#দ্বাদশ_বসন্তের_নীলচিঠি
#কলমে #ইয়াজ_ইনসাফ_দেওয়ান
#পর্বসংখ্যা ৭
( অনুমতি ব্যতীত কপি করা নিষিদ্ধ)
আদিবাকে নিয়ে ইয়াজ দাড়িয়ে ছিলো মঞ্চের এক সাইডে শিক্ষকদের বসতে দেওয়া হয়েছে যেখানে সেখানে। আদিবাসী দাঁড়িয়ে ছিলো বেশ বোরিং ফিল করছে। ইয়াশ আর ইউভানের কোন খোঁজ নেই। ইয়াশ ফোনে মুখ গুঁজে দাঁড়িয়ে ছিলো।প্রফেসর ড: আরহাম বেশিদিন হয়নি চাকরিতে যোগদান করেছেন। ইয়াজের সাথে বেশ ভালোই কথা হয়। অনেকক্ষণ ধরে দুজনকে লক্ষ্য করছিল এগিয়ে এসে ইয়াজকে ভালো-মন্দ জিজ্ঞেস করে হঠাৎ!
" আপনার বোনটা তো অনেক কিউট, মাশাআল্লাহ! একদম কিউটের ডিব্বা।" কথাটা বলেই প্রফেসর আরহাম আদিবার গাল ধরে হালকা করে টেনে দিলো। ঘটনাটা ইয়াজের চোখে পড়তেই তার ভেতরে কেমন যেনো রাগ লাগতে রাগলো ওর একদম পছন্দ হলো না বিষয় টা । আদিবার গাল টেনে দেই। সেটা দেখে ইয়াজের প্রচন্ড রাগ হলো " চুটকিকে এভাবে টাচ্ করার সাহস কীভাবে পেলো উনি?" ভাবতেই রাগে সব ভেঙে ফেলতে ইচ্ছে করছে।
প্রফেসর রফিক সাহেব ও এগিয়ে এসে মুচকি হেসে বললো, "হ্যাঁ , আসলেই মেয়েটা অনেক কিউট।"
তাদের কথাগুলো শুনে ইয়াজের রাগ যেন তরতর করে বেড়ে গেলো। কিন্তু পরিস্থিতির কারণে সেখান থেকে হুট করে সরেও যেতে পারছিলো না। কিছু বলারও উপায় নেই । ঠিক তখনই সামনে পড়ে থাকা একটি বড় ব্যানার চোখে পড়তেই এক মুহূর্ত দেরি না করে সেটি তুলে আদিবার গায়ে জড়িয়ে দিল। আদিবা এতটাই অবাক হয়ে গেল যে কয়েক সেকেন্ড কিছুই বুঝে উঠতে পারল না। হঠাৎ এমন আচরণের কোনো মানেই খুঁজে পেল না সে। কী হচ্ছে, কেন হচ্ছে সবকিছু ভাবার আগেই প্রফেসর আরহাম বিস্মিত গলায় বলে উঠলেন, "ইয়াজ স্যার, আপনার বোনকে এভাবে ব্যানার দিয়ে মুড়িয়ে দিলেন কেন?"
ইয়াজ একবার সবার দিকে তাকিয়ে ঠান্ডা গলায় বলল, "আপনাদের নজরেই তো জ্বর এসে গেছে। পরে দেখা হবে।"
কথাটা বলেই আর এক মুহূর্তও দাঁড়াল না। আদিবার হাত ধরে দ্রুত পায়ে সেখান থেকে হাঁটতে শুরু করল। আদিবা কয়েক কদম যাওয়ার পর জোরে নিজের হাত ছাড়িয়ে নিল। ইয়াজও থেমে গেল। আদিবা বিরক্ত হয়ে বলল, "আপনি এভাবে আমাকে টেনে আনলেন কেন? আর এগুলো কী গায়ে জড়িয়ে দিয়েছেন?"
কথা শেষ করেই ব্যানারটা গা থেকে খুলে একপাশে ফেলে দিল।
ঠিক তখনই সামনে থেকে হাঁটতে হাঁটতে জায়ান এসে থেমে গেল। আদিবার দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে কয়েক মুহূর্ত চুপ করে রইল। তারপর মুচকি হেসে বলল, "আরে! শ্যামলিকা!"
আদিবা ভ্রু কুঁচকে তাকাল। জায়ান হেসে আবার বলল,
"না না, আদিবা নামটা সুন্দর। কিন্তু তোমাকে দেখে হঠাৎ 'শ্যামলিকা' নামটাই মাথায় এলো। , আর তোমার সঙ্গে দারুণ মানিয়ে গেছে। তা তুমি এখানে?" জায়ানকে এভাবে আদিবার দিকে তাকিয়ে থাকতে দেখে ইয়াজের মুখ আরও গম্ভীর হয়ে উঠল।
"তোর আর কোনো কাজ নেই? ওর সঙ্গে এত বকবক করছিস কেন?"
জায়ান অবাক হয়ে ইয়াজের দিকে তাকিয়ে বলল, "না। সব স্টুডেন্টদের দায়িত্ব দিয়ে এসেছি। এখন একটু ফ্রি আছি। তুই এমন করছিস কেন, শালা? আমি ওর সঙ্গে কথা বলছি তো!"
কথা বলতে বলতেই সে আদিবার হাত ধরে হেসে বলল,"চলো, তোমাকে ওদিকটা ঘুরিয়ে নিয়ে আসি। এখানে শুধু ভিড়।"
জায়ানের হাত আদিবার হাতে পড়তেই ইয়াজের মাথার রক্ত যেন এক লাফে চড়ে গেল। এক ঝটকায় সামনে গিয়ে জায়ানের হাতটা আদিবার হাত থেকে সরিয়ে দিল। "হাত ছাড়।"
ইয়াজের কণ্ঠস্বরে এমন কঠোরতা ছিল যে আশপাশের কয়েকজনও তাকিয়ে রইল। জায়ান ভ্রু তুলে বলল, "কী হলো? এত রেগে যাচ্ছিস কেন?"
ইয়াজ এবার সরাসরি তার চোখের দিকে তাকিয়ে ধীরে ধীরে বলল,
"যা বলেছি, সেটাই কর। এখান থেকে চলে যা।"
"কেন? আমি যদি না যাই?" ঠোঁটের কোণে হাসি টেনে বলল জায়ান। ইয়াজ এক পা এগিয়ে এসে নিচু স্বরে বলল, "নিজের হাত আস্ত পাবি না বেশি কথা বাড়াস না । তাই ভালোয় ভালোয় নিজের কাজে যা।"
তারপর কানের কাছে গিয়ে বললো " আর কোন দিন ওর গা ছুলে ধরে টুনটুনি কেটে দিবো " জায়ান কয়েক সেকেন্ড ইয়াজের চোখের দিকে তাকিয়ে রইল।মনে মনে বলল, "শালা বউকে বউ মানে না এতিমখানায় রেখে আসে আবার এখন স্বামী গিরি দেখাচ্ছে। " তারপর হেসে মাথা নাড়ল।
"আচ্ছা শালা , যাচ্ছি। এত রাগ করার কী আছে! পরে দেখা হবে।"
কথাটা বলে একবার আদিবার দিকে তাকিয়ে হালকা হাসল, তারপর সেখান থেকে চলে গেল। জায়ান চলে যেতেই আদিবা অবাক চোখে ইয়াজের দিকে তাকিয়ে রইল। মানুষটা ঠিক কী কারণে এতটা রেগে গেল, সেটা কিছুতেই বুঝে উঠতে পারল না।
ভাবনার ভিতরে দেখতে পেলো দূর থেকে দুই বান্দর দৌড়ে আসছে। কিছুক্ষণের মধ্যেই তারা দৌড়ে এসে ইয়াজের সামনে দাঁড়ালো। ওদের আসতে দেখে প্রফেসররা সেখান থেকে চলে গেলো। ইয়াজ তখন রাগী চোখে ইউভান আর আদিবার দিকে তাকিয়ে রইলো। ইয়াজের এমন ভয়ংকর দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকা দেখে ইউভান একটু অস্বস্তি নিয়ে বললো, " কী হয়েছে ভাই? এভাবে তাকিয়ে আছিস কেন আমাদের দিকে? আমরা কিন্তু মেয়ে না, ছেলে। এভাবে দেখার কিছু নাই। ইউভানের কথা যেন ইয়াজের রাগে আরও ঘি ঢেলে দিলো। ইয়াজ হঠাৎ জোরে ধমক দিয়ে বললো।
" তোরা এখনই চুটকিকে নিয়ে বাসায় যাবি। এখনই মানে এখনই!"
ইয়াজের গলার আওয়াজে আদিবা চমকে উঠলো। ইউভানও অবাক হয়ে গেলো। কারণ ইয়াজ সাধারণত এতটা রেগে যায় না। তাই আর কেউ কথা বাড়ানোর সাহস পেলো না। ইউভান শান্ত গলায় বললো।
" আচ্ছা ভাই, এখনই বাসায় যাচ্ছি। তবে কাজগুলো কী হবে?'
ইয়াজ দাঁতে দাঁত চেপে বললো, " আমি দেখে নিবো।"
কথাটা বলেই ইয়াজ গটগট করে সেখান থেকে চলে গেলো।
আর পিছনে দাঁড়িয়ে থাকা তিনজন শুধু বোকার মতো তাকিয়ে রইলো।
******
রাত তখন প্রায় এগারোটা। আজ অদ্ভুতভাবে কারও ডিউটি নেই।বা অন্য কাজ। ডিনার শেষ করে পুরো দেওয়ান বাড়ির ড্রয়িংরুমে যেন ছোটখাটো আড্ডার আসর বসেছে। ইয়াজ অবশ্য সবার আগেই ডিনার শেষ করে একটাও কথা না বলে নিজের রুমে উঠে গেছে। ড্রয়িংরুমে ইয়াশ আর ইউভান আরাম করে থ্রি-কোয়ার্টার প্যান্ট আর টি-শার্ট পরে সোফায় আধশোয়া হয়ে বসে আছে। ইলহাম দেওয়ান আর ইকবাল দেওয়ান বাড়িতে মাঝেমধ্যে লুঙ্গি পরে তারা বসে গল্প করছেন। মাঝেমধ্যে দুজনেই বাড়িতে এমনভাবেই লুঙ্গি পড়ে থাকেন। এক পাশে মেহজাবিন দেওয়ান, আরিবা দেওয়ান আর আদিবা একসাথে বসে গল্পে মেতে আছে। হঠাৎ করেই মেহজাবিন দেওয়ান উঠে বললেন, "শোনো শোনো... চল সবাই ট্রুথ অর ডেয়ার খেলি!"
মেহজাবিন দেওয়ান বাড়ির বাচ্চাদের সাথে এভাবে মেশেন। ওনার এক সেকেন্ডের মধ্যেই সবাই উৎসাহ হলো ইয়াশ বলে উঠল,
"ইয়েস! দারুণ হবে!"
আরিবা দেওয়ান ও বলে উঠলো আপু ঠিক বলেছো। "অনেকদিন খেলি না!"
শুধু একজনের মুখ মুহূর্তেই কাঁচুমাচু হয়ে গেল। ইকবাল দেওয়ান।
তিনি ধীরে ধীরে গলা খাঁকারি দিয়ে চারপাশে তাকালেন। মনে মনে বিড়বিড় করলেন,"হায় আল্লাহ... আবার সেই গেম!"
সিনিয়র বউকে বিয়ে করার পর থেকে এই একটা খেলার নাম শুনলেই তাঁর বুক ধড়ফড় করে। কারণ ট্রুথ অর ডেয়ার মানেই মেহজাবিন এমন সব প্রশ্ন করেন, যেগুলোর উত্তর দিলে বিপদ, না দিলেও বিপদ। আগেও একবার ভুল করে একটা প্রশ্নের সোজাসাপ্টা উত্তর দিয়েছিলেন। তারপর টানা তিন দিন তাঁর সঙ্গে কথা বলেননি মেহজাবিন। সেই স্মৃতি মনে পড়তেই অজান্তেই একটা বড় ঢোক গিলে ফেললেন তিনি। আমতা আমতা করে বললেন, "আ... আচ্ছা... এই গেমটা না খেললে হয় না? অন্য কিছু খেলি?"
মেহজাবিন দেওয়ান ভ্রু কুঁচকে তাকালেন।
"কেন?"
ইকবাল দেওয়ান তড়িঘড়ি মাথা নেড়ে বললেন, "না... না, কিছু না। এমনিই বললাম।"
ইয়াশ ঠোঁট চেপে হাসি আটকানোর চেষ্টা করছে। ইউভান তো মুখ ঘুরিয়েই ফেলেছে, না হলে হেসে দেবে। ইলহাম দেওয়ানও মুচকি হেসে ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে বললেন,
"ভয় পাচ্ছো নাকি?"
"ধুর! ভয় পাব কেন?" মুখ বাঁচানোর চেষ্টা করলেন ইকবাল দেওয়ান। মুহূর্তেই পুরো ড্রয়িংরুমে হাসির রোল পড়ে গেল।
হাসতে হাসতেই আরিবা দেওয়ান আদিবার দিকে তাকিয়ে বললেন,
"আদি মা, বড় ভাইয়াকে একবার ডেকে নিয়ে আয় তো। সবাই খেলব, ইজু না থাকলে মজা হবে নাকি?"
আদিবা এ খেলার কোন আগামাথাই জানে না তবু সবাই খেলবে বলে ওরও ভালো লাগলো ইউনিক কিছু একটা শিখতে পারবে। কিন্তু ইয়াজকে ডাকতে যেতে ইচ্ছে করছে না লোকটা মাঝেমধ্যে অদ্ভুত ব্যবহার করে। মার কথা ফেলতে না পেরে মাথা নেড়ে উঠে দাঁড়াল।
"আচ্ছা, ডাকছি।"
বলে সে সিঁড়ির দিকে হাঁটতে শুরু করল। ইয়াজ রুমের সামনে গিয়ে দুই একবার নক করলো। ওপাশ থেকে উ য়াজ বলে উঠলো কে, আদিবা নিচু স্বরে বলল,
" আমি আদিবা বড় ভাইয়া, আম্মু আপনাকে ডাকছে ।"
ইয়াজ বিছানার উপর শুয়ে ফোন টিপছিল আর ওর সাথে কথা বলছিল। আদিবার কথা শুনে এক লাফে উঠে দাঁড়ালো, তারপর ওর দিকে এগিয়ে এসে ঝুঁকে বললো, "কী বললি? আমি তোর বড়ভাই লাগি?"
আদিবা ইয়াজকে এভাবে নিজের দিকে আসতে দেখে একটা ঢোক গিলে বলল, " আম্মু-আব্বু বলেছে আপনাকে বড় ভাইয়া বলে ডাকতে ।"
ইয়াজ এবার হতাশ ভঙ্গিতে নিজের মাথায় হাত রেখে বলল,
" হু, তোর বাপ-মারে বলবি, তিন কবুল বলা বড়ভাইয়া লাগি তোর আমি। ও সরি, একদিক দিয়ে ঠিকই আছে। বাচ্চা মেয়ে বিয়ে করে
বড় আব্বা শোনার চেয়ে বড়ভাইয়া-ই ভালো।"
"আপনাকে নিচে ডাকছে, তাড়াতাড়ি আসেন আপনি।"
কথাটা বলেই আদিবা এক দৌড়ে সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে গেল। একবারের জন্যও পেছন ফিরে তাকালো না। ইয়াজ কিছুটা কৌতূহল নিয়ে ধীর পায়ে সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামতে লাগলো। কেন ডেকেছে, কী এমন জরুরি কিছুই তো স্পষ্ট করে বলে যায়নি আদিবা। নিচে নামতেই চোখের সামনে গেলো ইয়াজ মুহূর্তের জন্য থমকে দাঁড়িয়ে গেল। বসার ঘরে সবাই গোল হয়ে বসে আছে। প্রথমে খানিকটা অবাক হলেও পরক্ষণেই বুঝে ফেললো, সবাই মিলে বেশ জমজমাট একটা আড্ডার আসর বসিয়েছে। তবে সেই আড্ডার মধ্যেই যে কোনো একটা খেলা শুরু হতে চলেছে, সেটা বুঝতে ইয়াজের আর বাকি রইলো না। ইয়াজকে সিঁড়ি বেয়ে নামতে দেখে আরিবা দেওয়ান হাসিমুখে বলে উঠলেন,
"ইয়াজও চলে এসেছে। চলো, এবার খেলা শুরু করা যাক।"
আদিবাকে আরিবা দেওয়ান খেলার নিয়ম বুঝিয়ে দিল। সবার মুখে আনন্দের ছাপ থাকলেও একমাত্র ইকবাল দেওয়ানের মুখেই যেন হালকা দুশ্চিন্তার ছায়া ভেসে উঠলো। কারণটা আর কিছুই নয়। এর আগে যতবার এই ট্রুথ অর ডেয়ার খেলা বসেছে, ততবারই কোনো না কোনোভাবে নিজের প্রিয়তমা স্ত্রীর হাতে ঝাড়ুর বাড়ি হজম করতে হয়েছে তাকে। তাই আজও বুকের ভেতর অজানা এক শঙ্কা কাজ করছে। এদিকে ইয়াজ কোনো কথা না বলে গিয়ে মেহেজাবিন দেওয়ানের ঠিক পায়ের কাছটায় বসে পড়লো। তারপর আলতো করে মাথাটা মায়ের কোলে রেখে দিল। ছেলের এমন আদুরে আচরণে মেহেজাবিন দেওয়ানের ঠোঁটে স্নেহমাখা হাসি ফুটে উঠলো। তিনি মমতাভরা হাতে ইয়াজের চুলে বিলি কেটে দিতে লাগলেন।
অবশেষে খেলা শুরু হলো।
ঘরের মাঝখানে রাখা কাঁচের বোতলটা ঘুরিয়ে দেওয়া হলো। বোতলটা বনবন করে ঘুরতে লাগলো। আর সেটার সঙ্গে সঙ্গে সবার চোখও আটকে রইলো ঘূর্ণায়মান বোতলের দিকেই। কয়েক মুহূর্ত পর বোতলের গতি ধীরে ধীরে কমে এলো। প্রথম পালায় বোতলের মুখ গিয়ে থামলো ইউভানের সামনে। নিজের নাম উঠতেই ইউভান মুখে থাকা লজেন্সটা বের করে আদিবার দিকে তাকিয়ে অভিমানী গলায় বললো, "কেন রে পিচ্চি? লজেন্স খাচ্ছিলাম, তোকে দিইনি বলে এভাবে বাঁশ দিলি?"
কথাটা বলে সে আদিবার চোখের দিকে তাকিয়ে রইলো। কিন্তু আদিবার মুখে কোনো ভাবান্তর দেখা গেল না। সে নির্বিকার দৃষ্টিতে ইউভানের দিকেই তাকিয়ে রইলো। পাশ থেকে দৃশ্যটা দেখে মিটিমিটি হেসে ইয়াশ বলে উঠলো।
"বাঁশ যখন দিয়েছেই, ভালোবেসেই দিয়েছে। এখন আর নাটক না করে বল ট্রুথ নিবি, নাকি ডেয়ার?"
ইউভান কিছুক্ষণ চুপ করে রইলো। কারণ সে খুব ভালো করেই জানে, ট্রুথ বলুক আর ডেয়ারই নিক আজকের দিনে বাঁশ খাওয়া প্রায় নিশ্চিত। ইউভানকে চুপ করে থাকতে দেখে ইয়াশ আবার তাড়া দিয়ে বললো, "কী হলো? তাড়াতাড়ি বল। ট্রুথ, নাকি ডেয়ার?"
খানিকক্ষণ ভেবে ইউভান দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললো, "ডেয়ারই নিবো। তবে আগে থেকেই বলে রাখছি, উল্টাপাল্টা কিছু করতে বললে কিন্তু পারবো না।"
"তুই যখন ডেয়ার নিয়েছিস, তার মানে যা বলা হবে, তাই করতে হবে। আর তোকে ডেয়ার দেবে ইয়াজ ভাই।"
ইয়াশের কথা শুনেই ইউভানের চোখ দুটো গোল হয়ে গেল। ধীরে ধীরে মাথা ঘুরিয়ে সে ইয়াজের দিকে তাকালো। কারণ, ইয়াজ যদি ডেয়ার দেয়, তাহলে সেটা সহজ কিছু হবে এমন আশা করার কোনো কারণ নেই। অন্যদিকে ইয়াজ ঠোঁটের কোণে রহস্যময় এক দুষ্টু হাসি ঝুলিয়ে ইউভানের দিকেই তাকিয়ে আছে। সেই হাসি দেখেই ইউভানের বুকের ভেতরটা ধক করে উঠলো। কয়েক সেকেন্ড ইউভানকে অপেক্ষায় রেখে ইয়াজ হালকা গলায় বললো,
"তোকে খুব ছোট্ট একটা কাজ করতে হবে। আমাদের সবার সামনে একটু নাগিন ডান্স করে দেখাস।"
কথাটা শুনেই ইউভানের মুখ মুহূর্তেই চুপসে গেল। চারপাশে হাসির রোল পড়ে গেল। কিন্তু উপায় নেই, ডেয়ার যখন নিয়েছে, তখন সেটা পূরণ করতেই হবে। ইয়াজ মোবাইলে নাগিন ডান্সের গান চালিয়ে দিল। গান বাজতেই ইউভান অনিচ্ছাসত্ত্বেও নাচ শুরু করলো। কখনো মেঝেতে গড়াগড়ি খাচ্ছে, কখনো বানরের মতো লাফাচ্ছে, আবার কখনো কোমর দুলিয়ে এমন সব অদ্ভুত স্টেপ দিচ্ছে যে উপস্থিত সবাই হেসে কুটিকুটি। কেউ হাসতে হাসতে চোখের পানি মুছছে, কেউ আবার পেট চেপে বসে পড়েছে।
ইকবাল দেওয়ান তো হাসতে হাসতেই বললেন, " থাম এবার বাপ ! আর নাচলে আজ আমাদের হাসতে হাসতেই হাসপাতালে যেতে হবে!"
অবশেষে হাঁপাতে হাঁপাতে ইউভান কোনো রকমে নাচ শেষ করলো। নিজের জায়গায় এসে বসতেই সবাই আবার একদফা হেসে উঠলো। হাসির রেশ কাটতে না কাটতেই আদিবা আবার বোতলটা ঘুরিয়ে দিল। বোতলটা কয়েকবার ঘুরে ধীরে ধীরে গতি কমাতে লাগলো। সবার চোখ আবারও বোতলের ওপর স্থির হয়ে রইলো।
কয়েক মুহূর্ত পর বোতলের মুখ গিয়ে থামলো... আদিবার দিকেই।
তোর ছোট বেলার কথা বল। মেহেজাবিন দেওয়ান বলে উঠলো পাশে থেকে। তোর ছোটবেলার কথা বল।
প্রশ্নটা কানে যেতেই আদিবার মুখের হাসিটা মুহূর্তেই মিলিয়ে গেল। এতক্ষণ যে মেয়েটা সবার সঙ্গে হেসে-খেলে গল্প করছিল, সে আচমকাই অন্য এক জগতে হারিয়ে গেল। চোখের দৃষ্টি স্থির হয়ে রইল সামনের মেঝেতে। কয়েক মুহূর্ত নীরব থেকে গভীর একটা শ্বাস নিল সে।বুকের ভেতরে জমে থাকা বহু বছরের না বলা কথাগুলো গলায় এসে আটকে গেছে। তারপর ধীরে ধীরে বলতে শুরু করল,
"সত্যি বলতে... বাবা-মা সম্পর্কে বলার মতো তেমন কিছুই আমার জানা নেই। কারণ... আমি কোনোদিন তাদের দেখিনি। তাদের মুখ কেমন ছিল, কণ্ঠস্বর কেমন ছিল, আমাকে কখনো কোলে নিয়েছিলেন কি না—কিছুই জানি না। বুঝতে শেখার পর থেকেই আমি নানুর কাছেই বড় হয়েছি। ছোটবেলা থেকে নানুই ছিল আমার পুরো পৃথিবী। আমার কাছে মা-ও উনি ছিলেন, বাবাও উনি ছিলেন।"
কথাগুলো বলতে বলতে আদিবার কণ্ঠ ভারী হয়ে উঠল। তবুও নিজেকে সামলে আবার বলল, "নানু কখনো আমাকে বুঝতে দেননি যে আমার জীবনে কোনো অভাব আছে। নিজের সবটুকু ভালোবাসা দিয়ে মানুষ করেছেন। কিন্তু... তিন বছর আগে নানুও আমাকে ছেড়ে চলে গেলেন।"
শেষ কথাটুকু বলার সময় ওর চোখ চিকচিক করে উঠল। গলাটা যেন আরও ভারী হয়ে এলো।
"তারপর থেকে মামির কাছেই বড় হয়েছি। মামা ঢাকায় থাকেন। উনি হয়তো কিছুটা জানেন... কিন্তু কোনোদিন কিছু বলেননি। আমিও কখনো জোর করিনি। কারণ, যতবার জানতে চেয়েছি, ততবারই বুঝেছি কিছু প্রশ্নের উত্তর হয়তো পাওয়ার জন্য না। তাই চুপ করে গেছি।"
এতটুকু বলে আদিবা থেমে গেল। মাথাটা আস্তে করে তুলল। অজান্তেই ওর দৃষ্টি গিয়ে থামল ইয়াজের মুখে। দু'জনের চোখ এক মুহূর্তের জন্য মিলতেই যেন বুকের ভেতর জমে থাকা সব কষ্ট হঠাৎ করেই বেরিয়ে আসতে চাইল। আদিবা কাঁপা গলায় বলল, "তারপর... একদিন... মামি আমাকে অনাথ আশ্রমে দিয়ে দেন।"
কথাটা শেষ হতেই আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না সে। এতক্ষণ জোর করে আটকে রাখা চোখের জল টপ... টপ... করে গাল বেয়ে ঝরে পড়তে লাগল। কাঁপতে লাগল ওর ঠোঁট। পুরো ঘর নিস্তব্ধ হয়ে গেল। কয়েক মুহূর্ত আগেও যেখানে হাসির শব্দে মুখর ছিল পরিবেশ, সেখানে এখন পিনপতন নীরবতা। আদিবা তাড়াতাড়ি হাতের উল্টো পিঠ দিয়ে চোখের পানি মুছে ফেলল। নিজেকে সামলানোর চেষ্টা করল। ঠোঁটে এক চিলতে হাসি ফুটিয়ে ধীরে ধীরে বলল, "তবে জানেন... এখন আর এসব নিয়ে আমার কোনো অভিযোগ নেই। হয়তো আল্লাহ আমার কাছ থেকে কিছু কেড়ে নিয়েছিলেন, কিন্তু বিনিময়ে অনেক বড় একটা উপহার দিয়েছেন। এতদিন ভাবতাম আমার কোনো পরিবার নেই। কিন্তু আজ বুঝি, রক্তের সম্পর্কই সবকিছু নয়। ভালোবাসার সম্পর্কও পরিবার হয়।"
আবারও একবার ইয়াজের দিকে তাকাল সে। চোখে তখনও জল চিকচিক করছে, কিন্তু সেই জলের ভেতর এবার কৃতজ্ঞতার আলোও স্পষ্ট। মৃদু হেসে বলল,
"আজ আমি এত সুন্দর একটা পরিবার পেয়েছি... এমন কিছু মানুষ পেয়েছি, যারা আমাকে কখনো অনুভবই করতে দেননি যে আমি একা, আমি অনাথ। জীবনে প্রথমবারের মতো মনে হয়েছে আমিও কারও আপন। আমিও একটা পরিবারের অংশ। এই অনুভূতিটা... পৃথিবীর সবচেয়ে বড় পাওয়া।"
শেষ কথাটুকু বলেই আদিবা আর কিছু বলতে পারল না। চোখের জল আবারও গড়িয়ে পড়ল। তবে এবার সেই কান্নার মধ্যে শুধু হারানোর বেদনা ছিল না; ছিল বহুদিনের একাকীত্বের শেষে আপনজন খুঁজে পাওয়ার স্বস্তি, নিরাপত্তা আর নিঃশব্দ কৃতজ্ঞতা। আর ওর কথাগুলো শুনে উপস্থিত সবার চোখই অজান্তে ভিজে উঠল। কেউ আর কোনো কথা বলতে পারল না। শুধু নীরবে অনুভব করল হাসিখুশি মুখের আড়ালেও কেউ কেউ কতটা গভীর কষ্ট বয়ে বেড়ায়।
চলবে.....