#out_of_syllabus
৫. ‘কিরে পরের ওড়না,তুই নাকি লেংড়া আমের মতো গড়াগড়ি খাচ্ছিস শুনলাম!’
গ্রুপ কলে নাবিলের হাস্যরসাত্মক কথাটা ভেসে আসতেই অর্নার চোখ মুখের ভঙ্গি পরিবর্তিত হলো।সেই সাথে মেজাজটাও বিগড়ে গেল।তেঁতে উঠল অর্না,
‘গড়াগড়ি তো খাওয়ালো তোর ভাই। মানে দুনিয়াতে এত বাইক, এত বাইক চালানো ছেলে থাকতে তোর ভাইয়ের বাইকের সামনে পড়ি?’
নাবিল সেই সময় বেশ ভাব নিয়েই বলে উঠল,
‘ভাগ্য,ভাগ্য,,বুঝলি,তুই ভাগ্য করে আমার ভাইয়ের বাইকের সাথে ধাক্কা খেলি।সেই কারণে তোকে সযত্নে বাড়িতে পৌঁছে দিল।
‘অন্য কোনো বাইক হলেও দিত।বেশি ভাব নিয়েন না।’
নাবিল,অর্না,আর নিশা তিনজনে হোয়াটস অ্যাপ অডিও কলে। অর্নাকে নিহাল পৌঁছে দেওয়ার পরে আঞ্জুমান বেগম অর্নাকে নিয়ে তার নিজের ঘরে নিয়ে আসেন। অর্না ড্রেস চেঞ্জ করে হাত মুখ ধুয়ে নিলে তার পায়ের,কনুইয়ের ছিলে যাওয়া জায়গা ভালোভাবে পরিষ্কার করে এন্টিসেপটিক দিয়েন দেন আঞ্জুমান বেগম।আপাতত সে তার ঘরেই রেস্ট নিচ্ছে।বসে থেকে ভাবছিল কোনো মুভি দেখা যায় কি না।সেই সময়েই নাবিলের গ্রুপ কল।তাদের তিনজনকে নিয়েই তাদের গ্রুপ।
নাবিল অর্নার কথার মাঝে নিশা ফট করে বলল,
‘নাবিল,তুই নিহাল স্যার মানে তোর ভাইয়ের একবাড়িতে থাকিস কি করে?এমন গোমড়া মুখো,রাগী,খিটখিটে।’
নিশার কথার সাথে তাল মিলিয়ে অর্না বলে উঠল,
‘খাল বিল,আমিও এটা জানতে চাই।থাকিস কীভাবে? আঙ্কেল,আণ্টি তুই সবাই তো একই রকম কিন্তু এই নেই হাল নিহাল স্যারটা কোত্থেকে এমন এলিয়েন মার্কা মেজাজ নিয়ে উৎপন্ন হলো রে?’
অর্না এবং নিশা নাবিলের কথা তুলতেই নাবিল স্পিকারে থাকা কলের ভলিউম কমিয়ে দিয়ে বলে,
‘আস্তে চিল্লাবি? তোরা কি আমার প্রাণটা নেওয়ার ধান্ধা করছিস? মুখ সামলে কথা বল! তোরা তো নিশ্চিন্তে নিজের ঘরে বসে আছিস, আমার পাশের রুমেই কিন্তু ভাইয়া আছে! শুনতে পেলে তোদের সাইজ করার আগে আমার হাল বেহাল করে ছাড়বে!’
‘লে হালুয়া।তুই সাউন্ড কমিয়ে না দিয়ে মাইক বাজাচ্ছিস কেন?’
‘দিয়েছি কমিয়ে।এবার বল।’
‘আমি কি বলব! বলবি তো তুই।’
নাবিল তখন বলে ওঠে,
‘ওহ হ্যাঁ।ভাইয়া বরাবর ওইরকম।শান্ত,নিজের মতো থাকতে পছন্দ করে।ওই ইন্ট্রোভার্ট আর কি।ভাইয়ার বন্ধু সংখ্যা এই কারণে মাত্র দুই।আর কীভাবে থাকি! ভাইয়া তো ইন্টার এর পর বিদেশে ছিল।পড়েটড়ে দেশে এসে হঠাৎ কী মনে হলো—এনটিআরসিএ (NTRCA) এক্সাম দিয়ে সোজা আমাদের কলেজে কেমিস্ট্রির টিচার হয়ে ঢুকে পড়ল! সত্যি বলতে, একই বাড়িতে থেকেও সারা দিনে ভাইয়ার সাথে আমার দু-একবারের বেশি দেখা বা কথা কিছুই হয় না।’
নাবিলের এই দীর্ঘ বিবরণ বেশ মন দিয়ে শুনল অর্না আর নিশা। কথা শেষ হতেই অর্না একটা চওড়া হাই তুলে চরম বিরক্তি নিয়ে বলল,
‘চিন্তা কর! বিদেশ থেকে অত বড় ডিগ্রি বাগিয়ে এসে নাকি আবার আমাদের মতো উচ্চ মাধ্যমিকের বাচ্চাদের রসায়ন পড়ায়! তা-ও যদি লোকটার ভেতরে একটু রস-কষ থাকত! তোর ভাই বিদেশে কিসের ওপর পড়াশোনা করছিল রে?’
‘ফার্মেসি।’ নাবিল সোজা উত্তর দিল।
শুনেই নিশা ড্রামাটিক স্টাইলে চিৎকার করে উঠল, ‘ওরে বাবারে! তাহলে তো বিরাট ডেঞ্জারাস সিনিক!’
‘কিসের ডেঞ্জারাস?’ নাবিল আর অর্না দুজন একসাথে কৌতূহলী হয়ে প্রশ্ন করে উঠল।
নিশা তখন চরম রহস্যময় ও ভাবুক গলায় ফিসফিস করে বলল,
‘চিন্তা করে দেখ, সামনে কেমিস্ট্রি প্র্যাকটিক্যাল বা যেকোনো ক্লাসে আমরা যদি একটুও শয়তানি করি, ক্যামিকেল বা ভুলভাল ওষুধ বানিয়ে আমাদের খাইয়ে দেবে না—তার কোনো গ্যারান্টি আছে?’
কথাটা শুনে অর্না আর নাবিল দুজনেই এক মুহূর্ত চুপ হয়ে গেল। মনে মনে স্বীকার করতেই হলো—শয়তানটার কথায় আসলে যথেষ্ট যুক্তি আছে!
____________
‘ জুরাইন,সিলেট থেকে ফিরলি কবে?’
জুরাইন বেগম সাথে আনা ব্যাগ থেকে চা পাটা সহ আরো অনেক কিছু বের করছিলেন।নিজাম সাহেবের প্রশ্ন শুনে তার হাত থামলো।নিজাম সাহেবের ছোট বোন জুরাইন রিজওয়ান।ভাইয়ের প্রশ্ন শুনে এক গাল হেসে বললেন,
‘গতকাল ফিরেছি ভাইজান।দেখো তুমি চা খেয়ে পছন্দ করো বলে জেসি নিজে মনে করে কত রকমের চা এনেছে।’
জুরাইন বেগমের কথা শুনেও নিজাম সাহেবের মুখভঙ্গি একই রকম আছে।সে নির্বিকার ভঙ্গিতে জবাব দিল,
‘সে ভালো কথা।সেলিমের কি খবর? ব্যবসাপাতি ভালো চলছে তো?’
‘জি ভাইজান।চলছে।’
জুরাইন বেগমের পাশেই বসে আছে তার একমাত্র মেয়ে জেসিকা তাহমিদ জেসি।নাবিলের সমবয়সী। তবে জেসি অত্যাধুনিক মেয়ে।বাবা মায়ের একমাত্র মেয়ে হওয়াতে উগ্র মর্ডান স্বভাবের।যদিও মামা বাড়ি অর্থাৎ ‘কল্পকুঠির নিবাস’- এ আসার সময় তার পোশাক আশাকে বেশ বদল আসে।তবে,চুলের অগ্রভাগে করা গোলাপি রং তো ঢাকা সম্ভব হয়না।
জেসির স্বভাব,আচার,আচরণ সম্পর্কে বেশ ভালো ভাবে অবহিত নিজাম সাহেব।সেই কারণে তিনি তাকে বিশেষ পছন্দ করেন না।
বড়দের আলাপের মাঝে জেসি জিজ্ঞাসা করল,
‘মামী,নাবিল কোথায়? কতদিন কলেজ যাওয়া হয়নি তো এই কারণে একটু দেখে নিতাম কি কি করিয়েছে।’
জেসির প্রশ্ন শুনে আফরোজা বেগম বললেন ,
‘নাবিল ওর ঘরে আছে।’
আফরোজা বেগমের কথা শুনে জেসি বসা থেকে উঠে দাঁড়ালো।বলল,
‘ তাহলে আমি একটু ঘুরে আসি।ছবি তুলে নিয়ে আসি নোটসের।’
‘ ঠিক আছে যাও।’
জেসি এগিয়ে গেল সিঁড়ির কাছে।জেসি সিঁড়ি দিয়ে উঠতেই জুরাইন বেগম বলে উঠলেন,
‘ভাইজান,,তোমাকে যে একটা বিষয় বলেছিলাম।সেটা কি কিছু ভেবেছ?’
‘অনেক বিষয় তো বলিস।এখন ঠিক কোন বিষয় ভাবার কথা বলছিস?’
জুরাইন বেগম একনজর আফরোজা বেগমের দিকে দেখে নিয়ে বলল,
‘জেসির সাথে আমাদের নিহালের,,,
কথা শেষ হওয়ার আগেই থেমে গেল জুরাইন বেগমের গোলে আওয়াজ।নিজাম সাহেব হাত উঁচিয়ে তাকে থামিয়ে দিলেন।গমগমে গম্ভীর গলায় বললেন,
‘জুরাইন,আজকে শেষ বারের মতো বলছি।এরকম সম্পর্ক কোনোদিনও সম্ভব নয়।দ্বিতীয় কোনোদিন এসব কথা আমার সাথে বলবি না।আর,যদি মনে হয় বলবি তাহলে বলে রাখি,আমার সাথে কথা বলার বা,এই বাড়িতে আসার কোনো প্রয়োজন নেই।’
জুরাইন বেগম থমকালেন। ভয় পেলেন,কারণ তিনি তার বড় ভাইকে যথেষ্ট ভয় করেন।শুধুমাত্র মেয়ে জেসি ও তার বাবা সেলিমের জোরাজুরিতে সে প্রস্তাব দিতে বাধ্য হয়েছে।না হলে,তিনি নিজেও বেশ ভালো করেই জানেন জেসি কোনো ভাবেই নিহালের যোগ্য না।
জুরাইন বেগম ঘাড় ঘুরিয়ে সিঁড়ির দিকে দেখলেন।জেসি উপরে উঠেছে।মনে মনে শুধু বললেন,‘নিহালের ঘরে যাস না জেসি।নিজের সাথে আমার মান সম্মান যেটুকু বেঁচে আছে নষ্ট করিস না।’
‘কল্পকুঠির নিবাস’ আধুনিক ট্রিপ্লেক্স বাড়ি। নিহালের পছন্দ মতো নিজাম সাহেব পুরাতন নিবাস ভেঙে এই আধুনিক সজ্জায় সজ্জিত করেছেন।ট্রিপ্লেক্স বাড়ির দোতলায় তাদের প্রত্যেকের ব্যক্তিগত বেডরুম।এবং তৃতীয় তলাটার অর্ধেকাংশ নিহালের।সেটুকুতে সে ছাড়া কারোর যাওয়ার অনুমতি নেই।সে নিজেই সবটা গোছায়,পরিষ্কার রাখে।
জেসি সোজা দোতলায় উঠে আসে।নাবিলের ঘর পার করে নিহালের বেডরুম।সে নাবিলের বেডরুমের সামনে দিয়ে সোজা নিহালের রুমের দিকে এগিয়ে যায়।নাবিল ফোনে তখনও অর্না নিশার সাথে কথা বলতে ব্যস্ত।
জেসি অনুমতির তোয়াক্কা না করে সোজা নিহালের রুমে ঢুকে পড়ে।নিহাল সেই সময় স্টাডি টেবিলে বসে নিজের মতো ল্যাপটপে কিছু কাজ করছিল।জেসি নিঃশব্দে রুমে ঢুকলেও নিহালের সকল ইন্দ্রিয় অত্যন্ত সচেতন ভাবে জানান দিল অনাকাঙ্ক্ষিত কারোর উপস্থিতি।চোখ থেকে রিমলেস ঝকঝকে ব্লু কাট লেন্স এর চশমা খুলে টেবিলের উপর রেখে ঘুরে তাকালো।দরজার দিকে তাকাতেই দেখতে পেল জেসি এসে দাঁড়িয়েছে। জেসিকে দেখে নিহালের কপালে মাঝে কয়েক স্তরের ভাঁজ পরে।জেসির দিক থেকে দৃষ্টি সরিয়ে বিরক্ত গলায় প্রশ্ন করল ,
‘উইদাউট পারমিশন আমার রুমে এসেছিস কেন?’
নিহালের বিরক্তিতে পাত্তা না দিয়ে জেসি এগিয়ে এসে দাঁড়ালো নিহালের পাশে।গায়ে গা ঘেষে দাঁড়ানোর চেষ্টা করল তবে নিহাল ঘর সামান্য নড়াতে জেসি দূরত্ব রেখে দাঁড়ালো।হাস্যোজ্বল মুখে বলল,
‘নিজের মানুষের রুমে ঢুকতে অনুমতি লাগে? আর এমনিতেও কিছুদিন পরে হয়ত এটা আমার রুম হবে।’
‘হোয়াট রাবিশ?’
‘মামা রাজি হলে তো তোমার সাথে আমার বিয়ে হবে।তাই না বলো সেটা ভেবে বললাম।’
নিহাল বসা থেকে উঠে দাঁড়ালো।জেসির মুখোমুখি দাঁড়ালো।চোখে মুখে একরাশ বিরক্তি উপচে পড়ছে যেন।ট্রাউজারের পকেটে হাত গুঁজে রেখে বলল,
‘ বিয়েটা আমি করব নাকি তোর মামা করবে?’
জেসি নিহালের দিকে দৃষ্টি রেখে বলল,
‘তুমি করবে।তোমার জন্য কত ভালো ভালো কলেজ রেখে তুমি যেই কলেজে আছো সেইখানে এসে ভর্তি হলাম।বোঝো না তুমি এগুলো!’
জেসির কথায় মেজাজ ঠিক রাখতে পারল না নিহাল। এমনিতেই সে জেসিকে একেবারেই পছন্দ করে না।তার উপর,,,।মস্তিষ্কের প্রতি নিউরনে নিউরনে যেন ক্রোধ ছড়িয়ে পড়ছে।
'এই মুহূর্তে আমার চোখের সামনে থেকে বেরিয়ে যাবি!'
নিহালের বাজখাঁই গর্জনে ভয়ে আড়ষ্ট হয়ে কেঁপে উঠল জেসি। মেরুদণ্ড বেয়ে যেন শীতল এক স্রোত নেমে গেল তার। তবুও অবাধ্য মনকে শাসন করতে না পেরে কাঁপা কাঁপা পায়ে সে এগিয়ে গেল নিহালের দিকে। দুহাতে নিহালের এক হাত শক্ত করে আঁকড়ে ধরে আর্তনাদ করে উঠল,
'বিশ্বাস করো ভাইয়া, আমি তোমাকে সত্যি অনেক ভালোবাসি! তুমি যেভাবে বলবে, আমি ঠিক সেভাবেই থাকব, সব করব। প্লিজ, আমাকে এভাবে দূরে সরিয়ে দিও না! আমি তোমাকে...'
জেসির অসম্পূর্ণ বাক্যটা মুখেই রয়ে গেল। চোখের পলক ফেলার আগেই সশব্দে তার গালে আছড়ে পড়ল নিহালের শক্ত হাতের চড়। নিহাল এক তীব্র ঝটকায় নিজের হাতটা ছাড়িয়ে নিতেই ভারসাম্য হারিয়ে মেঝেতে ছিটকে পড়ল জেসি। নিহালের আঘাতের তীব্রতা এতটাই যে, জেসির ডান গালে মুহূর্তেই স্পষ্ট হয়ে উঠেছে পাঁচ আঙুলের লালচে ছাপ। মনে হচ্ছে যেন চামড়া ভেদ করে এখনই রক্ত বেরিয়ে আসবে। গালের তীক্ষ্ণ ব্যথায় মেঝেতে লুটিয়ে পড়ে ডুকরে কেঁদে উঠল সে।
এদিকে নিহালের ক্রোধ যেন দাবানলের মতো ফুঁসছে। রাগে কপালের দুপাশের রগগুলো দপদপ করছে, চোয়াল শক্ত হয়ে আছে। রক্তবর্ণ চোখে জেসির দিকে আঙুল তাক করে সে রাগে হিসহিস করে উঠল,
'নির্লজ্জতার সব সীমা পার করে ফেলেছিস তুই! এক্ষুনি বেরিয়ে যা এই বাড়ি থেকে। আর কোনোদিন যেন এই বাড়িতে তোর পা না পড়ে!'
নিহালের সেই গর্জনের প্রতিধ্বনি দোতলার গণ্ডি পেরিয়ে সোজা নিচের ড্রয়িংরুমে এসে আছড়ে পড়ল। আকস্মিক এই চিৎকারে নিহালের বাবা নিজাম সাহেব, আফরোজা বেগম এবং জেসির মা জুরাইন বেগম—তিনজনেই উৎকণ্ঠায় একে অপরের দিকে তাকালেন। নিজাম সাহেবের কপালে চিন্তার ভাঁজ আরও গাঢ় হলো। সোফা থেকে দ্রুত উঠে দাঁড়িয়ে সিঁড়ির দিকে পা বাড়ালেন তিনি। তড়িঘড়ি করে ওপরে উঠতে উঠতেই থমথমে গলায় জুরাইন বেগমকে উদ্দেশ্য করে বলে উঠলেন,
'জুরাইন, আজ কিন্তু তোর মেয়েকে বাঁচানোর দায়ভার আমার নয়। আমি তোদেরকে বারবার নিষেধ করেছিলাম!'
বড় ভাইয়ের এহেন কথায় জুরাইন বেগম আতঙ্কিত হলেন।মেয়েটাকে নিষেধ করা সত্ত্বেও সে নিহালের কাছে গিয়েছে।জুরাইন বেগম আফরোজা বেগমের হাত ধরে বলেন,
‘ভাবি,,বিশ্বাস করো আমি জেসিকে নিষেধ করেছিলাম।তুমি ভাইজানকে বলো নিহালকে যেন সামলায়।’
আফরোজা বেগম জুরাইনের হাত ধরে সিঁড়ির দুয়েক এগোতে এগোতে বললেন,
‘আগে চলো যেয়ে দেখি।তোমাকে তোমার ভাই,আমি কত বার বলেছি তবুও,,, যাক গে। চলো।’
জুরাইন বেগম ও আফরোজা বেগম দুইজনে এগিয়ে গেল দোতলায় নিহালের ঘরের দিকে।এদিকে নিহালের পাশের ঘরে থাকা নাবিল নিজেও ভয় পেয়ে ওঠে তার গলার আওয়াজ পেয়ে।ভাইয়ের চিৎকারে সে অর্নার কল না কেটে হাতে ফোন নিয়ে চলে আসে নিহালের ঘরে।ততক্ষণে নিজাম সাহেব এসে দরজায় দাঁড়িয়ে আছেন। জেসিকে মেঝেতে পড়ে থাকতে দেখে নাবিল অস্ফুট স্বরে বলে উঠল,
‘এই জেসি কা জঞ্জল কই থেকে উড়ে এসে মেঝেতে পড়ল!’
নিজাম সাহেব পাশে দাঁড়িয়ে থাকায় নাবিলের বলা কথাটা শুনলেন।তবে তিনি কোনো প্রতিক্রিয়া দেখালেন না।তিনি তো তাকিয়ে আছে তার বড় পুত্র নিহালের দিকে।
ধীর পায়ে ঘরে ঢুকলেন নিজাম সাহেব। তাঁর পিছু পিছু হাঁপাতে হাঁপাতে এসে পৌঁছালেন আফরোজা বেগম ও জুরাইন বেগম। ঘরের ভেতরের দৃশ্য দেখে জুরাইন বেগমের যেন বুকের ভেতরটা ধক করে উঠল। তার মেয়ে মেঝেতে পড়ে এক হাতে গাল চেপে ফুঁপিয়ে কাঁদছে, আর উল্টোদিকে নিহাল তখনও যেন এক জ্বলন্ত আগ্নেয়গিরির মতো দাঁড়িয়ে আছে আর ফুসছে।তার শ্বাস-প্রশ্বাস তীব্র, চোখ দুটো রক্তবর্ণ, কপালে আর গলায় রগগুলো রাগের কারণে স্পষ্ট ফুটে বের হয়ে আছে।
মেঝের দিকে তাকিয়ে জুরাইন বেগম চিৎকার করে উঠলেন,
‘জেসি! কী হয়েছে রে তোর?’
মেয়েকে তোলার জন্য জুরাইন বেগম এক পা এগোতেই নিজাম সাহেবের গমগমে কণ্ঠ থমকে দিল পুরো ঘরকে,
‘জুরাইন, ওখানেই দাঁড়িয়ে থাক। এক পা-ও সামনে বাড়াবি না।’
নিজাম সাহেবের গম্ভীর আদেশে জুরাইন বেগম ভয়ে সেখানে দাঁড়িয়ে পড়লেন। আফরোজা বেগম দ্রুত এগিয়ে গিয়ে নিহালের পাশে দাঁড়ালেন। ছেলের কাঁধে হাত রেখে নরম গলায় বললেন,
‘নিহাল, বাবা শান্ত হ। কী হয়েছে বল তো আমাকে?’
মায়ের স্পর্শ পেয়ে নিহাল চোয়াল আরও শক্ত করল,তবে মায়ের বেলায় আর নিজেকে সংযত করল।নিহাল নিজাম সাহেবের দিকে চেয়ে রাগান্বিত গলায় বলল,
‘বাবা,আপনার বোন আর ভাগ্নিকে এই মুহূর্তে আমার চোখের সামনে থেকে যেতে বলুন। এরা যদি আর এক সেকেন্ড আমার সামনে থাকে, তবে এর পরিণতি খুব খারাপ হবে।’
গালে হাত দিয়ে ডুকরে কেঁদে উঠল জেসি,
‘মামা! দেখো ভাইয়া আমাকে কীভাবে মারল! আমি তো শুধু...’
‘চুপ কর তুই!’ গর্জে উঠলেন নিজাম সাহেব নিজেই। জেসির দিকে তাকিয়ে তাঁর চোখেও তখন চরম বিরক্তি। তিনি জুরাইন বেগমের দিকে ফিরে থমথমে গলায় বললেন,
‘জুরাইন, তোকে নিচে বসে কী বলেছিলাম মনে আছে?তোদের উগ্রতা আর আস্পর্ধা যে কতটা বেড়েছে, তা আজ আবার প্রমাণ করলি।তোর মেয়ে কোন সাহসে এই ঘরে ঢোকার স্পর্ধা দেখিয়েছে?’
জুরাইন বেগম কেঁদে ফেলে বললেন,
‘ভাইজান, ও তো ছোট মানুষ... ভুল করে ফেলেছে...’
‘ছোট মানুষ?’ এবার আর নিজেকে ধরে রাখতে পারলেন না নিহাল। পকেট থেকে হাত বের করে দরজার দিকে আঙুল তুলে বলল,
‘উনিশ-কুড়ি বছরের একটা মেয়ে নিজের মামাতো ভাইয়ের ঘরে কোনো পারমিশন ছাড়া ঢুকে গায়ে পড়ে কথা বলে, বেহায়াপনা করে ওকে আপনার ছোট মানুষ মনে হয় ফুপি?শুনুন আজকে শেষবারের মতো ওয়ার্নিং দিয়ে রাখছি।আপনার এই আদুরে মেয়েকে আমার আশপাশ থেকে দূরে রাখবেন।এরপর যদি কখনো আমার রুমের আশেপাশে বা কলেজে আমার সামনাসামনি আসে, তবে আজ তো শুধু একটা চড় খেয়েছে, এরপর কোন জায়গায় পৌঁছাবে ও নিজেও জানে না!’
নিহালের বরফশীতল আর প্রকম্পিত কণ্ঠস্বরে পুরো ঘরে যেন কেঁপে উঠল।
দরজার কোণে দাঁড়িয়ে থাকা নাবিল হাত দিয়ে নিজের মুখ চেপে ধরেছিল। কিন্তু ফোনে তখনও অর্না আর নিশার গ্রুপ কল চালু! জেসির এই প্রকাণ্ড চড় খাওয়ার শব্দ আর নিহালের সেই বাজখাঁই গর্জন ফোনের স্পিকার দিয়ে অর্না ও নিশার কানেও স্পষ্ট পৌঁছে গেছে। ফোনের ওপাশ থেকে অর্না আর নিশা থ হয়ে বসে আছে।যেন সম্পূর্ন ঘটনা নিজের সামনেই দেখছে।নিহাল স্যারের এই ভয়ঙ্কর রূপের মহড়া শুনে দুজনেরই যেন গায়ের লোম খাড়া হয়ে গেছে। নাবিল মনে মনে বিড়বিড় করল, ‘বাপরে বাপ! বলছিলাম না জেসির এই কাণ্ড একদিন কাল হবে! একেবারে সিংহের খাঁচায় ঢুকে সিংহকে নাচাতে গিয়েছিল!’
নিজাম সাহেব শান্ত কিন্তু কঠোর গলায় বললেন, ‘জুরাইন, ব্যাগ গুছিয়ে নাও। ড্রাইভারকে বলছি তোদের এখনই পৌঁছে দিয়ে আসতে। এই বাড়িতে আর এক মুহূর্তও তোদের থাকা হবে না।’
‘ভাইজান, অন্তত আজকের রাতটা...’ জুরাইন বেগম অনুনয় করার চেষ্টা করতেই নিজাম সাহেব হাত তুলে তাঁকে থামিয়ে দিলেন।
‘না।নিজের মেয়েকে নিয়ে এখনই এ বাড়ি ছাড়। জেসিকে শোধরাতে পারলেই আসবি না হলে নয়।’ নিজাম সাহেব কথাটি বলেই আর এক মুহূর্ত না দাঁড়িয়ে হনহন করে নিচে নেমে গেলেন।
আফরোজা বেগম একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে জেসির দিকে তাকালেন। করুণা হলেও ছেলের মেজাজ আর স্বামীর সিদ্ধান্তের ওপর কথা বলার কোনো উপায় তাঁর নেই। তিনি থমথমে গলায় জুরাইন বেগমকে বললেন,
‘জুরাইন, জেসিকে নিয়ে নিচে এসো। আমি ব্যাগগুলো গুছিয়ে দিচ্ছি।’
সবাই একে একে রুম থেকে বেরিয়ে যেতেই নিহাল গিয়ে নিজের স্টাডি টেবিলের চশমাটা তুলে চোখে দিল। গভীর একটা শ্বাস নিয়ে এক ঝটকায় নিজের ঘরের দরজাটা ধাম করে বন্ধ করে দিল। সেই শব্দে বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা নাবিল পর্যন্ত লাফিয়ে উঠল।
চলবে..
out_of_syllabus
লেখনী_রুহিতা
পর্ব -৫ কার্টেসি ছাড়া কপি করা সম্পূর্ন নিষিদ্ধ
সকলে বেশি করে লাইক করে দেন পরের পর্বের জন্য