ফন্ট সাইজ:
থিম:
গল্পটা আমাদের ছিল

৩৫তম পর্ব

লেখক: জান্নাতুল ফেরদৌস জেরি

#গল্পটা_আমাদের_ছিল

#লেখিকা_জান্নাতুল_ফেরদৌস_জেরিন

#পর্বঃ৩১ ( প্রথমাংশ )

~~ অনুমতি বিহীন কপি করা নিষিদ্ধ 🚫 ~~

সময় সে তো চিরবহমান। কারও অপেক্ষা, অভিমান কিংবা বুকভরা অপ্রকাশিত অনুভূতির জন্য সে কখনো থেমে থাকে না। নিজের আপন ছন্দে বয়ে চলতে চলতেই সেই ঘটনার পর আরও দুটো দিন নিঃশব্দে ক্যালেন্ডারের পাতা থেকে হারিয়ে গেল।

এই দুই দিনে যেন বদলে গেল চারপাশের পরিবেশ। চৌধুরী বাড়ি আর দেওয়ান বাড়ি— দুই বাড়ি বিয়ের আয়োজনের ব্যস্ততায় মুখর হয়ে উঠল। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত একের পর এক আত্মীয়-স্বজনের আনাগোনা, কর্মব্যস্ত মানুষের ছুটোছুটি, সাজসজ্জার তোড়জোড়, নতুন নতুন পরিকল্পনা আর হাসি-আনন্দে ভরে উঠল প্রতিটি কোণ।কোথাও বিয়ের পোশাক বাছাই চলছে, কোথাও গয়নার হিসাব, কোথাও আবার অতিথিদের আপ্যায়নের তালিকা তৈরি হচ্ছে। দুই পরিবারের প্রবীণদের মুখে তৃপ্তির হাসি, আর ছোটদের চোখেমুখে উৎসবের উচ্ছ্বাস— সব মিলিয়ে পুরো পরিবেশ যেন উৎসবের রঙে রঙিন হয়ে উঠেছে। দেখতে দেখতে দুই বাড়িই পরিণত হলো এক জমজমাট বিয়েবাড়িতে, যেখানে প্রতিটি মুহূর্ত নতুন এক অধ্যায়ের সূচনার অপেক্ষায় প্রহর গুনছে।

আজ দেওয়ান বাড়ির ছোটরা সবাই চৌধুরী বাড়িতে এসেছে। পরিকল্পনা একটাই—নিজেদের নতুন হবু ভাবি রাইশাকে নিয়ে ঢাকার বিভিন্ন জায়গায় ঘুরতে বের হবে। তাই সকাল থেকেই চৌধুরী বাড়িতে উৎসবের আমেজ। রান্নাঘরে বাড়ির বউরা নানান পদের মুখরোচক নাস্তা তৈরিতে ব্যস্ত।

কিছুক্ষণ পর রাফসানদের দল এসে পৌঁছাল। রাফসানসহ দেওয়ান বাড়ির ছয়-সাতজন ভাইবোন আর কয়েকজন কাজিন মিলে ড্রইংরুম যেন মুহূর্তেই সরগরম হয়ে উঠল।

মিসেস চৌধুরীকে দেখেই সবাই ছুটে গিয়ে তাঁকে ঘিরে বসল।

— "ফুফু! এতদিন পর তোমাকে এভাবে কাছে পেলাম! আমরা তো কোনোদিন ভাবতেই পারিনি, আমাদের আরেকজন এত মিষ্টি ফুফু আছে!"

ওদের উচ্ছ্বাস দেখে মিসেস চৌধুরী শুধু মায়াভরা হাসলেন।

তবে সবার কৌতূহলের কেন্দ্রবিন্দু ছিল একজনই—ইলা।

— "ফুফু, ইলাপি ছোটবেলা থেকেই এমন?"

— "ও কী নিয়ে পড়াশোনা করছে?"

— "এত দারুণ বাইক চালানো কবে শিখেছে?"

— "লন্ডনেও কি এমনই ?"

মিসেস চৌধুরী ধৈর্য নিয়ে একে একে সব প্রশ্নের উত্তর দিতে লাগলেন।

ঠিক তখনই রাইশারা আসে নিচে , সাথে সায়রা আর মাইশাও এসে আসল। মিসেস চৌধুরী এহানকে দেখতে ভেতরে চলে গেলেন। পিচ্চিটা তার দাদুর কাছে খেলছিল।

রাফসান চারদিকে তাকিয়ে বলল,

— "আচ্ছা, ইলা কোথায়? ওকে তো দেখছি না!"

প্রশ্নটা শেষ হতেই ইষা ঠোঁট বাঁকিয়ে ব্যঙ্গভরে বলে উঠল,

— "কোথায় আবার! নিশ্চয়ই কোথাও গিয়ে মারামারি করছে। আগে লন্ডনে গুন্ডামি করত, এখন ঢাকায় এসেও সেই স্বভাব যায়নি। বাজে মেয়ে একটা!"

ইষার কথা শেষ হতে না হতেই সায়রা আর মাইশা একসঙ্গে প্রতিবাদ করে উঠল।

— "আপু, মুখ সামলে কথা বলবেন। আমাদের ইলাকে নিয়ে আর একটা বাজে কথাও বলবেন না। সাহস থাকলে ওর সামনে দাঁড়িয়ে এসব বলবেন।এই কথা যদি ইলা একবার নিজের কানে শোনে, ও আপনার কী অবস্থা করবে তা কি আপনার কোনো আইডিয়া আছে? টেনে জিহ্বা ছিঁড়ে দেবে

ইষা ঠোঁট উল্টে বলল,

— "তোমরাও দেখছি ওর মতোই! কী দেখে যে সারাক্ষণ ওই খারাপ মেয়েটার পেছনে ঘুরো, আল্লাহই জানে!"

'খারাপ মেয়ে' কথাটা শুনে সায়রা রাগে তেড়ে গেল। কিন্তু মাইশা দ্রুত ওর হাত ধরে থামিয়ে দিল।

এতক্ষণ চুপ করে থাকা রাইশাও এবার কড়া গলায় বলে উঠল,

— "ইষা! তুই ইলার পেছনে এভাবে লেগে আছিস কেন? ও আসার পর থেকে শুধু ওকেই নিয়ে বাজে কথা বলছিস। আর একটা শব্দ বলবি, তাহলে ইলা আসার আগেই আমার হাত থেকে থাপ্পড় খাবি!"

এত মানুষের সামনে এমন অপমানের পর ইষার মুখ লাল হয়ে উঠল। বাইরে সে চুপ করে থাকলেও ভেতরে ভেতরে রাগে জ্বলতে লাগল।

'এত বড় সাহস! এই বাইরের ফালতু মাইয়ারাও এখন আমার সামনে এসে আমার সাথে উচ্চ গলায় কথা বলে আমারে মারার ভয় দেখায়! এদের সবাইকে এক্কেবারে কড়া শিক্ষা দিতে হবে! ওরা তো জানে না যে ওদের এই ওভারস্মার্টনেসের বদলা নিতে আমি ওদের সাথে ঠিক কী করতে পারি! এই অপমানের শোধ আমি এক এক করে নেব!

রাফসানরা নাস্তা শেষ করে বড়দের কাছ থেকে বিদায় নিল। এরপর সবাই মিলে রাইশাদের নিয়ে ঘুরতে বের হওয়ার জন্য নিচে চলে এলো।

গাড়ির কাছে এসে রাফসান মুচকি হেসে রাইশার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল ,

— "কোথায় যাবে তোমরা? কোনো স্পেশাল জায়গা পছন্দ আছে?"

রাইশা মৃদু হেসে বলল ,

— "মাইশা আর সায়রা তো ঢাকায় এসে এখনো তেমন কোথাও ঘোরা হয়নি। তুমি বরং এমন একটা সুন্দর, খোলামেলা জায়গায় নিয়ে চলো, যেখানে সবাই মিলে বসে আড্ডাও দেওয়া যাবে।"

রাফসান কয়েক সেকেন্ড ভেবে হাসল।

— "তাহলে চলো, ১০০ ফিট মাদানী অ্যাভিনিউয়ের Chef's Table Courtside-এ যাই। জায়গাটা প্রিমিয়াম, পরিবেশও দারুণ। আড্ডা দেওয়ার জন্য একদম পারফেক্ট। আশা করি সবারই ভালো লাগবে।"

সবাই রাজি হয়ে গেল।

কিছুক্ষণ পর দুটো গাড়ি নিয়ে ওরা রওনা দিল।

প্রথম গাড়িটা নিজেই ড্রাইভ করছিল রাফসান। পাশে বসেছিল রাইশা। আর পেছনের সিটে গল্প আর হাসি-আড্ডায় মেতে ছিল সায়রা, মাইশা, আফরা, আয়াত, রাইমা আর দেওয়ান বাড়ির আরও কয়েকজন কাজিন। বাকিরা উঠে বসল দ্বিতীয় গাড়িতে তাদের সাথে ইশা ও আছে।

গাড়ি চলতে চলতেই রাফসান আড়চোখে রাইশার দিকে তাকিয়ে বলল ,

— "আচ্ছা, ইলা আর ওর সাথের গুলো কি আজ আমাদের সঙ্গে জয়েন করবে?"

রাইশা মাথা নেড়ে বলল—

— "আসবে বলেছিল, ও যেখানে যাবে দেখবে কেউ নেওয়ার আগে ওর সাথে'র গুলো ওখানে উপস্থিত। দাঁড়াও, ওকে ফোন করে জেনে নিই।"

এই বলে ফোন বের করে ইলাকে কল দিল সে। কয়েকবার রিং হওয়ার পর একেবারে শেষ মুহূর্তে গিয়ে ফোনটা রিসিভ হলো।

— "কোথায় তুই?" রাইশা জিজ্ঞেস করল।

ওপাশ থেকে ইলার স্বাভাবিক গম্ভীর কণ্ঠ ভেসে এলো ,

— "অফিসে। কেন?"

— "আসবি কখন?"

— "কাজ শেষ হলেই।"

রাইশা এবার বলল ,

— "শোন, আমরা সবাই ১০০ ফিটের Chef's Table Courtside-এ যাচ্ছি। তোর মিটিং শেষ হলে ইরহামদের নিয়ে সোজা এখানেই চলে আয়। দেওয়ান বাড়ির সবাই তোকে দেখার জন্য মুখিয়ে আছে।"

ইলা সংক্ষিপ্ত স্বরে উত্তর দিল ,

— "আচ্ছা, চলে আসব। আর শোনো , ভিড়ের মধ্যে সায়রা আর মাইশার দিকে একটু খেয়াল রাখিও।"

ইলার কথাটা শুনে রাইশা ঠোঁট ফুলিয়ে মজা করে বলল ,

— "বাহ! আজকাল দেখি তোর সব চিন্তা শুধু সায়রা আর মাইশাকে নিয়েই। আমরা যেন কেউই কিছু না! তুই না থাকলে বোধহয় আমরা পথই খুঁজে পাব না!"

রাইশার অভিমান মেশানো কথায় ওপাশ থেকে ইলার হালকা হাসির শব্দ ভেসে এলো।

┈┈┈┈┈┈┈┈┈┈

বাইরে দুপুরের কড়া রোদ, কিন্তু শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত বিশাল কনফারেন্স রুমটায় এক অন্যরকম গম্ভীর পরিবেশ। ওভাল শেপের বড় টেবিলটার চারপাশে বসে আছেন কিছু বিজনেস ক্লাইন্ট , আশরাফ সাহেব, ইলা, ইরহাম, জুনায়েদ, মাহিম আর আরিয়ান। টেবিলের ওপর সাজানো ওনাদের কিছু প্রজেক্টের বিভিন্ন ম্যানুফ্যাকচারিং প্রডাক্ট আর স্যাম্পল ডিজাইন।

​ইলা পুরো বিজনেস ওয়ার্ল্ডের জন্য এক জ্বলন্ত বিস্ময়! ও একের পর এক প্রডাক্ট হাতে তুলে নিচ্ছে, আর মাত্র এক নজর দেখেই অত্যন্ত সূক্ষ্ম আর নিখুঁতভাবে বলে দিচ্ছে—কোনটার ম্যাটেরিয়াল কেমন, কোনটার ম্যানুফ্যাকচারিং কস্ট কেমন পড়বে এবং ইন্টারন্যাশনাল মার্কেটে কোন প্রডাক্টের ডিমান্ড কেমন হতে পারে। ওর এই তুখোড় বিশ্লেষণ আর অসামান্য অভিজ্ঞতা দেখে সেখানে উপস্থিত বিজনেসম্যান ও কর্মকর্তারা এক্কেবারে থমকে গেছে! ওনাদের চোখ চড়কগাছ। মনে মনে ভাবছেন, স্রেফ তো একটা মেয়ে, অথচ কী মারাত্মক ওর বিজনেস সেন্স! আসলে ও তো আর এমনে এমনে বিশ্বের টপ বিজনেস ওমেন হয়ে ওঠেনি! ওর মাথায় খেলা করে বিজনেস ইম্পায়ারের সবচেয়ে ধারালো চালগুলো।

​আরিয়ান ওর সিটে হেলান দিয়ে বসে এক দৃষ্টিতে ইলার দিকে তাকিয়ে আছে। ও ইলাকে যতই দেখছে, ততই ওনার বিস্ময়ের সীমা ছাড়িয়ে যাচ্ছে। মনে মনে ভাবছে—

‘একটা মানুষের ভেতরে এত গুণ কীভাবে থাকতে পারে? ও যেমন তেমনই ওর কড়া লিডারশিপ, আবার এদিকে বিজনেস টেবিলে ও আস্ত একটা ডেঞ্জারাস শার্ক! না জানি আরও কত রহস্য লুকিয়ে আছে এই মেয়ের আড়ালে!’

​আরিয়ান আড়চোখে ইলার প্রতিটা মুভমেন্ট খেয়াল করছে। গত দুই দিন ধরে ইলাকে ও বিন্দুমাত্র দেখার সুযোগ পায়নি। মেয়েটা রাতে কখন ওদের বাড়ি ফেরে, আর কখন নিজের রুমে চলে যায়—কেউ টেরই পায় না। আরিয়ান এই দুই দিন ধরে ইলাকে একটু দেখার জন্য ছটফট করছিল, তৃষ্ণার্ত চাতক পাখির মতো চেয়ে ছিল ওর পথের দিকে, কিন্তু এক সেকেন্ডের জন্যও ওর দেখা পায়নি। আজ কনফারেন্স রুমের এই কাছাকাছি দূরত্বে ইলাকে এতক্ষণ ধরে চোখের সামনে দেখে আরিয়ানের ভেতরের এই অজানা ব্যাকুল তৃষ্ণাটা যেন একটু হলেও শান্ত হলো।

​বিজনেস দুনিয়ায় পা রাখলে ইলা এক্কেবারে অন্য মানুষে রূপান্তর হয়ে যায়। ও যে এত বড় এক গুন্ডি আর লাগামছাড়া মেয়ে, তা ওনার প্রফেশনাল ভাইব দেখলে চেনার সাধ্য দুনিয়ার কারো নেই! ও ওর সেই চিরচেনা সভাব একপাশে সরিয়ে রেখে, অত্যন্ত মার্জিত আর ফ

গম্ভীর বিজনেস পার্টনারদের উদ্দেশ্যে বলতে লাগল ,

​— "লুক, আশরাফ আঙ্কেল। এই প্রডাক্টের ফাইবার ফিনিশিংটা কিন্তু ইন্টারন্যাশনাল স্ট্যান্ডার্ডের সাথে ম্যাচ করছে না। আপনাদের যদি গ্লোবাল মার্কেটে লিড করতে হয়, তবে এই পলিমার গ্রেডটা চেঞ্জ করে গ্রেড-এ ফাইবার ইউজ করতে হবে। আর এই সেকেন্ড প্রডাক্টটার ক্ষেত্রে ডিজাইনটা একটু বেশি বাল্কি হয়ে গেছে। বর্তমান জেনারেশন মিনিমালিস্টিক ডিজাইন পছন্দ করে। সো, এটার বডি ফ্রেম আরও স্লিক আর লাইটওয়েট করতে হবে। কস্টিং নিয়ে চিন্তা করবেন না, ওটার সলিউশন আমার মাথায় আছে।"

​ইলার মুখে এমন সাবলীল আর ঝরঝরে বিজনেস টক শুনে আশরাফ সাহেব এক চিলতে তৃপ্তির হাসি হেসে মাথা নাড়লেন, আর আরিয়ানের চোখের তৃষ্ণা মেটানোর ঘোরটা যেন আরও বেশি গভীর হয়ে উঠল!

ইলার মুখে প্রডাক্টের এমন নিখুঁত আর তুখোড় বিশ্লেষণ শুনে কনফারেন্স রুমের সবার একবাক্যে পছন্দ হলেও, মিস্টার শামিম নামের এক অহংকারী বিজনেস পার্টনারের তা বিন্দুমাত্র সহ্য হলো না। তিনি মুখ কুঁচকে, এক্কেবারে খেঁকিয়ে উঠে বলে উঠল ,

— "বেশি বড় হয়ে গেছো, তাই না? এইটুকু একটা পুঁচকে মেয়ে, সে বিজনেস বুঝবে কী আর বলবে কী! আশরাফ মির্জাদের বিজনেস এমনিতেই অনেক খারাপ যাচ্ছে, আর এখন এই আনকোরা মেয়ের ফালতু পদ্ধতি অবলম্বন করলে তারা যে এক্কেবারে পথে বসবে, তা একদম নিশ্চিত! গালভরা ইংরেজি বললেই বড় বিজনেসম্যান হওয়া যায় না, খুকি!"

​তার এই অপমানজনক কথা শুনে পাশে বসা ইরহাম আর জুনায়েদ,মাহিম রাগে আগুন হয়ে টেবিল চাপড়ে কিছু বলতে গেল, কিন্তু ইলা এক সেকেন্ডে ওদের হাত তুলে শান্ত থাকার ইশারা করল। ওর চেহারায় রাগের বদলে ফুটে উঠল এক অদ্ভুত শীতল ও তাচ্ছিল্যের হাসি।

​ইলা হালকা হেসে অত্যন্ত শান্ত গলায় জিজ্ঞেস করল,

─ "তা মিস্টার শামিম, আপনি বিজনেস জগতে কত দিন ধরে আছেন?"

মিস্টার শামিম দম্ভের সাথে বুক ফুলিয়ে বললেন— "৩৫ বছরের মতো! বা তারও বেশি।"

ইলা এক চিলতে বাঁকা হাসি হেসে বলল ,

─ "ওহ, আই সি... তা এত দিনের পুরনো বিজনেসম্যান আপনি, তাহলে তো মার্কেট নিয়ে আপনার অনেক গভীর ধারণা, তাই না?"

মিস্টার শামিম চটে গিয়ে বললেন ,

"অবশ্যই! তুমি কোন হরিদাস পাল? কয়দিন ধরে বিজনেস করছ যে সেইদিনের এক পুঁচকে মেয়ে আজ এই জগতে এসে এত এটিটিউড দেখাচ্ছো?!"

​ইলা ওর চেয়ারে আরাম করে হেলান দিয়ে ওর ফোনের স্ক্রিনে খটখট করে কী যেন টাইপ করতে করতে বলল,

— "আমি কবে আসছি আর কত দিন ধরে আছি, দ্যাট ডাজ নট ম্যাটার। আপনি যখন এতই ক্ষমতাবান, এক কাজ করেন তাহলে—আপনি নিজেই ওনাদের এই প্রডাক্ট গ্লোবাল মার্কেটে সেল করে সুপারহিট বানিয়ে দেখান। আর যেহেতু আপনার অনেক পাওয়ার, আমার এই ‘ফালতু’ আইডিয়ার বিজনেসটা পারলে জাস্ট বন্ধ করে দেখান!"

​মিস্টার শামিম অহংকারের চরম সীমায় গিয়ে তাচ্ছিল্য করে বললেন,

─ "আরেহ! এটা কোনো ব্যাপার হলো? আমার এক ইশারায় তোমার মতো মেয়ের বিজনেস আমি মাত্র এক দিনের মধ্যে মাটির সাথে মিশিয়ে তোমাকে ধংস করে দিতে পারব!"

​আরিয়ান চুপচাপ বসে পুরো সিনটা দেখছিল। ও এখনো ইলার ক্ষমতার গভীরতা সম্পর্কে পুরোপুরি জানে না, তাই ও চরম কৌতুহল আর বিস্ময় নিয়ে তাকিয়ে রইল। তবে কনফারেন্স রুমে বসা বাকি বিজনেস ক্লায়েন্টরা মিস্টার শামিমের কথা শুনে এক্কেবারে আঁতকে উঠলেন! ওনারা মনে মনে ভাবলেন—মিস্টার শামিম তো দেখছি সাক্ষাৎ জমের সাথে পাঙ্গা নিল! ও জানে না ও কার সাথে লাগতে গেছে!

আশরাফ সাহেব তখন একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে মিস্টার শামিমের দিকে তাকিয়ে বললেন ,

— "মিস্টার শামিম, কেন যে আপনি এই ঘুমন্ত সিংহীটাকে খ্যাপালেন? এর পরিণতি কী খতরনাক হতে পারে, তা আপনি এখন না বুঝলেও খুব দ্রুতই টের পাবেন!"

​ইলা ফোন থেকে চোখ না তুলে শান্ত কিন্তু বরফশীতল গলায় বলল,

— "লিসেন মিস্টার শামিম, বিজনেস নিয়ে আমাকে জ্ঞান দিতে আইসেন না। আপনি তো সস্তা প্রফিট খোঁজেন।"

মিস্টার শামিম রেগেমেগে চিৎকার করে বললেন,

— "মেয়ে, তুমি যে এত লাফাচ্ছো, তাহলে তুমিই

বলো—আসল বিজনেসটা কী?!"

​ইলা এবার ফোনটা টেবিলের ওপর স্লাইড করে রেখে মিস্টার শামিমের চোখের দিকে চাবুকের মতো চোখ রেখে বলল ,

— "যখন কোনো মানুষ বড় কিছু করতে চায়, তখন সেখানে বিগ রিস্ক থাকবেই। আর যদি লাইফে রিস্ক নেওয়া না হয়, তবে কোনোদিন সাকসেসের মুখ দেখা যায় না। বিনা রিস্কে চোরের মতো যে বিজনেস করা হয়, গ্লোবাল মার্কেটে সেটার কোনো ভ্যালু থাকে না এবং তা কখনো স্থায়ী হয় না! দিস ইজ বিজনেস, মিস্টার শামিম!"

​ইলার মুখের এই অসামান্য বিজনেস থিওরি শুনে পুরো কনফারেন্স রুমের মানুষ একদম থমকে গেল। যে বয়সের মেয়েরা সাধারণত প্রেম, বিয়ে, সাজগোজ আর ঘোরাঘুরি নিয়ে ব্যস্ত থাকে, সেখানে এই অল্প বয়সী মেয়েটার চিন্তা-ভাবনা বিজনেসের এত গভীরে চলে গেছে—তা ভাবাই যায় না!

​মুহূর্তের মধ্যে পুরো কনফারেন্স রুম জুড়ে মিস্টার শামিম ছাড়া বাকি সবাই একসঙ্গে জোরে তালি বাজিয়ে উঠল। আরিয়ান তো এক্কেবারে মুগ্ধ নয়নে ইলার দিকে তাকিয়ে।

​মিটিং শেষ করে ইলা আশরাফ সাহেবের সাথে টুকটাক কথা বলে বাকি সব ক্লায়েন্টদের সাথে হাসিমুখে হ্যান্ডশেক করল, শুধু মিস্টার শামিমকে ইগনোর করে ওখান থেকে বের হতে গেল। ওর এতো গুলো মানুষের সামনে করা অপমান টা সহ্য করতে না পেরে মিস্টার শামিম পেছন থেকে দাঁত কিড়মিড় করে চেঁচিয়ে বললেন,

— "অহংকার ভালো না মেয়ে! মাসে আর কত টাকাই বা ইনকাম করো যে এত দেমাগ দেখাও? আমার এক মাসের ইনকামের মতো ইনকাম করার যোগ্যতাও তোমার নেই!"

​ঠিক তখনই মিস্টার শামিমের পকেটের ফোনটা বিকট শব্দে বেজে উঠল। তিনি ওনার অ্যাসিস্ট্যান্টের কল দেখে রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে অ্যাসিস্ট্যান্ট এক্কেবারে হাউমাউ করে কাঁদতে কাঁদতে বলতে লাগল ,

— "স্যার! স্যার সর্বনাশ হয়ে গেছে! আমাদের সব প্রডাক্টের সেল হঠাৎ বন্ধ হয়ে গেছে! এমনকি যাদের সাথে আমাদের কোটি টাকার বড় বড় মিটিং কনফার্ম ছিল, সব ক্লায়েন্ট একযোগে ডিল ক্যানসেল করে দিছে! ওপর মহল থেকে আমাদের লাইসেন্স বাতিল করে বিজনেস পুরোপুরি সিলগালা করার নোটিশ আসছে! শুধু তাই না স্যার, ট্যাক্স ফাঁকি আর দুর্নীতির অভিযোগে পুলিশ অলরেডি আপনাকে অ্যারেস্ট করতে অফিসে চলে আসছে! আপনি যেখানে আছেন, তাড়াতাড়ি সেখান থেকে পালান স্যার! আমরা এক নিমিষে পুরোপুরি পথে বসে গেছি... হ্যালো? স্যার...!"

​অ্যাসিস্ট্যান্টের ওপাশের চিৎকার আর শোনা গেল না। পুরো কনফারেন্স রুম তখন এক নিথর শ্মশানের মতো স্তব্ধ! সবাই পাথরের মতো জমে গেছে। একটু আগেও যে মানুষের অহংকারে পা মাটিতে পড়ছিল না, সে মাত্র কিছু সময় আস্ত একটা পথের ভিখারি হয়ে গেল! ভাবা যায়?!

​ইলা এবার মিস্টার শামিমের দিকে ফিরে ওর ঠোঁট দিয়ে "চ্যু-চ্যু" করে শব্দ করতে শুরু করে।

​মিস্টার শামিম ওনার কপালে হাত দিয়ে ফ্লোরে ধপ করে বসে পড়ে বিড়বিড় করতে লাগলেন— "আমি... আমি কিছু সময়ের মধ্যে কিভাবে পুরোপুরি পথে বসে গেলাম? এটা কী করে সম্ভব?"

তিনি এক্কেবারে পাগল হয়ে ইলার দিকে আঙুল তুলে যা নয় তাই আজেবাজে গালিগালাজ করতে লাগলেন।

​ইলা ওর সানগ্লাসটা পড়ে উপহাস করে গম্ভীর গলায় বলল ,

— "আপনার অনেক পাওয়ার ছিল, তাই না মিস্টার শামিম? আপনার এক্সপেরিয়েন্স ৩৫ বছরের, আর আমার মাত্র ৫ ! আপনার দাবি ছিল আমার সব ধ্বংস করতে আপনার একদিন লাগবে, আর আমার জাস্ট এক সেকেন্ড লাগল আপনার পুরো ৩৫ বছরের সাম্রাজ্য ধুলোয় মিশিয়ে দিতে! সো, এবার জান বাঁচাইতে পালান মিস্টার শামিম, পুলিশ আসার আগেই পালান! ওহ আচ্ছা, আপনি যেন একটু আগে জিজ্ঞেস করছিলেন—আমি মাসে কত টাকা কামাই? লিসেন টু মি কেয়ারফুলি... আপনি আর আপনার পুরো গুষ্ঠি সারা বছর খাটাখাটনি করে যা কামান, আমার বসে তা মাত্র পাঁচ থেকে ছয় ঘণ্টার কামাই! আপনি যেখানে এসে আপনার শেষ সীমানা ভাবেন, আমার সাম্রাজ্য সেখান থেকে কেবল শুরু হয়। সো, এবার বলুন তো—পাওয়ারটা আসলে কার বেশি?!"

ইলা ওখানকার বড় বড় ক্লায়েন্টদের থেকে বিদায় নিয়ে ইরহামদের বলল— "চল, এবার বের হওয়া যাক।"

কনফারেন্স রুমে তখনো এক অদ্ভুত স্তব্ধতা। ওখানকার প্রত্যেকেই চরম বিস্ময়ে হাঁ করে তাকিয়ে আছে। ওদিকে আরিয়ান যেন পুরোপুরি থমকে গেছে! একটা মানুষ কিভাবে এতোটুকু সময় এত বড় একজন পাওয়ারফুল বিজনেসম্যানকে পথের ফকির বানিয়ে দিতে পারে—এটা ওর কল্পনারও বাইরে ছিল।

​আরিয়ানের বুকের ভেতরটা হঠাৎ কেমন যেন ওলটপালট হয়ে উঠল। ইলার এই রহস্যময়, ক্ষুরধার আর ড্যাম-কেয়ার রূপটা যতবার ও সামনে থেকে দেখছে, ততবার ওর মনের ভেতরে লুকিয়ে থাকা একটা পুরনো ক্ষত চাড়া দিয়ে উঠছে।

ও মনে মনে আউড়ে উঠল—

─'আহ! একে দেখলেই আমার কেন জানি বারবার মৃত্তিকা পাখির কথা মনে পড়ে যায়!

​হঠাৎ করেই আরিয়ানের মনটা এক চরম বিষাদে ছেয়ে গেল। এখন ওর আর কোনো কিছুই ভালো লাগছে না। এই মুহূর্তে ওর কিছু একাকিত্ব সময় কাটানো খুব দরকার। নিজেকে একটু সামলে নিয়ে আরিয়ান ওর আব্বুর সাথে সংক্ষেপে কিছু কাজের কথা বলল, তারপর আর এক সেকেন্ডও না দাঁড়িয়ে অফিস থেকে একরকম তাড়াহুড়া করে চলে এল। ও সোজা ওর বাসায় গিয়ে মৃওিকার সেই পুরোনো সেঁতসেঁতে ঘরটায় একা একা বসে থাকার সিদ্ধান্ত নিল। ওই ঘরের নীরবতা আর পুরোনো স্মৃতিগুলোর মাঝেই কেবল ও নিজেকে শান্ত করতে পারবে। ইদানীং কেন জানি ইলাকে দেখলেই মৃওিকার কথা বেশি মনে পড়ে আরিয়ানের, আর ঠিক তখনই ওর বুকের ভেতরটা ভার হয়ে ওঠে, শ্বাস নিতে কষ্ট হয়। সময়টা তখন দুপুর গড়িয়েছে, আরিয়ান এক বুক একাকিত্ব নিয়ে ওর বাসার উদ্দেশ্যে রওনা দিল।

°

°

°

​ওদিকে অফিস থেকে বের হয়ে ইলা, ইরহাম, জুনায়েদ আর মাহিম একটা রেস্টুরেন্ট থেকে ওদের দুপুরের লাঞ্চ সেরে নিল। খাওয়া-দাওয়া শেষ করেই ওনারা কালক্ষেপণ না করে বাইক স্টার্ট দিয়ে রাইশাদের সেই বলা লোকেশন—১০০ ফিট শেফস টেবিল কোর্টসাইডের উদ্দেশ্যে রওনা দিল।

​ওনারা মোট তিনটি বাইক নিয়ে ঝড়ের গতিতে এগিয়ে চলল। ইরহাম একটা বাইকে, জুনায়েদ আর মাহিম দুজনে একটা বাইকে, আর ইলা আলাদা ওনার সেই Kawasaki Ninja H2R নিয়ে একা রাইড করছে।

​কিছুক্ষণ পর ওরা শেফস টেবিল কোর্টসাইডের পার্কিং জোনের সামনে এসে একদম রাইশাদের ঠিক সামনে এসে ব্রেক কষল। চারজনই মাথা থেকে পা পর্যন্ত রাইডিং গিয়ার আর ফুল-ফেস ব্ল্যাক হেলমেট পরা। বাইরে থেকে দেখে মনে হচ্ছে ওরা চারজনই বুঝি মারাত্মক কোনো ড্যাশিং ছেলে!

​ইলাদের এই এন্ট্রি দেখে সায়রা আর মাইশা এক গাল হেসে ওদের দিকে এগিয়ে এল। দেওয়ান আর চৌধুরী বাড়ির বাকিরা সবাই এক দৃষ্টিতে ওদের দিকে তাকিয়ে রইল। যারা ইলার গ্যাংকে চেনে—যেমন রাফসান, রাইশারা—ওরা একদম চুপ করে মুচকি হাসছে। আর দেওয়ান বাড়ির বাকি যারা ওদের চেনে না তাড়া তাকিয়ে আছে।

​সায়রা ইলার বাইকের সামনে গিয়ে একটু অভিমানি গলায় নাক কুঁচকে বলল— "দোস্ত! তুই আমাদের সাথে করে নিস না, কিন্তু এই তিনটা আস্ত বড় বানরকে সবসময় সাথে নিয়ে ঘুরিস, এটা কেমন কথা?!"

​ইলা হেলমেটের গ্লাসের আড়াল থেকেই মৃদু হেসে বলল— ─ "ওলে আমার পাখিটা রে! রাগ করো না সোনা, তুমি তো আমার জান। নেক্সট টাইম তোমাকে অবশ্যই সাথে নিয়ে যাব, প্রমিস।"

​কথা বলতে বলতেই ইলা ওর ব্ল্যাক হেলমেটটা এক ঝটকায় মাথা থেকে খুলে ফেলল। ওদিকে হেলমেট খুলতেই জুনায়েদ আর মাহিম সায়রার ওপর এক্কেবারে চড়াও হয়ে ঝগড়া শুরু করে দিল। জুনায়েদ নিজের চুলগুলো একটু ঠিক করতে করতে বলল,

— "আরেহ! কচু মার্কা কথা বলবি না সায়রা! আমরা কত কিউট, কত হ্যান্ডসাম! তা দেখে যে তোর ভেতরে হিংসেয় একদম আগুন জ্বলে, তা আমরা খুব ভালো করেই বুঝি, বুঝলি?"

​মাহিমও সুর মিলিয়ে বলল,

— "একদম! আমাদের বাদর বলার আগে নিজের চেহারাটা আয়নায় দেখছিস কখনো?!"

ওদের এই ঝগড়া দেখে মাইশারা হাসিতে ভেঙে পড়ল।

​কিন্তু এই পুরো সময়টায় দেওয়ান আর চৌধুরী বাড়ির বাকি সবাই ইলার দিকে একদম চোখ বড় বড় করে হাঁ করে তাকিয়ে রইল! কারণ হেলমেট খোলার পর ইলার যে ক্যাজুয়াল অথচ মারাত্মক লুকটা সামনে এল, তা যেন আস্ত একটা জীবন্ত ছবি!

​

ইলা পরে আছে একটা ওল্ড-মানি স্টাইলের লাইট ব্লু স্ট্রাইপড বাটন-আপ শার্ট, যার হাতা দুটো ক্যাজুয়ালি কনুই পর্যন্ত গোটানো। ভেতরে একটা স্নো-হোয়াইট প্লেইন ইনার টি-শার্ট ইন করা, সাথে পরে আছে হাই-ওয়েস্টেড ওয়াইড-লেগ লাইট ওয়াশ ব্লু জিন্স আর পায়ে ধবধবে সাদা ক্লাসিক স্নিকার্স। ওনার চুলগুলো পেছনের দিকে একটা চকোলেট ব্রাউন ক্লাচ ক্লিপ দিয়ে খুব সুন্দর আর মেসি একটা খোঁপা করা, যেখান থেকে কয়েকটা চুলের গোছা ওনার গালের দুপাশে এসে আলতো করে ছুঁয়ে আছে। ওর চোখের ওপর পরা একটা ডার্ক ওভাল সানগ্লাস, গলায় একটা স্লিক গোল্ডেন চেইন আর কানে ছোট গোল্ডেন হুপস। কাঁধে ঝুলানো একটা হোয়াইট মিনি ক্রসবডি ব্যাগ।

সিম্পল একটা আউটফিটেও ইলাকে এত বেশি গ্ল্যামারাস লাগছিল যে, দেওয়ান বাড়ির ছেলেপেলেরা তো বটেই, এমনকি একটু আগে ইলাকে "নোংরা মেয়ে" বলে গালি দেওয়া ইষার নিজের চোখও হিংসা আর বিস্ময়ে এক্কেবারে চড়কগাছ হয়ে গেল! ও লাইফে অনেক মেয়ে দেখছে কিন্তু এত নিখুঁত কোনো মেয়েকে সামনাসামনি দেখেনি, যতো দেখে ততই অবাক হচ্ছে। ইষা মনে মনে জ্বলতে জ্বলতে ভাবল,

─ "ইলার কেন এতো সুন্দর হতে হবে? সব ছেলে ওর দিকে তাকিয়ে আছে! আমার দিকে এতোক্ষণ তাকিয়ে ছিল, তাহলে এখন কেন তাকাচ্ছে না, ওর জন্ম হইছে আমার সুখ আর এটেনশন কেড়ে নেওয়ার জন্য!" ও ইলার দিকে এমনভাবে তাকাল যেন পারলে চোখ দিয়েই ওকে পুড়িয়ে ভস্ম করে দেবে।

রাফসান একটু আমতা আমতা করে ইলার সামনে এসে হালকা হেসে বলল,

— "ইলা, কেমন আছো? ওইদিন ঠিকমতো কথা বলতে পারিনি।"

ইলা সানগ্লাসটা এক আঙুলে সামান্য নামিয়ে বলল,

— "আমি অলওয়েজ ভালো থাকি। তা নতুন দুলা, আপনি কেমন আছেন?"

রাফসান মাথা চুলকে হেসে বলল,

— "আলহামদুলিল্লাহ, ভালো আছি।"

ঠিক তখনই রাফসানের বোন আর কাজিনরা আর কৌতূহল সামলাতে না পেরে বলে উঠল,

— "আমাদের সাথে পরিচয় করিয়ে দেবে না?"

ইলা কাঁধ ঝাঁকিয়ে মুচকি হেসে বলল,

— "ইয়াহ, শিওর!"

রাফসান একে একে সবাইকে পরিচয় করিয়ে দিল,

— "এইটা আমার ছোট বোন রাফিয়া। আরিশা আর আহিয়ান—মেজো আব্বুর ছেলে-মেয়ে। সাবিহা আর সাকিব—ছোট আব্বুর। আর ওরা আমাদের কাজিন ফাহাদ, মিথিলা, জাইমা, তাহমিদ, আকাশ, শিলা, তরণী আর মিম।"

ইলা সবার দিকে তাকিয়ে হালকা হাত নেড়ে বলল,

— "হাই, এভরিওয়ান।"

ইলার দিকে ভালো করে তাকিয়েই সবাই মুগ্ধ হয়ে একসাথে বলে উঠল,

— "ওহ মাই গড! তুমি অনেক সুন্দর! বিশেষ করে তোমার চো—"

"শাট আপ!"

শব্দটা শেষ হওয়ার আগেই ইলা হাত তুলে ওদের থামিয়ে দিল। গম্ভীর মুখে বলল,

— "সব প্রশংসা আমার ভালো লাগে। কিন্তু এটা নিয়ে কোনো কমপ্লিমেন্ট আমি একদম পছন্দ করি না। তাই প্লিজ... ওটা স্কিপ করো।"

ইলার মুখের গম্ভীরতা দেখে সবাই থমকে গেল।

জুনায়েদ, ইরহাম আর মাহিম ,সায়রা ,মাইশা একে অপরের মুখের দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলল। এত বছর একসাথে থেকেও ওরা আজ পর্যন্ত বুঝতে পারেনি— প্রশংসা শুনলেই কেন ইলার মেজাজ বদলে যায়।

পরিবেশটা হালকা করতে আয়াত দৌড়ে এসে ইলার হাত জড়িয়ে ধরে আদুরে গলায় বলল,

— "আপি! জানো তোমাকে কত মিস করছি?"

ইলা বলল,

— "কত বাল মিস করছিস সেটা তো দেখেই বুঝলাম! একটু আগেই তো ওদিক থেকে ছবি তুলে আসলি!"

আয়াত দুই গালে হাত দিয়ে নাটকীয় ভঙ্গিতে বলল,

— "আপি! এইটা সবাইকে বলতে হয়?"

ইলা শার্টের কলারটা ঠিক করতে করতে নির্বিকার গলায় বলল,

— "ইয়াপ! আমি সবই পারি।"

ওদের কথা শুনে চারপাশে হাসির রোল পড়ে গেল।

রাফসান মুচকি হেসে জিজ্ঞেস করল,

— "তা তোরা কিছু খেয়ে এসেছিস?"

ইলা, ইরহাম, জুনায়েদ আর মাহিম মাথা নেড়ে বলল,

— "হ্যাঁ।"

রাইশা পাশে দাঁড়িয়ে জিজ্ঞেস করল,

— "কী দিয়ে খেয়ে এসেছিস?"

এক সেকেন্ড দেরি না করে চারজন একই সময়ে, একই সুরে উত্তর দিল,

— "হাত দিয়ে!"

রাইশা কপালে হাত ঠুকে বলল,

— "বলদের দল! আমি খাবার কী ছিল সেটা জিজ্ঞেস করছি!"

চারজন আবারও একদম সিরিয়াস মুখ করে বলল,

— "হাত দিয়েই তো খাইছি!"

এবার মাইশা আর সায়রা হাসতে হাসতে প্রায় দ্বিগুণ হয়ে গেল।

মাইশা হাসির মাঝেই বলল,

— "রাইশা আপু, ইলার গ্যাংকে লজিক্যাল প্রশ্ন করা মানেই নিজের বিপদ ডেকে আনা!"

রাইশা কোমরে হাত রেখে ধমকের সুরে বলল,

— "একদম ফাজলামি বন্ধ কর! ঠিকঠাক উত্তর দে।"

তিনজন এবার ইলার দাঁড়ানোর স্টাইল নকল করে মাথা দুলিয়ে আবারও বলল,

— "আমরাও তো ঠিকঠাকই বলছি... হাত দিয়েই খেয়ে আসছি!"

রাইশা আর নিজেকে সামলাতে পারল না। হেসে ইলার দিকে তাকিয়ে বলল,

— "ইলা! তুই তো পুরো একটা আজব পিস। তোর সাথে থাকতে থাকতে এদের সবাইকেও নিজের মতো বলদ বানিয়ে ফেলছিস!"

তারপর ইরহামের দিকে তাকিয়ে বলল,

— "আর ইরহাম, তুই তো দেখি এখন একটু ইলার সঙ্গ পেয়ে নতুন জীবন পাইছিস! আগে তো আহা রে... মাঝে যখন তুই দেশে আসলি, ইলার সঙ্গ না পেয়ে তো তুই এক্কেবারে অসুস্থই হয়ে গেছিলি! ঘরে কোণায় বসে পড়ে খালি এক বুলি আওড়াতি—'আমি ইলাদের কাছে যাবো , আমার ভালো লাগে না, আমাকে লন্ডন যেতে দেও!এই জন্য তুই ঠিক ভাবে দেশে আসতি না,আসলেও চার দিনের মাথায় যাওয়ার জন্য পাগল হয়ে যেতি' লাইক সিরিয়াসলি, তোদের এই গ্রুপটায় সব এক পিস!

মাহিম আর জুনায়েদের দিকে তাকিয়ে আবার বলল,

— "সায়রা আমাকে তোদের সব কীর্তিকলাপও বলেছে। তোরা ছয়জন একসাথে থাকলে পৃথিবীর কোনো মানুষ স্বাভাবিক থাকতে পারবে না!"

কথাটা শেষ হতেই সবাই আবার হো হো করে হেসে উঠল।

আর ওদিকে সবার সামনে এটা বলায় ইরহাম, মাহিম আর জুনায়েদ লজ্জায় মাথা চুলকাতে লাগল।

জুনায়েদ আস্তে করে মাহিমের কানে ফিসফিসিয়ে বলল,

— "দোস্ত... আজকে তো আমাদের ইজ্জতের এক্কেবারে কাবাব বানায় দিলগে

ওদের এই সুন্দর আড্ডার মজাটা যেন আরও জমে উঠল। রাফিয়া, আরিশা, সাবিহা আর সাকিব—ওরা ইলার এই দুষ্টু মিষ্টি রূপটা দেখে এক্কেবারে ওর ফ্যান হয়ে গেছে। ওরা ইলার পাশে ঘেষে বসে এটা-ওটা একনাগাড়ে জিজ্ঞেস করেই যাচ্ছে। ওদের এই আদিখ্যেতা দেখে আয়াত আর আফরা ওনাদের গাল ফুলিয়ে রাগ দেখিয়মিষ্ট,

— "উফ! তোমরা কি আমাদের আপির সাথে একটু শান্তিতে কথাই বলতে দেবে না? সব স্পেস তোমরাই নিয়ে নিচ্ছ!"

​রাফিয়া হেসে ফু দিয়ে বলল,

— "আরেহ! তোমরা তো সারাদিন এক বাসায় থাকো, ওনার সাথে বাসায় গিয়ে কথা বলিও। এখন আমাদের একটু বলতে দাও!"

​রাইমা তখন একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে দুঃখী মুখ করে বলল— "তোমরা ভাবছ বাসায় গেলেই আমরা ওর সাথে কথা বলতে পারি? উঁহু! ওই পিচ্চি এহান তো আমাদের ওর কাছে ঘেঁষতেই দেয় না! আপির কোলে ও একাই রাজত্ব করবে, সামনে গেছিলি চিল্লায় বাড়ি মাথায় তুলে ফেলে!"

​এদিকে আহিয়ান —যে কি না বয়সে ইলার চেয়ে প্রায় তিন বছরের বড়, সে কিন্তু এমনিতে গম্ভীর। তবে নিজের টাইপের পাগলাটে মানুষ পেয়ে গেলে কি আর বড়-ছোটর হিসাব থাকে? আহিয়ানের অবস্থাও এখন তেমন হয়ে গেছে। ইলার এই ভাইব দেখে আহিয়ান ইলার বন্ধুদের সাথে আর ইলার সাথে এইটুকু সময়ের মধ্যেই দেদারসে ফোন নাম্বার দেওয়া-নেওয়া হয়ে গেছে। এই দেখে আহিয়ানের বোনরা ওকে নিয়ে হাসাহাসি করে খোঁচাতে ছাড়ল না,

— "কী রে আহিয়ান ভাইয়া! ইলার নাম্বার নেওয়ার জন্য তো দেখি হাত একেবারে নিসপিস করছিল!"

​ইলা অবশ্য ওর স্বভাবসুলভ ভাবে আহিয়ান কে একটা ভালো কথা বললে উল্টো দশটা বকা দিয়ে সোজা করে দিচ্ছিল, আর আহিয়ান তো অবাক হচ্ছে এতো ওর থেকে ও উপরের লেভেল জাওরা। তবে ওদের এই তুমুল হাসাহাসি আর আড্ডার আসরে ইলাকে দেখলে পৃথিবীর কেউ অন্তত বিশ্বাস করবে না যে—এই মেয়েটাই স্রেফ কিছুক্ষণ আগে প্রফেশনাল দুনিয়ায় এক খতরনাক ঝড় তুলে, এক সেকেন্ডের ইশারায় মিস্টার শামিমের মতো একজন বাঘা বিজনেসম্যানকে তাসের ঘরের মতো ধ্বংস করে রাস্তায় নামিয়ে দিয়ে এসেছে!

সন্ধ্যা তখন ধীরে ধীরে শহরের কোলাহলকে নরম অন্ধকারের চাদরে জড়িয়ে নিচ্ছে। পশ্চিম আকাশে সূর্যের শেষ রক্তিম আভা মিলিয়ে গিয়ে একে একে জ্বলে উঠেছে শহরের অসংখ্য আলোকবিন্দু। হালকা বাতাসে দিনের ক্লান্তি মিশে আছে, আর ব্যস্ত ঢাকার পথঘাট যেন নতুন এক রাতের গল্প লেখার প্রস্তুতি নিচ্ছে।

অনেকক্ষণ আড্ডা, হাসি-ঠাট্টা আর খুনসুটির পর হঠাৎই ইলার ফোনটা বেজে উঠল। স্ক্রিনে "আম্মু" লেখা নামটা ভেসে উঠতেই ও কল রিসিভ করল।

ওপাশ থেকে মিসেস চৌধুরীর মায়াভরা কণ্ঠ ভেসে এলো,

— "কখন আসবি, এহান অনেকক্ষণ ধরে তোকে খুঁজে কান্না করছে। যতই বুঝাই, কিছুতেই শান্ত হচ্ছে না।"

কথাটা শুনেই ইলার মুখের দুষ্টু হাসিটা মুহূর্তেই নরম হয়ে গেল। ও ছোট্ট করে বলল,

— "আচ্ছা আম্মু, আমরা এখনই আসছি।"

ফোনটা কেটে বন্ধুদের দিকে তাকিয়ে হালকা হাসল।

— "গাইজ, চলো... বাসায় ফিরতে হবে।ছোট্ট প্রিন্সটা আবার কান্না শুরু করছে।"

সবাই একসঙ্গে উঠে বাইরে চলে এল। রেস্টুরেন্টের সামনে দাঁড়িয়ে আরও কিছুক্ষণ গল্প চলতে লাগল।

ঠিক তখনই রাফিয়া, আরিশা আর ইলার দুই হাত জড়িয়ে ধরে একসাথে অভিমানী গলায় বলল,

— "প্লিজ, আজ আমাদের বাসায় চলো না! তোমাকে এত তাড়াতাড়ি ছাড়তে একদম মন চাইছে না।"

আরিশা ঠোঁট ফুলিয়ে যোগ করল ,

— "আজ সারাদিনেও তো ঠিকমতো গল্পই করতে পারলাম না।"

সাবিহাও মাথা নেড়ে বলল ,

— "প্রমিস, আজ গেলে আর ছাড়ব না। অন্তত কয়েক দিন আমাদের সাথেই থাকবে ইলাপি!"

​ওদের এই অতিরিক্ত ভালোবাসা দেখে মাইশা এক দুষ্টুমির হাসি হেসে বলল,

— "আরেহ! এতই যখন পছন্দ, তাহলে তোমাদের কোনো হ্যান্ডসাম ভাইয়ের সাথে আমার এই গুন্ডা জানুটাকে বিয়ে দিয়ে এক্কেবারে পার্মানেন্টলি নিজেদের ঘরে রেখে দাও না! এই সুযোগে আমাদেরও ওর বিয়ে খাওয়া হয়ে যাবে!"

​মাইশার এই বিয়ের প্রস্তাব শুনে ইলা ওর সানগ্লাসটা হাতে নিয়ে চোখ গরম করে বলল,

"শালি ,আর সাওয়ার কোনো কথা পেলি না বলার জন্য? দাঁড়া তোকে এবার লন্ডন ফেরত নিয়ে গিয়ে কোনো এক বুড়োর সাথে বিয়ে দিয়ে তবেই শান্ত হব, ওয়েট!"

​ইলার এই কথা শুনে সবাই একসাথে হো হো করে হেসে উঠল। ইলা ওনার সানগ্লাসটা ব্যাগে ঢুকিয়ে হাতের হেলমেটটা মাথায় পরতে পরতে যেমনই পার্কিংয়ের দিকটায় একটু সামনে এগিয়ে যেতে নিল,

ঠিক তখনই—

​ভ্রোঁওওওওওওওওওওওম!

​এক বিকট আর গর্জনকারী ইঞ্জিনের শব্দে পুরো পার্কিং এরিয়া কেঁপে উঠল। চোখের পলকে একটা কুচকুচে কালো বাইক এসে একদম ঝড়ের গতিতে ইলার ঠিক এক ইঞ্চি সামনে এসে ব্রেক কষে আড়াআড়িভাবে দাঁড়িয়ে গেল!

​ইলা এক সেকেন্ডের জন্য থমকে দাঁড়িয়ে গেল। ওর দুই ভুরু কুঁচকে কপালে ভাঁজ পড়ে গেল। কে এই রাইডার? আর এভাবে ইলার পথ আটকে বাইক দাঁড় করানোর কলিজাটাই বা কার হলো?

​বাইকে থাকা রাইডারের পরনে ম্যাট ব্ল্যাক ফুল-ফেস হেলমেট, কালো লেদার রাইডিং জ্যাকেট, ব্ল্যাক রাইডিং গ্লাভস, ফিটেড ব্ল্যাক কার্গো/রাইডিং প্যান্ট আর কালো কমব্যাট বুট। পুরো লুকটাই যেন একজন এলিট স্পোর্টস বাইকারের—রহস্যময়, রাফ আর অসম্ভব আকর্ষণীয়। রাইডার বাইক থামিয়েও কোনো কথা বলছে না, জাস্ট নিথর পাথরের মতো বসে আছে।

​হেলমেটের ভেতরে ইলার মেজাজ এক সেকেন্ডে চড়ে গেল সপ্তম আকাশে। রাগি রূপ ধারণ করে কড়া গলায় চিল্লিয়ে বলল,

— "বাল! এটা বাইক পার্ক করে রাখার জায়গা পেলেন না? নাকি রাস্তা পুরো বাপের সম্পত্তি ভাবছেন? বাইকটা সাইড করেন বলছি!"

​ওপাশ থেকে কোনো উত্তর নেই। রাইডার একদম কাঠের পুতুলের মতো স্ট্যাচু হয়ে রইল।

​ইলা এবার এক পা এগিয়ে গিয়ে ওর হেলমেটের সামনের গ্লাসটা এক ঝটকায় ওপরে তুলে দাঁত কিড়মিড় করে চেঁচিয়ে বলল,

— "ও হ্যালো মিস্টার! কানে কালা নাকি কুত্তা? কী বললাম শুনলেন না? এই লেওড়া বাল-ছাল সব কইতে আসে রে ভাই! কানে কি একদম তুলো গুঁজে রাখছেন?!"

​রাইডারের কোনো হেলদোল না দেখে ইলা রাগে ফেটে পড়ে পাশে দাঁড়ানো ইরহামের দিকে মুখ ঘুরিয়ে বলল,

─"এই বাঙ্গির নাতি ! এই ধনটাকে সোজাসুজি সরতে বল তো! আমার অলরেডি লেট হচ্ছে।"

এই বলে ও ওর ফোনটার দিকে তাকিয়ে সময় দেখল।

​ইরহাম যেমনই একটু রেগেমেগে বাইকটার দিকে এগিয়ে যেতে নিল, ঠিক তখনই ওনাদের পেছন থেকে আরও বাইক এসে গর্জন করে ওদের চারপাশে এক ঘেরাও তৈরি করে দাঁড়িয়ে গেল!

​পেছনের বাইকগুলো দেখে ইলা এবার নিজের রাগ সামলাতে না পেরে বলল,

— "উফ! এক মাদারবোর্ড কি কম ছিল যে এখন এই পুরো বালের গুষ্টিগুলো আসলো?!"

ঠিক তখনই এতক্ষণ নীরব থাকা সামনের বাইকের রাইডার ধীরে ধীরে হেলমেটের লক খুলল।

এক ঝটকায় হেলমেটটা খুলে ফেলতেই—

চারপাশ যেন কয়েক সেকেন্ডের জন্য থমকে গেল।

সেখানে উপস্থিত অনেকের চোখ বিস্ময়ে বড় হয়ে উঠল। কারও ঠোঁট ফাঁক হয়ে গেল, কারও মুখ থেকে অজান্তেই বেরিয়ে এলো—

— "এ... এটা...?"

চলবে...

ভুল-ত্রুটি হলে ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন। 🤍

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৩৫তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন