#দ্বাদশ_বসন্তের_নীলচিঠি
#কলমে #ইয়াজ_ইনসাফ_দেওয়ান
#পর্বসংখ্যা ৮
( বিনা অনুমতিতে কপি করা নিষিদ্ধ)
আদিবার শেষ হতেই পুরো পরিবেশ থমকে গেল। কয়েক মুহূর্ত কেউ কোনো কথা বলল না। ইয়াশ, যে ছেলেটা সারাক্ষণ হাসি-ঠাট্টা আর দুষ্টুমি করে বেড়ায়, সেও আজ অস্বাভাবিকভাবে চুপ। মাথা নিচু করে বসে আছে।
ইউভান ধীরে ধীরে সোফার পিঠে হেলান দিল। তার চোখ স্থির আদিবার দিকে। এই মেয়েটাকে সে যতবার দেখেছে, ততবারই হাসতে দেখেছে। অথচ সেই হাসির আড়ালে এত বড় একটা শূন্যতা লুকিয়ে ছিল, সেটা আজ জানার পর তার বুকের ভেতরটাও কেমন ভারী হয়ে উঠল। তার অনেক দিনের শখ ছিল একটা ছোট বোনের। সেই অপূর্ণ শখ আদিবা এসে পূরণ করে দিয়েছে। অতীতে যা হয়েছে, সেটা ঠিক করা সম্ভব নয়। কিন্তু বর্তমান আর ভবিষ্যতে এই মেয়েটাকে কোনো কষ্ট পেতে দেবে না মনে মনে এমনই এক দৃঢ় প্রতিজ্ঞা করে নিল ইউভান।
ইকবাল দেওয়ান নীরবে দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। আর ইলহাম দেওয়ান চোখ নামিয়ে রইলেন। কারও মুখে কোনো শব্দ নেই। মেহজাবিন দেওয়ান আর আরিবা দেওয়ান একদিকে জড়িয়ে আদিবার দিকে তাকিয়ে আছেন। দুজনেরই চোখ ভিজে উঠেছে।
আর ইয়াজ... সে একদৃষ্টিতে আদিবার দিকে তাকিয়ে আছে। তার মুখে কোনো অভিব্যক্তি নেই, কিন্তু শক্ত হয়ে থাকা চোয়াল আর মুঠো করে রাখা হাত দুটোই বলে দিচ্ছে, ভেতরে ভেতরে সে কতটা অস্থির হয়ে আছে। আদিবার কান্না দেখে তার বুকের ভেতর কেমন যেন মোচড় দিয়ে উঠছে। কেন এত অস্থির লাগছে, সেটাই যেন বুঝতে পারছে না ইয়াজ। শুধু এটুকুই বুঝতে পারছে, আদিবার চোখের পানি সে আর দেখতে পারছে না।
আদিবার কান্না দেখে যেই না ইকবাল দেওয়ান উঠে যেতে উদ্যত হলেন, তার আগেই ইউভান উঠে দাঁড়াল। আদিবার সামনে গিয়ে দাঁড়াল। তারপর নিজের দুই হাত দিয়ে আলতো করে আদিবার দুই গাল ছুঁয়ে মুখটা ওপরে তুলল। আদিবা কান্নার মাঝেই হঠাৎ গালে কারও হাতের স্পর্শ পেয়ে মাথাটা একটু ওপরে তুলতেই দেখতে পেল ইউভান।
" আমার বনু তুই আমার বোন! তোর বর্তমান পরিচয় দেওয়ান পরিবারের একমাত্র মেয়ে তুই। অতীত পরিবর্তন করার ক্ষমতা আমার নেই। অতীতে কী হয়েছে, কতটা কষ্ট পেয়েছিস, কতটা আঘাত সহ্য করেছিস আমি কিছুই জানি না। আর সেসব পরিবর্তনও করতে পারব না। তবে বর্তমানে তোর পরিবার আছে। তোর মা আছে, বাবা আছে, ভাই আছে... আমি আছি, আমরা সবাই আছি। বর্তমানে তোকে যেন কোনো দুঃখ-কষ্ট ছুঁতে না পারে, সেই সর্বোচ্চ চেষ্টা করব আমরা। তোকে ভালো রাখার জন্য যা যা করা দরকার, তার কোনো কমতি থাকবে না। তোকে এতটা ভালোবাসা দেব, যেন তোর অতীত তুই একদিন ভুলে যাস। অতীতের কোনো স্মৃতি যেন আর তোকে কষ্ট দিতে না পারে। আমরা সবাই তোর পাশে আছি। আমরা সবাই তোকে ভালোবাসি। তোর এখন একটা পরিবার আছে। তুই আর একা না। বুঝেছিস, পাখি? মনে থাকবে আমার কথা?"
ইউভানের কথাগুলো শুনে আদিবা হঠাৎ করেই ইউভানকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে শব্দ করে কেঁদে দিল। ইউভান আদিবাকে আরেকটু নিজের কাছে টেনে নিল। আলতো করে ওর মাথাটা নিজের বুকের সঙ্গে মিশিয়ে দিল। আদিবা ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে। কান্নার চাপে ওর হেঁচকি উঠে গেছে। ইউভান কোনো কথা না বলে শুধু ওকে বুকের সঙ্গে জড়িয়ে ধরে রইল।
কিছুক্ষণ পর ইউভান অনুভব করল, তার বুকের কাছে ঠান্ডা ঠান্ডা লাগছে। তখনই বুঝতে পারল, তার টি-শার্ট আদিবার চোখের পানি আর নাকের পানিতে একেবারে ভিজে গেছে। ইউভান এবার আলতো করে আদিবার মাথাটা নিজের বুক থেকে একটু সরিয়ে নিয়ে গম্ভীর মুখ করে বলল,
" কিরে আদি ! তুই দেখি নাকের পুতু খাচ্ছিস! ছিঃ! ক্ষিদে পেয়েছিল বললেই পারতি। ও আম্মু , তোমার মেয়েকে কী খেতে দাও না নাকি? দেখো, বেচারি ক্ষিদের চোটে নাকের পুতু খাচ্ছে! আবার আমার টি-শার্টকেও খাওয়াচ্ছে!"
তারপর নিজের টি-শার্টের দিকে তাকিয়ে নাটকীয় ভঙ্গিতে বলল,
" আমার সাধের টি-শার্টের বারোটা বাজিয়ে দিল! কত কষ্ট করে গুলিস্তান ফুটপাত থেকে দামাদামি করে দুইশো বিশ টাকা দিয়ে কিনেছিলাম। এখন তোমার মেয়েকে বলো আমার টি-শার্ট ধুয়ে দিতে। না হলে কিন্তু খবর আছে, বলে দিলাম! দেখো দেখো, আবার কীভাবে পুতু চেটে চেটে খাচ্ছে! ছিঃ!"
ইউভানের কথা শুনে পুরো সবাই হো হো করে হেসে উঠল। মুহূর্তের মধ্যেই ভারী পরিবেশটা অনেকটা হালকা হয়ে গেল। আদিবা এবার একটু রাগান্বিত স্বরে বলল,
" আমি পুতু খাচ্ছি না। তুমি পুতু খাও!"
ইউভান সঙ্গে সঙ্গেই বলল, " কে যে খায়, সেটা তো সবাই দেখতেই পাচ্ছে! খা, খা... বেশি করে খা। এতে তো ভিটামিন আছে। তোর শরীরে এমনিতেই ভিটামিন কম। খেলে যদি একটু ভিটামিন হয়!"
কথা শেষ করেই আদিবার দিকে তাকিয়ে আবারও জোরে হেসে দিল। হাসতে হাসতে হঠাৎই অনুভব করল, কেউ যেন তার মুখে কিছু মেখে দিল। কেমন নোনতা নোনতা লাগছে! সে অবাক হয়ে আদিবার দিকে ফিরে তাকাতেই আদিবা শয়তানি হাসি দিয়ে বলল,
" তুমিও একটু খাও, ভিটামিন! তোমারও ভিটামিন দরকার আছে।"
কথাটা বলেই আদিবা দৌড় দিল। দৌড়ে গিয়ে ইলহাম দেওয়ানের পাশে বসে পড়ল। ইউভান এতক্ষণে বুঝতে পারল আদিবা কী করেছে ওর সাথে। বুঝতে পেরেই ইউভান ওয়াক ওয়াক করতে শুরু করল। ওয়াক ওয়াক করতে করতে দৌড়ে বেসিনের দিকে চলে গেল। আদিবার এমন কাণ্ড আর ইউভানের এমন রিঅ্যাকশন দেখে ড্রয়িংরুমে বসে থাকা সবাই জোরে হেসে দিল। ইউভান ওয়াক ওয়াক করছে, তা ড্রয়িংরুমে বসে থাকা সবাই শুনতে পাচ্ছে।
ইয়াজ আদিবাকে এমন করতে দেখে চোখ মুখ কুচকিয়ে তাকায়ি বিড়বিড় করে বললো । " কিছু সময় আগে কান্না করে ভাসিয়ে দিচ্ছিলো। এখন আবার বাদরের রুপ ধারন করেছে বেয়াদপ। "
কিছুক্ষণ পরই ইউভান ড্রয়িংরুমে ফিরে এলো। ওর মুখের এমন রিঅ্যাকশন দেখে ইউভান জোরে হেসে দিল। ইয়াশ ইউভানকে বলল,
"কী ভাই, ভিটামিন খেতে কি একটু বেশিই মজা হয়ে গেল? ভাই, ভিটামিনটার টেস্ট কেমন ছিল? আরো খাবি ? আদিকে বললে ও তোরে আরেকটু দিয়ে দেবে।"
ইয়াশের কথা শুনে ড্রয়িংরুমে বসে থাকা সবাই শব্দ করে হেসে উঠল। আদিবাও ইলহাম দেওয়ানকে ধরে খিলখিল করে হেসে উঠল।ইলহাম দেওয়ান মেয়েকে আগলিয়ে নিলো মেয়ের হাসিমাখা মুখ দেখে নিজেও মুচকি হেসে কপালে একটা চুমু একে দিলো। আরিবা দেওয়ান ও এগিয়ে এসে আদিবাকে জড়িয়ে পুরো মুখে চুমু দিলো। আদিবা বাবা মার আদর পেয়ে মুচকি হাসলো৷ মেহেজাবিন দেওয়ান আদিবার দিকে তাকিয়ে বলল,
" আম্মা এখানে আইন তো আমার কাছে আমারে কেউ পাত্তাই দিচ্ছে না দেখি। আমার মেয়েকে একটু আদর করার সুযোগ দাও। "
আদিবা হেসে উঠে মেহেজাবিন দেওয়ান এর কাছে গিয়ে জড়িয়ে ধরলো।
" বড় আম্মু দেও তো অনেক করে আদর করে। " মেহেজাবিন দেওয়ান হেসে মাথায় হাত বুলিয়ে দিলো। ইউভান আদিবার দিকে তাকাল। আদিবাকে এভাবে প্রাণ খুলে হাসতে দেখে ও আর কিছু বলল না। চুপচাপ গিয়ে ওর আম্মুর পাশে বসে পড়ল।
ইউভান বলল, "আচ্ছা, অনেক মজা হয়েছে, এবার খেলা শুরু করা যাক। এবার বোতল আমি ঘোরাব।"
কথাটা বলেই ইউভান পড়ে থাকা বোতলটা তুলে নিয়ে ঘোরাল।সবাই খেলার দিকে মন দিলো। বোতলের মুখটা এবার পড়ল ইয়াজের দিকেই। এটা দেখে মেহজাবিন দেওয়ান ইয়াজের দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসি দিয়ে বলল,
"তো বাবাজান, তুমি কী নেবে শুনি?"
ইয়াজ ওর আম্মুর কথা শুনে কিছুটা বিভ্রান্তিতে পড়ে গেল। ও যদি এখন ডেয়ার নেয়, তাহলে নিশ্চিত ওকে দিয়ে উল্টাপাল্টা কিছু একটা করানো হবে। তার চেয়ে ট্রুথ নেওয়াই ভালো। ইয়াজ বলল,
"আমি ট্রুথ নেব।"
মেহজাবিন দেওয়ান ইয়াজের দিকে তাকিয়ে মুচকি একটা হাসি দিল। ইয়াজ বুঝল না ওর আম্মু কেন এমন মুচকি হাসি দিচ্ছে। তবে ও যে আজ বাঁশ খেতে পারে, এটা ঠিকই বুঝতে পারল। মেহজাবিন দেওয়ান এবার প্রশ্ন করল...
" কোন গার্লফ্রেন্ড জোগাড় করতে পেরেছিস। "
ইয়াজ মেহজাবিন দেওয়ান এর কথা শুনে একটা ঢোক গিললো, তারপর আদিবার দিকে তাকালো দেখতে পেলো আদিবা ও ওর দিকে তাকিয়ে আছে চোখগুলো গোল গোল করে। ইয়াজ দাঁতে দাঁত চেপে মনে মনে বলল, " আরে মেরি মা গার্লফ্রেন্ড জোগাড় করতে পারি আর না পারি একটা চুটকে বউ জোগাড় করেছি। যার বড় হতে হতে আমার যৌবন তো শেষ হয়েই যাবে। তোমাদেরও দাদা-দাদী হওয়া হবেনা। " মেহজাবিন দেওয়ান আবার জিজ্ঞেস করল,
" কি রে কই হারালি! "
" নেই আম্মু মেয়ে খুঁজো বিয়ে করবো। " কথা শেষ করে আদিবার দিকে তাকালো। আদিবা এখনো এক দৃষ্টিতে ইয়াজের দিকে তাকিয়ে আছে ইয়াজের কথা কানে যেতেই বুকের ভিতর কেমন একটা ব্যথা অনুভব করল। তার ছোট্ট মন বুঝতে পারল না এটার কারণ কি। চোখ দিয়ে একফোঁটা পানিও বেরিয়ে গেল। আদিবা সেটা এক হাত দিয়ে নিঃশব্দ মুছে নিলো। ইয়াজ আদিবার কান্ড দেখলো। এই চুটকের কান্না দেখে তার ভিতরে খারাপ লাগা কাজ করছে।
মেহজাবিন দেওয়ান বলে উঠলো, " আবার বোতল ঘোরাও আবাল ছেলে পয়দা করছে একটা একটা গার্লফ্রেন্ড জোগাড় করতে পারেনি উল্টা আমাদেরকে বলছে মেয়ে খুঁজে লজ্জা করে না। "
ইয়াজ মায়ের দিকে তাকালো তার মা জানে তার পিছনে হাজার হাজার মেয়ে ঘুরে বেড়ায় সে পাত্তা দেয় না বলে। এর ভিতর ওর ফোন বেজে উঠলো ফোন ধরে কথা বলে জানতে পারলো হসপিটালে এমার্জেন্সি কেস এসেছে এখনই যেতে হবে। সবাইকে বলে নিজের রুমে চলে গেল হসপিটালে যাবে বলে রেডি হতে। ইয়াজ চলে যেতে আদিবা ওর যাওয়ার দিকে তাকিয়ে থাকলো।এর ভিতর ইউভান আবার বোতল ঘোরালো এবার গিয়ে পড়ল ইয়াশের দিকে । ইয়াশ ও ট্রুথ নিবে বললো। এবারও মেহজাবিন দেওয়ান প্রশ্ন করবে বললো। এ কথা শুনে ইয়াশ ঘোর বিরোধ করে বলে উঠলো,
" এটা তো হবে না আম্মু তুমি কেবল ভাইয়াকে প্রশ্ন করলে আবার আমাকেও কেন করবা আর সবাইকে সুযোগ দাও। "
ইয়াশ ভালো করেই জানত, ওর মা মেহজাবিন দেওয়ান নিশ্চয়ই আজ এমন সব প্রশ্ন করবেন, যেগুলোর উত্তর দিতে গিয়ে ওর ঘাম ছুটে যাবে। এতক্ষণ পর্যন্ত ও ভেবেছিল, সব প্রশ্নের তীর শুধু ইয়াজের দিকেই ছুটবে। কিন্তু না, নিজের মায়ের চোখ এড়িয়ে যাওয়া যে অসম্ভব, সেটা বুঝতে আর বাকি রইল না। মুখের কোণে রহস্যময় হাসি নিয়ে মেহজাবিন দেওয়ান ছেলের দিকে তাকিয়ে আছেন। সেই হাসি দেখেই ইয়াশ বুঝে গেল এবার বাঁশ খাওয়ার পালা ওরই।
"আমি প্রশ্ন করলে সমস্যা কী?" ভ্রু উঁচু করে জিজ্ঞেস করলেন মেহজাবিন দেওয়ান।
ইয়াশ সঙ্গে সঙ্গে দাঁত কেলিয়ে হেসে ফেলল।
"আরে না না, আম্মু! সমস্যা হবে কেন? করো, করো ... যত খুশি প্রশ্ন করো !"
"পরশু বিকেলে রেস্টুরেন্টে কার সঙ্গে ছিলি, ইয়াশ?"
ইয়াশ ভান করে চোখ বড় বড় করল।
"আমি? কই আম্মু! আমি তো কোথাও যাইনি!"
মেহজাবিন দেওয়ান ঠোঁট বাঁকিয়ে বললেন, "বাদরামো করবি না। নিজের চোখে দেখেছি, একটা মেয়ের সঙ্গে বসে ছিলি। তোকে কতবার বলেছি এসব দুষ্টুমি না করতে!"
ইয়াশ নাটকীয় ভঙ্গিতে দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
"আরে আম্মু, আমি তো ফ্রেন্ডদের সঙ্গেই গিয়েছিলাম। কিন্তু সেখানে গিয়ে যা দেখলাম...!"
মেহজাবিন দেওয়ানের কৌতূহল বেড়ে গেল। "কী দেখলি?"
ইয়াশ এবার গলা নামিয়ে রহস্যময় ভঙ্গিতে বলল, "দেখলাম, আব্বু এক ভদ্রমহিলার সঙ্গে দিব্যি বসে কফি খাচ্ছে! ওই যে... ফারিহা আন্টি! দুজনকে একসঙ্গে দেখে তো আমি নিজেই থ হয়ে গিয়েছিলাম!"
কথাটা শেষ হতেই ইকবাল দেওয়ানের হাতে থাকা চায়ের কাপটা প্রায় হাতছাড়া হয়ে গেল। তিনি কাশতে কাশতে চোখ বড় বড় করে ছেলের দিকে তাকালেন।
"এই ছেলে! আমার কথা মাঝখানে কোথা থেকে টেনে আনলি?"
ইয়াশ একেবারে নিরীহ মুখ করে বলল, "আমি তো যা দেখেছি, সেটাই বললাম, আব্বু। মিথ্যা তো বলিনি!"
ইকবাল দেওয়ান কিছু বলার আগেই মেহজাবিন দেওয়ান ধীরে ধীরে তাঁর দিকে ফিরলেন। মুখে মিষ্টি হাসি, কিন্তু সেই হাসি দেখেই ইকবালের বুকের ভেতরটা ধক করে উঠল।
"ইকবাল... রুমে চলো।"
ইকবাল দেওয়ান অপ্রস্তুত হেসে বললেন, "এখন আবার রুমে কেন? খেলা তো এখনও শেষ হয়নি!"
মেহজাবিন দেওয়ান শান্ত গলায় উত্তর দিলেন, "খেলা পরে খেলবে। আগে তোমার গায়ে যে শাকচুন্নি লেগেছে, সেটা ঝেড়ে ফেলতে হবে। চলো।"
কথা শেষ করেই তিনি ইকবাল দেওয়ানের হাত টেনে উঠিয়ে নিলেন।
সোফায় বসে থাকা সবাই কয়েক সেকেন্ড চুপচাপ তাকিয়ে রইল। তারপর ইয়াশ মুখ চেপে হাসতে শুরু করতেই পুরো ড্রয়িংরুম জুড়ে হাসির রোল পড়ে গেল। ইকবাল দেওয়ান ইয়াশের দিকে তাকিয়ে দাঁতে দাঁত চেপে বিড়বিড় করে বলল, " এই ছেলেকে আমি ছাড়ব না! বাপকে ফাঁসিয়ে দেয়। "
মেহজাবিন দেওয়ান ইকবাল দেওয়ানের হাত ধরে টানতে টানতে সোজা নিজেদের রুমে ঢুকলেন। দরজা বন্ধ করার সঙ্গে সঙ্গেই ইকবাল দেওয়ান সাবধানে এক পা পিছিয়ে গেলেন। মুখে কৃত্রিম হাসি ঝুলিয়ে বললেন,
" এই যে... এত সিরিয়াস হওয়ার কী আছে? ছেলেপেলেরা তো মজা করছিল! "
মেহজাবিন দেওয়ান দুই হাত বুকের সামনে ভাঁজ করে তাঁর দিকে তাকিয়ে রইলেন। ঠোঁটের কোণে হালকা হাসি, কিন্তু সেই হাসির আড়ালে কী চলছে, সেটা ইকবাল দেওয়ান খুব ভালো করেই জানেন।
" তাই নাকি? তাহলে বলো দেখি, ফারিহা কে?"
ইকবাল দেওয়ান কপাল কুঁচকে ভাব ধরলেন।
" কোন ফারিহা?"
" বাহ! নামও ভুলে গেছ? তাহলে তো ব্যাপারটা অনেক পুরোনো মনে হচ্ছে! "
" আরে না না! আমি বলতে চাচ্ছি... কোন ফারিহা? এই পৃথিবীতে ফারিহা নামে হাজার মানুষ আছে!"
মেহজাবিন দেওয়ান ধীরে ধীরে তাঁর দিকে এগিয়ে এলেন।
"আমি ওই ফারিহার কথা বলছি, যার সঙ্গে বসে তুমি দিব্যি কফি খাচ্ছিলে।"
ইকবাল দেওয়ান এবার মাথায় হাত দিলেন।
" আরে বাবা, উনি আমার বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের বন্ধু রাশেদের স্ত্রী। রাশেদও ছিল। সে বিল দিতে কাউন্টারে গিয়েছিল। ঠিক তখনই এই হতচ্ছাড়া ইয়াশ এসে দেখে ফেলেছে। আর যা না দেখেছে, সেটা বানিয়ে বানিয়ে বলে দিল! "
মেহজাবিন দেওয়ান কিছুক্ষণ চুপ করে তাঁর দিকে তাকিয়ে রইলেন। তারপর হঠাৎ বললেন, " আচ্ছা, সব কথা পরে হবে। আগে বিশটা উঠবস দাও। "
ইকবাল দেওয়ান চোখ কপালে তুলে বললেন, " কী? "
" শুনতে সমস্যা হয়েছে? বিশটা উঠবস। এখনই। "
" আরে বেগম, আমি তো কোনো দোষই করিনি!"
" সেটা পরে বিচার হবে। কিন্তু তোমার ছেলের মুখে এমন কথা শোনার পর আমার সম্মান গেছে। শাস্তি তো কাউকে পেতেই হবে। যেহেতু আসামি তুমি, তাই শুরু করো। "
ইকবাল দেওয়ান অসহায় মুখে বললেন, " এই বয়সে আমাকে দিয়ে উঠবস করাবে? "
" হ্যাঁ। আর গুনবও আমি। একটা কম হলে আবার প্রথম থেকে।"
মনে মনে দীর্ঘশ্বাস ফেলে ইকবাল দেওয়ান বিড়বিড় করে বলল,
"ভাগ্যিস সিনিয়র আপুকেই বিয়ে করেছিলাম! না হলে নিজের চেয়ে ছোট একটা মেয়ের কাছে এভাবে কান ধরে উঠবস করতে হতো। অন্তত এই একটা সান্ত্বনা তো নিজেকে দিতে পারি! আর ইয়াশ... তোর হিসাবটা পরে সুদে-আসলে মিটিয়ে নেব।"
আর কোনো উপায় না দেখে ইকবাল দেওয়ান দুই কান ধরে উঠবস শুরু করলেন। পাঁচ নম্বর উঠবসের পরই হাঁপাতে শুরু করলেন।
" বেগম... একটু পানি খাই?"
" না। আগে দশটা শেষ করো।"
দশটা শেষ হতেই ইকবাল দেওয়ান হাঁটুতে হাত দিয়ে হাঁপাতে লাগলেন।
" আর পারছি না। "
ইকবাল দেওয়ান মুখ বাঁকিয়ে আবার উঠবস শুরু করলেন। কষ্ট করে বিশ নম্বর শেষ করতেই ধপ করে বিছানায় বসে পড়লেন।
" আলহামদুলিল্লাহ! বেঁচে গেলাম।"
মেহজাবিন দেওয়ান এবার হাসি চেপে রাখতে না পেরে হেসে ফেললেন।
" আচ্ছা, এবার বলো তো... সত্যিই কোনো দোষ করেছ?"
ইকবাল দেওয়ান নাটকীয় ভঙ্গিতে দুই হাত তুলে বললেন,
" আল্লাহর কসম, আমি নির্দোষ। আমার অপরাধ একটাই—ইয়াশ নামে একটা ফাঁসিবাজ ছেলে জন্ম দিয়েছি!"
মেহজাবিন দেওয়ান চোখ ছোট করে বললেন, " সত্যি?"
" একদম কোরআন ছুঁয়ে বলার মতো সত্যি!"
" কোরআন ছোঁয়ার দরকার নেই। আমি শুধু তোমার চোখ দেখে বুঝব।" ইকবাল দেওয়ান সঙ্গে সঙ্গে বড় বড় চোখ করে নিষ্পাপ মুখ বানিয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন।
" এই যে দেখো... আমার চোখে কি মিথ্যা লেখা আছে?"
মেহজাবিন দেওয়ান কিছুক্ষণ তাঁর চোখের দিকে তাকিয়ে রইলেন। তারপর হঠাৎ খিলখিল করে হেসে ফেললেন।
" আহারে! এত ভয় পেয়ে গেছ?"
ইকবাল দেওয়ান অবাক হয়ে বললেন, " মানে... তুমি রাগ করোনি?"
" আমি কি এতটাই বোকা? তোমাকে আমি আজকের না, কত বছরের চিনি?"
ইকবাল দেওয়ান বুকের ওপর হাত রেখে নাটকীয় ভঙ্গিতে বললেন,
" আলহামদুলিল্লাহ! মনে হচ্ছিল আজ বুঝি আমার জানটাই বের হয়ে যাবে।"
মেহজাবিন দেওয়ান হেসে বললেন, " জান বের হবে কেন? তবে একটা কথা ঠিক..."
" কী কথা?"
" তোমার ছেলেকে আমি আজ ছাড়ব না। বাপকে ফাঁসিয়ে নিজে বাঁচতে চায়! "
ইকবাল দেওয়ানের মুখে সঙ্গে সঙ্গে দুষ্টু হাসি ফুটে উঠল।
"এই তো আমার বউ! আমি একাই কেন বিপদে পড়ব? আজ বাবা-ছেলে দুজনেই সমান ভাগে বাঁশ খাব।"
মেহজাবিন দেওয়ান ভ্রু তুলে বললেন, " তোমার মুখে যে হাসিটা দেখছি, তাতে মনে হচ্ছে তুমি প্রতিশোধ নেওয়ার প্ল্যান করে ফেলেছ।"
ইকবাল দেওয়ান ফিসফিস করে বললেন, " অবশ্যই। এত বড় সাহস! নিজের বাবাকে বলির পাঁঠা বানায়! আজকে ওর এমন অবস্থা করব, আগামী ছয় মাস আমার নাম মুখেও আনবে না।"
মেহজাবিন দেওয়ান হেসে মাথা নাড়লেন। " আসলে তোমার ছেলের কোন দোষ নেই বাপের স্বাভাবি পেয়েছে। তুমি যে কেমন ছিলে আমারও বেশি ভালোই জানা আছে। আমাকে পটিয়ে ঠিকই বিয়ে করে ফেললে জুনিয়র হয়ে। "
" আজকে সিনিয়র বিয়ে করেছি বলে লাঠি ঝাটা খেয়ে কিছু মনে হয় না নিজেকে শান্তনা দিতে পারি। " বলে ইকবাল দেওয়ান একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
চলবে......