এভাবে কথা শোনাচ্ছে! এই একটা পিস দেখলেই তো পরিষ্কার বোঝা যায় যে এই চৌধুরী বাড়ির বাকি মেয়েরা আসলে কেমন লুজ ক্যারেক্টারের আর কেমন বেয়াদপ!"
ওনার এই ঢালাও কটূক্তি শুনে রাইশার মা সাহেলা চৌধুরী নিজের হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে ইলার দিকে এক্কেবারে মারমুখী হয়ে চেঁচিয়ে উঠলেন,
— "এই মেয়ে, চুপ কর তো একদম! তোর এই নোংরা আর লাগামছাড়া আচরণের জন্য আজ আমাদের রাইশা সহ এই বাসার সব মেয়ের দিকে আঙুল উঠছে! তোকে এখানে কে মুরুব্বিয়ানা করতে ডাকছে শুনি? যত্তসব আপদ!"
সাহেলা চৌধুরীর মুখে এই উল্টো ব্লেম গেম শুনে ইলা এক মুহূর্তের জন্য থমকে গেল। ও নিজের কপাল চাপড়ে এক চরম তাচ্ছিল্যের হেসে বলল,
— "বাহ! ল-ঠেলা! যার ফ্যামিলির জন্য, যার মেয়ের ভালো করার জন্য আমি এতক্ষণ ধরে এত কিছু করতেছি—সে-ই এখন উল্টা আমারে বলে চুপ থাকতে! ওরে ইরহাম, জুনায়েদ, মাহিম—তোরা কে কোথায় আছিস রে? এই বাল*টাকে সরা তো এখান থেকে!
ওনারে ওনার রুমে পাঠা, ওনার চেহারা আমি আর এক সেকেন্ডও দেখতে চাচ্ছি না!"
মাকসুদ চৌধুরী এবার নিজের মেয়ের গায়ে হাত তোলার পর ভাইয়ের মেয়ের এই তেজ দেখে চরম রেগে ওনার ছোট ভাই মিস্টার চৌধুরীর (আশরাফ চৌধুরী) দিকে তেড়ে এসে বললেন—
— "ছোট! তোর এই উগ্র মেয়েটাকে এখান থেকে সরা! ওর ওই নর্দমার মতো মুখের জন্য কেন দেওয়ান বাড়ির লোক আমাদের সব মেয়েকে এক পাল্লায় মাপছে? ওকে কন্ট্রোল কর!"
মিস্টার চৌধুরী কিছু বলার জন্য মুখ খোলার আগেই ইলা ওনার পাপার সামনে হাত বাড়িয়ে কড়া গলায় বলল ,
— "পাপা! তুমি একদম চুপ থাকো আজ। আজকে যা বলার আমি বলব, আর এখানে বাকি সবাই জাস্ট চুপ করে শুনবে!"
কথাটা বলেই ও ওনার ফুফু মালিহা, চাচা আমজাদ, চাচি আর দাদি সজলা বেগমের দিকে এক ভয়ংকর খুনে দৃষ্টিতে তাকিয়ে কড়া গলায় ওয়ার্নিং দিল ,
— "আর এখানে বসা যে যে যাদের বডিতে এখনো মারাত্মক চুলকানি আছে, ওনারা দয়া করে নিজ দায়িত্বে এই ড্রইংরুম থেকে এখনই বিদায় হন। নয়তো এরপরে আমি যদি ওনাদের আমার স্টাইলে ইম্পেরিয়াল ভাবে ট্রিট করা শুরু করি, তখন কিন্তু ইজ্জতের ফালুদা এক সেকেন্ডে বাতাসে উড়বে! বলে রাখলাম!"
ইলার এই ওপেন থ্রেট শুনে ইশতিয়াক দেওয়ান আর এক মুহূর্তও সেখানে থাকতে রাজি হলেন না। তিনি নিজের ফ্যামিলির সবাইকে তাড়া দিয়ে বলতে লাগলেন ,
— "চলো সবাই! এই নোংরা আর ছোটলোকদের বাসায় আমাদের এক সেকেন্ড বসার কোনো দরকার নাই! চলো এখান থেকে!"
সবাই যখন চলে যাওয়ার জন্য পা বাড়াচ্ছে, ঠিক তখনই রাফসান অসহায় একটা ফেস করে ওনার বাপের হাত চেপে ধরে আকুতি করল ,
— "আব্বু! প্লিজ এমন কোরো না! আমি রাইশাকে ছাড়া এখান থেকে এক পা-ও যাব না। তোমরা কেন অতীত নিয়ে আজ আমাদের জীবনটা ধ্বংস করছ? রাইশা সত্যি অনেক ভালো মেয়ে আব্বু! এমনকি এই চৌধুরী বাড়ির বাকি সব মেয়েও অনেক ভালো..."
ইশতিয়াক দেওয়ান নিজের ছেলের মুখে শত্রুপক্ষের গুনগান শুনে এক্কেবারে বাঘের মতো গর্জে উঠে ওনাকে এক প্রচণ্ড ধমক দিয়ে বললেন ,
— "অনেক বেশি বড় হয়ে গেছিস না তুই? এখন বাপের ওপর দিয়ে কথা বলিস? কোন সাহসে ওনাদের দালালি করছিস আমার সামনে দাঁড়িয়ে?!"
ইলা এতক্ষণ রাফসানের এই ভেড়া মার্কা অসহায়ত্ব দেখছিল। ওর আম্মুর দিকে তাকিয়ে শান্ত গলায় বলল ,
— "আম্মু, তুমি যাও। ওনারা চলে যাওয়ার আগে ওনাদের ওই ভাইদের সাথে তোমার যা কথা বলার বলো।"
তারপর ও এক ঝটকায় ঘুরে এক্কেবারে জ্বলন্ত চোখে রাফসানের দিকে তাকাল। ওনার ঠোঁটের কোণে তখন এক চরম তাচ্ছিল্য আর অবজ্ঞা। ও রাফসানকে উদ্দেশ্য করে তপ্ত রাগে ফেটে পড়ল ,
— "আরেহ ধুর! কোন বালের আর কোন ছাগল মার্কা ভালোবাসা বাসেন ভাই আপনি? নিজের ভালোবাসার মানুষের গায়ে তার বাপ সবার সামনে ঠাস করে একটা চড় বসিয়ে দিল, আর আপনি সেখানে মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে ওনাদের পা চাটছেন? শক্তভাবে বাপের সামনে দাঁড়িয়ে নিজের ভালোবাসার অধিকারটা আদায় করতে পারেন না? এর থেকে ভালো হতো যদি আপনি এই প্রেম না করে ঘরে গিয়ে নিজের মায়ের আঁচল ধরে পুতুল খেলে ঘুরে বেড়াতেন! প্রেম পিরিতি না করলেই তো হতো! এত টুনি মার্কা ছোট আর ইঁদুরের কলিজা নিয়ে কোন সাহসে চৌধুরী বংশের মেয়ের সাথে প্রেমের ডালা সাজাতে আসছিলেন শুনি? হুদাই নায়ক সেজে ভাব মারেন, কাজের বেলায় একদম জিরো! ফালতু একদম!"
কথাগুলো এক নিঃশ্বাসে উগরে দিয়ে ইলা একটা দীর্ঘ আর তপ্ত শ্বাস ছাড়ল। ওর রাগে তখন মাথা ফেটে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে, ফর্সা রগগুলো কপালে ভেসে উঠছে।
ছেলের ওপর এইঅপমানজনক ডিরেক্ট অ্যাটাক দেখে ইশতিয়াক দেওয়ান এক্কেবারে খেঁকিয়ে উঠলেন। তিনি ইলার দিকে আঙুল উঁচিয়ে চিৎকার করে বললেন ,
— "এই বেয়াদপ মেয়ে! তুই কোন সাহসে আমার ছেলের গায়ে হাত না দিয়েও এভাবে মুখের ওপর কথা বলছিস? ওরে কী বললি তুই?!"
ইলা দু'হাত কোমরে রেখে ইশতিয়াক দেওয়ানের দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে বলল,
— "আহ, মামাজি! একটু শান্ত হন তো। এই বুড়ো বয়সে এত রাগ শরীরের জন্য কিন্তু ভালো না। দেখেন না, আপনার বাকি দুই ভাই কত শান্ত হয়ে বসে আছেন। শুধু আপনিই একাই পুরো সভার মাইক হয়ে গেছেন!"
ইশতিয়াক দেওয়ান রাগে কাঁপতে কাঁপতে বললেন,
— "আমাকে মামা বলবে না!"
ইলা কাঁধ ঝাঁকিয়ে নির্বিকার গলায় বলল,
— "আরে, আমারও খুব শখ নেই আপনাকে মামা বলার। কিন্তু কী করব, সম্পর্ক তো বদলানো যায় না!"
ইশতিয়াক দেওয়ান যতই বাধা দিচ্ছিলেন, দেওয়ান পরিবারের বাকি সদস্যরা ততক্ষণে রেহানাকে ঘিরে ফেলেছেন। কেউ খোঁজখবর নিচ্ছে, কেউ পুরোনো স্মৃতি মনে করছে। ছোটরা তো নতুন ফুফুকে পেয়ে মহাখুশি। মুহূর্তেই গল্পের আসর জমে গেল।
দূরে দাঁড়িয়ে সব দেখছিলেন মাকসুদ চৌধুরী। মুখে রাগের ভাব থাকলেও চোখের কোণে যেন স্বস্তির একরাশ ছায়া।
ইলা এবার গম্ভীর হয়ে দাঁড়াল।
চারপাশে একবার তাকিয়ে ধীর অথচ দৃঢ় কণ্ঠে বলল,
— "লিসেন এভরিওয়ান! এবার একটু এদিকে তাকান আর আমার কথাগুলো ঠান্ডা মাথায় শোনেন। দেখেন, ৩০ বছর আগে আমার আম্মু আর পাপা যা করেছিল, তা স্রেফ ভালোবেসে করেছিল। দুজন দুজনকে প্রাণ দিয়ে চাইত বলেই ওনারা ওই পথ বেছে নিতে বাধ্য হয়েছিল। ওই পুরনো জেদ আর অতীতকে ধরে রেখে আপনারা আজ এই দুটো নতুন প্রাণকে—রাফসান ভাইয়া আর রাইশাপুকে এভাবে কষ্ট দিতে পারেন না! যেখানে ওনারা দুজন দুজনকে এক্কেবারে মন থেকে ভালোবাসে। আমি মানি, অতীতে আমার আম্মু-পাপা ভুল করেছিল, যার কারণে দুই পরিবার এতগুলো বছর কোনো যোগাযোগ রাখেন নাই। কিন্তু আজ এত বছর পর যখন আল্লাহ নিজে আপনাদের আবার এক হওয়ার সুযোগ করে দিয়েছেন, তখন নিজেদের অহংকারটা মাটি চাপা দেন! ওদের চার হাত এক করে দিয়ে আপনারা আবার আগের মতো এক হয়ে মিলে যান না কেন? ভাবেন অতীতে ওসব ফালতু কিছুই হয় নাই! এখানে আপনারা সব নতুন করে শুরু করেন। শুধু শুধু নিজেদের ভেতরের নোংরা ঝামেলার কারণে এই দুই নিষ্পাপ মানুষ কেন সাফার করবে?"
ইলা এক গভীর শ্বাস নিয়ে নিজের গলার টোন আরও ঠান্ডা আর ডেডলি করে বলল ,
— "আমি এতগুলো কথা এখানে হুদাই খরচ করতাম না, বাট আজ করতে হচ্ছে—কারণ আমার কলিজার টুকরো আম্মু আপনাদের এই ফালতু মেলো ড্রামার জন্য সেই থেকে কান্না করছে! আপনাদের জায়গায় আজ যদি অন্য কোনো থার্ডপার্টি ফ্যামিলি হতো, তবে আমার আম্মুকে কাঁদানোর অপরাধে ওনাদের আমি এতক্ষণে গুম করে দিতাম! বাট আপনারা আমার আম্মুর আপন ভাই আর ভাবি হন, ওনার রক্তের মানুষ—স্রেফ সেই খাতিরে আমি এখনো চুপ করে হাত গুটিয়ে ভদ্র সেজে আছি! আর নেক্সট টাইম... চৌধুরী বাড়ির কোনো মেয়েকে ঢালাওভাবে ‘খারাপ’ বা ‘লুজ ক্যারেক্টার’ বলার চেষ্টা করবেন না আপনারা! নিজেরা না জেনে, আদেও ওরা কেমন তা না বুঝে এক সেকেন্ডে ক্যারেক্টার সার্টিফিকেট দিয়ে একাকার করে ফেলেন! তাই নেক্সট টাইম আমাদের বাড়ির মেয়েদের নিয়ে কোনো ফালতু কথা বলার আগে দশবার ভেবে কথা বলবেন! আমি আমার মতো, আমার সাথে অন্য কারও তুলনা বিন্দুমাত্র পছন্দ করি না। আমি এতক্ষণ শান্ত আছি, তা শান্তই থাকতে দেন—নয়তো আমি যদি একবার অশান্ত হয়ে রূপ ধরি, তবে ক্ষতিটা কিন্তু আপনাদেরই হবে! আর শেষবারের মতো ওয়ার্নিং দিয়ে রাখছি—আর একবার যদি আমার আম্মুর চোখ থেকে এক ফোঁটাও পানি পড়ে, তবে এখানে বসা ছোট-বড় সবগুলার খবর আমি এক্কেবারে এক ক্লিকে খতম করে দেব! তখন বুঝবেন ইলারা রোজ চৌধুরী আসলে কী জিনিস!"
পুরো ড্রইংরুমে যেন এক নিথর নীরবতা নেমে এল। ইলার এই চাবুক, যুক্তিপূর্ণ আর একই সাথে খতরনাক থ্রেটের সামনে দেওয়ান আর চৌধুরী—দুই পরিবারের বাঘা বাঘা মুরুব্বিরা এক্কেবারে মুখে কুলুপ এঁটে নিঝুম হয়ে ওনার কথা শুনল। কারও মুখে একটা শব্দ করার সাহস পর্যন্ত হলো না।
ইলা ওনার কথা শেষ করে আর কারও দিকে এক পলকও তাকাল না। ঠিক তখনই ওপর থেকে কাজের মেয়ে কবিতা কোলে করে পিচ্চি এহানকে নিয়ে নিচে নেমে এল। এহান ঘুমে থেকে উঠে ইলাকে না পেয়ে এক্কেবারে ডুকরে কাঁদছিল আর চোখ মুছছিল।
ইলা এহানকে দেখা মাত্রই ওনার চোখের সেই বাঘিনীর মতো হিংস্র রাগ এক সেকেন্ডে উধাও হয়ে গেল! ও অত্যন্ত কোমল আর মায়াবী মুখে এগিয়ে গিয়ে কবিতাকে বলল—"দে ওকে ।" ও এহানকে পরম আদরে নিজের কোলে তুলে নিল। ও এহানের চোখের পানি নিজের আঙুল দিয়ে মুছে দিয়ে একদম তুলতুলে নরম গলায় বলল—
— "আরে আমার প্রিন্স! কী হয়েছে? কাঁদছ কেন?"
এহান চোখের পানি মুছতে মুছতে জড়ানো গলায় বলল,
— "লছি... আমালে থুয়ে আতথো তেন..."
ইলা হেসে ওর কপালে চুমু খেয়ে বলল,
— "আমি কোথাও যাইনি, লাড্ডু। দেখ, তোর লচ্ছি তো তোর কাছেই আছে।"
মুহূর্তেই এহানের কান্না থেমে গেল। সে শক্ত করে ইলাকে জড়িয়ে ধরল।
এই দৃশ্য দেখে দেওয়ান পরিবারের সবাই আবারও বিস্মিত হয়ে গেল।
কয়েক মিনিট আগেও যে মেয়েটা সিংহীর মতো সবাইকে জবাব দিচ্ছিল, সেই মেয়েটাই এখন ছোট্ট একটা শিশুর সামনে মমের মতো কোমল।
দু'রূপের এই অদ্ভুত মিশেল দেখে সবাই নির্বাক হয়ে শুধু ইলার দিকেই তাকিয়ে রইল।
মিসেস চৌধুরী অত্যন্ত স্নেহভরা চোখে ইলার দিকে তাকিয়ে নরম গলায় বললেন,
— "ইলা, এদিকে আয় মা ওকে নিয়ে।"
ইলা পিচ্চি এহানকে কোলে নিয়েই ওর আম্মুর কাছে গিয়ে দাঁড়াল। মিসেস চৌধুরী তখন দেওয়ান বাড়ির ভাই-ভাবিদের দিকে ফিরে এহানকে দেখিয়ে হাসিমুখে বললেন,
— "এটা হলো আমাদের ছোট প্রিন্স।" তারপর ইলার দিকে হাত বাড়িয়ে গর্বের সাথে বললেন— "আর এটা আমার প্রিন্সেস!"
রাফসান সহ দেওয়ান বাড়ির সব কাজিনরা এক জোটে অবাক হয়ে এহানের দিকে তাকাল। এহান সত্যি অনেক সুন্দর, ফর্সা আর তুলতুলে গুলুমুলু একটা বাচ্চা। ওরা সবাই এক বুক আদর নিয়ে এহানকে কোলে নেওয়ার জন্য হাত বাড়াল। কিন্তু এহান ওদের কাউকেই চেনে না দেখে ইলার গলা আরও শক্ত করে জড়িয়ে ধরল, কিছুতেই ওদের কোলে গেল না।
ছেলের ঘরের নাতি আর বাকি বাচ্চাদের এভাবে একটা উগ্র মেয়ের কোল থেকে বাচ্চা কেড়ে নেওয়ার মতো করতে দেখে ইশতিয়াক দেওয়ান আবার খিটখিট করে উঠলেন। তিনি এহানের দিকে তাকিয়ে ইশারা করে কড়া গলায় বললেন,
— "এই মেয়ে! ওরে ওদের কাছ থেকে সরাও তো! বাচ্চাটারে ওভাবে চেপে ধরে রাখছ কেন?"
পিচ্চি এহান তখন বড় বড় চোখ করে দেখল যে এক খড়খড়ে গলার বুড়ো লোক ওর কলিজার ‘লছি’কে অনর্থক ধমক দিচ্ছে! এটা ওর একদম পছন্দ হলো না। ও নিজের পিচ্চি হাতটা ইশতিয়াকের দিকে উঁচিয়ে, মুখটা ফুলিয়ে আধো আধো কিন্তু কড়া টোনে চেঁচিয়ে উঠল—,
— "এই বুলো! তুমি আমাল লছি কে বকতো (বকছ) তেন (কেন)? খবরদাল! আমাল লছি কে আল বকবে না, নয়তো তিন্তু একদম খবল (খবর) আছে বলে রাকলাম!"
এইটুকু একটা তিন-চার বছরের বাচ্চার মুখে ওনার নিজের স্টাইলের ধমক শুনে ইশতিয়াক দেওয়ান এক সেকেন্ডে এক্কেবারে ভড়কে গেলেন! ওনার চোখ-মুখের অবস্থা দেখে মনে হলো ওনার হার্টবিট বুঝি মিস হয়ে গেছে। তিনি দুই পা পিছিয়ে গিয়ে বিড়বিড় করে বললেন,
— "কী রে বাবা! এই পিচ্চিটাও দেখি এত বড় কলিজা নিয়া ঘুরতাছে! বংশের রক্ত বইলা কথা, শেষে এই দুগ্ধপোষ্য বাচ্চাডাও এক্কেবারে সেম টু সেম ওই উগ্র চণ্ডীর মতো হইছে!"
ওনার এই ভড়কে যাওয়া ফেস আর এহানের এই কথা শুনে ড্রইংরুমের ছোটরা আর নিজেদের আটকে রাখতে পারল না, সবাই হু হু করে হেসে ফেলল। ইলা এবার পরিস্থিতি সামলাতে কবিতাকে ডেকে বলল,
— "কবিতা, এহানকে বাকি বাচ্চারা যেখানে খেলছে, ওখানে নিয়ে যা।"
রাফসানরা সবাই যাওয়ার আগে এহানকে অনেক আদর করার চেষ্টা করল, কিন্তু ইলার সাথে ওনারা একটু কথা বলতে গেলেই এহান ওনাদের দিকে তাকিয়ে চিল্লাইয়া ওঠে—"যাও! লছির সাথে কথা বলবে না!" পরে ইলা ওনাকে অনেক বুঝিয়ে-শুনিয়ে চকোলেটের লোভ দেখিয়ে কবিতার সাথে ভেতরের রুমে পাঠাল।
এহান চলে যেতেই এতক্ষণের নীরবতা ভেঙে মালিহা চৌধুরী ওনার মুখটা বাঁকিয়ে এক বিশ্রী তাচ্ছিল্যের সুরে বললেন,
— "উফ! ডং দেখলে আর বাঁচি না! ঘরের ভেতর এইসব ন্যাকামি ড্রামা কখন বন্ধ হবে? কাজের কাজ কী ঠিক হলো তা তো কেউ বলছে না, শুধু শুধু সময় চলে যাচ্ছে!"
ইলা তার এই আলগা মাতব্বরি শুনে এক সেকেন্ডে এক্কেবারে তপ্ত আগুনে রূপ নিল। ও ইরহামের দিকে ঘুরে দাঁড়িয়ে দাঁত কিড়মিড় করে বল ,
— "বাঙ্গির নাতি....! এই কচুটাকে এখান থেকে সরা তো আগে! নয়তো তোর কিন্তু আজ খবর আছে বলে দিলাম! সাওয়া টার কোন কাজ নাই? এসে অকারণে প্যানপ্যানানি শুরু করছে, আমার মাথাডা একদম খারাপ বানায় দিল!"
পরিস্থিতি ক্রমশ উত্তপ্ত হতে দেখে শানওয়াজ দেওয়ান আবারও এগিয়ে এলেন। আগের মতোই শান্ত, ভদ্র আর মার্জিত কণ্ঠে বললেন—
— "মামনি, একটু শান্ত হও। উনি সম্পর্কে তোমার ফুফু হন। বড়দের সঙ্গে এভাবে কথা বলতে নেই।"
ইলা ভ্রু উঁচু করে ওনার দিকে তাকাল।
— "মানে? উনি যা ইচ্ছা তাই বলবেন, আর আমি লক্ষ্মী মেয়ের মতো দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে সব শুনব?"
— "না মামনি, আমি সেটা বলতে চাইনি।"
— "তাহলে কী বলতে চেয়েছেন?"
শানওয়াজ দেওয়ান হালকা হেসে বললেন—
— "তুমি অবশ্যই কথা বলবে। কিন্তু এখানে অনেক গুরুজন আছেন। তাই ভাষাটা একটু সংযত রাখলেই ভালো হয়।"
ওনার শান্ত, ভদ্র আর যুক্তিপূর্ণ কথাগুলো শুনে ইলার মুখের কঠিন ভাবটা অনেকটাই নরম হয়ে এল।
কয়েক সেকেন্ড চুপচাপ ওনার দিকে তাকিয়ে থেকে হঠাৎই মুচকি হেসে বলল ,
— "ওকে... আপনাকে আমার ভালোই লাগল, মামা। ব্ল্যাকলিস্ট থেকে আপনার নামটা কেটে 'পছন্দের মানুষের তালিকায়' তুলে দিলাম।"
তারপর চারপাশে বসে থাকা সবার দিকে একবার চোখ বুলিয়ে ঠোঁট বাঁকিয়ে যোগ করল—
— "তবে বাকি যারা এখনো অকারণে চিল্লাচিল্লি করে পরিবেশ গরম করছেন, তাদের নাম কিন্তু এখনো ব্ল্যাকলিস্টেই আছে। ভবিষ্যতে প্রোমোশন হবে, নাকি সাসপেনশন—সেটা পরিস্থিতি বুঝে জানিয়ে দেওয়া হবে!"
ইলার কথা শেষ হতেই ড্রয়িংরুমজুড়ে চাপা হাসির ঢেউ বয়ে গেল।
কথাটা শেষ করেই ইলা এক ঝটকায় সবার দিকে তাকাল। তারপর জেন-জি স্টাইলে দুই হাত তালি দিয়ে কমান্ডিং টোনে বলল—
— "যাই হোক, অনেক ড্রামা হয়ে গেছে। এখন আর চিল্লাচিল্লি করে কোনো লাভ নেই। আগামী দশ-পনের দিনের মধ্যেই এই বিয়েটার ধুমধাম করে আয়োজন করবেন সবাই। কারণ আমার হাতে একদম সময় নেই। খুব তাড়াতাড়িই আমাদের আবার লন্ডনে ব্যাক করতে হবে।"
একটু থেমে চারপাশে তাকিয়ে আবার বলল—
— "এই মাইশা! সায়রা! তাড়াতাড়ি কর তো। আমাদের রাইশাপু আর উনার এই হবু ভেড়া হাসবেন্ডকে—মানে, রাফসান ভাইকে—টেনে এনে মাঝখানের সোফায় বসাও!"
মাইশা আর সায়রা এক সেকেন্ডও দেরি করল না। দু'জন মিলে রাইশা আর রাফসানকে প্রায় টেনেহিঁচড়েই এনে মাঝের সোফায় পাশাপাশি বসিয়ে দিল।
দু'জনেরই অবস্থা তখন দেখার মতো।
রাইশা মাথা নিচু করে লজ্জায় লাল হয়ে আছে, আর রাফসানও ভয়ে-লজ্জায় এমনভাবে বসে আছে যেন একটু পরই মৌখিক পরীক্ষা দিতে হবে।
ইলা ধীর পায়ে ওদের সামনে গিয়ে দাঁড়াল। দুই হাত কোমরে রেখে কিছুক্ষণ ওদের দিকে তাকিয়ে থেকে বলল,
— "এই রাইশাপু! এবার একটু হাসো দেখি? নিজের ভালোবাসার মানুষটাকে পাশে পাইছ, তারপরও এমন বিশ্বশোকের মুখ করে বসে আছ কেন? একটু দাঁত বের করে হাসো তো!"
রাইশা লজ্জায় আরও মাথা নিচু করে ফেলল। হাসার তো প্রশ্নই আসে না।
ওকে দেখে ইলা নিজের কপালে আলতো চাপড় মেরে নাটকীয় ভঙ্গিতে বলে উঠল—
— "ধুর ha....da...! এই জন্যই বলে, কারও সঙ্গে বেশি ভালো ব্যবহার করতে নেই। গাধারে ট্রেনিং দিয়ে ঘোড়া বানানো যায়, কিন্তু এই দুইটা রোমান্স-অ্যালার্জিক বলদকে হাসানো যায় না! যত্তসব আনরোমান্টিক বাল ছালা!"
ইলার কথা শেষ হতেই জুনায়েদ হো হো করে হেসে উঠল। তার সঙ্গে তাল মিলিয়ে মাইশা, সায়রা, ইরহাম আর মাহিমও হাসি চাপতে পারল না।
আর রাইশা আর রাফসান?
দু'জনই লজ্জায় একে অপরের দিকে তাকাতেও সাহস পেল না।
ইলার এই অনর্গল চাবুক আর খ্যাপাটে স্বভাব দেখে ড্রইংরুমের সবাই কম-বেশি ফিসফিস করে কথা বলছিল। কিন্তু এই পুরোটা সময় ফারহানা দেওয়ান (শানওয়াজের স্ত্রী) একদম চুপ করে ছিলেন, তিনি মুখে একটা কথাও বলেননি। ওনার ইলার এই বেয়াদপি, কথায় কথায় গালি দেওয়া আর মুরুব্বিদের মুখের ওপর চাট্টিখানি কথা উগরে দেওয়াটা বিন্দুমাত্র পছন্দ হয়নি। ওনার মনে হচ্ছিল এই মেয়েটার কোনো ছিরি-ছাঁদ নেই। কিন্তু তিনি বাকি সবার মতো ওনার এই চরম অপছন্দের ভাবটা মুখে বা আচরণে প্রকাশ করলেন না, এক অদ্ভুত নীরবতা বজায় রেখে ইলার দিকে তাকিয়ে রইলেন।
সবকিছু গুছিয়ে দিয়ে ইলা ওর পাপাকে আলাদা করে একপাশে নিয়ে গেল। দু'জনে কিছুক্ষণ নিচু স্বরে কথা বলল। কী কথা হলো, সেটা আর কেউ শুনতে পেল না।
এরপর দুই পরিবারের বড়রা একসঙ্গে বসে দীর্ঘ আলোচনার পর শেষ পর্যন্ত সব সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করলেন।
সাত দিন পর এনগেজমেন্ট।
তারপর মেহেদি অনুষ্ঠান, পরদিন গায়ে হলুদ, আর তার পরের দিন বিয়ে।
বিয়ের ঠিক দুই দিন পর সবাই একসঙ্গে ইশতিয়াকদের গ্রামের বাড়িতে যাবে। আর পরদিন থেকেই শুরু হবে সব আয়োজন—শপিং থেকে শুরু করে বিয়ের বাকি সব প্রস্তুতি।
সব ঠিকঠাক হওয়ার পর চৌধুরী বাড়ির গিন্নিরা দেওয়ান পরিবারের সবাইকে ডাইনিং টেবিলে নিয়ে গেলেন।
ততক্ষণে রাত প্রায় নয়টা।
হাসি-আড্ডার মাঝেই রাতের খাবার শেষ হলো। তারপর সবাই আবার ড্রয়িংরুমে গিয়ে বসল।
শেষদিকে ইশতিয়াক দেওয়ান আর মাকসুদ চৌধুরী নিজেদের পুরোনো ভুল নিয়ে দু-একটা কথা বললেও, দু'জনের মধ্যকার বরফ তখনও পুরোপুরি গলেনি।
এদিকে ইলা ছোট্ট এহানকে ঘুম পাড়িয়ে বিছানায় শুইয়ে দিল। তারপর হেলমেটটা হাতে নিয়ে বের হওয়ার আগে সবাইকে উদ্দেশ্য করে বলল—
— "আজ রাতে সবাই কিন্তু লাইভটা দেখবেন!"
কথা শেষ করেই ও বেরিয়ে গেল।
কয়েক সেকেন্ড পরই ইরহাম, জুনায়েদ, মাহিম, সায়রা আর মাইশাও চুপিচুপি ওর পেছনে বেরিয়ে গেল।
বিষয়টা সবার চোখ এড়িয়ে গেলেও রেহানা চৌধুরীর চোখ এড়াল না।
তিনি শুধু দীর্ঘশ্বাস ফেলে মনে মনে বললেন,
"মেয়েটা আবার সেইখানেই যাচ্ছে..."
সাজ্জাদ অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলেন,
— "এত রাতে ওরা কোথায় গেল ?"
ইশা মুখ বাঁকিয়ে বললেন,
— "মনে হয় কোনো ছেলের সঙ্গে দেখা করতে গেছে!"
রাইশা সঙ্গে সঙ্গেই প্রতিবাদ করল।
— "ইশাআআ, না জেনে কারও সম্পর্কে এমন কথা বলবি না।"
ড্রয়িংরুমে আবারও অস্বস্তিকর নীরবতা নেমে এল।
ঠিক তখনই শানওয়াজ দেওয়ান কৌতূহলী হয়ে বললেন,
— "ও যাওয়ার সময় লাইভের কথা বলল কেন?"
মিসেস চৌধুরী শান্ত গলায় বললেন ,
— "দেখলেই বুঝতে পারবেন।"
মিস্টার চৌধুরী মাহিমের দিকে তাকিয়ে বললেন ,
— "মাহিম, টিভিটা অন করো তো।"
মুহূর্তের মধ্যেই সবার দৃষ্টি টিভির পর্দায় গিয়ে স্থির হলো।
°°°°°°°
টাইম স্কিপ
রাত ১০:৩০ মিনিট।
ঢাকার ৩০০ ফিট সড়কের একপাশে এসে পাশাপাশি তিনটি বাইক থামল।
ইলা নিজের বাইক থেকে মাইশাকে নামিয়ে হেলমেট খুলতে খুলতে বলল—
— "তোরা এখানে দাঁড়া। আমি ওই সাইটে যাই। ওখানে অনেক মানুষের ভিড় জমছে আজকে! দেশের সব বড় বড় নামী-দামী বাইক রেসাররা বলে আজকে স্পটে হাজির হইছে!"
সামনের দিকে ইতোমধ্যেই মানুষের বিশাল ভিড় জমে গেছে। দেশের নামকরা বাইক রাইডারদের পাশাপাশি আজ নাকি বাইরের দেশ থেকেও একজন চ্যাম্পিয়ন রেসার এসেছে।
ইরহাম একটু চিন্তিত গলায় বলল—
— "নানী! পারবি তো আজকে? শুনলাম বাইরে থেকে নাকি আরও একজন ইন্টারন্যাশনাল লেভেলের খতরনাক রাইডার আসছে!"
ইলা ঠোঁট বাঁকিয়ে হেসে বলল—
— "আসছে তো আমার কী? হুদাই ডং মারার জায়গা পায় না সিবাল সর! ও ইন্টারন্যাশনাল চিজ হলে আমি কি ভুলে যাইস না! ধুলো চাটায়া ছাডমু আজকে motherboard.. কে...!"
সায়রা উদ্বিগ্ন মুখে বলল—
— "ইলু, আমার খুব ভয় করছে।"
ইলা হেলমেট পরে বিরক্ত গলায় বলল—
—আরেহ ধুর শ্যালি! কিসের বালের ভয় তোদের? সরা তো এইখান থেকে! কত বছর ধরে আমি প্রফেশনাল বাইক রেস করি, তাও তোদের এই মরা কান্না আর কথা প্রতিবার রেসের আগে আমারে শুনতে হয়! তোদের এই dhn এর কলিজা নিয়া ঘরে গিয়া ফিটার খেললেই তো পারতি!"
জুনায়েদ দাঁত বের করে হেসে বলল—
— "নানি, আজ ট্রফিটা জিতলে কিন্তু আমাদের কক্সবাজার... না হলে অন্তত সাজেক ঘুরতে নিয়ে যাবি!"
ইলা ইঞ্জিন স্টার্ট দিতে দিতেই চোখ রাঙিয়ে বলল—
— "অ্যাই চাটগাঁইয়া হাদারাম! Dh*n মার্কা কথা বন্ধ কর! নিজের বাপের টাকা দিয়া তেল ভরার মুরোদ নাই, আর আমি ট্রফি পাইলে বলে সাজেক ভ্যালিতে গিয়া বিলাসী আড্ডা মারবেন! এক্কেবারে বাইক্কা চোদা একটা! আগে রেসটা জিততে দে, তারপর তোর সাজেক ভ্যালির ভূত আমি এক সেকেন্ডে নামাইতেছে হাওয়া*র পো।"
কথা শেষ করেই এক্সিলারেটর ঘুরিয়ে গর্জন তুলে বাইক নিয়ে সামনের ভিড়ের দিকে ছুটে গেল।
পেছন থেকে একসঙ্গে সবাই চিৎকার করে উঠল—
— "অল দ্য বেস্ট, ইলু!"
••••••••••
তিনশো ফিটের রেসিং ট্র্যাকে তখন এক উন্মাদনা। রেস শুরুর কাউন্টডাউন শুরু হতেই রেসাররা যার যার পজিশন নিয়ে নিল। চারদিকের বিশাল ভিড় থেকে হাজার হাজার মানুষ যার যার পছন্দের রাইডার আর দলের জন্য গলা ফাটিয়ে চিয়ারআপ করছে। পুরো ট্র্যাকে তখন বাইকের ইঞ্জিনের গগনবিদারী গর্জন। কিন্তু এই ভিড়ের মাঝে কেউ একটা বারের জন্যও টের পায়নি যে, ব্ল্যাক হেলমেটের আড়ালে আজকের এই খতরনাক ট্র্যাকে ‘অন্ধকারের চিতা’ খ্যাত ইলা চৌধুরীও রেসে নেমে পড়েছে!
গ্রিন সিগন্যাল পড়তেই এক সেকেন্ডের ভগ্নাংশে ধোঁয়া উড়িয়ে বাতাসের গতিতে ছুটে চলল সবকটা চাবুক বাইক। ইলা ওর নিজের দানবীয় Kawasaki Ninja H2R এর থ্রটলে এক প্রচণ্ড মোচড় দিল! শুরু হলো এক চরম টানটান উত্তেজনা। ট্র্যাকের একেকটা বাঁকে রেসাররা ওনাদের বাইক স্টান্ট করে দেখাচ্ছে—কেউ বাইকের সামনের চাকা শূন্যে তুলে ওয়ান-হুইলিং করছে, তো কেউ একদম মাটি ঘেঁষে বাইক লীন করে অবিশ্বাস্য কর্নারিং দেখাচ্ছে।
রেসের মাঝপথেই কয়েকজন রেসার একজোট হয়ে ইলাকে ট্র্যাক থেকে ছিটকে দেওয়ার চেষ্টা করল। তিন দিক থেকে ওর Kawasaki Ninja H2R-কে ব্লক করে ওকে কোণঠাসা করে ফেলল।
কিন্তু ইলা কি এত সহজে হার মানার মেয়ে?
হেলমেটের ভেতর ঠোঁট বাঁকিয়ে থ্রটল একেবারে শেষ সীমা পর্যন্ত ঘুরিয়ে দিল।
ভ্রাআআম...!
মুহূর্তের মধ্যে ও অবিশ্বাস্য গতিতে বাইক কাত করে নিখুঁত কর্নারিং, হাই-স্পিড লিন আর এক ঝলক স্টান্টে প্রতিপক্ষের সব ব্লক ভেঙে বেরিয়ে গেল।
চোখের পলকেই সবাইকে পেছনে ফেলে তীরের মতো সামনে ছুটে গেল 'চিতা'।
স্পিডোমিটারের কাঁটা যেন পাগলের মতো ছুটছে—
১৫০... ২০০... ২৫০...!
পুরো রেসের সবচেয়ে টানটান আর রুদ্ধশ্বাস মুহূর্ত তখন!
ইলার Kawasaki Ninja H2R-এর ঠিক পাশেই সমানে সমানে পাল্লা দিয়ে ছুটছে বাইরে থেকে আসা সেই ইন্টারন্যাশনাল রাইডারের কালো বাইক। কেউ কাউকে একচুলও ছাড় দিচ্ছে না।
ফিনিশিং লাইনের আর মাত্র কয়েক সেকেন্ড বাকি।
ঠিক তখনই ইলা থ্রটল একেবারে শেষ সীমা পর্যন্ত ঘুরিয়ে দিল।
ভ্রাআআম...!
স্পিডোমিটারের কাঁটা অবিশ্বাস্য গতিতে লাফিয়ে উঠতে লাগল—
৩০০... ৩৫০... ৪০০... ৪৫০... এক ঝলকে ৫০০!
মনে হচ্ছিল বাইকটা আর ট্র্যাক ছুঁয়ে চলছে না, বিদ্যুতের মতো বাতাস চিরে উড়ে যাচ্ছে।
ফিনিশিং লাইনের ঠিক আগমুহূর্তে ইলা এক হাত তুলে বিজয়ের ভঙ্গি করল, আর চোখের পলকেই সবাইকে বহুটা পেছনে ফেলে প্রথম হয়ে ফিনিশিং লাইন অতিক্রম করল।
ট্র্যাকজুড়ে মুহূর্তেই বিস্ফোরণের মতো উল্লাস ছড়িয়ে পড়ল।
জুনায়েদ লাফিয়ে উঠে চিৎকার করে বলল—
— "ইয়েসসস! বলেছিলাম না, আজও ট্রফি আমাদের!"
ইরহাম দুই হাত আকাশে তুলে চেঁচিয়ে উঠল—
— "এটাই তো আমাদের ইলা! কেউ থামাতে পারবে না!"
মাহিম উচ্ছ্বাসে বলল—
— "চ্যাম্পিয়ন! আবারও চ্যাম্পিয়ন!"
মাইশা আর সায়রা একসঙ্গে হাততালি দিতে দিতে চিৎকার করে উঠল—
— "ইলু! ইলু! ইলু! ইউ ডিড ইট!"
রেসের এমন অবিশ্বাস্য ফিনিশিং দেখে পুরো গ্যালারির দর্শকরা প্রথমে একদম থমকে গেল, চারপাশ জুড়ে এক নিথর স্তব্ধতা নেমে এল। তারপরই যেন পুরো ৩০০ ফিট জুড়ে এক প্রলয়ংকরী চিৎকার আর উল্লাস ফেটে পড়ল। সবাই যার যার জায়গা থেকে লাফিয়ে উঠে চিয়ারআপ করতে করতে একে অপরের দিকে তাকিয়ে চেঁচাতে লাগল,
— "ও মাই গড! কে এই রাইডার?! এতগুলো ইন্টারন্যাশনাল বড়ো রেসারদেরকে তুড়ি মেরে এক সেকেন্ডে ধুলো চাটায়া দিল! দিস ইজ আনবিলিভেবল!"
ইলা ওসব শোরগোলকে বিন্দুমাত্র পাত্তা না দিয়ে এক চিলতে হাসি হেসে ধীরগতিতে জাজেস প্যানেলের মঞ্চের দিকে এগিয়ে গেল। সেখানে দেশের নামী-দামী বড় বড় ব্যক্তিত্বরা দাঁড়িয়ে ছিলেন। ওনারা এক বুক বিস্ময় আর সম্মান নিয়ে ইলার গলায় চকচকে চ্যাম্পিয়ন মেডেল পরিয়ে দিলেন এবং ওনার হাতে চার লাখ টাকার একটা উইনিং প্রাইজ চেক তুলে দিলেন।
উপস্থাপক এবার একগাল হেসে বিনীতভাবে ইলাকে অনুরোধ করে বললেন— "চ্যাম্পিয়ন, আমাদের দর্শকদের উদ্দেশ্যে যদি আপনার মূল্যবান কিছু বক্তব্য রাখতেন এবং নিজের আসল পরিচয়টা সবার সামনে রিভিল করতেন।"
আসলে এতক্ষণ পর্যন্ত গ্যালারির সব দর্শক থেকে শুরু করে রেসারদের সবাই মনে মনে ভাবছিল যে এই ব্ল্যাক হেলমেটের আড়ালে থাকা রাইডারটা নিশ্চিত কোনো ছেলে! কারণ ইলা ট্র্যাকের ভেতর পুরোটা সময় এতটুকু কোনো আওয়াজ করেনি বা মুখ খোলেনি।
এবার ইলা মঞ্চের ডায়াসের সামনে গিয়ে দাঁড়াল। ও মাইকটা হাত দিয়ে একটু ঠিক করে নিয়ে বলতে শুরু করল। ওর সুর আর বাচনভঙ্গি পুরো ৩০০ ফিটের স্পিকারে গমগম করে উঠল,
— "গুড ইভনিং, এভরিওয়ান। আই হোপ ইউ অল এনজয়েড দ্য শো। ওয়েল, আপনারা এতক্ষণ ধরে যাকে ট্র্যাকের বুকে খুঁজছিলেন, 'দ্য ডার্ক চিতা'—আই থিংক আপনারা সবাই নামটা খুব ভালো করেই শুনেছেন। হ্যাঁ, আমিই সেই অন্ধকারের চিতা! সো, সারপ্রাইজড?"
ইলার মুখ থেকে এই কথা শোনার সাথে সাথে পুরো ৩০০ ফিটের সব দর্শক, জাজেস প্যানেল আর ইন্টারন্যাশনাল রেসাররা এক্কেবারে বড় বড় চোখ করে শকড হয়ে গেলেন! সবার মুখ হাঁ হয়ে গেল। ওনারা যেন নিজেদের কানকেও বিশ্বাস করতে পারছিলেন না। কারণ, এই 'লন্ডনের অন্ধকারের চিতা' (দ্য ডার্ক চিতা অফ লন্ডন) হলো আন্ডারগ্রাউন্ড রেসিং ওয়ার্ল্ডের এক জীবন্ত কিংবদন্তি! যাকে স্রেফ একনজর দেখা আর যার সাথে একই ট্র্যাকে বাইক রেস করা দুনিয়ার প্রতিটা রেসারের জন্য এক একটা অধরা ড্রিম আর বাকি ফেন দের আজন্মের স্বপ্ন সামনে থেকে দেখার।
সবাই ভাবছিল, যে রাইডারটা একটু আগে ট্র্যাকে ৫০০ স্পিডে এত ভয়াবহ আর রুদ্ধশ্বাস ভাবে বাইক রাইড করল, কর্নারিংয়ের সময় যেভাবে মাটি ঘেঁষে স্টান্ট দেখাল—তাতে রেসের টানটান সময়ে গ্যালারির দর্শকদের নিজেদেরই ভয়ে আর উত্তেজনায় ঘাম ছুটছিল! ওনারা ভেবেছিলেন এটা হয়তো বাইরের কোনো দেশের মারাত্মক খতরনাক পুরুষ রাইডার হবে, কিন্তু এখানে তো পুরো সিনটাই উল্টো হয়ে গেল! এ তো আস্ত একটা মেয়ে, তাও আবার খোদ লন্ডনের সেই ডার্ক চিতা!
মুহূর্তের মধ্যে পুরো গ্যালারি থেকে লাখো মানুষ একসঙ্গে চিৎকার করে এক সুরে দাবি তুলতে লাগল,
— "ফেস রিভিল! ফেস রিভিল! আমরা অন্ধকারের চিতার আসল চেহারা দেখতে চাই! হেলমেট খোলো!"
ইলা দর্শকদের এই উন্মাদনা দেখে ওনার হেলমেটের গ্লাসে হাত দিয়ে এক অদ্ভুত তাচ্ছিল্যের বাঁকা হাসি হাসল। ও মাইকের সামনে ঝুঁকে বলল,
— "নো চান্স, পিপল! অন্ধকারের চিতা অত সহজে নিজের রূপ দুনিয়ার সামনে সস্তা করতে আসে নাই। চেহারা দেখার শখটা আপাতত মনের ভেতরেই চেপে রাখেন। চিতা সবসময় আড়ালেই থাকতে পছন্দ করে। সো, সি ইউ নেক্সট টাইম অন দ্য ট্র্যাক! বাই!"
দর্শকরা যখন দেখলো যে অন্ধকারের চিতা কোনোভাবেই ফেস রিভিল করবে না, তখন ওনারা আর কোনো উপায় না পেয়ে এক নতুন আবদার জুড়ে দিল। পুরো গ্যালারি থেকে হাজার হাজার মানুষ একসঙ্গে চিৎকার করে বলতে লাগল,
— "ঠিক আছে, চেহারা দেখতে হবে না! কিন্তু আমরা আজ অন্ধকারের চিতার গলায় একটা গান শুনতে চাই! জাস্ট একটা গান প্লিজ!"
ইলা কয়েক সেকেন্ড চুপ করে সবার দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর মুচকি হেসে মাইক্রোফোনটা কাছে এনে বলল,
— "আজ না... এটা থাক। আমার ফ্যানদের জন্য একটা বিশাল সারপ্রাইজ জমিয়ে রেখেছি। খুব শিগগিরই সেটা তোমাদের উপহার দেব।"
এ কথা শুনে নিচে দাঁড়িয়ে থাকা ইরহাম অবাক হয়ে বলল,
— "কী রে, নানী হুট করে এমন চুপ হয়ে গেল কেন? বিজনেস বাকি সব আর গালিগালাজ ছেড়ে ও কি এখন গান গাওয়ার কথা ভাবতাছে নাকি?"
জুনায়েদ কাঁধ ঝাঁকিয়ে বলল—
— "আরেহ না, লেউরা মার্কা চিন্তা করিস না! নানীর মাথায় এখন কোন খতরনাক বুদ্ধি ঘুরতাছেও ভালো জানে!"
ইলা আবার মাইক্রোফোন হাতে নিয়ে চারপাশে তাকিয়ে শান্ত, গভীর কণ্ঠে বলল— ,
"আমি ঝড়ের বুকে লুকিয়ে থাকা এক
নামহীন চিৎকার,যেখানে গতি এসে থমকে
দাঁড়ায়, আমিই শেষ সীমানা তার!
তোমরা যারে আলো ভাবো, সে তো সস্তা
মোহের মায়া,অন্ধকারের বুক চিরে পথ চেনে
এই চিতার ছায়া।মিথ্যে মুখোশ খসে পড়ুক,
ভাঙো এবার মিথ্যে জাঁক,এই রাজপথের ধুলোবালি আজ আমার গল্পই লিখে রাখ!"
ইলা ট্রফিটা ইরহামের হাতে তুলে দিয়ে আর এক মুহূর্তও দাঁড়াল না। হেলমেটটা পরে বাইকের ইঞ্জিন স্টার্ট দিতেই মুহূর্তের মধ্যে রাতের অন্ধকারে মিলিয়ে গেল।
ইরহাম, জুনায়েদ, মাহিম, সায়রা আর মাইশা কিছুক্ষণ নির্বাক হয়ে ওর চলে যাওয়ার দিকেই তাকিয়ে রইল।
জুনায়েদ দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল—
— "ইলা কে দেখে মনে হচ্ছে... ওর পুরোনো কোনো স্মৃতি আবার জেগে উঠেছে।"
কেউ আর কিছু বলল না। সবাই নীরবে বাড়ির পথে রওনা দিল।
অন্যদিকে চৌধুরী বাড়িতে...
টিভির সামনে বসে থাকা সবাই যেন পাথর হয়ে গেছে। কয়েক মিনিট আগেও তারা যে দৃশ্যটা দেখেছে, তা এখনো বিশ্বাস করতে পারছে না।
রাফসান অবাক হয়ে বলল—
— "ফুফু... ওটা কি সত্যিই ইলা ছিল?"
মিসেস চৌধুরী মৃদু হেসে শুধু মাথা নাড়লেন।
রাইমা, আফরা আর আয়াত বিস্ময়ে বলে উঠল—
— "আল্লাহ! আমাদের ড্রিম গার্ল এতদিন আমাদের সামনেই ছিল, অথচ আমরা চিনতেই পারিনি!"
মিস্টার চৌধুরী ওনার নিজের ভাই মাকসুদ চৌধুরীর দিকে এক চিলতে হাসি নিয়ে তাকিয়ে বললেন— "কী মাকসুদ ভাই? এবার দেখো ভালো করে! আমার মেয়ে কী চিজ, চোখ খুলে দেখো!"
কিন্তু ইশতিয়াক দেওয়ানের মুখ আরও গম্ভীর হয়ে উঠল।
মাকসুদ চৌধুরী বিরক্ত গলায় বলে উঠলেন—
— "ধুর! এটা কোনো মেয়ে নাকি ছেলে? ওর চলাচল, ওঠাবসা, কাজকারবার সব তো ছেলেদের মতো! একটা মেয়েকে কীভাবে মেয়েদের মতো ভদ্র হয়ে শান্ত শিষ্ট থাকতে হয়, সেই শিক্ষা তোরা ওরে একদম দেস নাই! এই মেয়ে দিনদিন এক্কেবারে উ উচ্ছন্নে যাচ্ছে! আভিজাত্যের চৌধুরী বংশের মেয়ে হয়ে এত রাতে রাস্তায় বাইক রেস করে বেড়াচ্ছে,কেমন ভাবে চলে ছিঃ! কী দিন দেখতে হচ্ছে আমাদের, আস্তাগফিরুল্লাহ!"
মালিহা চৌধুরীও ওনার মুখটা বিশ্রীভাবে বাঁকিয়ে বিষ উগড়ে দিয়ে বললেন— "এক্কেবারে নোংরা কালচার! চৌধুরী বাড়ির মান-সম্মান সব রাস্তায় ধুলা লোটায় দিল!" ওনাদের দেখাদেখি দেওয়ান আর চৌধুরী ফ্যামিলির কম-বেশি অনেকেই ইলাকে নিয়ে নানা রকম কড়া আর বাঁকা কথা শুনাতে লাগল। তবে মিস্টার চৌধুরী ওসব কথায় বিন্দুমাত্র কান দিলেন না। ওনার এতে কিছুই যায় আসে না, কারণ ওনার মেয়ে তো কোনো খারাপ বা অনৈতিক কাজ করছে না, তাহলে তিনি কেন ওনাকে বাধা দেবেন? ওনার মেয়ের এই আকাশছোঁয়া সাফল্যে ওনার বুকটা গর্বে ভরে গেছে।
ঘরটা আবার নীরব হয়ে গেল।
সেই নীরবতা ভেঙে শানওয়াজ দেওয়ান ধীরস্বরে বললেন,
— "এইটুকু একটা মেয়ে... অথচ কী গভীর কথা বলে! ওর প্রতিটা বাক্যের ভেতরে যেন শত গল্প লুকিয়ে আছে। সেই গভীরতা বোঝার সামর্থ্য সবার নেই।"
হয়তো সত্যিই...
সব মানুষ শব্দ শুনতে পারে, কিন্তু সবাই শব্দের ভেতরে লুকিয়ে থাকা নীরবতার আর্তনাদ শুনতে পারে না। কেউ কেউ হাসির আড়ালে লুকিয়ে থাকা কান্না পড়ে ফেলে, আবার কেউ সারাজীবন চোখের সামনে থেকেও একটি মানুষকে চিনতে পারে না। কারণ গভীর মানুষকে বুঝতে শুধু জ্ঞান নয়—লাগে অনুভবের গভীরতা, আর সেই অনুভবের ক্ষমতা সবার ভাগ্যে জোটে না।
চলবে........
" ভুল-ক্রটি হলে ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন "
রেসপন্স করো,,না হলে গল্প দিতে আগ্রহ পাই না,,,
অনেক বড় পর্ব দিছি so like comment please